Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫
ফাহিমা ইসলাম

সকাল যেনো ধরণীর বুকে সদ্য জেগে ওঠা এক নীরব মহাকাব্য। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম অরুণরেখা সোনালি অক্ষরে লিখে দিয়েছে নতুন দিনের সূচনার। রাতের গাঢ় নৈঃশব্দ ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে পাখিদের মৃদু কলতানে। দূরের বৃক্ষরাজি স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে আলো ঢুকে সৃষ্টি করছে রহস্যময় আলোর খেলা। এই প্রশান্ত সকালের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্রিক। নীরব, গভীর, নিজের চিন্তার অতল গহ্বরে ডুবে থাকা এক মানব। তার দৃষ্টি দূরের অস্পষ্ট দিগন্তে, অথচ মন বন্দী এক প্রশ্নে। ফজরের নামাজের পর সহজেই ঘুমায় রৌদ্রিক, অভ্যাসটা রোদেলা হওয়ার পর থেকেই হয়েছে। রৌদ্রিকের বুকের ভেতর আজ অদ্ভুত এক দ্বন্দ্বের ঝড় বইছে। এই দ্বন্দ্বের নাম তূর্ণা নামক মেয়েটা, জীবনে হঠাৎ করেই এক নাম না জানা পাখির মত এসেছে তার জীবনে।

বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রৌদ্রিক গভীর শ্বাস টেনে নিল। সকালের কোমল আলো এসে পড়েছে তার গম্ভীর মুখাবয়বে, কিন্তু চোখের গভীরে এখনো লুকিয়ে আছে অস্বীকার করা না-যাওয়া ক্লান্তি। রৌদ্রিক বরাবরই গম্ভীর এক মানব, সহজেই নিজের মধ্যে থাকা অনুভূতিগুলোকে বের করতে পারে না। তার ভালোবাসার ধরণও ভিন্ন, সে সবার মত দেখিয়ে কিংবা বলে বলে ভালোবাসতে পারে না। তার ভালোবাসার ধরণ বুঝতে সকলেই পারে না,আর না কোনোদিন সে চেয়েছে তার ভালোবাসার ধরণ পাল্টানোর। রোদেলা আসার আগেও সে এতটা ভালো মানুষ ছিল না। তার আগলের রাখার ধরনটাই অন্যরকম তাই হয়তো।সহজেই তার ভালো লাগা কিংবা ভালোবাসাটা বুঝতে সক্ষম হয় না। প্রিয়তী হাওলাদার, তার প্রাক্তন স্ত্রী! জীবনের পাঁচটা বছর যার সঙ্গে কাটিয়েছে হয়তো পাঁচটা বছর খুবই ক্ষুন্ন ছিল। যার কারণে তাকে বুঝতে সক্ষম হয়নি সে, প্রিয়তী তার থেকে তিন বছরের জুনিয়র। ঢাকা মেডিকেলের দুইজনই ছাত্র ছিল, তাদের মধ্যে আদৌও প্রেম ছিল কিনা সেটাও রৌদ্রিকের জানা নেই। তবে হ্যাঁ সে যেভাবে ভালোবাসতে জানে সেই ভালোবাসার ধরণ সকলের ভালো না লাগতে পারে।

রোদেলাকে প্রিয়তী একদমই চায়নি, আর রৌদ্রিক চায়নি নিজের প্রথম সন্তান ন’ষ্ট করতে। পেশায় প্রিয়তী সাইকিয়াট্রিস্ট, তাদের মেন্টালিটি প্রায় একই রকম। তবে মেন্টালিটি একই রকম হলে সবকিছুই একই রকম হয় এমনটা নয়। সময়ের সঙ্গে সম্পর্কে যখন বিশ্বাস,ভালোবাসা বিলীন হয়ে যায় তখন সেটাকে সম্পর্ক বলে না। রৌদ্রিক তাদেরকেই আগলে রাখে যারা থাকতে চায়, যে পাখি থাকতে চায় না তাকে শত আগলে রাখালেও মুক্তির জন্য পাখি ছটপট করে। রোদেলাকে প্রিয়তী কোনোদিনও চায়নি। তবে রৌদ্রিক চেয়েছিল কারণ একটা বাচ্চা শুধুই তার মায়ের হয়ে থাকে না, একজন বাবারও সেই পরিমাণ অধিকার থাকে সেই বাচ্চার প্রতি। রৌদ্রিক সময় দিয়েছি প্রিয়তীকে তবে সময় সবসময় সবকিছু পাল্টাতে পারে না। হয়তো সময় দিন পাল্টাতে পারে, মানুষ পাল্টাতে, বর্তমান পেরিয়ে আসতে পরে; কিন্তু কারো মনের মধ্যে স্থির করা সিদ্ধান্ত কোনোদিন বদলাতে পারে না। যতক্ষণ না সেই মানুষটা সেটাকে পাল্টাতে না চায়। রৌদ্রিকে প্রণয়ের প্রথম অনুভূতি প্রিয়তীকে ঘিরেই, যে পুরুষ নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারে না সে আবার কেমন পুরুষ? তবে আজকে এই কথাটা ভাবতে গেলেও কেমন সেই ভালোবাসাটা খুঁজে পায় না।
ভালোবাসা এ কোনো ক্ষণিকের আবেগ নয়, আবার কোনো মধুর ভ্রমও নয়।

