অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮ (২)
ফাহিমা ইসলাম
রাত্রির গাঢ় অন্ধকার সরে গিয়ে প্রভাতের রক্তিম আলোর ধীর উন্মোচন হয়েছে। সময়ের এই সূক্ষ্ম সন্ধিক্ষণ, যেখানে নিশীথের নিঃশ্বাস মিশে যাশ দিবাকরের উষ্ণতায়। আকাশের বিস্তৃত ক্যানভাসে সূর্য আবারও পুনর্জন্ম নিয়েছে, তার আলো ছড়িয়ে পড়েছে নিস্তব্ধ পৃথিবীর বুকে। পক্ষীকুল নীড় ত্যাগ করে উড়ে যাচ্ছে। সীমাহীন নীলিমায় স্বাধীনতার উল্লাসে ভরপুর, অথচ বৃক্ষরাজি শিকড়ে আবদ্ধ থেকেও স্থির এক নীরব মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই মুহূর্ত না সম্পূর্ণ সকাল, না পূর্ণ দুপুর বরং তাদের মধ্যবর্তী এক অদ্ভুত স্থবিরতা,
এই স্থবিরতার মাঝে বাগানের এক কোণে তূর্ণা আর রোদেলা তাদের নিজস্ব ছোট্ট জগতে মগ্ন। চারপাশে মালিরা ব্যস্ত আগাছা পরিষ্কারে, অথচ এই দুই নিষ্পাপ প্রাণ দু’টি অন্য এক জগতে বিচরণ করছে। তূর্ণার ক্ষুদ্র আঙুলগুলো ফুলের পাপড়ি ছুঁয়ে কিছু একটিকে বানাতে চাইছে কিন্তু পারছে না।
হঠাৎই সেই নির্মল মুহূর্তে অনুপ্রবেশ ঘটে এক অপরিচিত সুরের। এক নারীকণ্ঠ, শান্ত অথচ গভীর, রোদেলার নাম উচ্চারণ করে। হঠাৎ নিজের নাম শুনে রোদেলা থেমে যায়। তার দৃষ্টি সেদিকে ঘুরতেই সামনে ভেসে ওঠে এক অচেনা মুখ। তূর্ণাও তাকায়, কিন্তু সে চিনতে সক্ষম হলো না। যেন অতীতের কোনো সম্পর্ক আজ স্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। প্রীয়তি দারোয়ানের সঙ্গে একপ্রকার তর্ক করে ভিতরে চলে আসে, তাদের এইদিকেই এগিয়ে আসচ্ছে। রোদেলা তখনও চেয়ে আছে প্রীয়তির দিকে, যে জন্মদাত্রী মা জন্মের দু’মাসের দুধের শিশুকে ফেলে চলে যেতে পারে। সে মা’কে না চেনারই কথা, প্রীয়তি এগিয়ে এসে হুট করে রোদেলাকে কোলে তুলে নেয়। নিয়েই রোদেলাকে আদর করতে থাকে, তবে রোদেলা থাকতে চাইলো না প্রীয়তির নিকট। ছুটার চেষ্টা করলো সে, সন্তানেরা তো মায়ের গায়ের গন্ধ চেয়ে তাহলে রোদেলাকে চিনছে না কেনো? এত বছর দূরত্ব ছিল বলে তার গা থেকে মা মা গন্ধ গায়েব হয়ে গেছে?
এটা সত্যি সে এত তাড়াতাড়ি মা হতে চায়নি, তবে আল্লাহ যা ঠিক করে রাখেন সেটাই হয়। প্রীয়তি চেনেছিল রৌদ্রিকে না জানিয়ে বাচ্চাটা অ্যাবরশন করে ফেলতে চেয়েছিল; কিন্ত ভাগ্যবশত রৌদ্রিক তার প্রেগন্যান্সির কথা জেনে যায়। তারপর প্রীয়তি কোনো ভাবেই বাচ্চাটাকে অ্যাবরশন করতে পারেনা। রৌদ্রিকেরও এই বাচ্চার উপর সমান অধিকার ছিল, আর রৌদ্রিক তার বাচ্চাকে চায়। তাই প্রীয়তিকে না চাইতেও মানতে হয়। তারপরও রোদেলার প্রতি তার টান আসেনি, হয়তো সে সেই সময়টাকে মা হওয়ার অনুভূতিকে বুঝতে সক্ষম হয়নি।কোনো মা কি এত নিষ্টুর হতে পারে? হয়তো হ্যাঁ আবার না, কারণ সব মা যেমন এক হয় না তেমনি সেও মায়ের সেই মমতাময়ী রূপটা তাকে আঁকড়ে ধরতে পারেনি। তাই হয়তো আজকে তার গা থেকে মা মা গন্ধটা নেই! রোদেলা এবার ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে দেয়। তূর্ণা এবার আর চুপ থাকলো না, রোদেলা কান্না দেখে এগয়িে এসে রোদেলাকে নিতে চেয়ে রাগী গলায় বলে-
“ এই পঁচা মেয়ে আমার পুতুলকে দাও। ওকে কেনো নিয়েছো তুমি? আমূর পুতুলকে আমার কাছে দাও, দাও বলছি!”
