Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৭

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৭

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৭
ফাহিমা ইসলাম

সূর্য উদীরিত হয়েছে নতুন রূপে, তার তেজস্বী রশ্মিতে গোটা ধরণী ঝলমল করে উঠছে। নীলিমা জুড়ে মেঘের ঝাঁক উড়ে উড়ে দূরে কোথাও পারি দিতে ব্যস্ত। রোজকার নিয়ম মেনে পক্ষীরাজরা ডানা মেলে আপন নীড় থেকে বের হয়ে খোলা নীলিমায় নিজেদের মুক্তির উপসংহার জানান দিচ্ছে। রৌদ্রিক পাখিদের খাবার দিচ্ছে, রাতে বৃষ্টি হওয়ার কারণে সারা বারান্দা ভিজে একাকার! তবে বারান্দাটা বেশ বড় হওয়ায় পাখিদের বাসায় পানি এসে পৌঁছাতে পারেনি। এইগুলো সব রোদেলার জন্য এনেছে, মেয়েটা পাখি দেখে তাকে আবদার জানিয়েছিলো তারও এমন পাখি চাই। আর রৌদ্রিক নিজের মেয়ের কোনো ইচ্ছেই অপূর্ণ রাখে না। যেটা তার সাধ্যের মধ্যে এনে দেওয়ার মত থাকে সেটা এনে দেয়।

আজ শুক্রবার হওয়ায় আফ ডে নিয়েছে। এইদিনটা সে তার মেয়ের জন্য রাখে,কাজের কারণে সবসময় থাকা পরে না রোদেলার সঙ্গে তাই একটা দিন শুধু তার আর তার মেয়ের হয়। সকাল ছয়টা বেজে বিশ মিনিট; নামাজের পর আর ঘুমানো হয়নি। তাছাড়াও তূর্ণা আসার পর থেকে সোফায় ঘুমাচ্ছে সে। আর সে নিজের বিছানা ছাড়া ঘুমাতেও পারে না,যার কারণে ব্যাক পেন হয়েছে। তারপরও নিজের জীবনের এই পরিবর্তনটা মেনে নিয়েছে। মানুষকে তার পরিস্থিতি অনুযায়ী সবকিছু পরিবর্তন করতে হয়। আর তূর্ণাও তার পরিবর্তন একটা অংশ; রৌদ্রিক রুমে ঢুকতেই দেখতে পায় তূর্ণা উঠে বসে আছে। তার অক্ষিপুট ঘুমের তাড়নায় ঠিক মত খুলে রাখতে পারছে না। তারপরও ঘুমটাকে কাটানোর চেষ্টা করছে।
রৌদ্রিক সোফায় এসে বসলো, তূর্ণা সেদিকে ঘুম ঘুম চোখে তাকালো। রোদেলা এখনো ঘুমে রয়েছে, তূর্ণা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো, লম্বা কেশরাশি গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। ঘুমের কারণে মুখটা হালকা ফুলে আছে, মসৃণ তর্কে তৈলাক্ত ভাব জন্মেছে। রৌদ্রিক সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো, তূর্ণা রৌদ্রিকের সামনে দাঁড়িয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে-

“ আপনি কোথায় ছিলেন বর?”
রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে না তাকিয়েই শান্ত স্বরে উত্তর দেয়-
“ বারান্দায় পাখিদের খাবার দিচ্ছিলাম।”
তূর্ণা ভালো করে দেখলো রৌদ্রিক’কে কিছু সময় নিয়ে।কিছু সময় পর রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে প্রশান্তি মাখা কণ্ঠে বলে-
“ আপনি খুব ভালো বর। আপনি আমার জীবনে আসার পর সব কষ্ট কেমন করে পালিয়ে যাচ্ছে। আপনি আরও আগে কেনো আসলেন না আমার কাছে বর? আমায় কেউ কোনোদিন এতটা আদর করেনি। আপনি আসার পর সব কেমন স্বপ্নের মত হয়ে যাচ্ছে।”
তূর্ণার কথা শুনে রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। তারপর ভ্রু নাচিয়ে গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলে-

