অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২০
নুরিয়া ইসলাম
রাতটা ছিল ঘন কালো কুয়াশার মতো। বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল, জানালার কাঁচে ঝাপসা ছাপ রেখে চলেছিলো জলের ফোঁটা। অলিভিয়া বিছানার নরম কম্বলের ভাঁজে নিজেকে মুড়িয়ে নিঃশব্দে ফোন স্ক্রল করছিল। হঠাৎই তার ওয়াটসঅ্যাপে কিছু ছবি আসে অজানা নাম্বার থেকে। সে কৌতুহলী হয়ে ছবিগুলো খুলে দেখে, আর সঙ্গে সঙ্গেই মুখটা রাগে জ্বলে ওঠে।
ছবিতে ইনায়া আর এরিক একসাথে একটা রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে আছে, তারা দুজনেই দুজনের দিকে একদৃষ্টুতে তাকিয়ে রয়েছে।
এই ছবিগুলে দেখে, অলিভিয়ার বুকের মধ্যে কুন্ডলী পাকানো একটা বিষণ্ণতা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে;এক নিমেষে তার হাত-পা কেঁপে ওঠে, হৃৎপিণ্ডে জমে ওঠে কান্নার ভারী ঢেউ।
সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে ওঠে,”কেন, এরিক? কেন তুমি আমায় ভালোবাসলে না? আমাকে কী ভালোবাসা যায় না? ”
তবুও নিজের যন্ত্রণাকে আড়াল করে কাঁপা হাতে সে এরিককে মেসেজ লেখে,
“Why, Erik? Why am I never the one you see the way I see you?
I have given you every piece of my heart, every dream, every hope—yet you always look past me, as if I’m invisible.
It hurts, Erik. It hurts to love you this much and know you’ll never be mine.”
মেসেজটা পাঠিয়ে অলিভিয়া বিছানার কোণে সরে গিয়ে চুপ হয়ে বসে; মুখটা আয়নার দিকে ফেরায়।
চুলগুলো খুলে তার ঘাড়ে ছড়িয়ে দেয়;নিজেকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আত্মার নিঃসঙ্গতা গিলে ফেলে। তার চোখ দুটো ভিজে ওঠে , অথচ ঠোঁটে ভয়ঙ্কর হাসি ফুটে ওঠে, সে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে:
“ইনায়া… জানিস তো, এরিকের প্রতি আমার ভালোবাসার শেষ নেই;অন্ধকারটাও কখনো এমন ক্ষুধার্ত হয়নি, যেমনটা আমি হয়েছি; আমি এমন এক শূন্যতায় ডুবে আছি, যেখানে শতবার নিজেকেই হারিয়েছি শুধু এরিককে পাবো বলে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তুই জানিস না;এরিককে পাওয়ার জন্য আমি নিজের ছায়াকেও পুরিয়ে ফেলতে পারি!
অলিভিয়া আয়নার গ্লাসে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি করে বলে উঠে,
“Only one of us can have Erik, and it will never be you…”
তারপর বিছানা থেকে চুপচাপ উঠে সে ঘরের কোণে হাঁটে, চুল আঁকড়ে ধরে, ফিসফিস করে—
“ভালোবাসা একবারই হয়, পাগলামি হাজারবার… এরিক আমার, শুধু আমারই থাকবে। কেউই আমাদের মাঝে আসতে পারবে না।”
ইনায়া USC ক্যাম্পাসের নির্জন গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, হঠাৎ এক বখাটে টাইপের ছেলে তার সামনে এসে দাঁড়ায়;বেখেয়ালি অঙ্গভঙ্গি করে, ঘাড় কাত করে বলে,
“Hey queen of the desert, are you hiding your beauty with that hijab? Undress it, babe. Show me your f*cking milky body!”
(হেই মিষ্টির রানি,তুমি তোমার সৌন্দর্য কেন এই স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে রেখেছো? সব কিছু খুলে ফেল, বেবি?আমি তোমার সৌন্দর্য দেখার জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছি।)
ছেলেটির কথা শুনে ইনায়া বিরক্ত হয়ে পাশ কাটাতে চায়।কিন্তু ছেলেটি সামনে এসে দাঁড়ায়, ইনায়ার দিকে আরেকটু এগিয়ে আবার বলে,
“Come on, you must be so hot under all that stuff. Give me a real look, sweetheart!”
(তুমি খুব হট ;দেখেই বুঝতে পারছি?আমাকে তোমার হটনেস্ একটু দেখতে দাও সুইটহার্ট।) ”
কথাটি বলেই ছেলেটি;হাত বাড়ায় ইনায়ার স্কার্ফের দিকে। ইনায়া এক ঝটকায় ছেলেটির হাত সরিয়ে দিয়ে, তার গালে তীব্র আওয়াজে এক চড় মারে; গলা শক্ত করে বলে,
“Keep your disgusting hands off me!”
(নিজের নোংরা হাত আমার থেকে দূরে রাখ!)
ইনায়ার কান্ডে ছেলেটা ভয়ংকর রেগে যায়,রেগে সে ইনায়ার হাত চেপে ধরে।
“You little..b&tc#.! You think you can hit me and just walk away?”
(বিচ্!কী ভেবেছিস? আমাকে মেরে চলে যাবি?)
ইনায়া ছেলেটির হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে, পারে না। ঠিক তখনই পেছন থেকে গভীর গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে,
“Take your filthy hands off her.”
(তোর নোংরা হাত ওর থেকে সরা, শুয়োরের বাচ্চা!)”
