অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৪
রুপা
আর্যসহ আরও তিনটি পুলিশ ফোর্স মিলে তল্লাশি চালায়। পুষ্পর নূপুরে লাগানো জিপিএস ট্র্যাকারের শেষ লোকেশন ছিল একটি নির্জন জঙ্গল, যা রেড অ্যালার্ট হিসেবে পরিচিত। সেটা দেখেই আর্যর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তার ‘ফ্লাওয়ার’ এমন বিপজ্জনক জায়গায় গেল কীভাবে? ঠিক আছে তো? ওই লোকটা কি তার কোনো ক্ষতি করেছে? মেয়েটা নিশ্চিতভাবেই খুব ভয় পাচ্ছে। এমনিতেই সব সময় ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, এখন নিশ্চয়ই সেই ভয় বহুগুণ বেড়ে গেছে! চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, মেয়েটাকে নিশ্চয়ই না খাইয়ে রেখেছে। এসব ভাবতে ভাবতে আর্যর চোখ হিংস্র হয়ে উঠল। সে শুধু একবার তার ‘ফ্লাওয়ার’-এর খোঁজ পাক, তারপর বোঝাবে কার দিকে হাত বাড়ানোর দুঃসাহস করেছে তারা!
রেড অ্যালার্ট এলাকা হওয়া সত্ত্বেও আর্য পুরো জঙ্গল তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে, কিন্তু পুষ্পর খোঁজ মেলেনি। শেষমেশ নূপুরটা পাওয়া গেল একটা পাখির বাসায়। সেটা দেখে আর্যর টেনশন আরও বেড়ে গেল। পুষ্পর পায়ের নূপুর খুলে পড়ে গিয়েছিল, আর পাখিরা সেটাকে বাসা বাঁধার প্রয়োজনীয় সামগ্রী মনে করে নিয়ে গেছে। আর্য পাখির বাসা থেকে নূপুরটা উদ্ধার করে নিজের পকেটে রাখল। এরপর সে আরও উন্মাদ হয়ে উঠল। সন্দেহজনক খালি বাড়ি, ভাঙা দোকান, অন্ধকার পুরোনো বাড়ি—উত্তরা সেক্টরের এমন কোনো জায়গা বাকি রাখল না সে। একের পর এক তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে, হয়তো এই নির্জন কোনো বাড়িতেই তার ‘ফ্লাওয়ার’-কে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু এত জায়গায় তল্লাশি করেও পুষ্পর কোনো হদিস মিলছে না।
আর্যর এখন নিজেকে পাগল মনে হচ্ছে। পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটে চলেছে সে। পুলিশ অফিসাররা পর্যন্ত অবাক—একটা মেয়েকে ঘিরে নামকরা সরকার বাড়ির বড় ছেলের এমন পানি ছাড়া মাছের মতো অবস্থা হতে পারে, তা তারা ভাবতেই পারেনি।
আর্য নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে। কোথায় আছে তার ফ্লাওয়ার, কেমন আছে—কিছুই বুঝতে পারছে না সে। ছোট-বড় কোনো অলিগলি বাদ রাখেনি। সে নিজেকে বাইরে থেকে শান্ত দেখানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু ভেতরে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। কন্ঠনালী দিয়ে ঢোক গেলাও যেন মুশকিল হয়ে পড়েছে। ফুসফুসে যেন পর্যাপ্ত বাতাসের টান অনুভূত হচ্ছে, বাতাস টেনে নিতে পারছে না। একসময় যে মেয়েটিকে তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলার আদেশ দিয়েছিল, আজ সেই মেয়ের অনুপস্থিতিতে আব্রাহাম আর্য সরকারের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়।
আর্য স্টিয়ারিং থেকে মাথা তুলে সামনের রাস্তার দিকে তাকাল। চোখ দুটো অসম্ভব টকটকে লাল। গোছালো আর্য আজ ভীষণ অগোছালো। চুলগুলো উসকোখুসকো, শার্টের ইন করা অংশ বেরিয়ে গেছে, সবসময় গোটানো শার্টের হাতাগুলো অবহেলায় পরে আছে। দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল সে। এবার দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরে বড় বড় নিশ্বাস নিতে লাগল। সত্যি সত্যি অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে। কী করে খুঁজবে সে তার ফ্লাওয়ারকে? যতই চেষ্টা করছে খারাপ চিন্তা মাথায় না আনার, কিন্তু মস্তিষ্কজুড়ে হানা দিচ্ছে ভয়ংকর সব ভাবনা। মাথায় একটাই চিন্তা—তার ফ্লাওয়ার ঠিক আছে তো? কোথায় আছে সে?
