Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৯

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৯

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৯
রুপা

– “এই বউ, বিশ্বাস করো, আমি কিছু করিনি! আমি শুধু এই বিয়েটা করতে পারব না—সেটাই বলার জন্য সিমরানকে ছাদে ডেকেছিলাম!”
স্নিগ্ধর কথায় সারার মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে এমনভাবে স্নিগ্ধকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগল, যেন সেখানে কারো কোনো অস্তিত্বই নেই! কিন্তু স্নিগ্ধ তা হতে দিল না; সে সারার কোমল হাতখানা টেনে ধরল। সারা না চাইতেও দাঁড়িয়ে পড়ল, তবুও পিছু ফিরে তাকাল না। স্নিগ্ধ নিজেই এগিয়ে এসে সারার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল—

– “সত্যি বলছি, আমি শুধু এই বিয়েটা করতে পারব না—সেটাই ওকে বলতে ডেকেছিলাম!”
– “আপনি আপনার হবু বউকে ডেকেছেন, সেটা নিয়ে আমাকে কৈফিয়ত দিচ্ছেন কেন? আজব!”
বেশ বিরক্তি নিয়ে কথাটি বলল সারা।
সারার কথা শুনে স্নিগ্ধ কাতর চোখে তাকিয়ে রইল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর দিকে। স্নিগ্ধকে আর কিছু বলতে না দেখে সারা বিরক্তি নিয়ে চোখ তুলে তাকাল। সাথে সাথেই মিলন ঘটলো দুই জোড়া চোখের—একজনের চোখে আছে অসহায়ত্ব ও না-বলা হাজারো কথা, আর অন্যজনের চোখে তীব্র বিরক্তি, অথচ সেই বিরক্তির মাঝেও যেন অন্যরকম এক অনুভূতির ঝলক দেখা যাচ্ছে! সারা বেশিক্ষণ সেই চোখে তাকিয়ে থাকতে পারল না, সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল। এদিকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে তবুও কিছু বলতে না দেখে সারা আরও বিরক্ত হলো। সেই বিরক্তি নিয়েই বলে উঠল—

– “কী সমস্যা আপনার? এখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সরে দাঁড়ান, আমি যাবো।”
– “কোথায় যাবে?”
– “যেখানে গেলে আপনার এই বাঁদরমুখটার দর্শন পাওয়া যাবে না!”
সারার মুখের কথা শুনে স্নিগ্ধর কপালে ভাঁজ পড়ল। সে এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল—
– “এখনো আজেবাজে কথা বলা বন্ধ করোনি?”
– “নাহ, করিনি! ভবিষ্যতেও করব না।”
একদম ত্যাড়া জবাব দিল সারা।
সারার কথা শুনে স্নিগ্ধ মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ভালো করেই জানে, এই মেয়েকে হাজার বলে বুঝিয়েও শুধরানো যাবে না! সে কি কম চেষ্টা করেছিল মেয়েটাকে পথে আনার? কিন্তু কিছুই হলো না, উল্টো এই আজেবাজে গালিগালাজ করা মেয়েটাকেই সে ভালোবেসে ফেলল! মেয়েটাকে সে তার ভালো-মন্দ সবকিছুর সাথেই ভালোবেসে ফেলেছে। তাই তো হার মেনে নিয়ে সে নরম সুরে বলল—

– “আচ্ছা, আর করতেও হবে না! শুধু সেই ভবিষ্যতের সাথে আমাকে জড়িয়ে নাও।”
এই মুহূর্তে স্নিগ্ধর কথা শুনে সারার মেজাজ সপ্তমে চড়ে বসল! ‘শালা, এতই যদি ভবিষ্যৎ জড়ানোর শখ, তবে ফেলে গিয়েছিলি কেন?’ মুখ থেকে কয়েকটা গালি বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। জিবের ডগায় আসা গালিটা পেছনের দিকে ঠেলে ঢুকিয়ে নিয়ে একদম ভদ্রভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলল—
– “মানুষের ভবিষ্যতের সাথে জড়ানোর খুব শখ থাকলে, নিজের হবু বউয়ের সাথে গিয়ে জড়া! ভুল করে মন দিয়েছিলাম, তুই শালা সেটার যোগ্যই ছিলিস না। এখন আফসোস হয়—কোন দুঃখে তোর মতো বাঁদরমুখোকে ভালোবেসেছিলাম!”
কথাগুলো বলে স্নিগ্ধকে আর কোনো সুযোগ না দিয়েই সে সিমরানের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এদিকে স্নিগ্ধ বিমূঢ় ও বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—কী সুন্দর করে, কত ভদ্রভাবে তাকে তুই-তোকারি করে শুনিয়ে গেল তার বউ! দরজা লাগানোর শব্দে স্নিগ্ধর ঘোর কাটল। সারাকে আর দেখতে না পেয়ে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিয়ের আর মাত্র সাত দিন বাকি আছে, কিন্তু সে কিছুতেই এই বিয়ে করতে পারবে না! তাকে যেভাবেই হোক সারার কাছে নিজের পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে সেদিন সে ইচ্ছে করে তাকে ফেলে যায়নি, সে সত্যিই অসহায় ছিল।

