যাত্রাপথ পর্ব ৬৫
মাশফিত্রা মিমুই
বাড়িতে নতুন অতিথি আগমনের আজ সপ্তম দিন। আকিকার জন্য উঠোনের জলপাই গাছে মোটাসোটা একটি খাসি বেঁধে রাখা হয়েছে। ঘাসের উপরে পিঁড়ি পেতে বসে ধারালো ছুরি ধার দিচ্ছে কসাই। একটু পরেই খাসিটাকে জবাই করে রান্নার উপযোগী করে তোলা হবে। পাশের জমিতে প্যান্ডেল করে তার নিচে অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পারুল বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে নাতনির গায়ে সরিষার তেল মাখাচ্ছেন। কিছুক্ষণ আগেই তাকে গোসল করানো হয়েছে।
“বেলী ফুলরে তেল মালিশ করতাছি যাতে ঠান্ডা না লাগে। আরাম লাগতাছে না, বোইনে?” হেসে বললেন তিনি।
বেলী কিছু বুঝলো বলে মনে হলো না। তবে দাদীর ঠোঁট নাড়ানো আর হাসি দেখে দন্তহীন মাড়ি বের করে সেও হেসে দিলো। শাশুড়ির উদ্দেশ্যে পারুল বললেন, “দেখছেন আম্মা, পাকনি বুড়ি কেমনে হাসে?”
সৈয়দুন নেছা প্রত্যুত্তরে মাথা নাড়িয়ে লেপ্টে যাওয়া নজর ফোঁটা ঠিক করে দিলেন। কিছু একটা মনে পড়তেই ডেকে বললেন,“মিছরি বু, ভাত খাইছোস? খাওয়া শেষ হইলে আমার ঘরে আইয়িস তো একটু।”
মিছরি সাড়া দিলো না। উত্তরের অপেক্ষাও অবশ্য বৃদ্ধা করলেন না। সে যে শুনেছে তিনি জানেন। এবার পুত্রবধূর উদ্দেশ্যে বললেন,“মাইয়ার মিহিও একটু নজর দেও, বউ। শুকাইয়া কী হইছে দেখছো?”
পারুল মুখ ভার করে বললেন,“ওয় কথা হুনে না, আম্মা। জোর কইরা খাওয়াইয়া না দিলে খাওনের ধারের কাছেও আইবো না।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কী আর করবা? জোর করা ছাড়া উপায় নাই।”
দুপুরের দিকে বাড়িতে অতিথিরা এসে উপস্থিত হলো। আকিকার পশু জবাই শেষে রান্নাবান্না হলো, খাওয়া- দাওয়া হলো। এক সপ্তাহ পর নাজিরও শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলো নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। ভাইরা ভাইদের সঙ্গে গল্প শেষে স্ত্রীর ঘরে এসে বিছানায় বসলো সে।
মিছরি এতক্ষণ দাদীর ঘরে বসে ছিল। দুপুরের খাবার ওখানে বসেই খেয়েছে। বড়ো ভাবির মুখে স্বামীর আগমনি সংবাদ শুনে ছুটে এলো ঘরে। তবে আজ আর জড়িয়ে ধরলো না, কাছেও ঘেঁষলো না। মুখ ফিরিয়ে খাটের শেষ মাথায় গিয়ে বসলো।
“দূরে বসলা ক্যান? ফাহমিদারে দেখলাম খাওয়ার সময়ও জামাইরে কাছ ছাড়া করে না। শিখতে পারো না কিছু?” বিদ্রুপ করে বললো নাজির।
মিছরিও ত্যাছড়া স্বরে বললো,“শিখতে তো আপনিও পারেন। এক সপ্তাহ পর বউয়ের কথা মনে পড়ল? নাকি বউ যে আছে সেটাই ভুলে গিয়েছিলেন?”
নাজির বুঝলো স্ত্রীর অভিমান। দূরত্ব কমিয়ে নিলো। পেটে হাত রেখে বললো,“নড়াচড়া করে না?”
“আপনার মতো গাধা নাকি যে নড়াচড়া করবে?”
