Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৮

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৮

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৮
ফাহিমা ইসলাম

সকালের আলো আজও গৃহময় ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু সেই আলোর মধ্যে কোনো উৎসব নেই। দীর্ঘ বিপর্যয় অতিক্রম করে বেঁচে ফেরা এক পরিবারের নিঃশব্দ ক্লান্তি। জানালার কাঁচ ভেদ করে আসা ম্লান রৌদ্ররেখাগুলো যেন বাড়ির প্রতিটি কোণে জমাট বেঁধে থাকা অবসাদকে স্পর্শ করেও প্রাণ সঞ্চার করতে পারছে না। দুই সপ্তাহের সম্পূর্ণ শয্যাবিশ্রামের কঠোর নির্দেশ দিয়ে ডাক্তারেরা তারপর রৌদ্রিককে বাড়ি ফেরার অনুমতি দিয়েছেন। বাহ্যিকভাবে মৃত্যুকে পরাজিত করে ফিরে এলেও তার ভাঙাচোরা শরীর এখনো যন্ত্রণার অনুগত বন্দি। প্লাস্টারে মোড়া পা, ব্যান্ডেজে ঢাকা বাহু। তবুও রৌদ্রিকের সমস্ত মনোযোগ নিজের ওপর নয়। তার সমস্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে এক মানুষের দিকে।

গত সপ্তাহের অবিরাম মানসিক বিপর্যয়, অনিদ্রা, উপবাস, কান্না আর অন্তঃসত্ত্বা শরীরের অতিরিক্ত দুর্বলতা তাকে প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছে। চার মাসের অনাগত প্রাণকে বুকে ধারণ করেও সে নিজের শরীরের প্রতি বিন্দুমাত্র করুণা দেখায়নি তূর্ণা । বাড়িতে আসার পর থেকে রৌদ্রিকের ওষুধের সময়, ব্যথার ইনজেকশন, খাবার, প্রতিটি বিষয় এমন নিষ্ঠায় সামলিয়েছে, যেন নিজের অস্তিত্বের চেয়ে রৌদ্রিকের একটি নিঃশ্বাসও অধিক মূল্যবান তার নিকট। তবে এইসবে রৌদ্রিক একদম বিরক্ত, মেয়েটাকে শত বলেও কথা শোনাতে পারছে না।
সকালবেলার ওষুধ খাইয়ে গরম দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে আসছিল তূর্ণা।
রৌদ্রিক ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। সকালেও মেয়েটা ঠিকমতো কিছু খায়নি। মুখের সমস্ত রক্তিম আভা লোপ পেয়েছে। চোখের নিচে নীলচে ক্লান্তি জমে অদ্ভুত এক অবসন্নতার রেখা এঁকেছে। হাঁটার মাঝেও শরীরটা কেমন টলমল করছে। রৌদ্রিকের বুকের ভেতর অকারণ অস্বস্তি জন্ম নিল। নিজের এই শারীরিক দূর্বলতার উপর ভীষণ রকমের রাগ হচ্ছে। এমন সময়ই কেনো তাকে অসুস্থ হতে হলো?রৌদ্রিক অত্যন্ত ধীরস্বরে বলল-

“ তোমাকে আমি আমার সামনে বসতে বলেছি তূর্ণা।
তূর্ণা হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল।
“আগে আপনি এইটা খেয়ে নিন তারপর আমি বসচ্ছি।”
মাত্র দু’পা এগোতেই তার দৃষ্টি হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এল।তার চারপাশের দেয়াল যেন অস্বাভাবিক বেগে ঘুরতে শুরু করল। সবকিছু কেমন ঘুরছে তার চারদিকে।
হাতে ধরা গ্লাসটি আঙুলের ফাঁক গলে মেঝেতে পড়ে তীক্ষ্ণ শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পর মুহূর্তেই তূর্ণার শরীরটা ভারশূন্য হয়ে সামনের দিকে ঢলে পড়ল।
” তূর্ণা!!!”