সময়ের চাকা নিজ গতিতে চলমান, তা কারো দুঃখে থামে না, আবার কারো সুখেও আটকে থাকে না; সে শুধু আপন স্রোতে বয়ে চলে। এভাবে কেটে গেল আরও তিনটি দিন—বিয়ের আর মাত্র তিন দিন বাকি! শপিংয়ের পরের দিনই সবাই নিজ নিজ বাড়িতে চলে গিয়েছিল। স্নিগ্ধ বারবার সারার কাছে গিয়ে নিজের পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সারা তাকে সেই সুযোগই দিচ্ছে না! স্নিগ্ধকে দেখলেই সে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, তার সাথে কথা বলা তো দূরের কথা, তার কথা শোনারও কোনো প্রয়োজন মনে করছে না সে।
সরকার বাড়িতে মেহমানদের আনাগোনা বহুগুণ বেড়ে গেছে। সিমরানের নানুর বাড়ির আত্মীয়স্বজন এবং আর্যর দাদার দিকের আত্মীয়রা এসে ইতিমধ্যে সরকার বাড়ি পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিন দিন আগেই সারাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে এসেছে পুষ্প। পুষ্পকে সারার সাথে মন খুলে হাসতে দেখে আর্য বেশ অবাক হলো—সে তার ফ্লাওয়ারকে এর আগে কখনো এভাবে হাসতে দেখেনি! তাই তো সে নিজ দায়িত্বে সারাকে এখানে নিয়ে এসেছে। অবশ্য যখন সে জানতে পারল যে সারা স্নিগ্ধর লিগ্যাল ওয়াইফ, তখন থেকেই সে বাড়ির কাজের লোকেদের সারার বিশেষ যত্ন নিতে বলেছে। সে ভালো করেই জানে, সিমরানের এই বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হবে না, কারণ স্নিগ্ধ তাকে আগেই বলে দিয়েছে যে বিয়ের আসরে সে সিমরানকে নয়, বরং সারাকেই বিয়ে করবে!
আগে হলে হয়তো আর্যর এসবে কিচ্ছু যায় আসত না, কিন্তু এখন তার অনেক কিছুই যায় আসে। কারণ সে এখন খুব ভালো করেই জানে—তার কাছে যেমন তার ফ্লাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফ্লাওয়ারকে সে কিছুতেই হারাতে পারবে না, ঠিক তেমনি স্নিগ্ধর কাছেও সারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্নিগ্ধও সারাকে হারাতে পারবে না। তাছাড়া, স্নিগ্ধকে সাহায্য করার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো—স্নিগ্ধ একবার পুষ্পর জীবন বাঁচিয়েছিল। তাই তো সব দিক থেকেই স্নিগ্ধকে গোপনে সাহায্য করে যাচ্ছে আর্য।

ড্রয়িংরুমে সিমরানের নানির সাথে আরও বেশ কয়েকজন বয়স্ক মহিলা বসে পুরনো দিনের গল্পে মজেছেন। সাথে আছে তাদের পরের জেনারেশনের মহিলার দল। বিয়েবাড়িতে সচরাচর যেরকম হয়ে থাকে, সরকার বাড়িতেও তার ব্যতিক্রম নয়—সবাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে হাসি-ঠাট্টা ও গল্পে মেতে আছে। এর মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে সারা, পুষ্প এবং তাদের ঠিক পেছনে আর্যকে নেমে আসতে দেখা গেল।
সারা ও পুষ্প বাকিদের সাথে গল্পে যোগ দিতে এগিয়ে যেতেই, পেছন থেকে আর্যর ডাক পড়ল—
– “ফ্লাওয়ার?”
পুষ্প যেতে গিয়েও থেমে গেল। আর্যর ডাকে রমণী পেছনে ফিরে তাকাতেই আর্য এগিয়ে এসে পুষ্পর হাত ধরে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। এদিকে ড্রয়িংরুমের অধিকাংশ মানুষের নজরই তাদের ওপর গিয়ে পড়ল। কেউ কেউ পুষ্পকে আর্যর বউ হিসেবে জানলেও, অনেকেই তা জানে না। সারার সাথে কথা বলতে বলতে তাকে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখাতে গিয়ে সকাল থেকে পুষ্পর কিচ্ছু খাওয়া হয়নি। তাই আর্য নিজে খাবার বেড়ে পুষ্পকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল—

