Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩২

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩২

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩২
নুরিয়া ইসলাম

সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। চারিদিক থেকে আযানের মিষ্টি সুর ভেসে আসছে, সংক্ষিপ্ত হয়ে উঠল দিনের ক্লান্তির মায়াময় বিদায়বেলা। ইনায়া ঘর থেকে বের হয়ে হলরুমের মধ্য দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎই তার দৃষ্টি বিপরীত দিকের ঘরের করিডরের প্রান্তে গিয়ে পড়ল। মুহূর্তেই তার পদক্ষেপ থেমে গেল, মস্তিষ্কে চিন্তার তীব্র আঁচড় বুনতে শুরু করল।ইনায়া অবাক হয়ে ভাবতে লাগল,

—কী আশ্চর্য! কে এভাবে নামাজ পড়ছে? তাও আবার এত গোপনীয়ভাবে! সে বারবার চেষ্টা করল সেই পুরুষালি যুবকের মুখ দেখার, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হলো।পুরুষটিকে দেখে মনে হলো, সে যেন পুরো দুনিয়া থেকে নিজেকে আড়াল করে শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।না, ইনায়া আর এভাবে বসে থাকতে পারল না। তার বড্ড ইচ্ছে হচ্ছিল জানতে—পুরুষটি আসলে কে! তাই সে নিঃশব্দে, সতর্ক ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল। কিন্তু সামনে পৌঁছাতেই দেখতে পেল—আদিল নামাজ পড়ছে।
“আদিলকে দেখে ইনায়ার মুখ বিষণ্ন হয়ে গেল। সে কিছুতেই মানতে পারছিল না যে, নামাজ পড়া মানুষটি আদিলই। মন বারবার বলছিল—না, এটা আদিল নয়। কিন্তু বিশ্বাস করা ছাড়া উপায়ও ছিল না; চোখ তো এতটা ভুল দেখতে পারে না। কোনো কিছু না ভেবেই ইনায়া সেখান থেকে চলে গেল। আর ইনায়া চলে যেতেই আদিল যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

গোধূলির রাত! চারদিকে সূর্যের লালচে আভা মুছে গিয়ে পৃথিবীর বুকে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমের বাতাস সাঁই সাঁই শব্দ তুলে থাই গ্লাসের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এরিকের মুখ ও চোখে এসে লাগছে।বিরক্তিতে তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে উঠল। কিছুক্ষণ আগেও সে মনোযোগ দিয়ে কয়েকটি কাগজপত্র ঘাঁটছিল। কিন্তু পশ্চিমা বাতাস যেন তার বিরক্তি আরও বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই, বিরক্তির সীমা অতিক্রম করে কর্কশ আওয়াজে ফোনটা দ্বিতীয় দফায় বেজে উঠল।ফোনের স্ক্রিনে জ্যাকের নাম জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠল। এরিক ফোনটি রিসিভ করতেই জ্যাক ফোনের ওপাশ থেকে ভীত কণ্ঠে বলল,
“বস, খারাপ খবর আছে। মিস্টার রিচার্ড জেনে গেছেন যে আপনি এখন আমেরিকায় নেই। তারপর থেকে তিনি প্রচণ্ড রেগে আছেন। এমনকি আপনার পিছনে স্পাইও নিয়োগ দিয়েছেন।”
এরিক জ্যাকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল। অতঃপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

— ‘আই নো!’
জ্যাক এরিকের প্রতিউত্তর শুনে খুব অবাক হল না; এরিকের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের সঙ্গে সে আগে থেকেই পরিচিত।তাও একটু আগবাড়িয়ে জ্যাক এরিককে সতর্ক করে বলল,
‘বস, মিস্টার রিচার্ড যদি একবার সত্যিটা জানতে পারে যে আপনি ম্যামের জন্য—’ কিন্তু কথাটা শেষ করতে পারল না। ফোনের ওপাশ থেকে এরিক গম্ভীর গলায় গমগমে আওয়াজে বলল,

