অভিসৃতি পর্ব ২৮
নওরিন কবির তিশা
ক্ষন গণনায় বহু বছর পিছিয়ে যায়। উজান তখন সদ্য ভার্সিটিতে উঠা টগবগে তরুণ। সৌভাগ্যক্রমে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিল ও। ডিপার্টমেন্ট টপার। নাম ডাক নেহাত কম নয়। অন্তত ডিপার্টমেন্টে প্রচুর জনপ্রিয় ছিলো ও। তবে পড়াশোনা শুধু নয়, ব্যবহার-বুদ্ধিমত্তায় অতি সহজেই পরিচিতি লাভ করতে থাকে ও। কিন্তু কথায় আছে না? ভাগ্যের লিখন না যায় খন্ডন!
আর পাঁচটা নতুন শিক্ষার্থীদের মত ও-ও মাসখানেক যেতেই সিনিয়রদের রেগিং এর শিকার হয়। তবে, ধরণটা ভিন্ন ছিলো। তবে ,কিছুদিনের ভেতরই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ ভালো অবস্থান সৃষ্টি করায়, ওকে দিয়ে অন্য সমস্ত কার্যকলাপ করাতে পারত না সিনিয়ররা। তাই সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। তবে এই আকস্মিক গড়ে ওঠা ভালো সম্পর্কের নেপথ্যে থাকা কারণটা বড্ড গা ছমছমে।
দিন অতিক্রান্ত হয় স্বাভাবিক নিয়মেই। হঠাৎ একদিন, ডাক পড়ে উজানের। হোস্টেলে থাকা শান্ত ব্যক্তিত্বের উজান কখনো কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায়নি। তাই বাধ্য ছেলের মতোই সিনিয়রদের ডাকে সাড়া দিয়ে কাঙ্খিত গন্তব্যে গিয়েছিল ও। আর সেটাই ছিল ওর জীবনের অধঃপতনের সূচনা।
ডিপার্টমেন্টের ফোর্থ ইয়ারের ক্ষমতাধর সিনিয়র রাজিব ইস্কান্দার। বাবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অন্তরালে ঢাকা শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ড্রা”গ”স চোরাচালানের প্রধান সমন্বয়ক। রাজিব ও তার গ্যাং উজানকে এক গোপন কক্ষে ডেকে এনে টেবিলে এক বিশাল প্যাকেটের হে’রো’ইন আর সিনথেটিক ড্রা’গস গুঁজে দেয়। নির্দেশ আসে, এই চালানাটি নির্দিষ্ট এক ভিআইপি স্পটে পৌঁছে দিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখে ধুলো দিতে উজানের মতো ‘গুড বয়’ ইমেজের ক্যারেক্টারই ছিল ওদের দৃষ্টিতে একদম উপযুক্ত।
উজান প্রথমে বড়ো অনুনয়-বিনয় করেছিল, এই অপরাধে ও জড়াবে না। কিন্তু অনুনয়ের প্রেক্ষিতে কাজ হওয়ার বদলে,মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। রাজিবের পকেট থেকে বেরিয়ে আসে চকচকে বিদেশি পিস্তল, উজানের কপালে চেপে ধরে, হীমশীতল কণ্ঠে ও হুমকি ছোঁড়ে,
“আজ যদি এই ব্যাগ নিয়ে বের না হস, কাল সকালে তোর লাশ বুড়িগঙ্গায় ভাসবে। চয়েস ইজ ইউরস!”