“ আমি আর ভালো! জানো আমি কি করি..??”
তূর্ণা হাসি হাসি মুখ করে বলে-
“ হুম আপনি অনেক অনেক ভালো! আমার দেখা সবচেয়ে ভালো বর আপনি। আর আপনি কি করেন গো বর..??”
রৌদ্রিক তূর্ণাকে কি মনে করে জানি তার ভয় দেখাতে ইচ্ছে করলো। তাই সে আগের থেকেও বেশি গম্ভীর মুখ করে, রাশভারী কণ্ঠে বলে-
“ আমি মানুষ কা’টি, সার্জারি করি। তোমাকেও কে’টে ফেলবো ওইভাবে।”
তূর্ণার রৌদ্রিকের কথা বিশ্বাস করলো না। তাই সে আগের থেকেও জোর দিয়ে বলে-
“ না না আপনি এমনটা করতেই পারেন না। আপনি কত ভালো, আমাকে কে’টে আপনারই বা কি লাভ হবে..??”
রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে ভ্রুযুগল কুঁচকিয়ে তাকিয়ে বলে-
” উমম! এত কনফিডেন্স আমার উপর। যদি কে’টে ফেলি তখন কি হবে..??”
তূর্ণা রৌদ্রিকের কথা শুনে মলিন হেসে বলে-
“ কি আর হবে হবে আমিও ম’রে যাবো আমার মায়ের মত। তারপর মায়ের মত তারা হয়ে আপনাকে আর পুতুলকে রোজ রাতে বেলা দেখতে আসবো।”
রৌদ্রিক শান্ত দৃষ্টিতে তূর্ণার দিকে চেয়ে রইলো। মেয়েটার জীবনটা এতটাও সহজ ছিল না তার আসার আগে। রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তূর্ণার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে-

“ ঘুরতে যাবে..??”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা বিস্মিত নয়নে রৌদ্রিকের দিকে চেয়ে রইলো ক্ষানিকটা সময়। এর আগে কেউ তাকে ঘোরা তো দূরে থাক, জিজ্ঞেস অব্দি করেনি। রূপা আর নয়ন মাঝে মাঝেই বাহিরে ঘুরতে যেতো। এমনকি লুকমান হোসেন আর সেলিমা খাতুনও সঙ্গে যেতো। কিন্তু তাকে কোনোদিন নিয়ে যায়নি, বাড়িতে তাকে যে একটু ভালোবাসত সে হলো তার দাদি৷ কিন্তু দাদিও দুই বছর হলো পরপারে পাড়ি জমিয়েছে; তারপর থেকে আর একটু ভালোবাসার মানুষও ওই বাড়িতে ছিল না। ওই বাড়িতে বলতে গেলে আপন বলতে তার দাদিই ছিল। তূর্ণা অবাক হয়েই রৌদ্রিক’কে জিজ্ঞেস করে-
“ সত্যি নিয়ে যাবে আমাকে তোমার সাথে?”
“ হুম নিয়ে যাবো।”

তূর্ণা যেনো আকাশের চাঁদ স্বয়ং এই জমিনের মধ্যে পেয়ে গেলো। উচ্ছ্বসিত মনে লাফিয়ে উঠলো, বাচ্চাদের মতই আনন্দ শব্দ করে উঠছে। রৌদ্রিক তাকিয়ে রইলো সেদিকে, সামান্য ঘুরতে নিয়ে যাওয়াতেই কেউ এত খুশি হতে পারে? সেটা হয়তো তূর্ণা নামক মেয়েটাকে না দেখলে বুঝতো না। তূর্ণার শব্দ শুনে রোদেলার ঘুম ভেঙে গেছে, সেও ঘুম জড়ানো চোখে আনন্দ নাচতে থাকা তূর্ণাকে অবাক হয়ে দেখছে। রৌদ্রিক মেয়ের কাছে গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে স্নেহের পরশ এঁকে দেয়। রোদেলাও বাবার গালে ছোট ছোট হামি দিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে-
“ তুনা..কি কলে..তুনা কি কলে পাপা..??”
রৌদ্রিকেরও জানা এর উত্তর কি দেবে তাই মাথা নাড়িয়ে সে জানালো, সে নিজেও জানে না। রোদেলা এবার তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-

