Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬৭

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬৭

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬৭
Maha Aarat

‘আমি কখনো আপনার কাছে কোনোকিছু নিয়ে অভিযোগ করেছি?’
তাঁর চোখে কান্না।আরহামের হৃদয়ে যেনো অগ্নিমশাল ধরিয়ে দিয়েছে কেউ।তিনি নি:শব্দে কেবল তাকিয়ে রইলেন।প্রত্যক্ষ করলেন হাফসার ভেজাচোখের নীরব সব অভিযোগ! উনার আক্ষেপ হলো, উমায়ের একটু ব্যতিক্রম হলেও পারতেন।
আরহামের হৃদয় থেকে যেনো একদল নীরব হাহাকার মুক্ত হওয়ার নেশায় যুদ্ধ শুরু করলো।মনের কথায় কান পেতে নরমসুরে বললেন, ‘আপনার অভিযোগগুলো শুনেছি।ঠিক শুনিনি,পড়ে নিয়েছি।আমারগুলো শুনবেন না?’
হাফসা ঝাপসা দৃষ্টি তুলে তাকালো।তার চোখে তীব্র সংশয়!
‘আমার অভিযোগ একটাই,আমি কখনোই আপনাকে আমার মতো করে পাইনি।কখনোই না,উমায়ের।আপনার এই মৌণতা,নীরবতা,লুকোচুরি দেখতে দেখতে আমি সত্যি ক্লান্ত।’

হাফসা আবার চোখ বুজলো।তার সব ব্যথা বিষাদে পরিণত হলো।আরহামকে সে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়,আর তিনিও চোখবুজে,বিনা অভিযোগে সব ব্যথা গিলে ফেলেন।এটা কি তাঁর স্বভাব?না রক্তের সম্পর্কে পাওয়া?বাবা যে ধোঁকা দিয়েছিলেন মা’কে তাঁর ক্ষেত্রে তো সেটা হয়নি।সে তো সম্পর্কের শুরুর থেকেই জেনে আসছে,উনার আরেকজন নারী আছেন,যাকে সে বোনের মতো ভালোবাসে।তবে এতো জড়তা কেন?তাঁর মনের কি ভয় হয়?আবারও কোনো ঝড়ো জলোচ্ছ্বাসের?যে ঝড় এসে রঙ্গিন স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিবে! ভালোবাসা নামক যে সুতোয় বাঁধা দূটো প্রাণ,কেটে যাবে সেই সুতো?এমন ভয়েই কি ওর এতো লুকোচুরি! ভাইকেও তো দেখেছে সে।কেমন নীরব,গম্ভীর আর রাগী।একই পোড়ায় কি ভাইয়াও দগ্ধ! নাহ,উনি তো এমন সত্য জানেন না! আর উনার না জানা’য়ই সব কল্যাণ রহিত!
নাহ,একদমই আবোলতাবোল ভাবছে সে।এমন ভাবনাগুলোর কোনো ভিত্তি হয় না।সে তো সঠিক সময়ের অপেক্ষায়! যেখানে গোপনে মরিচা ধরা এই সম্পর্কের লুকোচুরির সমাপ্তি হবে! হৃদয়ের আপনে-গোপনে লুকানো কোনো কথার আর বেড়ি থাকবে না,সে মুখ ফুটে আবদার করবে,অভিমান করবে,অভিযোগ করবে।মনের ভেতর চেপে রাখা যন্ত্রণার সাক্ষী আর হতে হবে না তাঁর।আর তো মাত্র কিছুক্ষণ! অতপর কাঙ্খিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!