জীবনের ভয়ে দিশেহারা উজান বাধ্য হয়ে সেদিন সেই প্যাকেট নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিয়ে আসে। কিন্তু বি’ষাক্ত চক্রের হাত থেকে আর মুক্তি মেলেনি ওর। এরপর থেকে প্রায়শই ওকে হুমকি ধামকি দিয়ে একের পর এক অবৈধ কাজ করিয়ে নিতে থাকে রাজিবের দলবল। জীবনভয় আর প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে উজান নিজেই একদিন ড্রা’গসের শরণাপন্ন হয়।
তারপর ধীরে ধীরে এক ভয়ঙ্কর নেশার অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে শুরু করে ও। ডিপার্টমেন্ট টপ করা মেধাবী ছেলেটির উপস্থিতি ক্লাসে কমতে থাকে, পরীক্ষার ফলাফল একের পর এক খারাপ হতে শুরু করে, এমনকি একপর্যায়ে ইয়ার ড্রপ করে বসে ও। পরিবার সচেতন হওয়া সত্ত্বেও শান্ত স্বভাবের ছেলের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ছিল তাদের।
উনারা ধরেই নিয়েছিলেন, ছেলে হয়তো শরীর খারাপের কারণে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময় পর যখন ওকে ঢাকা মেডিকেলের রিহ্যাবে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হলো, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। শারীরিক চিকিৎসা পেলেও মানসিক সুস্থতা আর ফিরে আসেনি।
রিহ্যাব থেকে বের হয়ে সুস্থতার ভান করলেও, ভেতরের অন্ধকার ততদিনে ওকে গ্রাস করে ফেলেছিলো পূর্ণোদ্যমে। ধীরে ধীরে বাজে সঙ্গ আর অপরাধ জগতের ভয়াল হাতছানি উজানের স্থানকে পোক্ত করে তোলে। আর এই চূড়ান্ত অন্ধকার পথেই ওর পরিচয় হয় ‘ফিরোজ ভাই’ নামক এক রহস্যময় ব্যাক্তির সাথে।
অত্যন্ত ধূর্ত আর উগ্র পাকিস্তানপন্থী রাষ্ট্রবিরোধী আদর্শের ধারক ফিরোজ ভাই বিশ্বাস করত,বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল এক মস্ত ভুল। তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো এদেশের শাসনব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সম্পূর্ণ ধসে দিয়ে দেশকে পুনরায় পাকিস্তানের অংশ কিংবা এক পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করা। এবং এমন ভ্রান্ত মানসিকতার মানুষকে,স্বার্থসিদ্ধির জন্য দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা করে আসছিল অনেক ক্ষমতাধর রাষ্টের ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গ।
টাকার লোভ আর ক্ষমতার মোহ গ্রাস করেছিল বিষাদগ্রস্ত উজানকে। কিছুদিনের মধ্যেই,ভরসার স্থল পোক্ত করে,ফিরোজ ভাইয়ের ডান হাত হয়ে ওঠে ও। আন্তর্জাতিক ড্রা’গস চোরাচালান, অস্ত্র পাচার থেকে শুরু করে নারী ও শিশু পাচারের বিশাল এক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে থাকে ও। তবে এই অপরাধ জগতে ও উজান নামে পরিচিত ছিল না কখনোই; সেখানে ওর নাম ছিল ‘উমায়ের,উমায়ের খলিলি’।
নেটওয়ার্কের চরম গোপনীয়তার কারণে ফিরোজ ভাইকে সরাসরি কেউ কোনোদিন দেখেনি। একমাত্র উজানই তাকে সরাসরি চিনত এবং তার থেকে সরাসরি আদেশ পেত। উমায়ের নাম শুনলেই অপরাধ জগতের বাঘা বাঘা অপরাধীদের বুক কেঁপে উঠত।
এর আগে বহু মিশন নিখুঁতভাবে সম্পন্নকারীর এবারের পরিকল্পনাটিও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও নিখুঁত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায় একযোগে থার্মোবারিক বিস্ফোরক দিয়ে সিরিজ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সরকারি স্থাপনা ধ্বংস করা এবং সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া। একই সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে আসা সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ও দেশের ভেতরের কিছু মাস্টারমাইন্ড পলিটিশিয়ানদের সহায়তায় অরাজকতা সৃষ্টি করে ক্ষমতা দখল করা—এটাই ছিল তাদের ছক।
আটকা পড়া অন্যতম প্রধান এক জ’ঙ্গির ম্যারাথন জবানবন্দি থেকে ইন্টারোগেশন সেলে বসে এই ভয়ঙ্কর থ্রেডের কথা জানতে পারে মেজর দুর্জয়। টর্চার সেলের ডিম লাইটের নিচে বসা র”ক্তাক্ত সন্ত্রাসী জীবন ভয়ে এটাও স্বীকার করে,
“স্যার, আমাদের মূল অপারেশন চালাইত উমায়ের ভাই। আর উমায়ের ভাইয়ের মাথার ওপর হাত ছিল ফিরোজ ভাইয়ের। আমরা কেবল হুকুম তামিল করছি!”