– “তাড়াতাড়ি খাবার ফিনিশ করো।”
কথাটি বলে সে পাশে বসে ফোন স্ক্রল করতে শুরু করল। পুষ্পও বিনা বাক্যে খাওয়া শুরু করল। কিন্তু কিছুটা খাওয়ার পরই পুষ্প আর খাবে না বলে দিল। আর্য একপলক পুষ্পর দিকে তাকিয়ে আবার খাবারের প্লেটের দিকে তাকাল—দেখল, অর্ধেকের বেশি খাবার প্লেটেই পড়ে আছে! সে কিছুতেই বুঝতে পারে না, এতটুকু খাবার খেয়ে একটা মানুষ কীভাবে থাকে! সে শুরু থেকেই বিষয়টি খেয়াল করেছে। তাই এবার একটু গম্ভীর কণ্ঠেই সে বলে উঠল—
– “ফ্লাওয়ার, খাবার ফিনিশ করতে বলেছি!”
– “আমার পেট ভরে গেছে, আর খেতে পারব না।”
মুখ কালো করে কথাটি বলল পুষ্প।
আর্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর হাতের ফোনটা একপাশে রেখে বাকি খাবারগুলো নিজেই খেতে শুরু করে! পুষ্প কিছু বলল না, কারণ এটা এখন তার কাছে অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আর্যর সাথে খাবার খেলে বেশিরভাগ সময়ই পুষ্পর অর্ধেক খাওয়া খাবার খায়, নয়তো দুজনে একই প্লেটে খায়, আর্য খাওয়ায়। খাওয়া শেষ করে দুজনেই উঠে পড়ল। আর্য হয়তো কোথাও বেরোবে, তাই যাওয়ার আগে পুষ্পর মাথায় গোল করে জড়ানো ওড়নাটা আরও একটু টেনে ঠিক করে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সে বলল—

– “আমি এখন বাইরে যাচ্ছি। তোমার কিছু লাগবে? আমি আসার সময় নিয়ে আসবো!”
আর্যর কথায় পুষ্প দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল যে, তার কিছু লাগবে না।
– “আচ্ছা, তাহলে রুমে যাও। বাইরে অনেক মানুষ, তোমার এখানে থাকার প্রয়োজন নেই।”
আর্যর কথা শুনে পুষ্পর মুখটা একদম ছোট হয়ে গেল, চেহারায় যেন আষাঢ়ের কালো মেঘ জমেছে! বাড়িতে মেহমানরা আসার পর থেকেই আর্য তাকে সবসময় রুমে আটকে রাখছে—দেখে মনে হয়, পুষ্পকে সে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারলে বাঁচে! আজকে একটু বাইরে বের হতে পেরেছিল সারাকে বাড়ি ঘুরিয়ে দেখানোর বাহানায়, সেখানেও এখন তাকে আবার রুমে চলে যেতে বলছে। পুষ্পর এমন কালো হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে আর্য নরম সুরে বলল—
– “কী হয়েছে, এভাবে মুখ কালো করেছ কেন?”
আর্যর কথায় পুষ্প চোখ তুলে তাকাল। আর্য তখনো তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, তাই তড়িঘড়ি করে সে চোখ নামিয়ে নিল তারপর মিনমিন করে বলল—

– “আমি এখানে সবার সাথে একটু থাকি না! ওই রুমে একা একা একদম ভালো লাগে না।”
– “নো। ভালো না লাগলে তোমার ফ্রেন্ডকে নিয়ে যাও, নয়তো সিমরানের রুমে যাও—সেখানে গিয়ে গল্প করো।”
পুষ্প আর কিছু বলতে পারল না। কী-ই বা বলবে সে? আর্যর মুখের ওপর কোনো দিন তো সে টু শব্দটি পর্যন্ত করে না, সেটা যেন তার স্বভাবের একদম বিপরীত! তাদের এই কথাটার মাঝেই হঠাৎ আর্যর কানে এল দূর থেকে আসা কিছু মহিলার ফিসফিসানি কথপোকথন—
– “আচ্ছা, ওই পিচ্চি মেয়েটা কে রে?”
আরেকজন জবাব দিল—
– “আরে, ওই মেয়েটা ওই ছেলেটার বউ! আসার পরই তো আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন শেহনাজ ভাবি।”
কথাটা শুনে কিছুটা মুখ বাঁকিয়ে প্রথম মহিলাটি বললেন—