সমুদ্রতীরের নীরব জায়গা! রাতের মধ্যাংশ।মাথার ওপর খেলা করছে একফালি চাঁদ।চাঁদের রূপোলি আলোয় প্রকৃতি ঘুমিয়ে আছে যেনো আবেশে।নরম বাতাস বইছে জোর গতিতে।ভরা জোৎস্নায় প্রকৃতি খোলস ছেড়ে দিয়েছে।খুব বেশী দূর দেখা না গেলেও মোটামুটি কাছের জিনিস বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।তীরে বাঁধা আছে খোলা নৌকাগুলো।সমুদ্রে ভাটা চলছে,তাই পানির আনাগোনা কমই আছে এখন।সড়কের পাশের নিয়নের আলোকবাতিতে এখানটায় বেশ আলোকিত।আইরাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন মাহের।সমতল জায়গা পেরিয়ে নরম মাটিতে পা দেওয়ার আগে তাঁর হাত শক্ত করে চেপে ধরতেই আইরার বকবকানি বন্ধ হলো।এতোক্ষণ সে হাজারটা প্রশ্ন করছিলো কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন,এটা তো আপনার হাসপাতালের রাস্তা না,আমাকে বসিয়ে রেখে আপনি কি পেশেন্ট দেখবেন,আমি একা একা কি করব,ঘুম আসলে কোথায় ঘুমাব,আপনার স্টেথোস্কোপ তো আনলেন না!
মাহের কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিলেন না।তাঁর হাত ধরতেই এতক্ষণে প্রশ্নের গোলা ছোড়া বন্ধ করে একেবারে নীরব হয়ে গেলো।হাঁটার গতি কমিয়ে দিয়েছে সে।মাহেরের দৃষ্টি সামনে থাকলেও তিনি বুঝতে পারছেন সে এখনো মাহেরের দিকেই তাকিয়ে।

‘কি হলো?কথা বলছো না?’
‘আপনি সত্যি আমাকে এখানে নিয়ে আসছেন?’
‘হ্যাঁ।কাজ শেষে চলে যাব।’
‘কাজ?এখানে কি কাজ?’
‘তোমার সাথে সংসার হচ্ছে না আমার।সমুদ্রে ফেলে চলে যাব।আর তো উপায় নেই।’
আইরা চিৎকার দিয়ে উঠলো।’মানে?’
‘আমার যে শ্বশুর,আর সমন্ধিক তোমার কিছু হলে তারা আমাকে কুচিকুচি করে ফেলবে,তাই তোমাকে বাঁচিয়ে রেখে কোনো ক্ষতি করবো না।একসাথে সবকাজ শেষ করতেই এখানে আসা।’
আইরা দাঁড়িয়ে পড়লো।তাঁর মনে পড়লো আব্বুর কথাগুলো।তিনি বলে দিয়েছিলেন ,আমার মেয়ের কিছু হলে আমি তোমাকে ছেড়ে দিব না।’মুখের ওপর এমন ভয়াবহ হুমকি কারোরই গায়ে সইবে না।কিন্তু সে তো এই কয়দিন এক ভিন্ন মাহেরকে আবিষ্কার করছিলো।সব কি মিথ্যা আর সাজানো।একটু সময়ের ব্যবধানে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো আইরা।আজকে তাঁর জীবনের শেষ রাত কল্পনাও করেনি সে।তাঁর ভালোবাসার মানুষ এতো বড় ধোঁকা দিলেন তাকে?
তার কান্নায় মাহের বিরক্ত হলেন।বললেন ,

‘আহা কাঁদছো কেন?’
‘আপনি তো আমাকে বলেন নি।’
‘আমি কি বোকা?বলে দিলে তুমি আসতে?’
‘কিন্তু আমার লাশ যদি ভেসে উঠে! তাহলে তো সবাই জানবে আমি মারা গিয়েছি।তাহলে তো আব্বু ভাইয়া জেনে যাবে যে আপনি…
‘তখন বলে দিব কিছু একটা।’
‘আপনি আমাকে ভালোবাসেন না?’
‘না।’
‘সত্যি না।’
‘তাহলে মেরে দিন।’
‘শিওর?’
‘মেরে দিন।শিওর মেরে দিন।আমি কিছু বলবো না।’
‘তুমি বললেও কিছু হবে না।’
আইরা কাঁদছে,হালকা আলোয় তাঁর টলমল চোখ দৃশ্যমান।এ পর্যায়ে নিজেকে বেশ শাসালেন মাহের।সুযোগ বুঝে এই বাচ্চা মেয়েটাকে কাঁদিয়ে নাস্তানাবুদ অবস্থা করে ছাড়ছেন।অথচ আজকে তো শুভ দিন!
এপাশে মানুষের আনাগোনা একেবারেই নেই।মাহের হাত বাড়িয়ে তাঁর নিকাব সরিয়ে নিলেন।রুমাল বের করে চোখমুখ মুছে দিতে দিতে বললেন , ‘আচ্ছা কেঁদো না।মারব না তোমাকে তুমি ভয় পাচ্ছ।’
সে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল, ‘বাসায় যাব।’

