অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৮
ফাহিমা ইসলাম
নব দিনের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে সিকদার বাড়িতে আয়োজনের আমেজ মেতেছে। আজকে জবা সিকদারের বাবার পরিবারের লোকজন সহ রুমা সিকদার আর রোমানা সিকদারের বাড়ির মানুষরাও আসবেন। যার জন্য সকাল থেকেই বাড়ির গিন্নীরা নানা কাজে মেতে আছে, সঙ্গে বাড়িট কাজের লোকরাও। রৌদ্রিকোর বিয়েটা হুট করেই ঠিক হওয়ায় কেউই তেমন উপস্থিত থাকতে পারেনি। তাই আজকে তিন পরিবারের লোকেরাই আসবে নতুন বউকে দেখতে। এরজন্য রৌদ্রিকেও বাহিরে যেতে দেওয়া হয়নি, কিন্তু ছেলেটা কোন সুযোগে বের হয়ে গেছে কেউ জানেই না। রিনিও আরও কয়েকদিন ছুটি বারিয়ে নিয়েছে, কতদিন পর সকলেই একসঙ্গে হবে আর সে একা একা হোস্টেলে থাকবে সেটা তো হয় না। রিনি, রোদেলা আর তূর্ণা রৌদ্রিকের রুমে বসে রয়েছে। রিনি ফোন ঘাটতে ব্যস্ত, তূর্ণা আর রোদেলা টুকটুকির সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত। তূর্ণা আর রোদেলার কাজই এটা সুযোগ পেলেই দুইজন বারান্দায় এসে টুকটুকির সঙ্গে কথা বলবে। টুকটুকি হয়তো বুঝে কিছুটা তাই তো তাদের কথার শব্দ করে উত্তর দেয়। রোদেলা টুকটুকির দিকে তাকিয়ে বলে-
“তুততুতি তুনি কি খেয়ুতো সতালে? ”
পাখিটা কিছুই উত্তর দিলো না সেটা দেখে রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ তুততুতি কতা বয় না কতা বয় না কিনু?”
তূর্ণা আবারও ব্যর্থ রোদেলার সম্পূর্ণ কথাটুকু বুঝতে। তারপরও হালকা হালকা বুঝতে শিখেছে এই কয়েকদিনে। তাই যতটুকু বুঝলো সে অবুঝ মনে বললো-
“ ওর হয়তো খিদে পেয়েছে তাই কথা বলছে না।”
“ পাপা কি খেয়ু দায়নি তুততুতিকে?”
“ জানি না তো, চল আমরা খাবার দেই।”
বলেই সামনে থাকা একসাথে রাখা পাখিদের খাবার তুলে নিয়ে টুকটুকির খাবার ভিতরে থাকা খাবারের পাত্রে আধার দিতে থাকে। টুকটুকি খাবার পেয়ে খেতে শুরু করে, সেটা দেখে রোদেলা খুশিতে লাফিয়ে ওঠে! আনন্দের সঙ্গে হাত তালি দিতে থাকে। এর মাঝেই সেখানে জবা সিকদার হাতে শাড়ি সহ গয়নার বক্স নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। রিনি মাকে দেখে ফোন চালানো বন্ধ করে সেদিকে তাকায়, তিনি গম্ভীর ভাবে তূর্ণাকে পর্যবেক্ষণ করে গম্ভীর স্বরে বলে-
“ এই মেয়ে শোন, এই কয়েকদিন শাড়ি পরে থাকবে। আর এইসব বাচ্চামো বন্ধ রাখবে। বাড়িতে মানুষ আসবে একটু পর, তাই এইসব শাড়ি, গয়না পরে সুন্দর মত রেডি হয়ে শান্ত হয়ে বসে থাক। রিনি তুই ওকে রেডি করিয়ে তুইও বের হয়ে নে, তোর নানুরা এসে পরলো বুঝি।”
জবা সিকদারকে দেখে তূর্ণা একদম শান্ত হয়ে গেছে, বউভাতের পর আর তাকে শাড়ি পরতে হয়নি। রৌদ্রিক শাড়ি পরতে বারণ করে দিয়েছে, এতটুকুনি মেয়ে তারউপর শাড়ি পরলে নিজেই সামলাতে পারবে না। তাই শাড়ি পরতে বারণ করে দিয়েছে, রৌদ্রিকের কথা মাথায় আসতেই তূর্ণা ভয়ে ভয়ে বলে-
“ ব..বর তো বারণ করেছে শাড়ি পরতে।”
তূর্ণার কথা শুনে জবা সিকদার তীক্ষ্ণ ভাবে বলে-
“ সেটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। যা বললাম সেটা করবে, কোনো প্রকার সমস্যা করবে না বলে দিলাম আগেই।”
তূর্ণা মাথা নাড়িয়ে কথাটুকু মেনে নিলো, রোদেলা এবার জবা সিকদারের দিকে তাকিয়ে আবদারের স্বরে বলে-
“ দাদু, আনিও তালি পলবো। আনিও তালি পলবো।”