“ তুনা..ত..তনি কি কল..??”
রোদেলার কথা শুনে তূর্ণা থেমে যায়, উচ্ছ্বসিত মনে রোদেলার কাছে এগিয়ে এসে বলে-
“ আজকে তূর্ণা ঘুরতে যাবে। জানো পুতুল সোনা বর আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। তুমিও কি যাবে আমার সাথে? আমরা কিন্তু অনেক মজা করবো!”
বাহিরে যাওয়ার কথা শুনে রোদেলাও খুশি হয়ে যায়। শব্দ করে ‘ইয়েয়য়’ বলে ওঠে সে। রৌদ্রিক নীরব চোখে দেখলো তূর্ণা আর রোদেলার কান্ড। দু’টোই সম্পূর্ণ বাচ্চা! একজন বড় হয়েও বাচ্চা রয়ে গেছে, অন্যজন তার ছোট্ট আম্মাজান। রোদেলা রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আত..আতকে অনেত মতা কলব পাপা।”
“ আচ্ছা করিও এখন দু’জন ফ্রেশ হতে চল৷ দুষ্টুমি করলে চলবে না কিন্তু।”
তূর্ণা আর রোদেলা ভদ্র বাচ্চার মত মেনে নিলো সবটা।

সময়ের সঙ্গে আকাশের মধ্যগগনে স্থির হয়ে থাকা জ্যোতির্ময় অগ্নিগোলকটি যেন ক্রুদ্ধ রাজাধিরাজ, যার তীক্ষ্ণ রশ্মির শলাকা প্রতিটি কণায় কণায় প্রবেশ করে দগ্ধতার অদৃশ্য দাগ এঁকে দিচ্ছে। পিচঢালা সড়কগুলো তপ্ত ধাতুর ন্যায় দগ্ধমান, তাদের বুকে জমে থাকা উত্তাপ কাঁপিয়ে তুলছে দূর দিগন্তের দৃশ্যপট। ব্যস্ত পায়ে একটা সাবলেট বাসায় ঢুকলো রূপা। গরমে ফর্সা মুখশ্রীতে ঘামের রাজত্ব বসেছে। চোখ-মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট! হাতে থাকা ফোন বের করে সৈকত নামক নাম্বারে কল লাগালো। কিছু সময় অতিবাহিত হতেই অপর পাশ থেকে ফোনটা তুলতেই রূপা রাগ মিশ্রিত স্বরে বলে-

“ সৈকত এইভাবে আর কতদিন? তোমার জন্য আমি বিয়ে থেকে পালিয়ে এসেছি অথচ তুমি আমাকে এখন অব্দি বিয়ে করোনি। তুমি আর তোমার পরিবারের মতিগতি আমি বুঝতে পারছি না কিন্তু!”
রূপার কথা শুনে ফোনের অপর পাশে থাকা সৈকত বিরক্তি নিয়ে বলে-
“ আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর রূপা। তোমার এইভাবে পালিয়ে আসাটা বাবা-মার পছন্দ হয়নি। তারা রাজিই ছিল, হুট করে এমনটা হওয়ায় তারা এখন মানছে না। আমাকে কয়েকটা দিন সময় দাও!”
রূপা ধৈর্য হারা হয়ে গেলো, এমনি গরম তারপর রাগ সবমিলিয়ে ফর্সা মুখশ্রীটা আরও লালচে হয়ে উঠলো। রূপা কর্কশ গলায় বলে-