‘এখুনি?’
‘জ্বি।’
‘পরে যাই?মাত্রই তো আসলাম।’
‘আমার ভ্ ভয় করছে।’
‘আমাকে?’
আইরা উত্তর দিলো না।তাঁর ভীতচোখ বুঝিয়ে দিয়ে গেলো উত্তর।এবার বেশ শব্দ করে হাসলেন মাহের।স্বীকার করে নিলেন,এতোক্ষণ প্রাঙ্ক করছিলেন তার সাথে।আইরা প্রথমে বিশ্বাস করলো না।পরে যখন বুঝতে পারলো তার নিরামিষ গম্ভীর মানুষটা হাসাতে না পারেন,ভয় দেখাতে পারেন ভাবতেই চোখের পাতায় চেপে রাখা ভয় ঝাড়লো সে।প্রিয় মানুষের হাত ধরে অনাকাঙ্ক্ষিত এই সুন্দর সময়টা উপভোগ করতে ছাড়লো না।

রায়ানের নতুন চাকরি হয়েছে।তাও বেশ ভালো পজিশনে,হ্যান্ডসাম স্যালারিতে।বাবার সামনে মাথা উঁচু করে চলেন এখন তিনি।যেখানে দূর্দিনে মাথায় হাত রেখে ছেলেকে আগলে নেওয়ার কথা ভদ্রলোকের সেখানে অবহেলা করে দূরে সরিয়ে দেওয়ার তোহফা টা সত্যিই চমৎকার।
আজকের ডিনারটা বাহিরে করার প্ল্যান তাদের।রায়ানের ইনভাইটে বাবাও আমন্ত্রিত।কিন্তু ছেলে আর বউমার একসাথের মুহুর্তে বাগড়া দিতে চান না বলেই ভদ্রতার সহিত এমন প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়েছেন।
শহরের বেশ নিরিবিলি জায়গায় এই রেস্তোরাটা।কোলাহল ,বা তীব্র হইচইয়ের মতো কোনো বিরক্তিকর মুহূর্তের সাক্ষী হতে হবে না এখানে।এশা আজ ভীষণ খুশি।রায়ানের নতুন চাকরি,বা বাহিরে বের হওয়ার আনন্দে নয়,তাঁর আনন্দ লাগছে তাঁর প্রিয়তমের মলিন মুখে সুখের হাসি ফুটেছে।এতোদিন আড়ালে চেপে রাখা ব্যথা রায়ান যতই আড়াল করার চেষ্টা করতেন,এশা ঠিক বুঝে নিতো।তাঁর মনে হতো তাঁর ভালো থাকার ওষুধের অসুখ হয়েছে।সবশেষে এখন একটা সুন্দর সময়ের সাক্ষী হতে পেরে সে খুব বেশীই প্রফুল্ল!
এশা খেয়াল করলো,রায়ান বারবার ফোনে ডায়াল করছেন।এতোক্ষণে চেপে রাখা প্রশ্ন ছুড়লো সে।

‘কাকে এতো ফোন দিচ্ছেন?’
‘দিচ্ছি।আমার দূজন গেস্ট আসবেন।’
‘মানে?’- অবাক হলো এশা।
খানিক রাগতস্বরে বলল, ‘এতোদিন পর আপনার সাথে বেরোনোর সুযোগ হয়েছে।সেখানে আমার আর আপনার মধ্যেও অন্যকেউ থাকবে?’
‘তাতে দোষ কি?’
‘আপনি তাহলে তাদের সাথেই ডিনার করতেন।’
‘রেগে যাচ্ছো কেন?একা একা কি ভালো লাগে?কয়েকজন থাকলো একসাথে গল্প করলাম,সুন্দর সময় কাটবে।’
এশা মুখ ফিরিয়ে নিলো।যতটুকু খুশি নিয়ে এখানে এসেছিল ,তাঁর এক আনাও অবশিষ্ট থাকলো না।এই লোকটা কি তাকে আদৌ বুঝেন?