—’আই’ উইল প্রটেক্ট হার!'”
যদি কেউ তাকে আঘাত করতে আসে, এই এরিক অ্যাসফোর্ড তার বুক চিঁড়ে দাঁড়াবে। এই এরিক অ্যাসফোর্ড যেমন ভালোবাসতে জানে, তেমনি নিজের ভালোবাসাকে রক্ষা করতে জানে। তুমি শুধু মিস্টার রিচার্ডের দিকে নজর রেখো। ফোনের ওপাশ থেকে জ্যাক কী বললো, তা আর শুনা গেল না। এর আগেই এরিক ফোনটা কেটে দিল।”
ফোনটা বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেলে এরিক ডেভিল হাসি দিয়ে বলে উঠলো,
—”আপনাকে ধোঁয়াশায় রেখে, শেষ পর্যন্ত আমি অনেক কিছুই করবো। আপনি শুধু দেখতে থাকুন। ”

রাত গভীর হতেই প্রকৃতি তার নিজেস্ব খোলস ভেঙে ধারণ করল এক রণমূর্তি। মুহূর্তের মধ্যে পুরো আকাশ কেঁপে উঠে ঝরে পড়ল মুষলধারে বারিধারা। থাই গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে ইনায়া তখন আনমনে ডুবে ছিল নিজের ভাবনায়।ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে দরজার ছিটকিনির শব্দ ভেসে এলো ইনায়ার কানে। চমকে উঠে সে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল এরিককে। বিস্ময় আর বিরক্তির মিশ্র স্বরে সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
‘—একি!আপনি দরজা বন্ধ করলেন কেন?’”
এরিক কোনো জবাব না দিয়ে আচমকা ইনায়াকে টেনে নিয়ে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল। চোখ পাকিয়ে, ইনায়ার গলা চেপে ধরে বলে উঠলো,
—”কয়টা ছেলে লাগে তোর, আমাকে দিয়ে হচ্ছে না। শরীরে এত ক্ষুধা তোর। ”
“ইনায়া মরিয়া হয়ে এরিকের শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে উঠল,

—‘কী আজেবাজে কথা বলছেন আপনি? ছাড়ুন আমায়! আপনার মাথা ঠিক নেই।’
“ইনায়ার কথায় এরিকের রাগ যেন সীমা ছাড়িয়ে গেল। হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে সে গর্জে উঠল,
—”আমি যা -তা বলছি! তাহলে বিয়ে করতে অস্বীকার করলি না কেন?”
এরিকের উগ্রতা দেখে হঠাৎই ইনায়ার ভেতরে আবারও জেগে উঠল সেই ভুলে যাওয়া পুরনো ক্ষত। সে ঝাঁকি মেরে তার হাতটা সরিয়ে দিল, আর তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে বলে উঠল,
—”কেন মানা করবো?কার জন্য মানা করবো?একজন চরিএহীন পুরুষের জন্য যে কিনা আজ এই মেয়ে তো কাল আরেক মেয়ে। ”
এরিক ইনায়ার দিকে বেদনা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।তারপর হঠাৎ গমগমে কণ্ঠে বলে উঠল,

—”শুধু আমার একটা সাইড’ই দেখলি, দিনের পর দিন তোকে পাওয়ার জন্য আমি ঠিক কতটা উন্মাদ হয়ে আছি, এইগুলো তোর নজরে পড়ল না। ”
“অস্বীকার করতে পারবি? তুই আমার জীবনে আসার পর থেকে আমি কি আর কোনো নারীর সংস্পর্শে গিয়েছি?
আমি যেই পরিবেশে বড় হয়েছি? নিজের বাবার নির্মম সত্যটা নিজের চোখের সামনে দেখেও যেইভাবে আমাকে দিন কাটাতে হয়েছে.. তাতে তুই আমার কাছ থেকে কেমন চরিত্র আশা করিস, বল?”
কথাগুলো বলে এরিক জোরে নিশ্বাস ফেলে আবারো বলে উঠলো,

—”দেখো আমি অতীতে যা করেছি, তার জন্য সত্যিই আমি অনুতপ্ত। আমি আমার স্ত্রীর অধিকার অন্য দের মাঝে বিলীন করে দিয়েছি…..
শালার, এই নারী জাতি আমার মাথাটাকে পুরোপুরি বিগড়ে দিয়েছে।বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে গভীরভাবে ভালোবাসি। আমি স্বীকার করি—আমি ভুল করেছি, ভীষণ খারাপ কাজ করেছি। আজ তার জন্য অনুতাপে ভুগছি। আসলে এসব কোনোভাবেই একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানায় না। আমাকে কি একবারের জন্যও সুযোগ দেওয়া যায় না?”