দুর্জয় টেবিল চাপড়ে হুঙ্কার দিয়ে ওঠলো,,
“হু ইজ দিস ফিরোজ ভাই? তার বর্তমান লোকেশন কোথায়?”
জ’ঙ্গিটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ে,
“আমরা কেউ ওনাকে দেখি নি স্যার! উমায়ের ভাই ছাড়া ওনার চেহারা বা নামটাও কেউ জানে না… উমায়ের ভাই-ই ছিল,ওনার একমাত্র লিংক!”
কথাটি শোনামাত্র দুর্জয়ের শক্ত চোয়াল আরও কঠিন হয়ে উঠল। অতএব সমস্ত ঘটনার অর্থ দাঁড়ায়, উমায়ের অর্থাৎ উজান মারা যাওয়ার সাথে সাথেই ফিরোজ ভাইয়ের মূল অস্তিত্বের শেষ সূত্রটিও হয়তো চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। প্রধান মাস্টারমাইন্ড এখনো অবাধে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে!
হঠাৎ,দুর্জয়ের রগে রগে অগ্নুৎপাত হলো যেন। কোণে পড়ে থাকা ধাতব চাবুকটা এক টানে হাতে তুলে,কোনো কথা না বাড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে পর পর অগণিত নৃশংস আঘাত বসাল লোকটার পিঠে! এই মুহূর্তে দুর্জয়ের হিংস্রতায় নিঃসন্দেহে ভয় থরথরিয়ে কেঁপে উঠবে যেকোনো সাধারণ মানুষ। চাবুকের সশব্দ প্রহারে নোনাধরা দেয়াল কেঁপে উঠল মুহুর্তের তরে। যন্ত্র”ণায় তীব্র আর্ত চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল লোককা।
হঠাৎ চূড়ান্ত কম্পনে নিজের অবস্থানের জানান দিল দূর্জয়ের পকেটে থাকা ফোনটা। সামরিক নিয়মে ডিউটি চলাকালীন নিজের ব্যক্তিগত ফোন বন্ধ রাখার বিধান থাকলেও, পরিবারের করুণ আর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কথা চিন্তা করেই আজ মোবাইলটি সচল রেখেছিল সে।হাত থেকে চাবুকটা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টাস্কফোর্সের অফিসারের হাতে ছুঁড়ে দিয়ে, দ্রুত পায়ে সেল থেকে খানিকটা দূরে চলে এল দুর্জয়।
পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে কায়রার নাম উঠতেই সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে কানে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে কায়রার অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন ও ব্যাকুল কণ্ঠ ভেসে এল,
“মে-মেজর? আপনি কোথায়? ইথিকা আপুর সেন্স এখনো ফেরেনি! ফাহমিদা ম্যামচটজলদি সিটি হাসপাতালে শিফট করতে বলেছেন। আমরা এখন হাসপাতালেই আছি, আপনি প্লিজ একটু জলদি আসুন না!”
ফাহমিদা আহমেদ দুর্জয়দের পারিবারিক চিকিৎসক। অবস্থা জটিল না হলে সমস্ত চিকিৎসা উনি নিজেই দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ, এটি কার অবস্থা প্রকৃত অর্থেই সংকটজনক। দুর্জয়ের চোয়াল শক্ত থাকলেও, বরাবরের ন্যায় নিজ রমনীর সঙ্গে কণ্ঠ কঠোর হলো না,,
“শান্ত হও, কায়রা! হাসপাতালে আর কে কে আছে এখন?”
কায়রা হাঁপাতে হাঁপাতে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“এখানে শুধু আমি, আব্বু আর ঊষা আছি। আম্মু বাড়িতে চাচী আম্মুকে নিয়ে ব্যস্ত, উনার শারীরিক অবস্থাও একদম ভালো না… প্রেসার হাই হয়ে গিয়েছে। আর এদিকে আপুর কন্ডিশনও খুব একটা সুবিধার লাগছে না। আমাদের সাথে কুহুও এসেছে, ও খুব ভয় পেয়ে কাঁদছে। আপনি, একটু জলদি আসলে খুব ভালো হতো!”