আর্য চোখ বন্ধ করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল। না, তাকে ভেঙে পড়লে বা হার মানলে চলবে না। তাকেই খুঁজে বের করতে হবে তার বউকে। সে হারে হারে টের পাচ্ছে, মেয়েটির প্রতি তার অনুভূতি যতটা ভেবেছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি। আর এই অনুভূতি ক্রমশ বাড়ছে, একবিন্দু কমার নাম নেই। সে জানে না তার এই বেড়ে চলা অনুভূতির শেষ পরিণতি সুখের নাকি দুঃখের? যা-ই হোক, তার ওই মেয়েটিকেই লাগবেই, নাহলে সে বাঁচতে পারবে না। ‘ওই মেয়ে ঠিক আছে তো?’—এই চিন্তাটা মাথায় আসতেই তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। যদি সত্যি কিছু হয়ে যায়, তবে কি সে মরে যাবে না?
আর্য চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলল—
– “আল্লাহ, তুমিই একমাত্র ভরসা। আমি তার কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাকে নিজেকে নিরাপদ রাখার মতো শক্তি দিও।”
একটু থেমে আবার বলল—
– “ফ্লাওয়ার, কোথায় তুমি? তোমার সরকার সাহেব তো মরে যাবে তোমায় ছাড়া! নিজের মায়ায় এতটা না জড়ালে পারতে। আমাকে নিজের মায়ায় জড়ানোর আগে একটু তো কার্পণ্য করতে পারতে! কিন্তু তুমি তো কার্পণ্য করতে শেখোনি। দেখো, এখন কী অবস্থা করেছ আমার! যে আমি জীবনের কাছে কিছুই আশা করত না, সে-ও এখন দিব্যি আশা রাখে তোমায় নিয়ে গোটা একটা জীবন পার করার। আমার লাইফলাইন হওয়া কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিল তোমার?”
আর্য যখন দিশেহারা হয়ে দিকবেদিক হন্যে হয়ে পুষ্পকে খুঁজছে, ঠিক এমন সময় বাড়ি থেকে ফোন আসে। ফোনের ওপাশ থেকে বলা কথাটা শুনেই আর্য আর কোনো কিছু না ভেবেই তীব্র গতিতে গাড়ি চালিয়ে দুই ঘণ্টার রাস্তা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পাড়ি দিয়ে বাড়িতে পৌঁছায়। কোনোমতে গাড়ি একপাশে পার্ক করে এলোমেলোভাবে দৌড়ে সদর দরজায় এসে ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল—শেহনাজ সরকারের বুকে বিড়ালছানার মতো লেপ্টে থাকা পুষ্পর দিকে। মুখ দেখা মুশকিল, মুখ গুঁজে রেখেছে শেহনাজ সরকারের বুকে!
আর্য স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শেহনাজ সরকারের বুকে লেপ্টে থাকা পুষ্পর দিকে। কত ঘণ্টা পর দেখছে সে! পুরো আটাত্তর ঘণ্টা পর স্বচক্ষে তার ‘ফ্লাওয়ার’-কে দেখছে সে! আর্য যেন চোখের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে, কিন্তু বুকটা জ্বলছে মেয়েটাকে অন্তত একবার জড়িয়ে ধরার জন্য। বুকটা খা খা করছে তপ্ত মরুভূমির মতো!
ড্রয়িংরুমে বসে আছে সরকার বাড়ির ছোট-বড় সবাই। রেশমাও আছে, নেই শুধু মিনারা বেগম আর নিশি। সবাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শাশুড়ি-বউমার দিকে। ছেলের বউকে বুঝি এতটাও ভালোবাসা যায়? যায় তো, এই যে তাদের সামনে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ!
