অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৬
ফাহিমা ইসলাম
সময়, সে কোনো দিন কারো জন্য থামে না। সে এক নির্মম যাযাবর, যার পদচিহ্ন নেই, অথচ যার গমনধ্বনি প্রতিটি নিঃশ্বাসে সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয়। সে নদীর মতো অবিরাম, অপ্রতিরোধ্য। কখনো শান্ত স্রোতে ভেসে যায়, আবার কখনো উন্মত্ত বেগে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায় অজানার অতলে। কারো আকুল প্রার্থনা, কারো অশ্রুসিক্ত আর্তি কিছুই তাকে বেঁধে রাখতে পারে না। চোখের পলকেই কেটে গেছে গোটা একটা সপ্তাহ, এক সপ্তাহে কি কারো জীবনে পরিবর্তন সম্ভব হয়? হয়তো কারো মতে হ্যাঁ অথবা না, কারণ সময় সকলের জন্য এক নিয়মে চলে না। সময়ের স্রোত কারো জীবনে সুখ বয়ে আনে নতুবা কারো জীবনে দুঃখের ঢেউয়ে ভাসিয়ে দেয়। সময় হয়তো চেয়েছিল তূর্ণা নতুন করে বাঁচুক, কারো অবহেলায় নয়, কারো কাঁধের বোঝা হয়ে নয়। বরং কারো জীবনসঙ্গিনী হয়ে সে বেঁচে উঠুক নতুন রূপে। জীবন আমাদের প্রতি পদে পদে শিক্ষা দিয়ে যায়, আমাদের দিয়ে যায় কিছু কারণ যা নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা হয়ে ওঠে।
তূর্ণা রোজ হাসে, আবারও মাঝে মাঝে কাঁদেও। হয়তো নিজের জীবনে এই বিরাট বড় পরিবর্তন তার গোটা জীবনে এমন বিপুল পরিবর্তন এর আগে সে দেখেনি। কেউ তাকে দেখায়নি, এমন পরিবর্তন। রৌদ্রিক তূর্ণাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী রূপে মেনে নেওয়ার পর থেকেই জবা সিকদার ছেলের উপর বেশ বেজায় হয়ে আছেন। তিনি কোনো কালেই এমন একটা মেয়েকে মেনে নিতে পারছেন না, তার নরম মনটা কেনো জানি তূর্ণা নামক মায়ায় ভড়া অসুস্থ মেয়েটার উপর নরম হয় না! কেমন পাথরে পরিণত হয়েছে তার হৃদয় এই মেয়ের প্রতি। দ্বিতীয় বার ছেলেটার জীবনটাকে নতুন রূপে সাজিয়ে দেওয়ার সুযোগ তারা পেয়েছিলো অথচ ভাগ্য বয়ে এনেছে অন্য এক ঝড়! রোদেলা পেলো না একটা সুস্থ মা, আর না রৌদ্রিক পেলো তার উত্তম এক জীবনসঙ্গী!
মা হয়ে নিজের সন্তানের এমন সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াটা একদমই সহজ নয় তার নিকট। চাইলেও আর তূর্ণাকে মারতে পারে না, আর না মারার ইচ্ছে জাগে। সবদিক দিয়ে দেখলে এই মেয়েটাকেও দোষী হিসেবে গণ্য করা যায় না। তারা সকলেই একটা পরিস্থিতির শিকার মাত্র! তবু কিছু পরিস্থিতি বয়ে আনা সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সমস্যা হয় না; কিন্তু এই পরিস্থিতি যা বয়ে এনেছে সেটা মেনেও নেওয়া যায় না।
