অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৩
নুরিয়া ইসলাম
ভোরের আবছা আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি, কিন্তু রুখসানা বেগমের তীব্র চিৎকারে যেন পুরো বাড়ি কেঁপে উঠলো। ইনায়ার ঘরের দরজায় তিনি আছড়ে পড়ছেন আর ক্ষিপ্ত কণ্ঠে ডেকে চলেছেন,
—“ইনায়া, দরজা খোল! এই ইনায়া!”
রুখসানা বেগমের এই অপ্রত্যাশিত শোরগোলে রুখসানা বেগমের স্বামী সামীরসহ পরিবারের বাকি সদস্যরা নিজেদের ঘুম বিসর্জন দিয়ে ইনায়ার রুমের সামনে হাজির হয়।রুকসানা বেগমের স্বামী স্ত্রীর এই রকম আচারণে এক প্রকার বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন,
“সকাল সকাল কী শুরু করেছ রুখসানা? একটু শান্তিতে ঘুমোতে দেবে না নাকি!”
সামীরের কথায় রুখসানা বেগমের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। তিনি স্বামীর দিকে তেড়ে এসে বললেন,
“তোমার শুধু আমাকেই চোখে পড়ে? এইদিকে তোমার ভাইজি সারা রাত এক পরপুরুষের সাথে নষ্টামি করেছে, সেই খবর রাখো!” তার প্রতিটি শব্দে ইনায়ার প্রতি ঘৃণা আর বিদ্বেষ ঝরে পড়ছে।
রুখসানা বেগমের এমন কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে তানভিরের বুক কেঁপে উঠলো। শান্ত, নিরীহ স্বভাবের বোনটির সম্পর্কে এমন অভিযোগ শুনে তার কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে গেল।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—”চাচি, কোনো প্রমাণ ছাড়া আমার বোনের চরিত্রে দাগ লাগাতে আসবেন না।”
রুখসানা বেগম আগে থেকেই সব প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি তেতে উঠে বললেন,
“শোনো তানভির, আমার কথা তোমাদের অনেকের পছন্দ না-ও হতে পারে, তাই বলে সত্যিটা মিথ্যা হয়ে যাবে না। তোমার বোন এই শেখ পরিবারের মান-সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।ওই খ্রিস্টান ছেলেটার সঙ্গে সারা রাত এক ঘরে কাটিয়েছে, আমি নিজে দেখেছি। আমেরিকায় গিয়ে আমেরিকার মেয়েদের মতো নষ্টামি শিখে এসেছে। ছিঃ! বংশের মুখে পুরো চুনকালি মেখে দিলো!”
ঠিক তখনই শানাওয়াজ শেখ লাঠি দিয়ে মাটিতে একবার আঘাত করলেন। তার মুখমণ্ডলে ছিল গম্ভীর, শান্ত কিন্তু দৃঢ় অভিব্যক্তি।তিনি রুখসানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— “তোমার কথার কী প্রমাণ আছে, রুখসানা? আমরা সবাই ইনায়াকে খুব ভালো করে চিনি—সে এমন কাজ করবে না।”
কিন্তু রুখসানা বেগম হার মানার পাত্রী নন। তিনি শানাওয়াজ শেখের দিকে ঘুরে বললেন,
“ঠিক আছে বাবা, তাহলে আপনার নাতনিকে দরজা খুলতে বলুন। এতক্ষণ ধরে চিৎকার-চেঁচামেচি করার পরও সে কেন দরজা খুলছে না?”
রুখসানা বেগমের এই কথায় যেন সবাই থমকে গেল। এক অজানা শঙ্কা সবার মনে ভর করলো। এবার সবাই মিলে ইনায়ার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করলো। উপায় না দেখে, একরাশ ভয় ও লজ্জায় ইনায়া দরজা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই রুখসানা বেগম হিংস্র বাঘিনীর মতো ইনায়ার দিকে তেড়ে গেলেন।
— “সারা রাত ফষ্টিনষ্টি করেও শখ মেটেনি যে এখনো শুরু করেছিস!”