শেহনাজ সরকার এবার পুষ্পকে নিজের বুক থেকে তুলে রুমে নিয়ে যেতে চাইলেন। মেয়েটাকে ফ্রেশ করিয়ে কিছু খাওয়াতে হবে। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে পুষ্পর হাত ধরে বললেন—
– “চল মা, আগে ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নিবি, বাকি সব পরে।”
শেহনাজ সরকার উঠে দাঁড়ানোর পর যেই না পুষ্প উঠে দাঁড়াল, অমনি ঝড়ের বেগে এসে কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাকে! রমণীর ছোট দেহখানা যেন নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে চাইছে সে। পুষ্প ভীষণ অবাক হয়, তবে পুরুষালি কড়া পারফিউমের ঘ্রাণে তার বুঝতে বাকি থাকে না যে এটি তার সরকার সাহেব! কিন্তু তবুও তার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না, বরং সবার সামনে এভাবে জড়িয়ে ধরায় বেশ অস্বস্তি হতে লাগল। এদিকে বাড়ির সবাইও একইভাবে চমকে উঠল, আর শেহনাজ সরকার ছেলের এমন কাণ্ড দেখে মুখটা আরও গম্ভীর করে ফেললেন।
এদিকে আর্যর যেন কোনো হুঁশ নেই! সে শুধু নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। মেয়েটাকে না পেয়ে ভেতরে যে তীব্র অস্থিরতা আর ছটফটানি শুরু হয়েছিল, মেয়েটার সান্নিধ্যে এসে সেটা শান্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। হ্যাঁ, এখন তার নিঃশ্বাস নিতে কোনো কষ্ট হচ্ছে না, ফুসফুস যেন বাতাস টেনে নেওয়ার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে পূণরায়। একটা মেয়ের মাঝে কি এতটা ক্ষমতা থাকে? যে মেয়েটির দূরত্বে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মেয়েটা কাছে আসতেই সব ঠিক হয়ে যায়! হয় তো, এই যে সেই পুষ্প, যার অনুপস্থিতিতে আব্রাহাম আর্য সরকারের মতো কাঠখোট্টা পুরুষটাও বেপরোয়া, উন্মাদ আর পাগল হয়ে উঠেছিল! যে পুরো এলাকার এক একটি জায়গা তিন তিনবার করে তল্লাশি চালিয়েছে!
আর্যকে পুষ্পকে না ছাড়তে দেখে আহনাফ গলা খাঁকারি দিয়ে মিথ্যে কাশির নাটক করে। কিন্তু আর্যর মাঝে কোনো হেলদোল নেই! এবার বাড়ির সবাই মুখ টিপে হাসতে লাগল। পুষ্প এবার আর্যর শক্ত হাতের বাঁধন থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি শুরু করে, কিন্তু এটা যেন তার সরকার সাহেবের মোটেই পছন্দ হলো না। সে গভীর আবেশে জড়ানো কণ্ঠে বলল—
– “ফ্লাওয়ার, ডোন্ট মুভ, ফিল নিতে দাও!”
পুষ্প তবুও আর্যর কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায়। আর্য কিছু বলবে, তার আগেই ভেসে আসে শেহনাজ সরকারের গম্ভীর কণ্ঠ—
– “আর্য, ছাড়ো পুষ্পকে! তোমাকে দূরে থাকতে বলেছি আমার মেয়ের থেকে।”
মায়ের কথা পছন্দ হলো না আর্যর। আটাত্তর ঘণ্টা দূরে ছিল, সেটা কি কম ছিল? একবার দূরে গিয়ে হারাতে বসেছিল, আবারও দূরে যাবে? সে কি গাধা নাকি? জ্ঞান থাকতে আর কোনোদিন বউকে একা ছাড়বে না সে! আর্য এবার কোনো তোয়াক্কা না করেই পুষ্পকে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছিল, সেভাবেই দু’হাতে কোমর পেঁচিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে নিল! পুষ্পর পা মেঝের স্পর্শ ছাড়ে। সেই অবস্থাতেই হাঁটা শুরু করল দোতলার দিকে, উদ্দেশ্য তাদের রুম।
পুষ্প নিজেকে আচমকা শূন্যে আবিষ্কার করে হকচকিয়ে গেল নিজেকে ব্যালেন্স ঠিক রাখতে আর্যর গলা দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
আহনাফ এবার চিৎকার করে উঠল—
– “ওহ হোওও! আমাদের বউ না-মানা সরকারের এ কোন রূপ দেখছি খোদা!”
