অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৫
নুরিয়া ইসলাম
সকল ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসরুমে বসে আছে, চারপাশ হালকা গুঞ্জনে ভরে উঠেছে । ক্লাস শুরু হতে এখনও মিনিট দশেক বাকি। অলিভিয়া আর তার ফ্যাশন-সচেতন বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করেছে আর নতুন করে ইনায়াকে অপমান করার ছক আঁকছে। কথা বলার ফাঁকে তারা সামনে তাকিয়ে দেখে, দরজা দিয়ে ইনায়া ঢুকছে।আজ তার গায়ে মার্জিত পারপেল লং আবায়া, সাথে হালকা ধূসর হিজাব। এই সাদামাটা সাজে ইনায়াকে আরও শান্ত, পরিপাটি আর আত্মবিশ্বাসী লাগছে। তার এই সাবলীল -সৌন্দর্য নিঃশব্দে সবার চোখে পড়ে।
অলিভিয়া ও তার বন্ধুরা ইনায়ার এই সাধারণ অথচ অনন্য সাজ দেখে নাক সিটকায়।তাদের কাছে সৌন্দর্য মানে বাহারি পোশাক, দামি ব্র্যান্ড আর ঝলমলে সাজ। মনের সৌন্দর্য, বিনয় কিংবা ব্যক্তিত্বের ঔজ্জ্বল্য তাদের কাছে তুচ্ছ।
ইনায়া প্রতিদিনের মতো লাস্ট বেঞ্চে যেতে চাইলেও আজ সেখানে দু’একজন মেয়ে বসে থাকায় তাকে বাধ্য হয়ে সামনের বেঞ্চে বসতে হয়। ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, ম্যাডাম নিজের মতো পড়াচ্ছেন। এদিকে অলিভিয়া পেছনের এক মেয়েকে চোখের ইশারায় কিছু নির্দেশ দেয়। মেয়েটি ব্যাগ থেকে একটা বড় কাগজ বের করে, তাতে মোটা অক্ষরে লেখা-“Book me for a night!” নিঃশব্দে, সাবধানে, সেই কাগজে আঠা লাগিয়ে ইনায়ার পিঠে সেঁটে দেয়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ম্যাডাম ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার পর, ইনায়া চুপচাপ ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে আসে। তার পা ফ্লোরে পড়ার সাথে সাথেই পেছনে শুরু হয় হাসির ঝড়-কেউ ফিসফিস করে, কেউ আবার জোরে বলে ওঠে,
“এক রাতের দাম কত?” বিদ্রুপে ভরা সেই শব্দগুলো যেন চারদিক থেকে ইনায়াকে ঘিরে ফেলে। সে বিভ্রান্ত কেন সবাই এমন কথা বলছে, কিছুতেই বুঝতে পারছে না। মাথা ঝিমঝিম করছে তার , সবার এই বিদ্রুপে কোন রকম পাওা না দিয়ে সে সামনে এগিয়ে যায়।কখন যে সে বাস্কেটবল কোর্টে চলে এসেছে, নিজেও টের পায়নি।
ওদিকে এরিক আর তার বন্ধুরা খেলায় ব্যস্ত। হঠাৎ এরিকের চোখ পড়ে ইনায়ার দিকে। তখনি তার মস্তিষ্কে সেই পুরনো অপমানের দৃশ্য-সবার সামনে ইনায়ার থাপ্পড়,তার চোখে ভেসে ওঠে। রাগে-ক্ষোভে, সে বলটা শক্ত করে চেপে ধরে, ইনায়ার দিকে নিশানা করে ছুঁড়ে মারে। মুহূর্তেই বলটা গিয়ে লাগে ইনায়ার নাকে। তীব্র ব্যথায় সে কুঁকড়ে ওঠে, নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। আর এক মুহূর্তও সেইখানে দাঁড়ায় না। দৌড়ে চলে যায় ওয়াশরুমে।
ওয়াশরুমের আয়নায় নিজেকে দেখে ইনায়া ভেঙে পড়ে। রক্তে ভেজা রুমাল চেপে ধরে, নিঃশব্দে কান্না করতে থাকে। চারপাশের নিস্তব্ধতায় শুধু তার নিঃশ্বাস আর কান্নার শব্দ ভেসে উঠে । ঠিক তখনই, পেছন থেকে ভেসে আসে এক ঠান্ডা, মেয়েলী কণ্ঠ-
“Is that your favorite place?”