“তুই গাধা। পেটে থাকতেও নড়ে।”
“কথা বলবেন না। আব্বার কথায় এখানে এসেছেন, জানি না ভেবেছেন?”
“জানবাই তো, পাকনা যে।”
“কাপড় চোপড় গুছিয়ে রেখেছি। এখনি বের হবো? নাকি বিকেলে?”
“ক্যান, যাইবা কই?”
“থাকবেন এখানে?”
“না।”
“তাহলে আবোল তাবোল প্রশ্ন কেন? অবশ্যই স্বামীর বাড়ি যাবো।”
“এইখানেই থাহো, স্বামীর বাড়ি যাওয়ার দরকার নাই।”
“কেন?”
“এমনি।”
“মজা করছেন?”
“না।”
“তাহলে কেন?”
“পরিস্থিতি ভালা না।”
“আমি আপনার সাথেই থাকবো।”
“তোমারে কেউ জিগাইছে?”
“শালিকের কী হবে?”
“হেইডা হের জামাইয়ের চিন্তা। তোমার আমার না।”
বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো নাজির। যাওয়ার আগে বলে গেলো,“নিজের খেয়াল রাইখো। কোনো কিছুর প্রয়োজন হইলে জানাইয়ো, পাঠাইয়া দিমু। সময় মতন তোমারে আইয়া লইয়া যামু।”
তারপর পিছু ফিরে একবারের জন্যও তাকালো না সে। সেই যে পাষণ্ডের মতো চলে গেলো আর এমুখো হলো না।
বহুদিন পরের কথা। জৈষ্ঠ্য পেরিয়ে শেষ আষাঢ়ের অলস দিবস। ক’দিন আগে ফাহমিদাও একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছে হাসপাতালের বিছানায়। পলির মতো স্বাভাবিক প্রসব তার হয়নি। বেশ কষ্ট পোহাতে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে সোজা এসে বাপের বাড়ি উঠেছে। দাদী সেই বাচ্চাকে কোলে নিয়ে মিছরিকে বললেন,“এইডা মাইয়া হওয়ার মৌসুম নাকি রে, বু? তোরও মনে হয় মাইয়া হইবো।”
মিছরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। আজকাল সে কথা কম বলে, চলতে ফিরতে কষ্ট হয়। মাঝেমধ্যে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। দাদীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে,“মনে হয় আমি আর বাঁচবো না। পেটে কী যেন লাফায়, খুব ব্যথা করে। আমার বাচ্চাটার কী হবে, দাদী? ওর বাপটা কোথায় গেলো? আমার কিছু হয়ে গেলে তোমরা ওই লোককে ছাড়বে না।”
সৈয়দুন নেছা সেই মাঝরাতে উঠেই দোয়া সূরা পড়ে নাতনির পেটে তেল মালিশ করেন। মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন,“এত জামাই পাগল হইলে চলে না। ধৈর্য ধর, বু। ব্যাডায় যাইবো কই? পোলাপাইনের টানে হইলেও ঠিক আইয়া পড়ব। দোয়া কর আল্লাহর কাছে।”
সেই সান্ত্বনা কাজে লাগে না। সারারাত আর ঘুমাতে পারে না সে। বহুকাল বোধহয় হাসে না, কারো সঙ্গে মন খুলে কথা বলে না মেয়েটা। নাজিরও আসে না, দেখা দেয় না, অপেক্ষার প্রহর কিছুতেই শেষ হয় না। নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে মিছরির। তার তুলনায় শালিকের দিনকাল ভালোই কাটছে। সপ্তাহ খানেক আগে বিদেশ থেকে স্বামীর চিঠি এসেছে। তাতে সে মহাখুশি। যখন সময় পায় তখনি আড়ালে গিয়ে বুকে জড়িয়ে রাখে সেই চিঠি।
দুপুরে বাবা খেতে এলেন। মিছরি ছুটে গেলো তাঁর কাছে। লজ্জা শরমের মাথা খেয়েই জিজ্ঞেস করল, “উনার সঙ্গে দেখা হয়নি, আব্বা? কী বললেন?”