রৌদ্রিক সিদ্ধান্তের উপর আর কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এইসবের পিছনে সকলের অদৃশ্য এক হাত রয়েছে, তাই তাদেরও জোর খাটানোটা এখানে আর মানায় না। তূর্ণার অবুঝ পাখির মত সারাদিন রুমেই থাকে, প্রয়োজন ছাড়া বের হয় না। তার বরং তাকে বারণ করে যায় রোজ যাতে সে দুষ্টুমি না করে, আর তূর্ণার দাদি বলেছে বরের সব কথা মানতে হয়। নাহলে আল্লাহ নারাজ হয়, আল্লাহ নারাজ হলে এই পৃথিবীতে তো আর কেউ থাকবে না তার। তাই চুপটি করে বর নামক মানুষটার শাসন সে মেনে নেয়, রোদেলার এখন তার প্রিয় পুতুল হয়ে উঠেছে। বেশির ভাগ এই পুতুলের সঙ্গেই তার সময় কাটে, সে আর রোদেলা মিলে রোদেলার সব খেলনা দিয়ে খেলে। রোদেলাকে আদর করে দিলে রোদেলাও তাকে আদর করে দেয়। ওই বাড়ির মত কেউ তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়না। আর না তাকে বাশি খাবার খেতে দেয়, আর কেউ মারেও না তাকে। এখানে আসার পর সব যেনো তার স্বপ্নের মত হচ্ছে, সে আগে আল্লাহর কাছে নালিশ জানাতো তাকে সবাই কেনো মারে? তাকে কেউ কেনো ভালোবাসে না? সে আল্লাহ কাছে চাইতো সবাই যেনো তাকে একটু ভালোবাসে, তাকে না মারে। এখানে আসার পর তার সব চাওয়া কেমন করে পূর্ণ হয়ে গেছে।
সূর্য আজ মধ্যগগনে তার অগ্নিময় আধিপত্য বিস্তার করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন জ্বলন্ত ক্রোধে পৃথিবীকে শাস্তি দিচ্ছে। তার প্রখর কিরণ ধরণীর প্রতিটি কণায় কণায় আগুনের শলাকার মতো বিঁধে যাচ্ছে। ধুলিকণাগুলো সূর্যের তাপে ঝলসে উঠে ক্ষুদ্র অগ্নিকণার মতো ঝিকমিক করছে। পাখিরা আর উড়ে বেড়াচ্ছে না,
তারা আশ্রয় নিয়েছে গভীর ছায়ার নিভৃত আঁধারে, যেন এই দহন থেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাইছে।
বারান্দায় থাকা খাঁচায় রাখা টিয়া পাখির দিকে তাকিয়ে আছে তূর্ণা। কালকে রাতেই তূর্ণার বর এইটাকে এনেছে, কি সুন্দর দেখতে এটা! রোদেলাকে গোসল করাতে নিয়ে গেছে জবা সিকদার। সে এই ভরদুপুরে পাখিটাকে দেখতে ব্যবস্থা। আরও কয়েক ধরনের পাখি এনেছে, তবে সেগুলোর থেকে টিয়া পাখির উপর নজর তার। তূর্ণা টিয়া পাখিটার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ এই টুকটুকি, তুই এত সুন্দর কেনো? জানিস তোর মত আমারও একটা ভাঙা টিয়া আছে, কিন্তু ও তোর মত করে ডাকে না। তোর মত করে খাবারও খায় না, তুই কি আমার বন্ধু হবি..??”
পাখিটা শব্দ করে উঠলো, তূর্ণা লাফিয়ে উঠলো খুশিতে! এর মানে পাখিটা তার বন্ধু হবে। তূর্ণা পাখিটার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বলে-
“তাহলে আজ থেকে আমরা বন্ধু কেমন! তুই, আমি, পুতুল সোনা, রিনি আমরা বন্ধু কেমন। আর তোর নাম টুকটুকি।”
পাখিটা আবারও ডেকে উঠলো, তূর্ণা খুশি মনে চেয়ে রইলো। তার একলা জীবনে রঙিন ফানুসের মত তার বর নামক মানুষটা এসে পাল্টে দিয়েছে। তার কতগুলো বন্ধু হয়েছে, এখানে কেউ তাকে পাগল বলে অবহেলা করে না। বরং তার খেয়াল রাখে, তাই না চাইতেও বরের প্রতি তূর্ণার অন্তঃকরণে আলাদা এক জায়গা তৈরি হয়েছে। তূর্ণার কথার মাঝেই, সেখানে জবা সিকদার রোদেলাকে লোকে নিয়ে আসেন। তূর্ণা দিকে গম্ভীর ভাবে তাকিয়ে বলেন-
“ নিচে আসো খাবার খাবে।”