মেয়েটি সামনে এসে দাঁড়াতেই ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে থাকে,ফর্সা বর্ণ, পরনে হালকা নীল ক্রপ টপ আর ফিটিং জিন্স, খোলা চুল, হাতে ছোট স্লিং ব্যাগ, পায়ে সাদা স্নিকার্স। মেয়েটি ইনায়ার চোখে চোখ রেখে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
“তুমি জানতে চাও কেন তারা তোমার সাথে এমন আচরণ করে?”
ইনায়া কেবল মাথা নাড়ে। মেয়েটি হালকা হাসে,
“তুমি এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছ শুধুমাত্র আমাদের মিডিয়ার জন্য।”
ইনায়া বিস্মিত হয়ে মেয়েটির কথা শুনতে থাকে।
মেয়েটি এক পলক ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আবার বলে,
“আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো তোমাদের সম্পর্কে ভয়াবহ সব গল্প ছড়ায়। প্রতিদিন খবরের কাগজে, টিভিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তোমাদের টেরোরিস্ট হিসেবে দেখানো হয়। এ কারণেই এই ইউনিভার্সিটির অনেকেই ভাবে, তুমি তাদের ক্ষতি করতে এসেছো।তুমি নাকি টেরোরিস্টদের দলে।”
ইনায়া শান্ত গলায় বলে ওঠে,
“প্রথমত, সব ধর্মেই ভালো-খারাপ মানুষ আছে। আমি যদি কোনো ভুল করি, তার দায় আমার-আমার ধর্মের নয়। পৃথিবীর কোনো ধর্মই খারাপ কিছু শেখায় না। আমি জানি না কেন পশ্চিমা মিডিয়াগুলো ইসলামকে এত খারাপভাবে তুলে ধরে। হয়তো তারা শুধু সেই অংশটাই দেখায়, যেটা তাদের কাজে লাগে। প্রতিটি মুদ্রার দুইটা পিঠ থাকে। তারা কেন ইসলামের ভালো দিকগুলো আড়াল করে রাখে, জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি যদি কোনো অন্যায় করি, তার দায় আমার, ধর্মের নয়।
USC লাইব্রেরি,
ইনায়া ডেস্কে বসে ছিল, হাতে ‘রিয়াদুস সালিহীন’-এর ইংরেজি অনুবাদ, বইটা এক কোণায় রাখা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে হাদিসের পাতায় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। USC-তে সে Central Science-এ পড়ছে, আর লাইব্রেরিতে পার্ট-টাইম কাজ করে। চারপাশে নীরবতা বিরাজ করছে , শুধু কীবোর্ডের টিপটিপ শব্দ।
হঠাৎ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে এরিক। তার গায়ে ব্র্যান্ডেড কালো শার্ট, উপরে হালকা ফিটিং প্রিমিয়াম ব্লেজার, পরনে ক্লিন ডার্ক ব্লু ডিজাইনার জিন্স। পায়ে সাদা দামি স্নিকার্স, হাতে মিনিমাল সিলভার ব্রেসলেট আর ঘড়ি, আরেক হাতে কালো কফির কাপ। চুল নিখুঁতভাবে সেট করা, চোখ দুটো একেবারে অনুভূতিহীন-ঠান্ডা, গভীর।
ইনায়ার মনোযোগ তখনও কাজে। কিন্তু এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর তার কানে বাজে-
এরিকঃ “তুমি! এখানে কী করছো?”
ইনায়া ধীরে চোখ তুলে তাকায়, দেখে এরিক তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
ইনায়া নির্লিপ্ত স্বরে জানায়,
“আমি পার্ট-টাইমার হিসেবে এখানে জয়েন করেছি।”
এরিক হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
“Interesting. Didn’t think I’d see you here.”
ইনায়া কোনো গুরুত্ব দেয় না, আবার কাজে মন দেয়।
এরিকের একদমই সহ্য হয় না, যখন কেউ তার কথা উপেক্ষা করে।
তার অহংকারে যেন আচড় পড়ে, বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করে ওঠে।
চোয়াল শক্ত করে, ঠোঁট কামড়ে সে ধীরে ধীরে বলে উঠে-
লেটস সি হাউ লং ইউ লাস্ট,বেবিগার্ল। ”
ইনায়া কোমল স্বরে বলে উঠে,
“আপনি কী এখানে আমাকে থ্রেট দিতে এসেছেন?”
