অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩
ফাহিমা ইসলাম
দিগন্ত জুড়ে রোদ্দুরেরা খিলখিল করে হেসে উঠছে, দিগন্ত জুড়ে দুই-একটা পক্ষীরাজের দেখা মিলছে। সিকদার বাড়ির আমেজে মেতে উঠেছে সকাল থেকেই, সকাল হতে না হতেই মহল্লার মানুষজন ভিড় করে ফেলেছে এই বাড়ির নতুন বউকে দেখার জন্য। সকলের মাঝেই এখনো চাপা গুঞ্জন বিদ্যমান! দুপুর হতে হতে মানুষজন আসা শুরু করবে বৌভাতের জন্য। রুমা সিকদার, আর রোমানা সিকদার ড্রইংরুমে বসে থাকা মহিলাদের খাবারের ব্যবস্থা করছে। জবা সিকদারকে সিড়ি বেয়ে নামতে দেখে সেখানকার মধ্যে থাকা একজন তার উদ্দেশ্যে বলে ওঠলেন-
“ কি গো জবা তোমার ছেলের সেই বউ কই? বউকে কি আমাদের দেখাবে না নাকি? বউকে একটু আন, আমারও একটু দেখি। যা শুনলাম সেটা সত্যি নাকি মিথ্যা!”
মহিলাটার কথা শুনে না চাইতেও জবা সিকদারের রাগ হলো। তিনি জানতেন এমন কিছুই হবে, আর হলোও সেটা। সকাল হতে না হতে সকলেই উপস্থিত হয়েছে নতুন বউ দেখার জন্য। জবা সিকদার ধীরে নিচে নেমে এলেন, কি বলবেন তিনি জানেন না। এর মাঝেই রুমা সিকদার চা নিয়ে সেখানে হাজির হয়। তিনি সহ রোমানা সিকদার মহিলার কথাগুলো শুনেছে। জবা সিকদারের মনের অবস্থাও তারা বুঝতে পারছে। তবে তারা বুঝতে পারছে বলে বাহিরের মানুষও বুঝতে পারবে এমনটা নয়। রুমা সিকদার চায়ের ট্রে এগিয়ে দিয়ে হাসি মুখে বলে-
“ আগে চা টা খান ভাবি, বউ এমনিও দেখতে পাবেন সমস্যা নেই।”
মহিলাটার নাম রতনা আক্তার, তিনি চা নিতে নিতে বলেন-
“ চা ও তো খেতেই পারবো ভাবি। বউকে আন দেখি একটু! বউ কি এখনো উঠেনি নাকি? ”
রুমা সিকদার একবার জায়ের দিকে তাকালেন। এমনিই এই আকস্মিক বিয়ে নিয়ে সকলেই বেজায় হয়েছে আছেন। তারউপর যদি এরাও এমন করে, জবা সিকদার তূর্ণার উপর আরও রেগে যাবে। রুমা সিকদার কোনো রকমে হাসি টেনে বলে-
“ তেমন কিছুই না, আসলে ও হয়তো রেডি হচ্ছে তাই দেরি হচ্ছে। তোমরা বস আমি দেখে আসচ্ছি কতদূর এগোলো ও।”
বলেই উপরে চলে যায়, জবা সিকদার ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। রৌদ্রিকের মতিগতি তিনি বুঝতে পারছেন না, ছেলেটা তার ওই মেয়েকে কি মেনে নিবে? ভাবতে ভাবতে আবারও তাকে ডাক দিলো-
“ এদিক এসে বসেন,এত কি ভাবছেন ভাবি?”
জবা সিকদার কোনো রকমে হাসার চেষ্টা করে সামনে তাকিয়ে বসতে বসতে বলে-
“ কিছু না ভাবি, আপনাদের আর কিছু লাগবে?”
