অভিসৃতি পর্ব ১২
নওরিন কবির তিশা
সামরিক অভিযান সমাপ্ত হয়েও হতে চায় না যেন। এই যেমন, অপারেশন ‘রেড ফ্যালকন’ সফল হওয়ার ঠিক পরপরই সীমান্ত জুড়ে শুরু হয়েছিলো সেনাবাহিনীর স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর। উদ্ধার করা অ’বৈধ অস্ত্র, কার্তুজ ও বিডিআর-এর বাজেয়াপ্ত ড্রা-গসের তালিকা প্রস্তুত করে স্থানীয় পুলিশ ও বিজিবির যৌথ টিমের কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতেই নিশীথের আঁধার কাটিয়ে সদ্য প্রস্ফুটিত সূর্যালোকিত চরাচর্।
কিছুক্ষণ হলো, বান্দরবান সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে পৌঁছেছে সেনাদল। প্রাতরাশের সমাপ্তি ঘটিয়ে সবে চোখ বুজেছে সকলে। অথচ ব্যাতিক্রমী দুর্জয় তখন ধোঁয়া ওঠা কফি হাত ঝুল বারান্দার কানের ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। অভিযান সফল হলেও দায়িত্বের ইতি টানার উপায় নেই। এখনো অন্তত, দিনদুয়েক এখানেই আস্তানা গাড়তে হবে তাদের।
দূর দিগন্তে আঁকিবুঁকি কাটা রোদের আলোয় তন্দ্রাচ্ছন্ন ক্লান্তি ভুলছিল দুর্জয়, আকস্মিক নীরবতা বিদীর্ণ করল এক তরুণ কণ্ঠস্বর,,
“আসতে পারি স্যার?”
ঘাড় ঘুরানোর প্রয়োজন বোধ করলো না দুর্জয়। ধুরন্ধর মস্তিষ্ক ইতিমধ্যে, আগত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করে ফেলেছে। পূর্বের অবস্থানে থেকেই ও বলল,,
“ইয়েস।”
অনুমতি পেয়ে, প্রবেশ করলো আর্মি মেডিকেল কোরের এক তরুণ মেডিকেল অফিসার আসমান রেহমান,
“স্যার, আপনার কনুই তো বেশ গভীরভাবে কেটে গেছে! ড্রেসিং করানো হয়নি?”
দুর্জয় পকেট থেকে হাত না বের করেই অনাগ্রহী গলায় বলল,
“ইটস নাথিং, আসমান। স্ক্র্যাচ মাত্র। গো অ্যান্ড চেক দ্য আদার্স।”
আসমান কিন্তু থামলো না। বরাবরের ন্যায় ভয়টাকে পিছু ঠেলে, এগিয়ে এসে জেদী কন্ঠে বলল,,
“স্যার, প্লিজ। অ্যাজ আ মেডিকেল অফিসার, এত বড় কন্টামিনেশন ইগনোর করা আমার ডিউটির খেলাপ। দুই মিনিট লাগবে, জাস্ট ড্রেসিংটা করে দিই।”
সদা কঠোর মুখাবয়বের ব্যক্তিটা কিঞ্চিত ঘাড় ঘুরিয়ে যদি মুখটার পানে চাইল। কি জানি ভেবে তর্কে জড়ালো না আর।
“অলরাইট, মেক ইট কুইক।”
সম্মতি পেয়ে খুশি হলো তরুণ। পেশাদারি দক্ষতায় অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে শুরু করল। কিন্তু হঠাৎই ওর নজর গেল দুর্জয়ের ডান হাতের অনাবৃত কবজিতে প্যাঁচানো ব্রেসলেট আকৃতি-টির দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বুঝল, এটা সাধারণ কিছু নয়।অনুমানত, কোনো তাম্রকেশের সূক্ষ্ম বেনুনি এটা।
সামরিক জীবনে প্রচন্ড শৃঙ্খলিত মেজরের এমন আলগা ব্যাক্তিগত জিনিস বহন করা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য! তার ওপর লোকটার মেজাজ আর মারাত্মক ব্যক্তিত্বের ভয় তো আছেই। আসমান ঢোক গিলে কৌতূহল সামলাতে না পেরে, দৃষ্টিটা দূরের চিম্বুক পাহাড়ের সারির দিকে রেখেই ইতস্তত করে বলল,,
“ইয়ে… স্যার, বাই দ্য ওয়ে… আপনার রিস্টের এই কাস্টমাইজড ব্যান্ড’টা কিন্তু বেশ ইউনিক! ডিফেন্স প্রটোকলে তো এমন এক্সেসরিজ সচরাচর দেখা যায় না। কোনো স্পেশাল লাকি চার্ম নাকি, স্যার?”