সমুদ্রতীরে ঘুরা শেষে একসাথে ডিনার সারলো তারা।অতপর মাহের তাকে আইসক্রিম কিনে দিলেন।আইসক্রিম খেতে খেতে সে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছিলো।একই সাথে হাতে হাত রেখে ,পাশাপাশি হয়ে ফুটপাতের সরু গলি ধরে হাঁটার মুহুর্তে ফুলের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাহের বললেন ,এখান থেকে যা যা ফুল পছন্দ সে বেছে নিতে,মাহের পে করছেন।আইরা একটা সাদা গোলাপের তোড়া তুলে আনতে আনতে ভাবলো,এই ফুলগুলো যদি তিনি নিজহাতে তাকে দিতেন,সে খুশিতে পাগল হয়ে যেতো,এজন্যই বোধহয় দেননি।
আরেকটু হাঁটতেই সে দূর থেকে রঙ্গিন বেলুন দেখে ছুটে গেলো।যেখানে ভেতরে ঝলঝল করে জ্বলছে কালারফুল তাঁরা’রা।মাহের তাঁর এই বায়নাও রাখলেন।শেষমুহুর্তে পপকর্ণ খেতে খেতে গন্তব্যে ফিরলো তারা।গাড়ির ফ্রন্ট মিররে মাহের দেখলেন,একহাতে বেলুন,অন্যহাতে ফুলের তোড়া,আর ঠোঁটে কথার ঝুলি নিয়ে কতো খুশি সে।আনমনে হাসলেন তিনি।মেয়েদের সত্যিই কি এতো অল্পতে খুশি করা যায়?

দূজনের মধ্যে পিনপতন নীরবতা।একটু আগের কথোপকথনের পর থেকে এশা নিশ্চুপ।সে অপেক্ষা করছে এখান থেকে চলে যাওয়ার।ফোন পেয়ে উঠে গেলেন রায়ান।রেস্তোরায় ডোরের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন উনার অতিথিদের অভ্যর্থনার জন্য।
এশা দেখলো কিছুক্ষণ পর প্রবেশ করলেন দূজন ব্যক্তি।বিস্ময়ে হতবাক সে যেনো নির্বাক হয়ে গেলো এমন ঘটনায়।দৌড়ে ছুটে গিয়ে আগলে নিলো মা’কে, বাবাকে।খুশিতে তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।সে নি:শব্দে তাকালো রায়ানের দিকে।উনি ঠোঁট চওড়া করে হাসলেন।চমৎকার হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন,তার মুখে এই হাসি ফোটানোর জন্য ,তাকে খুশি জন্য এমন হাজারবার চমকে দিতে পারেন!

আজকে শুক্রবার।বাসায় থাকবেন আরহাম।পুরো সকালটা আম্মুর সাথে ছিলেন তিনি।আম্মুর রুম গুছিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে কাপড় কাঁচা কিছুই বাদ রাখেননি।আম্মুর কেবিনেটের লকে ডিস্টার্ব হয়েছে তাই এখন সেটা ঠিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
হাফসা দৃঢ় অপেক্ষায়।দীর্ঘ অপেক্ষা ফুরোলো।আরহাম ব্যস্তভঙ্গিতে রুমে ঢুকলেন।উনার হাতে স্কচটেপ।হয়তো কিছু খুঁজতে এখানে এসেছেন।ডোর খুলতেই একেবারে সামনাসামনি দেখা গেলো উমায়েরকে।আরহামের মস্তিষ্ক জানান দিলো হ্যামার খুঁজতে এখানে এসেছেন তিনি।কিন্তু এর ন্যানো সেকেন্ডের মাঝে মস্তিষ্ক তাঁর নোটিফিকেশন পাল্টে ফেললো।বুঝালো এমন কিছু তিনি দেখে ফেলেছেন যেটার চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু হতে পারে না।
তড়িৎ গতিতে হাফসার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলেন তিনি।নিজের অজান্তেই বুকে হাত চলে গেলো উনার।অস্ফুটস্বরে বলে উঠলেন, ‘ইয়া মারহাবা!’
আরহামের চক্ষুতে নৃত্য করছে যেনো সর্বোচ্চ সুন্দর কোনো নৈসর্গিক সৌন্দর্য! অপরিমেয় মুগ্ধতা নিয়ে দেখছেন উনার প্রিয়তমাকে।এ মুহুর্ত থমকে যাক,চোখ এই সৌন্দর্য আমরণ দেখতে থাকুক,তবে আর কোনো তৃষ্ণা থাকবে না।না থাকবে কোনো আক্ষেপ,আফসোস!
ইসস এভাবে কেন তাকাচ্ছেন তিনি।আজকে সাইনেস দমিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টার পণ করেছে হাফসা।এতোটুকু এসে শেষে না হেরে যায়!