“ পালিয়ে কি আমি এসেছি সৈকত? তুমি আমাকে পালিয়ে এনেছো? তোমাকে বার বার বলেছিলাম আমার বাবার কাছে প্রস্তাব নিয়ে পাঠাও তোমার বাবা-মাকে। কিন্তু তুমি আমার একটা কথাও শোননি, আর এখন বলছো পালিয়েছি বলে মানছে না। তাহলে তোমাকে কেনো মেনে নিলো? তোমার হাত ধরেই তো পালিয়েছি আমি তাই না?”
“ দেখ তুমি আর আমি এক হলাম কি করে? শত হোক আমি বাবা-মার একটা মাত্র ছেলে আমাকে মেনে না নিয়ে উপায় আছে। আর জান আমি বলছি তো তোমাকে বিয়ে করবো তাহলে আর একটু ধৈর্য ধর। বউ তো তুমিই হবে আমার তাই না!”,‘ শান্ত, নরম স্বরে বলে’
সৈকতের কথা শুনে রূপা গম্ভীর কণ্ঠে বলে-
“ আমিও আমার বাবার বড় মেয়ে। বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে তোমার হাত ধরে এসেছি, এরজন্য আমার বাবাকেও কম অপমানিত হতে হয়নি সৈকত। তাছাড়াও আমাকেই তোমার বিয়ে করতে হবে, ভুলে যেওনা তোমার জন্য আমার পরিবার অপমানিত হয়েছে পুরো সমাজে। যদি ভেবে থাক আমাকে ঠকাবে, তাহলে মনে রেখো তোমাকে আমি রাস্তায় নামিয়ে ছাড়বো।”
শেষের কথাটুকু শক্ত গলায় বললো রূপা। সৈকত হকচকিয়ে বলে-

“ তুমি বেশিই ভাবছো রূপা। মাথা ঠান্ডা কর, এমন কিছুই না। আচ্ছা এখন রাখি একটা কাজে এসেছি পরে তোমাকে ফোন করছি।”
বলেই ফোনটা কেটে দেয় সৈকত। রূপা রুমের ফ্যানটা আন করে দেয়, গরমে মাথা ঘুরছে। তারা মধ্যবিত্ত হলেও লুকমান হোসেন কোনোদিন তাকে কষ্ট বুঝতে দেননি। প্রথম সন্তান হওয়ায় সবচেয়ে আদরও সেই পেয়েছে, হ্যাঁ সে লুকমান হোসেনের দ্বিতীয় ঘরের সন্তান। তারপরও তার দ্বারাই বাবা হওয়ার ইচ্ছেটা পূর্ণ হয়েছে লুকমান হোসেনের। তূর্ণার মায়ের সঙ্গে সংসার জীবন লুকমান হোসেনের প্রায় সাত বছর সমান। তূর্ণার মা জুঁই আক্তার এত বছরেও একটা সন্তানের মুখ দেখাতে পারেনি লুকমান হোসেনকে। যার জন্য তাদের সংসারে সবসময় অশান্তি লেগেই থাকতো,

জুঁই আক্তার স্বভাবগতই নরম ধাঁচের ছিলেন। তাই মুখ ফুটে কোনোদিন কিছুই বলতে পারতো না, সংসারের অশান্তি কারণে লুকমান হোসেন আর জুঁই আক্তারের মাঝে বেশ দূরত্ব ছিলো।
সেই থেকেই সেলিমা খাতুনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পরেন। তারপর বিয়ে, বছর ঘুরাতেই সেলিমার কোল আলো করে রূপা আসে। তখনো লুকমান হোসেনের দ্বিতীয় বিয়ের কথা বাড়িতে কেউই জানে না। হুট করে একদিন বাচ্চা সহ সেলিমা খাতুনকে নিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হন লুকমান হোসেন। সেদিনটা জুঁই আক্তারের জন্য অমাবস্যার রাত্রির ছিল। শুধু সেই দিনটাই নয় তারপর থেকে প্রতিটা দিনই ছিল জুঁই আক্তারের কাছে জাহান্নাম! ভালোবাসার মানুষটার থেকে এত বড় ধোঁকা আশা করেনি সে। সবচেয়ে বড় কথা তার কয়েক সপ্তাহ পেরোতেই সাত বছরের প্রতীক্ষার প্রহর শেষ করে জুঁই আক্তার সন্তানসম্ভবা হন। কিন্তু সেই ভালোবাসারা তিনি পান না যেটা তার প্রাপ্য ছিল, মানসিকতা আর শারিরীক দুই ভাবেই জুঁই আক্তার সেলিমা খাতুনের কাছ থেকে অত্যাচারীত হতে থাকেন। লুকমান হোসেন সেসব দেখেও না দেখার মত এড়িয়ে চলেন।