রোজ একই প্রশ্ন। আদরের কন্যাকে মিথ্যে বলতে কাশেম আলীর ভালো লাগে না। তৎক্ষণাৎ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“তুমি নাকি খাওয়ায় খুব অনিয়ম করো, আম্মাজান? এইগুলা কী ঠিক?”
“এখন আর করি না।”
“দুপুরে খাইছো কিছু?”
মা খাবার নিয়ে অনেকক্ষণ পিছুপিছু ঘুরেছে। তবুও সে খায়নি। সকালেও খাওয়ার পর বমি করেছে। তাই মিথ্যে বললো,“খেয়েছি, এবার বলো।”
“আবার মিছা কথা? তোমার সোয়ামি কিন্তু এসবের লাইগা খুব নারাজ। এই ধরো, তোমার লাইগা এইডা পাঠাইছে।” একটা থলে ধরিয়ে দিলেন মেয়ের হাতে।
থলে পেয়ে মিছরিকে ততটা খুশি হতে দেখা গেলো না। প্রত্যেক সপ্তাহেই তার জন্য ফলমূলসহ পছন্দ অপছন্দের খাবার পাঠায় লোকটা। তবে আজ সাথে পাঠিয়েছে সবুজ আর কমলা রঙের দুটো শাড়ি। মিছরি অধৈর্য হয়ে বললো,“পরবো না এই শাড়ি। তুমি তাকে আসতে বলো, আব্বা। এক গ্ৰামে থেকেও কেন আসতে পারে না? কী এমন ব্যস্ততা? আমি তার কাছে কোনো ধরণের বায়না করবো না, যেতেও চাইবো না। তাও আসুক। তুমি আনতে না পারলে আমি ছোটো ভাইজানকে বলবো।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কাশেম আলী। নাজিরকে তিনি বলেছিলেন, এখানে এসে কিছুদিন থাকতে। ছেলেটা রাজি হলো না। বাড়িতে আবার সম্পত্তি নিয়ে চাচাতো ভাইদের সাথে ঝামেলা চলছে। বাড়ি তার জন্য খুব একটা নিরাপদ নয়। কয়েকদিনের মধ্যে নাকি শালিস বসবে। তাই বললো,“ঝামেলা না মেটা পর্যন্ত ওরা বরং আমনেগো বাড়িতেই থাকুক। আমি নিজের বউ সন্তান লইয়া কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। এই সমস্ত ঝামেলা জটিলতায় ওগো থাকার দরকার নাই।”
কাশেম আলীও জোরাজুরি করেননি। তিনিও চান না তাঁর মেয়ে, ভাগ্নি এসবে জড়াক। মেয়েকে সত্য মিথ্যা মিলিয়ে আশ্বাস দিয়ে বললেন,“ব্যবসা, সম্পদ লইয়া সে একটু ব্যস্ত, আম্মাজান। কইছে, ঝামেলা মিটলে আইয়া তোমারে লইয়া যাইবো। তুমি তো আমার ভালা বোঝদার মাইয়া তাই না?”