বলেই তিনি ইনায়াকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন। তার দুটি চোখ চারিপাশে শুধু এরিককে খুঁজছে। কিন্তু ঘরজুড়ে রয়েছে শুধু শূন্যতা। এরিক সেখানে নেই!
রাগে কাঁপতে কাঁপতে রুখসানা বেগম ইনায়ার দু’বাহু শক্ত করে চেপে ধরলেন।তারপর এক প্রকার চেঁচিয়ে বললেন,
—”কাল তুই ওই খ্রিস্টান ছেলেটার সঙ্গে রাত কাটিয়েছিস, কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস তোর নগরকে? একদম মিথ্যা বলবি না, আমি সব জানি।”
রুখসানা বেগম ইনায়ার দু বাহু ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন। কিন্তু ইনায়ার মুখ থেকে একটি শব্দও বের হলো না। সে শুধু মাথা নিচু করে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলো। সে কী বলবে? সে তো সত্যিই কলঙ্কিত হয়ে গেছে!
শেওনায়াজ শেখের উচ্চ কণ্ঠস্বর রুখসানা বেগমকে থামিয়ে দিল।
“অনেক হয়েছে রুখসানা! তুমি তখন থেকে মেয়েটার নামে উল্টোপাল্টা কলঙ্ক লাগিয়ে যাচ্ছ। ইনায়া এই বাড়ির মেয়ে—ভুলে যেও না। তুমি যা দেখোনি তা নিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় করে তুলেছ। তার উপর একটা মেয়ে হয়ে আরেক মেয়ের নামে কুৎসা রটাচ্ছ!”
রুখসানা বেগম দৃঢ় স্বরে বললেন,
“না বাবা, আমি সত্যি বলছি। এই মেয়ে পুরো রাত ওই খ্রিস্টান ছেলের সঙ্গে কাটিয়েছে।”
তিনি অতি আত্মবিশ্বাসের সহিত কথাটি বললেন যেন তিনি তার অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দিহান নন। তিনি তার কথা সত্য প্রমাণ করতে ইনায়াকে টেনে সবার সামনে দাঁড় করালেন। তারপর তার মাথা থেকে ওড়না সরিয়ে তার গলার লালচে দাগগুলো সবাইকে দেখিয়ে বললেন,
“আমি যদি মিথ্যা বলে থাকি, এগুলো কী বাবা? কী হলো, আপনারা সবাই চুপ করে আছেন কেন বলুন।”
তার বলা কথাগুলো সেইখানে উপস্থিত সবার মনে প্রশ্নের ঝড় তুলে দিল।
রুখসানা বেগম ইনায়ার মুখভঙ্গি দেখে মনে মনে হেসে বলে উঠলেন,
—আমিও দেখবো, এবার তুই সবার সামনে কী বাহানা দিস?
এই দিকে ইনায়া লজ্জা আর ভয়ে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে এলো। কী বলবে সে?সে কীভাবে সবার সামনে মুখ দেখাবে?তার কল্পনাতেও আসেনি যে রুখসানা বেগম এমন একটা কাজ করে বসবে। এই প্রথম ইনায়া নিজের সম্মান বাঁচাতে মিথ্যার আশ্রয় নিলো। সে রুখসানা বেগমকে উদ্দেশ্য করে কম্পিত স্বরে বলল,
“চাচি, আপনি ভুল ভাবছেন, এগুলো অ্যালার্জির ফোস্কা। কাল রাতে আমি আম খেয়েছিলাম, তোমরা তো জানো আমে আমার অ্যালার্জি আছে।”
রুখসানা বেগম ইনায়ার অনায়াসে সকলের সামনে মিথ্যা স্বীকারউক্তি শুনে রেগে আগুন হয়ে গেলেন।তিনি ইনায়াকে ধমকে বলে উঠলেন,
“এই তুই চুপ কর! রাতের বেলায় পরপুরুষ ঢুকিয়ে নষ্টামি করিস, এখন অনায়সে মিথ্যা কথা বলছিস!”
