Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩০

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩০

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩০
নুরিয়া ইসলাম

ইনায়ার কথাগুলো এরিকের বুকের মাঝখানে ছুরির মতো বিঁধে গিয়েছিল।
— “আপনার নোংরা হাত দিয়ে আমায় স্পর্শ করবেন না!”এই একটি বাক্য তার মাথার ভেতরে ঝড়ের মতো তাণ্ডব চালাচ্ছে। তার চোখে আগুন জ্বলছে, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে একটা তীব্র যন্ত্রণা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সে ইনায়ার সামনে নিজের অতীতের কালো পর্দা সরিয়ে দিয়েছে,
নিজের সমস্ত দুর্বলতা আর ভুল উন্মোচন করে দিয়েছে, কিন্তু ইনায়ার চোখের সেই ঘৃণার আগুন তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। ঘরের মধ্যে সে অস্থির পায়ে পায়চারি করছে, হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে যার ফলে শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। তার মুখ লাল হয়ে কাঁপছে, ঠোঁট চেপে ধরেছে দাঁত দিয়ে। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল, অস্থির হয়ে বলে উঠলো,

—“I think I need some fresh air.”কথাটি বলে, সে গর্জে উঠল।
সে ঝড়ের মতো ছুটে গেল গ্যারেজে। সেইখানে অনেকগুলো গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে কালো রংয়ের মোটরবাইক, যেটা তার উন্মত্ত মনের একমাত্র সঙ্গী। হেলমেটের কথা মাথায় আসেনি। সে লাফ দিয়ে বাইকে উঠল, আঙুল দিয়ে অ্যাক্সিলারেটর ঘোরাতেই ইঞ্জিনটা গর্জন করে উঠল, যেন তার ভেতরের ক্রোধের প্রতিধ্বনি হচ্ছে।গ্যারেজের দরজা খুলতেই সে বাইকটাকে ঝড়ের বেগে ছুটিয়ে দিল।রাস্তায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে গতি তুলল, যেন তার মনের অস্থিরতাকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। হাওয়া তার মুখে তীক্ষ্ণ ছুরির মতো আঘাত করছে, চুল উড়ছে, চোখ সরু হয়ে গেছে। দাঁত চেপে ধরে সে বাইক চালাচ্ছে, হাতের মুঠোয় এমন শক্তি প্রয়োগ করছে যেন সে পুরো পৃথিবীটাকেই চূর্ণ করে দিতে চায়।
ইনায়ার কথাগুলো তার মাথায় হাতুড়ির মতো আঘাত করছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— “তোমার নোংরা হাত… তোমার নোংরা হাত…” সে চিৎকার করে উঠল, “আমি নোংরা নই!” কণ্ঠটা ভেঙে এল, যেন নিজেকেই বোঝানোর শেষ চেষ্টা করছে। কিন্তু তার মন শান্ত হচ্ছে না। ইনায়ার ঘৃণাভরা চোখ, তার অতীতের কালো ছায়া সব মিলে তাকে তাড়া করছে। সে আরো জোরে অ্যাক্সিলারেটর ঘোরাল। বাইকটা যেন এবার রাস্তায় উড়ছে। গাছপালা, বাড়িঘর, সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হলো, এই গতিতে সে হয়তো সেই স্মৃতিগুলোকে পেছনে ফেলে আসতে পারবে, ইনায়ার কথাগুলোকে ভুলে যেতে পারবে।
কিন্তু ঠিক তখনই রাস্তায় একটা তীক্ষ্ণ বাঁক এসে পড়ল। এরিকের মন তখন পুরোপুরি বিভ্রান্ত ইনায়ার কথায়,আর তার অতীতের বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলো তার মাথার ভেতরে ঝড় তুলছিল। সে বাঁকটির দিকে মনোযোগ দিতে পারেনি, চোখের সামনে শুধু ইনায়ার ক্রুদ্ধ মুখ আর তার অতীতের কালো ছায়া ভেসে উঠছিল। বাইকটা নিয়ন্ত্রণ হারাল। একটা তীব্র ঝাঁকুনিতে সে ছিটকে পড়ল রাস্তায়। তার শরীর মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে এগিয়ে গেল, হাত-পা ছিড়ে গেল, কপালে তীব্র আঘাত লাগল।