জবা সিকদারকে দেখতে পেয়ে তূর্ণার হাসিটা বন্ধ হয়ে গেলো। সারা বাড়িতে এই এক মানুষ যাকে সে জমের মত ভয় পায়! যাকে দেখলেই তার বুকটা কেমন ধুকপুক করতে শুরু করে দেয়। তূর্ণা নীরবে জবা সিকদারের পিছনে পিছনে নেমে আসে, দুপুরের সময় বাড়ির পুরুষেরা তেমন থাকে না। রিনি কালকে আবারও হোস্টেলে ফিরে যাবে, তাই তার জন্য বাড়িতে শুঁকনো জাতীয় খাবার তৈরি করা হচ্ছে। রুমা সিকদার প্লেটে ভাত বাড়ছিলেন, তূর্ণাকে দেখে হাসি মুখে সেদিকে তাকায়। তূর্ণা রুমা সিকদারকে দেখে খুশি হয়ে যায়, এই একটা মানুষ যেকিনা প্রথম যেদিন এই বাড়িতে পা রেখেছে সেদিন থেকেই তার খেয়াল রাখে। মানুষটার কাছ থেকে কেমন মা মা গন্ধ আসে! মা মা গন্ধ কেমন হয় সেটা তূর্ণার জানা নেই। তবু কেনো জানি এই কয়েকদিনের মাঝেই এই মানুষটাকে নিজের খুব আপন লাগে। জবা সিকদার রোদেলাকে খাবার খাওয়াচ্ছে, রোদেলা চুপচাপ ভদ্র বাচ্চার মত খাচ্ছে আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। রোদেলা হাত নাড়িয়ে তূর্ণাকে তার আঙ্গুল দেখাচ্ছে, তূর্ণা চোরা চোখে সবকিছু দেখছে। জবা সিকদার থাকায় তেমন কিছু করার সাহস পাচ্ছে না, যদি আবারও মারে তাকে!
রোদেলা খেতে খেতে আধো আধো স্বরে বলে-
“ তুনা,তুনা দেকু..দেকু।”
তূর্ণার দেখলে বাচ্চাটা তাকে তার আঙ্গুল গুণে গুণে দেখাচ্ছে। তূর্ণা হাসি দিলো একটা, তার খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। রুমা সিকদার তূর্ণার কবুতরের মত খাওয়া দেখে শাসিয়ে বলে-
“ আর একটু ভাত নাও তূর্ণা। এতটুকু খেলে কি করে হবে?”
তূর্ণা ভয়ে ভয়ে একবার জবা সিকদারকে দেখে নিলো। তারপর মিনমিনিয়ে বলে-
“ বাড়িতে মা এতটুকুই দেয় তো, তাই এতটুকুই খেতে পারি।”
“ এখন থেকে যত ইচ্ছে খাবে, এটা এখন তোমারও বাড়ি।এখানে কেউ মানা করবে না, তোমার শ্বাশুড়িও না।”, ‘বলেই রুমা সিকদার জবার দিকে তাকিয়ে হাসে।’
জবা সিকদার কিছু বললেন না, তাকে যে তূর্ণা ভয় পায় সেটা সে নিজেও জানে। কিন্তু সবার মত সে ভয়টা কাটানোর চেষ্টা করলো না, বরং নিরব থাকলেন। এত ভালোর মাঝে সে নাহয় একটু খারাপ থাকলো সমস্যা কই?
গোধূলির লগ্নে সেজে উঠেছে গগন। পক্ষীরাজরা নীড়ের দিকে ছুটে চলেছে। সূর্যীখানা কোমলার মত হয়ে আছে, কিছু সময় পরই সেটা ডুবে যাবে তিমির অতলে। বাসার ঘর থেকে হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসচ্ছে। তূর্ণা রুম থেকেই নিচ থেকে ভেসে আসা শব্দ শুনতে পেলো, রুমে এখন শুধুই সেই রয়েছে। রোদেলা তার দাদির কাছে, কিছু সময় আগেই নিয়ে গেছে খাওয়ানোর জন্য। তূর্ণা বারান্দায় বসে টুকটুকির সঙ্গে কথা বলছিলো, তার মাঝেই হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসে। নিচে সবাই হয়তো আনন্দ করছে, রিনির শব্দে সহ সকলেরই কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। সঙ্গে নতুন দু’টি অচেনা স্বরও কর্ণকুহরে এসেছে তূর্ণার। তূর্ণার মনটা কেমন আকুবাকু করলো নিচে যাওয়ার জন্য। ইচ্ছে করলো সেও নিচে গিয়ে দেখবে আসলে হচ্ছে কি?