তার কথা বলার মাঝেই এরিক একজোড়া শর্টস পরে হাই তুলতে তুলতে বেরিয়ে এলো। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠলো,
— “হোয়াট দ্য হেল! এটা বাড়ি না মাছের বাজার?”
কথাটা বলেই সে রুখসানা বেগমকে উদ্দেশ করে বলে উঠলো,
—“ইউ ওল্ড লেডি, সকাল সকাল কেন ষাঁড়ের মতো চিৎকার করে আমার ঘুমের বারোটা বাজালেন।”
এরিকের কথা শুনে ছোট তুলি ফিক করে হেসে বলে উঠলেন,
—”ভাইয়া শুধু আপনার না আমাদের ঘুমটাও নষ্ট করে দিয়েছেন।সেই কখন থেকে ইনায়া আপ্পির নামে পচাঁ কথা বলে যাচ্ছেন।
ছোট্ট তুলির কথা শুনে বাড়ির ছোট সদস্যরা হেঁসে দিল। মিস্টার শেওনায়াজ শেখ চোখ পাঁকাতেই সবাই চুপ হয়ে গেল।
এই দিকে এরিককে সামনে থেকে আসতে দেখে রুখসানা বেগম যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল, মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না এই মুহুর্তে । সে যে পুরো রাত ইনায়ার ঘরে ছিল, তাহলে এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে ছিল!কথাগুলো আনমনে ভেবে চলেছেন তিনি।
রুখসানা বেগমের বিহ্বলতা দেখে এরিক ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার আচরণে কোনো অপরাধবোধ বা ভয় ছিল না, বরং ছিল একধরনের বিজয়ীর মনোভাব। রুখসানা বেগম যখন নিজেকে সামলে নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন,
“তুমি… তুমি সারা রাত ইনায়ার ঘরে ছিলে, আমি নিজের চোখে দেখেছি। কোথায় লুকিয়ে ছিলে এতক্ষণ?”
এরিক তার দিকে এক পা এগিয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বর ছিল নির্লিপ্ত, সে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বলে উঠলো,
“ছি ছি, ওল্ড লেডি! আপনি নিজের কল্পনাকে এত বেশি সত্যি ভাবেন কেন?” তার চোখেমুখে দুষ্টুমি খেলা করছিল।
“আমি রাতে কোথায় ছিলাম, সেটা আপনি উঁকি দিয়ে দেখতে পারেন, কিন্তু আমি রাতে ঠিক কী কী করেছি সেটা বলতে আপনার রুচিতে এতো বাঁধছে কেন?সবাইকে বলুন।”
এরিকের এমন সরাসরি মন্তব্যে রুকসানা বেগম কিছুটা হতবাক হয়ে গেলেন। তার মুখ থেকে কথাও বেরোচ্ছিল না। শানাওয়াজ শেখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন তিনি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। রুখসানা বেগমের এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এরিক নির্লজ্জের মতো হেসে বলে উঠলো,
“তবে আপনি একটা জিনিস ঠিক ভেবেছেন, ওল্ড লেডি। আপনি যেটা ভেবে এতোগুলা মানুষ জড়ো করেছেন, আমি সত্যিই সেই জিনিসটা করেছি ইনায়ার সাথে শুধু একরাতে নয়, ট্রাস্ট মি প্রতিরাতে করেছি তবে সেইগুলো ছিল নিছকই সুন্দর স্বপ্ন।
এরিক এইবার বাঁকা হেসে সকালের উদ্দেশ্য বলে উঠে,
আপনাদের মেয়েকে আমার খুব মনে ধরেছে, তাই আপনারা যদি অনুমতি দেন, আমি আপনাদের মেয়েকে আমার স্ত্রী হিসেবে পেতে চাই।কতদিন আর নিজের পছন্দের জিনিসকে চোখের সামনে দেখবো।একটু মন খুলে ছুঁয়ে না দিলে ফিল পাওয়া যায় বলুন।
এরিকের এই স্পষ্টভাষী এবং নির্লজ্জ কথায় রুখসানা বেগমের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি রাগে কেঁপে উঠলেন।
— “বেয়াদব! তুমি এতগুলো গুরুজনের সামনে এমন নির্লজ্জের মতো কথা বললে কী করে?”
এরিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো ,
“কুল ওল্ড লেডি!আপনি সবার সামনে অন্যের বেডরুমে কি হলো তা জানার আগ্রহ দেখাতে পারেন আর আমি আপনার কৌতূহল মেটাতে এই সামান্য কথাটা বলতে পারি না।
তবে এইটুকু বলি, ইনায়া আমার নেশায় পরিণত হয়েছে।আর তার সাথে এক রাত কেন, আমি তো প্রতি রাতে …”
এরিকের কথা শেষ হওয়ার আগেই রুখসানা বেগম তার দিকে প্রায় তেড়ে গিয়ে বললেন,
“বেয়াদব ছোকরা!তেমার সামনে এতোগুলো গুরুজন দাঁড়িয়ে আছে,মুখের লাগাম টানো।
কিন্তু এরিক যেন এই ধমকে একটুও বিচলিত হলো না। বরং হাসিতে তার চোখ চিকচিক করে উঠলো।সে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বলে উঠলো,
“শান্ত হোন, ওল্ড লেডি, এতোটা হাইপার হবেন না । নাহলে যে আপনার হার্ট এটাক হয়ে যাবে।
রুখসানা বেগম আর এরিকের কথা কাটাকাটির মধ্যেই বাড়ির কাজের লোকগুলো ইনায়া আর এরিককে নিয়ে ফিসফিস শুরু করে দিল যেটা মিস্টার শাহনাওয়াজ শেখের কানে স্পষ্টভাবেই আসছিল। তাদের ফিসফিসানি বাতাসকে ভারী করে তুলছিল। তাদের মধ্য থেকে একজন বলল,
চেয়ারম্যান সাহেব পারেন ও বটে! বাড়িতে একটা শেয়ানা মেয়ে থাকতে একজন আইবুড়ো ছেলেকে বাড়িতে রেখেছেন। অঘটন আজ না-হয় ঘটেনি, ঘটতে কতক্ষণ!”
আরেকজন টিপ্পনি কেটে বলল,
—”আজকালকার ছেলেমেয়েরা সর্বনাশ করতে সময় নেয় না।”
তাদের কথাগুলো শুনে রুকসানা বেগম মনে মনে হাসলেন, কারণ তিনি এটাই চেয়েছিলেন, ইনায়কে সকলের সামনে অপদস্ত করতে।
তাদের ফিসফাস আর হাসাহাসি শুনে শাহনাওয়াজ শেখের সারা শরীর রাগে কাঁপছিল। তাঁর মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল মুহুর্তেই। হাতে ধরা লাঠিটা মাটিতে সজোরে ঠুকে তিনি গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,
—”চুপ করো তোমরা সবাই! আমি শাহনাওয়াজ শেখ এখনো বেঁচে আছি। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া না লাগিয়ে দ্রুত বিয়ের আয়োজন শুরু করো।”
তাঁর কথায় বাড়ির প্রতিটি মানুষ থমকে গেল। তানভীর, যে এতক্ষণ নিরবে সব দেখছিল, হঠাৎ করে দাদুর এমন সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে গেল। সে কিছুটা হতভম্ব হয়ে বলল,
— “বিয়ে আয়োজন শুরু করব মানে, দাদু?”