কথাটুকু বলেই নিতে চাইলে প্রীয়তি মুখশ্রী শক্ত হয়ে আসে। সে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে-
“ দূরে থাক পাগল কোথাকার! ও আমার মেয়ে আর আমি ওর মা।”
প্রীয়তির এমন কথায় তূর্ণা না চাইতেও বেশ কষ্ট পেলো। নেত্র কোণ ভিজে উঠলো, নাকের পাটা ফুলিয়ে ভেজা গলায় বলে-
“ না আমি ওর মা! পুতুলের মা শুধু আমি, তুমি একটা পঁচা মেয়ে। আমার পুতুলকে দাও বলছি।”
বলেই আবারও নিতে গেলে প্রীয়তি এবার ধাক্কা দিয়ে তূর্ণাকে ফেলে দেয়। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় তূর্ণা বেগ সামলাতে না পেরে নিচে পরে যায়, এতে বেশখানিকটা ব্যথাও পায় সে। এইদিকে তূর্ণাকে পরে যেতে দেখে রোদেলা এবার আরও জোরে শব্দ করে কেঁদে ওঠে। সঙ্গে বার বার ‘মা’ ‘মা’ করে আর্তনাদ করে ওঠে! তূর্ণা এবার না চাইতেও তার চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরে। প্রীয়তি রোদেলার কান্না থামাতে থামতে বলে-
“ ডোন্ট ক্রাই বেবি! মাম্মাম এসেছি তো। দেখ আমি এসেছি, আমি তোমার মা!”
রোদেলা শুনলো না নিচে পরে থাকা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে কান্না করে যাচ্ছে। প্রীয়তির কাছ থেকে ছাড়া পেতে চাইছে, তূর্ণা আবারও উঠে এসে প্রীয়তির কাছে গিয়ে রোদেলাকে নিজের কাছে নিতে চায়। প্রীয়তি দিতে চাচ্ছে না দেখে, তূর্ণা কেমন হাইপার হয়ে উঠলো। নিজের খুব প্রিয় জিনিসটা অন্যের কাছে দেখে তার সহ্য হচ্ছে না। রোদেলাকে তো তাকে মা বলে, আর সে তো তার পুতুলের মা। তাহলে প্রীয়তি কেনো বলছে সে প্রীয়তির মা নয়? সবাই বলে পুতুল তার, আর সে পুতুলের মা। না চাইতেও তূর্ণার অবুঝ মনে তীব্র এক অধিকারবোধ কাজ করলো, হিংস্র ভাবে প্রীয়তির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-
“ এই পঁচা মেয়ে আমার পুতুলকে ছাড়! ও আমার পুতুল, আমার মেয়ে। সবাই বলে তূর্ণা পুতুলের মা। ছাড় আমার পুতুলকে, আমি ওর মা। ছাড় বলছি!”