মিছরিকে বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হলো কাশেম আলীর। শেষমেশ মেয়েটা বাবার কথা বিশ্বাস করে নিলো। খুশি মনে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘরে চলে গেলো। তারপর স্বামীর পাঠানো শাড়ি পরে বসে রইল।
উত্তর পাড়ার ভিটের জমিতে নতুন ঘর তোলার কাজ ধরেছে নাজির। সপ্তাহ খানেক আগে কর্পোরেশনের কিছু জমি বিক্রি করতে কাগজপত্র নিয়ে বসেছিল সামিউল। তাতেই যেন গড়মিল লেগে গেলো। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে ফের ছুটলো ভূমি অফিসে। বাবা জমি হস্তান্তর করেছে। কার নামে? নাজির আর নওশাদের নামে।
বাড়িতে চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলো। মর্জিনা ধমক দিয়ে বললেন,“চিল্লাস ক্যান, পাডা? মাছের বাজার পাইছোস? দুইদিন পরপর কাউয়ার মতন গলা উঁচা হইয়া যায়।”
মর্জিনার দিকে ফিরেও তাকালো না সামিউল। একই ভাবে চেঁচিয়ে ডাকলো,“নাজির! মাথামোথা কিন্তু খুব খারাপ। বাহির হ, হালার পুত।”
নাজির গোয়াল ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। কোরবানি ঈদে চড়া দামে তিনটা গরু বিক্রি করেছে। সাথে কম দামে কিনে এনেছে আরো একটি ষাঁড় গরু। মিল্টন, লতিফ এখন দুধ ধোয়াচ্ছে। তাদেরকে কাজ জারি রাখার নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে এলো সে,“সমস্যা কী? তোমার লগে আমার আর কোনো কথা নাই।”
“তা কইলে তো হইবো না। দুই ভাইয়ে মিল্যা আমার বাপের সম্পত্তি ভোগ দখল করার ফন্দি আঁটছোস? কার জমিতে ঘর তুলতাছোস?”
“মানে?”
তার দিকে কাগজ ছুঁড়ে দিলো সামিউল। নাজির তুলে নিলো সেসব। সম্পত্তি হস্তান্তরের খবর তার মানে জেনে গিয়েছে এই ছেলে। তাই নাজির আর লুকালো না। বললো,“দেখলাম, কী হইছে এতে?”
“যেই জমি আমার আব্বার আছিলো সেই জমি এহন তোর নামে কেমনে? সন্দেহবশত মেইন আফিসে গিয়া খোঁজ নিয়া দেহি আরো অনেক জমি নয়ছয় করা। এমনকি নওশাদের নামেও হইছে। কী এইসব?”
“হেইডা তোমার মরা বাপরে গিয়া জিগাও। আমার মাথা খাইয়ো না। নয়ছয় করার মতো মানুষ নাজির শাহ না। যদি তাই মনে হয় তাইলে প্রমাণ করো।”
“মেজাজ খারাপ করিস না, নাজির। আমার বাপের সম্পত্তির একটা মাটিও আমি ছাড়মু না।”
“যা ইচ্ছা করো গা। বিচার ডাক দিবা? দেও। আমি ডরাই না কাউরে।”
রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেলো সামিউল। ঝগড়া থেকে একপর্যায়ে হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম হলো। কিন্তু এবারেও মিল্টন, নাজমুল ছুটে এসে থামিয়ে দিলো তাদের। শেষে নাজিরের ফাঁদেই পা দিলো সামিউল। ডাক দিলো শালিসের। ছোটোখাটো পারিবারিক শালিস যাকে বলে।
সপ্তাহ দুয়েক তাকে ঘুরানোর পর আজ সময় করে চেয়ারম্যান, মেম্বার শাহ বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন। সাথে মিন্নত ব্যাপারি, দেলোয়ার, নজরুল আলম, কাশেম আলী এসেছেন। বর্তমানে আফাজ উদ্দিনকে এসবে দেখা যায় না। বৃদ্ধর বয়স বেড়েছে, পাশাপাশি রোগশোকে জর্জরিত। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। সাবেক চেয়ারম্যান আতাউরও আর সুস্থ হতে পারেননি। ক্ষতয় পচন ধরেছে। কত বড়ো বড়ো ডাক্তার যে দেখিয়েছেন! তবুও কাজ হচ্ছে না। পাপের ফল কী এত সহজে ফুরোয়?
চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান চেয়ারে বসে আছেন। মরহুম আকবর মিয়ার দুই পুত্রকে দেখে বেজায় খুশি হলেন। এই নির্বাচনে ভালোই সাহায্য করেছে তারা। কুশল বিনিময় করে বললেন,“আমনেরা আইয়া ভালাই করছেন। আমনের মাইয়া জামাই জানি কোনডা, কাশেম ভাই?”