এ এক গভীর অগ্নিশিখা, যা আত্মার গহীনে ধিকিধিকি জ্বলে নিঃশব্দে, নিরবধি, নির্মম। ভালোবাসা মানে কারও অস্তিত্বকে নিজের শ্বাসের ভেতর গোপনে ধারণ করা। যেন হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন তার নামের অব্যক্ত উচ্চারণ। ভালোবাসা কখনো কোমল শিশিরবিন্দুর মতো নিঃশব্দে নেমে আসে, অথচ সমস্ত সত্তাকে ভিজিয়ে দেয় এক অদৃশ্য স্নিগ্ধতায়। আবার কখনো তা দহনময় অগ্নিগর্ভ যেখানে আত্মা পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও, তার ভস্মের ভেতর জন্ম নেয় নতুন কোনো অনন্ত আকাঙ্ক্ষা। ভালোবাসা মানে কেবল কারও হাত ধরা নয়,ভালোবাসা তার সকল অপূর্ণতা, তার ভাঙাচোরা স্বপ্ন, তার সমস্ত ক্ষতবিক্ষত অতীতকে নিজের বুকে আশ্রয় দেওয়া।যেন পৃথিবীর সমস্ত নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। এ এমন এক অনুভব,যেখানে দু’টি হৃদয় একে অপরের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় । কিন্তু এখন রৌদ্রিক হৃদয় এই ভালোবাসা নামক মন্ত্রে আবারও জড়িয়ে যেতে চায় না। তার ভিতরের আত্মা চাইছেনা কাউকে আঁকড়ে ধরছে, কারণ সে সেভাবে ভালোবাসতে জানে না। তার ভালোবাসা সবাই বোঝে না, আর না সে কাউকে সেটা বোঝাতে চেয়েছে কখনো।

রৌদ্রিক আর ভাবলো না এ নিয়ে রুমের ভিতর প্রবেশ করতেই আবারও নিদ্রায় মগ্ন তূর্ণাকে দেখতে পেলো। মেয়েটা গভীর নিদ্রায় তলিয়ে আছে, রোদেলা হালকা নড়ে উঠছে। তার ওঠার সময় হয়ে এসেছে, রৌদ্রিক ধীর পায়ে বিছানার অপর প্রান্তে গিয়ে আস্তে করে রোদেলাকে কোলে তুলে নিলো। ততোক্ষণে রোদেলার ঘুম হালকা হয়ে এসেছে, বাবাকে দেখতে পেয়ে সে বিড়াল ছানার মত ছিটিয়ে গেলো বাবার উষ্ণ বুকে। রৌদ্রিকে মেয়েকে কোলে নিয়ে নিঃশব্দে হাঁটাহাটি করছে। প্রিয়তী একবারের জন্যও রোদেলার কথা ভাবেনি, সে একটা বছর চেয়েছিল রোদেলাকে সামলে নেওয়ার জন্য। তবে প্রিয়তী মানে নি, চলে গিয়েছিলো দুধের শিশু ফেলে! পৃথিবীতে মায়েদের ভিন্ন ভিন্ন রূপ রয়েছে। কেউ বা শত কষ্টের মাঝেও নিজের সন্তাকে আগলে রাখে আবার কেউ বা নিজের সুখকে বেছে নিয়ে সন্তানের সুখ ত্যাগ করে। প্রিয়তী নিজেকে বেছে নিয়েছে, রোদেলাকে সে চায়নি তাই বলে রৌদ্রিক এটা ভাবেনি তার মেয়েকে এইভাবে ছেড়ে যাবে। নয়টা মাস পেটে ধরার পরও যে নারীর নিজের সন্তানের প্রতি মায়া জন্মেনি সেই নারীর প্রতি তার কোনো অভিযোগ কিংবা
অভিমান কিছুই নেই। অভিমান হোক কিংবা অভিযোগ করতে হলেও অধিকার কিংবা একটা সম্পর্কের প্রয়োজন হয়। যেটা তাদের মধ্যে নেই, তাই রৌদ্রিক কোনোটাই প্রিয়তীর উপর জমা করে রাখেনি। আর না কোনোদিন ফিরে আসার আবদার জানিয়েছে, যে পাখি একবার তার নীড় ছেড়ে চলে যায় স্বইচ্ছায়। তাকে ফিরিয়ে আনতে চাওয়া শুধুই বোকামি!