রোদেলোর কথা কানে আসতেই জবা সিকদার নাতনির দিকে কোমল চোখে তাকান। রোদেলার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে-
“ আচ্ছা ঠিক আছে দিদুন। দাদুকে বলিয়ে এখনি রোদেলার জন্য শাড়ি আনাবো। এখনের জন্য সুন্দর একটা জামা পরে নাও তো। বড় নানু আসবে তো রোদেলাকে দেখতে।”
রোদেলা খুশি হয়ে নাচতে শুরু করলো, এত ছোট বাচ্চার শাড়ি সহজেই পাওয়া যায় না। তারপরজ রোদেলা যখন আবদার করেছে সেটা তো দিতেই হবে। রোদেলা তার ছোট্ট নরম, ফর্সা হাত জোরা উঁচু করে দেখিয়ে বলে-
“ তুলিও পলবো দাদু।”
রিনি রোদেলাকে কোলে নিয়ে গালে আদর করে দিয়ে বলে-
“ হ্যাঁ আজকে রোদ বুড়িকে বিয়ে দিয়ে দিবো একদম। লাল টুকটুকে বউ সাজিয়ে জামাই বাড়ি পাঠিয়ে দিবো একদম।”
রিনির কথা শুনে রোদেলা বুঝলো না জামাই-বউ কাকে বলে, তাই রিনির দিকে তাকিয়ে বলে-
“ তামাই-বউ কি পিপি?”
“ তোমার তূর্ণা যেমন তোমার পাপার বউ, তুমি ওমন কারো বউ হলে সে তোমার জামাই হবে।”
রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ তুনা পাপাল বউ হয়! না তুনা আমাল বউ।”
রোদেলার কথা শুনে রিনি হেসে দেয় ফিঁক করে৷ হাসতে হাসতে বলে-
“ আরে রোদ তূর্ণা তোমার বউ না মা হয়, মা। তুমি তো মেয়ে তোমার কি করে বউ হবে বল! তূর্ণার তোমার পাপার বউ আর তোমার মা। ”
রিনির কথা রোদেলার ছোট্টো মাথায় তেমন ভাবে বুঝে উঠলো না। রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে তার কোলে যাওয়ার আবদার জানালো। তূর্ণা একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা জবা সিকদারকে দেখে, কোনো রকমে রোদেলাকে কোলে নিয়ে নেয়। রোদেলা তূর্ণার কোলে গিয়ে তার বুকে মাথা দিয়ে আধো আধো স্বরে বলে-
“ তুনা কি তুনি আমাল মা? দাদু তো পিপি সঙ্গে থাতে, তুনি কেনু আমাল কাতে ছিতে না?”
তূর্ণা কি বলবে ভেবে পেলো না। অল্পখানিক বুঝ হওয়ার পরও রোদেলা তার পাপা আর গোটা সিকদার পরিবার ছাড়া আর কাউকেই পাশে পায়নি। মা নামক মানুষেরও যে অস্তিত্ব রয়েছে সেটাও তার জানা নেই, মা বলতেও সে তার পাপাকে বোঝে। বাড়ির সবাই রোদেলাকে আরও মাথায় করে রাখে প্রিয়তীর চলে যাওয়ার পর। একজন মা-ও যে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে সেটা প্রিয়তীকে দেখলে বোঝা যায়। শত হোক তার পেটেরই সন্তানকে যে সময় সবচেয়ে বেশি মায়ের প্রয়োজন ছিল। সেই সময়টাতেই প্রিয়তী ছোট্ট রোদেলার কথা, একটি বারের জন্যও না ভেবে নিষ্ঠুর ভাবে ফেলে চলে গেলো! রোদেলা হয়তো জানে না মা জিনিসটা কি, এই বাড়িতে তার ভালোবাসার কমতি নেই। তবু একটা মায়ের ভালোবাসা চাইলেও সকলের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আর না রোদেলা মায়ের ভালোবাসাটা বোঝে, তারপরও জীবনের একটা পর্যায়ে একটা সন্তানেরও মায়ের ভালোবাসা প্রয়োজন হয়। আর একজন ছেলেরও একটা সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। তূর্ণার বিষয়টা বুঝতে পেরে রিনিই নিজ থেকে বলে-
“ হ্যাঁ তোমার তূর্ণা তোমার মা। রোদে দাদু যেমন আমার মা, তূর্ণাও তোমার মা। এতদিন ছিল না কারণ মা অনেক দূর ছিল তাই আসতে পারেনি। কিন্তু এখন থেকে রোদের মা রোদের সঙ্গেই থাকবে।”
রোদেলা তূর্ণার বুক থেকে মাথা উঠিয়ে তূর্ণা মুখপানে চেয়ে ভীষণ আদুরে ভাবে ডেকে ওঠে-
“ আমাল তুনা মা। তুনা মা!”