তূর্ণা আর নিজের অবাধ্য মনটাকে সামলে রাখতে পারলো না। পা টিপে টিপে নেমে এলো সিড়ির কাছে, সিড়ি কাছে আসতেই ড্রইংরুমে দু’টো ছেলেকে দেখতে পেলো। দুই জনের পরণেই ফর্মাল ড্রেস, দেখতেও বেশ! তূর্ণা চিনলো না এদের। কারা এরা? মনে প্রশ্ন জাগলো, এখানে আসার পর এদের তো দেখেনি সে। সবার সঙ্গেই দেখা হয়েছে এরা ব্যতীত। রিনি খুশিতে গদগদ হয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ রোহান ভাই কি কি এসেছো আমার জন্য? আমি কি তোমাকে বলেছিলাম যেগুলো আনতে সেগুলো এনেছো তো?”
রিনির কথা শুনে রোহান নামক ছেলেটা রিনির দিকে ভ্রু নাচিয়ে তাকালো। তারপর মাথায় গোট্টা মেরে বলে-
“ তুই কে রে যে তোর জন্য আনবো? চাচি এই ফক্কিনিকে কোথা থেকে আনছো?”
সিকটার সিকদার বাড়ির তিন গিন্নীই হাসলে ভাই-বোনদের এমন খুনসুটি দেখে। রিনি রাগে কিল বসিয়ে দিলো রোহানের পিঠে। রোহানের কথা শুনে পাশে থাকা শ্রাবণ হেসে উঠলো, তার হাসি দেখে রিনি আরও জ্বলে উঠলো। রিনি রাগে রিনরিন হয়ে বলে-
“ আম্মু এদের বাড়ি থেকে বের করে দাও তো। শয়তান গুলো আমার কিছুই আনেনি।”
রিনির কথা শুনে শ্রাবণ বলে-
“ এই শাঁকচুন্নি চুপ কর তো। রোদ সোনা চাচ্চুর কাছে আসো তো দেখি। কতদিন আদর করি না চাচ্চু তোমাকে।”
বলেই রোদেলাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে থাকে। রোদেলা আহ্লাদী হয়ে উঠলো, এর মাঝেই রোহান বলে ওঠে-
“ আরে আমাদের ভাবি নাকি? এদিকে আসুন ভাবি।”
রোহানের কথা শুনে তূর্ণার চমকে উঠলো! এইভাবে সবার নজরে এসে যাবে সে ভাবেনি। রিনি দৌড়ে গিয়ে তূর্ণাকে নিজের সঙ্গে করে নিয়ে আসে। তূর্ণা আতঙ্কিত ভাবে তাকালো সামনে। রোহান হাসি মুখে বড় করে সালাম দিয়ে বলে ওঠে-
“ আমি রোহান, আপনার দুই মাত্র দেবরের একজন।”
রোহানের কথা শুনে রিনি মুখ বাঁকিয়ে বলে-
“ দেবর না ছাঁই, ও হলো একটা বাঁদর ভাবি।”
রোহাম আবারও রিনির মাথায় গাট্টা মেরে বলে-
“ এই তুই চুপ থাক বেশি কথা বলিস না। তা ভাবি, আমরা দুইজন ভাইয়ের বিয়েতে থাকতে পারিনি তাই হয়তো আমাদের দেখেনি। যাই হোক আপনার সঙ্গে পরে আরও ভালো করে আলাপ কর কেমন।”
তূর্ণা শুধু মাথা নাড়ালো, শ্রাবণ রোদেলাকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এসে তূর্ণাকে সালাম দিলো। তূর্ণা শুধুই চুপ থাকলো, শ্রাবণ আর রোহান হলো সিকদার বাড়ির মেঝ ছেলে রহিম সিকদারের দুই ছেলে। রাশেদুল সিকদারের এক ছেলে আর এক মেয়ে, রশিদ সিকদারের কোনো সন্তান নেই। তাদের পরিবারটা যৌথ পরিবার তিন ভাই এক সাথেই থাকে। এতে করে সম্পর্কগুলো আরও মজবুত আর ভালো হয়। দু’জনই কয়েক মাসের জন্য কিছু কাছে লন্ডনে ছিল, বিয়ের আগেই এসে পরতো কিন্তু ফ্লাইটের সমস্যা হওয়ার কারণে সময় মত আর আসতে পারেনি। রোমানা সিকদার ছেলেদের তারা দিয়ে বলেন-
“ উপরে যা ফ্রেশ হয়ে আয় খাবার খেয়ে তারপর সব কয়টা মিলে বসে গল্প করিস।”