“ না গো ভাবি আপনি আপনার বউমাকে আনুন তাতেই চলবে। দুপুরে নাহয় একেবারে পেট ভড়ে খাবো, যতই হোক আমাদের রৌদ্রিকের বিয়ে বলে কথা।”
সবার সঙ্গে টুকটাক কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পরেন জবা সিকদার। মনের মাঝে চলতে থাকা চিন্তাগুলোকে একদিকে সড়িয়ে রেখে।
রোদেলাকে জামা পরিয়ে দুধের ফিটার হাতে নিয়ে দুধ পান করাতে ব্যস্ত রৌদ্রিক। কিছুখন আগেই সজাগ হয়েছে রোদেলা, প্রতিদিনের নিয়ম করে বাবার লোকে চড়ে হাঁটাহাটি করেছে সে। রৌদ্রিক মেয়েকে খাওয়ার মাঝেই সেখানে একটা খয়েরী রঙের শাড়ি নিয়ে উপস্থিত হলেন রুমা সিকদার। রুমা সিকদার একবার বিছানায় নিদ্রামগ্ন তূর্ণা কে দেখে নিলো। তারপর এগিয়ে গেলো রোদেলার দিকে, মিষ্টি করে হেসে বলে ওঠে-
“ আমার রোদ দিদিভাই উঠেছে দেখি। ছোট দিদুনের কথা মনে পরেনি তোমার? আসো দেখি দিদুনের কোলে!”
বলেই হাত বাড়িয়ে রোদেলাকে কোলে তুলে নিলেন। রোদেলার দুই বছর পাঁচ মাস চলছে। রোদেলা রুমা সিকদারের কোলে গিয়ে হালকা কলকলধ্বনিতে হেসে উঠলো। গোল গোল চোখে রুমা সিকদারের দিকে তাকিয়ে রইলো, রুমা সিকদার রোদেলার কপালে চুমু এঁকে দিয়ো রৌদ্রিকের উদ্দেশ্যে বলে-
“ মেয়েটাকে রেডি করাবো, তুই বরং বাহিরে যা। নিচে মানুষজন এসেছে নতুন বউ দেখার জন্য।”
রৌদ্রিক একবার ভাবলো না করবে মেয়েটাকে না নিয়ে যাওয়ার জন্য। না বলার শতটা কারণ আছে, সে বা তার পরিবার তূর্ণার বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবে নিলেও। বাহিরের মানুষ যে সেটা স্বাভাবিক ভাবে নিবে এমনটা নয়; তারপর আর না করলো না, যাকে চেনে না,জানে না তার ব্যাপারে নাক গলানোর প্রয়োজন মনে করলো না। রোদেলাকে রেখেই নিজের স্টাডিরুমের দিকে পা বাড়ালো। রুমা সিকদার রোদেলাকে কোলে নিয়েই তূর্ণার কাছে এগিয়ে গেলেন, বাচ্চাদের মত করে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। রোদেলাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে তূর্ণাকে কয়েকবার ডাকতেই, মেয়েটা আতঙ্কের সঙ্গে উঠে বসলো। আর আতঙ্কিত গলায় বলে ওঠে-
“ ও মা আমাকে মে*রো না হ্যাঁ, আমি সব কাজ করে দিবো। আমাকে মে*রো না, খুব খুব ব্যথা লাগে!”
বলতে বলতে কেঁদে দিবে এমন অবস্থা রুমা সিকদার বেশ অবাক হলেন! নিজ বাড়িতে এতটা আতংকের মধ্যে থাকে বলেই হয়তো মেয়েটার এমন হাল হয়েছে। তিনি নিজেকে সামলে,নরম স্বরে বলে-
“ কেউ মারবে না, তুমি শান্ত হও।”
তূর্ণা ভয়ে ভয়ে সামনে তাকালো, সেলিমা খাতুনের জায়গায় অন্য কাউকে দেখতে পেয়ে ভয়টা হালকা হলেও সম্পূর্ণ কাটলো না। আঁড়চোখে এদিক-ওদিক তাকালো, আর বোঝার চেষ্টা করলো সেলিমা খাতুন আছে কিনা? রুমা খাতুন তূর্ণার ভয় পাওয়ার বিষয়টা ধরতে পেরে বলেন-
“ কেউ মারবে না তুমি উঠে পর। সবাই তোমাকে দেখবে তো!”