শাহনাওয়াজ শেখ নাতির দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—”আগামী ২০ দিনের মধ্যেই আমি আদিল আর ইনায়ার বিয়ে দিতে চাই।”
এই কথাটা যেন বোমার মতো ফাটল পুরো শেখ পরিবারের মাঝে। ইনায়া এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল, দাদুর এই কথা শুনে তার মুখের সব রক্ত জমে গেল। তার চোখগুলো বিস্ফারিত হলো, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে সে হতবাক হয়ে গেল। হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল। তার চোখে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল কেবল অসহায়ত্ব।সে এরিকের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। এরিকের উপস্থিতি তার মনের গভীরে ঢুকে থাকা এক পুরনো কাঁটার মতো—তাকে সরিয়ে দেওয়া যায় না, অথচ আঁকড়ে ধরতেও ভয় লাগে। তবুও এই মুহূর্তে সে একজনের স্ত্রী হতে যাচ্ছে; হৃদয়ের গোপন কক্ষে আরেকজনের নাম এঁকে রেখে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপরাধবোধ তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। তার পা ভারী হয়ে আসছে, প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন এক একটি পাথর হয়ে বুকের ওপর চেপে বসেছে। এই বিয়ে কি শুধুই একটি সামাজিক চুক্তি,না বরং এটি তার আত্মাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিচ্ছিল। একদিকে ভালোবাসার টান, অন্যদিকে বাস্তবতার নির্মম শেকল এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে সে যেন এক অনন্ত শূন্যতায় হারিয়ে যাচ্ছে।কোন দিকদিশা না পেয়ে ইনায়া ছলছল চোখে প্রথমবার এরিকের দিকে তাকালো, তাকে হারানোর ভয় তার চোখে স্পষ্ট।
এরিক রাগে শেওনায়াজ শেখের দিকে কিছু বলতে উদ্যত হল, কিন্তু ইনায়ার ইশারায় সে থেমে গেল। ইনায়ার এই নীরব নিষেধ যেন এরিকের ভেতরের রাগটাকে দ্বিগুণ করে দিল। তার ইচ্ছে করছিল ইনায়ার গাল দুটোকে থাপ্পড় মেরে লাল করে দিতে। কেন এই মেয়ে বোঝে না, সে তাকে কতটা ভালোবাসে? সব পিছুটান ফেলে তার কাছে চলে এলে কি খুব বেশি ক্ষতি হবে?
কিন্তু এই নীরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।শেওনায়াজ শেখের কথা শুনে রুখসানা বেগমের মুখটা কালো মেঘে ঢেকে গেল। তিনি শেওনায়াজ শেখকে উদ্দেশ্য করে কিছু তিক্ত বাক্য আওড়ালেন,
—”বাবা, আপনি এসব কী বলছেন? এই নষ্ট মেয়ের সাথে আপনি আদিলের বিয়ে দিতে চান?”