রোহান আর শ্রাবণ নিজেদের রুমে পা বারালো। শ্রাবণের সাথেই রোদেলাও গেলো, চাচ্চুদের সাথে আর গলায় গলায় ভাব। অনেকদিন পর চাচ্চুদের পেয়ে এত তাড়াতাড়ি কাছ ছাড়া করবে না। রিনি তূর্ণাকে নিয়ে নিজের রুমে গেলো, আবারও যে যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পরলো।
আজকের নিশীথে আকাশ যেন তার সমস্ত অন্ধকার জমাট বেঁধে ছুঁড়ে দিয়েছে পৃথিবীর বুকে। মেঘেরা উন্মত্ত, বিদ্যুৎ তাদের ক্রুদ্ধ শিরা ক্ষণে ক্ষণে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে রাতের স্তব্ধতা। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে, এই বৃষ্টির ধারাগুলো আর স্রেফ জল নয় ওগুলো যেন বহু যুগের দহন, বহুদিনের দমিয়ে রাখা কান্না। রৌদ্রিকের পদচারণা ভারী ভাবে ফেলে নিজের রুমের দিকে এগোচ্ছে। বাহিরের ঝড় যেন তার ভেতরের অস্থিরতারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় পর সে ফিরেছে ক্লান্ত, অনাগ্রহী, আর একরাশ অদৃশ্য বিরক্তি নিয়ে। দরজার সামনে আসতেই রৌদ্রিক দাঁড়িয়ে পরলো হঠাৎ। রুমের ভিতর থেকে ভেসে আসচ্ছে দু’টি অদ্ভুত হাসির শব্দ!
হাসি? না, সাধারণ কোনো হাসি নয় এটাতে ছিল খণ্ডিত, নিরুদ্বেগ, শিশুসুলভ এক নির্মল উচ্ছ্বাস, যার মধ্যে ছিল না কোনো সামাজিক বাঁধন, না কোনো লুকানো অর্থ। রৌদ্রিক থমকে দাঁড়াল দরজার সামনে, তার কপালের ভাঁজগুলো একটু গভীর হলো। এই হাসি অচেনা, অপ্রত্যাশিত শব্দ তার অভ্যস্ত নির্জনতায় এক অদ্ভুত কম্পন তুলছে। তার অন্তঃকরণে ভেতর কোথাও যেন খুব সূক্ষ্ম এক সাড়া জেগে উঠল কিন্তু সেটার নাম কী? বিরক্তি? বিস্ময়? নাকি অন্য কিছু? সে জানে না, আর সে জানার চেষ্টাও করল।
ধীর পায়ে সে এগিয়ে এলো রুমের দিকে। সামনে তাকাতেই দৃশ্যটা স্থির হয়ে গেল তার দৃষ্টি। তূর্ণা মেঝেতে বসে আছে আর তার পাশেই ছোট্ট রোদেলাও হাসছে, আর তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু রঙিন কাগজ। সে নিজের মনে হাসছে, ঠিক যেমন কোনো ছোট্ট শিশু অকারণের আনন্দে মেতে ওঠে। তার এলোমেলো চুল মুখের ওপর এসে পড়েছে, তবুও তাকে বিরক্ত দেখালো না। তার চোখে জুড়ল এক অদ্ভুত নিষ্পাপ শূন্যতা। যেখানে পৃথিবীর জটিলতা পৌঁছাতে পারেনি এখনো। তার জান বাচ্চাটাও আনন্দ করছে, না চাইতেও অন্তঃকরণে শীতল এক হাওয়া বয়ে গেলো। রৌদ্রিক সামনে থাকা তূর্ণার দিলে শান্ত চোখে তাকালো। এই মেয়েটা তার স্ত্রী। শুধুই ‘স্ত্রী’ একটি সম্পর্কের শুষ্ক সংজ্ঞা, এর বেশি কিছু নয়। তবু কতকিছু ঘিরে রয়েছে এই শব্দের মাঝে। তূর্ণার হাসির শব্দটা আবার ভেসে এলো, আর অদ্ভুতভাবে সেটা তার বুকের ভেতর প্রতিধ্বনিত হলো, একটা অচেনা অনুভূতি ধীরে ধীরে গাঢ় হতে লাগল, যার নাম সে কোনো অভিধানেই খুঁজে পেলো না।রৌদ্রিক ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে গেলো, দুই জনই নিজেদের কাজে মগ্ন। তার উপস্থিতি টের পেয়ে তূর্ণা মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে ভয় নেই, সংকোচ নেই, শুধু আছে এক সরল উচ্ছাস। তূর্ণা রৌদ্রিকে দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলে-
“ তুমি এসেছো বর?”