— “আহ!” সে আর্তনাদ করে উঠল, কণ্ঠে আকুতি আর হতাশার তীব্রতা ফুটে উঠলো । রক্ত তার কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সে মাটিতে পড়ে রইল, শরীর কাঁপছে, হাত দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরে উঠতে চাইল।
তার ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখতে পেল সামনে একটা মসজিদের আলো জ্বলজ্বল করছে। মিনার থেকে সকালের সোনালি আলো ঠিকরে পড়ছে, আর সেই আযানের সুর, যা সকালে তাকে বিরক্ত করেছিল, এখন যেন তার হৃদয়ের গভীরে ঢেউ তুলছে।ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে সে হামাগুড়ি দিয়ে মসজিদের দিকে এগোল। প্রতিটি নড়াচড়ায় তার শরীর যন্ত্রণায় চিৎকার করছে, কিন্তু তার মনের মধ্যে এক অজানা শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।মসজিদের গেটে পৌঁছতেই একজন বয়স্ক লোক তাকে দেখে চমকে উঠলেন। এরিকের রক্তাক্ত মুখ, ছেঁড়া কাপড়, আর চোখের সেই গভীর বিষণ্ণতা দেখে লোকটির ভ্রু কুঁচকে গেল। তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে উষ্ণ, নরম কণ্ঠে বললেন,

—“বাবা, কী হয়েছে তোমার? তুমি তো আহত! চলো, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।”
এরিক মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে ব্যথা, বিভ্রান্তি, আর এক অদ্ভুত কৌতূহল জেগে উঠলো। মসজিদের ভেতরে লোকজন নামাজ পড়ছে—মাথা নত, হাত বুকে বাঁধা, চারপাশে এক অলৌকিক শান্তি। সে দুর্বল কণ্ঠে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,

— “সবাই… এখানে কী করছে?”(দুজনে এইখানে ইংরেজিতে কথা বলছে)। তার হাত মাটিতে ঠেকানো, শরীর কাঁপছে, কিন্তু চোখে একটা কৌতূহল ফুটে উঠেছে ।
লোকটি তার চোখের গভীর বিষণ্ণতা দেখে মৃদু হেসে বললেন,
— “আমরা সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করছি। তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করছি, শান্তি খুঁজছি।”
এরিকের চোখে একটা আলো জ্বলে উঠল। সে কাঁপা হাত দিয়ে কপালের রক্ত মুছে নিল, দুর্বল পায়ে উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে একটা তীব্র আবেগ ফুটে উঠলো,
—“ইউ মিন… আল্লাহ?” তার গলা ভারী হয়ে আছে, চোখ স্থির, যেন সেই নামটি তার হৃদয়ে একটা স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছে।
লোকটি মাথা নেড়ে হাসলেন, তাঁর চোখে উষ্ণতা ফুটে উঠলো।

—“হ্যাঁ, আল্লাহ।” তিনি এরিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি যদি চাও, ভেতরে আসতে পারো।”
এরিকের মুখে একটা অস্থিরতা ফুটে উঠলো, সে হাত দিয়ে মাটি থেকে ভর করে উঠে দাঁড়াল, শরীর কাঁপছে, কিন্তু মন যেন এক অজানা টানে বাঁধা পড়েছে।
—“আমি… ভেতরে যেতে চাই,” সে বলল, তার কণ্ঠে একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে । লোকটি খুশি হয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। মসজিদের উঠোনে একটা কলের কাছে নিয়ে গিয়ে তিনি বললেন,
— “এখানে ওযু করতে হয়। এটা আমাদের ইবাদতের প্রথম ধাপ।”
এরিকের হাত কাঁপছে, কিন্তু সে লোকটির নির্দেশ মেনে ওযু করতে শুরু করল। পানির ঠান্ডা স্পর্শ তার শরীরের সমস্ত ব্যথাকে ধুয়ে দিচ্ছে। মুখ ধোয়ার সময় রক্তের সঙ্গে পানি মিশে গেল, কিন্তু সে থামল না। হাত, পা, মুখ—প্রতিটি অঙ্গ ধুয়ে সে যেন নিজের ভেতরের কিছু পরিশুদ্ধ করছে। তার প্রতিটি নড়াচড়ায় একটা তীব্র আবেগ ফুটে উঠলো, যেন সে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে লড়াই করছে।
লোকটি তাকে মসজিদের ভেতর নিয়ে গেলেন। এরিক এক কোণে দাঁড়িয়ে, হাত তুলে মাথা নিচু করল বাকি সকলের মতো। তার কাঁধ কাঁপছে, চোখে জল টলটল করছে। সে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল,

