অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩১
নুরিয়া ইসলাম
সূর্য পূর্বে উদিত হয়েছে, হালকা কুয়াশার মাঝে পুরনো যুগের নান্দনিক ঘরের জানালার গরাদে প্রোভাতের প্রথম কিরণের নরম ছোঁয়া সোনালি আলো বুলিয়ে যাচ্ছে,ঘরের ভিতরে, কৃত্রিম তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের নীরব বন্ধনে শীতল বাতাস বইছে,যেখানে শেওনায়াজ শেখ রকিং চেয়ারে স্বাচ্ছন্দে বসে আছেন, হাতে একটি খবরের ম্যাগাজিন নিয়ে, পুরোপুরি সংবাদপত্রের জগতে ডুবে রয়েছেন তিনি। তবে শেওনায়াজ শেখের আঁচড়ানো চোখ বারবার খবরের কাগজ থেকে সরিয়ে ভেতরের দরজার দিকে ছুটে যাচ্ছে, যেন কোনো বিশেষ কারোর আগমনের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।অবশ্য খুব বেশিক্ষণ তাকে অপেক্ষা করতে হলো না, তার অপেক্ষার ইতি ঘটিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল তানভীর।ধীর পায়ে দাদা জানের কাছে এগিয়ে এসে লম্বা একটা সালাম টেনে মার্জিত ভঙ্গিতে সোফায় গিয়ে বসলেন। শেওনায়াজ শাহ্ তার দুই নাতিকে আদর্শনীতি আর শিষ্টাচারের মডেল হিসেবে দেখেন।তিনি হাতে থাকা খবরের কাগজটা সাইডে রেখে তানভীরের উদ্দেশ্য বলে উঠলেন,
—”ইনায়া এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে, আশা করি, তুমি আমাদের পারিবারিক ওয়াদার কথা ভুলোনি।”
তানভীর দাদাজানের কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে যায়, সে কী বলবে সে নিজেও জানে না? সে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলে উঠে,
—দাদাজান, আমেরিকায় যা ঘটেছিল …
মিস্টার তানভীরের কথা পুরোপুরি শেষ না হতেই, শেওনায়াজ শাহ্ তার এক হাত উঠিয়ে মিস্টার তানভীরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
—আমেরিকায় কী ঘটেছে বা কতটুকু ঘটেছে সেইসব আমি জানতে চাই না?
শেখ পরিবারের একটা রীতি আছে জানো তো,
“jo chiz ekbar joyan se nikal ti he, use nibhana hi parivar ki parampara hai.”
(“যেই জিনিস একবার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, তাকে যে কোন মূল্যে পূরণ করায় শেখ পরিবারের রীতি,ভুলে যাওনি নিশ্চয়ই ।”)
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মিস্টার তানভীর তার দাদাজানকে খুব ভালোভাবে চেনেন। তিনি পরিবারের সম্মান এবং দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে সবকিছুর উপরে রাখেন। কিন্তু এরিক—এরিকের বিষয়টিও তিনি মাথা থেকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না। তার চিন্তা সর্বদা এরিকের উপর কেন্দ্রীভূত। কারণ এরিক চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকার ছেলে নয়।তাছাড়া এরিকের মতো উগ্র ছেলের হাতে কখনো তিনি নিজের বোনকে তুলে দিবেন না। তাইতো এরিকের প্রতিটি কাজের উপর নজর রাখার জন্য মিস্টার তানভীর ইতিমধ্যেই কিছু লোক হায়ার করেছেন। তারা প্রতিনিয়ত এরিকের প্রতিটি মুহূর্তের আপডেট তাকে জানাচ্ছে। এমনকি কিছু দিন আগে এরিক যে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছে—এই খবরটিও তার কানে পৌঁছেছে।
সবকিছু যেন তার কাছে এক অন্ধকার ধোঁয়াশার মতো লাগছে।সে কিছুতেই কোন কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। যখনই মনে হয়, সে এই ধোঁয়াশার সমাধানে পৌঁছেছে তখনি আবার নতুন একটা প্রশ্ন হাজির হয়েছে তার সামনে।বারংবার সে ভেবেছে,
—একজন খ্রিস্টান ছেলে কেন মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়বে?