রৌদ্রিকের বুক থেকে বেরিয়ে এলো আতঙ্কে বিদীর্ণ এক আর্তচিৎকার। হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে মনে হচ্ছে। এক মুহূর্তে সামনে থাকা দৃশ্যটা সবচেয়ে ভয়ানক দৃশ্য মনে হচ্ছে রৌদ্রিকের নিকট। ডাক্তারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, নিজের ভাঙা পা, ছিন্নভিন্ন হাত এক মুহূর্তে সবকিছু অর্থহীন হয়ে গেল।অসহনীয় যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে সে বিছানা থেকে নেমে আসার চেষ্টা করলো। প্লাস্টারবন্দি পা মেঝেতে ছোঁয়ামাত্র বুকফাটা ব্যথা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। তবুও থামল না সে। বেড আঁকড়ে, খুঁড়িয়ে, প্রায় টেনে হিঁচড়ে নিজের শরীরটাকে তূর্ণার কাছে নিয়ে এলো।মেঝেতে অচেতন হয়ে পড়ে আছে তূর্ণা। মুখটা সম্পূর্ণ বিবর্ণ। সারা মুখশ্রী কেমন নেতিয়ে পরা,রৌদ্রিকের হাত কাঁপতে লাগল। অত্যন্ত সতর্কতায় সে তূর্ণার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। কাঁপা আঙুলে কপালের এলোমেলো চুল সরিয়ে দিয়ে বারবার ডাকতে লাগল-
“তূর্ণা… শুনতে পাচ্ছ? আমার দিকে তাকাও… প্লিজ…!!”
কোনো সাড়া নেই। তার বুকের ভেতর জমাট বাঁধল আদিম ভয়। এটা সেই ভয়, যা আইসিইউর অন্ধকারে তূর্ণা প্রতিদিন অনুভব করেছে তার জন্য। আজ সেই একই অসহায়তা রৌদ্রিককে গ্রাস করলো। তার হাত কেমন যেনো কাঁপছে, মেয়েটাকে বড্ড বকার ইচ্ছে করছে। মাথা নত করে তূর্ণার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল-

“আমার জন্য এতটা নিষ্ঠুর হয়ো না,আমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ফিরেছি শুধু তোমাদের জন্য। তুমি যদি নিজেকেই এমন অবহেলা করো, তবে আমার এই ফিরে আসার অর্থ কোথায়?”
রৌদ্রিকের কন্ঠস্বর অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। নিজের পায়ের ব্যথার কাছে এই ব্যথা ফিকে লাগছে। রৌদ্রিক তূর্ণার দেহটা একহাতে কোনো রকমে ওঠার চেষ্টা করলো অতি সাবধানে। হাতের ব্যথাটা কমলেও প্লাস্টার করা পা খানি নিয়ে বিপাকে পরেছে। পায়ের উপস বড্ড রাগ লাগছে, এমন সময় কেনো তাকে অচল হতে হবে? রৌদ্রিক কোনো রকমে তূর্ণাকে বেডের উপর উঠিয়ে ঠিক মত শুইয়ে দিলো। এতে পায়ের অনেক চাপ পরায় প্রচন্ড রকমের ব্যথায় রৌদ্রিকের ফর্সা মুখশ্রী খানিকটা নীল বর্ণ ধারণ করেছে, তবুও সেই পায়ে ভরাট দিয়ে কাজটুকু করেছে। রৌদ্রিক তূর্ণার মাথার কাছে বসে পরলো, একহাত তূর্ণার এলোমেলো হয়ে যাওয়া কেশরাশির মধ্যভাগে বিলিয়ে দিয়ে আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছে। তূর্ণার পালস চেক করতেই বুঝতে পারলো, পালস খুব ধীর গতিতে চলছে।
এমন সময় ছোট্ট রোদেলা দৌড়ে ঘরে ঢুকল। রৌদ্রিক রোদেলাকে দেখা মাত্রই রোদেলার দিকে সতর্কতা বার্তা ছুড়লো।

“ রোদ না, এইদিক দিয়ে আস্তে হেঁটে আসো।”
রৌদ্রিকের কথায় রোদেলা গতি কমে এলো। সে পিটপিট চোখে ফ্লোরে পরে থাকা ভাঙা গ্লাসটার দিকে তাকালো, তারপর রৌদ্রিকের দিকে। রৌদ্রিকের কথা মতো আস্তে করে হেঁটে বিছানার উপরে এলো। তূর্ণাকে শুয়ে থাকতে দেখে তার নিষ্পাপ মুখে আতঙ্কের ছায়া নেমে এল।
“পাপা…মা ঘুমায় কেন?”
রৌদ্রিক খানিকটা হাসার চেষ্টা করলো,রোদেলাকে ভয় পেতে দিতে চাইল না। কষ্টের মাঝেও ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে বলল-
“মা খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে, রোদ। আমরা দু’জনে মিলে মার খেয়াল রাখব… ঠিক আছে?”
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। তারপর ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের আঙুল শক্ত করে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল-

