Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪
ফাহিমা ইসলাম

রোমানা সিকদারের কথায় শান্ত হলো না। ক্ষীপ্ত ভাবে তূর্ণাকে দেখছে, তূর্ণা ফুঁপিয়ে উঠছে একটু পর পর। জবা সিকদারকে প্রচন্ড ভয় লাগছে! রুমা সিকদারের বুকে মুখ লুকিয়ে রয়েছে, কান্নার দাপটে ঠিক মত শ্বাস না টানতে পারায় তূর্ণা হা মেলে নিশ্বাস টেনে নিলো মুখ দ্বারা। রুমা সিকদারের নিজের উপর রাগ লাগছে সে যে কেনো মেয়েটাকে একা ওইভাবে গেলো। গেলো তো গেলো যাওয়ার আগে কাউকে কাছেও রেখে যাওয়া উচিত ছিলো তার, অথচ সে কোনোটাই না করে বোকার মতো চলে গেছিলো। এমন হতে থাকলে তূর্ণা সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ হয়ে পরবে। জবা সিকদার আবারও বলে,,
“ এই মেয়ে শুনে রাখ তোমার জন্য আবারও যদি সকলের কাছ থেকে কথা শুনতে হয়। তাহলে আজকেই এই বাড়িতে তোমার শেষ দিন, তোমার বাবা-মা আসবে তাদের সঙ্গেই চলে যাবে।”
তূর্ণা কিছু বললো না, রোমানা সিকদার জবা সিকদার আবার কিছু করার আগেই টেনে নিজের সঙ্গে বাহিরে নিয়ে গেলেন। রুমা সিকদার বুকে পরে থাকা তূর্ণাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।

এদিকে লুকমান হোসেনেরা প্রবেশ পথ থেকেই তূর্ণার অবস্থা দেখেন। সেলিমা খাতুনও সবটা দেখেছেন, তিনি এইসব নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়! তিনি এত বড় বাড়ি দেখে অবাক হয়ে গেছে; সঙ্গেই রূপার করা বোকামির জন্য আফসোস করলেন। আজকে এই বাড়িটা রূপার হওয়ার কথা ছিলো অথচ মেয়েটা নিজের ভাগ্য নিজেই খোয়ালো। লুকলাম হোসেনেদের দেখতে পেয়ে রাশেদুল সিকদার এগিয়ে আসেন, গম্ভীর মুখেই কুশল বিনিময় করলেন। সকলেই তূর্ণা এমন আচরণ নিজে কথা বলতে ব্যস্ত! সকলে মুখে না জিজ্ঞেস করতে পারলেও তাদের মাঝে এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সকলের সামনে আবারও নাক কাটা গেলো তাদের। বিষয়টা তারা যতটা ধামাচাপা দিতে চাচ্ছে, বিষয়টা ততো জেনো খোলাসা হচ্ছে। লুকমান হোসেন অপরাধী ন্যায় মাথা নিচু করে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে বলেন-
“ মাফ করবেন বিয়াই সাহেব! আবারও আমাদের ভুলের জন্য এইসব হলো।”
“ সে যাই হোক, বাদ দিন এইসব। যা হওয়ার হয়ে গেছে এখন কিছুই করার নেই। আপনারা ভিতরে যান আপনাদের মেয়েকে ওইখানেই পাবেন। কোনো অসুবিধা হলে জানাবেন অবশ্যই।”