এই অস্থিরতার সমাধান করতে, সে নিজে ইমাম সাহেবের কাছে গিয়েছিলো, তাতেও কোন ফয়সালা মিলেনি।এই ছেলে সবকিছু এত গোপনীয় করে রেখছে, যে বোঝার কোন উপায় নেই।কিন্তু মিস্টার তানভীর একটা জিনিস ভেবেই পায়না, সবকিছুতে এত গোপনীয়তা কীসের জন্য।
রাতে পুরো ডাইনিং জুরে খাবার সামনে রেখে সবাই মিস্টার শেওনায়াজ শেখের জন্য অপেক্ষা করছিল।তার অনুমতি ছাড়া, এই বাড়িতে এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত পান করা যায় না, সেটা এখানকার অলিখিত নিয়ম। আর সেই নিয়মই যেন এরিক বারংবার ভেঙ্গে বেয়াদবির পরিচয় দিচ্ছে।এই যে এরিক, যে পুরো শার্টলেস্ হয়ে আর হাফ প্যান্ট পড়ে, হাতে একটা ফোন নিয়ে শেওনায়াজ শেখের সামনে দিয়ে এসে কোনরকম ফরমালিটি মেইনটেইন না করে সোজা গিয়ে, শেওনায়াজ শেখের বরাদ্দকৃত চেয়ারে গিয়ে বসলো।এতে কি শেওনায়াজ শেখ অপমানিত বোধ করলেন না,করলেই বা কী,এরিক কী এইসবের ধার ধারে।এই কয়দিনে এরিককে দেখে মিস্টার শেওনায়াজ শেখ বুঝে গেছেন, ছেলেটা চরম লেভেলের বেয়াদব, বড়দের সম্মান দিতে জানে না।
“এমন একটা ছেলে তার নাতির বন্ধু হলো কি করে সেটা তিনি ভেবেও পান না?”
এরিক সকলের দৃষ্টি উপেক্ষা করে, সবাইকে আরও এক ধাপ চমকে দিয়ে পাশে রাখা ব্রেডটি প্লেটে তুলে তাতে জ্যাম মাখিয়ে এক কামড় নিলো এবং সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
—আমি মানছি, আই’ম ড্যাম হট।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সামনে এত খাবার ফেলে রেখে আপনারা সবাই আমাকে গিলে খাবেন!”
এরিকের এইসব বেয়াদবির সামনে মিস্টার তানভীরের ধৈর্য একদম ফুরিয়ে এল। তিনি টেবিল থেকে উঠে, এরিককে কিছু বলার জন্য উদ্দত হবার আগেই, শেওনায়াজ শাহ্ জোরে নিজের লাঠিটা মাঠির সাথে বারি দিয়ে একপ্রকার গর্জন করে বললেন,
—”তোমাকে কেউ শেখায়নি, বড়দের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়? ”
—এ কেমন বেয়াদবি?
আমার চেয়ারে বসে, আমার অনুমতি ছাড়া খাবারে হাত দিয়েছো?”