সমস্ত তথ্য পেতেই দুর্জয় আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে, গাড়ির চাবির দিকে হাত বাড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল
“ডোন্ট প্যানিক। টেক কেয়ার অফ ইওরসেলফ অ্যান্ড এভরিওয়ান। আই অ্যাম কামিং রাইট নাও!”
গাড়ির গতি সীমা ছাড়িয়ে হাসপাতালের প্রাঙ্গণে এসে দূর্জয়ের গাড়ি। দ্রুত পায়ে জরুরি বিভাগের সিঁড়ি ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতেই করিডোরে কায়রাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল ও। কাছে গিয়ে চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে শুধাল,
“কুহু কোথায়?”
কায়রা ক্লান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“ও খুব কাঁদছিল, তাই আব্বু ওকে একটু শান্ত করার জন্য বাইরে নিয়ে গিয়েছেন জুস কিনে দিতে।”
“আর ঊষা?”
“ইথিকা আপুর সেন্স ফিরেছে তো, তাই ঊষাকে আপুর কেবিনে বসিয়ে রেখে এসেছি। আপনি কল দিলেন বলেই আমি বাইরে এলাম।”
দুর্জয় পকেট থেকে হাত বের করে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“তাহলে আমি আগে কেবিনে…”
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই কায়রা তাড়া দিয়ে বলে উঠল,
“না, তার আগে ডক্টর আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন। উনার চেম্বারে যেতে বলেছেন আমাদের। চলুন প্লিজ।”
দুর্জয় আর কথা বাড়াল না, ধীরপায়ে কায়রার সাথে ডক্টর ঘোষের চেম্বারের দিকে পা বাড়াল। দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই ডক্টর ঘোষ উনাদের দিকে চেয়ে চশমাটা নাকের ওপর থেকে সামান্য নামিয়ে বললেন,
“আরে, আসুন, বসুন।”
ডক্টর নিজের চেয়ারে সোজা হয়ে বসে, দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “দুর্জয়, তোমাকে তো আমি বহু বছর ধরে চিনি। তোমার বাবার সাথেও আমার ভালো সম্পর্ক। কিন্তু আই থিংক, এই মোমেন্টে পুরো খবরটা তোমাদের ফ্যামিলির আর কাউকে জানানো ঠিক হবে না।”
কায়রা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধাল,,
“কী হয়েছে ডক্টর? ইথিকা আপুর কী হয়েছে বলবেন তো?”
“দেখুন, আসলে কিছুই করার নেই। তোমরা যদি আরেকটু আগে ডায়াগনোসিস করাতে, হয়তো চেষ্টা করার একটা সুযোগ থাকত…”
অচেনা উদ্বেগে কায়রার হাত দুটো মৃগিরোগীর ন্যায় কাঁপছে। অবচেতনভাবেই ও দুর্জয়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। দুর্জয় এক মুহূর্ত কায়রার থরথর করে কাঁপা হাতটার দিকে তাকিয়ে নিজের অন্য হাতটি দিয়ে আলতো করে কায়রার হাতের ওপর বুলাতে বুলাতে শান্ত গলায় বলল,
“কাম ডাউন।”
কায়রার উদ্বিগ্নতায় দূর্জয় ডক্টরের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“আপনি সরাসরি বলুন ডক্টর। উই আর স্ট্রং এনাফ টু হ্যান্ডেল দিস।”
ডক্টর টেবিলের ওপর রাখা একটা ডার্ক ফোল্ডারের ফাইল এগিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন,
“ইথিকার ব্লাড ক্যান্সার… একদম লাস্ট স্টেজ। ব্লাড কাউন্ট যেভাবে ড্রপ করেছে, উনার হাতে বড়জোর সপ্তাহখানেক সময় আছে। তার চেয়ে কমও হতে পারে। এরপর কী হবে, সেটা অনলি গড নোজ। যদি কোনো মিরাকেল ঘটে তবে আলাদা কথা, আদারওয়াইজ সুস্থ হওয়ার পসিবিলিটি একদম জিরো পার্সেন্ট।”