আমি প্রমিস করছি, ইনায়া… পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী হয়ে দেখাবো। অভিযোগ করার সুযোগ কখনো দেব না,তোমায়। যেদিন থেকে তুমি আমার মনে জায়গা করে নিয়েছো, আমি সত্যি বলছি, আমি আর কোনো নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হইনি।
আমি অতো টাও অধর্জোশিল পুরুষ না যে, যাকে তাকে আমি আমার বেডে নিয়ে আসবো।আমার পিছনে ছোটা সব মেয়েরা শুধু টাকার জন্য আমার কাছে এসেছে।আমি কোন মেয়ের সাথে আজ পর্যন্ত সরাসরি ইন্টিমেট হয়নি। তাদের প্রত্যেককে আমি উওেজিত অবস্থায় রেখে, চলে আসতাম। এটা অন কাইন্ড অফ স্যাটিসফেকশন বলতে পারো।
এটা আমি শুধু আমার এক্স-গার্লফ্রেন্ডের প্রতি রাগ থেকে করতাম, কারণ সেই মেয়েগুলোও তার মতো লোভী ছিল। কিন্তু এর চেয়ে বেশি দূর আগানোর রুচি আমার হতো না। আমি ওই বেপার গুলো জাস্ট এনজয় করেছি নিজের স্যাটিসফেকশন ফিল করতে।কিন্তু আজ পর্যন্ত, এরিক অ্যাসফোর্ড কখনো কোনো মেয়েকে জোর করে নিজের বিছানায় আনেনি।

—”ট্রাস্ট মি, বেবি, আমি তোমায় খুব ভালোবাসি… আমি মরে যাবে, যদি তোমায় না পাই।
তুমি কি বুঝতে পারছো না, আমার ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে। কেন এত দহনে পোড়াচ্ছ আমায়?
ইনায়া এরিকের কথায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। কান্না জড়িত কণ্ঠে সে বলল,
—”আমি বুঝতে পারছি না, এরিক, আমার কোথায় ভুল হয়েছিল। আমি কী এমন পাপ করেছি, যার জন্য আমাকে এমন জীবনসঙ্গীকে পেতে হলো? সত্যি করে বলুন তো, এরিক, এসব কি আদৌ আমার পাপ্য? মস্তিষ্ক আর মনের দ্বন্দ্বে আমি হাপিয়ে উঠেছি। মন বারবার আপনাকে ক্ষমা করতে চেয়েও, মস্তিষ্ক পারছে না। কাল অব্দি ভেবেছি, আমি আপনাকে ক্ষমা করে দেব, কিন্তু আপনার অতীত কি সত্যিই আমি ভুলতে পারব?”
এতো কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ইনায়া হঠাৎ নিজের হুস হারিয়ে মুখ ফসকিয়ে এক প্রকার বলেই উঠলো,
“আমায় ডিভোর্স দিন, এরিক।”

ইনায়ার এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল এরিকের রাগ আরও বাড়িয়ে দিতে। এতক্ষণ ধরে সে ইনায়াকে বোঝাচ্ছিল, নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাচ্ছিল, আর মেয়েটি তাকে ডিভোর্স দিতে চাইছে।তার থেকে দূরে যেতে চাইছে। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এরিক হঠাৎই ইনায়াকে সজোরে এক চড় মারল।এরিকের শক্ত হাতের চড় খেয়ে ইনায়া নিজেকে সামলাতে পারল না। পিছিয়ে গিয়ে জানালার সিলে মাথা গিয়ে ঠেকল, যার ফলে কপালের কিছুটা অংশ কেটে গেল। ইনায়া ব্যথায় মৃদু কেঁপে উঠলো, মুখ থেকে বের হয়ে আসলো ব্যথাতুর আর্তনাদ।
ইনায়ার আর্তনাদ শুনে এরিকের হুস ফিরে এলো। হুস ফিরতেই সে দৌড়ে গিয়ে ইনায়াকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলল,