কথাটা আর্যর কানে যেতেই সে মাঝসিঁড়িতে থেমে যায়। সে পেছনে না ফিরেই গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
– “বউ মানি বা না মানি, বউটা আমারই! আর আজীবন আমারই থাকবে।”
কথাটা বলে আবারও হাঁটা শুরু করতেই শেহনাজ সরকার কড়া ও তীক্ষ্ণ গলায় বললেন—
– “তোমার ধারণা ভুল! আগামী সাতদিনের মধ্যে আমি তোমাদের ডিভোর্স করাব। আর তুমি খুব ভালো করে জানো, আমি যেটা বলি সেটা করেই ছাড়ি! তোমার সাথে আমি আমার পুষ্পকে কোনোদিন থাকতে দেব না।”
আর্য মাঝপথে থেমে মায়ের কথাগুলো শুনল। তারপর বাঁকা হেসে জবাব দিল—
– “সরি আম্মু! তোমার ইচ্ছেমতো বিয়ে করতে পারলেও ডিভোর্সটা দিতে পারব না। বউটা আমার লাগবে, আজীবনের জন্য!”
কথাটা বলে কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই পুষ্পকে নিয়ে উপরে চলে গেল আর্য। আর্য যেতেই বাড়ির সবাই ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল। ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশ মুহূর্তেই হাসির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল।
এদিকে শেহনাজ সরকার একইভাবে গম্ভীর চাহনিতে তাকিয়ে আছেন আর্যর চলে যাওয়ার দিকে। ওনার ঠোঁটে ফুটে উঠল আবছা বাঁকা হাসির রেখা, যেটা কারো নজরে আসার আগেই তা মিলিয়ে গেল। নিজের মনেই দৃঢ় সংকল্প করলেন—
– “তুমি যতই জেদি আর তেঁড়া হও না কেন, ছেলে কিন্তু তুমি আমারই। এত কিছু করার পর, ওকে এত কষ্ট দেওয়ার পর ভাবলে কী করে যে, আমি এত সহজে তোমার হাতে ওকে তুলে দেব!”
একটু থেমে আবারও বললেন—
– “পুষ্প যতটা কষ্ট পেয়েছে, তার দ্বিগুণ কষ্ট তোমাকেও পেতে হবে। নাহলে তুমি পুষ্পর কষ্ট কোনোদিন বুঝতে পারবে না। আর তুমি পুষ্পর কষ্ট না বুঝলে, একই কষ্ট ওকে দ্বিতীয়বার দিতেও ভাববে না। তুমি যতদিন পুষ্পর মূল্য না বুঝতে পারছ, ততদিন তোমাকে পুষ্পর থেকে দূরে থাকতে হবে। যেদিন ওর জন্য তুমি ছটফট করবে, ওর আঘাতে ওর চেয়েও বেশি কষ্ট তুমি অনুভব করবে—সবার সামনে গর্বের সাথে যখন বলতে পারবে ওকে তুমি ভালোবাসো, ও তোমার স্ত্রী; সেদিনই আমি পুষ্পর ওপর তোমার সম্পূর্ণ অধিকার দেব। তার আগে নয়। তুমি এই সাময়িক মোহ থেকে মেয়েটার কাছে যাবে, মেয়েটা তোমার প্রতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তুমি যদি রেগে গিয়ে আবারও মেয়েটাকে আঘাত করো, তাহলে ও পুরোপুরি ভেঙে পড়বে; যেটা আমি বেঁচে থাকতে কোনোদিন হতে দেব না। যেদিন তীব্র রাগের মাঝেও মেয়েটার কথা ভেবে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সেদিন ধরে নেব তুমি তোমার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছো।”
এর মাঝে সোফায় বসে থাকা স্নিগ্ধ এবার উঠে দাঁড়াল। সবার দিকে তাকিয়ে বিনয়ীভাবে বলল—
– “আঙ্কেল-আন্টি, আমি তাহলে আজকে আসি!”
স্নিগ্ধর কথা শুনে আমজাদ সরকার বললেন—
– “স্নিগ্ধ, কী বলছো তুমি? চলে যাবে মানে? আজকে থাকো, খাওয়া-দাওয়া করো।”
– “না আঙ্কেল, আমি চলে যাব। আমার কাজ আছে।”
– “কী কাজ তোর যে, একই শহরে থেকেও বাড়িতে থাকিস না?”