তূর্ণার বুঝলো না সে কোথায়? আশেপাশে তাকিয়ে নিজেকে বিশাল এই রুমে দেখতে পেয়ে অবাক হলো। রুমা সিকদারের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ তুমি কে? আমি এখানে কেনো? আর সত্যি ই মা আমাকে মারবে না?”
“ আমি তোমার চাচি শ্বাশুড়ি, কালকে তোমার বিয়ে হয়েছে ভুলে গেলে?”
তূর্ণা মাথায় জোর খাঁটিয়ে মনে করার চেষ্টা করলো সে। কিছু সময় বাদে ফানুসের মত স্মৃতির পাতায়, কালকের একে একে ঘটে যাওয়া সবকিছু স্মরণে এলো তার। এদিকে রোদেলা মুখ দিয়ে আওয়াজ করছে, হাসি হাসি মুখ করে নতুন মানুষটাকে দেখতে ব্যস্ত সে। তূর্ণার রোদেলার উপর নজর গেলেও। আর মুহুর্তেই তার মনে পরলো, রাতেও সে তার পুতুল বরের কাছে এই সুন্দর পুতুলটাকে দেখেছিলো। আর তার বর তো বলেছিলো এই পুতুল উঠলে তার কোলে দিবে। তূর্ণা হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইলো রোদেলাকে, কিন্তু কিছু একটা ভেবে আর হাত বারালো না। রুমা সিকদার আবারও তূর্ণা কে বলে-
“ ওঠ তৈরি হতে হবে, অনেক মানুষ এসেছে তোমাকে দেখতে। আর শোন আমি যেমনটা বলবো তেমন ভাবে থাকবে ঠিক আছে?”
তূর্ণা ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো, আবারও মিষ্টি ভাবে হাসতে থাকা রোদেলাকে দেখে নিলো। তূর্ণা ভয়ে ভয়ে রুমা সিকদারকে বলে ওঠে-
“ আমাকে একটু এই পুতুলটাকে কোলে নিতে দিবে? আমি একদম ব্যথা দিবো না পুতুলকে! একটু আমাকে দিবে?”
রুমা সিকদার হালকা হেসে রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ দিদুভাই কি যাবে তার নতুন মায়ের কাছে?”
রোদেলা হেসে উঠলো, এর মানে সে যাবে। রুমা সিকদার রোদেলাকে তুলে তূর্ণার কোলে দিলো রোদেলাকে। তূর্ণা কম্পিত হাতে রোদেলাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিলো। সে অবাক হয়ে রোদেলাজে দেখছে! এত নরম কেনো এই পুতুলটা? কই তার পুতুলটা তো শক্ত ছিলো, এই পুতুল কেনো এতো নরম। কেমন বড় বড় চোখ করে মায়া মায়া করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তূর্ণার ভয় হলো সে যদি ব্যথা দিয়ে ফেলে এই পুতুলকে! তখন কি হবে? সবাই কি তাকে মা*রবে? তূর্ণা কাঁপতে কাঁপতে রুমা সিকদারের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ এ..এই পুতুল এ..এত নরম কেনো? ও কি ব্যথা পাচ্ছে? আ..আমার পুতুল এত নরন নয় কেনো?”
” কারণ ও হলো আসল পুতুল, আর ব্যথা পেলে কেঁদে ফেলতো। তুমি ওকে এখন এখানে রাখ, আগে তোমাকে তৈরি করি তারপর ওকে আবার নিও।”
তূর্ণা ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ালো, রোদেলা তূর্ণার গালে হাত ছুঁইয়ে দিয়ে আধো আধো স্বরে বলে-
“ প..পা..পাপা..!!”