কণ্ঠে এমন এক নির্ভার উচ্ছ্বাস, যেন রৌদ্রিকের এই আগমনটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার অভ্যস্ত কঠোর শব্দগুলো যেন গলায় আটকে গেল। মেয়ের পানে চাইলো, মেয়েটা পাপা পাপা বলে হাত বাড়িয়েছে কোলে ওঠার জন্য। রৌদ্রিক দেরি না করে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। সারাদিন পর নিজের অস্তিত্বকে দেখতে পেয়েছ আলাদা এক প্রশান্তি ছেয়ে গেলো। তূর্ণার দিকে তাকিয়ে ভারী কণ্ঠে বলল-
“এইসব কী করছো?”
তূর্ণা হেসে উঠল আবার,
“ ছবি বানাচ্ছি… তুমি দেখবে বর?”
সে হাত বাড়িয়ে কিছু কাগজ এগিয়ে দিল অগোছালো, অর্থহীন আঁকিবুঁকি। কিন্তু তার চোখে সেটাই যেন তার সম্পূর্ণ জগত। রৌদ্রিক তাকিয়ে রইল, রোদেলাও বাবাকে দেখাচ্ছে আর বলছে তারা কি কি করেছে। রৌদ্রিক শান্ত ভাবে সবটা দেখলো, তূর্ণা আর একটা কাগজ তুলে নিয়ে উচ্ছাসের সঙ্গে বলে ওঠে-
“ এটা দেখ বর, এখানে তুমি, আমি,পুতুল সোনা, টুকটুকি আর রিনি আছি। তোমরা সবাই খুব ভালো! আমরা সবাই একসাথে এখানে।”
রৌদ্রিক তূর্ণার হাসিমাখা মুখশ্রীটা দেখলো। মেয়েটাকে একদলা স্নিগ্ধতা এসে ঘিরে ধরেছে, চুলগুলো আলতো করে উড়ছে মৃদু বাতাসের তালে। চুলগুলো বেশি বড় না হলেও কোমড় অব্দি ছুঁই ছুঁই। রেশমের মত মোলায়েম কেশরাশি থেকে অদ্ভুত এক সুগন্ধি ভেসে আসচ্ছে বাতাসের তালে। রৌদ্রিক দৃষ্টি সরিয়ে নিলো, মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলে-
“ এখান ঘুমানোর সময়, এইসব আবার কালকে কর। রাগে খাবার খেয়েছো?”
তূর্ণা ভদ্র মেয়ের মত সবটা মেনে নিয়ে কাগজ উঠাতে উঠাতে বলে-
“ হুম খেয়েছি তো, শ্রাবণ ভাইয়া ত্রিভুজের মত কি জানি এনেছিলো। ওইটা প্রথমে গোল ছিল জানো বর, তারপর কেমন করে ত্রিভুজ হয়ে গেলো। খেতে অনেক মজা ছিল, আমি প্রথমবার খেলাম! এত মজা ছিল।”
রৌদ্রিক বুঝলো ওইটা পিৎজা ছিল। শ্রাবণরা এসেছে বিকেলেই জানতে পেরেছে। রাত হওয়ায় আর দেখা করতে গেলো না, একবারে সকালে দেখা করে হসপিটালে যাবে। রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ ওটার নাম পিৎজা, তোমার ভালো লেগেছে?”
তূর্ণা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। তারপর আবারও বলে-
“ আচ্ছা বর ওটা ওমন দেখতে হয়ে গেলো কেনো কাটার পর?”
রৌদ্রিক কি বলবে বুঝলো না। তারপর বলে-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫
“ গোল থাকায় আড়াআড়ি করে কাটার কারণে ত্রিভুজ আকৃতির হয়ে যায়।”
“ ও আচ্ছা তাই বল। তুমি কি খাবার খেয়েছো বর?”
রৌদ্রিক শান্ত,গম্ভীর কণ্ঠে বলে-
“ না..।”
বলেই আলমারি থেকে জামা বের করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য চলে যায়। তূর্ণা আবারও ব্যস্ত হয়ে পরে রোদেলার সঙ্গে খেলায়।
