Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৯

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৯

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৯
ফাহিমা ইসলাম

নির্মল প্রভাত সময়ের এই পবিত্র প্রহর, যখন সূর্যের সোনালি আভা ধরণীর বুকে নীরব আশীর্বাদের মতো নেমে আসে। শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকা স্বচ্ছ কণাগুলো যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্র হয়ে ঝলমল করছে। বাতাসে মৃদু কুসুম গন্ধ, আকাশ নীলের গভীরতায় বিস্তৃত, আর দূরের বৃক্ষরাজি রোদের কোমল স্পর্শে যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। কিন্তু এই শান্তির আবরণ ভেদ করেই হঠাৎ ছিন্নভিন্ন হয়ে ওঠে এক করুণ আর্তনাদ।যেন শান্ত স্রোতের বুকে আচমকা আছড়ে পড়া বজ্রাঘাত। তূর্ণার নিদ্রিত দেহটা হঠাৎই প্রবল ছটফটানিতে কেঁপে ওঠে; তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত, বিশৃঙ্খল ভাবে ওঠানামা করছে। যেন বক্ষগহ্বরের অন্তঃস্থলে বায়ু নিজেই বন্দিত্বে হাহাকার করছে। ললাটে সঞ্চিত ঘামবিন্দু, কাঁপমান অধর, আর বন্ধ নেত্রের পল্লবের অন্তরালে সুস্পষ্ট আতঙ্কের ঝড়।

“না… না… ছুঁইও না…!!”
ভাঙা কণ্ঠে অস্পষ্ট আর্তি বেরিয়ে আসে তার ঠোঁট ফাঁক দিয়ে। তার হাত দুটো শূন্যে ছটফট করছে;যেন কোনো অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেকে বাঁচাতে চাইছে।
সময়ের পাল্লা দিয়ে তূর্ণার ছটপটানি যেনো বেরেই চলেছে। সময়ের অনুপ্রবাহের সাথে তূর্ণার এই ছটফটানি ক্রমাগত তীব্রতর হতে থাকে গলা কা’টা মুরগীর মতো এই ছটপটানি, এই নিস্তব্ধতায় আবৃত কক্ষজুড়ে বজ্রপাতসম প্রতিধ্বনি করে তুলছে। কক্ষের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতেই রৌদ্রিকের প্রথমেই তার দৃষ্টি পড়ে তূর্ণার আতঙ্কিত অবস্থার দিকে। মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
“তূর্ণা…!”
সে দ্রুত এগিয়ে আসে। তূর্ণা তখনো কা’টা মুরগীর মত ছটপট করছে; রৌদ্রিক বেশ বুঝতে পারলো তূর্ণার ঘুমের ঘোরে প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। রৌদ্রিক বিছানার পাশে বসে তূর্ণার কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের মুঠোয় নেয়। হাতের তালু ঘঁষতে ঘঁষতে বলে অস্থির কণ্ঠে বলে ওঠে-
“শোন… আমি আছি… কিছু হয়নি।”

কিন্তু তূর্ণা যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তার শরীরটা আরও বেশি কাঁপতে থাকে, নিঃশ্বাস যেন থেমে আসছে তার। রৌদ্রিকের চোখে তখন অসহায় এক দহনের দেখা মিললো। সে ধীরে ধীরে তূর্ণাকে নিজের দিকে টেনে নেয়, একটা দৃঢ়,কোমল আলিঙ্গনে জড়িয়ে ফেলে তূর্ণাকে। তূর্ণার দেহাবশেষ চলতে থাকা কম্পন খুব ভালো করে টের পাচ্ছে রৌদ্রিক৷ প্যানিক অ্যাটাকের কারণ জানা নেই রৌদ্রিকের, কিন্তু তূর্ণা ঘুমের ঘোরে বলতে থাকা ‘ছুঁয়ো না, ছুঁয়ো না’ বিষয়টা বুঝতে পারছে সে। তাই শক্ত করে তূর্ণার হাতটা আঁকড়ে ধরে বলে-
“কেউ তোমাকে ছুঁতে পারবে না।কেউ না!”

তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, অথচ ভেতরে লুকানো প্রচণ্ড রাগ। রৌদ্রিক তার আঙুলগুলো তূর্ণার চুলে আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছে। একটা আশ্বাস, একটা নিরাপত্তার অনুভূতি পৌঁছে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করছে। কিছুখন সময়ের মধ্যে তূর্ণার যে প্যানিক অ্যাটাক শুরু সেটা বুঝতে পারেনি। এতক্ষণ সে বাগানে হাঁটাহাটি করছিল; এটা তার নিত্যদিনের কাজ। বাগান থেকে এসে ভেবেছিল তূর্ণাকে ঘুম থেকে ওঠাবে। কিছু সময় সেভাবেই অতিবাহিত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তূর্ণার ছটফটানি কমে আসে। তার নিঃশ্বাস এখনও ভারী, কিন্তু আগের মতো ছিন্নভিন্ন নয়। কিছুক্ষণ পর তূর্ণা আঁখি মেলে তাকায়। নেত্রজুড়ে এক আতঙ্কের ছায়া! জ্বলজ্বল করছে নেত্রজোড়া। রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে কেঁদে ওঠে, যেমন করে বৃষ্টি আসার আগ মুহুর্তে আকাশ কুন্ড গর্জে উঠে। রৌদ্রিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কেঁদে চলেছে। আর বার বার বলছে-
“ও আবার আসবে, কেউ আমায় ভালোবাসে না। সবাই পঁচা, মা আমাকে খুব মে’রেছে, খুব ব্যথা করছে!”
অতি কম্পিত স্বরে বলেই আবারও ফোঁপাতে থাকে। যেনো এখনো সে অতীতের সেই সীমারেখা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। তূর্ণার কথাগুলো শুনে না চাইতেও রৌদ্রিকের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
তার চোখে তখন এক ভয়ংকর কঠোরতা নেমে আসে যেন সে সেই অদৃশ্য ‘ওদের’ অস্তিত্বকেই মুছে ফেলতে চায়।

“কেউ আসবে না তূর্ণার। আমি আছি তো এখানে।” অতি শান্ত স্বরে কথাটুকু বলে থেমে যায়। তারপর হালকা গম্ভীর স্বরে আবারও বলে-
“যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, কেউ তোমাকে আর ছুঁতে পারবে না।”
তূর্ণার দেহাবশেষ ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পরলো রৌদ্রিকের বাহুতে। জ্ঞানহীন হয়ে বাহুতেই সেইভাবে পরে রয়; রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তূর্ণাকে সে যত ভালো রাখতে চায়, মেয়েটার উপর যেনো বিপদ ততোই বেড়ে যায়। মেয়েটার উপর সেই সময়ই বিপর্যয় আসে, যখন সে অনুপস্থিত থাকে। তার উপস্থিতিতে কারো সাহস নেই তূর্ণাকে কিছু বলবে, তাই তো তার অনুপস্থিতিতে মেয়েটার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। রৌদ্রিক আস্তে করে তূর্ণাকে ঠিক ভাবে শুইয়ে দিয়ে, বিছানা থেকে নেমে যায়। তূর্ণার সম্পূর্ণ শরীর ঘেমে একাকার! রৌদ্রিক বাহিরে গিয়ে রুমা সিকদারকে ডেকে এনে তূর্ণার সারা পানি দিয়ে মুছিয়ে নেয়।

“ শোন রৌদ্র ওকে একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাস। মেয়েটার মানসিক অবস্থা বোধহয় ভালো না, যে যখন পারছে মেয়েটাকে আঘাত করে যায়। তুই তো থাকিস কাজে, আমি যতক্ষণ ওর কাছে থাকি না সেই সময়টাতেই মেয়েটা আঘাত পায় বেশি। ওর এই ভয়টা ওর অতীতকে ঘিরে, ওই বাড়িতে মেয়েটার উপর বেশ অত্যাচার করা হতো। সারা গায়ে কালচে দাগ দিয়ে ভরা।”
রুমা সিকদারের কথা শুনে না চাইতেও রৌদ্রিকের গাম্ভীর্যের ঠাসা মুখশ্রী শক্ত হয়ে আসে। মানুষ কতটা নিকৃষ্ট হলে এমন অসুস্থ মানুষকেও ছাড়ে না। রৌদ্রিক রুমা সিকদারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে-
“ মা কি এখনো তূর্ণা সঙ্গে রুড বিহেব করে? জানি মা মেনে নিতে পারেনি তারপরও ওর উপর এমনটা করতে বারণ কর। আমি বললে কষ্ট পাবে তাই বলিনি কোনোদিন কিছু।”
রুমা সিকদার হালকা হেসে জবাব দেয়-
“ আরে না, আপা একটু রেগে আছে। ওইটাও ঠিক হয়ে যাবে, আগের থেকে বেশ নরম হয়ে এসেছে আপা। চিন্তা করিস না। জানিস তো আপা কেমন, কয়দিন পরই দেখবি নিজেই তূর্ণার খেয়াল রাখছে। ”
রৌদ্রিক আর কিছু বললো না, দূর থেকে শুয়ে থাকা নিস্তেজ তূর্ণার আতঙ্কগ্রস্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে রইলো।