রুমা সিকদার হেসে বলে-
“ এটা পাপা না দিদুভাই। আস তোমার নতুন মাকে সাজাই।”
বলেই কোলে তুলে নিলো, তূর্ণা এখনো হতভাগ! রুমা সিকদার রোদেলাকে বিছানায় খেলনা দিয়ে বসিয়ে। তূর্ণাকে তৈরি করতে শুরু করে।
সকলের সামনে মাথায় কাপড় দিয়ে মাথা নুইয়ে ভয়ে ভয়ে বসে আছে তূর্ণা। সকলের দৃষ্টি এখন তার উপর বিদ্যমান। ভয় লাগলো বেশ তার! এর আগে এত এত মানুষের সামনে বসা হয়নি তার। সেলিমা খাতুন কিংবা বাড়ির কেউই তাকে মানুষের সামনে আনতো না। তাই সবসময় ঘরের এক কোণেই পরে থাকতো সে। রতনা আক্তার তূর্ণাকে ভালো করে দেখে জিজ্ঞেস করেন-
“ তা নাম কি গো তোমার নতুন বউ?”
তূর্ণা ভয়ে কি উওর দিবে ভেবে পেলো না, জবা সিকদার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়ে যদি উল্টা-পাল্টা কিছু করে সকলের সামনে নাক কাটায় তাহলে সে কিছুতেই ছাড়বে না। তূর্ণাকে ভয় পেতে দেখে রুমা সিকদার পাশ থেকে আস্থা দিয়ে শান্ত থাকতে বলেন। তূর্ণার রুমা সিকদারের কথা মত আস্তে করে বলে-
“ ত..তূর্ণা!”
এরমাঝেই একজন বলে ওঠে-
“ যাই বল প্রথম বউটার মত সুন্দর না তোমার এই বউটা। হ্যাঁ সব ঠিকই আছে কিন্তু তোমার প্রথম বউটা আরও মিষ্টি ছিল দেখতে, ওর তুলনায় ও একটু কম এই যা! কিন্তু হতভাগি ওমন কাজ করতে পারে সেটা বোঝা যায়নি।”
জবা সিকদার কিছু বললেন না, কারণ বলেও লাভ নেই। তারা চাইলেও সবার মুখ বন্ধ করতে পারবে না। কেউ না কেউ অতীত টেনে খোঁটা শোনাবেই, তূর্ণার পাগল হওয়ায় বিষয়টা এখনো কেউ ধরতে পারেনি তাতে কিছুটা চিন্তা মুক্ত আছেন। তবে কতখন এই সত্য চাপা থাকবে জানা নেই তার, এরমাঝে রতনা আক্তার আবারও বলে-
“ শুনলাম তো তোমার এই বউ নাকি পাগল। দেখে তো মনে হচ্ছে না, নাকি আমরাই ধরতে পারছি না কোনটা গো ভাবি?”
“ তেমন কিছু নয়, পাগল হলে তো দেখতেনই তাই না। এতক্ষণ ধরে আপনাদের সামনেই তো আছে।”,’রুমা সিকদার হেসে বলেন’
“ তুমি যেভাবে ধরে রেখেছো মনে হচ্ছে তোমার ছেলেরই বউ। জবা ভাবি কি নতুন বউকে নিয়ে সন্তুষ্ট নয়?”