এরিক একটু হেসে, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
“নোপ, একদমই না।
আমি এইখানে কিছু বই নিতে এসেছি। Like dark romance? I’m bored out of my damn mind.”
ইনায়া হালকা চমকে উঠে,
“ডার্ক রোম্যান্স? I didn’t expect someone to ask that here!”
ইনায়ার কথা শুনেএরিকের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে,
“Yeah? What’d you expect me to ask for-Shakespeare?”
ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে, খোঁচা দিয়ে বলে উঠে,
“Sorry, আমারি বোঝা উচিত ছিল।আপনি কখনো ভালো কিছু চাইতেই পারেন না। ডান সাইডের বুকশেলফের কাছে যান, আপনার পছন্দের বই পেয়ে যাবেন।”
এরিক ইনায়ার দিকে এক গা-জ্বালানো, মকিং হাসি ছুঁড়ে বুকশেলফের দিকে এগিয়ে যায়।
সে নিজের মতো করে কিছু ডার্ক রোম্যান্স-‘The Dark Side’, ‘Twisted Love’, ‘Corrupt’, ‘Ruthless People’, ‘Den of Vipers’, ‘Hunting Adeline’-এইসব বই তুলে আনে, ইনায়ার সামনে রাখে।
এরিক হান্টিং অ্যাডেলিন বইটা তুলে, ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে,
এইটা নাও, ‘হান্টিং অ্যাডেলিন’।তবে সাবধান, তোমার মতো ইনোসেন্টদের জন্য এই বইটা একটু বেশি ডার্ক হতে পারে, কিন্তু একবার শুরু করলে… থামতে পারবে না। ডার্ক রোম্যান্সের আসল স্বাদ পেতে চাইলে, আমাকেই গাইড হিসেবে রাখতে পারো।”
“এই বইগুলোতে, ভিলেন যেভাবে হিরোইনকে Pl3z4r দেয়… I like that. ঠিক সেইরকম intense, raw, unstoppable vibe… সেটা তোমারও পছন্দ হবে, বেবিগার্ল। ”
ইনায়া বইটা পাশের চেয়ারে ছুঁড়ে ফেলে চোখে মুখে তার বিরক্তি ফুটে উঠে,
“ছিঃ! তুমি…সবসময় এমনভাবে কথা বলো কেন?”
এরিক ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে, গলার স্বর একটু নিচু করে বলে,
“সবসময় তো আর সোজা পথে হাঁটা যায় না, বেবিগার্ল। আর তোমার এই ইনোসেন্ট রিঅ্যাকশন-এইটাই তো আমাকে আরও টিজ করতে বাধ্য করে। Admit it, তুমি একটু হলেও curious হয়েছো… But trust me, এই বইটা পড়লে তোমার ভিউ বদলে যাবে।”
এরিকের মুখে এমন নির্লজ্জ কথা শুনে ইনায়া মুহূর্তেই থমকে যায়। মনে মনে অবাক হয়ে ভাবে-একজন মানুষ কতটা বেপরোয়া, কতটা অসভ্য হতে পারে, সেটা এরিক অ্যাডফোর্ডকে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।
এরিক বইগুলো হাতে নিয়ে লাইব্রেরির কোণার টেবিলে গিয়ে বসে। একটা বই খুলে পড়তেই তার চোখ আটকে যায় ভাষার গভীরতা, অনুভূতির তীব্রতা, চরিত্রগুলোর টানাপোড়েন যেন তার ভেতরের সবকিছু নাড়িয়ে দেয়। মুহুর্তেই সে উওেজিত হয়ে পড়ে।বইয়ের প্রতি পাতায়, শব্দের ভেতর সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে; নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে, আঙুল দিয়ে বইয়ের কোণ চেপে ধরে, যেন শব্দগুলো তাকে জড়িয়ে ধরছে।
কফির কাপটা সরিয়ে দিয়ে, সে পুরোপুরি বইয়ের জগতে ডুবে যায়।
এই সময়, ইনায়া বই সাজাতে সাজাতে হঠাৎ লক্ষ্য করে এরিকের চোখ বইয়ের পাতায় নেই, যেন অন্য কোনো জগতে। মুখে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলে ওঠে,
“ছিঃ! এটা লাইব্রেরি… behave yourself।”
এরিক চমকে ওঠে, বইটা বন্ধ করে হাসার চেষ্টা করে বলে,
“Didn’t realize the story would hit that hard!”