এরিক ছেলেটার সামনে এসে দাঁড়ায়, রাগে এরিকের পুরো মুখ লাল হয়ে গেছে, সে ছেলেটির হাত চেপে ধরে বলে,
“Which hand did you touch her with? This one? Swear to God, I’ll f*cking break it!”
(কোন নোংরা হাত দিয়ে ওকে স্পর্শ করেছিস;তোর সেই হাত আমি ভেঙে ফেলবো, আই সোয়ার!)
বলেই, এরিক ছেলেটার হাতে চাপ দেয়, ছেলেটা আর্তনাদে চিৎকার করে ওঠে। এরিক তাও ছাড়ে না—একের পর এক কিল,ঘুষি মারতে থাকে , ছেলেটা পড়ে যায় মাটিতে। এরিক ছেলেটির গলা ধরে ক্যাম্পাসের সবার সামনে তুলে বলে,
“শুনে রাখো সবাই! She’s mine. Not an accessory. Not some weak girl. She’s MY f*cking world.
(সে শুধু আমার; শুধুই আমার। সে আমার রাজ্যের রানি। তার গায়ে আঁচড় পড়ার আগে আমি পুরো দুনিয়াকে ছাই করে দেবো।
আই প্রমিস!এক বিন্দুও দুঃখ দিলে, আমি দম নিতেই দেব না, কাউকে! )
ইনায়া আদুরে বিড়াল ছানার মতো গুটি-শুটি মেরে এরিকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এরিক এগিয়ে এসে তার স্কার্ফটা ঠিক করে দেয়, গভীর চোখে তার দিকে এক পলক চেয়ে ধীর কন্ঠে বলে—
“তুমি ঠিক আছ তো? কেউ তোমাকে ছুঁতে পারবে না, যতদিন আমি আছি;আই প্রমিস!”
ইনায়ার কাঁপা কাঁপা গলায় , আস্তে বলে,
“ধন্যবাদ…”
এরিক মুচকি হেসে বলে,
“নিজের শত্রুকে ধন্যবাদ দিচ্ছো… ইন্টারেস্টিং।”
ইনায়া এবার কয়েক ধাপ এগিয়ে, ঠান্ডা গলায় বলে,
“আমি কমপ্লিমেন্ট দিতে কার্পণ্য করি না। তবে সবাইকে দেওয়া যায় না;কেউ কেউ সেটা লালার মতো জড়িয়ে রাখে, কেউ পাথরের মতো টেনে নেয়। আপনি কোনটা মনে করেন নিজেকে, এরিক?”
এরিক একটু মুচকি হেসে বলে,
“প্রয়োজনে দুটোই;তোমার জন্য পাথর হতে পারি, আবার আগুনও।”
প্রেম এমন এক সমুদ্র, যার জল কখনও নিস্তরঙ্গ নয়। ভালোবাসা বৃষ্টি, খরস্রোতা নদী, কাঠফাটা রোদ কিংবা টুপটাপ ঝরা পাতা ;সবকিছুর মতোই অবাধ্য, বাঁধভাঙা। সময়ের সাথে সাথে ছুটে চলে দুই মেরু, আদিল আর জুলি;সহসাই দুজনে বুঝতে পারে না, নিজেদের অনুভূতি।
জুলি:তাহলে, শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল আমাদের প্রেজেন্টেশনটা… কেমন লাগছে?
আদিল:অদ্ভুত লাগছে। এতদিন সকাল-সন্ধ্যা এই প্রেজেন্টেশন নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি, হঠাৎ করে এখন যেন খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
জুলি হেসে বলে,
তোমার তো এখন নিশ্চয়ই আনন্দ হচ্ছে, “এই মেয়েটা” আর ঘাড়ের ওপর থাকবে না।
আদিলঃ
আসলে… “এই মেয়েটা” না থাকলে প্রেজেন্টেশন হতো না। আর হয়তো এই কফি মোমেন্টটাও থাকতো না।
জুলি:
তোমার সঙ্গে কাজ করে অনেক কিছু শিখেছি। শুধু অ্যাকাডেমিক না… মানুষ হিসেবেও।
আদিল:
আপনি খুব সিরিয়াস আর গুছানো, আমি তো হাফ-হাজার্ড টাইপ। অথচ কেমন যেন মানিয়ে গেলাম, তাই না?
জুলিঃ
মানিয়ে যাওয়ার পেছনে কারণ থাকে।
আদিল জুলির দিক থেকে নজর সরিয়ে বলে,
সব কিছুর ব্যাখ্যা হয় না, ম্যাডাম।
জুলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
তোমার সাথে কাটানে সময়গুলো… জানো, এগুলো একধরনের বাজে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আদিল:
অভ্যাসগুলো যখন শেষ হয়ে যায়, তখন
মানুষকে দেখতে একটু খালি খালি লাগে?
জুলিঃ
হয়তো… কিংবা আরো কিছু অনুভূতি থেকে যায়, যা বলা হয় না।
আদিলঃ
সব অনুভূতি বলাও যায় না… কথাটা বললেই হয়তো, ভুল হবে।
জুলিঃ
তাহলে চলো, না বলার এই চুপচাপ অভ্যাসটাকে ধরে রাখি। শেষ কফির মতো করে।
আদিল:
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৯
শেষ না। হয়তো… অন্য কোনো দিনে, অন্য কোনো কাজের ছুতোয় আবার দেখা হবে।
জুলি:
হয়তো। যদি Universe চায়।
দুজনেই চুপচাপ কফিতে চুমুক দেয়। জানালার বাইরে ঝরা পাতার মতো নিঃশব্দে পড়ে থাকে কিছু না বলা কথা।