রতনা আক্তারের কথাশ রুমা সিকদারের মাথা নুইয়ে পরে। কথাটা কিভাবে বলেছে তিনি বুঝতে পারছে, না চাইতেও একধরনের চিনচিন ব্যথা তার বক্ষস্থল ভেদ করে সেখানে আঘাত হানচ্ছে। জবা সিকদার এতোক্ষণে মুখ খুললেন-
“ আমার ছেলে মানে রুমারও ছেলে। তাই একদিক থেকে ও রৌদ্রিক মা, আমি যেমন মা তেমনি রোমানা,রুমা ও রৌদ্রিকের মা। তাই আমার কাছে রাখলেও যা ও রাখলেও তাই।”
জায়ের কথা রুমা সিকদারের নিভে যাওয়া হাসিটা আবারও ওষ্ঠপুটে দেখা মিললো। এই পরিবার তাকে তার সন্তান না হওয়ার কারণে কোনোদিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেখেনি। বরং সবসময় তাকে বোঝার চেষ্টা করেছে, মানুষ সবসময় সবদিক থেকে পূর্ণতায় পরিপূর্ণ হয় না। কারো কোনো না কোনো কমতি থাকে, তেমনিই রুমা সিকদারের কমতি হলো মা না হতে পারা। এটা নিয়ে তার যতটানা দুঃখ ছিলো, তার চেয়ে বেশি এই পরিবার তাকে আগলে রেখেছে। কোনোদিন তার এই কমতি নিয়ে তাকে আলাদা করে দেখেনি। নাহলে আজকালকার দিনে তাদের মত বাঁজা মানুষের কত কষ্ট হচ্ছে করতেই না হয়। কত মানুষ আছে যারা বাচ্চা জন্ম না দিতে পারায় স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে, স্বামীর কাছে প্রতিনিয়তই মা’র খেতে হয়। শ্বাশুড়ি বাড়ি যেনো বাড়ি থাকে না সেটা পৃথিবীর বুকে এক নরক খানা তৈরি হয়। সেখানে সে হাজার গুণ সুখে আছে, সবাই তার কমতিটাকে নিয়ে ভাবে না।
ধরণির বুকে নেমে এসেছে এক গম্ভীর, রহস্যাবৃত প্রশান্তি। আকাশের বিস্তীর্ণ গহ্বরে চন্দ্র যেন তার রৌপ্যময় আভা ছড়িয়ে নিঃশব্দে পাহারা দিচ্ছে নিদ্রিত পৃথিবীকে। রাতের বুক চিরে আজ আলোকমালায় উদ্ভাসিত সিকদার বাড়ি। বিশাল অট্টালিকার প্রতিটি প্রাচীর জুড়ে ঝুলছে রঙিন বাতির নক্ষত্রমালা, প্রবেশপথ থেকে শুরু করে পুরো প্রাঙ্গণ সুসজ্জিত ফুলের অলংকরণে গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা ও গোলাপের সুগন্ধ বাতাসে এক মোহময় আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছে সারা বাড়িতে। আজ সিকদার বাড়িতে বিশাল বউভাতের আয়োজন। বিশাল প্রাঙ্গণে বসেছে অতিথিদের সমারোহ কোথাও গম্ভীর আলাপচারিতা, কোথাও চাপা হাসির রেশ, আবার কোথাও কৌতূহলী দৃষ্টির মেলাতে ব্যস্ত। পরিবেশে মিশে আছে বিরিয়ানি, কাবাব আর নানা রকম মসলার ঘ্রাণ, যা রাতের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলছে এক অনির্বচনীয় তৃপ্তির অনুভূতিতে।
