অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২
রুপা
কারো রিনরিনে মিষ্টি হাসির আওয়াজে আর্যর পা জোড়া যেন মেঝেতে আটকে গেল। ভেতর থেকে কেউ একজন বারবার বলছে— এত সুন্দর হাসির মালিককে না দেখে চলে যাবে আর্য? সে ধীরপায়ে পেছন ফিরে এদিক-ওদিক তাকাতেই চোখ গেল বাগানের দিকে। সাদা ডেইজি ফুলের বাগানের পাশে বসে পুষ্প হাসছে। তার হাতে ছোট ছোট সাদা তুলতুলে দুটো খরগোশ। সে খরগোশ দুটোর সাথে আপনমনে কথা বলছে আর হাসছে। বাইরের দুনিয়ার দিকে তার যেন কোনো খেয়ালই নেই।
আর্য বেশ অবাক হলো। গত তিন মাসে সে এই মেয়ের মুখে একফোঁটা হাসিও দেখেনি। অবশ্য তার অবাক হওয়ার কারণও আছে; আর্য বেশ রাত করে বাড়ি ফেরে, তখন পুষ্প হয় ঘুমিয়ে থাকে, নয়তো ঘুমের ভান করে থাকে—যাতে আর্যর মুখোমুখি হতে না হয়।
সাদা সালোয়ার-কামিজ পরা পুষ্পর মায়াবী চেহারার দিকে আর্যর চোখ যেন আটকে গেছে। পরক্ষণেই সে বিরক্ত হয়ে চোখ সরিয়ে নিল। বিড়বিড় করে নিজেকে শাসাল—
– “আশ্চর্য! এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে কী?
আর্য, ভুলেও এই ভুল করিস না। মেয়েরা মায়াবিনী হয়; নিজের মায়ার জালে ফাঁসিয়ে শেষে একা ফেলে চলে যায় তুই নিজেই তার প্রমাণ।”
সে এবার গম্ভীর গলায় ডাক দিল—
– “এই মেয়ে!”
আর্যর আওয়াজ কানে আসতেই পুষ্পর হাসি মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই। সেখানে জায়গা করে নিল একরাশ ভীতি। সে খরগোশ দুটোকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কিছুটা পিছিয়ে গেল। আর্য অবাক হয়ে ভাবল— মেয়েটা তাকে দেখে এতটা ভয় পাচ্ছে কেন? সকালে চিৎকার করেছি ঠিক আছে, কিন্তু সে তো মেয়েটার নিজের দোষেই! তার জিনিসে হাত দিয়েছিল কেন? হঠাৎ আর্যর নজর গেল পুষ্পর কপালের ব্যান্ডেজের দিকে। সে ভ্রু কুঁচকে ভাবল— মাথায় আঘাত পেল কী করে? কাল তো এমন ছিল না! (নেশার কারণে গতরাতের কোনো স্মৃতিই আর্যর মনে নেই)।
মনের অজান্তেই সে জিজ্ঞেস করল—
– “মাথায় আঘাত পেলে কী করে?”
পুষ্পর মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না। বয়সই বা কত মেয়েটার? মাত্র ১৬! এই অল্প বয়সেই জীবন তাকে অনেক কিছু সহ্য করতে শিখিয়েছে। ছোটবেলা থেকে পাওয়া আঘাতগুলো তাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছে। সে সহজভাবে মিশতে পারে কেবল শেহনাজ আর সিমরানের সাথে; তাঁরা তাকে মা আর বোনের মতো আগলে রাখেন বলে হয়তো। এই বাড়ির বাকি সবার সামনে গেলেই পুষ্পর বুক দুরুদুরু করে, কথা আটকে যায় গলায়। ছোটবেলার সেই ট্রমা তাকে এখনো তাড়া করে বেড়ায়।
পুষ্পকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আর্য বিরক্ত হলো। রুক্ষ স্বরে বলল—
– “যেভাবেই আঘাত পাও, আমার তাতে কী! ভুলেও আমার সামনে আসবে না।”
কথাটা বলেই সে গটগট করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। আর্য চলে যেতেই পুষ্প একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার খরগোশ দুটোর নাম সে রেখেছে ‘তুলি’ আর ‘তুলতুল’। ওদের কচি কচি ঘাস খাইয়ে নিয়ে সে-ও ধীরপায়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
পুষ্প ভেতরে এসে সোজা সিমরানের রুমে চলে গেল। সিমরান কলেজ থেকে ফিরে মাত্রই গোসল করে বেরিয়েছে। পরনে তার কালো সালোয়ার-কামিজ, ভেজা চুল থেকে এখনো টপটপ করে পানি ঝরছে। পুষ্পকে দেখেই সিমরান চনমনে গলায় বলে উঠল—
– “কী হয়েছে রে পুষ্পরানি? মন খারাপ কেন? কেউ কিছু বলেছে তোকে?”