রোদেলা ঘুম ঘুম চোখে রৌদ্রিকে দিকে তাকালো। ঘুমানোর ফলে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, রাতে বাবাকে না দেখতে পেয়ে কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পরেছিলো। জবা সিকদার প্রথমে রোদেলাকে তূর্ণার সঙ্গে রেখে যেতে চায়নি, যদি বাচ্চাটাকে আঘাত করে বসে এই ভয়ে! কিন্তু রিনি সঙ্গে থাকায় আর মানা করেনি, এরপর তূর্ণা,রোদেলা আর রিনি গল্প করার মাঝেই দুইজনই ঘুমিয়ে পরেছিলো। তাই রিনি বেরিয়ে এসেছিলো ঘর থেকে, রোদেলা বাবার দিকে তাকিয়ে আধো আধো স্বরে বলে-
“ পা…পাপা..ত..তনি.আ..আতনি..তনি..আতনি।”
রৌদ্রিক মেয়ের ললাটে চুমু এঁকে দিয়ে নরম স্বরে বলে-
“ এই তো এসেছি মা! সরি লেট করে ফেলেছিলাম একটু। আর হবে না এমনটা।”

রোদেলা আবারও বাবার বুকে মাথা দিয়ে দেয়। রোদেলা হওয়ার পর রৌদ্রিক কোনোদিন রাতে হসপিটালে থাকে না। যত দেরিই হোক না কেনে বাড়ির ফিরবেই সে, তার জন্য তার ছোট্ট আর এক মা প্রতীক্ষার প্রহরও গুণে। ছোট্ট রোদেলাও বাবার উপর অভিমান জমিয়ে রাখে দেরি করে আসলে। রৌদ্রিক মেয়েকে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দেয়, সুন্দর করে মেয়েকে ফ্রেশ করিয়ে নিজেও ফ্রেশ হয়ে বের হয় রৌদ্রিক। তূর্ণা তখনো ঘুমেই মগ্ন! রৌদ্রিক আর ডাকলো না মেয়েকে নিয়ে সোজা বাহিরে চলে এলো৷ এই সময়টা তাদের দুইজনের।
প্রায়সময় তারা বাবা-মেয়ে একসঙ্গে বাগানে এসে হাঁটা-হাঁটি করে। রোদেলা হালকা হালকা হাঁটতে শিখছে, নিজের প্রায় দাঁড়াতেও পরে তবে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। রৌদ্রিক বাগানে এসে রোদেলাকে নরম ঘাসের উপর নামিয়ে দেয়, মেয়েটা নিচে নামার জন্য পাগল। রৌদ্রিক আলতো করে মেয়েকে ধরে রেখে যাতে পরে না যায়। রোদেলা মিষ্টি হেসে আদো আদো পায়ে নরম ঘাসে তার পা মেলে হাঁটার চেষ্টা করছে। আর একটু পর পর পাপার দিকে তাকাচ্ছে আর হাসচ্ছে। রোদেলা হাসতে হাসতে বল-