প্রথমবার হয়তো কেউ এত আদর মেখে ডাকলো তূর্ণাকে। তবে ডাকটার মাঝে আলাদা কিছু ছিল, নতুন কিছু ছিল। যা এর আগে কোনোদিন কেউ তাকে ডাকেনি। না চাইতেও তূর্ণার অদ্ভুত একধরনের ভালো লাগা ছেয়ে গেলো হৃদয় মাঝে! মা ডাকটা কি এতোই মধুর? নাকি তার কাছেই শুধু মধুর লাগছে। এই জীবন্ত পুতুল তাকে মা ডাকছে, তার মানে এই পুতুলটা তার খুব আপন কেউ। তূর্ণা রোদেলা ললাটে হালকা করে চুমু এঁকে দিয়ে বলে-
“ আরেক বার মা ডাকতো পুতুল সোনা। আমি তোমার মা, আমার পুতুল তুমি।”
“ তুনা মা, তুনা মা।”
জবা সিকদার হালকা নরম হলেন। তিনি তূর্ণা আর রোদেলার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বেশ দোটানায় ভুগচ্ছেন। ভোগান্তির কারণটা ফেলে দেওয়ার মত নয়, তূর্ণার মানসিক অবস্থার জন্য তিনি রোদেলাকে একলা তূর্ণার কাছে রাখেন না সহজেই। সঙ্গে রিনি নাহলে অন্যকেউ থাকেই, কখন না জানি আঘাত করে বসে সেই ভয়ে। তবে এই কয়েকদিন যতটুকু দেখেছে তাতে সম্পূর্ণ ভয় না কাটলেও, মনের মধ্যে খচখচানি রয়ে গেছে।
“ হয়েছে এবার ওকে তাড়াতাড়ি রেডি করা। আর তোমার ভাইকেও ফোন দে, তাকে যেতে বারণ করার পরও বের হয়ে গেছে। ওকে ফোন দিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে বলে দে।”
বলেই খাটের উপর সবকিছু রেখে তিনি বের হয়ে যান। রিনি তূর্ণাকে ফ্রেশ হয়ে আসতে বলে, শাড়ি সহ সবকিছু দেখতে লাগলো। সঙ্গে ছোট্ট রোদেলাও যোগ হয়েছে।
সকাল থেকেই আবহাওয়া হালকা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব মিশে আছে। না অতি মাত্রায় গরম আর না ঠান্ডা, ভাদুরে আবহাওয়া। দুপুর হতে হতে তিন পরিবারের মানুষরা এসে উপস্থিত। সারা বাড়িতে শোরগোল শোনা যাচ্ছে, রৌদ্রিকে নানি বেশ বয়ষ্ক মানুষ। যার জন্য গাড়ি যাতায়াত তেমন করতে পরেন না, বছর একবার মেয়ের বাড়িতে বেরাতে আসেন। নতুন নাতবউ হওয়ায় না এসে পারলেন না। তারউপর নাতবউ নাকি পাগল! এইসব শুনে ছুটে এসেছেন। সবাই বসে আলাপে ব্যস্ত, বাচ্চার সব উপরে রুমে আড্ডায় মেতেছে। বড়রা সবাই নিচে, রৌদ্রিকে নানি রোকসানা খাতুন বলে ওঠে-
“ নাতবউ কই? হেরে আন আগে, আসা হাতে দেখলাম না তো তারে।”
“ রুমা একটু ওকে নিয়ে আয় তো বোন।”
জবা সিকদারের কথা শুনে রুমা সিকদার তূর্ণাকে নিতে চলে যান। তূর্ণার রুমেই বসে ছিল, পরণে তার লাল-সাদা মিশ্রিত একখান তাঁতের শাড়ি। ফর্সা গায়ে শাড়িটা বেশ মানিয়ে উঠেছে, সেই সাথে হাতের সোনা বালা আর কান সহ গলায় থাকা গয়নার জন্য আরও সুন্দর লাগছে। মুখে কৃত্রিম কিছু দেওয়া হয়নি, সাদামাটা যেমন তূর্ণা তেমনই রাখা হয়েছে। রুমা সিকদার মাথায় আঁচল টেনে দিয়ে তূর্ণাকে নিয়ে নিচে আনে। তূর্ণা ভয়ে মাথা নিচু করে রেখেছে, জবা সিকদার বার বার করে বলে দিয়েছে ভালো করে থাকতে। তূর্ণা ভয়ে সবটা মেনে নিয়েছে, রুমা সিকদার রোকসানা খাতুনের পাশের খালি জায়গাটাতে তূর্ণাকে বসিয়ে দেন। রোকসানা খাতুন গম্ভীর ভাবে তূর্ণাকে পর্যবেক্ষণ করলেন। মুখশ্রীতে কাঠিন্য ভাব বজায় রেখে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে ওঠে-
“ নাম কি তোমার?”