স্টেজের উপরে রক্তিম ও সোনালি রেশমে সজ্জিত আসনে বসে আছে নববধূর রুপে তূর্ণা। তার গায়ে লাল বেনারসির দীপ্তি আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ভয়। নতুন এইসাজে তাকে আলাদা রকমে সুন্দর লাগছে! চারপাশে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বারবার ঝলসে উঠছে, যার কারণে আরও ভয় লাগছে, এর আগে কোনোদিন এত মানুষের ভিড়ে আসেনি সে। সবাই তার সাথে একটু পর পর কথা বলে যাচ্ছে, ভয়ে তূর্ণা কথা বলতে পারছে না। সবাই টুকটাক কথা বলার চেষ্টা করছে তবে তূর্ণা মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করেনি। রুমা সিকদার পাশে আছে তূর্ণার, পরিস্থিতি যাতে খারাপ দিকে না যায় তাই সে তূর্ণার সঙ্গে বসে আছে। ভয়ে যদি তূর্ণা উল্টোপাল্টা কিছু করে বসে, তাহলে এতগুলো মানুষের সামনে নাক কাটা যাবে।
কালকের ঘটনা সেভাবে ছড়ালেও তূর্ণার এমন নিশ্চুপ থাকার কারণে কেউ ধরতে পারেনি। একদিক থেকেই ভালোই হয়েছে তাদের, সাধারণ তূর্ণার মত মানুষটা একটু চঞ্চল হয়ে থাকে। তবে তূর্ণার মাঝে সেই চঞ্চলতার বদলে একরাশ আতঙ্ক ছেয়ে রয়েছে৷ মেয়েটাকে যে ওই বাড়ি কিভাবে রাখা হয়েছিলো, সেটা বুঝতে পারছেন রুমা সিকদার। এদিকে রৌদ্রিকের কোনো খোঁজ নেই, সেই দুপুরে বের হয়ে গেছে কাজ আছে বলে। এখন রাত হয়ে এসেছে তারপর আসার নাম নেই, মানুষ নানা কথা বলছে এই নিয়ে৷ সে বর কই? তূর্ণা আস্তে করে ভয়ে ভয়ে রুমা সিকদারকে বলে-
“ আমার না খুব ইয়ে পেয়েছে চাচি মনি! আমার এখানে ভালো লাগছে না। মা দেখলে আমাকে খুব মা*রবে, আমার গাঁ থেকে এইসব খুলে নাও। মা দেখলে খুব মা*রবে!”
রুমা সিকদার তূর্ণার কথা শুনে বলে-
“ তোমার মা মা*রবে না আর, এইসব তোমার এখন থেকে। আর একটু বস আমি দেখি কি করা যায়।”
বলেই উঠে যায় রুমা সিকদার, এইভাবে হুট করে স্টেজ থেকে বউ নিয়ে গেলে ব্যাপারটা কেমন দেখায়। রুমা সিকদার যেতেই আরও ভয় চেপে ধরে তূর্ণাকে। আশেপাশে ভয়ে ভয়ে দেখে নিলো সবকিছু, লুকমান হোসেনেরা এখনো এসে পৌঁছায়নি এখানে। হুট করেই সেখানে একটা ছেলে এসে তার পাশে বসে পরলো, ছেলেটা তূর্ণার একেবারে গাঁ ঘেঁষে বসেছে। তূর্ণা ভয়ে সরে আসতে চাইলে ছেলে বলে-
“ আরে আরে ভাবি সরে যাচ্ছেন কেনো? আমি আপনার দেবর হই। সবাই বললো আপনি নাকি পাগল, কিন্তু আমি তো পরীকে দেখছি। হাই আ’ম জিয়ান!”
বলেই হাত এগিয়ে দেয়, তূর্ণা ভয়ে সরে গেলো একেবারে সোফার শেষ প্রান্তে। তূর্ণাকে ভয় পেতে দেখে জিয়ান আরও একটু চেপে বসলো তূর্ণার।
“ সরে যাচ্ছেন কেনো ভাবি? দেবর লাগি তো, এদিকে আসুন। আমাকে কি ভয় পাচ্ছেন আপনি?”
তূর্ণা ভয়ে ভয়ে বলে ওঠে-
“ দূরে যাও দূরে যাও, তু..তুমি ভালো না, ভালো না!”
জিয়ান ভ্রুযুগল নাচিয়ে বলে ওঠে-
“ কিছু করলামই না আর তাকেই খারাপ উপাধি দিয়ে দিলেন। ইট’স নট ওকে ভাবি জান!”