কাশেম আলী আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজলেন। নাজির এসে উপস্থিত হলো সেখানে। দুনিয়াতে যাই হয়ে যাক, সে মানুষের সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকার ছেলে নয়। তাই সবাইকে সালাম দিয়ে কেদারা এনে নিজেও বসে পড়ল সামনে। কাশেম আলী দেখিয়ে বললেন,“এই যে এইডাই নাজির।”
নুরুজ্জামান হেসে বললেন,“হেরে তো আমি চিনি। তা কী হইছে, জামাই? হঠাৎ বাড়ির ভিতরে শালিস? শেষ এমন শালিস হইছিল ফতেহ চাচা মরার পর মনে হয়। ঠিক কইছি না, ভাই?”
নজরুল মাথা নাড়িয়ে বললেন,“আর কইয়ো না, নুরু। দুনিয়ার অবস্থা ভালা না। ভাই ভাইরে সম্পত্তির লাইগা মাইরা ফেলাইতাছে, পোলায় বাপ মারতাছে। এ তো চাচতো ভাই। যাই করো, সঠিক সিদ্ধান্ত নিবা কইয়া দিলাম। তুমি মানুষ ভালা দেইখাই কিন্তু তোমারে সমর্থন করছি।”
“আমনেরা চিন্তা কইরেন না। আমার কামই তো জনগণরে ন্যায় পাওয়াইয়া দেওয়া।”
মুমিনুল শাহ দূর থেকে তাদের হাসাহাসি করতে দেখে বিরক্ত হলেন। মনে মনে আতাউরকে ইচ্ছেমতো গালি দিলেন। মুখ বাঁকিয়ে ভাতিজার উদ্দেশ্যে বললেন, “লেড়ের শালিস ডাকছোস। দেখ, কেমনে হাইসা কথা কইতাছে। এই চেয়ারম্যান আমগো শত্রু পক্ষের। কিছুই ফালাইতে পারবা না।”
সামিউল কিছু বললো না। উপস্থিত হলো তাদের সামনে। শালিসের কার্যক্রম শুরু হলো। মেম্বার হাশেম বললেন,“শালিস যেহেতু তুমিই ডাকছো তাই তুমিই শুরু করো, সামিউল। কী ব্যাপার?”
সামিউল নরম স্বরে বিস্তারিত সব জানালো। সাথে এও বললো,“আমার আব্বা এমন করার মানুষ না। করলে আমি জানতাম, আব্বাস জানতো। আমি নিশ্চিত নাজিরে জালিয়াতি করছে।”
নাজির সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো,“দলিল আবার জালিয়াতি কেমনে করে? অত বড়ো বড়ো কর্মকর্তা টের পাইলো না?”
চেয়ারম্যান মাথা নাড়িয়ে বললেন,“জালিয়াতি করা অত সহজ না, সামিউল। করা গেলেও সাধারণ মাইনষের লগে করা যায়, বড়ো অফিসার গো লগে করা যায় না। তুমি ওইখানে কথা কও নাই? দলিলে তোমার আব্বার স্বাক্ষর আছে না? স্বাক্ষী হিসাবে কেডায় আছে?”
নীরবতা ঘিরে ধরলো সামিউলকে। সব খবরাখবর সে নিয়েছে। স্বাক্ষী হয়েছে বাবার বিশ্বস্ত ম্যানেজার। সেই লোকটার সাথেও কথা বলেছে সে।
নাজিরও বোকা নয়। দলিলের কয়েক কপি আগেই এনে রেখেছে। চেয়ারম্যান, মেম্বারদেরসহ উপস্থিত সবাইকে তা দেখলো। মুমিনুল শাহ সেসব দেখে খুব অবাক হলেন। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করাতে পারছেন না। আমিরুল শাহর আঙুলের ছাপ দলিলে জ্বলজ্বল করছে। নাজির কীভাবে করল এতকিছু? নুরুজ্জামান বললেন,“এইতো সব প্রমাণ। জমি ভোগ দখল হইলে না হয় শালিসে আমরা সমাধান কইরা দেই, কিন্তু আইনত সঠিকটারে কীভাবে বেঠিক বানাই কও তো? স্পষ্ট দেখা যাইতাছে, মরহুম আমিরুল শাহ তাঁর কিছু সম্পত্তি ভাতিজা নাজিরের নামে হস্তান্তর করছে। পরে মনে হয় সেইখান থাইক্যা অর্ধেক নাজির তার ভাইয়ের নামে দলিল করছে। তাই না, নাজির?”