কথাটা শোনামাত্র কায়রার মাথার ওপর যেন এক এক করে সমস্ত আকাশ ভেঙে পড়ল। চোখের সামনে সবকিছু এক লহমায় ধোঁয়াটে হয়ে এল, মুহূর্তেই স্তব্ধ-বাক্যহারা হয়ে গেল ও। বুকের ভেতর বাতাস চলাচলের পথটুকুও আটকে গিয়েছে যেন। ধাক্কা দুর্জয় নিজেও খেয়েছে। তবে কঠোর ব্যক্তিত্বে তা প্রকাশ করা মানা। আপাতত নিজের আবেগী রমণীকে সামলাতে হবে। দুর্জয় হাতের স্পর্শ শিথিল করে কায়রার কাঁধে নিজের হাত রেখে, আলতো করে ওকে নিজের দিকে কিছুটা আগলে নিয়ে, কাঁধে হাত ঘষে তাকে আরেকটু শক্ত করে ধরে নীচু কণ্ঠে বলল,
“বি স্ট্রং, মাই লাভ… সামলাও নিজেকে।”
ডক্টর নিস্তব্ধতায় পুনরায় বললেন
“আই অ্যাম রিয়েলি স্যরি। রিপোর্টটা হাতে পেয়েই আমি সরাসরি তোমাকে নক করেছি দুর্জয়। পেশেন্টের মনের ওপর প্রভাব পড়বে ভেবে ওনাকে বা ফ্যামিলির বয়স্কদের এই মুহূর্তে জানানো ঠিক মনে করিনি। সত্যি বলতে, পেশেন্টকে এখন যতোটা পারো হ্যাপি রাখার চেষ্টা করো। উনার পছন্দের কাজগুলো করতে দাও, কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করো। সময়টা বড্ড কম… চোখের পলকেই চলে যাবে।”
হতভম্ব কায়রা বাকশক্তি খু্ঁইয়েছে। নিষ্পাপ কুহুর কথা মনে পড়তেই, অশ্রুরা বাঁধ ভাঙছে। ইথিকা সার্বক্ষণিক নিজের মেয়ের সঙ্গেই পড়ে থাকতো। হয়তো প্রথম মাতৃত্বের সমস্ত টুকু অনুভব করতে। কিন্তু তার স্থায়িত্ব এত কম? মেয়েটার বাবা খারাপ ছিলো ঠিকই, কিন্তু হচ্ছে একজন আদর্শ বাবা ছিলো নিঃসন্দেহে। মেয়ের প্রতি যত্ন কম ছিল না তারও। অথচ, কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে মেয়েটা বাবা হারা হয়েছে। এখন প্রাণপ্রিয় মা কেউ হারাতে চলেছে। ছোট্ট হৃদয়টা এত বড় সত্যের বোঝা বহন করবে কিভাবে?
চেম্বার থেকে বেরিয়েই ডুকরে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। সঙ্গে সঙ্গে দুর্জয় দুই বাহুতে আঁকড়ে, বক্ষে লুকালো ওকে। কান্নার তোড়ে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে কায়রার ক্ষীণ কায়া। দুর্জয় যথাসাধ্য শক্ত করে ধরল ওকে।
“আরে পাগলি,এভাবে পাবলিক প্লেসে কান্নাকাটি কে করে? একটু পরেই অসুস্থ হয়ে পড়বে তো! তোমার মাইগ্রেনের প্রবলেম আছে না? কান্নাকাটি করলে কি আর সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, বলো?”
কায়রা অশ্রু সিক্ত নয়নে দুর্জয়ের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,,
“একটা ছোট্ট বাচ্চা বাবা মা ছাড়া তো একদম একা হয়ে যাবে! এই বয়সে ওদের তো বাবা মার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়, বলুন? ও একা হয়ে যাবে তো!”
দুর্জয় আলতো করে কায়রার চোখের জলটুকু আঙুলের ডগায় মুছিয়ে,চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরে চোখে চোখ রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“ও একা কেন হতে যাবে? আমরা আছি না? আমি আছি, তুমি আছ।”
কায়রা জিজ্ঞাস্য দৃষ্টি মেলতেই,দূর্জয় শুধালো,,
“কেন? পারবে না কুহুকে একদম নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতে? নিজের ছায়ায় রেখে বড় করতে?”
