অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮ (৩)
ফাহিমা ইসলাম
রাত্রির রক্তমাখা উন্মত্ততার বিপরীতে, আজকের দিনটি যেন প্রকৃতির এক অনিন্দ্য, উজ্জ্বল, দীপ্তিময় প্রভাত।
সূর্য তার স্বর্ণাভ আভা মেলে আকাশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে কোমল দীপ্তি, বাতাসে মিশে আছে শিউলি-ঝরা স্মৃতির মতো নরম সুবাস, আর চারপাশে লাল-সাদা রঙের উৎসবমুখর উচ্ছ্বাস। ঢাকের তালে তালে স্পন্দিত হচ্ছে নগরীর প্রাণ, আলপনার রঙিন রেখাগুলো মাটির বুকে এঁকে দিচ্ছে উৎসবের জীবন্ত কবিতা। আজ ‘পহেলা বৈশাখ’ নবসূচনা, নবজন্ম, আর ভাঙাচোরা আত্মার পুনর্জাগরণের দিন। বাংলার নিউ ইয়ার বলা হয় এই পহেলা বৈশাখকে। নতুন রূপে সেজে উঠেছে প্রতিটা কোণা, সকলেই বৈশাখের আমেজে মেতে উঠেছে। বৈশাখ মানেই নতুন রূপে সেজে ওঠা বাঙালিদের এক নীতি। সকলেই নিজেদে লাল-সাদায় রাঙিয়ে রাখে এই দিনটায়। বিশাল জায়গা জুড়ে বৈশাখ মেলা বসেছে। সারা মেলা নিজেদের এক উচ্ছাসে মেতে আছে,এই উচ্ছলতার ভিড়েই দাঁড়িয়ে আছে তূর্ণা।
লাল-সাদা শাড়িতে আবৃত তার ক্ষীণদেহ, কপালে টানা সিঁদুরের বিন্দু নয় বরং এক টুকরো লাল টিপ, যা তার নিষ্পাপ মুখশ্রীতে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা এনে দিয়েছে। কোমর ছুঁয়ে থাকা খোলা চুলগুলো হালকা বাতাসে দুলে উঠছে, যেন প্রতিটি কেশগুচ্ছ নিজেই কোনো অজানা ছন্দে নৃত্যরত। চোখদুটি স্বচ্ছ, নির্মল, শিশুসুলভ বিস্ময়ে ভরা; সেখানে নেই জটিলতার ছায়া, নেই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার কোনো চিহ্ন। তার ঠোঁটে লেগে আছে এক অবাধ, অনাবিল হাসি যা কোনো প্রাপ্তবয়স্কের নয়, বরং এক শিশুমনের নির্ভেজাল উচ্ছ্বাস। প্রথমবার এতবড় মেলা দেখতে পাওয়ায় তার এই উল্লাস! ‘পহেলা বৈশাখ’ কি সেটা সম্পূর্ণ অজানা তূর্ণার নিকট। জীবনে কোনোদিন এমন কিছুর অংশ হয়েছে কিনা সন্দেহ।
“ দেখো! ওটা দেখো!”
তূর্ণা হঠাৎ হাততালি দিয়ে উঠল, একটা রঙিন মুখোশের দোকানের দিকে আঙুল তুলে। তার চোখে সে
এই দীপ্তি, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন আবিষ্কার করেছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্রিক। কোলে লাল-সাদা রঙের ফ্রক পরে আছে। মাথায় লাল রঙে বো হেডব্যান্ট। যার কারণে আস্ত একটা পুতুল লাগছে, মনে হচ্ছে শিল্পের হাতে অতি যত্নসহকারে কেউ এই জীবন্ত পুতুলকে তৈরি করেছে। গাঢ় পাঞ্জাবিতে মোড়ানো রৌদ্রিকের দীর্ঘদেহ, চোখে চিরচেনা সেই গাম্ভীর্য ঠাডা। যেন সে নিজেই এক নিঃশব্দ প্রাচীর।
রৌদ্রিক কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকে তূর্ণার দিকে।
“তূর্ণা…”
তূর্ণা ঘুরে দাঁড়ায়, তার চুলগুলো বাতাসে উড়ে গিয়ে মুখে পড়ে, আর সে শিশুসুলভ বিরক্তিতে তা সরিয়ে নেয়। তারপর রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আবদারের স্বরে বলে-
“আমাকে ওইটা কিনে দেবে বর?”