“এ বউটা আমার?”
আরহাম এক হাতে চিবুক ধরে মায়ময়ী চোখে জিজ্ঞেস করলেন।হাফসা লাজুক হেসে মাথা নত করে বলল, ‘আপনি বলেছেন কখনো ইচ্ছেমতো আমার চুল দেখেননি।’
হাফসার পরনে কমলা শাড়ি।মাথায় হিজাবের সাথে হালকা মেকআপ।লোকটাকে মাঝে মাঝে এমন চমকে দেওয়া যায়,তাঁর খারাপ লাগবে না।
আরহাম হঠাৎ বললেন , ‘আমি আসছি,উমায়ের।’
বলে দ্রুত চলে গেলেন তিনি।হাফসা ঠোঁট উল্টে দাঁড়িয়ে রইলো।এমন চমৎকার মুহুর্তে উনার কোন কাজের কথা মনে পড়লো আবার।
আরহাম খুব বেশি সময় নিলেন না।মিনিট দশেক পরের মানুষটাকে দেখে সে চমকালো,থমকালো।উনি কাছে আসতেই মনে হলো,এই সুবাসে চোখ বুজে মাতোয়ারা হওয়া যায়।আরহাম মুচকি হেসে তার হৃদযন্ত্র স্পর্শ করলেন।অনুভব করলেন সেটার কম্পনে ঝড় উঠেছে।আরহাম দুষ্টু হেসে ভ্রু উঁচিয়ে বললেন, ‘এবার ঠিক আছে।আপনি একা পরিপাটি হবেন আর আমি যেমন তেমন থেকে যাব?’

সাদা শুভ্র পান্জাবি,বুকে হলুদ সুতোর কাজ।ঘন দাঁড়িতে বাখুরের ঘ্রাণ,গায়ে আঁতর।খুব বেশি আহামরি কিছু না তবুও তার পুরুষের সৌন্দর্য্যে আজ সে পলকহীন তাকালো।নাহ,এতক্ষণ অপচয় করে নিজের সৌন্দর্য সে যতটুকু না ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে, উনি সেক্ষেত্রে দশ মিনিটেই সফল।
আরহাম নীরব সম্মতি চোখে ওরনার এক ভাঁজ খুললেন।ঘন কেশে খোঁপা করা চুল ছাড়তেই সেগুলো ছড়িয়ে পড়লো অনায়াসে।এক শ্যামল স্নিগ্ধ ঘ্রাণ লাগলো নাকে!
আরহাম নিমগ্ন হয়ে মুখ ঝুঁকে সুবাস নিতে গেলেই কানে বাজে এক বিস্ফোরক শব্দ!
‘আপনাকে পুচকে পুতুলের আম্মু ভালোবাসে।খুব ভালোবাসে,ভীষণ ভালোবাসে।’
আরহাম জড়িয়ে ধরলেন।শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।নাহ,এবার আরও শক্ত করে ধরলেন।হাফসা ব্যথা অনুভব করছে।লোকটা এতো পাগল!মুখে কুলুপ এঁটে চোখ বুজে রইলো সে।এইতে আর একটু!একটু পর সে বোধহয় উনার বুকের ভেতর ঢুকে যাবে।উনার হৃদপিন্ড নামক যন্ত্রটার টিপটিপ আওয়াজ স্পষ্ট আলাদা করতে পারছে সে।আওয়াজ টা এসে তাঁর কানে বাড়ি খাচ্ছে, মনে হচ্ছে তাঁর হার্টবিটের শব্দ এটা।
পিনপতন নীরবতা ছাড়িয়ে হুট করে ছেড়ে দিলেন তিনি।চোখে নীরব অশ্রুর ঢেউ।আনন্দের অশ্রু সব সময় মুছে ফেলতে নেই।এটা দূ:খ নিয়ে ঝরে।একটু দূ:খের অবসান হতে দোষ কি!