লুকমান হোসেন আর সেলিমা খাতুন তার থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির ভিতরের দিকে পা বাড়ায়। সেলিমা খাতুন চারদিকের বিশাল আয়োজন দেখে শুধু অবাকই হচ্ছে। রূপার উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার! এইসব কিছুর মালিক আজকে রূপাই হতো যদি বিয়ের দিন ওইসব না করতো। সেলিমা খাতুন স্বামীর দিকে তাকিয়ে রুক্ষ গলায় বলে-
“ বিয়েটা না দিলেই পারতে, এইসব কিছু আমার মেয়ের হতো। তারপর তোমার ওই পাগল মেয়ের হলো! এত বড় মানুষ ওনারা, কত কষ্ট করে বিয়েটা ঠিক করলাম। কিন্তু কিছুই হলো না!”
“ বিয়েটা না দিলে এত টইটই করে এখানে আসা হতো না। ঘরেই থাকা লাগতো, যার ভালো করতে চাইলাম সেই পালিয়েছে। ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে এখন সেটা মেনে নাও!”
বলেই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার সময় জবা সিকদারের মুখোমুখি হন তারা। জবা সিকদার লুকমান হোসেন আর সেলিমা খাতুনকে দেখে তার রাগটা যেনো বেড়ে গেলো। তারপরও ভদ্রতার ক্ষতিরে কোনো রকমে বলে ওঠে-
“ তাহলে এসেছেন, আপনারা যদি এমন করবেন জানতাম তাহলে জীবনেও আমার ছেলের বিয়ে আপনাদের মেয়ের সঙ্গে ঠিক করতাম না। আপনারাই তো বলেছিলেন আপনাদের মেয়ের কোনো আপত্তি নেই এই বিয়েতে, তাহলে বিয়ের দিন এইসব কি?”
সেলিমা খাতুন জবা সিকদারের হাত চেপে ধর অপরাধী স্বরে বলে-
“ আমরাও জানি না বেয়াইন, মেয়েটা আমার এই বিয়ে নিয়ে খুশিই ছিল। হুট করে ও এমনটা করে বসবে বুঝতে পারিনি।”

“ এরজন্য ই বার বার বলেছিলাম আপনাদের মেয়ের সমস্যা আছে নাকি সেটা জিজ্ঞেস করতে। একটা সম্পর্কে যখন জড়াবে না সেটা আগেই জানিয়ে দিতো। সবকিছু ঠিক-ঠাক হওয়ার পর সমাজে চুনকালি মাখিয়ে ভেগে যাওয়া কি খুব জরুরি ছিলো? এমন নয় আমার ছেলের জন্য মেয়ের অভাব পরেছে। কত কষ্টে রাজিয়ে করিয়েছিলাম এই বিয়ের জন্য, আর আপনারা একটা পাগল মেয়েকে গুচিয়ে দিলেন এইভাবে!”
রোমানা সিকদার হালকা হেসে ওনাদের উদ্দেশ্যে বলে-
“ কিছু মনে করবেন না ভাইসাহেব। বুঝেনই তো এত কিছু হয়ে গেছে তাই মা হয়ে কি করে মেনে নিবে এইসব। আপনারা বসুন আমি খাবারের ব্যবস্থা করি, রুমা তূর্ণাকে নিয়ে আসবে একটু পর। আপা আপনি পারলে ওই রুমের দিকে চলে যান। ওখানেই তূর্ণা আছে।”
বলেই জবা সিকদারকে নিয়েই রান্নাঘরের দিকে চলে যান কাজের লোককে ওনাদের খেয়াল রাখার জন্য বলে। সেলিমা খাতুন, আবারও স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন-
“ তোমার মেয়ে কই আছে সেটার খোঁজ পেয়েছেন? আমার এইসব ভালো লাগছে না, আমার মেয়েটার কাপল পুড়লো আর তোমার ওই পাগল মেয়ের ভাগ্য খুললো।”

বলেই তিনি রোমানা সিকদারের বলা কথা মত তূর্ণার সঙ্গে দেখা করতে চলে যায়। রুমা সিকদার তূর্ণাকে অনেক বোঝার পর সে কান্না থামিয়েছে, তখন সেখানে উপস্থিত হয় সেলিমা খাতুন। সেলিমা খাতুন রুমা সিকদারকে সালাম দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। প্রথমেই তার নজর গেলো তূর্ণা গায়ে জড়ানো ভাড়ি স্বর্ণের হারের দিকে। হাত,গলা,জান ভর্তি করেই গয়না পরানো আছে সেই সাথে গায়ে জড়ানে দামি শাড়ি। সবকিছুই যেনো বিষের মত বিঁধলো সেলিমা খাতুনের কাছে; এইসব কিছুই তো রূপার হওয়ার কথা ছিলো অথচ এই পাগল পেয়ে বসে আছে। তারপরও মুখে মিথ্যে হাসি ঝুলিয়ে তূর্ণার কাছে এগিয়ে দিয়ে বলে-
“ কি রে কেমন আছিস? এত গুলো লোকের সামনে তোর পাগলামি না করলে হতো না? তোর জন্য সবার সামনে আবারও নাক কাটা গেলো সবার।”