“মা ওঠো। এবার তুমাকে আমি ওতুধ খাওয়াবু।”
” মা কান্ত,যখন উঠবে তখন খাইয়ে দিও কেমন? সকালে ঠিক মত খেয়েছে তো?”
রোদেলা মাথা দুলালো, তূর্ণার মলিন মুখশ্রী পানে চেয়ে বলে-
” মা খাইয়ে দিতেছে, অনেত মজা!”
“ তাহলে রোদেলা এখন কি করছে?”
“ কিতু না, আমি তো খেলতে চেতেছিলাম, কিন্তু মা তো ঘুমায়।”
“ এখন সায়রা বেবির সঙ্গে খেলো কেমন? পাপার পা ঠিক হয়ে গেলো আমরা অনেক খেলবো।”
বলতে বলতে রোদেলা গল্প জুড়ে দিয়েছে, রৌদ্রিক তার হসপিটালের চেনা একজন মহিলা ডাক্তারকে বাড়িতে আসতে বলেছে। এই অবস্থায় সে নিয়ে গিয়ে চেকআপ করাতে পারবে না, তূর্ণার শরীরের হিমোগ্লোবিন, ভিটামিনের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া মেয়েটার শরীরের র’ক্তের পরিমাণ কম, দুই ব্যাগ ব্লাড দেওয়া হয়েছে। সে না থাকায় মেয়েটা নিজের যত্ন না নিয়ে আরও নিজের খারাপ অবস্থা বানিয়েছে।

দুপুরের দিকে তূর্ণার জ্ঞান ফিরেছে, রৌদ্রিক একটা বাক্য অব্দি উচ্চারণ করেনি আর। সে মানুষ তার চিন্তার মূল্য দেয়না তার সঙ্গে কথা লাভ কি? কারো খেয়াল রাখার জন্য নিজেকে ভুলে হলে,ওমন খেয়াল রাখাই উত্তম। রৌদ্রিক তার কাজের জন্য কাউকেই বলছে না, প্রয়োজন হলেই শ্রাবণকে বলছে সে করে দিচ্ছে। শ্রাবণকে কয়েকদিনের জন্য নিজের নার্স বানিয়েছে সে। তূর্ণা অপরাধীর ন্যায় মুখ করে বসে আছে, জবা সিকদারের কাছে বকুনি খেয়েছে অনেকখানি। এর পর থেকে আরও মন ভার হয়ে আছে, রুমা সিকদার জোর করে খাবার খাইয়ে গেছে। আর এখন হাতে ভিন্ন ফ্রুটস কেটে দেওয়া হয়েছে যাওয়ার হয়েছে। তবে তূর্ণার মনোযোগ সেইদিকে নেই, তার মনোযোগ তার সামনে চোখ বন্ধ করে রাখা গম্ভীর মানবটির দিকে।
কালকেও তাকে অবিশ্বাস্য করে দিয়ে মানুষটা মজা করছিলো। অথচ এখন তাকাচ্ছে না অব্দি, তূর্ণার ভীষণ কান্না পেলো। নাকের ডগা লাল হয়ে এসেছে, সময়টা এমনই না চাইতেও অল্পতেই মনটা বিষাদে ভড়ে যাচ্ছে। তূর্ণা নাক টেনে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো, তবুও পারলো না। কার্ণিশ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পরলো।