—”আই এম সরি, রিয়েলি সরি… সরি ফর এভরিথিং, জান। আমি নিজের হুসে ছিলাম না, তাই তোমায় আঘাত দিয়ে ফেলেছি।”
“কেন তুমি আমাকে বারংবার রাগিয়ে দাও? তুমি জানো না, তোমার এই পাগল বরটা কতটা অবৈর্য!”
এই কথা বলে এরিক এক হাত দিয়ে ইনায়াকে বুকে জড়িয়ে ধরল, অন্য হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে আরও শক্তভাবে জরিয়ে ধরল। এমনভাবে জড়িয়ে ধরল যেন ছেড়ে দিলে ইনায়া পালিয়ে যাবে। সে গভীরভাবে, পেশিবহুল বাহুর মাঝে ইনায়াকে ধরে বলল,

—”আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা, তুমি কীভাবে বলতে পারলে?”
যেইখানে আমি তোমার প্রতি পুরোপুরি আশক্ত জেনেও।
আমাকে ছেড়ে যাওয়ার শাস্তি তুমি……..
এরিকের কথাটা শেষ না হতেই নেশার ঘরে বুদ হয়ে থাকা ইনায়া আচনক একটা কান্ড করে বসলো। সে নিজের হুস হারিয়ে এরিকের ঠোঁটে কিস করে বসলো। ইনায়ার করা আচমকা অগ্রাসনে এরিক হকচকিয়ে উঠল।
পরক্ষণেই, এরিকের ঠোঁটের কোনে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো, তার দেওয়া ঔষুধ কাজ করেছে।সে নিজেও ইনায়ার সাথে তাল মিলাতে লাগলো।কিছুক্ষণ পর, কিস ব্রেক করে ইনায়ার উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
—”আই অ্যাম সরি বেবি, তোমার সাথে যা করতে যাচ্ছি তার জন্য।”
কিন্তু চিন্তা করো না, আমি তোমাকে হালাল ভাবেই ছুঁবো। আমার প্রতিটা স্পর্শে থাকবে বৈধতার ছোঁয়া। এটা শুধু শরীরের নয়, দুটো আত্মার মিলন হবে। আজ যখন তোমাকে আমি আলিঙ্গন করব, আমার হাত তোমার শরীরকে নয়, তোমার আত্মাকে আঁকড়ে ধরবে। এই রাতটা আমাদের দুজনের একে অপরকে ভালোবাসার,একে অপরের প্রণয়ের প্রাপ্তির রাত। বৃষ্টির ফোঁটার মতো আমি তোমার বুকে ঝরে পড়ব, আর তুমি আমাকে তোমার পুরো অস্তিত্বে জুড়ে অনুভব করবে,

— মাই লেডি।”
কথা শেষ করে, এরিক পাশে রাখা একটি ব্যাগ থেকে কিছু কাগজ বের করে ইনায়ার সামনে ধরল। ইনায়া ঢুলু চোখে একবার কাগজগুলো দেখল, তারপর আরেকবার এরিকের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— এইগুলো কীসের পেপার?
এরিক পেপারটি এগিয়ে দিয়ে বললো,
—”তোমার আমার সম্পর্কের বৈধতার সার্টিফিকেট জান। ”
এইগুলোতে সাইন করে দাও, আমার যে এই দূরত্ব আর সহ্য হচ্ছে না। আজ আমাদের মধ্যের সমস্ত দূরত্বকে আমি মিটিয়ে দিতে চাই।তোমাকে আপন করে নিতে চাই।
তোমার পুরো অস্তিত্বকে আমার মধ্যে চাই। খুব গভীরভাবে চাই। তোমার প্রতিটা রন্ধ্রে আমার ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে চাই। এই বৃষ্টির মাদকতায় তোমাকে উন্মাদনার সাগরে ভাসিয়ে নিতে চাই। তোমাকে পূর্ণ করতে চাই, তোমাকে পুরোপুরি অনুভব করতে চাই। তোমার নীরবতায় পুড়তে চাই, অন্ধকারের গভীরে ডুবে তোমাকে গ্রাস করতে চাই।”