তূর্ণার আঁড়চোখে একবার দেখে নিলো সামনে থাকা বয়ষ্ক মাহিলাটাকে। বয়সের কারণে ফর্সা চামড়া কেমব কুঁচকিয়ে এসেছে, তারপরও মিষ্টি দেখতে বেশ! দেখেই বোঝা যাচ্ছে যৌবনে অধিক মাত্রায় সৌন্দর্যের অধিকার সম্পূর্ণ নারী ছিলেন এনি। তূর্ণা ভয়ে ভয়ে বলে-
“ তূ..তূর্ণা।”
রোকসানা খাতুন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বজায় রেখেই বলেন-
“ মাথার সাথে কি মুখও তোতলা তোমার? সুন্দর ভাবে কইতে পারো না নামডাও?”
তূর্ণা শুঁকনো ঢোক গিলে নিলো ভয়ে। এদেখি জবা সিকদারের মত পঁচা! শুরুতেই কেমন কেমন করে কথা বলছে। তূর্ণা আবারও কোনো রকমে বলে-
“ তূর্ণা।”
“ দেইখা তো মনে হয় না পাগল তুমি। দেখতে বেশ সুন্দর তুমি! তয় সংসার কেমন করতে হয় সেটা বোঝ তো নাকি?”
তূর্ণা কিছু বললো না, নিঃশব্দে সবটা শুনলো। কারণ তাকে এটাই করতে বলা হয়েছে, তারউপর সামনের মানুষটা বেশ রাগি স্বভাবের। তাই আরও চুপ থাকাটা ভালো মনে করলো তূর্ণা, রোকসানা খাতুন গম্ভীর স্বরে বলে-
“ শোন মাইয়া, সিকদার বাড়ির বউ হইছো পাগল হওয়ার পরও। তোমার ভাগ্য আছে কওন লাগবো, নাইলে আমার ওমন চাঁদের টুকরা নাতির কাপলে ওমন পাগল জুটলো কেমন কইরা? যাই হোক, এই বাড়ির বউ যহন হইছো তখন তেমন ভাবে মানায়া নিতে হইবো, বাপের বাড়িত কি করছো হেইগুলা এহানে করলে চলবো না। তোমরা সংসার এইডা, তাই তোমারেই সামলাইতে হইবো।”
তূর্ণা নীরবে শুনলো সবটা, সে পাগল বার বার তাকে সেটা মনে করাতে হয়। সে তো বলেনি সে পাগল নয়, তাহলে সবাই কেনো এটা বার বার বলে? তার প্রচন্ড কান্না পায় পাগল শব্দটা শুনলে, সে কি ইচ্ছে করে পাগল হয়েছে? নেত্রজোড়া কেমন ছলছল করে উঠলো, হালকা জ্বালাপোড়া করছে! রোকসানা খাতুন পাশে থাকা বেগ থেকে একজোড়া মোটা স্বর্ণের বালা বের করল। তূর্ণার হাতটা নিজের কাছে টেনে সেগুলো পরিয়ে দিতে দিতে বলেন-
“ এইগুলো আজ থেইকা তোমার। সামলায়া রাইখো, আমার সবচেয়ে প্রিয় নাতি সে। তারে সব আর তার মেয়েরে সবসময় আগলায়া রাখবা, আর সবসময় এমন শাড়ি পইরা থাকবা। নতুন বিয়া হইছে, তাই শাড়ি পরবা বেশি কইরা। তাইলেই স্বামীরে আঁচলে বাঁধতে পারবা। বুঝছো কি বলছি আমি?”