সুবিশাল কক্ষজুড়ে নিস্তব্ধতা বিরাজমান৷ খোলা বিশাল বারান্দায় দিয়ে সোঁ সোঁ করে বাহির থেকে দমকা বাতাস প্রবেশ করছে। আঁধশোয়া অবস্থা হাতে ক্যানুলা লাগিয়ে রাখা তূর্ণার, নিস্তেজ শরীরটা কেমন আরও ফেঁকাসে রূপ ধারণ করেছে। আশ্চর্যজনক ভাবে তূর্ণার ১০৪° জ্বর চলে এসেছে, শরীরে আরও নানান সমস্যার কারণে স্যালাইন দিতে হয়েছে। কড়া মেডিসিন হওয়ায় গভীর নিদ্রায় মগ্ন প্রায় বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে। রৌদ্রিক আজকে আর হসপিটালে যায়নি, পুরোটা সময় তূর্ণার সঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছে। এখন প্রায় রাত হয়ে এসেছে, বাহিরের আজকে আর রোজকার নিয়মে চন্দ্রের দেখা মিলেনি। বৃষ্টি নামবে ধরণী জুড়ে।
রোদেলাও আজকে সারাদিন তূর্ণার কাছে আসতে পারেনি। কিন্তু এখন দেখা করার হবে পাগল হয়ে উঠেছে মেয়েটা, তাই রৌদ্রিক রোদেলাকে নিয়ে আস্তে করে রুমে আসে। তখনও তূর্ণা নিদ্রামগ্ন, রোদেলাকে বিছানায় নামিয়ে দেওয়া মাত্রই সে এগিয়ে গিয়ে তূর্ণার মাথার কাছে বসে পরে। ছোট্ট ছোট্ট নরম হাত দ্বারা তূর্ণার সমগ্র মুখশ্রীতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রোদেলা তূর্ণার মাথায় হাত রেখে আধো আধো বুলি আওড়ালো-
“ মা..মা..মা ইতু ইতু। রোদ তল রোদ তল যাদে!”
“ রোদে ডাকে না সোনা, তুমি দেখা কর। মা অসুস্থ!”
রোদেলা জ্বলজ্বল চোখে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে বলে-
“ মা উতে না.. উতে না। মা.. অদল মা অদল!”
বলেই ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে তূর্ণার গলা৷ তূর্ণা হালকা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলো হয়তো। কিছু সময় পর তূর্ণার সম্পূর্ণ জাগ্রত হলো, পিট পিট করে চোখ মেলে তাকাতেই রোদেলাট আদুরে মুখখানি চোখে পরে সর্বপ্রথম। তূর্ণা মস্তিষ্ক এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা, চারিদিকের কিছুই তার বুঝে আসচ্ছে না। চতুর্থদিকে চোখ ঘুরিয়ে সবটা দেখে নিলো সে, তারপর আবারও রোদেলার দিকে তাকালো। তূর্ণাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে রোদেলা খুশি হয়ে যায়, তূর্ণার বুকে মাথা রেখে অভিমানী স্বরে বলে-