“ কারো জন্য যদি আবারও আমার বউ-বাচ্চার ক্ষতি হয়,তাকে আর আমার ঘরে থাকতে হবে না। বাড়িতে আরও ঘর আছে সেগুলোতে যাতে চলে যায়।”
অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে কথাটুকু বললো চোখ বন্ধ অবস্থায়। তূর্ণা যেনো আরও ফুঁপিয়ে উঠলো। রৌদ্রিক আবারও শীতক,গম্ভীর স্বরে বলে-
“ চোখ খুলে যাতে বাটি খালি দেখি। নাহলে এই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে সে।”
“ আপনি খুব পাষাণ! এসে হাতে আমায় একবারও আদর করেননি, সুন্দর করে কথাও বলেননি। বকেছে খালি, আমি কি ইচ্ছে করে করেছি এইসব?”
“ কথা না শোনা মানুষদের আবার কিসের আদর?”
তূর্ণা ফোঁপাতে ফোপাঁতে মুখে খাবার পুরছে। হেঁচকি তুলছে। রৌদ্রিক এবার হালকা রাগ মিশ্রিত গলায় বলে-
” কান্না থামিয়ে তারপর খান, এত দয়া দেখিয়ে খেয়ে গলায় আটকাতে হবে না।”
তূর্ণা মুখ বাকলো কান্নার মাঝেও। কি পাষাণ মানুষ! একটু সুন্দর করে বললে কি তার জাত যাবে? এসে হাতে তার সঙ্গে ভালো করে কথা বলেনি। তার জায়গায় রৌদ্রিক কি একই জাজ করতো না? জানা নেই তূর্ণার, তবে তার গলা দিয়ে এই কয়দিন ভাতের দানাগুলোকে ইটের টুকরো মনে হয়েছে৷ যেগুলো গিলতে তার প্রচন্ড কষ্ট হয়েছে।

বিকেলটা আজ অদ্ভুত রকমের স্তব্ধ। পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বমুহূর্তে নিজের স্বর্ণাভ অহংকারটুকু ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে, অথচ সেই দৃশ্যের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সিকদার ভিলার দ্বিতীয় তলার প্রশস্ত শয়নকক্ষটিতে। জানালার কাঁচ ভেদ করে প্রবেশ করা ম্লান আলোকরেখাগুলো সারা কক্ষে গাঢ় কাঠের গায়ে দীর্ঘ ছায়ার জ্যামিতি এঁকে দিয়েছে। আরামদায়ক বিছানায় বসে আছে,আর এই অলসময় সময় পার করতে শেষমেশ আশ্রয় নিয়েছে একটি পুরোনো দর্শনগ্রন্থে। বইয়ের প্রতিটি পঙ্‌ক্তি মনোযোগ দিয়ে পড়লেও মস্তিষ্কের অন্তরালে বারবার ভেসে উঠছে, সকালের ভয়ানক দৃষ্টিটা।
হঠাৎ ই নিস্তব্ধতার বুক চিরে ভেসে এলো একগুচ্ছ ক্ষুদ্র নূপুরের শব্দ। ঝিনুকের সঙ্গে ঝিনুকের মৃদু সংঘর্ষের মতো কোমল, অথচ রৌদ্রিকের হৃদস্পন্দন অস্থির করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। বইয়ের পাতা থেকে দৃষ্টি তুলে দরজার দিকে তাকাতেই সে দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।দরজার চৌকাঠ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একরত্তি রোদেলা। টুকটুকে লাল শাড়ি, কোমল কপালে ক্ষুদ্র লাল টিপ, মাথাজুড়ে খুদে ওড়না, দু’হাতে কাঁচের লাল চুড়ি, আর ছোট্ট রুপালি তার আনা নূপুর। গোলাপের পাপড়ির মতো মুখখানা উচ্ছ্বাসে দীপ্ত, ঠোঁটের কোণে শিশুসুলভ বিজয়ের হাসি।যেনো আকাশের সমস্ত লালিমা নেমে এসে আশ্রয় নিয়েছে ক্ষুদ্র এক মানবশিশুর অবয়বে। রৌদ্রিকের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক আবেগে ভারী হয়ে উঠল। সে মুগ্ধ নয়নে রোদেলার দিকে চেয়ে বলে ওঠে-

“ আসমান থেকে এই পরীটা কখন এলো আমার ঘরে? আমার পাখিকে তো পুরো পরী বউ লাগছে!”
রোদেলা খিলখিলিয়ে হেসে নিজের ছোট্ট ঘাঘরার ঘের দু’হাতে তুলে গোল গোল ঘুরে দাঁড়াল।
“ আমায় কেমুন লাগছে পাপা?”
প্রশ্নটা ছিল নিখাদ নিষ্পাপ।কিন্তু এই সরল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রৌদ্রিকের চোখ দুটো অকারণই ভিজে উঠল। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে বলল-
“ আগে পাপার কাছে আসো,তারপর বলছি।”
আহ্লাদে আটখানা হয়ে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে দৌড়ে এলো রোদেলা। নূপুরের টুংটাং শব্দে যেন সমগ্র কক্ষের নীরবতা হাসতে শুরু করেছে, রোদেলা কাছে আসতেই
রৌদ্রিক তাকে সাবধানে কোলে তুলে নিল। এখনও শরীর পুরোপুরি সুস্থ নয়, তবুও বুকের ভেতর আগলে রাখা এই ক্ষুদ্র প্রাণটুকুর ওজন তার কাছে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তির চেয়েও অধিক শান্তিদায়ক। রৌদ্রিক মেয়ের মুখপানে চেয়ে বলে-

“ আমার রোদপাখিকে বউ লাগছে, একদম লক্ষ্যবউ! আমার মা’টাকে বিশ্বের সুন্দরীতমা লাগছে।”
রৌদ্রিকের প্রসংশা পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেলো আবারও রোদেলা। চোখ-মুখে খুশি উবড়ে পরছে তার।রোদেলা দু’হাত দিয়ে পাপার গলা জড়িয়ে ধরে গর্বিত স্বরে বলল-
” মা তাতিয়েছে, তুন্দল লাগতে?”
রৌদ্রিক হেসে তার নাকটা আলতো চেপে দিল।
” খালি কি সুন্দর? আমার রোদপাখি তো মিষ্টি পাখি তার পাপার, তাকে তো সবসময় সুন্দর লাগে।”
কথা বলার মাঝেই আচমকাই দুই হাত দিয়ে রৌদ্রিকের মুখখানা স্পর্শ করল। রোদেলার আঙুলগুলো অত্যন্ত সতর্কতায় রৌদ্রিকের আঘাতের দাগে গিয়ে থামল।কণ্ঠটা হঠাৎ করেই বিষণ্ন হয়ে এলো।
“পাপা…তুমাল ব্যতা করে?”
রৌদ্রিক কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর দিতে পারল না।
এই ছোট্ট মানুষটা গত কয়েকদিনে কতখানি বড় হয়ে গেছে, তা হয়তো সে নিজেও জানে না।মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

“না সোনা। আমার সব ব্যথা চলে গেছে।”
রোদেলা সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।তারপর হঠাৎ ঝুঁকে বাবার কপালে একটুখানি চুমু খেল। অতঃপর অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে ফুঁ দিয়ে বলল,
” ঠিত হয়ে যাবপ। আমি ফুঁ দিছি।”
রৌদ্রিক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুকণাটি দ্রুত আড়াল করে সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল নিজের মেয়েকে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৭

মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে, যাদের স্পর্শে ভাঙাচোরা আত্মাও পুনর্জন্ম লাভ করে। এই ক্ষুদ্র মানুষটাই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র অলৌকিকতা। এক হাত দিয়ে মেয়ের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে, অন্য হাত দিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিলো,এই একরত্তি প্রাণটার হাসি রক্ষার জন্য যদি মৃত্যুর সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হয়, তবুও সে পিছিয়ে যাবে না। কারণ পৃথিবীর সমস্ত বিজয়ের ঊর্ধ্বে, একজন বাবার কাছে তার কন্যার “পাপা” ডাকটুকুই সবচেয়ে মহার্ঘ প্রাপ্তি। আর তার প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতি রোদেলা, রোদেলাকে ঘিরে রৌদ্রিকের অসংখ্য স্বপ্ন বুনেছে৷ দ্বিতীয়বার জীবন নিয়ে ভাবেনি সে, ভেবেছে শুধু রোদেলাকে। সে আর রোদেলা, তার রোদপাখি সময়ের সঙ্গে তার জীবনে আরও দুটি মানুষ যুক্ত হয়েছে৷ আজ সে দু’জন থেকে চারজনের পরিণত হয়েছে। তার জীবনে মানুষের পরিধি খুবই কম, তার মধ্যে যারা রয়েছে, সবই তার হৃদয়ের খুব কাছের।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here