“ হা..হাতি..হাতি..পাপা!”
“ হুম আমার সোনা হাঁটতে শিখছে, কয়েদিন পর পাপাকে হেঁটে দেখাবে রোদ!”
রোদেলা পাপার কথায় আরও খুশি হয়ে গেলো, বাগানের মালি গাছে পানি দিচ্ছিলেন আর রৌদ্রিক আর রোদেলাকে দেখে হাসচ্ছিলেন। রৌদ্রিক হুট করে রোদেলার হাতটা ছেড়ে দিলে, রোদেলা কয়েক সেকেন্ড হেঁটে ঘাসের উপর পরে গেলো। তেমন ব্যথা না পেলেও ভয় পেয়েছে, রোদেলা রৌদ্রিকের দিকে অশ্রুসজল নয়নে তাকালো। ওষ্ঠপুট দু’টো উল্টিয়ে বাবাকে নালিশ জানালো সে ব্যথা পেয়েছে, রৌদ্রিক এগিয়ে এসো মেয়েকে নিজের বাহুতো চেপে ধরে আদর করে দিয়ে বলে-
“ কিছু হয়নি সোনা, পাপাকে তোমার হাঁটা দেখাবে না? বেশি ব্যথা পেলে মাটিকে পাপা মেরে দিবো আমার রোদকে ব্যথার দেওয়ার জন্য।”
রোদেলা আর কাঁদল না রৌদ্রিকের কথায়, আবারও রৌদ্রিকে সাহায্যে হাঁটা শুরু করেছে। রৌদ্রিক অনেক সময় মেয়েকে নিয়ো বাগানে হাঁটা-হাঁটি করে রোদেলাকে লোকে নিয়ে এক সাইডে বসে পরলো। রোদেলাকে বসে বসে হাতের মধ্যে থাকা ফুল দিয়ে খেলছে। রোদেলা একটা ফুল নিয়ো রৌদ্রিকে কানে গুঁজে দিলো তারপর রৌদ্রিকে দিকে তাকিয়ে বলে-

“ তু..তুন্দল, তুন্দল! আ..আনাকে..দাউ।”
রৌদ্রিক রোদেলার কথা মত সেখান থেকে আর একটা ফুল তুলে নিয়ে মেয়ের কানে গুঁজে দিলো। রোদেলা খুশি হয়ে গেলো, সে হাসি হাসি মুখ করে রৌদ্রিকে এটা-ওটা বলছে। রৌদ্রিক মন দিয়ে মেয়ের প্রতিটা কথা শুনছে, তার কাছে এই মুহুর্তে রোদেলার কথা শোনা ছাড়া অন্যকিছু গুরুত্ব মনে হচ্ছে না। তখনি সেখানে উপস্থিত হলেন রশিদ সিকদার, রৌদ্রিকের সামনে বসে পরেন তিনি।
“ বিয়েটা মেনে নিবি?”
চাচার কথায় রৌদ্রিক শান্ত চোখে সেদিকে তাকালো। এই প্রশ্নের উওর এখনো তার কাছে নেই, রশিদ সিকদার ব্যাপারটা ধরতে পারলেন। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে-

“ আমি বলবো তুই বিয়েটা মেনে। অবাক হলি এমনটা বলায়? জানিস তো রুমা কোনোদিন মা হতে পারবে না। এ নিয়ে আমার কোনোদিন আক্ষেপ হয়নি আর না ওর উপর রাগ হয়েছে। পৃথিবীতে হাজারও এমন মানুষ আছে, যাদের সন্তান থেকেও তারা সেই সন্তানের মর্যাদা দেয় না। সকলেই নয় তবে দশজনের মত একজন এমন আছে যারা নিজের সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট নয়। তেমনি তূর্ণার মেয়েটাও, রুমা মেয়েটাকে এত অল্প সময়ে খুব আপন করে নিয়েছে। মেয়েটা ওর বাবার বাড়িতে ভালো ছিল না, ওর উপর মানসিক ভাবে অত্যাচার করা হতো যতটুকু বুঝলাম। মেয়েটাকে ওর বাড়ির কেউই ভালোবাসে না, ওর সমস্যা কারণে নিজের বাবা হয়তো অবজ্ঞা করে। অথচ দেখ পৃথিবীতে আমাদের মত কত দম্পতি আছে যারা একটা বাচ্চার জন্য পাগল! হোক সেটা পাগল কিংবা প্রতিবন্ধী। অথচ মানুষ পেয়েও মূল্য দেয়না।