— “সত্যি কথা বলতে… আমি কখনো সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করিনি।” তার কণ্ঠ কাঁপছে, হাত দুটো উপরে উঠানো, যেন সে তার সমস্ত ভার তুলে দিচ্ছে। “কিন্তু ইনায়া… সে আপনাকে এত ভালোবাসে, এত সম্মান করে। আমি বুঝতে পারছি না কেন আমি এখানে এসেছি।”
তার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সে থামল না।
—“শুধু মনে হচ্ছিল… আমার আপনাকে প্রয়োজন। আমার এই বোঝা, এই অপরাধের ভার হালকা করতে কাউকে প্রয়োজন।”
এরিকের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। সে একটু থামল, হাত কাঁপছে, মাথা আরো নিচু করে রেখেছে।
— “আমি অনেক ভুল করেছি। আমার জীবন… আমার অতীত… সবকিছু আমাকে এই অন্ধকারে টেনে নিয়ে গেছে।”
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল, চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। “আমি জানি, আমার হাত নোংরা, আমার মন নোংরা। কিন্তু আমার ভালোবাসা নোংরা নয়।আমি সত্যিই তাকে ভালোবাসি।
তার কথাগুলো মসজিদের নীরবতায় মিশে গেল। এরিকের শরীর কাঁপছে, কিন্তু তার মন কেমন যেন হালকা হয়ে এসেছে।

মসজিদ থেকে ফিরে আসার পর এরিকের মন এক অদ্ভুত শান্তি এবং অস্থিরতার মিশ্রণে ভরে গেছে। তার শরীরের আঘাতগুলো এখনো জ্বালা করছে, কপালের ক্ষত থেকে রক্ত শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তার মনের ভার কিছুটা লাঘব হয়েছে।তার হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ দ্রিমদ্রিম করে উঠল, মনের গভীরে জমে থাকা কথাগুলো তাকে ঠেলে নিয়ে গেল ইনায়ার ঘরের দিকে।দরজায় আলতো হাতে টোকা দিয়ে এরিক ভিতরে ঢুকে পড়ল, তার হৃদস্পন্দন ঘরের নিস্তব্ধতায় মিশে গেল। পায়ের নিচে মেঝে যেন তার আত্মার ভার বুঝতে পেরে নরম শব্দ তুলল, সে দেখল,
ইনায়া ঘরের এক কোণে শান্ত মূর্তির মতো বসেছিল, বইয়ের পাতায় দৃষ্টি আটকে ছিল, কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছিল,তার হৃদয় কোনো অশান্ত স্রোতে ভেসে চলছিল।
ইনায়াকে অন্য মনস্ক দেখে এরিকের ভ্রু কুঁচকে গেল,সে -কী হয়েছে তা দেখার জন্য ইনায়ার সামনে এসে দাঁড়াল, দুর্বল কণ্ঠে বলল,

—“আমার উপর এখনো অভিমান করে আছো।
পাশ থেকে পুরুষালি একটা গম্ভীর কন্ঠ শুনে ইনায়া ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে।সামনে তাকিয়ে দেখে এরিক দাঁড়িয়ে আছে। এরিককে দেখে সে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,
—অভিমান তো মানুষ আপনজনের উপর করে মিস্টার এরিক। আপনি তো আমার আপনজন নন।
ইনায়ার কথা শুনে এরিকের ভ্রু কুচকে গেল, সে একটু মুচকি হেসে বলে উঠলো,
——তাহলে কী করলে ম্যাডামের আপনজন হওয়া যাবে? এতটা আপনজন, যতটা আপনজন হলে একে অপরের মাঝের দূরত্ব গলে গিয়ে দুটো হৃদয় একাকার হয়ে যায়।
ইনায়া এরিকের কথাকে পুরোপুরি ইগনোর করে,বইয়ের পাতা উলটাতে লাগল, যেন এরিকের উপস্থিতি তার কাছে অদৃশ্য।