প্রীয়তি এবার ক্ষিপ্ত হয়ে গেলো, তূর্ণাকে আবারও ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলে ওঠে-
“ কিসের মেয়ে ও তোমার? সৎ মা তুমি ওর, আর আমি! আমি ওকে জন্ম দিয়েছি বুঝলে। রৌদ্রিকে জিজ্ঞেস কর রোদেলা কার মেয়ে৷ তাই ও তোমার মেয়ে না, ও আমার মেয়ে।”
প্রীয়তির এমন কথা শুনে তূর্ণা যেনো আরও হাইপার হয়ে উঠলো। মেনে নিতে পারছে না, সৎ-আপন এইসব কিছুই সে বোঝে না। শুধু এতটুকুই বোঝে রোদেলা তার পুতুল। তূর্ণা এক আকস্মিক কাজ করে বসলো। প্রীয়তির হাতে কামড় দিয়ে বসলো। প্রীয়তি হঠাৎ এমন আক্রমণের জন্য তৈরি ছিল না, প্রীয়তি হাত আলগা করতেই সে তাড়াতাড়ি করে রোদেলাকে নিজের কাছে টেনে নেয়। প্রীয়তি রক্তলাল চোখে তূর্ণার দিকে তাকায়, কিছু বলতে নিবে তার আগেই তূর্ণা বলে ওঠে-
“ পঁচা ডাইনি! পুতুল শুধু আমার মেয়ে। ওর মা আমি, বরকে আমি সব বলে দিবো, তারপর দেখ বর তোমাকে আচ্ছা করে মজা দেখাবে।”
বলেই রোদেলাকে কোলে নিয়ে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। এইদিকে প্রীয়তি রাগে কটমট দৃষ্টিতে তূর্ণার যাওয়ার পানে চেয়ে রয়, প্রায় ২ বছর পর আবারও এই সিকদার বাড়িতে পা রাখলো সে। কোনোকিছুই বদলায়নি, বদলিয়েছে শুধু সময় আর এই বাড়িতে থাকা মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক। তূর্ণা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই রুমা সিকদারকে দেখতে পায়, রোদেলাকে কাঁদতে দেখে রুমা সিকদার এগিয়ে আসেন। তূর্ণা হাঁপাতে হাঁপাতে রুমা সিকদারকে বাহিরের দিলে আঙ্গুল তাক করে বলে-
“ছোট মা, বাহিরে ওই পঁচা ডাইনিটা আমার পুতুলকে বার বার নিজের মেয়ে বলছিল। তুমিই বল, পুতুল তো আমার মেয়ে তাই না? তাহলে ওই পঁচা মেয়েটা কেনো আমার পুতুলকে ওর মেয়ে বলছিল?”
তূর্ণার কথা শুনে রুমা সিকদার কিছুই বুঝতে পারেন না। তূর্ণা এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ওঠে-
“ ছোট মা পুতুলকে আমি কিভাবে জন্ম দিবো? ওই পঁচা মেয়ে বললো ও নাকি আামর পুতুলকে জন্ম দিয়েছে তাই পুতুল ওর মেয়ে। কিন্তু তুমি তো জানো পুতুল আমার মেয়ে!”
রুমা সিকদার তূর্ণার কথা শুনে ছুটে বাহিরে চলে যান। বাহিরে বের হতেই তিনি বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রীয়তিকে দেখতে পায়। এতগুলো বছর পর প্রীয়তিকে এই বাড়িতে দেখে অবাক হয়ে যান তিনি, এতক্ষণে তূর্ণার কথাগুলোর মানে বুঝতে পেরেছে সে। প্রীয়তি রুমা সিকদারকে দেখে এগিয়ে আসে তার দিকে; এসেই তূর্ণার কামড় দেওয়ায় হাতটা সামনে তুলে ধরে হালকা ক্ষিপ্ত গলায় বলে-
“ দেখ রুমা আন্টি, ওই পাগল মেয়ে আমাকে কামড় দিয়েছে। আজকে আমাকে এইভাবে আঘাত করছে, কালকে আমার সন্তাকে করবে। তোমরা কিভাবে এই মেয়েটাকে বাড়িতে রেখেছো?”
“ তার আগে জবাব দাও তুমি এখানে কি করছো? রৌদ্রিক জানে তুমি তার অনুমতি না নিয়ে যে এই বাড়িতে এসেছো?”
রুমা সিকদারের কথায় প্রীয়তি বড় একটা দম ফেলে বলে ওঠে-
“ আন্টি তুমি কেনো ভুলে যাচ্ছো আমি রোদেলার মা। আর আমি চাইলে যেকোনো সময় আমার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারবো।”
“ আচ্ছা মানলাম তোমার কথা, কিন্তু এত বছর পর তোমার মেয়ের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে জাগলো? এর আগে এই ইচ্ছে কোথায় ছিল তোমার প্রীয়তি?”