এরিক একটুও বিচলিত না হয়ে আরেক দফা ব্রেডে কামড় বসিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
—“আমাকে ভদ্রতা শেখানোর মানুষ তো অনেক ছিল, কিন্তু শিখতে ইচ্ছা করেনি।”
“তবে যদি আপনার বেশি অসুবিধা হয়, তাহলে আমার জন্য একটা কাজ করতে পারেন।”
—”আপনার নাতনি ইনায়ার সঙ্গে আমার বিয়েটা ঠিক করে দিন।
ওর কাছে গিয়ে হয়তো আমি কিছুটা ব্যবহারিক ভদ্রতা শিখে নেব।”
—”উমহু, ভয় নেই, ফ্রি ফ্রি কিছু শিখবো না। বিনিময়ে আমিও ওকে ব্যবহারিক কিছু শিখিয়ে দেব। অফারটা ভেবে দেখবেন।”
তার কথা শুনে টেবিলের সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এরিকের কথার প্রতি উওরে কী বলা উচিত কেউ ভেবে পাচ্ছে না।আজ পর্যন্ত কারও সাহস হয়নি শেওনায়াজ শাহের সঙ্গে এভাবে কথা বলার, আর এই দুইদিনের ছোকরা কিনা রীতিমতো তার সঙ্গে বেয়াদবি করছে।সে তার ৬৬ বছরের জীবনে কখনও বেয়াদবি করেনি, আর কারও বেয়াদবি কখনও বরদাস্ত করেননি। রাগে সে এরিককে এক প্রকার ধমকিয়ে বলল,
—”এই ছেলে মনে হচ্ছে না, তুমি একটু বেশি বেয়াদবি করে ফেলেছো।”
“এরিক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মাংসের উপর ছুরি চালিয়ে, চামচের সাহায্যে এক পিচ মুখে তুলে বললো,
—”না, আমার তো সেই রকম মনে হচ্ছে না। ”
কিন্তু শেওনায়াজ শেখের এরিকের কথা একদম সহ্য হচ্ছে না। তিনি নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লেন, প্লেটে খাবার তুলতে তুলতে কঠিন গলায় বললেন,
“আজ আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
—ইনায়া আর আদিলের অসম্পূর্ণ বিয়েটা আমি সম্পূর্ণ করতে চাই।
এই ব্যাপারে আর কোনো কথা হবে না।”
“এরিকের মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে ইনায়ার দিকে কটমট করে তাকাল, রাগে তার শরীর জ্বলে উঠছে। হঠাৎ, হাতের নাগালে থাকা প্লেটটি টেবিলে ঠাস করে ফেলে দিল।পুরো ডায়নিং জুড়ে প্লেটটা ঝংকার দিয়ে উঠলো। ধুম করে উঠে দাঁড়িয়ে, কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা ঘর থেকে এরিক বেরিয়ে গেল। প্লেটটা টেবিলে গড়াগড়ি খেয়ে থামলো।
“শেওনায়াজ শেখ এরিকের এই রকম কান্ডে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আদিলের দিকে তাকালেন। আদিল, যে এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, এরিকের এইরকম আচরণে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। শেওনায়াজ শেখ গর্জে আদিলকে বলে উঠলেন,
—“এ কেমন ছেলেকে তুমি বন্ধু বানিয়েছো, আদিল?
বড়দের সম্মান দিতে জানে না, নিয়মের তোয়াক্কা করে না! ওকে একটা কথা ক্লিয়ার করে জানিয়ে দিবে,
—এই বাড়িতে থাকতে হলে আমার নিয়মে চলতে হবে। নইলে এই বেয়াদবির জায়গা এখানে নেই!”
আদিল মাথা নিচু করে বলে উঠল,
—”দাদু, এরিক তো এমনই।
শেওনায়াজ শেখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আদিলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—এই এরকম ই মানে টা কি? এটা বেয়াদবি! আর তুমি ওকে সমর্থন করছো? আমার বাড়িতে এসব চলবে না!”
পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলো ছাদটাকে কোমল আচ্ছাদনে মুড়িয়ে দিয়েছে। এরিক ম্লান আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে একের পর এক নিকোটিনের ধোঁয়া ছেড়ে পাঠাচ্ছে, যেন তার মনেও অস্থিরতার মেঘ ঘুরপাক খাচ্ছে। ইনায়াকে পাওয়ার জন্য নিজের মনের জগতে এক দক্ষ শিল্পীর মতো নিখুঁত পরিকল্পনা বোনা শুরু করে দিয়েছে; প্রহেলিকার প্রত্যেক লুকানো বেড়াজালকে সামনে রেখেই লড়াই করবে সে, নিজের মনে এক নিদারুণ কৌশল সাজিয়ে নিল মুহুর্তেই।
ভাবনার ভেতর পুরোপুরি ডুবে ছিল এরিক। ঠিক তখনই পিছন থেকে আদিল এসে তার পিঠে হাত রাখল।শরীরে পুরুষালি স্পর্শ পড়তেই এরিক বুঝতে দেরি করল না;এটা আর কেউ নয়, আদিলই।
এক নিমিষে, কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই, হিংস্র সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সে থাবা বসাল আদিলের জামার কলারে।
এতটা আচমকা ঘটনায় আদিল হতবাক হয়ে গেল।নিজের শরীর থেকে এরিকের শক্ত হাত সরাতে সরাতে বলে উঠলো ,
—”ছাড় শালা!সব সময় আমাকে অ্যাটাক করার জন্য রেডি থাকিস কেন?”