রৌদ্রিকের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে যা তার গম্ভীর মুখাবয়বকে আরও গভীর, আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। রোদেলা এদিক-ওদিক দেখছে,
“ দিবো, চল।”
তূর্ণা খুশিতে প্রায় লাফিয়ে ওঠে। তার এই হাসি যেনো চারপাশের কোলাহলকেও হার মানায়। রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে-
“ মা তাবু।”
রৌদ্রিকের মেয়ের কথা শুনে মেয়েকে নিজের সঙ্গে আলগে নিয়ে বলে-
“ এখন না রোদ, এখানে অনেক ভিড়। পরে যাও।”
রোদেলা ঠোঁট উল্টিয়ে বাবার কথা মেনে নিলো। আজ হঠাৎ কি মনে করে রোদেলা আর তূর্ণাকে নিয়ে এই মেলা এলো। তূর্ণা কিভাবে বড় হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ অবগত না হলেও, বুঝেছে মেয়েটা এইসবের সঙ্গে পরিচিত নয়। তাই নিয়ে এসেছে, রুমা সিকদার তাই সুন্দর করে তূর্ণাকে সাজিয়ে দিয়েছে। এই প্রথম তারা তিনজন একসঙ্গে বের হয়েছে, এর আগেও একবার বের হয়েছিল। কিন্তু তখন সেখানে রিনি ছিল, কিন্তু আজকে তারা তিনজন। রৌদ্রিক ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো দোকানের দিকে, পাশেই তূর্ণাও তার সঙ্গে মিলিয়ে হাঁটছে। হঠাৎই ভিড়ের মাঝে হালকা ধাক্কায় তূর্ণা টলতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে রৌদ্রিক তাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। তার বাহুর দৃঢ় আবরণে তূর্ণা থেমে যায় দুজনের মাঝে ক্ষণিকের নীরবতা। তূর্ণা মাথা তুলে তাকায় তার দিকে চোখে নিখাদ আস্থা, কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো ভয় নেই। নিষ্পাপ ভাবে তাকিয়ে আছে তার দিকে এক স্নিগ্ধ হাসিমাখা মুখ নিয়ে। তবে রৌদ্রিক, সে প্রথমবারের মতো নিজের ভেতরের অদ্ভুত কম্পনটাকে স্পষ্ট অনুভব করে। ভিড়ের মধ্যে আস্তে করে একহাত দিয়ে তূর্ণার নরম হাতটা নিজের হাতের মধ্যে আবদ্ধ করে নিলো। এই প্রথম সে নিজ থেকে তূর্ণাকে স্পর্শ করছে।
“ সাবধানে হাঁটো।”
চারপাশে ঢাকের তালে তালে উৎসব, মানুষের ভিড়ে রঙের উচ্ছ্বাস, আর সেই উচ্ছ্বাসের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে দুটি ভিন্ন জগতের মানুষ। একজন বাস্তবের কঠিন দেয়ালে বন্দী, আরেকজন নিজের নির্মল স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যাওয়া। এগিয়ে গেলো মাটির তৈরির হস্তশিল্পের দোকানের দিকে, সেখানে মাটির তৈরি ছোট ছোট নানা ধরনের খেলনার দ্রব্যাদি। সেগুলো দেখে রোদেলা আর তূর্ণার দু’জনেরই চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে৷ তূর্ণা হাত বাড়িয়ে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল তুলে নিলো। একটা পাতিল তুলে নিয়ে রৌদ্রিকে দেখি আহ্লাদী স্বরে বলে-
“ এটা দিয়ে আমি আপনার আর পুতুলের জন্য ভাত রান্না করবো। আমাকে এইগুলো কিনে দিন, আমি সব রান্না করবো এখানে।”
“ বাহ বেশ ভালো তো! তা আঁটবে তো সবার খাবার? যা যা পছন্দ হয় সেগুলো নিয়ে নাও। আর রোদ সোনা তোমার কি কি পছন্দ?”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮ (২)
রৌদ্রিক বলেই মেয়েকে হালকা জিনিসগুলের কাছে নিয়ে গেলো। রোদেলা পছন্দ মত হাত দিয়ে এটা-ওটা দেখিয়ে দিচ্ছে। রৌদ্রিক দোকানদার কে বলে সবকিছু কিনে নিলো। রোদেলা আর তূর্ণার খুশি দেখে কে! দুইজন কিভাবে, কিভাবে খেলবে সেটা নিয়ে বিশ্লেষণ করায় ব্যস্ত। রৌদ্রিক নিরব শ্রোতা হয়ে তাদের এইসব কথা শোনায় মগ্ন, না সে বিরক্ত নয় বরং তার খারাপও লাগছে না রোদেলা আর তূর্ণার কথা শুনতে। কিসব আজগুবি কথায় ব্যস্ত তারা! রৌদ্রিক ওষ্ঠপুট হালকা বাঁকিয়ে হাসে এইসব শুনে।