তূর্ণা তাড়াহুড়ো করে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। শাড়ি পরার পর সবাই তাকে বলেছে তাকে নাকি অনেক সুন্দর লাগছল। ছোট্ট রোদেলাও কতখন তার দিকে চেয়েছিল, আর বলছি তাকে নাকি সুন্দর লাগছে।
দিনের আলো ফুরিয়ে রাত্রি নেমেছে ধরণী জুড়ে। পক্ষীরাজ’রা নিজেদের নীড়ে ফিরে গিয়েছে, রাত আট বেজে পয়তাল্লিশ মিনিট। রৌদ্রিক বাড়িতে প্রবেশ মাত্রই নিজের মামা সহ অন্যদেরও দেখতে পেলো। অনেকদিন পর সকলের সঙ্গে দেখা হওয়ায় উপরে আর গেলো না, সবার সঙ্গে বসে গল্প করে নিলো বেশ কিছু সময়। রোকসানা খাতুন বয়স্ক মানুষ তারউপর এত দূর জার্নি
করে এসেছেন তাই সে রুমে রেস্ট নিচ্ছে। রৌদ্রিক রোকসানা খাতুনের সঙ্গে দেখা করার জন্য উপরে তার রুমে চলে গেলো। রুমে ঢুকতেই রোকসানা খাতুনকে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখতে পায়। রৌদ্রিক আস্তে করে রোকসানা খাতুনের পাশে গিয়ে বসলো।
“ কেমন আছো নানু?”
রৌদ্রিকের কন্ঠস্বর পেয়ে রোকসানা খাতুন চোখ মেলে তাকান। রৌদ্রিকে দেখে তার ওষ্ঠপুটে হাসির রেখা ফুটে ওঠে, তিনি ঠিক হয়ে বসে বলেন-
“ এতক্ষণে আসার সময় হলো বুঝি তোর? এই বউকে আর ভালো লাগে না নাকি?”
রৌদ্রিক হালকা হেসে বলে-
“ উমম, এই বউকে কি ভালো না লেগে থাকা যায়? যাই হোক শরীর কেমন এখন তোমার?”
“ এইতো আছি আল্লাহর রহমতে! তুই কেমন আছিস?”
“ এই তো বেশ ভালো আছি! রাতে খাবার খেয়েছো?”
“ হুম খাইছি, তোর জন্য অপেক্ষা করলাম কিন্তু তুই তো এইলি না।”
“ কাজ ছিল নানু, জানোই তো।”
রোকসানা খাতুন নাতির দিকে তাকিয়ে হতাশ কণ্ঠে বলে-
“ ওই পাগল মেয়েকে কেনো মাইনা নিলি তুই? মেয়েটা তোকে কি কইরা সামলাইবো? আর রোদে নানুভাই! ওরই বা কি হইবো?”
রৌদ্রিক হালকা হেসে বলে-
“ আমি যদি না মেনে নিতান তাহলে মেয়েটা হয়তো মারে যেতো। ও ওর নিজের বাড়িতেই নিরাপদ নয়, যেভাবেই হোক বিয়েটা যেহেতু হয়ে গেছে তখন আমারও কিছু দায়িত্ব আছে তাই না।”
“ দায়িত্ব দিয়ে গোটা সংসার চলে না রে। সংসারে ভালোবাসা না থাকলে সেটা কোনোদিন সংসার হয় না। আর ওকে বাঁচানোর জন্য, নিজের জীবনটা এমন করে ফেললি!”
“ কিছু জিনিস আমাদের হাতে থাকে না নানু। কিছু জিনিস নিয়তি নিজেই বয়ে আছে, মেয়েটা আমার নিয়তি নানু। তাই হয়তো ও আজকে আমার স্ত্রী রূপে এই বাড়িতে, এইসব কথা বাদ দাও তো। আমার মেয়ের জন্য আমি আছি, তোমরা আছো এতেই কি যথেষ্ট নয়?”