তূর্ণার এই অবস্থার জন্য শতভাগ ওর পরিবার দায়! ওকে সময় মত যদি ওনারা চিকিৎসা করাতো তাহলে সমস্যাটা এত বড় আকাড় নিতো না। হয়তো সময়ের সঙ্গে ঠিকও হয়ে যেতো, সম্পূর্ণ না হোক মেয়েটা ভালো একটা জীবন পেতো। তাই চাই তুই মেয়েটাকে একটা স্বাভাবিক জীবন দেয়, জানি এটা বলা ঠিক না। তোর জীবন তুই যা সিদ্ধান্ত নিবি সেটা মেনে নিতেও সমস্যা নেই কারোই। কারণ জীবনটা তোর, তাই তুই যা চাবি তাই হবে। মেয়েটাকে যদি তুই ডিভোর্স দিস তাহলে মেয়েটা হয়তো আর বেঁচে থাকার মত অবস্থায় থাকনে না সমাজ নাম এই নোংরা খেলায় ও শেষ হয়ে যাবে। স্বয়ং ওর পরিবারও ওর দিকে ফিরে তাকাবে না, জানিস তো ডিভোর্স একটা নারীর জীবন কিভানে নরকে পরিণত করতে পারে।”
রৌদ্রিক শুনলো সবটা, সে খুব ভালো করে জানে কি হতে পারে সামনে। তবে সে মেয়েটার ভালো করতে গিয়ে যদি খারাপ করে ফেলে, তখন সে কি করবে। এরজন্যই সে বিয়ে করতে চায়নি। যেদিন তার খুব করে মনে হতো তার বাকিটা পথ চলার জন্য একজন সঙ্গীর প্রয়োজন তাহলে সে বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হত। রশিদ সিকদার রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আবারও বলে-
“ ভেবে দেখ কি করবি, তুই যা সিদ্ধান্ত নিবি তাই হবে। কোনো কিছুতেই জোর নেই!”

দিনের প্রখরতা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে, সূর্য যেনো তার অগ্নিময় অহংকার গুটিয়ে নিয়ে নরম স্বর্ণাভ আলোর আবরণে ঢেকে দিয়েছে পৃথিবীকে। দূর আকাশে অলস ভেসে চলেছে কয়েকটি মেঘখণ্ড, তাদের রং সূর্যের শেষ আলোয় কখনো অগ্নিমাখা কমলা, কখনো বা গাঢ় রক্তিম দেখাচ্ছে। পাখিরা দূর আকাশ পেরিয়ে আপন নীড়ে ফেরার তাড়ায় ডানা ঝাপটাচ্ছে, তাদের কিচিরমিচির ধ্বনি বিকেলের স্তব্ধতায় সুরের মতো ভেসে উঠছে।
রৌদ্রিক বাড়ির ভিতর পা রাখতেই তূর্ণাকে দেখতে পায়। সাথে তার কোলে ছোট্ট রোদেলাও রয়েছে, আশেপাশে বার বার চোরা চোখে তাকিয়ে দেখছে কেউ আছে কিনা। এই সময়টাকে বাড়ির গৃহিণীরা রান্না ঘরে বিকেলে নাস্তা বানাতে ব্যস্ত থাকে। বাড়ির সবার রান্নাটা তারাই করে, রৌদ্রিক বুঝলো না এইভাবে চোরের মত করে এদিক-ওদিক তাকানোর। তূর্ণা রোদেলাকে আস্তে করে কি জানি বলাতে রোদেলা হেসে ওঠে, আস্তে আস্তে সিড়ি বেয়ে উপরের দিকে চলে যায় তারা। রৌদ্রিকও আর দেরি করলো না, সে নিজেও তাদের পিছু ছুটলো। তূর্ণা ঘরে এসে রোদেলাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে সামনে কতগুলো পাকা পাকা সবেদা আর পেয়ারা রাখলো। এইগুলো তাদের বাগানের, রৌদ্রিক শব্দ বিহীন দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো দেখার জন্য এই মেয়ে আসলে করে কি। এই একদিনে রোদেলার সঙ্গে তূর্ণার বেশ ভাব হয়ে গেছে, তূর্ণা রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলে-

“ পুতুল সোনা, তুমি কি খাবে? পঁচা শ্বাশুড়ি দেখলে বকা দিবে তো। চুরি করা ভালো নয়, কিন্তু তারপরও করলাম। তুমি কিন্তু একদম চুরি শিখ না কেমন!”
রোদেলা হেসে দিলো তূর্ণার কথায়। তূর্ণা রোদেলার হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ পুতুল সোনা তোমাকে হাসলে অনেক সুন্দর লাগে! তুমি এইভাবেই হাসবে ঠিক আছে? তুমি আমার বাসার পুতুলের থেকেও মিষ্টি দেখতে৷ আমার সাথে খেলাও কর কি সুন্দর।”
রোদেলা তূর্ণার কথা শুনে হেসে হেসে বলে-
“ আ.আনি কি তুতুল? আ..আতা তুতুল কি?”
তূর্ণা রোদেলার কথা বুঝতে পারলো না। তাই বোঝার জন্য বলে-
“ তুমি কি বলছো আমি তো বুঝতেই পারছি না। পুতুল সোনা তুমি আমার মত কথা বলতে পারো না কেনো? আচ্ছা সবেদা খাবে তুমি? এটা অনেক নরম!”