সোজা কথা না বলে ইঙ্গিতবহ ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করতেই দুর্জয় ধীর গতিতে কফির মগে শেষ চুমুক দিল। তারপর আসমানের দিকে অলস,তবে অতল প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। গম্ভীর কণ্ঠে সংক্ষিপ্ত জবাব দিল,,
“ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম না করাটা একটা ভালো প্র্যাকটিস, আসমান। জব ডান? দেন ইউ মে লিভ।”
আসমান বেশ লজ্জিত। ও সতর্ক ভঙ্গিতে চটপট সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“ইয়েস স্যার! এক্সকিউজ মি, স্যার!”
তরুণ ডাক্তারটি আর এক সেকেন্ড বিলম্ব না করে দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করল। দুর্জয় বারান্দার রেলিংয়ে একহাত রেখে অনাবৃত কবজির সেই রেশমি বিনুনিটার দিকে চোখ বুলালো। নিজেকেই নিজে শুধালো,,
“আমি এমনটা কবে থেকে হলাম?”
জবাব মিলল না।
“দোস্ত,দিহান ভাইতো তোর শোকে দেবদাস হয়ে যাচ্ছে! বেচারা।”
“আর মৃন্ময়ী দিহানের জন্য! হোয়্যাট আ লাভ ট্যাঙ্গেল!”
বন্ধুমহলের হাসিঠাট্টার মাঝেই ক্যানে শেষ চুমুক দিয়ে শূন্যে ছুঁড়ে মারলো কায়রা। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এমন হাস্যরসের কথা গুলোও আপাতত বিরক্তিকর লাগছে। বাড়িতে বোনের জোরাজুরি আর বন্ধুদের একের পর এক ফোনকলের দরুন শেষমেশ ভার্সিটি ক্যাম্পাসে পা রাখা। নয়তো, লোকালয়ে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ওর ছিল না।
এতো কিছুর পরও ওর এই প্রকাণ্ড নির্লিপ্ততায় এবার মেধা ক্যানটিনের বেঞ্চে হেলান দিয়ে সরাসরি খোঁচা মারল,,
“সিরিয়াসলি, কায়রা? মেজরের ভালোবাসায় একদম ডুবজল অবস্থা তোর! এখনো সময় আছে দোস্ত, রি-থিংক করে দেখ। একজন মিলিটারি ম্যানের সাথে এইভাবে পারমানেন্টলি ওয়েটিং মোডে থেকে লাইফ লিড করা ইমপসিবল। আজ এক মিশন, কাল আরেক সীমান্ত… কোনো ফিক্সড লাইফ আছে?”
ইভানও হাত নেড়ে সায় দিয়ে যোগ করল,
“এক্স্যাক্টলি! বয়স তোর জাস্ট টোয়েন্টি-ওয়ান! এই এজে এমন স্যাড-গার্ল ফেজ ধরে বসে থাকার কোনো মানে হয়? জীবনটা কি কোনো সস্তা সিরিয়াল যে বীর নায়কের প্রেমে রোজ বিরহগাথা লিখবি?”
কায়রা এতক্ষণ চুপ করে ঘাসের ডগায় আঙুল বোলাচ্ছিল। এবার মাথা তুলে সোজা ওদের চোখে চোখ রাখল,
“তোদের এই জেন-জি ক্যালকুলেশনটাই ভুল, ইভান। প্র্যাকটিক্যাল লাইফে অপেক্ষা জিনিসটা কষ্টের হতে পারে, কিন্তু যাকে অপেক্ষা করানো হচ্ছে তার প্রতি ট্রাস্ট আর রেস্পেক্ট থাকলে এই কষ্টটাই রিওয়ার্ডিং শোনায়। আই নো মাই চয়েস, আর আমি কোনো ইমোশনাল ড্রামা থেকে এই ডিসিশন নিইনি।”
মেধা একগাল হেসে চট করে পাল্টা যুক্তি ছুঁড়ল,
“হাহ্! এতই যদি তোর ম্যাচিউরড থট প্রসেস, তবে মুখখানা পেঁচার মতো অফ করে ক্যাম্পাসের কোণে বসে আছিস কেন শুনি? তোর লজিক তো এখন তোর ফেসের সাথে একদমই ম্যাচ করছে না, মিস কায়রা!”