তারপর তূর্ণার জন্ম হয়, জন্ম দেওয়ার পর পরই জুঁই আক্তার মুক্তি পান এইসব অত্যাচার থেকে। সন্তান আর মা দুই জনেরই বাঁচার সম্ভাবনা একদমই ছিল না, তাছাড়াও তূর্ণা একটা প্রিম্যাচ্যুর বাচ্চা। সময়ের আগেই তার আগমন ঘটেছে, তারপর লুকমান হোসেন দ্বিতীয় বার বাবা ঠিকই হলেন তবে তার মধ্যে সেই সন্তানকে পাওয়ার আনন্দ ছিল না। তূর্ণাকে দেখেও দেখতেন না তিনি সেভাবে, দাদির কাছেই তূর্ণার বড় হওয়া। দাদি যা একটু তাকে ভালোবাসত ওই বাড়ির মাঝে। রূপা প্রথম সন্তান হওয়ায় লুকমান হোসেন রূপার কোনো প্রকার কষ্ট যাতে না হয় সেটাই ভাবেন তিনি। আর রূপা তাদের পেটে লাথি মেরে পালিয়ে এসেছে, সে নিজেও বিয়েতে রাজি ছিল। রাজি হবেই না বা কেনো? এত বছর বাড়ি, তারউপর বেশ বড়লোক পরিবার তারা। তাই রাজি হয়ে গেছিল, রৌদ্রিকে না সামনাসামনি দেখে আর না ছবিতে। শুধু এটাই জানতো লোকটার এর আগে একটা বিয়ে হয়েছিল আর একটা বাচ্চা আছে। ভেবেছিল বিয়ে হলে তার সাথে থাকতে থাকতে বাচ্চার বিষয়টা কেটে যাবে।
সৈকতের সঙ্গে তার সম্পর্ক দুই বছরের। সৈকত যে আহামরি বড়লোক বাড়ির ছেলে তেমনটা নয় আবার মধ্যবিত্ত বললেও চলে না। বিয়ে ঠিক হওয়ার কয়েকদিন আগেই সৈকতের সঙ্গে বিয়ে নিয়েই ঝামেলা হয়েছিল তার আর সৈকতের। রাগে বসেই বিয়ে রাজি হয়েছিল, কিন্তু বিয়ের দিন যখন সৈকত তার নিকট এলো তখন আর ফিরিয়ে দিতে পারেনি রূপা। সৈকতের হাত ধরে পালিয়ে এসেছে, রূপা ভেবেছিল সেইদিনই তাদের বিয়ে সম্পূর্ণ হবে৷ কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রামণ করে সৈকত তার থেকে সমায় চায় কয়েকদিন। আর এই ছোট্ট বাসায় তাকে রেখেছে। এইসব ভাবতে ভাবতে রূপার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে, বাড়ির কোনো খবরই জানে না সে এখন। তার পালিয়ে আসার পর কি হয়েছে সেটাও জানা নেই তার।