নাজির মাথা নাড়ায়,“হ, মরার কয়দিন আগেই চাচা স্বাক্ষর করছিল। আমনে তারিখটা দেহেন। ব্যস্ততায় দলিল আনতে আমি যাইতে পারি নাই। তাই নওশাদ গেছিলো। ওয় তো এইসব আবার ভালা বুঝে।”
“নওশাদে কই?”
“ওয় দেশে নাই, বিদেশ গেছে গা। এইতো এইবার তিন মাস হইবো।”
“ভালা খবর। আমগো গেরামের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পোলায়।”
মুমিনুল দ্বিমত পোষণ করে বললেন,“ভাইজানরে যে ফুঁসলাইয়া ফাঁসলাইয়া দলিলে টিপসই নেওয়া হয় নাই তার কী প্রমাণ? কেউ কী এমনি এমনি কাউরে কিছু দেয়? তার উপরে নিজের পোলা রাইখা ভাতিজারে এত্তগুলা জমি!”
সব প্রশ্নের উত্তর যেন নাজিরের মাথায় আগে থেকেই তৈরি। তাই উত্তেজিত হলো না। কিছুটা খোঁচা মেরেই বললো,“এমনি এমনি দিছে কেডায় কইলো? বহু বছর আগের কথা, চেয়ারম্যান চাচা। আমার বাপ, দাদার ঘটনা তো জানেনই? দাদা মরার পর গেরামের মুরুব্বি আর সাবেক চেয়ারম্যান গো সাক্ষী রাইখা তিন ভাইয়ের মধ্যে সমান সমান সম্পদ ভাগ হইছিল। কিন্তু তার কয়েক মাস পর আব্বারে কেউ মারার চেষ্টা করল, আব্বাও বিছানা থাইক্যা আর উঠতে পারলো না। সেই সুযোগে বড়ো চাচায় আমার আব্বার সব সম্পদ নিজের নামে লেখাইয়া নিছিলো। এহনো প্রমাণ খুঁজলে ঠিক পাওয়া যাইবো। কোনো মানুষ নিজের পোলাগো রাইখা ভাইয়ের নামে এত সম্পদ লেইখা দেয়?”
উপস্থিত সকলে সহমত পোষণ করলেন। নাজির ফের বললো,“মরার আগে নাকি মাইনষে কিছু একটা আঁচ করতে পারে। ভিতরে অপরাধবোধ জাইগা ওঠে। বড়ো চাচার ক্ষেত্রেও মনে হয় তাই হইছিল। আমারে একদিন কাচারি ঘরে ডাকলো। ছুডো চাচারে জিগান, মাঝেমধ্যেই ডাকতো। তো হেইদিন ডাইকা কইলো, জোয়ানকালে কম অপরাধ তো করি নাই, নাজির। লোভে আর মাইনষের কানপড়ায় নিজের বাপের বুকে ছুরি চালাইছি, ভাইডার যৌবন সংসার কাইরা নিছি, তগোরে বঞ্চিত করছি। নিজেরে রক্ষার লাইগা দোষ চাপাইছি মাস্টর বাড়ির বুইড়ার নামে। এই পাপের ভার আর বইতে পারতাছি না, বাপ। মুমিনে কী করবো জানি না, তবে আমার থাইক্যা পাওনা তোর সব সম্পদ তুই লইয়া যা। তবুও আমারে মাফ কর।”
এই পর্যায়ে এসে মুমিনুল শাহ আশ্চর্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলেন। কী বলে এই ছেলে? কিছু বুঝতে পারছেন না তিনি। নাজিরের এসব জানার কথা নয়। আমিরুল শাহ কেন জানাতে যাবেন? তিনি তো আরো! বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন মুমিনুল শাহ। দ্বিগিদ্বিক ভুলে তেড়ে এসে বললেন,“মিছা কথা সব। নাজির কেচ্ছা বানাইয়া কইতাছে। এসব ভাইজানে ক্যান কইবো?”