“ না যথেষ্ট নয়, আজকে রোদ ছোট কালকে ও বড় হবে। আর বুঝতে শিখবে মা জিনিস কি? তোকে প্রশ্ন করবে ওর মা কই, তখন কি জবাব দিবি? মায়ের ভালোবাসা মায়ের মতই হয়। তুই ওর বাবা-মা দু’টোই তারপরও মায়ের ভালোবাসাটা একজন বাবা কোনোদিন পূরণ করতে পারে না।”
রৌদ্রিক এই বিষয়ে আর কথা বললো না। আরও কিছু সময় রোকসানা খাতুনের সঙ্গে কথা বলে নিজের রুমে পা বাড়ালো। রুমে প্রবেশ মাত্রই তূর্ণাকে বসে থাকতে দেখতে পেলো, গায়ে এখনো শাড়ি জড়ানো। তবে শাড়ির অবস্থা বেহাল! এলোমেলো হয়ে আছে। রোদেলা ঘুমিয়ে আছে, তার পাশেই চুপ করে সে বসে আছে। এই মেয়ে শাড়ি পরেছে কেনো? মেয়েটা শাড়ির পরলে সেটার অবস্থা একদমই বিচ্ছিরি হয়ে যায়। ঘুমের সময় আরও বাজে অবস্থা হয়। যেটা সামলাতে পারে না সেটা জোর করে পরার দরকার কি? তাছাড়া মেয়েটাকে শাড়ি পরলে কেমন বউ বউ লাগে। পিচ্চি মানুষ পিচ্চি হয়ে থাকবে, না হয়ে শাড়ি পরে বউ হওয়ার মানে কি? তার উপর হাতে পরা চুড়ির কারণে আরও বেশি বউ বউ লাগছে। চিকন চিকন হাতে চুড়িগুলো বেশ শোভা পেয়েছে। নাকটাও ফোরানো সেখানেও ছোট্ট ডায়মন্ডের নাক ফুল চিকচিক করছে।গোলগাল মুখে সেটা বেশ ভালো মানিয়েছে।
রৌদ্রিকে দেখে তূর্ণা উঠে পরে। শাড়ির অবস্থা বেহাল! পায়ের কাছে উঠে আছে, যার কারণে ফর্সা লোমযুক্ত পা’টা উম্মুক্ত হয়ে আছে। ফর্সা পায়ে কালো লোমগুলো আলাদা এক সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে, ফর্সা পায়ে সেটা মুক্তদানার মত মনে হলো। রৌদ্রিক সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে বিছানায় মেয়ের কাছে গিয়ে গেলো। ঘুমন্ত রোদেলার ললাটে চুমু এঁকে দিল। তূর্ণা শান্ত চোখে শুধু দেখলো। কিছু বললো না, রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে-
“ শোন মেয়ে তুমি কোনো প্রকার শাড়ি পরবে না,
তোমাকে শাড়িতে বড্ড বাজে লাগে। ”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সবাই আজকে তাকে সুন্দর লাগছে বলেছে, কিন্তু রৌদ্রিক বলছে তাকে বাজে লাগছে। তূর্ণা হালকা মন খারাপ করে বলে-
” আমাকে সত্যি ই খুব বাজে লাগছে বর? সবাই তো বললো আমাকে বউ বউ লাগছে, একদম আপনার বউ।নানিও বললো শাড়ি পরে আপনাকে আঁচলে বেঁধে রাখতে।”
তূর্ণার কথা শুনে রৌদ্রিক ভ্রুযুগল কুঁচকিয়ে বলে-
“ তুমি কি সবার বউ নাকি আমার বউ..??”
“ আমি তো আপনার বউ, এটাও আপনি জানেন না বর?” ‘ ঠোঁট উঠিয়ে বলে ’
“ তাহলে আমি যা বলবো তোমাকে সেটাই মানতে হবে।
বলেছিলাম কি, মনে নেই তোমার? আমার সব কথা মানতে হবে তোমাকে। তুমি এইসবব শাড়ি পরবে না, পিচ্চি মানুষব পিচ্চির মত জামা পরবে।”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৭
তূর্ণা কিছুখন ভেবে বলে-
“ আপনি কি রেগে গেলেন বর? আমি আর শাড়ি
পরবো না, পঁচা শ্বাশুড়ি বললো শাড়ি পরতে। তাই তো পরলাম।”
“ রেগে যাবো কেনো? তোমার শাড়ি পরার বয়স হয়েছে? যাই হোক এইসব পরার দরকার নেই। মা যেহেতু বলেছে তাহলে এই কয়েকদিন পর, কিন্তু তারপর এইসব পরবে না। ছোট মানুষ ছোট মানুষের মত জামা পরবে।”
বলেই ফ্রেশ হওয়ার জন্য চলে যায়। তূর্ণা ভাবতে লাগল সে কি বাচ্চা?