জবা সিকদার রান্নাঘরেই ছিলেন, তিনি রোদেলার কান্নার শব্দ শুনে বাহিরো আসতেই সদর দরজায় প্রীয়তিকে দেখতে পান। প্রীয়তিকে এখানে না চাইতেও জবা সিকদার রেগে গেলেন। রাগে হনহনিয়ে এগিয়ে এলেন প্রীয়তির দিকে।
“ তুমি! তুমি এখানে কি করছো? কোন সাহসে আমার বাড়িতে পা রেখেছো তুমি?”
“ মা আমি রোদেলার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
“ কিসের মা আমি তোমার? মা ডাকবে না একদমই, আর রোদেলার সঙ্গে কিসের দেখা করা তোমার? ওর সঙ্গে সম্পর্ক আছে তোমার? নিষ্টুর মেয়ে কোথাকার, দুধের বাচ্চাকে ফেলে গেছিলে তখন কই ছিল এই দরদ?”
“ তোমরা সবাই এমন করছো কেনো? আমি আমার মেয়ের সঙ্গে দেখাও করতে পারবো না নাকি? এতদিন আসিনি, কিন্তু আজ তো এসেছি তাহলে তোমরা সবাই কেনো আমার মেয়ের সঙ্গে আমাকে দেখা করতে দিচ্ছো না?”
জবা সিকদার আরও ক্ষেপে গেলেন যেনো। তিনি নিজের রাগকে ধরে রাখতে পারছেন না, তারপরও কোনো রকমে রাগটাকে দমিয়ে বলে-
“ শোন প্রীয়তি এত বছরে মেয়ের জন্য মন পোড়েনি তাহলে আজকে হঠাৎ এই মন পোড়ার কারণ কি?”
“ দেখ তোমরা এবার বেশি বেশি করছো। কোর্টের কাছে যেতে আমি বাধ্য হব কিন্তু এবার। তোমরা সবাই আমার মেয়েকে আমার কাছে আসতে দিচ্ছো না। আর ওই পাগলের কাছে ওকে একা ছেড়ে দিয়েছো কিভাবে? দেখ আমাকে কামড়ে কি করেছে” বলেই নিজের হাতটা আবারও জবা সিকদারকে দেখালো।
“ কবে না জানি রোদেলাকেও কামড়ে দেয় এইভাবে।”
“ শোন ও পাগল হোক তাও তোমার থেকে শতগুণ ভালো আছে। দেখছো ওই মেয়ের চোখে জল, ওইটাও রোদেলার জন্য। অথচ তুমি জন্মদাত্রী মা হয়ে বাচ্চাটাকে ফেলে চলে গেছিলে। আর তোমাদের ডিভোর্সের সময় তুমিই বলেছিলে বাচ্চা তোমার চাই না। তাই কোর্টে গিয়েও লাভ নেই। এবার আসতে পারো তুমি!”
বলেই প্রীয়তির হাতটা ধরে বের করে দিলেন জবা সিকদার। দিয়েই দারোয়ানকে প্রীয়তিকে বের করে দিতে বলে, দরজা বন্ধ করে দেয়। অপমানে প্রীয়তির মুখশ্রী লাল হয়ে আসে; কেউ হাতে এইভাবে গাত ধরে বের করে দিতে পারে এর থেকে অপমানের আর কি হতে পারে? প্রীয়তী রাগে-অপমানে সেখান থেকে হনহনিয়ে চলে যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
“ প্রীয়তিকে কামড় দিয়েছো কেনো?”