– “তাই নাকি! দেখে তো বোঝার উপায়ই নেই যে মেয়েটা ওই ছেলেটার বউ! না আছে নাকে নাকফুল, না আছে হাতে চুড়ি—কী দেখে বুঝব বল? এমনিতে দেখতে তো এইটুকু একটা মেয়ে, ছেলেটার কাঁধের সমানও হচ্ছে না! দেখেশুনে বোঝার উপায় আছে যে ওটা ওই ছেলেটার বউ?”
আর্য কথাগুলো শুনে কিছুই বলল না, বরং পুষ্পর হাত ধরে নিজেই ওপরের দিকে চলে গেল। নিজের রুমে এসে তার অন্য ফোনটা পুষ্পর হাতে দিয়ে বলল—
– “এই ফোনে মুভি দেখো। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব, ওকে? তখন আর একা লাগবে না।”
কথাটি বলে সে পুষ্পর কপালে একটা চুমু দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পুষ্প অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো আর্যর যাওয়ার পথের দিকে। সে ভীষণ অবাক হয় এই সরকার সাহেব কে দেখে, আবার মনে মনে বেশ খুশিও হয়। সে এখন শুধু তার সরকার সাহেবের সাথেই থাকতে চায়; প্রতি দিনে অন্তত একবার হলেও সরকার সাহেবের হাতে খেতে চায় আবার রাতে সরকার সাহেবের বুকে জড়িয়ে ঘুমাতে চায়—এর বেশি আর কিছু চাওয়ার নেই! রমণী নিজের কপালে হাত ছোঁয়ালো, ঠিক যে জায়গায় একটু আগে আর্য চুমু দিয়ে গেছে; আর তাতেই পুষ্পর ঠোঁট আপনাআপনি প্রসারিত হয়ে এক মিষ্টি হাসিতে ভরে উঠল।
এরই মধ্যে সেখানে সারা এসে হাজির হলো। যাওয়ার আগে আর্যই সারাকে এই রুমে আসার কথা বলে গিয়েছিল। সারাকে দেখেই পুষ্প এগিয়ে গিয়ে তার সাথে গল্প শুরু করে দিল। আর ঠিক তখনই হঠাৎ পুষ্প বলে উঠল—

– “সারা, তোর সাথে স্নিগ্ধ স্যারের কি কোনো সম্পর্ক আছে?”
হঠাৎ পুষ্পর এমন কথায় থমকে গেল সারা! পুষ্প কি কোনোভাবে তাদের অতীত সম্পর্কের কথা জেনে গেছে? কে বলেছে? স্নিগ্ধ? নাহ, নাহ! স্নিগ্ধ কেন বলতে যাবে, যেখানে সে নিজেই অন্য একটা বিয়ে করছে? সারা নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে একদম স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
– “কেন? হঠাৎ তোর এমন কেন মনে হলো? কী এমন ঘটল যে তোর মনে হচ্ছে আমাদের কোনো সম্পর্ক আছে?”
– “মনে হওয়ার তো অনেক কারণ আছে!”