তূর্ণা পায়ে ছিটিয়ে যায়, মাথা নিচু করে রাখে। রুমা সিকদার সেলিমা খাতুনের উদ্দেশ্যে বলে-
“ এইসব কথা বাদ দিন, আপনারা এলেন বসুন খাওয়ার ব্যবস্থা করি।”
“ না না আপা তার কোনো দরকার নেই। এত তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই।”
তূর্ণা রুমা সিকদারকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। ভয়ে ভয়ে সেলিমা খাতুনের দিকে তাকাচ্ছে, রুমা সিকদারও জিনিসটা খেয়াল করেছে। তাই তিনি তূর্ণার হাতটা ধরেই আছেন, এর মাঝেই ডাক পরলো ওনার। সেলিমা খাতুনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আরও কয়েকবার তার ডাক পরলো। সেটা দেখে সেলিমা খাতুন বলেন-
“ আপনাকে হয়তো ডাকছে আপা, যান দেখে আসুন কি হয়েছে।”
রুমা সিকদার হেসে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে-
“ তূর্ণা তুমি এখানেই তোমার মায়ের সাথে থাকো। আমি একটু পর আসচ্ছি!”

বলেই যেতে চাইলে তূর্ণা শক্ত করে রুমা সিকদারের শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে। বার বার যেতে না করছে, রুমা সিকদারেরও যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু বার বার ডাকছে তাই কোনো রকমে বুঝিয়ে তিনি বের হয়ে গেলেন। তিনি বের হওয়া মাত্রই সেলিমা খাতুন তীক্ষ্ণ বাজপাখির দৃষ্টি তূর্ণার দিকে নিক্ষেপ করেন। তিনি তূর্ণার হাতের কব্জি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ এখানে এসে দেখি রাণী সেজেছিস। ভুলে যাস না এইসব কিছুর মালিক রূপা, তুই ভাগ্য করে পেয়েছিস। আর ওনাকে যেতে না দিয়ে কি বোঝাতে চাইছিলি?”
তূর্ণা ভয়ে কোনো রকমে বলে-

“ কিছু না মা, কিছু না আমাকে মেরো না!”
সেলিমা খাতুন তূর্ণার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন। ব্যথায় তূর্ণার নেত্রকোণ আবারও ভিজে উঠলো, কার্নিশ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো। তূর্ণা এর জন্যই রুমা সিকদারকে যেতে দিতে চাচ্ছিলো না। সেলিমা খাতুন আবারও দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ আমিও দেখবো তুই এই সংসার কিভাবে করিস। এমনিও তোর সংসার হবে বলে মনে হয় না, তোর শ্বাশুড়ি এমনিও তোকে মেনে নিবে না যা বুঝলাম। তোর মত পাগলের আবার কিসের সংসার! তাই এত আশা বাদ দে।”
তূর্ণা অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু কিছুই বললো না। এরমাঝেই সেখানে লুকমান হোসেন আসলেন, তিনি আসতেই সেলিমা খাতুন তূর্ণাকে ছেড়ে দিলো। তূর্ণার ভেজা চোখে বাবা নামক মানুষটার দিকে তাকালো, তিনি এইসব দেখেও যেনে অদেখার মত করে থাকেন। আর আজকেও রইলো একই ভাবে, তিনি এগিয়ে এসে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলে-

“ সবার সামনে ওমন পাগলামি কেনো করলে? বলেছিলাম তো এখানে ভালো মত থাকতে। তোমার এইসবের জন্য আমার সম্মানে বার বার আঘাত লাগে।”
তূর্ণা বসা থেকে উঠে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে-
“..ও..উনি ভালো না, আ..জিসান ভাইয়ের মত.. নোংরা! আমাকে নোংরা ভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছিলো।”
লুকমান হোসেন দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন, তারপর কঠিন স্বরে বলে-
“ তাই বলে সবার সামনে ওমন করবে? এটা তোমার বাড়ি না যে যা ইচ্ছে করবে। এটা তোমার শ্বাশুড়বাড়ি তাই সেইভাবেই থাকতে হবে তোমাকে, এখন থেকে এটাই তোমার বাড়ি।”