বলেই বিছানায় থাকা নরম একটা সবেদা তুলে নিলো। রোদেলা খুশি মনে সেদিকে তাকিয়ে আছে তারও খাওয়ার ইচ্ছে জেগেছে। রোদেলা, তূর্ণা আর রিনি রুমেই বসে ছিলো। তিনজন নানা রকম আজগুবি গল্প করছিলো, কেউ একটা ফোন করা রিনি করায় ব্যস্ত হয়ে পরে। তূর্ণা রোদেলাকে কোলে নিয়ে রিনির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাগান দেখছিলো, তখনই তূর্ণার নজর পরে বাগানে থাকা পেয়ারা গাছ আর সবেদা গাছের দিকে। দূর থেকে তূর্ণার মনে বেশ লোভ জাগলো সেইগুলো খাওয়ার, তাই নিজের ইচ্ছেটাকে আর দমন করে রাখতে না পেরে রোদেলাকে কোলে নিয়েই চুপিসারে নিচে নেমে আসে। গাছগুলো মাঝারি আকাড়ের হওয়ায় তূর্ণা সহজেই সেইগুলো পেরে বাড়ির ভিতরে এসে পরে। তার ভাবনা মতে কেউ যদি দেখে সে গাছ থেকে ফল পেরেছে তাহলে তাকে হয়তো খুব করে বোকতো! তাই সে চোরের মত চুরি করে এইসব নিয়ে এসেছে, রোদেলা এর আগে এমনটা করেনি তাই তারও বেশ ভালো লেগেছে। সে নীরবে তূর্ণার সঙ্গী হয়েছে, তূর্ণা সবেদাটা রোদেলার মুখের সামনে ধরতেই পিছন থেকে রাশভারি গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে-

“ ওকে দিও না, এইভাবে খেতে পারবে না।”
কথাটুকু বলে ভিতরে প্রবেশ করলো রৌদ্রিক। রৌদ্রিকে দেখে তূর্ণা ভূত দেখার মত চমকে উঠো! তার হাতে থাকা ফলটা নিচে পরে গেলো মুহুর্তে। রোদেলা পাপাকে দেখা মাত্রই পাপা যাবে শুরু করে দিয়েছে, এদিকে তূর্ণা ভয়ে শেষ! তার বর কি দেখে ফেলেছে সে চুরি করেছে? তার বরও কি সবার মত না বলে নেওয়ার জন্য বকাঝকা করবে? ভাবতে ভাবতে ভয়ে ছিটিয়ে যায় সে। রৌদ্রিক রোদেলাকে কোলে নিয়ো তূর্ণার দিকে শীতল দৃষ্টি তাক করে। তূর্ণার অবস্থাটা বুঝতে পেরে শান্ত কণ্ঠে বলে-
“ ফল খেতে চাইলে যে কাউকে বললেই পেরে দিবে। আর রোদকে এত বড় পিস খেতে পারবে না, কুসুমকে বলে কাটিয়ে এনে দিচ্ছি তারপর খাও।”

রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা অবাক হয়ে গেলো! তার বর তাকে বকলো না চুরি করার জন্য, এই বাড়িতে তাকে কেউই বকে না শুধু পঁচা শ্বাশুড়ি ছাড়া। এই বাড়িতে আসার পর বকাও খেতে হয়নি শুধু একজন ছাড়া। তারপরও তূর্ণার ভয় কাটলো না, সে ভয়ে ভয়ে রৌদ্রিকে দেখে নিলো তার বর একদম টিভিতে থাকা হিরোদের মত দেখতে, ওমনই লম্বা, ওমনই সবকিছু দেখতে। হয়তো টিভির হিরোর থেকেও বেশি সুন্দর তার বর! তূর্ণা আমতা আমতা করে বলে-
“তূর্ণা..আ.আর না বলে নিবো না কিছু। আমাকে বলা দিও না কেমন বর!”
রৌদ্রিক শান্ত চোখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গোল জামা পরিহিত মেয়েটাকে দেখে নিলো। শাড়ি পরায় যতটুকু বড় লাগে, জামা পরলে সম্পূর্ণ বাচ্চা লাগে। তার বয়স তেত্রিশ+ চলে এই মেয়ের বয়স কত হবে? তাদের মধ্যকার বয়সের তফাৎটাও বেশখানিক মনে হচ্ছে।
“ যা খেতে মন চায়, তা বলবে বাড়ির যে কাউকে তাহলে তারা বানিয়ে দিবে। তোমার জামা-কাপড় কোথায়?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণার কালকে চলে যাওয়ার আগে সেলিমা খাতুনের কথা মনে পরলো। সেলিমা খাতুন বলে গিয়েছি তার বর নাকি তাকে ফেলে দিবে সে পাগল বলে। তার পুতুলের মত তার কোনো সংসার হবে না। আর তাকে যদি তার বর ফেলে দেয় তাহলে সেলিমা খাতুন তাকে আর ওই বাড়িতে নিবে না। এইসব ভাবতেই তূর্ণা ভয়ে তার নেত্রকোণে অশ্রু এসে হানা দিলো! রৌদ্রিকের দিলে অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে ভেজা গলায় বলে-
“ আমি পাগল বলে, আপনি আমাকে মায়ের কাছে রেখে আসবেন বর? বাড়িতে গেলে খুব করে মারবে আমায় আবারও!”

তূর্ণা এমন কথা শুনে রৌদ্রিক কি উওর দিবে ভাবনায় পরে গেলো। সত্যি ই কি ওই বাড়িতে এই অসুস্থ মেয়েটার উপর এত অত্যাচার করা হতো? মেয়েটা তো এমনি অসুস্থ, তারমধ্যেও মানুষ কিভাবে এমন একটা মানুষকে মারতে পারে? রৌদ্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে কি করবে। তূর্ণার অশ্রুসিক্ত নেত্রদ্বয়ে দৃষ্টিরেখা মিলিয়ে শান্ত স্বরে বলে ওঠে-
“ তোমার সঙ্গে পথ চলতে আপত্তি নেই আমার। আমি তোমার দূর্গম পথের সঙ্গী হবো ঠিকই কিন্তু সেই পথে ভালোবাসা থাকবে এমন নিশ্চয়তা দিতে পারছিনা।”
তূর্ণা রৌদ্রিক এত কঠিন কথার অর্থ বুঝতে পারলো না। অবুঝের মত চেয়ে রইলো বর নামক মানুষটা দিকে, রৌদ্রিক তূর্ণার অবস্থাটা বুঝতো পারলো, নিজের কথায় নিজেই বিরক্ত হলো। কাকে কি বলছে সে, মেয়েটাকে কি আদৌও তার এই কথার মানে বুঝবে নাকি। রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে-
“ কোথাও রেখে আসবো না, আজ থেকে এটাই তোমার বাড়ি। এখানে কেউ তোমাকে মারবে না, যদি মারে আমাকে বলবে। ভদ্র মেয়ের মত আমার কথা শুনবে। তোমার নাম কি যেনো..??”
তূর্ণা খুশি হয়ে গেলো রৌদ্রিকের কথা শুনে। সে মুখে হাসি বজায় রেখেই বলে ওঠে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪

“ তূর্ণা..।”
রৌদ্রিক তূর্ণার উপর পূর্ণ দৃষ্টি রেখে গম্ভীর স্বরে বলে –
“ আজ থেকে তুমি আমার বউ, আমার অর্ধাঙ্গিনী৷ আমি যা বলবো তোমাকে তাই শুনতে হবে। কারণ আমি অবাধ্যতা পছন্দ করি না। যদি বলি চলে যাও তাহলে চলে যাবে, যদি না করি তাহলে করবে না। এই বাড়িতে তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে থাকবে অন্যকারো বোঝা হয়ে নয়। তাই আমি যা বলবো তাই তোমাকে শুনতে হবে আর মানতে হবে। বুঝতে পেরেছো.??”
তূর্ণা সবকিছু না বুঝলেও, যতটুকু বুঝতে পেরেছে সেই হিসেবে সে মাথা নিচু করে নিচু স্বরে বলে-
“ আমি সব শুনবো বর, তুমি খালি আমাকে মেরোনা।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৬