রুকসানার নোংরা ইঙ্গিতে মিস্টার শাহনাওয়াজ শেখের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তার চোখেমুখে ফুটে উঠলো তীব্র ক্রোধ যেন আগ্নেয়গিরির লাভা উপচে পড়ছে।তার গলার স্বরে বজ্রের মতো শোনা গেল,
—”তোমার লজ্জা করছে না রুকসানা? এতগুলো বাইরের মানুষের সামনে তুমি শেখ পরিবারের মেয়ের গায়ে কলঙ্ক লাগাচ্ছ? নিজেকে বদলাও রুকসানা। আমি বদলানোর দায়িত্ব নিলে সেটা তোমার জন্য ভালো হবে না।”
তাঁর এই কঠিন, কঠোর কথাগুলো শুনে রুকসানা বেগমের মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি এক লহমায় নিজের সমস্ত তেজ হারিয়ে ফেললেন। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন, শাহনাওয়াজ শেখের মুখের ওপর দিয়ে কথা বলার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এই ঘটনার পর সবার মধ্যেই এক চাপা উত্তেজনা ও থমথমে নীরবতা নেমে এলো। কেউ একটিও কথা বলার সাহস পেল না, সবারই বুক ভয়ে দুরু দুরু করে কাঁপছে।
নদীর অবিরাম স্রোতের মতো সময় বয়ে চলে, পেছনে ফেলে আসে কত স্মৃতি, কত অপেক্ষার প্রহর। দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতায় প্রতীক্ষিত সেই দিনটি এসে হাজির হলো। আজ ইনায়া আর আদিলের গায়ে হলুদ। ইনায়াকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। গায়ে হলুদের লেহেঙ্গা তার শরীরে দারুণ মানিয়েছে। এরিক মুগ্ধ হয়ে ইনায়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ইনায়ার চোখ এরিকের দিকে পড়তেই এরিক চোখ সরিয়ে নেয়। সে পাশ কাটিয়ে সেই জায়গা থেকে চলে যায়। এরিকের বিষণ্ণতা ইনায়ার চোখ এড়ায়নি। সবার নজর এড়িয়ে তাই সে নিঃশব্দে এরিকের পিছু নিল।সে এরিককে খুঁজতে খুঁজতে এদিক-ওদিক হাঁটতে থাকে, ঠিক তখনই একটি হাত তাকে ভেতরের একটি ঘরে টেনে নেয়। ইনায়া ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। ইনায়া যখন অনুভব করে একটি উষ্ণ নিশ্বাস তার ঘাড়ে পড়ছে। তখনি সে নিজের চোখ দুটো খিঁচে ধরে রাখে।এরিক তাদের মধ্যের ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়িয়ে দেয়। ইনায়ার পুরো শরীরে শিহরণ জেগে উঠে। এরিক তা দেখে বাঁকা হেসে নেশালো কণ্ঠে বলে ওঠে,
—”Open your eyes, moonlight!”
ইনায়া এরিকের কথায় আস্তে আস্তে চোখ খোলে। দেখে এরিক তার উন্মুক্ত পেটে আস্তে আস্তে হলুদ মাখিয়ে দিচ্ছে। এরিকের স্পর্শে ইনায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। সে এরিকের হাত চেপে ধরে বলে,
— “কী করছেন, এটা হারাম।”
এরিক ইনায়ার কথা শুনে তার ঠোঁটে উপর এক আঙুল দিয়ে আলতে করে চাপ দিয়ে বললো,
—“Hush… চুপ করে শুধু আমার স্পর্শগুলো অনুভব করো।”
— তাছাড়া তোমার সাথে এত কিছু করার পরও আমাদের মাঝে হারাম কোনো জিনিস বাকি আছে বলে তো আমার মনে হয় না।
এরিকের কথা শেষ হতেই সে ইনায়াকে উল্টো করে ঘুরিয়ে দিল, তার উন্মুক্ত পিঠটা এরিক পুরোপুরি নিজের দখলে করে নিল।সে নিজের হলুদমাখা গাল বাড়িয়ে দিল ইনায়ার উন্মুক্ত পিঠে,তার নরম উষ্ণ স্পর্শ ইনায়ার পিঠের প্রতিটি লোমকূপে শিহরণ জাগালো। এ যেন এক বিদ্যুৎপ্রবাহ, যা এরিকের গাল থেকে ইনায়ার পিঠে ছড়িয়ে পড়লো। ইনায়ার শরীর কেঁপে উঠলো, এক তীব্র উষ্ণতা তার শিরায় শিরায় বইতে শুরু করলো।