তূর্ণা ভয়ে ভয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে করুন স্বরে আবদার করে বসলো। স্টেজে থাকাকালীন দূর থেকে দেখেছি একজন পিতা তার মেয়েকে নিজ খাতে খাইয়ে দিচ্ছে, সাথে যত্নসহকারে মুখে লেগে থাকা খাবারও মুছে দিচ্ছে। না চাইতেও সেই মুহুর্তের স্মৃতির পাতায় কিছু ভেসে ওঠে তার, বাড়িতে যখন রূপা কিছুই খেতে চাই তো না। তখন লুকমান হোসেন ঠিক এইভাবে রূপাকে তুলে খাওয়াতো, সাথে অনেক আদর করতো৷ আর তূর্ণা শুধুই দূর থেকে সবটুকু দেখতো। বাবাকে প্রচন্ড ভয় পায় সে, একবার পাগলামি করে বাবার হাতে খেতেও চেয়েছিল কিন্তু তাকে লুকমান হোসেন খাইয়ে দেয়নি। বরং বকেছিল ভীষণ ভাবে, লুকমান হোসেন সবসময় রূপাকে আদর করতো। মাথায় তেল দিয়ে দিতো, কিন্তু তূর্ণাকে কেনো জানি তিনি দেখেও দেখতেন না। তূর্ণার ছোট্ট অবুঝ মন আজকে আবারও কেমন বাবা নামক মানুষটার কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার বড্ড লোভ জন্মিয়েছে। লুকমান হোসেনের হাতরে আদর খেতে বড্ড ইচ্ছে করছে। তাই অশ্রুসজল চোখে লুকমান হোসেনের দিকে তাকিয়ে করুন কণ্ঠে বলে-
“ ও বাবা আমার মাথায় একটু হাত রাখবে? তুমি আমায় একটু আদর করে দিবে? আর কোনোদিন চাইবো না আদর বিশ্বাস কর! রূপা আপুকে কত আদর কর, কিন্তু আমায় কেনো করো না? আমি কি খুব বেশি পঁচা? আমায় একটু আদর করে দিবে? আমি তো পাগল, তাই বলে আমাকে একটু আদর করবে না?”

লুকমান হোসেন শান্ত চোখে তাকালেন তূর্ণার অসহায় কাতর মুখপানে। কি স্নিগ্ধ লাগছে নতুন বধূ রূপে! বোঝা দায় তূর্ণার এই স্নিগ্ধতার মাঝেই তার অপূর্ণতা লুকিয়ে আছে। আজকে তার তূর্ণার আবদার ফিরালেন না, অনিচ্ছা শর্তেও হাত বাড়িয়ে তূর্ণার মাথায় হাত রাখলেন। তূর্ণা কেমন হুর হুর করে কেঁদে উঠলো! হয়তো প্রথমবার বাবার আদর পাওয়ার খুশিতে তার অশ্রুবিন্দু গুলো শ্রাবণধারার মত না ঝড়ে থাকতে পারলো না। সেলিমা খাতুন মুখ বাঁকালেন, তিনি আর কিছু বললেন না। এত আদিখ্যেতা তার মোটেও সহ্য হলো না তাই মুখ বাঁকিয়ে শক্ত করে বলে ওঠেন-
“ তোমাদের এইসব নাটক শেষ হলে বাহিরে চলো।”
বলেই তিনি বেরিয়ে যান রুম থেকে। লুকমান হোসেন তূর্ণার মাথার উপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিলেন। তূর্ণা কিছুই বললো, নিজের কান্নাটাকে বন্ধ করার চেষ্ট চালালো৷ এর মাঝেই সেখানে রোদেলাকে কোলে নিয়ে প্রবেশ করলো একটা মেয়ে, রোদেলা হাসচ্ছে। মেয়েটার মুখেও হাসি লেগে রয়েছে, লুকমান হোসেনকে দেখে কিছুটা ইতস্তত পরলো সে। কোনো রকমে হাসি টেনে বলে-

“ আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল আর ভাবি তোমাকে। আমি তোমার একমাত্র ছোট ননদ!”
তূর্ণা কিছুই বুঝলো না, লুকমান হোসেন সালামের উত্তর নিলেন। রোদেলা এদিকেই চেয়ে আছে, সে অস্পষ্ট স্বরে বুলি আওড়ালো-
“পি..পি..পিপি।”
“ হুম বল পিপি।”
লুকমান হোসেন তূর্ণার উদ্দেশ্যে বলে-
“ ওর সাথে কথা বল,তোমার রূপা আপুর মত ও। তোমরা কথা বল আমি আসচ্ছি!”
বলেই তিনি বের হয়ে যান। তূর্ণা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দর গড়নের মেয়েটাকে দেখলো, ভাড়ি মিষ্টি দেখতে মেয়েটা। তার কোলে থাকা রোদেলাকে অসম্ভব রকমের সুন্দর লাগছে, লাল রঙের ফ্রক পরানো। সাথেই সামনের চুলে লাল রঙের হেয়ারক্লিপ লাগানো। তূর্ণা এবার হালকা স্বরে বলে-

“ আচ্ছা তুমি কে?”
রিনি হাসি চওড়া করে বলে-
“ আমি তোমার ননদ মানে তোমার বরের বোন হই। আজকেই হোস্টেল থেকে ছুটি পেয়েছি তাই বিয়েতে দেখাই হয়নি। তুমি তো রূপা ভাবি তাই না? তাহলে তোমার বাবা ওমনটা কেনো বললো?”
“ রূপা তো আমার আপু। আপু তো ওর বরের সাথে পালিয়েছে তাই তো আমার বরকে পেলাম। এই জানো, তুমি না অনেক মিষ্টি দেখতে!”
রিনি বিয়েতে কি হয়েছে সেই ব্যাপারে কিছুই জানে না। তাই রূপার পালিয়ে যাওয়া ব্যাপারটাও সে জানে না। আর না রৌদ্রিকের বিয়ের সময় সে ছিলো, তাই রূপাকে দেখা হয়নি তার। হুট করেই বিয়েটা ঠিক হয়েছিল তাই সেভাবে কিছুতেই থাকতে পারেনি সে। রিনি হেসে বলে-

“ তুমি তো আমার থেকেও বেশি মিষ্টি দেখতে৷”
রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে আছে, সেটা তূর্ণা দেখে আবারও তার ইচ্ছে জাগলো বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার। তখন নিয়েছিল তখন আলাদা এক নুভূতি হয়েছিল। তূর্ণা রিনির দিকে তাকিয়ে বলে-
“ এই পুতুলটাকে আমাকে একটু দিবে? একটুই নিবো?”
রিনি হেসে ফেললো, সে রোদেলাকে তূর্ণার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে-
“ এটা তো তোমারও পুতুল। ভাইয়ের সবকিছু এখন তোমারও, আমাদের রোদ সোনা তোমারই।”
তূর্ণা আস্তে করে রোদেলাকে কোলে নিলো। বাচ্চাটা কি মায়া মায়া করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে! রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-