বলেই তূর্ণাকে আবারও ছুঁতে নিলে, তূর্ণা সরে যেতে নিলে নিচে পরে যায়। মুহুর্তেই সকলের দৃষ্টি তূর্ণা আর জিয়ানের উপর পরলো। তূর্ণার কেমন অস্বাভাবিক হয়ে উঠলো, জিয়ানের উপস্থিতিতে। স্মৃতি পাতায় আবছা আলোয় কালো ধোঁয়াসার মত কিছু উঠে বেরাল। জিয়ান এগিয়ে এসে তূর্ণার হাতের কব্জি ধরে উঠাতে চাইলে তূর্ণা ভয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। মুহুর্তেই জিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, আবাডও থাবা দিয়ে তূর্ণার হাতটা শক্ত করে ধরতেই তূর্ণা শব্দ করে কান্না করে উঠলো। ভয়ে আওড়াতে থাকে-
“ আমা..আমাকে ছেড়ে দাও জিসান ভাই..আ…আমাকে ধরিও না! তুমি অনেক নোংরা! আমাকে নোংরা ভাবে ধরিও না।”
সকলের দৃষ্টি এইদিকেই এখন, রুমা সিকদার তাড়াতাড়ি করে এদিকে এগিয়ে এলেন। তূর্ণা কেমন অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে দিয়েছে, আজানা ভয়ে মেয়েটা পাগলের মত ছোটাছুটি করছে আর ‘নোংরা’ ‘নোংরা’ করছে। রুমা সিকদার এসে জিয়ানের কাছ থেকে তূর্ণাকে ছাড়িয়ে নিলো, তূর্ণা অশান্ত হয়ে পাগলামি শুরু করে দিয়েছে। রুমা সিকদার তূর্ণাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, তবে তূর্ণা শান্ত হচ্ছে না। জবা সিকদার, আর রোমানা সিকদারও এগিয়ে এসেছে৷ সবাই দেখছে, আর তূর্ণার এমন আচরণে আনারপ গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। ধামাচাপা পরা বিষয়টা আবারও সকলের মাঝে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পরছে।
“তূর্ণা এই তূর্ণা শান্ত হও! দেখ কেউ তোমাকে ধরবে না। এদিকে দেখ, শান্ত হও!”
তূর্ণা শুনলো না, কেমন আড়ষ্ট হয়ে পাগলামি করছে। বার বার বলছে তাকে না ছুঁতে! রুমা সিকদার কি করবেন বুঝতে পারছেন না। জবা সিকদার চটে গেলেন, এতগুলো মানুষের সামনে তিনি কিছু বলতেও পারছে না। নিজের রাগটাকে দমন করে দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ ওকে ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে চল। এখানে থাকলে আরও পাগলামি করবে, ওর ধর!”
জবা সিকদারের কথা মত কোনে রকমে তূর্ণাকে ধরে সেখান থেকে তাকে নিয়ে যায় তারা, তবে তূর্ণা শান্ত হলো না। অতীতের ভয়ংকর কিছু তার মধ্যে আবারও নতুন করে ঝেকে বসেছে। রুমের ভিতরে আনা মাত্রই জবা সিকদার দেরি না করে নরম গালে শক্ত হাতে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। রোমানা আর রুমা সিকদার হতভাগ হয়ে গেলেন। জবা সিকদার আবারও এমনটা করবেন ভাবতে পারেনি তারা, তূর্ণা ভয়ে শান্ত হয়ে গেছে তবে তারা কান্না বন্ধ হয়নি। জবা সিকদার রুক্ষ গলায় বলে ওঠেন-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২
“ জিয়ান কি বলেছেন এমন তুমি পাগলামো শুরু করলে? বলেছিলাম না চুপচাপ বসে থাকতে, কোনো কথা না বলতে? তাহলে মুখ খুললে কেনো? তোমার জন্য বার বার অপমানিত হতে হচ্ছে। একবার নাম ডুবিয়ে মন ভড়েনি, আবারও একই কাজ করছো!”
“ ভাবি শান্ত হন, মেয়েটা ভয় পেয়ে আছে। হয়তো কিছু হয়েছে যার জন্য এমনটা করেছে। এতক্ষণ কিছু করেনি হুট করে তো করার কথা না।”
রোমানা সিকদারের কথায় শান্ত হলো না। ক্ষীপ্ত ভাবে তূর্ণাকে দেখছে, তূর্ণা ফুঁপিয়ে উঠছে একটু পর পর। জবা সিকদারকে প্রচন্ড ভয় লাগছে!
