Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৪

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৪

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৪
নুরিয়া ইসলাম

সান ফ্রান্সিসকো-নীল আকাশের আঁচলে মোড়া, সাগরের কোলছোঁয়ায় স্নিগ্ধ এক স্বপ্নময়ী নগরী।
কুয়াশার নরম চাদরে মোড়া গোল্ডেন গেট ব্রিজ হচ্ছে সান ফ্রান্সিসকোর বুকে মিশে থাকা প্রকৃতির নিঃশব্দ গীত, যেখানে পাহাড়ের সবুজ আর সাগরের নীল ছোঁয়ায় জন্ম নেয় এক অনন্ত মোহনীয় সৌন্দর্য। রক্তিম সূর্যোদয়ে তার লালচে-সোনালি রঙে জেগে ওঠে এক অপার্থিব মাধুর্য, আর সন্ধ্যার নীল আলোয় সে ডুবে যায় নীরব রহস্যে।এই শহরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য রঙিন ভিক্টোরিয়ান ‘পেইন্টেড লেডিস’ বাড়ি, এই বাড়িগুলো দেখলে মনে হয় যেন শহরের কোলাহলের মধ্যে ছোট এক টুকরো শান্তির আশ্রয়। যার প্রতিটি জানালা আর বারান্দা ছড়িয়ে দেয় সৌন্দর্যের নীরব সুর।এই বাড়িগুলো থেকে একটু দূরে,
পাহাড়ের গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ইনায়াদের রঙিন দুতলা বাড়িটা , দেখতে ছিমছাম আর পরিপাটি-বড় জানালা দিয়ে ভেতরে আলো ছড়িয়ে পড়ে, বারান্দায় টাঙানো ফুলের টব আর কাঠের কারুকাজে বাড়িটা দেখলেই মনটা জুড়িয়ে যায়।

অনেক দিন পর আজ ফ্রান্সিসকোর আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যের সোনালি আলো।পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সেই নরম রশ্মি জানালা ভেদ করে ইনায়ার মুখে পড়তেই ঘুমের ঘোরে সে একটু নড়েচড়ে উঠে। বেড সাইড টেবিলের উপর রাখা ঘড়িটার টুংটাং সুরে সে মিষ্টি আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে উঠে বসে।আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি থাকায় সে সারাদিন বাড়িতেই থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে, কালো লং ড্রেসের সঙ্গে মিলিয়ে কালো স্কার্ফ gracefully গলায় জড়িয়ে শান্ত ও সাবলীল ভঙ্গিতে নিচে নামল সে।
নিচে ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যস্ত ছিলো তার ভাবি মারিয়া। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে আলতো করে ভাবিকে জড়িয়ে ধরে মৃদু স্বরে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

– আসসালামু আলাইকুম, ভাবি।
মারিয়া স্নিগ্ধ হেসে ইনায়ার হাত ধরে নিজের মুখের সামনে এনে আদুরে কণ্ঠে বললেন,
– ওয়ালাইকুম আসসালাম, আমার আদরের ননদিনী।
ইনায়া হালকা হাসি মুখে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে, যেন কারও খোঁজ করছে।
মারিয়াঃ কাকে খুঁজছো?
ইনায়াঃভাইয়াকে।
মারিয়াঃ তোমার ভাইয়া নেই, অফিসে কাজ আছে বলে সকালেই না খেয়ে বেরিয়ে গেছে।
ইনায়াঃকী বলো ভাবি, এতে তো ভাইয়ার শরীর খারাপ করবে?”
মারিয়াঃ কী আর বলবো, তোমার ভাইয়া তো আমার কথাই শোনে না-সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ।
ইনায়াঃ আচ্ছা, তুমি ভাইয়ার খাবারটা প্যাক করে দাও, আমি অফিসে গিয়ে দিয়ে আসবো।

ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে বড় কোম্পানি ‘Vertex Dynamics’-এর অফিসটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এক বিশাল ভবন, যার কাঁচের দেয়ালগুলোতে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা সূর্যের আলো খেলে যায়।
ভবনের ভেতরে রয়েছে প্রশস্ত লবির ঝকঝকে মার্বেল ফ্লোর, উঁচু ছাদে ঝুলছে দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি, আর চারপাশে ছড়িয়ে আছে সবুজ ইনডোর প্ল্যান্ট।প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে ওপেন-স্পেস ওয়ার্কস্টেশন, অত্যাধুনিক কনফারেন্স রুম, আর কর্মীদের জন্য আরামদায়ক ক্যাফেটেরিয়া ও বিশ্রামঘর-সব মিলিয়ে প্রযুক্তি আর নান্দনিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ।এই কোম্পানির ওনার হলেন রিচার্ড অ্যাসফোর্ড।তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত বিজনেসম্যান।

