অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪২
ফাহিমা ইসলাম
নব অরুণোদয়,
চারিদিকে সূর্যরশ্মি দ্বারা ধরণীকে আলোকিত করে তুলেছে। পক্ষীরাজরা আপন নীড় ছেড়ে উড়াল দিয়েছে দূর আকাশে। আবহাওয়া হয়তো বুঝে গেছে আজ কারো বিশেষ দিন, তাই তো সকাল সকাল ঝলমলে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। তূর্ণা মনটা সকাল থেকেই ফুরফুরে, সকাল সকাল উঠে হালকা সাজে নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছে। দেহাবশেষ লাল রঙে একখানা শাড়ি জড়িয়ে আছে, সদ্য ফোঁটা গোলাপের পাপড়ির ন্যায় দেখতে লাগছে মুখখানা। কালোদিঘী নেত্রজোড়ায় কাজলের উপস্থিতি বিদ্যমান। রোদেলা আর রৌদ্রিক গভীর নিদ্রা মগ্ন, রৌদ্রিক ফজরের নামাজ পরার পর আবারও ঘুমিয়ে পরেছে।
রোদেলার হাত-পা সব রৌদ্রিকের গায়ের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। রৌদ্রিক নিপুণ হাতে মেয়েকে আগলে রেখেছে ঘুমের মধ্যেই। তূর্ণা সেদিকে একনজর তাকিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, তার রৌদ্রিকে অনেক কিছু বলার রয়েছে। এই দিনটার জন্যই অপেক্ষায় ছিল সে, আর এতদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে।
বাড়ির কেউ-ই তেমন এখনো ওঠেনি, তূর্ণা সবার জন্য ফিন্নি সহ আরও কয়েকটা মিষ্টি জাতীয় খাবার তৈরি করতে লাগলো। খুশির দিনে সূচনা মিষ্টি দিয়ে করাবে। মোটামুটি তার রান্নার হাত এখন ভালো, মাঝে-মধ্যে সময় পেলেই সবার জন্য মন খুলে রান্না করে। এই বাড়ির কেউ-ই রান্না করা কিংবা না করা নিয়ে কিছু বলে না।
মধ্যাহ্নকালের তেজে সারা ধরণী জ্বলজ্বল করছে, রৌদ্রিক সবে মাত্র বাহির থেকে বাড়িতে পা রাখতেই তূর্ণা রান্না ঘরে ছোটাছুটি করতে দেখতে পায়। রৌদ্রিক ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়, তূর্ণা কেকটা উইপ-ক্রিম দ্বারা সাজানোর চেষ্টা করছে। গরমের তাপে ঘেমে একাকার মেয়েটা। কোমড়ের পাশে গুঁজে থাকা আঁচলের ফাক দিয়ে মেদহীন ফর্সা উদরখানি দৃশ্যমান হয়েছে। রৌদ্রিক নৈঃশব্দের তূর্ণা পিছনে দিয়ে দাঁড়ালো। তূর্ণা ঠিক রৌদ্রিকের বুক বরাবর, যাকে বলে পারফেক্ট হাইট।
প্রতিটি মেয়েরই এই হাইটের হওয়া উচিৎ বলে রৌদ্রিক মনে করে, যাতে বউ একদম স্বামীর বুক বরাবর মাথা ঠেকতে পারে। সে সামনে দাঁড়ালে তূর্ণা যাতে তার দিকে মাথা উঁচু করে তাকাতে পারে, আর সে দৃষ্টি নত করে তূর্ণার বুলিগুলো শুনবে। তূর্ণা মাঝে মাঝে রৌদ্রিকের শার্টের কলার ঠিক করে দেয়, তখন রৌদ্রিক একহাতে বউকে উঁচু করে ধরে।
“ কিসের জন্য এই কেক মিসেস সিকদার? ”
হঠাৎ রৌদ্রিকের কথা কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্রই তূর্ণা যেনো ভয়ে ছিটকে দূরে সড়ে দাঁড়ালো। বুকটা তার ধুরপুক, ধুরপুক করছে! রৌদ্রিক এইসময় বাড়িতে কি করে? লোকটা তো বলেছিল তার ফিরতে বিকেল হবে। তূর্ণা তো কেকটা রৌদ্রিকের জন্যই তৈরি করছে। প্রথমবারে মত কেক বানিয়েছে সে, তূর্ণা কথা বলতে না দেখে রৌদ্রিক আবারও জিজ্ঞেস করে-
“ কি হলো মিসেস সিকদার? এনিথিং ইজ রং?”
“ আপনি এখন বাড়িতে কেনো? এইভাবে কেউ পিছনে এসে দাঁড়ায়? কত্ত ভয় পেয়েছি জানেন!”
“ কেনো বাড়িতে দেখে খুশি হওনি? এমনিতে তো দেখলেই মা-মেয়ে নেচে-কুঁদে কাছে এসো, আজকে আবার কি হলো?”
তূর্ণা নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে হলো। সে এমন করলে লোকটাকে সারপ্রাইজ দিবে কিভাবে? তূর্ণা নিজেকে যথাযথ স্বাভাবিক রেখে বলে ওঠে-
“ উপরের যান, আমি তো ঘেমে গেছি। গা ঘেঁষলে ঘাম লেগে যাবে তো।”
তূর্ণার বাক্য ফুরাতেই রৌদ্রিক দক্ষ হাতে তূর্ণা কোমড় আঁকড়ে ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। তূর্ণা হকচকিয়ে গেলো হঠাৎ এমনটা করায়।
“ কি করছেন, কেউ এসে পরবে তো। ছাড়ুন, উপরে গিয়ে বসুন আমি আসচ্ছি। পুতুল ঘুমাচ্ছে।”
“ আসলে আসুক, তাতে আমার কি?”
“ আপনার কিছু না হলেও আমার হবে। উপরে যান, এইভাবে না দাঁড়িয়ে।”
তূর্ণার কথা উপেক্ষা করে রৌদ্রিক হাত বাড়িয়ে তূর্ণা ঘামে লেপ্টে থাকা কেশরাশি গুলো যত্নসহকারে কানে পিছনে গুঁজে দিলো। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতেই তূর্ণার কালোদিঘী নেত্র কোণায় কালজ লেপ্টে গেছে হালকা। রৌদ্রিক সেটা দেখে বলে-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪১
“ কিছু করতে হবে না, আমি কেক আনিয়ে দিবো। গরম অনেক ঘরে চল।”
“ না, আমি বানাই না। আপনি উপরে যান।”
রৌদ্রিক আর কিছু বললো না, পকেট থেকে রুমাল খানি বের করে তূর্ণা ক্লেদযুক্ত মুখশ্রী খানা মুছে দিলো। তূর্ণার না চাইতেও ইচ্ছে করলো মানুষটার সঙ্গে মিশে থাকতে। এত যত্ন করলে কার না ইচ্ছে করবে মানুষটা সঙ্গে সর্বদা থাকতে। তবে মনটাও খারাপ হলো, মানুষটা কি তাদের বিবাহবার্ষিকী কথা ভুলে গেছে? রৌদ্রিকের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই সে আসলে ভুলে গেছে, নাকি মনে আছে।