ইনায়া চোখ ঘুরিয়ে চলে যায়, কিন্তু মনে মনে ভাবে,
“আসতাগফিরুল্লাহ, এই ছেলে একেবারে সীমা না জেনে বসে আছে…
সন্ধ্যা নামতেই দ্য ক্যালিফোর্নিয়া ক্লাবের ঝলমলে আলোয় একে একে ভিড় জমায় শহরের বড়লোক পরিবারের বিগড়ে যাওয়া তরুণ-তরুণীরা। দিনের বেলায় ক্লাবটা যতটা নিস্তব্ধ, রাতের বেলায় ঠিক ততটাই জমজমাট-ডেস্কের ওপর সারি সারি দামি হুইস্কি, স্কচ, টেকিলা, কনিয়াক, আর প্রিমিয়াম ওয়াইন যেন অপেক্ষায় থাকে নতুন গল্পের। সবার নজর কাড়ে সেই বিখ্যাত The Macallan Lalique 55 Year Old Single Malt Scotch Whisky, যার দাম শুনলে অনেকেরই মাথা ঘুরে যায়।
ইউনিভার্সিটি শেষে এরিক আর তার বন্ধুরা প্রায়ই এখানে আড্ডা জমায়। আজও বার ট্যান্ডারের সামনে বসে গ্লাসে গ্লাসে ড্রিঙ্কস আর হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠেছে তারা। এরিক হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে,
“শালা, প্রতিদিন এই মদ, মেয়ে… সব কিছুই এখন বড্ড বোরিং লাগে। Satisfaction feel করতে লাইফে নতুন কিছু দরকার।”
এ্যারেন চোখে একরাশ দুষ্টু হাসি নিয়ে বলে,
“তাহলে চল, ইন্টারেস্টিং কিছু করি।”
এরিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কী করতে বলছিস?”
এ্যারেন একটু বাঁকা হাসি দিয়ে বলে,
“আমাদের ক্লাসের সেই ব্যাকডেটেড মেয়েটা-ইনায়া।”
এরিক বিরক্ত হয়ে বলে,
“তাকে দিয়ে আমি কী করবো?”
এ্যারেন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
“কেন, তার সাথে প্রেম করবি?”
এরিক হেসে ফেলে,
“তোর মাথা খারাপ হয়েছে নাকি? ওই ব্যাকডেটেড মেয়েটার সাথে আমি প্রেম করবো! সি ইজ নট মাই টাইপ।”
এ্যারেন ধৈর্য ধরে বলে,
“রিল্যাক্স, প্রেম করতে কে বলেছে? তুই শুধু মেয়েটাকে নিজের প্রেমের জালে ফাঁসাবি। ভাব, এটাই তো থাপ্পড়ের বদলা নেওয়ার পারফেক্ট সুযোগ।”
এ্যালেক্স একটু চিন্তিত হয়ে বলে,
“আমার মনে হয় না মেয়েটা ফাঁসবে। সে মুসলিম, মুসলিম মেয়েরা সহজে ছেলেদের কাছে ঘেঁষতে দেয় না। এই চ্যালেঞ্জটা নিলে হেরে যাবি।”
এরিক গ্লাসটা হাতে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে,
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৪
“এরিক অ্যাসফোর্ড আজ পর্যন্ত কোনো চ্যালেঞ্জে হারেনি, এটাতেও হারবো না। ওই মেয়েকে যদি আমার পেছনে না ঘুরিয়েছি, তো আমার নামই এরিক অ্যাসফোর্ড না। আমায় সবার সামনে থাপ্পড় মেরেছিলো না? এবার ওকে এমনভাবে আমার প্রেমের জালে ফাঁসাবো, যে ও নিজেই পুরো ক্যাম্পাসের সামনে দাঁড়িয়ে বলবে-‘আমি এই এরিক অ্যাসফোর্ডকে ভালোবাসি!'”