ইনায়া অতিরিক্ত উওেজনায় নিজের চোখ দুটো আবেশে বন্ধ করে নিল।সে তার কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে এরিককে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
—”আহ্, এরিক! থামুন, দয়া করে! আপনার এই ছোঁয়া আমায় পাগল করে দিচ্ছে।”
তার কন্ঠস্বরে এমন আকুতি যা এরিকের সামনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করছিল। প্রতিটি স্পর্শে তার শরীর বেসামালভাবে কেঁপে উঠছিল, আর সেই কাঁপন তার আত্মার গভীরে ঝড় তুলছিল।
এরিকের হাতের বেসামাল স্পর্শে তাী ভিতর যে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিল, তা ইনায়ার হৃদস্পন্দনকে এক বন্য ড্রামের ছন্দে কাঁপিয়ে তুলছিল।সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, এক পর্যায়ে সে এরিকের ভালোবাসার বেড়াজালে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে আবদ্ধ করতে চাইল।
ইনায়াহর সমস্ত ভাবনা থমকে গেল যখন এরিক তার উষ্ণ ঠোঁট আলতো করে কাঁধে রাখল।সেই উষ্ণ স্পর্শে ইনায়াহর বুকের ভেতর থেকে এক চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।তার সমস্ত চেতনা এক মুহূর্তে থমকে গেল। ইনায়ার হাত তখন এরিকের চুলের ভাঁজে খেলা করছিলো।এরিক ইনায়ার স্পর্শে আরো উন্মাদ হয়ে যাচ্ছিল,সে নিজের ভিতরের বয়ে চলা উন্মাদনাকে কন্ট্রোল করতে না পেরে ইনায়ার গলার নরম ভাঁজে ছোট ছোট কামড় বসাতে শুরু করলো।ইনায়ার ব্যাথায় মুখ থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে এলো, এরিক এইবার নিজের ঠোঁট দিয়ে ইনায়ার ঠোঁট চেপে ধরলো। এক গভীর চুমু এেঁকে দিল ইনায়ার ওই গোলাপি রাঙা ঠোঁটে। যখন বুঝতে পারলো ইনায়ার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তখন ইনায়াকে ছেড়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—“Bite me back, moonlight.Then, you won’t feel pain in your body.”
বলেই এরিক ইনায়ার কানের লতিতে একটা কামড় বসালো যার ফলে ইনায়ার মুখ থেকে মৃদু আওয়াজ বেরিয়ে এলো। এরিক ইনায়ার নাজেহাল অবস্থা দেখে বাঁকা হেসে বলে উঠলো,
— Baby, this is just the preview. Our wedding night… it’ll be eternal fire.”
[“জান, এ তো শুধু আমাদের ভালোবাসার এক মুহূর্তের ঝলক ছিল। আমাদের বিয়ের রাত হবে চিরন্তন এক কাব্য, সেইদিন আমি তোমার সমস্ত অনুভূতির গভীরে ডুবে যাব। তোমার শরীর, মন, আর আত্মা— সবটুকু একাকার করে নেব আমার মধ্যে। সেইদিনের জন্য না হয় নিজেকে প্রস্তুত রেখো।
কথাটি বলে এরিক ইনায়ার গালে শেষবারের মতো আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩২
—ইউর টেস্ট ইজ জাস্ট পারফেক্ট বেবি,আই ওয়ান্ট ইট মোর।
কথাটি শেষ করে এরিক ধীর পায়ে ইনায়ার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। তার ঠোঁটের উষ্ণতা তখনো ইনায়ার গালে লেগে ছিল, আর সেই অনুভবের ওপর স্থির ছিল এরিকের গভীর দৃষ্টি। দরজার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তার শেষ চাহনিটুকু এক নীরব প্রতিশ্রুতির মতো ইনায়ার হৃদয়ে গেঁথে গেল। ধীর পায়ে এরিক ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, তার পদশব্দ বাতাসে মিলিয়ে গেল।এরিক চলে যেতেই ইনায়া চোখ বুজে এরিকের দেওয়া প্রতিটি স্পর্শ হৃদয়ে ধারণ করল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সেই রাতের সমস্ত জটিলতা তার স্পর্শের উষ্ণতায় গলে গেছে।