তুমি কি সেই সুযোগ দেবে আমাকে।
ইনায়া আজ আর এরিককে বাঁধা দিতে পারলো না, সে যতই সে নিজের হুসে না থাকুক,সত্য তো এটাই সে অবচেতন এবং চেতন দু’ই অবস্থায়ই সে এরিককে ভালোবাসে। মনের মধ্যে যতই ক্ষোভ থাকুক, তার উন্মাদনা ও আবেগের কাছে সে নিজেও অবশ হয়ে গিয়েছে।এরিকের বক্ষভাজের সাথে লেপ্টে থাকার কী তার শখ জাগে না, অবশ্যই জাগে?পছন্দিতা পুরুষের স্পর্শ কার না ভালো লাগে।আচ্ছা এই মুহুর্তে, ইনায়া যদি নিজের সজ্ঞানে থাকতো , সে কী এরিকের স্পর্শে সারা না দিয়ে থাকতে পারতো,পারতো না বোধায়?
এরিক তো তাকে যথাযথ সম্মান দিয়েছে। হয়তো তার উপায়টা ভুল ছিল। ভালোবাসলে কয়জন’ই ঠিক ভুলের হিসাব রাখে।পছন্দিতা মানুষের শরীরের গন্ধে হারিয়ে যেতে কে বা না চায়?নেশায় পুরোপুরি বুদ হয়ে থাকা ইনায়া দিন দুনিয়ার কথা ভুলে, নিজের মনের কথাকে প্রাধান্য দিয়ে এরিককের বাড়ানো কাগজটিতে সই করে দিল।
(🚫এইখানে কিছু জিনিস সিক্রেট রেখেছি……………)

এরিক একবার পেপারটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে, ইনায়ার কপালে চুমু দিয়ে বললো,
—”আমায় ক্ষমা কর মুনলাইট!আমি তোমার সুযোগ নিচ্ছি।”
“তবে সেটা অবৈধভাবে নয় টোটালি বৈধভাবে। ”
এছাড়া যে আমার হাতে আর কোন উপায় ছিল না।বিশ্বাস কর, অন্য কোন উপায় থাকলে আমি এই পন্থা অবলম্বন করতাম না। আমার যে তোমাকে সবকিছুর থেকে প্রটেক্ট করতে হবে।
আমার শরীরের কোনো এক অস্তিত্বকেই ব্যবহার করে তোমাকে সারাজীবনের জন্য নিজের কাছে বেঁধে রাখার জন্য ভালো আর কোনো উপায় আমি খুঁজে পাইনি।
আমি চাই, আমাদের পৃথিবীতে শুধু আমরা দুজন একসাথে থাকব। আর আমার কোনো একটা অংশ তোমার এই ছোট্ট শরীরে রাজত্ব করে আমাকে আমার সবচেয়ে বড় উপহারটা দিবে।
ইনায়া নেশার ঘরে কী শুনলো কে জানে, এরিকের কলার জরিয়ে বলে উঠলো,
—“আমি চাই আপনাকে… আমার শুধু আজ আপনাকেই লাগবে—প্র্যাকটিক্যালি, ফিজিক্যালি, নর্মালি, মেন্টালি… এই সব ভাবেই আমি চাই আপনাকে । দয়া করে, ফিরিয়ে দিবেন না,আমায়।”
ইনায়া আবারো নেশার ঘরে এরিককে বলে উঠলো,

—“আপনাকে না ব্লাক শার্টে অনেক হট লাগে। আপনি অনেক হট এরিক।আমাকে আজ পুরোপুরি আপনার সাথে মিশিয়ে নিন। আমাকে এমন বন্ধনে আবদ্ধ করুন যেই বন্ধন ছেড়ে আমি কোন দিনও যেতে না পারি।আমাকে আপনার মাঝে বিলিন করে দিন।”
“ইনায়ার আবেদনময়ী কথা শুনে এরিক একটু মুচকি হেসে ইনায়ার দিকে যত এগোচ্ছে, ততই তার নিজের নিয়ন্ত্রণও যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।মনে মনে সে ভাবছে,
—“আমি তো আগেও অনেক মেয়ের সাথে এমন ছিলাম, কিন্তু আজকের মতো অনুভূতি কেন আগে আসেনি? সেই অনুভূতিগুলো ছিল শরীরের তীব্র উত্তেজনা, কিন্তু আজকেরটা হৃদয়কে ছুঁয়ে যাচ্ছে।”
ইনায়া এরিককের দেওয়া স্পর্শগুলোকে সাদরে গ্রহণ করে, তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে উঠলো,