এরিক দাঁতে দাঁত পিষে হাতের বাঁধনটা শক্ত করে বলল,
—”আমার বউকে বিয়ে করার খুব শখ তোর, তাই না? মিটাচ্ছি তোর এই শখ?”
“আজ তোকে এমন শিক্ষা দেব যে, তোর এই শখ চিরতরে মিটে যাবে!”—এরিক গম্ভীর স্বরে বলল।
এ কথার সঙ্গে সঙ্গেই সে আদিলকে ধরে ছাদের কর্ণারের দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে দিল।হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় আদিল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
সে একবার নিচের দিকে তাকাচ্ছে, তো আবার এরিকের দিকে তাকাচ্ছে। ভয় আর আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
—”ছাড় শালা আমাকে,আমার শরীরটাকে কী তুই সরকারি পেয়েছিস? যে যখন তখন অত্যাচার শুরু করে দিস।”
“তাছাড়া আমাকে কি পাগল কুকুর কামড়েছে, যে গার্লফ্রেন্ড রেখে একটা বিবাহিত মেয়েকে বিয়ে করব!”
এরিক শক্ত করে আদিলের শার্টের কলার চেপে ধরে তাকে টেনে তুলল।কোনোমতে উপরে উঠে আসতেই আদিল হাফ ছেড়ে বাঁচল।আরেকটু দেরি হলেই হয়তো তার জানটা বলে উঠত— “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।”
আদিল এবার চোখ কুঁচকে রাগি দৃষ্টিতে তাকাল এরিকের দিকে। মনে হলো, এরিক যেন তার সহ্যের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এরিক তার সেই দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল।
তাতেই আদিল আরও ক্ষেপে গিয়ে গর্জে উঠল,
—“এতোই যখন ভালোবাসিস, আমার ওপর রাগ ঝাড়ার বদলে সত্যিটা সোজাসুজি বলে দিলেই হতো!”
আদিলের পুরো কথা একেবারে মন দিয়ে শুনল এরিক।
তবুও তার চেহারায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এলো না।
চুপচাপ পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরল।তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
—“প্রটেক্ট করছি।”
এরিকের মুখ থেকে এই কথাটা শুনে আদিল ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে।সন্দিগ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
—“কীসের থেকে?”
এরিক আকাশে নিকোটিনের ধোঁয়া উড়িয়ে, ধীরে ধীরে ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল,
—“আনফরচুনেটলি, নিজের জন্মদাতা পিতার থেকে!”
ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ পড়ল আকাশে,তাদের থেকে একটু দূরে একটি ড্রোন উড়ছে।ড্রোনটি দেখে এরিক একটি তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“ইনায়া নিজের রুমে বসে বসে তার দাদাজানের বলা কথাটা আনমনে ভেবেই চলেছে।কি করবে সে?হৃদয় আর মস্তিষ্কের দ্বন্ধে, হৃদয়ে বয়ে চলা এই নিষিদ্ধ অনুভূতির বেড়াজালে সে গভীর ভাবে জরিয়ে পরেছে।”
“না সে এরিককের ভুলগুলো ক্ষমা করে তাকে মেনে নিতে পারছে না তার থেকে দূরে থেকে এই বিরহ ব্যাথা সহ্য করতে পারছে। দুই সত্তার দ্বন্দ্বে, সে প্রতিনিয়ত নেতিয়ে পড়েছে। তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে,
—”আমার গল্পের প্রতিটা পাতায় আপনি থেকেও, আমি নিজেকে শূন্য অনুভব করি এরিক। আপনি হীনা আমি ভালো নেই।”
ইনায়া নিজের অন্তরের অন্ধকার কক্ষে নিঃশব্দে বললো,
—“এরিক, আপনি আমার জীবনের প্রতিটা কোণে অদৃশ্য ছায়ার মতো বসে আছেন। আপনার ভুলগুলো আমার হৃদয়ের ভেতর এমন দাগ রেখে গেছে, যা ধোয়া-ধোয়া ভাবেও মুছে যায় না। আমি চাইছি আপনাকে ভুলে যেতে, কিন্তু প্রতিটা স্মৃতি যেন আমার চোখের সামনে নীরব প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আপনার স্পর্শের অভাব আমার ত্বককে শূন্য করে দিয়েছে, যেন সমস্ত রং, সমস্ত শব্দ, সমস্ত জীবন—এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এই নিষিদ্ধ অনুভূতিগুলো ,এখন পুরোপুরি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
তার ভাবনার মাঝে চিঁড় ধরে পিছন থেকে মারিয়া গমগমে আওয়াজে বলে উঠলো,
—”ভালোবাসলে ক্ষমা করতে হয়, জানো তো ননদীনি!খুব কম মানুষ’ই ভুল করে অনুতপ্ত হয়, তার পূর্বের কাজের জন্য।”
এরিক তোমাকে সত্যিই খুব ভালোবাসে, সে যদি তোমাকে ভালো না বাসতো তাহলে কখনো নিজের বিলাশবহুল জীবন ছেড়ে এইখানে তোমার কাছে, এতো অপমান সহ্য করেও পড়ে থাকত না। খুব কম মানুষ’ই সত্যিকারের ভালোবাসা পায় ননদীনি। সময় থাকতে নিজের ভালোবাসার মূল্য দিতে শিখ।একবার হারিয়ে গেলে, শত চেষ্টা করেও তুমি তা ফিরে পাবে না।
“তাছাড়া, বিয়েটাকে যতই অস্বীকার করো, সত্যি তো এটাই—তুমি বিবাহিত। হোক না সে তোমার বৈধতাহীন স্বামী, তবুও স্বামী তো স্বামী। তাকে যদি মানতে না পারো, তাহলে…”
—এই নিষিদ্ধ ভালোবাসায়, নিজেকে জরালে কেন?”
মারিয়া আর সেইখানে এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না, এই মুহুর্তে ইনায়ার একা থাক খুব প্রয়োজন। নিজের অনুভূতিগুলোকে বোঝা প্রয়োজন।
মারিয়া চলে যেতেই, ইনায়া ধীর পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের দিকে অগ্রসর হলো । টেবিলে সাজানো বইয়ের পালা থেকে সে একটা বই বের করে, তার মধ্য থেকে তার প্রিয় কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা খুঁজতে লাগলো। একপর্যায়ে সে তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পেয়েও গেল। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো জিনিসটা দেখে, বইয়ের পাতার ভিতর জ্বলজ্বলিয়ে উঠলো শুকনো নেতিয়ে পড়া একগুচ্ছো লাল গোলাপ। এটা সেই গোলাপ যেটা দিয়ে এরিক তাকে প্রোপোজ করেছিল। ইনায়া একসেপ্ট না করায়, এরিক ফুলটা ফেলে দিয়েছিলো, কিন্তু গোলাপ ইনায়ার পছন্দের তালিকায় থাকায়, সে অপছন্দনীয় মানুষের দেওয়া পছন্দময় উপহারটাকে অবজ্ঞা করে ফেলে আসতে পারে নি। ইনায়া গোলাপের দিকে তাকিয়ে বলল,