দিগন্তের বুকে ক্লান্ত সূর্যের রক্তিম অবসানঘণ্টা ধ্বনিত হচ্ছে। দিবসের দীপ্তিময় অহংকার ক্রমে নিঃশেষিত হয়ে এক বিষণ্ন স্বর্ণাভ আবরণে আচ্ছন্ন করছে সমগ্র ধরণীকে। বৃক্ষশাখার অবসন্ন পত্ররাজি ধীর দোলায় যেন দিনের সমস্ত কোলাহলকে বিদায় জানাচ্ছে, আর দূরাগত পাখিদের প্রত্যাবর্তনের সুরে ভেসে উঠছে নিবিড় আপন আশ্রয়ে ফেরার আকুতি। পার্কের এক প্রান্তবর্তী নির্জন কোণে স্থাপিত বেঞ্চের উপর নিঃশব্দে বসে রয়েছে রৌদ্রিক। তার থেকে কিছুটা ব্যবধান রেখে রিনি, রোদেলা ও তূর্ণা নিজেদের আনন্দলোকে মগ্ন। দুপুরের খাবার খাওয়ার পর পরই তারা এখানে এসেছে। আর এখন দিনটা ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়েছে গোধূলির কোমল ছায়া।
শিশুদের জন্য নির্ধারিত প্রতিটি রাইডে একাধিকবার উঠেছে তিন জনই। তবুও ক্লান্তির লেশমাত্র নেই এদের মাঝে! তূর্ণা, এই কিশোরী সত্তাটি যেন আজ এক অদ্ভুত উল্লাসে উজ্জ্বল, যা তার প্রফুল্ল, হাস্যোজ্জ্বল মুখাবয়বের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই স্পষ্ট বোঝা যায়
পার্কে আসার পর থেকেই তূর্ণা বিস্ময়াভিভূত দৃষ্টিতে চারপাশ অবলোকন করছিল। কিন্তু কোনো প্রকার আবদার বা চঞ্চল বায়না প্রকাশ করেনি একবারের জন্যও। অথচ এ ধরনের কোমল প্রাণেরা সাধারণত আবেগপ্রবণতা ও শিশুসুলভ দাবিতে পরিপূর্ণ থাকে। কিন্তু তূর্ণার ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম, সম্ভবত অতীতে তাকে এমন স্বতঃস্ফূর্ততা প্রকাশের সুযোগ কখনোই প্রদান করা হয়নি। তাই মেয়েটা নিজের শিশুসুলভ দাবিগুলো কোনদিনও ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়নি।

এক অদৃশ্য আতঙ্কের আবরণে আবদ্ধ থেকে তার চঞ্চল সত্তা যেন ক্রমে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল, যার ফলে তার স্বাভাবিক প্রাণোচ্ছলতার কোনো বহিঃপ্রকাশ দৃশ্যমান নয়।
ছোট্ট রোদেলার গরমে ফর্সা মুখশ্রী লাল হয়ে গেছে। রৌদ্রিক বসা থেকে উঠে তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিয়ে বলে-
“ হয়েছে এখন বাড়ি ফিরতে হবে। এত গরমে এত লাফালাফি না করলে কি নয় না?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে রিনি বিরক্তি নিয়ে বলে-
“ তুমি চুপ কর তো ভাইয়া। তোমার মত রোবট হয়ে বসে থাকলে এই জীবন চলবে না। এখন বাড়ি চল সত্যি কান্ত লাগছে!”
“ না আরও একটু লাফা দরকার হলে। কম লাফালাফি হয়ে গেলো না তোদরে..??”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৬

বলেই রোদেলাকে কোলে নিয়ে৷ মামপটে থাকা ঢাকনা খুলে পানি খাইয়ে দিতে থাকে। রৌদ্রিক তূর্ণার ঘর্মাক্ত মুখের দিকে তাকালো। তিন জনেরই একই অবস্থা! রৌদ্রিক সবাইকে নিয়ে বের হলে এলো। তিন জনকে গাড়িতে বসিয়ে বাহির থেকে হালকা-পাতলা হওয়ার জিনিস এনে দিলো। রোদেলার জন্য বাসা থেকেই খাবার আনা আছে সেটা রৌদ্রিক খাইয়ে দিয়ে, রোদেলাকে কোলে বসিয়েই ড্রাইভ করতে লাগলো৷ তূর্ণা আর রিনি দুইজন পিছনে বসে গল্প করতো ব্যস্ত। এদিকে কিছু সময় পর কান্ত রোদেলা বাবার কোলেই ঘুমিয়ে পরে। সেটা দেখে রিনি রোদেলাকে তার কাছে দিতে বলে কিন্তু রৌদ্রিক দেয় না, মেয়েকে কোলে ভালো করে শুইয়ে দিয়ে ড্রাইভ করতে লাগলো।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৮