কায়রা কোনোরূপ দ্বিমত না করে তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল।
“পারব… অবশ্যই পারব!”
দুর্জয় হালকা হেসে,কায়রার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো,
“তাহলে প্রবলেম কোথায়? শুধু সবসময় এতোটুকু মনে রাখবে, কুহু আমাদের প্রথম সন্তান!”
থমথমে চারপাশ, অদেখা আশঙ্কায় ভারাক্রান্ত আহসান কুঞ্জের বাতাসটাও। দুর্জয় মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে, হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে দেখে সত্যটা জানিয়ে দিয়েছে ও। সময়ের পরিমাণ খুবই কম; তাই এখন আর লুকোচুরির কিছু খুঁজে পায়নি ও। শোকে স্তব্ধ পরিবারকে সামলে, ও স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে যাতে, ইথিকার সামনে যেন কেউ একফোঁটা চোখের পানি না ফেলে, কোনো করুণার ছাপ যেন কারও ব্যবহারে ফুটে না ওঠে। জীবনের যে ক’টাদিন বাকি আছে, ওকে যেন কেবল হাসিখুশি আর পরম ভালোবাসায় ঘিরে রাখার সঙ্গে ছোট কুহুকে সারাক্ষণ ওর কোলঘেঁষে রাখা হয়।
ইথিকার বিছানার একপাশে বসে আতিকা বেগম পরম মমতায় মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, পাশে চুপচাপ বসে উষা আর কায়রা। প্রতিটা মুহূর্তেই তাদের ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা, এক অদ্ভুত আতিশয্য। এই অস্বাভাবিক স্নেহ-আদরের হঠাৎ ঢল ইথিকার নজর এড়াল না। অসুস্থ হলেও বুদ্ধি বা অনুভূতির ধার তো আর কমে যায়নি!
ইথিকা ক্ষীণ চোখে কায়রা আর আতিকা বেগমের দিকে তাকাল। শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটে সামান্য হাসি ফুটিয়ে ধীর গলায় বলল,
“তোমাদের সবার কী হয়েছে বলো তো? হঠাৎ আমাকে নিয়ে সবাই এতটা কনসার্নড কেন? এর আগেও তো অসুস্থ হয়েছি… কিন্তু আজকের অ্যাটমোস্ফিয়ারটা এত ডিফরেন্ট কেন?”
আতিকা বেগম বুকচাপা দীর্ঘশ্বাস চেপে তড়িঘড়ি বললেন,
“কীসের আলাদা রে মা? তোমার শরীর খারাপ,মাত্র হাসপাতাল থেকে ফিরলে, একটু যত্নআত্তি করব না? বাজে বোকো না তো!”
ইথিকা হালকা মাথা নাড়ল। অতঃপর কায়রার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“তুমি অন্তত মিথ্যা বোলো না, জুনিয়র। আম্মুর চোখের কোণে পানি, উষাও আমার দিকে তাকাতে পারছে না… আমার কি খুব মরণব্যাধি কিছু হয়েছে? আমি কি খুব তাড়াতাড়ি মা’রা যাচ্ছি?”
বাক্যদ্বয় কর্ণগোচর হতেই ,কায়রার বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল। ও তড়িঘড়ি করে ইথিকার হাত দুটো চেপে ধরে বলল,
“কী সব আজেবাজে কথা বলছেন, আপু! ডক্টর বলেছেন জাস্ট সিভিয়ার অ্যানিমিয়া আর উইকনেস। মেডিসিন নিলে আর প্রপার রেস্টে থাকলেই একদম ঠিক হয়ে যাবে।”
কায়রার ভুজুম ভাজুম মিথ্যে ধরা পড়লো সঙ্গে সঙ্গে। ইথিকা স্পষ্ট কন্ঠে বলল,,
“নো কায়রা, ডোন্ট লাই টু মি! আমার নিজের শরীর, আমি ফিল করতে পারছি ভেতরটা কতটা ক্ষয়ে যাচ্ছে। যদি সত্যি হাতে খুব কম সময় থাকে, তবে আমাকে বলে দাও না প্লিজ… আমার মেয়েটার সাথে আমি একটু বেশি সময় কাটাতে চাই। সত্যিটা জানলে আমি নিজেকে প্রিপেয়ার করতে পারব। প্লিজ, হাইড কোরো না!”