সিমরানের নানুর বাড়ির দিকের কাজিনরা মিলে সিমরানকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসেছে। তারা সবাই মিলে ঠিক করছে—আগামীকালের মেহেদি অনুষ্ঠানে কে কেমন সাজবে আর কী ধরনের জুয়েলারি পরবে ইত্যাদি। অথচ যার বিয়ে, তার যেন কোনো হুঁশই নেই! সে সশরীরে উপস্থিত থাকলেও তার মন যেন অন্য কোথাও পড়ে আছে। সিমরান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল; তার এই শোরগোল এত মানুষের ভিড় একদম ভালো লাগছে না। সে যখনই ওপরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, অমনি তার চোখ গিয়ে পড়ল সদর দরজার দিকে। সিমরানের চোখ ওখানেই থমকে গেল!
আর্য আসছে, আর তার ঠিক পেছনেই হেঁটে আসছে ইভান। আর্য নিজেই ইভানকে আনতে গেছে। শেষবার যখন ইভান বাড়িতে এসেছিল, তখন আর্য রেগে ইভানকে মেরেছিল—সেটার জন্য সে সরি বলেছে এবং ইভানকে এখন নিজের সাথে করে নিয়ে এসেছে। ইভানও বন্ধুর ওপর রাগ করে বসে থাকেনি, কারণ ভুল তো তারই ছিল! না জেনে সে বন্ধুর বউয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল; আর্যর জায়গায় সে থাকলেও হয়তো একই কাজ করত। বন্ধুর ওপর তার কোনো রাগ না থাকলেও সে আসলে এখানে আসতে চায়নি, কারণ সে সিমরানের মুখোমুখি হতে চাইছিল না। সিমরানের বিয়ের খবর শুনে সে খুশিই হয়েছিল—যাক, মেয়েটা তাকে ভুলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে চলেছে। সেখানে নিজে সিমরানের সামনে এসে তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চায়নি সে। আর একটা বড় কারণ ছিল—তার ‘মায়াবিনী’।

বন্ধুর খুশিতে সে যতই খুশি হোক না কেন, সেই খুশির কারণ যে তার সেই মায়াবিনী, তা মানতে তার খুব কষ্ট হয়। সে হাজার চেষ্টা করেও মন ও মস্তিষ্ক থেকে ওই ভীত হরিণী চোখের মেয়েটাকে কিছুতেই বের করে দিতে পারছে না! আর্য জোর করে তাকে ধরে নিয়ে এসেছে, তাই সে বাধ্য হয়ে এসেছে। যদি আর্য বুঝতে পেরে যায় যে সে পুষ্পকে পছন্দ করে—পছন্দ বলা ভুল হবে, সে আসলে ভালোবেসে ফেলেছে—তাহলে যদি তাদের বন্ধুত্বে কোনো আঁচ লাগে! এই ভয়ে সে নিজেকে বাইরে থেকে স্বাভাবিক রেখে এখানে এসেছে নিজের মনের ওপর পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। অথচ তার নিজেরই তো বুকের ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে! আসার সময় সে আর্যর পাগলামি নিজের চোখে দেখেছে—বউয়ের জন্য চুড়ি বা নাকফুল কোনটা রেখে কোনটা নেবে, তা ঠিক করতে না পেরে সে ইভানকেই জিজ্ঞেস করছিল কোনটা ভালো লাগবে। শেষ পর্যন্ত কোনটা বাদ দেবে বুঝতে না পেরে যে যে ডিজাইন পছন্দ হয়েছে, তার সবই সে নিয়ে নিয়েছে!

এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ ইভানের চোখ গিয়ে পড়ল ড্রয়িংরুমে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা সিমরানের ওপর। নিস্প্রভ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ইভানের তখন কী হলো কে জানে, সে চোখ নামিয়ে নিল; সে ওই চোখের দিকে তাকাতে পারছে না! কী রকম তৃষ্ণার্ত চোখে মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে আছে! সে নিজে যে কষ্ট পাচ্ছে, সেই কষ্টটাই তো সে ওই মেয়েটাকে নিজের হাতে দিয়েছে! কোথাও যেন বুকের ভেতরটায় একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব হলো। মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না—চোখের নিচের অংশ বসে গেছে, গত কয়েক দিনে শুকিয়ে গেছে অনেকটাই! দেখে মনে হচ্ছে সে ঠিকমতো খাচ্ছেও না, ঘুমাচ্ছেও না। ইভানের ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগল। এই সবকিছুর জন্য কি কোনোভাবে সে নিজে দায়ী? কিন্তু সে-ই বা কী করবে? ভালোবাসা তো জোর করে হয় না!

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৮

নিজের এই অস্বস্তি আড়াল করার জন্য সে একটা ফেক কল আসার ভান করে আর্যকে বলল সে একটু ঘুরে আসছে, তারপর সে উল্টো দিকে পা বাড়াল।
ইভানকে আবার উল্টো দিকে চলে যেতে দেখে অদ্ভুত ভাবে হাসে সিমরান বিষাময় এক হাসি। তার চোখের কোণ ইতিমধ্যে ভিজে উঠেছে; একটু হলেই হয়তো সবার সামনে কেঁদে ফেলত সে! তাই তো নিজের কান্না কোনোমতে আড়াল করে সে দৌড়ে ওপরের দিকে চলে গেল।

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here