ইনায়ার ইগনোরে এরিকের বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। সে ইনায়ার আরও কাছে এগিয়ে গেল, হাত বাড়িয়ে তার কাঁধে ছুঁতে চাইল, কিন্তু ইনায়া পিছিয়ে গেল।
ইনায়ার এই রকম অবহেলা করা এরিকের কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না। সে তো স্বীকার করেছে, সে অতীতে অনেক ভুল করেছে।তার জন্য সে তো অনুতপ্ত তাহলে ইনায়া এখনো তাকে কেন ক্ষমা করতে পারছে না। ইনায়ার এই ইগনোরেন্স যে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।এই মেয়েটা কী বুঝে না, এরিকের পাষাণ্ড মন যে তার ভালোবাসার একটু পরশ পাওয়া জন্য ব্যকুল হয়ে থাকে,সে কী সত্যিই অনুভব করতে পারে না আমার ভিতরের অস্থিরতাকে। তার ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। কিন্তু ইনায়ার এই নির্লিপ্ততা যে তার হৃদয়ের প্রতিটি ধুকপুকুনিকে যন্ত্রণায় মুড়ে দিচ্ছে,

—আহ কী নিষ্ঠুর সেই দহন,যা প্রতিনিয়ত আমার মন মস্তিষ্ককে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
ইনায়ার নীরবতা , ইগনোরেন্স এরিকের হৃদয়ে ছুরির আঘাতের মতো লাগছে।এরিকের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল,সে আর সহ্য করতে পারলো না। তার চোখ লাল হয়ে উঠল, রাগে তার শিরাগুলো ফুলে উঠল। সে চিৎকার করে উঠল,
— “কেন শুনছ না? কেন বুঝছ না,আমার কথা?”
কথাটি বলতেই হঠাৎ তার হাত ছুটে গেল টেবিলের উপর রাখা ফুলদানির দিকে। এক ঝটকায় তা তুলে নিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলল। শব্দটা ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল, কাচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে গেল পুরো মেঝে জুড়ে । ইনায়া চমকে উঠল, কিন্তু কথা বলল না। এরিকের রাগ তাতে আরও বেড়ে গেল।

এরিকের রাগ এই মুহুর্তে একটা অগ্নিঝড়ে পরিণত হয়েছে।ইনায়ার ঘর থেকে বেরিয়ে সে, দ্রুত সোজা নিজের কক্ষে প্রবেশ করল। দরজাটা এমন জোরে বন্ধ করল যে, সেই কম্পনের প্রতিধ্বনি করিডর জুড়ে মৃদু গুঞ্জনে ছড়িয়ে পড়ল।তার চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে । ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ,সে চারপাশে তাকাল।টেবিলের উপরের বই, চেয়ার, আলোর ল্যাম্প, সবকিছু যেন মুহুর্তেই তার ক্রোধের লক্ষ্য হয়ে উঠল।

—”কেন তুমি বুঝতে চাও না, ইনায়া? কেন আমাকে এমন শাস্তি দিচ্ছ?” বলে চিৎকার করে উঠল সে। হঠাৎ তার হাত ছুটে গেল টেবিলের ওপর ছড়ানো বইগুলোর দিকে। এক ঝটকায় সেগুলো মাটিতে ছুড়ে ফেলল সে, কাগজের পাতাগুলো বাতাসে হু হু করে উড়তে লাগল।রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে টেবিলের ল্যাম্পটা তুলে নিল, আর পরক্ষণেই তা দেয়ালে আছড়ে ফেলল। কাচের টুকরোগুলো ঝনঝন শব্দ করে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। একটা ধারালো টুকরো তার পায়ে বিঁধে গেল, রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল, কিন্তু সে যন্ত্রণার ছোঁয়াও টের পেল না।চেয়ারটা দু’হাতে তুলে সে রাগে ফেটে পড়ে মাটিতে আছড়াল,কাঠের পা খানখান হয়ে ভেঙে গেল, আর একটা ধারালো কিনারা তার হাতে ছুঁড়ির মতো বিঁধে গভীর ক্ষত ফেলল।