“হেয় না কইলে আমি জানছি কেমনে? সবাই জানে, আমগো লগে মাস্টর বাড়ির একটা শত্রুতা আছিলো। ভুল বোঝাবুঝি আছিলো। এহন নাই ক্যান?”
শাহরিয়ার বাবাকে আটকে দিলো। ফিসফিস করে বললো,“সবাই দেখতাছে, আব্বা।”
মুমিনুল শাহ পিছু হটে ধপাস করে কেদারায় বসে পড়লেন। ভয়ে তাঁর ঘাম ছুটে গিয়েছে। কাশেম আলী অবাক হওয়ার ভান ধরে বললেন,“আমগো আব্বায় মাঝেমধ্যে কইতো, এইসব কিছু ফতেহ চাচার দুই পোলায় করছে। হাছাই নাকি? কী ভয়ংকর!”
নুরুজ্জামান গলা ঝাড়লেন,“পুরাইন্না কথা আপাতত বাদ দেই। আমার আবার একটু তাড়া আছে, কীয়ের নিবন্ধন কার্ডে নাকি স্বাক্ষর দিতে হইবো। তো শেষ কথা হইলো, দলিলে উল্লিখিত জমির মালিক বর্তমানে নাজির শাহ, নওশাদ শাহ। হেগো জমি হেরা যেমনে ইচ্ছা ভোগদখল করতে পারবো। তোমরা বাঁধা দিলে আইনের খেলাপ হইবো। তবে সন্দেহ থাকলে মামলা মোকদ্দমা করতে পারো। কিন্তু সেইখানেও সমস্যা। পুরাইন্না কাহিনী বাহির হইয়া আইতে পারে। তুমগোই ঝামেলা। তাই মিলমিশ কইরা থাকো। নিজেগো মাঝে কাইজ্জা ভালা না। আইজ তাইলে উঠি।” মরহুম আকবর মিয়ার দুই পুত্রের উদ্দেশ্যে এবার বললেন, “নজরুল ভাই, কাশেম ভাই দাওয়াত দিতাছেন কবে? অনেকদিন হয় ভাবিগো হাতে রান্ধা খাই না। বিবি তো খালি আইতে চায়।”
নজরুল আলম তাঁর সঙ্গে যেতে যেতে বললো,“কী কও, নুরু? তুমি নিজেগো মানুষ। আবার দাওয়াত লাগবো? যহন ইচ্ছা আমগো বোইনেরে লইয়া আইয়া পড়বা।”
নুরুজ্জামান হেসে দিলেন। কাশেম আলী তাদের পিছু যাওয়ার আগে জামাতাকে বলে গেলেন,“হুদাই কোনো ঝামেলায় জড়াইস না। মুখটারে একটু ক্ষান্ত দে।”
তারা অদৃশ্য হতেই উঠে দাঁড়ালো নাজির। ঘাড় চুলকে বললো,“তুমগো কিছু নেই নাই আমি। মাইনষের জিনিস কাইড়া নেওয়া আমার স্বভাবের বাহিরে। যা নিছি সব আমার। তা যেমনেই হোক না ক্যান। শিখছি তো তুমগো থাইক্যাই।”
সামিউল দাঁতে দাঁত পিষে হুমকি দিলো“আমিও দেখমু তুই কেমনে ওই জমি ভোগ করোস।”
নাজির সেকথায় পাত্তা না দিয়ে চেঁচিয়ে গান ধরলো,
যাত্রাপথ পর্ব ৬৪
‘আগুনের দিন শেষ হবে একদিন
ঝর্ণার সাথে গান হবে একদিন
এ পৃথিবী ছেড়ে চলো যাই
স্বপ্নের সিড়ি বেয়ে সীমাহীন
আগুনের দিন শেষ হবে একদিন
ঝর্ণার সাথে গান হবে একদিন।’