“ মা তই তিলে?”
তূর্ণা তখনো কিছুই বুঝছে না। রৌদ্রিকর তূর্ণার অবস্থাটা বুঝতে পেরে রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ রোদ, অসুস্থ সে। একটু পর যা বলার বল সোনা।”
রোদেলা কথা শুনো না, সে তূর্ণার সঙ্গে মিশে রইলো। কিছু সময় পর তূর্ণার মস্তিষ্কের স্মৃতিরা সব হানা দিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে কিছুটা স্বাভাবিক হয় সে, জ্বর হওয়ায় শরীরটা ভীষণ রকমের দূর্বল তার। তারপরও রোদেলাকে দেখতে মেয়ে তার শুকানো অধর ভাজে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। অন্যহাত দিয়ে রোদেলাকে নিজের সেই চেপে ধরে, ধীর স্বরে বলে-
“ তুমি কই ছিলে পুতুল? আমার কাছে আসোনি কেনো? তোমায় খুব মনে পরছিল আমার!”
রোদেলা আরও আদুরে বিড়াল ছানা হয়ে গেলো। বিড়ালরা যেমন আদর পেয়ে গা এলিয়ে দেয় আর একটু আদরের আশায়; ঠিক তেমনটা। রোদেলা তূর্ণার বুকের সঙ্গে মিশে আঁকিবুঁকি করতে করতে নালিশ জানিয়ে বলে-
“ তেউ আততে থেয় না মা।”

তূর্ণা বুঝলো না কিছুই, তাই চুপ করে অন্য হাত দিয়ে রোদেলার চুলগুলো বুলিয়ে দিচ্ছে৷ স্যালাইন প্রায় শেষ তাই এগিয়ে এলো বেড সাইডের টেবিলের দিকে। তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ ওইদিকে তাকাও, দেখ তো রোদের মাথায় কি লেগেছে।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা কৌতূহল নিয়ে রোদেলার মাথায় দেখতে থাকে। এর মাঝেই হুট করেই চিনচিন করে উঠলো তার হাত! আকস্মিক ভাবে এমনটা হওয়ায় তূর্ণা হালকা ভয়ে চমকে ওঠে! পাশ ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় রৌদ্রিক তার হাতে থাকা সুই বের করছে। তার তার হাত থেকে হালকা রক্ত বের হচ্ছে, যেটা রৌদ্রিক খুবই সুক্ষভাবে সাদা তুলার সাহায্যে চেপে ধরেছে সেই জায়গায়। তূর্ণা আতঙ্কিত নয়নে চেয়ে আছে সেদিক। সেটা দেখে রৌদ্রিক আশ্বাস দিয়ে বলে ওঠে-
“ কাম ডাউন, কিছু হয়নি। সি কিছু হয়নি।”
তূর্ণার ভয়টা কেটে গেলো ধীরে ধীরে। রোদেলাকে বুকে চেপেই উঠে বসার চেষ্টা করলো, সেটা দেখে রৌদ্রিক হাত বাড়িয়ে তূর্ণাকে বসিয়ে দিলো। তারপর পাশ থেকে গ্লাসে পানি নিয়ে সেটা খেতে দিলো। তূর্ণা ভদ্র মেয়ের মত খেয়ে নিলো, রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ মা..তুত হয়ে তাও। এতগুলা তুমু দিবু তুনাকে।”
বলেই ছোট ছোর চুমু দিতে থাকে তূর্ণার গালে। তূর্ণা মস্তিষ্ক এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি, সবকিছু এখনে আবছা আবছা তাই কিছুটা শান্ত। রৌদ্রিক রোদেলা আর তূর্ণাকে রেখে বাহিরে চলে যায়। স্যুপ আনার জন্য, এইসবটাতে স্যুপ খাওয়াটা রোগীর জন্য ভালো। রোদেলার দিকে তাকিয়ে তূর্ণা বলে-

“ আজকে তো আমরা রান্না করার কথা ছিল পুতুল৷ বরকে তো বলেছিলাম রান্না করবো আমি।”
“ তান্না নাই, তান্না নাই?”
রোদেলা হাত উঠিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখাচ্ছে এক আজব ছন্দ। হয়তো নিজেও জানে না এই ছন্দ দ্বারা সে কি বোঝাতে চাইছে। তূর্ণার হঠাৎ রোদেলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে বসে-
“ পুতুল আমি তোমার কে হই?”
রোদেলা তূর্ণার কথা শুনে হেসে ওঠে৷ মাথাটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে আনন্দে ভরা স্বর নিয়ে বলে-
“ মা..মা..মা।”
“ তাহলে ওই পঁচা মেয়েটার কাছে যাবে কেমন। জানো ও তোমাকে আবারও নিতে এসেছিল, আমি কত করে তোমায় ডাকলাম তুমিও শুনলে না আমার কথা। আমি অনেক কেঁদেছি জানো!”
তূর্ণা মন খারাপ করে কথাটুকু বলে। সে যা বলছে সেটা বাস্তব নয়, তবে তূর্ণার নিকট তার স্বপ্ন যেনো আর একটা বাস্তব পৃথিবী। রোদেলাকে স্বপ্নের মাঝে প্রীয়তি আবারও নিতে এসেছিলো রোদেলাকে। তাই না চাইতেও একপ্রকার আতঙ্ক ছেয়ে আছে তূর্ণার মধ্যে।
সে চিন্তামগ্ন হয়ে বলে-