—“আই ওয়ান্ট অ্যা বেবি… আমি আপনার মতো একটা বেবি চাই। সে আপনার মতো অপবিত্র মানুষের মধ্যে থেকে পবিত্র ফুল হয়ে আমার কাছে আসবে। … যে আপনার মতো ব্যাড বয় হবে না।”
ইনায়ার কথা বলার মাঝে এরিক তাকে ছুঁয়ে দিতেই, ইনায়ার পুরো শরীরে শিহরণ জেগে উঠলো।
ঘরের ক্যান্ডেলের নিভু আলোয় এরিক ইনায়াকে দেখতে লাগল। এরিক ইনায়ার লজ্জা মাখা মুখ দেখে, তার বেহায়া মনটা যেন আরো আশকারা পেয়ে গেল।এক পর্যায়ে তাকে কাছে টেনে নিল। এই প্রথমবারের মতো এরিক কোনো নারীকে ভালোবাসার আদলে নিষ্পাপভাবে ছুঁয়ে দিল, যার মাঝে কোনো অশ্লীলতা ছিল না।”

চাঁদের আলোয় দোলনার উপর দুই পা ঝুলিয়ে রেখে পান চিবুচ্ছেন রুখসানা বেগম। ঠিক তখনি বাড়ির কাজের মেয়েটি হাঁপাতে হাঁপাতে তার সামনে হাজির হয়।মেয়েটিকে হাঁপাতে দেখে রুখসানা বেগম বলে উঠেন,
—কীরে এতো হাঁপাচ্ছিস কেন?
ম্যাডাম এমন একটা খবর এনেছিনা যেটা শুনে আপনিও খুশি হয়ে যাবেন। রুখসানা বেগম কাজের মেয়েটির কথা শুনে অতি উৎসাহ নিয়ে বলে উঠলো,
—”কী খবর তাড়াতাড়ি বল, মুখপুড়ি?”
কাজের মেয়েটি একটু শান্ত হয়ে বলে উঠলো,
ওই যে খ্রিষ্টান ছেলেটা আছে না, তাকে আমি ছোট ম্যাডামের ঘরে দেখেছি।
রুখসানা অবাক হয়ে জিজ্ঞেসা করলো,

—”কী বলছিস এইসব? ”
কাজের মেয়েটি প্রতিউওরে বললো,
—”হ্যাঁ মালকিন! আর আমি বাইরে থেকে দরজার সিটকিনি লাগিয়ে দিয়েছি, ওরা কেউ বাইরে বেরোতে পারবে না। ”
রুখসানা বেগমের চোখদুটো মুহুর্তেই জ্বলজ্বল করে উঠলো,
“থাকতে আজ সারারাত দুটোকে।কাল দেখাবো আমার খেল।”

পাহাড়ের চূড়া ভেদ করে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে। রাতের অন্ধকার সরে গিয়ে ধরনী জেগে উঠেছে নতুন দিনের আলোয়। সোনালি রশ্মি থাই গ্লাস পেরিয়ে এসে বিছানায় শায়িত দুই কপোত-কপোতীর মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। রাতের ক্লান্তি ঝেড়ে ইনায়া আধো ঘুম চোখে চারপাশে তাকাল। হঠাৎই এরিকের সঙ্গে নিজেকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় জড়ানো দেখে সে বিস্ময়ে চমকে উঠল। আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

—আল্লাহ!আমরা দুজনে এতো ঘনিষ্ঠ অবস্থায় কেন? কী হয়েছিল গতরাতে আমাদের মাঝে?”
এই দিকে ইনায়ার চিৎকার কানে পৌঁছাতেই এরিক চমকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। চোখে এখনও ঘুমের ছাপ লেগে আছে, তবু ইনায়ার আতঙ্কিত মুখ দেখেই তার শিরা-উপশিরা সজাগ হয়ে উঠল। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নরম গলায় বলল,
“কি হয়েছে, ইনায়া? এমন করে কেউ চিৎকার করে?”
এরিকের খাপছাড়া কথা ইনায়ার রাগের মাএাকে আরও বাড়িয়ে দিল। ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে সে তীব্র স্বরে বলল,