জবা সিকদারের এমন শক্ত গলায় প্রশ্ন শুনে তূর্ণা হকচকিয়ে যায়। ভয়ার্ত চোখে জবা সিকদারের দিকে তাকিয়ে, আমতা আমতা করে বলে-
“ পুতুল কাঁদছিল, আর ওই পঁচা মেয়েটা বার বার বলছিল আমি নাকি পুতুলে মা নই। কিন্তু আমিই তো পুতুলের মা তাই না বল! আরও কত কি বলছিল, আর পুতুলকে দিচ্ছিল না। তাই কামড় দিয়েছি।”
জবা সিকদার শান্ত চোখে তূর্ণাকে দেখলো। মেয়েটা কেঁদে দিবে প্রায় এমন অবস্থা, জবা সিকদার হয়তো সন্তুষ্ট হলেন তূর্ণার কথায়। তারপরও গাম্ভীর্য কমালেন না, একই ভাবে বলে ওঠে-
“ তুমি যখন জানো তুমি রোদেলার মা তাহলে সেটার জন্য কান্না করছো কেনো? মানো রোদেলাকে নিজের মেয়ে? সৎ হয়ে যদি আপনের মত আগলাতে পারো তাহলে তুমিই ওর মা অন্যকেউ না।”
“ হুম মানি তো, পুতুল তো আমার মেয়ে আমি মা। কিন্তু ওই পঁচা মেয়েটা কেনো বললো আমি জন্ম দেইনি? তুমি একটু বলবে পঁচা শ্বাশুড়ি কিভাবে পুতুলকে আমি জন্ম দিবো।”
“ কারণ ও তোমার পেটের মেয়ে না, তাই বলেছে এই কথা। আর কোনোদিন কাউকে কামড় দিবে না, এইসব ভালো কাজ না।”
তূর্ণা অভিমানী স্বরে বলে-
“ আচ্ছা ঠিক আছে আর দিবো না। কিন্তু পুতুল কিন্তু আমার মেয়ে, ওকে ওই পঁচা মেয়েটার কাছে আর যেতে দিবো না।”
আকাশ গভীর কালোর গহ্বরে নিমজ্জিত, যেন সৃষ্টির আদিম অন্ধকার ফিরে এসেছে তার প্রাচীন অধিকার পুনর্দখল করতে। আজকের আকাশে চাঁদ অনুপস্থিত অথবা হয়তো মেঘের স্তূপে নির্বাসিত, আর তারা? তারা যেন ভয়ে নিজেদের আলো গুটিয়ে নিয়েছে। রোদেলাকে শক্ত করে নিজের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে তূর্ণা। প্রীয়তি যাওয়ার পর থেকে সে কিছুতেই রোদেলাকে নিজের কাছ ছাড়া করছে না, প্রীয়তির কথাগুলো তার মনে বেশ দাগ কেটেছে। তাই না চাইতেও বার বার মনে হচ্ছে প্রীয়তি আবারও এসে বলবে রোদেলা তার মেয়ে নয়, নিজের মেয়ে দাবি করবে। রৌদ্রিক রুমে এসে আস্তে করে রোদেলার পাশে বসেছে, সবটা তার কানে এসেছে। প্রীয়তি এখানে আসবে সেটা ভাবতে পারেনি সে।
রৌদ্রিক তার জীবনে পার হওয়া জিনিসগুলো অতীতেই সীমাবদ্ধ রাখে, তার বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতে অতীতের কোনো জায়গা নেই। সেখানে প্রীয়তি তার অতীত আর সে তার জীবনে ফেলে আসা জিনিস দ্বিতীয় ফিরিয়ে আনে না নিজের কাছে। সেখানে প্রীয়তির সঙ্গে তার সম্পর্কের সমাপ্তি টেনেছে আরও ২ বছর আগেই। প্রীয়তি রোদেলার প্রতি হঠাৎ টানের কারণটা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারছে ;তবে প্রীয়তি যেটা চায় সেটা কোনোদিনও সম্ভব নয়। তূর্ণা আজকে নাহয় কিছু না বুঝুক, কিন্তু কাল যখন ঠিক হবে তখন তাদের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হবে সেটাও অজানা রৌদ্রিকের নিকট। তার জীবনের সঙ্গে তূর্ণা আকস্মিক ভাবে জুড়ে গেছে, তূর্ণা পুরোপুরি সুস্থ না হলেও নরমাল হবে। তখন হয়তো তার মত পুরুষকে মেনে নাও নিতে পারে। সমাজে পুরুষের কলঙ্ককে কলঙ্ক হিসেবে গণ্য না করা হলেও এটাও তোদের একটা ক্রটি। অথচ সমাজ কোনোদিনও ছেলেদের ক্ষেত্রে এই ক্রটিকে ক্রটি হিসেবে দেখে না; কিন্তু একটা মেয়ের জীবনের সামান্য ক্রটিকে তারা কলঙ্কের তকমা পরিয়ে দেয়।