“ তুমি শুধু আমার হয়ে থাকো পুতুল৷ আমি তোমাকে আবার জন্ম দিবো, তাহলে কেউ বলবে আমি তোমায় জন্ম দেইনি।”
বলেই রোদেলাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয় সে। তার প্রিয় মানুষের তালিকা খুবই কম, আর না সে কারোর প্রিয়’র তালিকায় রয়েছে৷ এখানপ আসার পর রোদেলাই একমাত্র সঙ্গী যে, সবসময় তূর্ণার সঙ্গে মিশে ছিলো। না চাইতেও অদৃশ্য এক মায়াজালে দুই জনই বাঁধা পরেছে। তাই না চাইতেও সবকিছুর মধ্যে তীব্র অধিকারবোধ এসে পরেছে তার। বিশেষ করে রোদেলার উপর। পেটের সন্তান, বা নিজ গর্ভ থেকে জন্ম দেওয়া সন্তান কাকে বলে সেটা জানা নেই তূর্ণার। তাই সে বার বার চায় জন্ম দিতে।

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিলনস্থল। পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন আর ব্যস্ত নগরজীবনের সমন্বয়ে চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অঞ্চল। ইতিহাসের পাতায় যেমন চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম, তেমনি বর্তমানেও এটি অর্থনীতি, পর্যটন ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের এসেছে আজ নিয়ে পাঁচদিন হলো ইরার। এখানে আসা হাতে ঘোরাঘুরিতেই দিন কাটছে তার। জীবনে তার অনেক সখ ছিল, বন্ধুদের সঙ্গে এইভাবে ঘোরাঘুরি করবে। ইরা তার বাড়ির খবর জানে না, সে খুব ভালো করেই জানে বাড়িতে তাকে সকলেই খুঁজছে। সে আসার আগে একটা চিঠিও রেখে এসেছে, এখন সেটা দেখেছে কি-না সেটা তার জানা নেই।
কতদিন এখানে থাকবে সেটাও জানে না, নতুন জায়গা হওয়ায় বেশ বেগ পেতে হয়েছে তাদের। কিন্তু নীলা থাকায় তেমন সমস্যা হয়নি, আজকেও নিয়ম করে ঘুরতে এসেছে তারা। মোট পাঁচ জন বেরাতে এসেছে তারা, তারা আজকে ডিসি হিলে বেরাতে এসেছে। কালকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যাবে। ইরার পরণে বাতাসি রঙের একখানা চুড়িদার। হাত জুড়ে কালো কাঁচের চুড়ি, কিছুখন আগেই এই চুড়িগুলো রাস্তা ধার থেকে কিনেছে৷ শুধু সে না, মরিয়ম, নীলা তিনজনই কিনেছে।

“ আন্টি আমাকে ফোন দিয়েছি রাতে৷ তোর কথা জিজ্ঞেস করছিলো, আমি তো বলিনি কিছু কিন্তু মনে হচ্ছে বিশ্বাস করেনি আন্টি।”
নীলার কথা শুনে ইরা বিরক্ত হয়ে গেলো। ইরা পালানোর পর তার সকল বন্ধু মহলের ফোনে হামলা চালিয়েছে তার পরিবার।
“ দিক, যা বলেছি বলতে তাই বলবি। এখন আর বাড়িতে ফিরবো না, গেলেই বাঁশ খাবো উত্তম-মধ্যম।”
হুট করেই মরিয়ম বলে ওঠে-
“ কিরে রূপার নাকি বাড়িতে ফিরে এসেছে। সৈকতের সঙ্গে পর বিয়েটা হয়নি?”
“ হুম, শা*লা বাটপার ওকেই ওক্কা দিয়ে আর একজনকে বিয়ে করেছে। ওরে বারণ করছিলাম কতবার। কিন্তু না ওর তো করাই লাগবে ওর সাথে প্রেম।”
“ ওর যার সাথে বিয়ে ঠিক হইছিল, লোকটা কিন্তু বেশ দেখতে। আমার আঙ্কেলের সার্জান ছিল, ব্যাটার যে একটা মেয়ে আছে দেখে বোঝাই যায় না। পার্সোনালিটি বেশ! শা*লি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মা’রছে।”
ইরা হালকা হেসে বলে-