বন্ধুদের শাণিত ট্রোলিংয়ের সামনে কায়রা ক্ষণিকের তরে থমকে গেল বটে, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের কাঁধের ওড়নাটা সামলে বেশ ভাব নিয়ে ঘুরে বসল। আসল মনোভাবটা বন্ধুদের সম্মুখে তুলে ধরে বলল,,
“অ্যাকচুয়ালি, ওয়েটিং এ প্রবলেম হচ্ছে না আমার। আমার মেইনলি ওনাকে নিয়ে টেনশন হচ্ছে। কে জানি এখন কোথায় কিভাবে কেমন আছেন?”
কথাটা আবেগঘন হলেও বন্ধু মহলে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারল না তা। বরং হাসির খোরাক হলো যেন। সবগুলো একযোগে বলে উঠলো,,
“আহারে বেচারীটার!”
তবে এত কিছুতে মাথা ঘামালো না, কায়রা। এতক্ষণে, মস্তিষ্ক গ্রহণ করল বহু পূর্বে বলা কথাটা। সন্দিহান দৃষ্টিতে তূজার দিকে তাকিয়ে ও বলল,,
“দিহান ভাইয়ের কথা কি বলছিলি তুই?”
হাসি থামালো না তূজা। তবে পূর্বের তুলনায় নিয়ন্ত্রণ করল নিজেকে, হাসি হাসি মুখেই জবাব দিল,,
“আরে ওই যে, ওসি শিহাব চৌধুরীর ছেলে। দিহান চৌধুরী। থার্ড ইয়ার বিজ্ঞান বিভাগ, টপার ছেলেটা। অল ভার্সিটির ক্রাশ তো ভাই! একমাত্র তুই-ই দাম দিলিনা।”
কায়রা বিরক্তির এক চরম শিখরে পৌঁছে চোখমুখ সামান্য কুঁচকে ছুঁড়ে দিল জবাবটা,
“ছাড় তোদের তথাকথিত টপার আর ক্রাশদের গল্প! এসব চকলেট বয়দের প্রতি আমার কোনো জন্মেই কোনো ইন্টারেস্ট ছিল না, আর এখনও নেই। আই প্রেফার আ প্রপার রিয়েল ম্যান, নট দিস কাইন্ড অফ বয়েজ!”
কথাটা শেষ করতেই কায়রা নিজের ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়াল। বন্ধুদের দলটা চঞ্চল পায়ে হাঁটত হাঁটতে ক্যাম্পাসের মেইন গেটের দিকে এগোতে লাগল। তূজা, তখন থেকেই দিহানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কায়রা শেষমেষ রাগান্বিত হয়ে বলেই উঠল,,
“আ’ম অলরেডি এঙ্গেজড। সো আমার ওসব সাদা মুলা লাগবে না। তোর লাগে তো তুই গিয়ে গলায় ঝুলে পর যা!”
এহেন ত্যাড়া কথায় মুখ বাঁকালো তূজা। কিছু বলার প্রস্তুতি নিয়েও বলল না কিছু। ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসছিল দিহান চৌধুরী আর তার একঝাঁক অনুগামী। কায়রাকে চটপটে পায়ে এগিয়ে আসতে দেখে দিহানের সাঙ্গপাঙ্গরা হুট করে শিস বাজিয়ে বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠল,
“আরেহ্! ভাবি যে! কী খবর ভাবি?”
আচমকা এমন সস্তা মন্তব্যে রুশাফ’রা চরম ক্ষেপে গিয়ে রুখে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু কায়রা ইশারায় শান্ত হতে বলল ওদের। ওদিকে দিহান নিজের বন্ধুদের দিকে এক কড়া চোখ রাঙিয়ে নীরব থাকার সংকেত দিয়ে কায়রার ঠিক মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ওষ্ঠাধরের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,,
“হাই কায়রা! হাউ অ্যাবাউট আ কফি নাও? অনেকদিন তো হলো ফ্রি টাইমে ক্যাফেতে বসা হয় না।”
“আমি আপনার সাথে আগে কখনো কফি খেতে বসেছিলাম?”