Vertex Dynamics-এর সামনে কালো রঙের রোলস্-রয়েসটি এসে থামতেই, দরজা খুলে বেরিয়ে এল এরিক। তার মুখে তীব্র রাগের ছাপ-চোখে রাগের ঝলক, ভ্রু কুঁচকে আছে। কোনো দিকে না তাকিয়ে সে দ্রুত পা ফেলে কোম্পানির ভেতরে ঢুকে পড়ে।
কোম্পানির নারী কর্মীরা তাকে দেখে মুগ্ধতায় মুখর, কিন্তু আজ এরিকের চোখে কারও জন্য কোনো অনুভূতি নেই।
সে সোজা এগিয়ে গিয়ে সিক্রেটারির কলার চেপে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে, “Where is Dad?”
এরিকের আচমকা আগ্রাসী আচরণে সিক্রেটারি ভয়ে কেঁপে ওঠে, কাঁপা হাতে আঙুল তুলে মিটিং রুমের দিক দেখিয়ে দেয়।
ঘটনাটা যেন মুহূর্তেই ঘরের বাতাস ভারী করে তোলে-সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে।

মিস্টার রিচার্ড বড় বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করছিলেন, হঠাৎ এরিক দরজাটা ঠেলে ঢোকে, মুখে কোনো অনুভূতির ছাপ নেই-চোখে কেবল কঠিন, নির্লিপ্ত দৃষ্টি।
সে কোনো ভণিতা না করেই সোজা রিচার্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ”
“ড্যাড, লেট্‌স কাট দ্য ক্র্যাপ। আই নিড ইয়োর অ্যাটেনশন, রাইট নাউ।”
” থিজ ক্লাউনস ক্যান ওয়েট,”-তার কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই রয়েছে এক ধরনের কর্তৃত্ব।
রুমের সবাই থমকে যায়, মিস্টার রিচার্ডের মুখ শক্ত হয়ে ওঠে।
তিনি গম্ভীর কন্ঠে বলেন,

“এরিক, দিস ইজ মাই মিটিং। শো সাম রিসপেক্ট, অর গেট আউট।”
এরিক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চেয়ারটা টেনে বসে, চোখে চোখ রেখে বলে,
“রিসপেক্ট ইজ আর্ন্ড, ড্যাড। নট ডিম্যান্ডেড। সো, আর ইউ লিসনিং নাও, অর শুড আই মেইক আ সিন?”
রিচার্ডঃ “আর ইউ থ্রেটেনিং মি?”
এরিকঃ “আই ডোন্ট মেক থ্রেটস, ড্যাড। আই মেক প্রোমিসেস।”
রিচার্ড এরিকের মুখে এই ধরনের ম্যানার্সলেস কথা শুনে রেগে যাই ,
“ইউ আর ক্রসিং আ লাইন, এরিক। ডোন্ট টেস্ট মি।”
এরিক কাঁধ ঝাঁকিয়ে একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে,
“লাইন্স আর ফর পিপল হু ফলো রুলস। অ্যাণ্ড ইউ নো আই নেভার ডিড।”
এরিক সবার দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে কেবল এক ইশারায় পুরো ঘর খালি করে দিল।
ঘর নিস্তব্ধ হতেই, এরিক মিস্টার অ্যাসফোর্ডেকে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“হুয়াই আর ইউ ব্লকিং মাই ফাকিং অ্যাকাউন্ট,ড্যাড?”
রিচার্ডঃ আমার টাকা কোন ফালতু কাজে ওয়েস্ট করার জন্য না,এরিক ?
এরিক এক ভ্রু নাচিয়ে ঠোঁট কামড়ে ফ্লার্টি টোনে বলে উঠলো,
“তুমি মরে গেলে তো সব টাকাই আমার, So my money, my rules.”
রিচার্ড(রেগে গিয়ে): “কী খাইয়ে যে তোর মতো এক অভদ্র ছেলেকে জন্ম দিয়েছি! যার আচরণে বিন্দুমাত্র ভদ্রতা নেই, এমনকি নিজের বাপকেও রেসপেক্ট করতে জানিস না।”
“এরিক ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল,
“Respect? I don’t give a damn. নিতে চাইলে, নিজেই নিয়ে নাও।”
এরিক এবার চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করল, ঠোঁটে চেপে রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,

“Do you have a lighter?”
রিচার্ড কটাক্ষ করে বলল,
“নির্লজ্জ ছেলে, বাপের সামনে সিগারেট খাচ্ছো আবার লাইটার চাচ্ছ।”
এরিক নির্লিপ্তভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল,
“Whatever, বললেই তো হয় দিবে না।”
তারপর এক ঝলক সেক্রেটারির দিকে তাকিয়ে ইশারা করল কাছে আসতে।সেক্রেটারি কাছে আসতেই এরিক গম্ভীর স্বরে বলল,

“Give a lighter.”
ভয়ে ভয়ে লাইটার এগিয়ে দিল সেক্রেটারি।
এরিক লাইটার নিয়ে, রিচার্ডের সামনে সিগারেটে আগুন জ্বালালো।
দুইবার টান দিয়ে ধোঁয়া ছুড়ে দিয়ে বলল,
“পাঁচ মিনিটের মধ্যে যেন আমার অ্যাকাউন্ট আনলক হয়। আই রিপিট, ওয়ানলি ফাইভ মিনিটস।”
বলেই সে হনহন করে বেরিয়ে চলল।