ইথিকার উন্মাদনায় কক্ষ জুড়ে ভয়াল নিস্তব্ধতা নামলো। আতিকা বেগম বরাবরই বড্ড আবেগপ্রবণ। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে, মুখে আঁচল চেপে জলদি প্রস্থান করলেন উনি।উষা দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
কায়রা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। অতঃপর ইথিকার মিনতিভরা আকুল নেত্রে চেয়ে আর মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারল না ও। এমনিতেই যত জলদি সম্ভব ইথিকাকে সত্যিটা জানিয়ে দেওয়াই উত্তম। ও চোখের বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর প্লাবন সামলে, অতি কষ্টে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“আপু… ব্লাড ক্যান্সার। একদম লাস্ট স্টেজ। ডক্টররা… ডক্টররা আমাদের হাতে আর একদম সময় দেননি,হয়তো একসপ্তাহ!”
কিন্তু.. পরমুহূর্তের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সকলকে অবাক করে কোনোরূপ আর্তচিৎকার ছাড়া, চূড়ান্ত সত্যি টাকে অবলীলায় মেনে নিয়ে, সিলিং এ তাকিয়ে এক প্রলম্বিত শ্বাস টানলো ও। সদ্য কাঁধ থেকে বিশাল বোঝাটা নামিয়েছে যেনো। কিছুক্ষণ বাদে,ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে কায়রার গালটা ছুঁয়ে মৃদু হেসে বলল,
“সময় কম কোথায়? এক সপ্তাহ অনেকটা সময়! বেঁচে থাকার ইচ্ছে তো, অনেকক্ষণ হলো ম’রে গিয়েছে আমার! শুধু বাচ্চাটার মুখের দিকে চেয়েছিলাম, যাক… অন্তত শেষ দিনগুলোতে আমার মেয়েটাকে মন ভরে দেখে যাওয়ার সুযোগটুকু তো আল্লাহ দিলেন। থ্যাংক ইউ কায়রা, আমাকে সত্যটা জানানোর জন্য।”
ঊষা হাউমাউ করে কেঁদে জড়িয়ে ধরল ইথিকাকে। ইথিকা বরাবরের ন্যায় মৃদু হাসলো। তবে আজকে হাসিটা অসম্পূর্ণ, কোথাও একটা মলিনতা আছেই।ঊষার মাথায় হাত বুলিয়ে ও বলল,,
“অন্তত তোর বিয়েতে প্রচুর মজা করতে চেয়েছিলাম্।দেখ, আল্লাহ আমাকে সেদিন টাও দেখতে দিল না। কিন্তু ব্যাপার না, আমার মেয়েটাকে আগলে রাখিস! আমার পর তো তোরাই আছিস ওর!”
“আচ্ছা মাম্মা, পাপা কি আর কক্ষনো ফিরবে না?”
নিশুতি নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চরাচর। গভীর সুপ্তিতে মগ্ন ধরিত্রী। অথচ ইথিকার কোলে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা, চড়ুইছানা এখনো জাগ্রত। একের পর এক প্রশ্ন করে চলেছে সে। ইথিকাও ধীরেসুস্থে প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর করছে। হঠাৎ মেয়ের এমন প্রশ্নের থমকে গেলো ও। জানলা দিয়ে দূর অন্তরীক্ষে চেয়ে,আনমনে বলল,,
“স্টার হয়ে গেলে মানুষ আর ফিরতে পারে না মাম্মাম!”
“তাহলে,পাপা স্টার হলো কেনো?”
ইথিকা মেয়ের মাথায় হাত বুলায়,,
“সেটা তো আমি জানি না মাম্মাম।”
কুহু জেদ কষে বলল,,
“তাহলে পাপাকে বলো, ফিরে আসতে! আর স্টার হওয়া লাগবে না।”
“একবার স্টার হলে কেউ আর ফিরতে পারেনা মাম্মাম!”