আরহাম একটু পরপর তাঁর গাল টানছেন।আবার পেটের দিকে তাকাচ্ছেন।এখানে যে ছোট্ট একটা প্রাণ ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে ভাবলেই উনার চোখ ভিজে যাচ্ছে।একদিনে এতো শক কীভাবে মানিয়ে নিবেন তিনি।এবার বাচ্চাদের মতো দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে আরম্ভ করলেন তিনি।এ অভ্যাস টা তো তাঁর নিজের,ভেবে মুচকি হাসলো হাফসা।এদিকে উনার গাল ভেজে যাচ্ছেই অবিরত।
জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্ বাবুটা কি সত্যি? সত্যি উমায়ের?’
হাফসা উপর নীচ মাথা ঝাঁকালো।নাহ,তারপরও আরহাম বিশ্বাস করতে পারছেন না।বাবা হওয়ার সংবাদে এতো সুখ কীভাবে থাকে।কীভাবে এই সুখ হজম করা যায় ভেবে কুল কিনার পাচ্ছেন না তিনি।
এতোক্ষণের প্রাণোচ্ছল আরহাম এখন একেবারে নীরব।উনার ভেতরের অনুভূতি সম্পর্কে অবগত নয় সে।হাফসার মুখ শুকিয়ে গেলো।তিনি কি সন্তুষ্ট না?’
‘আপনি কি ভাবছেন?খুশি হোন নি না?’

আরহাম ছলছল চোখে তাঁর দিকে তাকালেন।বাচ্চা শিশুর মতো চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘আমি যে কত খুশি আমি কীভাবে বুঝাই আপনাকে!আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ!’
পুরো বাড়িতে আনন্দের ঢেউ।আম্মু একটু পর পর তাঁর চিবুক ধরে চুমু খাচ্ছেন।আব্বুর চোখে মুচকি হাসি লেগেই আছে।আইরা সংবাদ শুনেই হইচই করা শুরু করেছে।সে পারলে উড়ে চলে আসে।এতো কিছুর ফাঁকে আরহামের কেমন লজ্জ্বা লজ্জ্বা লাগছে।উমায়ের তো সবসময় লজ্জ্বা পান,তাই উনার এখনকার সাইনেস কারো চোখে আসবে না।কিন্তু আরহামতো লজ্জ্বা পাওয়ার কথা না।তবুও লজ্জ্বা লাগছে।

ইসস বাসায় একটু ফাঁকা জায়গা নেই,যেখানে ঘাপটি মেরে কিছুক্ষণ লুকিয়ে থাকা যাবে।খুঁজতে হবে,খুঁজলে পাওয়া যাবে।সেই উদ্দেশ্যে হাঁটতেই একেবারে আব্বু সামনাসামনি পড়ে গেলেন।আরহাম মাথা নিচু করে ফেললেন সাথে সাথে।আহনাফ তাজওয়ার কেনো জানি উনাকে কোনো শুভেচ্ছা জানালেন না।আরহামের মনে পড়লো সেদিনকার কথা, ‘

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬৬

‘তোমার দাদু যেদিন তোমার আম্মুর মতো এরকম বলেছিলেন আমি তাঁর পরেই তাকে তোমার সুসংবাদ দিয়েছিলাম।’
হিসেব টা কেমন মিলে গেলো?

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here