প্রশ্নের জবাবে তাকেই ফাঁসিয়ে দিয়েছে দেখে বোকা হেসে দিহান বলল,,
“না আসলে! কিন্তু একটা কফি তো খাওয়াই যায়।”
কায়রা অনাসক্ত, বরফশীতল কণ্ঠে উত্তর দিল,
“নো থ্যাঙ্কস। আমি কফি খাই না।”
দিহান দমে না গিয়ে এক পা এগিয়ে অমায়িক গলায় শুধাল,
“ওকে ফাইন, নো কফি! দেন আইসক্রিম? আই নো, এই টাইপের সুইট জিনিসগুলো তোমার অল-টাইম ফেভারিট!”
কায়রা নিজের চোখজোড়া আলতো ঘুরিয়ে চূড়ান্তরুপে এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিমাতে জবাব দিল,
“নো থ্যাঙ্কস এগেইন। আই জাস্ট হেট দিস! আমার তাড়া আছে, এক্সকিউজ ম্যি।”
বিন্দুমাত্র আমল না দিয়ে কায়রা সোজা দিহানকে পাশ কাটিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যেতেই দিহানের দলের চেঁচামেচি নিমেষে থেমে গেল। দিহানের সেই দাম্ভিক, হাসিমুখখানা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নিজের জনপ্রিয় ভাবমূর্তিতে এমন প্রকাশ্য চড় খেয়ে ও কিঞ্চিৎ ক্ষিপ্ত হয়েই পেছন থেকে উচ্চস্বরে ডেকে উঠল,,
“বাই দ্য ওয়ে, মিস কায়রা! তোমাকে ভালো লাগে আমার, এ্যান্ড আই অ্যাম সেয়িং ইন ফ্রন্ট অফ এভরিওয়ান,আই লাভ ইউ এ্যান্ড আই উইল মেক ইউ মাইন!”
দিহানের এহেন দাম্ভিক, উচ্চকিত চিৎকারে পুরো গেটের সামনের পরিবেশ ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। উপস্থিত সবাই উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল কায়রার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়। কায়রা চলন্ত পায়ে থমকে দাঁড়াল। তবে ওর চেহারায় না ফুটল কোনোরূপ চাঞ্চল্য, না রাগ। ধীর গতিতে ঘুরে দাঁড়াল সে। অতল শান্ত কিন্তু বরফশীতল দৃষ্টি সোজা নিবদ্ধ করল দিহানের চোখে। ওষ্ঠাধরের কোণে এক চিলতে শাণিত, অবজ্ঞাপূর্ণ হাসি ফুটিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,
“ডে-ড্রিমিং বন্ধ করুন, মিস্টার দিহান চৌধুরী! কায়রা ইয়াসিরের মন, আত্মা আর অধিকার-এভরিথিং ইজ অলরেডি বুকড্ অ্যান্ড রেজিস্টার্ড বাই মেজর দুর্জয় আহসান! সো, বেটার স্টে ইন ইউর লিমিট, কজ ইউ ডোন্ট ইভেন স্ট্যান্ড আ চান্স!”