—”আমার সমস্ত ভালোবাসাকে মিথ্যা প্রমাণ করে, আমায় অপবিত্র করে দিলেন এরিক।”
ইনায়ার অসহায় চোখে জল দেখে এরিকের বুকটা হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল সে। তারপর ধীরে, নরম স্বরে বলল,
— “তুমি অপবিত্র নও, মুনলাইট। তুমি আমার চোখে সবসময় পবিত্রতার প্রতীক।
ইনায়া এরিককের কথা শুনে চাতক পাখির ন্যায় এরিকের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।তার চোখ থেকে আপনাআপনি দু ‘ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এতো দিনের ধরে রাখা সতীত্ব আজ সে হারালো। সে চোখের জল মুছে এরিককে বলে উঠলো,

—”বৈধতাবিহীন সম্পর্কে স্বামী না হয়েও আপনি আমার উপর অধিকার খাটালেন এরিক।”
এরিক ইনায়ার ভগ্নহৃদয়ের প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন স্পষ্ট শুনতে পেল। নিজের ভেতরেও এক ভারি অপরাধবোধ তাকে চেপে ধরল, যদিও জানে,সে কোনো ভুল করেনি। ইনায়ার চোখের জল তার বুকের ভেতরটা আরও ক্ষত-বিক্ষত করে তুলল। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে শান্ত গলায় বলল,
—হৃদয়ে স্ত্রীর অধিকার আমি বহু আগেই তোমাকে দিয়েছি,মুনলাইট।”
ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল এরিকের কথায় , রাগে-অভিমানে সে কেঁপে উঠল।
— “স্ত্রী? আপনি আমার স্বামী নন! আল্লাহর কাছে বিবাহ ছাড়া কোনো সম্পর্ক বৈধ নয়। আপনি খ্রিষ্টান, আমি মুসলিম। আমাদের মাঝে বৈধ কিছু নেই। আপনি কীভাবে পারলেন এমন পাপ করতে?”
এরিকের কণ্ঠ ভারী করে বলল,

— যদি কাউকে ভালোবাসা পাপ হয়, তবে আমি সেই পাপে ডুবে আছি। আমি হয়তো তোমার ধর্ম পুরোপুরি বুঝি না, কিন্তু আমার ভালোবাসা কি এতটাই তুচ্ছ যে তাকে অবৈধ বলা হবে?”
ইনায়া কেঁদে বলে উঠে,
— “হ্যাঁ! আমার ধর্মে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনকিছুতে বৈধতা নেই। সমাজ আমার দিকে আঙুল তুলবে, পরিবার আমাকে গ্রহণ করবে না। আমি সারাজীবন কলঙ্কিত হয়ে থাকব।”
এরিক তার কাছে এগিয়ে এসে ধীরে বলল,
— নিজেকে কলঙ্কিত ভাবা বন্ধ কর, তুমি কলঙ্কিত নও। আর সমাজ কি আমাদের হৃদয়ের চেয়ে বড় ?
ইনায়া ফুঁপিয়ে উঠল।
— “আপনি বুঝবেন না, এরিক। ভালোবাসা যতই সত্য হোক, বৈধ-অবৈধ, হালাল-হারামের বেড়াজাল আমাদের আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে ধরবে। ”

—আমার নিজের প্রতি খুব ঘৃন্না হচ্ছে, এরিক!আপনার দেওয়া প্রতিটা ছোঁয়া এখনো আমার শরীরে জীবন্ত হয়ে ফুটে আছে।
এমন সময় হঠাৎ, তাদের কথোপকথনের মাঝখানে দরজায় তীব্র কড়া নাড়ার শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল। চমকে ইনায়া তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল, বুকের ভেতর ধকধক করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার ওপাশ থেকে রুখসানা বেগমের তীক্ষ্ণ স্বর ভেসে এল,

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩১

—“দরজা খোল! দরজা বন্ধ করে কোন নাগরের সঙ্গে কী করছিস?”
ইনায়া ভয়ে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভয়ে আতঙ্কে জমে গেছে। এবার কী ইজ্জতের সাথে সাথে সম্মানটাও হারাতে চলেছে সে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৩