—“সব ভেঙে ফেলব আমি! সব ধ্বংস করে দেব!” মনে মনে বিড়বিড় করে সে চিৎকার করল।
ঘরটা মুহূর্তেই ধ্বংসের রণক্ষেত্রে রূপ নিল—ভাঙা কাচ, ছেঁড়া কাগজ আর চূর্ণ কাঠের টুকরোয় ছেয়ে গেল মেঝে। কিন্তু এই ধ্বংসেও তার মনের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে উঠল।একসময় শরীরের শক্তি ফুরিয়ে গেল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে ধপ করে বসে পড়ল, তার দৃষ্টি হঠাৎ পড়ল কোণে রাখা গিটারটার উপর,এই মুহুর্তে, তার ইচ্ছে করলো,মনের মধ্যে সমস্ত অস্থিরতাকে ঝঙ্কার তুলে সুরের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে।
সে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল, কাঁপা কাঁপা হাতে কোণে পড়ে থাকা গিটারটাকে তুলে নিল। আঙুলগুলো স্ট্রিংয়ে রেখে সে আস্তে আস্তে ছন্দ ধরল।তার মনের সমস্ত অস্থিরতাকে ঢেলে,সে গান গাইতে শুরু করল,একটি হৃদয়বিদারক সুর, যা তার সমস্ত বেদনা বহন করছে।

❌——রাতদিন চেনা তুমি ছিলে অচেনা——❌
❌—অন্তহীন মনে হত মিষ্টি যন্ত্রণা— ❌
❌—সেই ব্যথা উঠল সেরে চোখেরই চাওয়াই —❌
❌—আমি শুধু চেয়েছি তোমায়— ❌
❌—আমি শুধু চেয়েছি তোমায় — ❌
❌—কতদিন ভেবেছি শুধু দেখবো যে তোমায়— ❌
❌—ক্লান্তহীন তুমি ছিলে আমার কল্পনায় —❌
❌—সেই ছবি উঠলো ভেসে চোখেরই পাতায়—❌
❌—আমি শুধু চেয়েছি তোমায় — ❌
❌—আমি শুধু চেয়েছি তোমায়— ❌

গানের প্রতিটি সুরে তার কণ্ঠে ভেঙে পড়ছে, গিটারের স্ট্রিংগুলো তার রক্তে ভিজছে।সে গাইতে গাইতে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু প্রতিটি শব্দ তার বুকের জখম আরও গভীর করে তুলছে। এক অদৃশ্য ছুরি তার হৃদয়ে বারবার বিঁধছে। তার কণ্ঠ কখনো কেঁপে ওঠে, কখনো ফিসফিসে নেমে আসে, তবুও বেদনার তীব্রতা কমে না।
পাশের ঘরে ইনায়া বিছানায় শুয়ে আছে, তার শরীর নিশ্চল, কিন্তু মনটা অস্থির হয়ে আছে। এরিকের হৃদয়বিদারক গানের সুর তার কানে ভেসে আসে, তার মনের শান্তি কেড়ে নিয়ে, হৃদয়ে এক ঝড় তুলে দেয়। গানের প্রতিটা লিরিক্স, কষ্টে ভরা যা তার হৃদয়ে অস্থিরতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সে আর শুয়ে থাকতে পারে না। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে, দেয়ালের কাছে গিয়ে কান পাতে। এরিকের গানের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কম্পন তার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। সে বোঝে, এরিক একা কষ্ট পাচ্ছে না, সে নিজেও তো একই দহনে পুড়ছে ।

“আমি শুধু চেয়েছি তোমায়…” এরিকের কণ্ঠে ভাসা সেই সুরটি তার কানে বাজে, এক অদৃশ্য তীরের মতো তার হৃদয় ভেদ করে। তার চোখ জলে ভরে ওঠে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। নীরবে অশ্রু তার গাল বেয়ে গড়ায়, তার হৃদয়ের সমস্ত বোঝা সেই জলের ফোঁটায় মিশে যায়। হাঁটুতে মুখ গুঁজে সে বসে পড়ে, মেঝের ঠান্ডা স্পর্শ তার শরীরকে কাঁপিয়ে তোলে। ফিসফিস করে বলে,

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩০

—“হে আল্লাহ, এ কোন পরিস্থিতিতে তুমি আমাকে এনে ফেললে? আমি বুঝতে পারছি না আমার কী করা উচিত। তার কষ্ট আমার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। আমি কী করবো? তাকে ক্ষমা করব, না দূরে সরে যাব?” তার কান্না ঘরের নিস্তব্ধতায় মিশে যায়, সেই নীরবতা তার বেদনার সাক্ষী হয়ে ওঠে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩১