Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪
রুপা

আর্য রুমে এসে শুয়ে পড়েছে। সে আসার অনেকক্ষণ পর পুষ্প ঘরে ঢুকল; কারণ আর্য তাকে সামনে আসতে বারণ করেছে। রুমে ঢুকে পুষ্প দেখল—আর্য উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, গায়ে কোনো শার্ট নেই, কোমর পর্যন্ত ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে রেখেছে।
পুষ্প একনজর সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পাশ থেকে একটা বালিশ নিয়ে সে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। নিচে বিছানোর মতো কিছুই নেই। নেই বললে ভুল হবে, ছিল; কিন্তু আর্য সেগুলো সরিয়ে নিয়েছে। পুষ্প সোফায় ঘুমাতে চেয়েছিল, কিন্তু আর্য সেখানেও বারণ করে দিয়েছে। তার মতে, মেঝেতে ঘুমানো পুষ্পর শাস্তি—তাকে বিয়ে করার শাস্তি! অগত্যা পুষ্প একটি বালিশ নিয়েই মেঝেতে রাত কাটায়। অবশ্য বাড়ির কেউ জানে না রুমের ভেতর প্রতি রাতে কী হয়; দরজার ওপারের খবর বাইরে যাওয়ার কোনো উপায়ও নেই।

পরের দিন সকালে শেহনাজ সরকার লোক দিয়ে পুষ্পর সব কাগজপত্র জোগাড় করে আনলেন। আজ পুষ্পকে নিয়ে কলেজে ভর্তি করাতে যাওয়ার কথা। যাওয়ার কথা ছিল আমজাদ সরকারের, কিন্তু হুট করে জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় তিনি যেতে পারলেন না। বাসায় আর্য ছাড়া আর কেউ নেই। আর্য নিচে নামতেই শেহনাজ সরকার ছেলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন—
– “আর্য, তোমার কি আজ কোনো কাজ আছে? তোমার বাবার কাছে শুনলাম আজ তোমার কোনো মিটিং নেই। বাইরে কি অন্য কোনো কাজ আছে?”
আর্য নির্লিপ্ত গম্ভীর গলায় বলল—
– “আমার কাজ আছে কি নেই, সেটা জেনে তুমি কী করবে আম্মু?”
– “যেটা জিজ্ঞেস করছি, সেটার জবাব দাও।”
– “আপাতত কোনো কাজ নেই। বিকেলের দিকে ইভানের সাথে বের হব।”
– “ঠিক আছে। এখন পুষ্পকে নিয়ে গিয়ে কলেজে অ্যাডমিশন করিয়ে দিয়ে আসো।”
আর্য তড়িঘড়ি করে বলল—

– “আমি পারব না!”
শেহনাজ সরকার দমে যাওয়ার পাত্রী নন। তিনি বললেন—
– “পারবে না কেন? না পারার মতো কোনো কাজ এটা নয়।”
– “পারার মতো হলেও তোমরা যাও, আমি যেতে পারব না। ওই মেয়েকে নিয়ে কোথাও যাওয়ার কথা আমি ভাবতেও পারি না।”
– “তোমার বাবার যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় তিনি যেতে পারছেন না। তাই তোমাকে বলছি; না হলে তোমাকে বলার মতো ইচ্ছে আমারও নেই। কথা বাড়াবে না একদম! চুপচাপ গিয়ে পুষ্পকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসো।”
মায়ের কথার ওপর আর কথা বলার সাহস বা ইচ্ছে কোনোটাই আর্যর নেই। সে তার মায়ের সাথে বেয়াদবি করতে চায় না। সে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শেহনাজ সরকারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জড়সড় পুষ্পর দিকে তাকাল। যেন চোখ দিয়েই তাকে ভস্ম করে ফেলবে। আর্য গটগট করে বেরোতে বেরোতে বলল—
– “আসতে বলো ওকে। আমি দুই মিনিটের বেশি দাঁড়াতে পারব না।”
ছেলের কথায় মনে মনে খুশি হলেন শেহনাজ সরকার। তিনি পুষ্পর কপালে মমতায় একটি চুমু দিয়ে বললেন—
– “ভয় পাস না মা, কিছু হবে না। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তোকে অনেক পড়াশোনা করতে হবে, অনেক বড় হতে হবে—যাতে তোর দিকে কেউ আঙুল তুলতে না পারে। একদম ভয় পাবি না, আমি তো আছিই। আর্য কিছু বললে আমাকে এসে বলবি, কেমন?”
পুষ্প ফুফুমণিকে জড়িয়ে ধরে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল—
– “ঠিক আছে ফুফুমণি।”

গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্য। বাড়ির দরজার দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর। বলে এসেছে দুই মিনিটের মধ্যে আসতে, কিন্তু এখন দুই মিনিট ছত্রিশ সেকেন্ড হয়ে গেছে—এখনো আসার নাম নেই। মেজাজটা ক্রমেই বিগড়ে যাচ্ছে আর্যর। ঠিক তখনই সদর দরজা দিয়ে পুষ্পকে বেরিয়ে আসতে দেখল সে। কালো বোরকা সাথে গোল করে হিজাব পরা।
আর্য দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। সে নিজেকে বারবার শাসন করে— “এই ভুল জীবনেও করিস না আর্য, এই মায়ার জালে জড়ালে জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে।” সে তড়িঘড়ি করে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। পুষ্প এসে পেছনের সিটে বসতে গেলে আর্য কর্কশ গলায় বলে উঠল—

– “এই মেয়ে! আমি কি তোমার ড্রাইভার? চুপচাপ সামনে এসে বসো। আমি কারো ড্রাইভার নই।”
আর্যর ধমকে পুষ্পর ছোট্ট প্রাণপাখিটা যেন ভয়ে উড়ে গেল। সে আড়ষ্ট হয়ে সামনের দরজা খুলে সিটে গিয়ে বসল। পুষ্পর এই কুঁকড়ে থাকা দেখে আর্যর মেজাজ আরও চড়ে গেল। সে এবার আবার ধমক দিল—
– “এই যে, সিট বেল্ট কি তোমার বাবা এসে বেঁধে দিয়ে যাবে?”
আর্যর একের পর এক ধমক খেয়ে পুষ্প যেন দিশেহারা হয়ে গেল। সে এর আগে কখনো গাড়িতেই ওঠেনি, সিট বেল্ট কীভাবে বাঁধতে হয় তা বোঝার সাধ্য তার নেই। সে ফেলফেল করে আর্যর দিকে তাকাল। তার ওই অবুঝ আর সরল চাহনি দেখে আর্য বুঝতে পারল, এই মেয়ে তার কথা বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারেনি।
আর্য বিরক্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুষ্পর দিকে ঝুঁকে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস পুষ্পর মুখে গিয়ে লাগছে। হঠাৎ আর্যকে অত নিকটে আসতে দেখে পুষ্প ভয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। বুকের ভেতরটা ‘ধড়াস ধড়াস’ করে কাঁপছে তার। সে শক্ত করে বোরকার কাপড় খামচে ধরল। আর্য নির্বিকারভাবে সিট বেল্টটি টেনে বেঁধে দিয়ে আবার নিজের সিটে ফিরে এল।
গাড়ি চলা শুরু করতেই পুষ্প চোখ খুলে জানালার বাইরে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্যও সে আর্যর দিকে ফিরে তাকাল না। অন্যদিকে গাড়ি চালাতে চালাতে আর্য আড়চোখে বারবার পুষ্পর হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছে। তার ধারণা, এই মেয়েটা নিছক টাকার লোভেই এই বিয়েটা করেছে; না হলে জানাশোনা নেই, বয়সের ঠিক নেই—এমন একটা অচেনা ছেলেকে কেন কেউ বিয়ে করবে? তবে একটা বিষয় তাকে ভাবায়—এই মেয়েটাকে সে এত অপমান-অবহেলা করে, মাঝে মাঝে গায়েও হাত তোলে, তবুও সে একটা টু শব্দও করে না! মাকেও কিছু জানায় না। পরক্ষণেই আর্য নিজেকে বোঝায়— “না না, এগুলো সব এই মেয়ের নাটক! আমাকে ফাঁদে ফেলার নতুন কৌশল।”

পুষ্পকে একটা নামী প্রাইভেট কলেজে অ্যাডমিশন করিয়ে দিয়ে মাত্রই বের হলো আর্য। তার মাথা এখন প্রচণ্ড গরম হয়ে আছে। অ্যাডমিশনের সময় কাগজে দেখল—এই মেয়ের বয়স মাত্র ষোলো! আর তার নিজের বয়স আটাশ। গুনে গুনে তার চেয়ে বারো বছরের ছোট একটা বাচ্চার সাথে আম্মু তার বিয়ে দিয়েছে! এত দিন সে ভাবত মেয়েটা অন্তত সাবালিকা হয়েছে, কিন্তু এখন দেখছে সে তো নাবালিকা।
আর্যর রাগ ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এই রাগ সে দেখাবে কাকে? মা তো তার কোনো কথাই শুনতে রাজি নন। কী আছে এই পিচ্চি মেয়ের মাঝে যে মা তাকে ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না? এমনকি নিজের ছেলের অনুভূতিও তাঁর কাছে তুচ্ছ! আর্য বিড়বিড় করে নিজেকে শাসাল—
– “যাই হোক, বয়স ষোলো হোক আর পনেরো, আমার তাতে কী! এই মেয়েকে আমি কোনোদিন বউ হিসেবে মেনে নেব না। কোনো নারীই আমার জীবনে আসবে না। মেয়েরা ছলনাময়ী, প্রতারক!”
আর্য নিজের রাগ সামলে নিয়ে পুষ্পকে গাড়িতে বসিয়ে দিল। আগামীকাল থেকেই পুষ্পর কলেজ শুরু। ড্রাইভিং সিটে বসে আর্য আবারও পুষ্পর সিট বেল্টটা বেঁধে দিল। পুষ্প একবার আড়চোখে আর্যর দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছে না আর্য কেন এত রেগে আছে। সে তো কিছুই করেনি, কোনো কথাও বলেনি। শুধু দেখছে আর্যর চোখ-মুখ শক্ত হয়ে আছে। বাড়ি পৌঁছে পুষ্পকে নামিয়ে দিয়েই আর্য আবার বেরিয়ে গেল।

– “আর কত ড্রিঙ্ক করবি আর্য? দেখ, একজন প্রতারণা করেছে বলে যে সবাই তেমন হবে, এমন কোনো কথা নেই। পৃথিবীতে অনেক রকমের মানুষ থাকে; কেউ ঠকায়, আবার কেউ ঠকেও জিতে যায়। একটা মেয়ে ভুল করেছে দেখে সব মেয়েকে একই পাল্লায় মাপার কোনো মানে হয় না। তুই যেটা করছিস, তাতে নিজের জীবনটাই শেষ করছিস!”
কথাগুলো বলে থামল আর্যর বন্ধু ইভান। কিন্তু আর্যর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে একের পর এক গ্লাস শেষ করে যাচ্ছে। নেশাতুর ভাঙা গলায় আর্য বলে উঠল—
– “সব মিথ্যে ইভান! মেয়েরা কোনোদিন ভালোবাসতেই পারে না। এরা চরম ছলনাময়ী। মায়ার জালে জড়াতে এরা পটু, কিন্তু স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে এক নিমেষে সেই মায়া কাটিয়ে চলে যায়। অপর পাশের মানুষটা যে তিলে তিলে মরছে, তাতে তাদের কিছুই যায়-আসে না। তারা দিব্যি সুখে থাকে। এই ছলনাময়ী নারীর কারণে ওকে হারিয়ে ফেলেছি ও এরকম কেন করল ইভান? আমিও তো ভালোবাসতাম ওকে! আমাদের ভালোবাসার চেয়ে এক ছলনাময়ী নারীর ভালোবাসা বেশি হয়ে গেলো ওর কাছে।”
ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

– “সব মেয়ে একরকম হয় না রে, সেটা তোকে বুঝতে হবে। একজন ঠকিয়েছে বলে গোটা নারী জাতিকেই ঘৃণা করবি? তোর নিজের বাড়িতেই দেখ, আঙ্কেল-আন্টি ভালোবেসে বিয়ে করে কত সুখে সংসার করছেন!”
আর্য তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল—
– “ওসব পুরনো দিনের কথা। আমার আম্মুরা ভালোবাসার মর্যাদা দিতে জানতেন। কিন্তু এখনকার মেয়েদের কাছে টাকার লোভটাই সব। এরা টাকার জন্য একজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে আরও বড়লোক কাউকে পেলে আগের মানুষটাকে আবর্জনার মতো ফেলে চলে যায়।”
ইভান বুঝতে পারল আর্যকে এখন বোঝানো বৃথা। সে বিরক্ত হয়ে বলল—
– “তোকে বুঝিয়ে লাভ নেই, তুই নিজেই কিছু বুঝতে চাস না। তুই নিজের মনে এটা গেঁথে নিয়েছিস যে মেয়েরা খারাপ, লোভী আর ছলনাময়ী। এখন রাত দশটা বাজে, বাসায় যাবি না?”

– “বাসায় কী জন্য যাব? ওখানে গেলে ওই স্টুপিড মেয়েটার চেহারা দেখতে হবে আমাকে। ওই মেয়েকে আমি একদম টলারেট করতে পারি না ইভান! জানিস, আম্মু কার সাথে আমার বিয়ে দিয়েছে? আমার চেয়ে বারো বছরের ছোট একটা মেয়ের সাথে! মেয়েটার নাম শুনলে গা পিত্তি জ্বলে যায়। বয়স মাত্র ষোলো, অথচ দেখ কী লোভ! নিজের চেয়ে এত বড় একজনকে বিয়ে করতে তার একটুও বাঁধল না? কারণ একটাই—আমার টাকা আছে। টাকা দেখেই তো এই বিয়েতে রাজি হয়েছে।”
নেশার ঘোরে কথাগুলো বিড়বিড় করে বলতে লাগল আর্য। তার শরীর টলছে; অতিরিক্ত ড্রিঙ্ক করার কারণে সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। কথা বলতে বলতে সে প্রায় নেতিয়ে পড়ল। আর্যর এই অবস্থা দেখে ইভান মনে মনে বলল—

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩

– “এই ছেলে নিজে ইচ্ছেমতো ড্রিঙ্ক করবে, আর শেষে আমাকেই ওকে বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। মনে হয় বডিগার্ড। বন্ধু পেয়েছি একটা! নিজের খেয়ালে নেশা করে যেখানে-সেখানে পড়ে থাকে।”
তবে ইভানের মনে বিরক্তি থাকলেও বন্ধুর প্রতি মায়ার অভাব নেই। সে জানে, আর্য সবসময় এমন ছিল না; পরিস্থিতি আর কাছের মানুষকে হারানোর শোক তাকে এভাবে বদলে দিয়েছে। ইভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হাসল। তারপর বন্ধুর কাঁধে হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। টলমল পায়ে আর্যকে নিয়ে সে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। আজকের রাতটাও তাকে বন্ধুর ‘সারথি’ হয়েই কাটাতে হবে।

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here