রৌদ্রিক নিজেই একটা ক্রটি যুক্ত মানুষ। তার জীবনে তূর্ণা আগেও একজন ছিল, যাকে যে ভালোবেসেছিল। সব মেয়েরই স্বপ্ন সে তার স্বামীর জীবনের প্রথম নারী হবে, প্রথম ভালোবাসা হবে। কিন্তু সে তো কোনোটাই দিতে পারেনি তূর্ণাকে, তূর্ণা মানসিক অবস্থার জন্য তাকে সমাজে চোখে একজন পাগল হিসেবে বিবেচিত করা হয়। যদি সে সুস্থ হয়েও একজন ডিভোর্সি নারী হতো তখনও সে একই দোষের ভাগিদার হতো; তাও বিনা অপরাধে। রৌদ্রিক উঠে পারলো, বসলো না। জীবনের অনেকটা পথ চলা বাকি তার। সঙ্গে নতুন একজনেট দায়িত্ব তার কাঁধে এসেছে, আর সে সেই দায়িত্ব নিজের সবটুকু দিয়ে পালন করবে। ভালোবাসা হলে একদিন ঠিকই ভালোবেসে নিবে তার এই হৃদয়! তাই নিজের উপর জোর খাটায় না রৌদ্রিক।
বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা বয়ে চলেছে। রাত হওয়ায় বাসার সকলেই গম্ভীর নিদ্রায় মগ্ন, বাসা ভর্তি মানুষ। ইরা চুপিচুপি নিজের ঘর থেকে বের হয়েছে কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে। অতি সাবধানের সঙ্গে মেইন দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। রাতের দুটো বাজে, আর সে এখন পালাচ্ছে। তাও নিজের বাড়ি থেকে, কারণ একটাই সকাল হতেই তার বিয়ে। আর সে বিয়ে করবে না, তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। যতোদিন বাড়ির পরিবেশ ঠান্ডা হবে না ততোদিন আর ফিরবে না সে, এখান থেকে সোজা চট্টগ্রাম যাবে সে এক ফ্রেন্ডের বাসায়। ভোরের দিকে ট্রেন আছে তার।
বাসা থেকে নেমে সোজা রাস্তায় এসে দাঁড়ায়, বাসার সামনেই একটা সিএনজি। এত রাতে সিএনজি পাওয়া কথা নয়, কিন্তু এটা পরিচিত মানুষের হওয়ায় সহজেই হয়ে গেছে সব। ইরা এগিয়ে আসতেই ভিতরে থাকা তানভীর আর মরিয়ম তাড়াতাড়ি ঢুকতে বসে ভিতরে। তারা তিনজন যাচ্ছে চট্টগ্রাম। ইরা ভিতরে বসতেই সিএনজি চলতে শুরু করে কমলাপুর রেলস্টেশনের দিকে। ইরা সিএনজিতে বসেই নিজেট ফোন থেকে সিম কার্ডটা খুলে রেখে দেয়, মরিয়ম ইরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ তোকে কেউ দেখেনি তো? যদি ধরা করিস আমি নাই ভাই, এমনি জীবনে বাঁশের অভাব নাই। আবার নতুন বাঁশ এড হইলে আমারে আর খুঁজে পাবি না।”
“ আরে না কেউ দেখে নাই। সবাই ঘুম, ভাই আমার কি আনন্দ লাগতাছে! প্রথমবার এমন একা একা এত দূর ঘুরতে যাচ্ছি।”
“ হ ধরা পরলে সব আনন্দ একদম বের হবে। কাকে সারাদিন জার্নি করতে হবে। আচ্ছা তুই বিয়ে করলি না কেন? ছেলেটা খারাপ ছিল না কিন্তু।”
মরিয়মের কথায় বিরক্ত হলো ইরা। নাক-মুখ কুঁচকিয়ে বলে ওঠে-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮
“ শা’লা এক নাম্বারের লুইচ্চা। সবার সামনে এমন ভাবে থাকে যেনো ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেতে পারে না৷ জানিস কালকে রাতে ফোন দিয়ে কি বলে শা’লা। বিয়ে করেই নাকি কক্সে যাবে, কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করতে। বুঝোস কি শয়তান! ওর সাথে কথা হইছে এই নিয়ে দুই বার তাতেই এত কিছু।”
ইরার কথায় হেসে ওঠে মরিয়ম৷ হাসতে হাসতে বলে-
“ ওমা এটা তো ভালো রোমান্টিক পোলা পাইতে যাইয়া হারাইলি।”
“ রাখ তোর রোমান্টিক! তোর লাগলে তুই বিয়া কর।”