এরিক অফিস থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। লিফটের বোতাম টিপতেই ভিতরে এক তরুণীকে দেখতে পেল। মেয়েটি তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। এরিক জিভ দিয়ে গাল ছুঁয়ে একবার মেয়েটিকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিলো। তারপর ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি নিয়ে লিফটের ভিতরে প্রবেশ করল।লিফটের দরজা বন্ধ হতেই নিস্তব্ধতা নেমে এলো।মেয়েটি তখনো এরিকের দিকে তাকিয়ে ছিল। এরিক মেয়েটির দৃষ্টি অনুভব করে হালকা হাসল,
“হেই গার্ল, Am I good-looking?”
মেয়েটি উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো।
এরিকঃ Really!
মেয়েটিঃ Hmm…
এরিক ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হেসে বললো,
Then,try me…
এরিকের এই কথাটি বলার সাথে সাথে মেয়েটি হঠাৎ ঝড়ের মতো এরিকের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
এরিক বাঁকা হেসে বললো,
“ইউ আর সো ওয়াইল্ড! বাট আই লাইক ইট!”
তার পরমুহূর্তেই সে মেয়েটির ওষ্ঠে ডুবে গেল-প্রথমে আলতো, তারপর ধীরে ধীরে গভীর, আবেগে ভরা চুম্বনে রূপ নিল তাদের মিলন।
লিফটের নীরবতায় দুইজনের শুধু হৃদস্পন্দন আর শ্বাসের গতি- শুনা যাচ্ছিলো।

ইনায়া কোম্পানির সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে সে মনোযোগ দিয়ে ধীর পায়ে ভিতরে প্রবেশ করল। প্রবেশ করতেই সবাই তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অফিসের মেয়ে স্টাফরা তার ড্রেসিং সেন্স নিয়ে মুখ টিপে হাসাহাসি করছিলো। ইনায়া এসব কিছু পাওা না দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রিসেপশনিস্টের কাছে এগিয়ে গেলো।
ইনায়াঃ এক্সকিউজ মি!
রিসেপশনিস্টঃ ইয়েস্।
ইনায়াঃ মিস্টার তানভীর শেখ কোন ফ্লোরে আছেন?
রিসেপশনিস্টঃ থার্ড ফ্লোরে ম্যাম।
ইনায়াঃ thanks

ইনায়া ধীরে পায়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। লিফটের সামনে দাঁড়াতেই দরজাটি নীরবে খুলে গেল। ঠিক তখনই, তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেইদিনের মতোই কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। দৃশ্যটা দেখে ইনায়া বিস্ময়ে ও বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠল,
– “ছিঃ ছিঃ, আস্তাগফিরুল্লা! আপনি লিফটের মধ্যেও এসব শুরু করে দিয়েছেন!”
এরিক একটা পরিচিত মেয়েলি কণ্ঠ শুনে মেয়েটিকে ছেড়ে সামনে তাকাল। ইনায়াকে দেখে তার মুখ কালো হয়ে গেল। সে রেগে বলল,

– “You, again! তোমার সমস্যাটা কী? কেন সবসময় আমার ইন্টিমেট মুহূর্তে এসে মুডটা নষ্ট করো?”
ইনায়া (ঠাণ্ডা গলায়):
আপনি এতটা বেহায়া কেন? যেখানে-সেখানে এসব করতে আপনার বাধে না? আস্তাগফিরুল্লা!
এরিক (হতবাক হয়ে):
এক মিনিট, এই ‘আস্তাগফিরুল্লা’ আবার কী? তুমি কি আমাকে তোমার ভাষায় অপমান করছো?
ইনায়া (দৃঢ় কন্ঠে):
সবাইকে আপনার মতো ভাববেন না। আপনি যা করছিলেন, তা দেখে আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছি-আপনাকে গালি দিইনি।
এরিক (উত্তেজিত হয়ে):
কী অদ্ভুত শব্দ! যাইহোক, বেবিগার্ল, তুমি আমার মুড নষ্ট করেছো, এর শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে!
ইনায়া (রাগে):

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩

বললেই হলো? লজ্জা করে না? অন্যের কোম্পানিতে এসে এমন কাজ করছেন!
এরিক (গর্জে উঠে):
ইউ স্টুপিড গার্ল! এটা আমার কোম্পানি, বুঝেছো?
মেয়েটি (কৌতূহলে):
বেবি, মেয়েটি কে? তোমার সাথে এমনভাবে কথা বলছে কেন?
এরিক (উপেক্ষা করে):
লিভ হার , বেবি!তুমি শুধু আমার দিকে মনোযোগ দাও।
বলে এরিক মেয়েটির কোমর জরিয়ে ইনায়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,
লেট্‌স ডিসঅ্যাপিয়ার ইনটু অ্যা নাইট অফ প্যাশন -জাস্ট ইউ অ্যান্ড মি, নো ওয়ান এল্‌স,বেইবি।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৫