—”তুমি ভাবলে কি করে ভাবি, যেই অপছন্দনীয় ব্যক্তির দেওয়া উপহারটাকে আমি এত যত্ন করে রেখে দিয়েছি, অথচ তার সবচেয়ে পছন্দনীয় নারী হয়েও আমি, নিজেকে অন্যের হাতে সোপে দিব। ”
আমি তাকে চাই। সম্পূর্ণ হালাল ভাবে পেতে চাই।
ইনায়া গোলাপের দিকে তাকিয়ে অতীতের কিছু মুহুর্ত কল্পনা করতে থাকে,
দিনটি ছিল বছরের প্রথম দিন। নিউ ইয়ার। ইনায়া মুসলিম ঘরের মেয়ে হওয়ায় এইসব তেমন একটা পালন করে না। কিন্তু তার ইউনিভার্সিটিতে প্রতিবছর এই দিনটি খুব জাঁকজমক ভাবে পালন করা হয়। ইনায়া আসতে না চাইলে, এরিক ইনায়াকে এক প্রকার জোরজবরদস্তি করে ভার্সিটিতে নিয়ে আসে। সেইদিন ইউনিভার্সিটিতে একটা বিশাল রেসিং এর আয়োজন করা হয়েছিল।
“রেস শুরু হওয়ার মুহূর্তেই, এরিক ইনায়াকে সবার সামনে একপ্রকার জোর করে নিজের বাইকে তুলে নিল।”
“ইনায়া বাইকে উঠতেই, এরিক জোরে বাইক স্টার্ট দিল। ইনায়া ভয় পেয়ে একপ্রকার চিৎকার করে বলল,”
—”এই পাগল লোক, কি শুরু করেছেন আপনি?আপনার মরার ইচ্ছা হলে, নিজে গিয়ে মরুন।আমাকে কেন সাথে টানছেন?”
এরিক ইনায়ার কথায় মুচকি হেসে বলে উঠে,
—”তুমি হলে আমার ইহকাল পরকালের সাথী, তোমাকে একা ফেলে মরি কি করে?টেনশন নট, এই জন্মে মরলেও, এখনো ছয় জন্ম পরে আছে আমাদের। ”
ইনায়া এরিকের কথায় রেগে এরিকের পিঠে মারতে মারতে বলল,
—”এখনি বাইক থামান আপনি,আমার ধর্মমতে সাতজন্ম বলে কিছু নেই,আমার এক জন্ম আপনার মতো পাগলের পাল্লায় পড়ে নষ্ট করতে চাই না। ”
এরিক ইনায়ার কথায় সেইদিন হো হো করে হেসে উঠেছিল। ইনায়া সেইদিন প্রথম এরিকের প্রাণখোলা হাসি দেখে ছিল।এরিককে হাসতে দেখে ইনায়া আনমতে বলে উঠলো,
—”আপনি হাসতেও পারেন। ”
এরিক সেইদিন ইনায়ার কথার প্রতিউওরে কিছু বলেনি, শুধু এইটুকু -ই বলেছে,
—”পূর্বজন্ম হবে না বলেই তোমাকে এই জন্মে পেয়ে গত সাত জন্মের ভালোবাসা পুষিয়ে নেওয়ার খুব ইচ্ছে। ”
ইনায়ার এরিকের কথা শুনে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে শুধু একটা কথায় বলেছিল,
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩০
—”বিধর্মী মেয়ের প্রতি এতো ভালোবাসা অন্তররে রাখতে নেই, মিস্টার।সময়ের সাথে সাথে এই ভালোবাসা ফিকে পড়ে যাবে!”
এরিক ইনায়ার কথার প্রতিউওরে প্রতিবাদ করে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠলো,
—মোটেও না!আমি যাকে ভালোবাসবো, তাকে আমৃত্যু ভালোবাসবো। ভালোবাসবো মানে জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত শুধু তাকেই ভালোবাসবো। ”
ইনায়া ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে, গোলাপের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,
—”আমিও আপনাকে আমৃত্যু ভালোবাসবো, এরিক!তবে সেটা হালালভাবে। ”