সিমরানের কথায় পুষ্প একবার চোখ তুলে তাকাল, পরক্ষণেই আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বলল—
– “আপু, আমার একদম ভালো লাগে না। তুমি কলেজে চলে যাও, ফুফুমণিও কোর্টে চলে যান। বাসায় কেউ থাকে না, আমার খুব একা লাগে। তুমি একটু তাড়াতাড়ি চলে আসতে পারো না?”
সিমরান হেসে বলল—
– “আমার পুষ্পরানি, ক্লাস শেষ না হলে আমি আসব কী করে বল? তার চেয়ে এক কাজ করা যাক, তোকেও কলেজে ভর্তি করিয়ে দিই। কী বলিস?”
পুষ্পর চোখ-মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে বলল—
– “না না আপু! এমনিতেই আমাকে নিয়ে এখানে অনেক সমস্যা। এখন যদি আমি কলেজে যাই, তবে ঝামেলার শেষ থাকবে না। উনি আবার রেগে ফুফুমণির সাথে তর্ক করবেন। আমি চাই না আমার জন্য অশান্তি হোক।”
পুষ্পর কথা শুনে সিমরান স্তব্ধ হয়ে গেল। এই ছোট মেয়েটা এত অল্প বয়সেই কত কিছু বুঝে গেছে! জীবন তাকে সময়ের আগেই বড় করে দিয়েছে। সিমরান মনে মনে ভাবল— ‘আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট হয়েও মেয়েটা কত পরিণত কথা বলে! হায় আল্লাহ, এই ফুলের মতো মেয়েটার জীবনে তুমি এত কাঁটা বিছিয়ে দিলে কেন?’
নিজেকে সামলে নিয়ে সিমরান বলল—
– “আচ্ছা সেসব বাদ দে। চল, আমরা ছাদে যাই। বেলিফুল ফুটেছে অনেক, সেগুলো দিয়ে মালা গাঁথব।”
পুষ্প মৃদু হেসে বলল—
– “আচ্ছা আপু, তুমি যাও। আমি দেখে আসি ওনার কিছু লাগবে কি না, তারপর আসছি।”
সিমরান কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল—
– “তোর ‘উনি’ তো তোকে দেখলেই রেগে আগুন হয়ে যান, তার পরও ওনার কী লাগবে সেটা দেখতে যাবি?”
পুষ্প নিচু গলায় বলল—
– “রাগারাগি তো করেন, মারেন তো না! ছোটবেলা থেকে এসব আমার অভ্যাস হয়ে গেছে আপু। ফুফুমণি বলেছেন ওনার সব প্রয়োজনীয় জিনিস যেন আমি এগিয়ে দিই।”
সিমরান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
– “আচ্ছা যা, তোর ওনার সেবা করে আয়। তারপর ছাদে আসিস।”
পুষ্প রুমে ঢুকে দেখল আর্য কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। টি-টেবিলে কফির খালি কাপ রাখা। পুষ্প বুঝতে পারল আর্য কফি খেয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাথা ব্যথা কমেনি। যন্ত্রণায় সে বারবার কপাল কুঁচকাচ্ছে। পুষ্প গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে একদম আর্যর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। খুব মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল—
– “সরকার সাহেব, আপনার কি মাথা ব্যথা করছে?”
আর্যর মাথার যন্ত্রণা যেন মুহূর্তেই চড়ে গেল। পুষ্পর গলা শুনতেই সে চোখ না খুলেই কর্কশ স্বরে বলে উঠল—
– “তোমাকে বলেছি আমার মাথা ব্যথা করছে? ন্যাকামি করতে কেন এসেছ? এই ন্যাকামি অন্য কাউকে গিয়ে দেখাও। তোমাকে বারণ করেছি না আমার চোখের সামনে না আসতে? কেন আসছ?”
আর্যর কড়া কথা শুনেও পুষ্প নড়ল না। সে দেখতে পাচ্ছে মানুষটা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, এমন অবস্থায় সে যায় কী করে? সে আবারও সাহস করে বলল—
– “আমি কি একটু চুল টেনে দেব? তেল দিয়ে মাথা মালিশ করে দিলে হয়তো ব্যথাটা কমত।”
আর্য ধমক দিয়ে বলল—
– “বলছি না দরকার নেই! এখান থেকে যাও, আমার মাথা আরও খারাপ কোরো না।”
পুষ্প তবু গেল না। খাটের নিচে একপাশে জড়সড় হয়ে বসে রইল। সাহস করে আর্যর মাথায় হাত দেওয়ার শক্তি তার নেই, আবার তাকে এই অবস্থায় রেখে চলে যাওয়ার মতো মনও তার নেই। এক অদ্ভুত দোটানায় পড়ে সে নিশ্চুপ বসে রইল।
মাথার অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে একসময় আর্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তাকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে পুষ্প সন্তর্পণে খাটের পাশে গিয়ে বসল। আলতো করে, পরম মমতায় আর্যর চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে লাগল সে। প্রথমে কাঁপা কাঁপা হাত থাকলেও পুষ্প দেখল আর্য ঘুমের মধ্যেই যেন আরাম পাচ্ছে। সে ড্রেসিং টেবিল থেকে হালকা একটু তেল নিয়ে আর্যর মাথায় মেখে দিল এবং অতি সাবধানে মালিশ করে দিতে লাগল। মাঝে মাঝে হালকা করে চুল টেনে দিতে দিতে কখন যে পুষ্প নিজেও খাটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল, সে নিজেও টের পেল না।
প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর আর্যর ঘুম ভাঙল। চোখ মেলতেই সে বুঝতে পারল মাথার সেই তীব্র যন্ত্রণাটা আর নেই। কিন্তু উঠতে গিয়েই সে থমকে গেল। অনুভব করল তার মাথায় কারো নরম একটি হাত রাখা। চট করে উঠে বসতেই সে দেখল— পুষ্প খাটে হেলান দিয়ে তার মাথায় হাত রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্য হাতে তেলের বোতলটা ধরা।
মুহূর্তের জন্য আর্যর মনের কোণে এক চিলতে ভালো লাগা উঁকি দিলেও পরক্ষণেই সে সেটাকে বিরক্তি দিয়ে চাপা দিল। তার এই কঠোর মন কিছুতেই গলতে চাইল না। সে এই মায়ার জালে জড়াতে চায় না; তার কাছে এই মায়া মানেই ধ্বংস। সে নির্দয়ভাবে ঘুমন্ত পুষ্পকে একটা সজোরে ধাক্কা দিয়ে খাট থেকে নিচে ফেলে দিল। চিৎকার করে উঠল—
– “তোমার এত বড় সাহস কী করে হয় আমার বিছানায় বসার? তোমাকে হাজার বার বলেছি না আমার কোনো জিনিসে হাত দেবে না? আমার চোখের সামনে আসবে না বলে দিয়েছি না?”
ঘুমের ঘোরে হঠাৎ এমন ধাক্কায় পুষ্প কিছুই বুঝতে পারল না। মেঝেতে পড়ে কোমরে বেশ আঘাত পেল সে। যন্ত্রণায় চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল পুষ্প। পরক্ষণেই আর্যর কর্কশ কণ্ঠ শুনে সে ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল। বুঝতে পারল, অনুমতি ছাড়া বিছানায় বসার অপরাধেই তাকে এই শাস্তি পেতে হলো।
সে কোমর চেপে ধরে মিনমিন করে বলল—
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১
– “আপনি মাথা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, তাই একটু মালিশ করে দিচ্ছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি। ক্ষমা করে দিন সরকার সাহেব, আর কখনো এমন হবে না।”
পুষ্পর করুণ মুখচ্ছবির দিকে একবার তাকিয়ে আর্য গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