“ লোকটা রূপার জন্য ছিল না। রূপার বদলে তূর্ণার ভাগ্যে ছিল তিনি। আমি খুশি হয়েছি এটা জানার পর, মেয়েটাকে কম অত্যাচার করেনি ওরা। বন্ধু হলেও ওদের একটা জিনিস আমার কোনোদিনও পছন্দ ছিল না। ভালো হয়েছে রূপার সঙ্গে বিয়ে হয়নি।”
ইরার কথা শুনে অবাক হয়ে যায় তারা। তূর্ণাকে সবাই কম-বেশি চেনে, তূর্ণার সঙ্গে তেমন দেখা না হলেও সবাই চেনে তূর্ণাকে।
“ কি বলিস, কিন্তু কিভাবে? তূর্ণা তো মানসিক ভারসাম্যহীন। যতোই হোক ওনার মত লোকের সঙ্গে তূর্ণার যায়?”
নীলার কথা শুনে ইরা বিরক্ত হলো। চোখ গরম করে নীলার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ এইভাবে বলছিস কেনো? ওর কি ভালো থাকার অধিকার নেই? আমি মনে করি লোকটা সবচেয়ে ভালো ডিসিশন নিয়েছে৷ কয়জন পারে এমন কাউকে মেনে নিতে? মেয়েটার একটা ভালোবাসার মানুষ দরকার, যে ওকে ওর মত করে বুঝবে। যদি আল্লাহ চায় সুস্থ হবে একদিন। রূপাদের সঙ্গে থাকলে ওর হয়তো ভালো হওয়াটা কোনোদিন হতো না।”
“ তাও ঠিক, কিন্তু তারপরও বেশ বেমানা লাগছে না।”
“ একদমই না। কিছু জিনিস বেমানা জিনিস আমাদের জীবনে এসে এক নতুন সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।”

দিগন্ত জুড়ে সোনালী আলোর ছড়াছড়ি। পক্ষীরাজরা নিজেদের নীড়ে ফিরে যাচ্ছে দলবেঁধে। কান্ত সূর্য বিদান নিয়ে রাত্রির আগমন ঘটাবে। ব্যস্ত নগরী তার মতোই ব্যস্ত হয়ে ছুটে চলেছে নিরুদ্দেশে। গাড়ি ছুটে চলেছে তার আপন গতিতে, খোলা জানালা দিয়ে সোঁ সোঁ করে বাতাস এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে তূর্ণার কেশরাশি গুলোকে। বার বার চুলগুলো মুখের সামনে আসায় তূর্ণা বিরক্ত হচ্ছে। জানালা বন্ধ করতে চাইছে না, বাহিরে দৃশ্য দেখতে তার বড্ড ভালো লাগছে। তাই বিরক্তির মাঝেও বাহিরের দিকে চেয়ে রয়েছে। হুট করেই অনুভব করলো কেউ তার এলোমেলো কেশ রাশিগুলো অতি যত্নসহকারে; মুখের উপর থেকে সরিয়ে দিচ্ছে৷ তূর্ণা অবাক হয়ে পিছু ফিরতেই রৌদ্রিকের গম্ভীর, অনুভূতি শূন্য মুখাবয়ব দেখতে পায়। হেয়ার ব্যান্ট দিয়ে সুন্দর করে তূর্ণার এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিলো। তূর্ণা হাসি মুখে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে রইলো, আজ-কাল তূর্ণার মধ্যে ভিন্ন এক অনুভূতির দেখা মিলছে। তার রৌদ্রিকে দেখতে প্রচন্ড রকমের ভালো লাগে। রৌদ্রিক যখন বাড়ি থাকে না সে রৌদ্রিকের বাড়িতে আসার প্রহর গুণতে থাকে। আজ-কাল তার কেমন জানি বউ বউ সাজতে ইচ্ছে করে। রৌদ্রিক যখন ছোট ছোট বিষয় গুলো খেয়াল করে তখন না চাইতেও, তূর্ণার অন্তঃকরণে প্রজাপতিরা ডানা মেলে উড়ে বেরায়। তাই তূর্ণা ইচ্ছে করে আজ-কাল অগোছালো হয়ে থাকে৷ সে অগোছালো হয়ে থাকলে, রৌদ্রিক সুন্দর ভাবে তাকে নিজ হাতে গুছিয়ে নেয়। তূর্ণার মনে হুট করেই একটা প্রশ্ন জাগলো, জানা নেই এই প্রশ্ন জাগার মানে। তূর্ণা তার নিষ্পাপ, চাতক ভরা নয়ন রৌদ্রিকের দিকে তাক করে জিজ্ঞেস করে-