“ পিপি..তুনি..তুনি।”
“ হ্যাঁ সোনা, এটা তোমার মা। রোদ সোনার মা এটা।”
তূর্ণা সঙ্গে আরও নানান কথা বলতে থাকে রিনি। তূর্ণার মনের মধ্যে থাকা ভয়টা কেটে দিয়েছে, এর আগে নিজ থেকে তার সঙ্গে এত কথা কেউ বলেনি। রোদেলাও মাঝে মাঝে অস্পষ্ট স্বরে এটা ওঠা বলছে আর তূর্ণা অবাক হয়ে দেখছে। বাচ্চাটা একদম তার সঙ্গে কেমন মিশে যাচ্ছে, তূর্ণার মনে হচ্ছে সে সত্যিই পুতুল কোলে নিয়ে আছে। যে পুতুল কথা বলে, হাসতে পারে, মায়া মায়া চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাত্রি গভীর হতে শুরু করেছে। নিস্তব্ধতা গ্যাস করে নিয়েছে সকল আলো। আকাশে মস্ত বড় একখানা চাঁদের দেখা মিলেছে, সেই সাথে তার পাশ ঘেঁষে মিটিমিট করে জ্বলছে অসংখ্য নক্ষত্ররা। রাত হওয়ায় বাড়ির ফাঁকা হয়ে এসেছে, সকলেই ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছে সিকদার বাড়ি থেকে। কান্ত পায়ে বাড়িতে প্রবেশ মাত্রই রাশেদুল সিকদারকে গম্ভীর মুখে বসে থাকতে দেখতে পেলেন রৌদ্রিক। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো সেদিক সে, রৌদ্রিকের জন্যই বসে ছিলেন তিনি। রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে তিনি গম্ভীর,শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেন-
“ আজকের দিনে তোমার এই দায়িত্বহীনতার একদমই মানায়নি রৌদ্রিক। তোমার এখানে উপস্থিত থাকাটা প্রয়োজন ছিল অথচ তোমার কোনো খোঁজই নেই।”

রৌদ্রিক রাশেদুল সিকদারের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ পর পর দু’টো সার্জারি ছিল, তাই আসা সম্ভব হয়ে উঠেনি।”
রাশেদুল সিকদার আর কিছু বললো না এই নিয়ে। রৌদ্রিক নিজের কাজ কিংবা অন্যকিছু সহজেই দায়িত্বহীনতার মতো কাজ করে না। তবুও ছেলেটা বরাবরই সংসার জীবন নিয়ে উদাসী! রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে তিনি সরাসরি জানতে চাইলেন-
“ তুমি কি এই বিয়ে টিকিয়ে রাখতে চাও? নাকি মেয়েটাকে ডিভোর্স দিতে চাও? একটা ভুল হয়ে গেছে এখন, তুমিই বল কি চাও।”
রৌদ্রিক রাশেদুল সিকদারের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ আমি কি চাই এটা জরুরি হলে বিয়ে করাতে না তোমরা। যাই হোক আমাকে ভাবার সময় দাও, কিছু জিনিস থাকে হুট করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।”

বলেই উপরে চলে যায় রৌদ্রিক। রাশেদুল সিকদার ছেলের যাওয়ার পানে চেয়ে রইলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুমের দিকে পা বাড়ালেন। তিনি।
রুমে প্রবেশ মাত্রই আঁটকে গেলো রৌদ্রিক। সামনে থাকা দৃশ্যটা তার নিকট প্রথম! বিছানায় তূর্ণার বুকে মাথা দিয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন রোদেলা। তার সঙ্গে তূর্ণাও নিদ্রায় মগ্ন, মেয়েটা সুন্দর করে তার রোদকে আগলে রেখেছে। রোদেলা মিশুক বাচ্চা হলেও এত সহজে কারো বুকে ঘুমায় না৷ খুব বেশি যাকে পছন্দ করে তার নিকটই এমন ভাবে ঘুমিয়ে পরে সে। রৌদ্রিক শব্দবিহীন আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে দিলো। এই সময় এখানে জবা সিকদার থাকেন, সে যতক্ষণ আসেনা ততক্ষণ জবা সিকদারের সঙ্গে থাকে রোদেলা।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩

তবে আজকে এমন কিছু দেখবে বলে আশা করেনি সে। সার্জন হওয়ায় তাকে বেশির ভাগই ব্যস্ততায় কাটাতে হয়, যতটুকু হাতে সময় থাকে সেটা রোদেলাকে দেয়। মাঝে মাঝে এমন দেরি হয়ে যায় আসতে। রৌদ্রিক আবারও তাকিয়ে রইলো তূর্ণা আর রোদেলার দিকে, মেয়েটার গায়ে এখনো ভাড়ি শাড়ি জড়ানো। ঘুমানোর কারণে পা থেকে কিছুটা শাড়ি সরে দিয়ে ফর্সা পা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। রৌদ্রিক সেখান থেকে দৃশ্য সরিয়ে আনলো। নিজের এমন জীবনের জন্য কোনটা সঠিক সিদ্ধান্ত সে বুঝে উঠতে পারছে না।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