কথাগুলো যেন প্রখর চাবুকের মতো গিয়ে আঘাত করল দিহানের দাম্ভিক অহংবোধে। ও একদম বাকরুদ্ধ, নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কায়রা আর এক মুহূর্তও সেখানে ব্যয় করল না; বন্ধুদের অবাক চাউনি উপেক্ষা করে সুদৃঢ় পদক্ষেপে ক্যাম্পাসের মূল ফটক পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
অপরাহ্ণের হেলানো রোদ বান্দরবান সেনানিবাসের সবুজ পাহাড়গুলোর চূড়ায় রক্তিম আবির ঢালছে। আপাতত অভিযানের দ্বিতীয় ধাপ চলমান-অপারেশনাল প্রসিডিউর আর ডিব্রিফিং। ১৯তম পদাতিক ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার্স কনফারেন্স রুমে এক যৌথ বৈঠক বসেছে। টেবিলজুড়ে মানচিত্র, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ইনভেন্টরি রিপোর্ট আর ইনটেলিজেন্স ডেটা ছড়িয়ে আছে। সেখানে জিওসি স্যার, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার আর সংশ্লিষ্ট অফিশিয়ালদের সামনে পুরো ‘অপারেশন রেড ফ্যালকন’-এর আফটার-অ্যাকশন রিপোর্ট উপস্থাপন করল দুর্জয়।
অভিযানের নিপুণ বাস্তবায়ন, কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতি না হওয়া এবং সফলভাবে ত্রি-সীমান্ত পথ অবরুদ্ধ করার জন্য উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনামা থেকে সমগ্র বিশেষ বাহিনীকে দাপ্তরিক প্রশংসা ও সাধুবাদ জ্ঞাপন করা হলো। নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাসের অনুমোদনপত্র হস্তান্তরিত হওয়ার পর, জিওসি স্যার সহাস্যমুখে ক্যাপ্টেন শান্ত আর ক্যাপ্টেন ফারহাদুলের উদ্দেশ্যে বললেন,,
“অ্যাডভান্সড রেকি আর গ্রাউন্ড ইনটেলিজেন্স কভার করার কাজটা দারুণ সামলেছেন, আপনারা ক্যাপ্টেন! ভেরি প্রাউড অব ইউ।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার!”—বুক টান করে একত্রে তেজোদীপ্ত স্যালুট ঠুকল ওরা।
অতঃপর জিওসি স্যার, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্জয়ের পিঠ চাপড়ে বললেন,
“অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়েছ, মেজর! সীমান্ত এখন পুরোপুরি সিকিউরড। ইউ অ্যান্ড ইউর এনটায়ার টিম ডিজার্ভ আ ব্রেক। আগামী পরশু তোমার ইমার্জেন্সি লিভ কার্যকর হচ্ছে। ব্যাক টু ইওর ফ্যামিলি, এন্ড এনজয় ইউরসেফ মেজর।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার!”—স্যালুট ঠুকে এক অকম্পিত অথচ স্বস্তির জবাব দিল দুর্জয়।
বিকেলের ম্রিয়মাণ রোদটুকু জজ কোর্টের লালচে ইটের দালানগুলোর ওপর ঢলে পড়েছে। আদালতের করিডোরে মক্কেল আর আইনজীবীদের কোলাহল থামেনি তখনও। পায়রা তার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর ডিভোর্স কেস সংক্রান্ত আইনি পরামর্শের জন্য সেখানকার এক অ্যাডভোকেটের চেম্বারে এসে বসেছে।
আইনজীবীর টেবিলে রাখা কেস ফাইলের ওপর হাত রেখে বান্ধবীর অন্যায়ের বিবরণ দিচ্ছিল পায়রা। অত্যন্ত ক্ষোভ আর দরদ ঢেলে ও বলছিল,
“দেখুন, মেয়েটার ওপর দিনের পর দিন যে মানসিক নির্যাতন চলেছে, তার ওপর আর কোনো আপস হতে পারে না! স্ট্রং আইনি অ্যাকশন চাই আমাদের!”
ঠিক তখনই চেম্বারের পাশের কাঠের দরজার আলগা পর্দা ঠেলে ভেতরে পা রাখলেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। চোখে দামি চশমা, পরনে কুচকুচে কালো ব্যারিস্টারি গাউন আর সুবিন্যস্ত স্যুট। শান্ত, গম্ভীর চোখে ফাইলের দিকে চোখ বোলাতে বোলাতে উনি ভেতরে ঢুকলেন। পায়রা তার উত্তপ্ত বক্তব্যের মাঝেই কৌতুহলী হয়ে সেদিকে ঘাড় ফেরাল। আর মুখোমুখি চোখ পড়তেই থমকে গেল দুজনেই!
লোকটার গাঢ় বাদামী নেত্রে একলহমায় ভেসে উঠল চেনা বিস্ময়। চশমাটা একহাতে সামান্য নামিয়ে শীতল কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“আরে! আপনি?”