রেশমার কথা শুনে মাথা চুলকে হাসল স্নিগ্ধ। তারপর আমতা-আমতা করে বলল—
– “ছোট মা, সময় হলে জানতে পারবে কী করি। এখন যাই।”
– “কোথাও যাওয়া হবে না! রাতে খেয়ে তারপর যাবি, তার আগে কোথাও যেতে দেব না।”
রেশমার কথার বিপরীতে কিছু বলতে পারল না স্নিগ্ধ। মা মারা যাওয়ার পর থেকে এই ছোট মা তাকে মায়ের মতোই বড় করেছেন। নিশির বড় ভাই হচ্ছে স্নিগ্ধ। পুষ্প গত একদিন স্নিগ্ধর কাছেই ছিল। যে লোকটা পুষ্পকে কিডন্যাপ করেছিল, সে তার আরও একজন সঙ্গীকে নিয়ে পুষ্পকে তাদের গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছিল। মাঝপথে গাড়িতে পুষ্পর জ্ঞান ফিরতে চাইলে তারা তাকে হাই-ডোজের স্লিপিং ড্রাগ ইনজেক্ট করে। যাওয়ার সময় স্নিগ্ধর বাইকের সাথে তাদের ছোটখাটো এক্সিডেন্ট হয়। কলেজ শেষ করে স্নিগ্ধ ওই রাস্তা দিয়েই আসছিল। লোকগুলো স্নিগ্ধকে কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে বিষয়টি স্নিগ্ধর কাছে খটকা লাগে। সাধারণত এক্সিডেন্ট হলে মানুষ সরি বলে, কিন্তু লোকগুলো যেন পালালেই বাঁচে! তবুও স্নিগ্ধ শুরুতে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু তার চোখ পড়ে গাড়ির ভেতরে অচেতন পুষ্পর ওপর। কিছু একটা আন্দাজ করে সে লোকগুলোকে মেয়েটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা আমতা-আমতা করে বলে, ‘তাদের মেয়ে’। তাতেই স্নিগ্ধ বুঝতে পারে—কিছু একটা গন্ডগোল আছে। কারণ সে সারার কাছে আগেই শুনেছিল পুষ্প অনাথ এবং ফুপুর বাড়িতে থাকে। সেখান থেকেই লোকগুলোর সাথে মারামারি করে পুষ্পকে উদ্ধার করে সে।
কিন্তু পুষ্প ছিল অবচেতন, তাই সে কিছুই জানতে পারেনি। পুষ্পকে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়া ছাড়া স্নিগ্ধর আর কোনো উপায় ছিল না। সে পুষ্পকে নিজের ফ্লাটে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে নিশ্চিত হয় যে সে ঠিক আছে। তবে হাই-ডোজের স্লিপিং ড্রাগ দেওয়ায় সে টানা ষোল ঘণ্টা গভীর ঘুমে ছিল। সকালে পুষ্পর জ্ঞান ফিরলে সে প্রথমে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। অচেনা বাড়ি আর অচেনা পরিবেশে নিজেকে আবিষ্কার করে সে কুঁকড়ে যায়। স্নিগ্ধ খুব সুন্দরভাবে পুষ্পকে বুঝিয়ে শান্ত করে এবং ভয় পেতে বারণ করে। পুষ্পর ভয় পুরোপুরি না কাটলেও কিছুটা কমে, কিন্তু বিপত্তি বাঁধে অন্য জায়গায়—পুষ্পর কাছে কারো নম্বর ছিল না, এমনকি সরকার বাড়ির সঠিক ঠিকানাও তার জানা ছিল না। কারণ শেহনাজ সরকার তাকে প্রতিদিন ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কলেজে পৌঁছে দিত এবং নিয়ে আসত।
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৩
তাই পুষ্পকে নাস্তা খাইয়ে বাসায় অপেক্ষা করতে বলে স্নিগ্ধ কলেজে গিয়ে পুষ্পর সব ডিটেইলস চেক করে। সেখানে গার্ডিয়ানের নাম ও নম্বর সংগ্রহ করে সে শেহনাজ সরকারের সাথে যোগাযোগ করে এবং পুষ্পকে নিয়ে সরকার বাড়িতে আসে। স্নিগ্ধ অবাক হয় এটা জেনে যে, পুষ্প তার ‘ছোট মা’ রেশমার আত্মীয়। রেশমা ভীষণ খুশি হয় নিজের ছেলেকে (স্নিগ্ধকে) দেখে। যদিও স্নিগ্ধ ওনার বড় জা’য়ের ছেলে, তবুও রেশমা তাকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসেন।