“ আমি আপনার কে হই বর?”
তূর্ণার হঠাৎ এমন প্রশ্ন রৌদ্রিক ড্রাইভ করার মাঝে তূর্ণাকে দেখে নেয়। তূর্ণার মুখশ্রীর জুড়ে কৌতূহলের হাতছানি। কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে গেলো নিস্তব্ধতায়। রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তার পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে; অতি শান্ত স্বরে বলে-
“তুমি আমার কে! এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তবে মানুষের জীবনে কিছু অস্তিত্ব থাকে যার কোনো নাম হয় না। তুমি আমার ঠিক সেই নামহীন অস্তিত্ব!”
তূর্ণার রৌদ্রিকে এত কঠিন কথার মানে বুঝলো না। তাই মনটা খারাপ হয়ে গেলো, অধর জোরা ছোট বাচ্চাদের মত উল্টিয়ে অভিমানী স্বরে বলে-
“ কেনো জানেন না বর আমি আমার কে? আপনি আমার বর হলে আমি আপনার বউ, এটাও জানেন না আপনি?”
রৌদ্রিক হালকা বাঁকা হাসলো, তাকে দেখে বোঝা গেলো না আসলেই সে হাসলো নাকি না। তাকেে হাসতে দেখা যায় না সবসময়, কেমন নিস্তব্ধতায় ঘেরা এক মানব।

“ আমার বউ যেহেতু জানো তাহলে জিজ্ঞেস করছো কেনো?”
“ আপনি তো আমায় আমায় আদর করেন না। টিভিতে তো দেখেছি হিরো কি সুন্দর তার বউকে আদর করে। ”
“ টিভিতে এইসব দেখো? আদর মানে বোঝ? আদর খায় না মাথায় দেয়?”
তূর্ণা নাকের পাঠা ফুলিয়ে বলে-
“ আপনি আদরও চিনেন না বর! হিরো তার বউকে এতগুলো চুমু দেয়৷ আপনি তো আমায় চুমু দেন না।”
“ আদর মানে চুমু? তোমাকে কে বললো চুমু মানে আদর করা? তা আর কি কি অকাজের জিনিস জেনেছো টিভি থেকে?”
ভ্রু কুঁচকিয়ে জিজ্ঞেস করে সে।
“ ইসস, আমি জানি সব। চুমু দিলে পুতুল আবারও আমার পেটে আসবে, আর আমি পুতুলকে জন্ম দিবো৷ আপনি আমায় চুমু দিবেন ঠিক আছে বর।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৮ (৩)

তূর্ণার এমন কথায় রৌদ্রিকের কি উত্তর দেওয়া উচিত সেটা সত্যি তার জানা নেই৷ তূর্ণা এমন আজগুবি কথা শুনে, রাগ হবে নাকি খুশি হবে? তূর্ণাকে নিয়ে ডঃ নীরবের কাছে চেকআপের জন্য গিয়েছি। তূর্ণার অবস্থা এখনো তেমন পরিবর্তন হয়নি, তবে ধীরে ধীরে কিছুটা পরিবর্তন আসছে তার মধ্যে। আজকে নিয়ে তিন মাসে পূর্ণ হলো তাদের বিয়ে। সময় কতটা দ্রুত চলে যায়, কয়দিন আগেই তূর্ণা তার জীবনে এসেছে। অথচ দিন যাচ্ছে মেয়েটা তার অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে, তূর্ণার ছোট ছোট সবকিছুর অভ্যাস হয়ে গেলো। নাম না জানা এক অস্তিত্ব হয়ে তার অন্তঃকরণে জায়গা করে নিয়েছি তূর্ণা। রৌদ্রিক শান্ত চোখে হাসোজ্জল তূর্ণার দিকে তাকালো। মেয়েটা আবারও বাহিরের দৃশ্য দেখাতে মগ্ন হয়ে গেছে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২০