পায়রাও ডাগর চোখের তারা দুটো প্রসারিত করে বাক্রুদ্ধ হয়ে রইল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুনিয়র অ্যাডভোকেট তড়িঘড়ি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“স্যার! আসুন স্যার!ম্যাম, ইনিই আমাদের এখানকার রেনোউনড জ্যেষ্ঠ ব্যারিস্টার সায়মন রহমান স্যার। এই কেসের মেইন লিড উনিই নেবেন। আমি ওনার অধীনেই ইন্টার্নশিপ করছি।”
ধীর পায়ে এগিয়ে এসে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর পাশের চেয়ারটায় বসলঝ। অনাবৃত সুগঠিত চিবুকে অলস হাত রেখে, পায়রাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল ওর বান্ধবীর দিকে চোখ রেখে বললো,
“আই অ্যাম ব্যারিস্টার সায়মন। কেসের গ্রাউন্ডসগুলো বেশ জটিল। হাসব্যান্ডের ফ্যামিলি থেকে কোনো ফাইনান্সিয়াল সেটেলমেন্টের প্রপোজাল এসেছে?”
সায়মনের এই প্রকাণ্ড, অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণে পায়রার অহংবোধে দাউ দাউ করে জ্বললো ক্রোধের অনল! লোকটা ওকে একদম হাওয়া বানিয়ে দিল? গণনায় ধরলই না? পায়রা আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার ধৈর্য হারাল। ঝটকা মেরে বান্ধবীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে তাকে চেয়ার থেকে প্রায় তুলে ফেলল। তীব্র ক্ষোভে ও ফুঁসে উঠে বলল,
“চল রে রিয়া! এখান থেকে উঠ! কী সব চোর-বাটপার আর দালালের পাল্লায় এসে পড়লাম আমরা! ফি নেওয়ার নামে পকেট কাটবে, আর কাজের বেলায় কাঁচকলা! চল, কোনো ভালো আইনজীবীর কাছে যাই, এই গাধা ব্যারিস্টারের কাছে কোনো কথা নাই!”
সায়মনের অনমনীয় চিবুক একমুহূর্তের জন্য শক্ত হলো। অত্যন্ত অলস ও শীতল ভঙ্গিতে চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে বরফশীতল দৃষ্টি নিবদ্ধ করে শক্ত কণ্ঠে বললেন,
“ও হ্যালো ম্যাডাম? আ ল বিট অফ রেসপেক্ট অ্যান্ড ডেসিমেটর ইন কোর্ট প্রিমিসেস! মুখ সামলে কথা বলুন। আপনার মতো কোনো কমনসেন্সহীন মেয়ের সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট আমার নেই।এক্সকিউজ ম্যি বেরোন এখান থেকে! আই উইল অনলি টক টু দ্য ক্লাইন্ট!”
পায়রা রাগে-ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে সায়মনের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর হাত আছড়ে বলল,
“কী বললেন? আমার সাথে কথা বলবেন না মানে? রিয়া আমার বান্ধবী! ওর হয়ে কথা বলার পুরো অধিকার আমার আছে! আর কমনসেন্সহীন কাকে বলছেন শুনি, মি. চোর সাহেব?”
সায়মন নিজের স্থান থেকে একচুল নড়লেন না। অলস ভঙ্গিতে গাউনটা সামলে নিয়ে বললেন,
“কাকে বলছি সেটা আপনার রিয়্যাকশনই বলে দিচ্ছে, মিস। চোর-পুলিশ খেলা বন্ধ করে ব্রেনটা একটু প্রপারলি ইউজ করা প্র্যাকটিস করুন। চিল চিৎকার না করে কোর্ট প্রিমিসেস খালি করুন, আদারওয়াইজ আই উইল বি ফোর্সড টু কল দ্য সিকিউরিটি!”
অভিসৃতি পর্ব ১১
“সিকিউরিটি? কত বড় স্পর্ধা!”—পায়রা দাঁতে দাঁত চেপে এক পা এগিয়ে এল।
দু’জন প্রাজ্ঞ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের এমন বাকযুদ্ধ চেম্বারের পরিবেশকে নিমেষেই টানটান উত্তেজনায় ভরিয়ে দিল। রিয়া অবস্থা বেগতিক দেখে, নিজের সমস্যা ভূলে চটজলদি পায়রার হাত ধরে বেরিয়ে এলো চেম্বার থেকে।