মায়ের মলিন কন্ঠে কুহু চুপ রইলো। হঠাৎ, কি জানি ভেবে বলল,,
“তুমিও স্টার হয়ে যাবে না তো, মাম্মা?”
ইথিকা হতভম্ব। এ প্রশ্নের জবাব কোথায়? কি বলবে ও? নিশ্চল পাথরের ন্যায় স্থবির হয়ে রইল ক্ষণকাল। অতঃপর, মেয়ের ছোট্ট কপালে চুমু এঁকে, মলিন হেসে বলল,,
“যে কেউ যখন তখন স্টার হয়ে যেতে পারে মাম্মাম! এটা বলা যায় না!”
কুহু এবার ভীতু হলো। শক্ত করে ইথিকাকে জাপ্টে ধরে বলল,,
“কিন্তু,তুমিও স্টার হয়ে গেলে আমি কার কাছে থাকবো?মাম্মা বলবো কাকে? না না, কোথাও যাচ্ছো না তুমি। তোমাকে শক্ত করে ধরে রাখবো আমি!”
মাতৃহৃদয়ে বড্ড উতলা। সন্তানের সামান্যতম কথাতেই অশ্রু জলে ভাসে সে।আর সেখানে মৃত্যু এত সন্নিকটে জেনেও, সন্তানের মুখ থেকে শুনছে সে তাকে ছাড়বে না। এরপর, কোনো মা স্বাভাবিক থাকতে পারে? ডুকরে কেঁদে উঠলো ইথিকা। কুহু জীবনে প্রথম মাকে কাঁদতে দেখলো হয়তো। ভয়ে ভয়ে মায়ের মুখে চেয়ে বললো,,
“তোমার কি কষ্ট হচ্ছে, মাম্মা? আমি কি তোমাকে ছেঁড়ে দিব?”
ইথিকা তৎক্ষণাৎ মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, বাষ্প রুদ্ধ বলল,,
“না,মাম্মাম! তুমি শক্ত করে ধরে রাখো আমায়। কখনো ছেড়ো না কিন্তু!”
অতিক্রান্ত দিনগুলোকে পারলে মুঠো বন্দি করে ফেলতো কায়রা। ভারাক্রান্ত হৃদয়, গুমড়ে গুমড়ে মরছে ও। ইথিকাকে চোখের আড়াল হতে দেয় না পরিবারের কেউ। দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে ওর। মামা বাড়ির লোকজন এসে দেখে গিয়েছে সেদিন। গত বছর মায়ের মৃত্যুর পর আপাতত আপনজনগুলোকে হারিয়ে ফেলেছে ও। শশুর বাড়ির লোকজনই শেষ সম্বল। মেয়েটা শয্যাশায়ী হয়েছে দু’দিন হলো। রুগ্ন দেহ, ভেঙে পড়া চোয়ালে মেয়েটাকে শতবর্ষী লাগে ইদানিং।
ইথিকাকে গোসল করিয়ে, শিউরে বসে ছিল কায়রা। ভার্সিটি থেকে দিন পনেরোর ছুটি নিয়েছে ও। প্রায়দিন বন্ধু মহল এসে দেখা করে যায়। পরিবার থেকে ও লোকজন আসে একদিন অন্তর। দুপুরের পর থেকে ইথিকা চৈতন্যহীন অবস্থায় পড়ে আছে। ওকে একা রাখার সাহস হচ্ছে না কারো। কায়রা মেডিসিন হাতে নিয়ে ইথিকার দিকে পানি এগিয়ে দিতে গেলেই ইথিকা বলল,,
“এটা নিয়ে আর কি হবে জুনিয়র? আমি মনে হয় আজকের রাতটাও দেখতে পারবো না। আমার মেয়েটাকে একটু এনে দিবে?”
কায়রা বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলো,,
“কিচ্ছু হবে না আপনার আপু! আমরা-আমরা আছি তো!”
ইথিকা বদ্ধ চোখে মলিন হাসলো,,
“মিথ্যা আশা ছেড়ে দিয়েছি আমি। মরণ মুখে এসে এগুলো শুনতে বড্ড খারাপ লাগে।জানো?”
কায়রা কিছু বলার আগেই ইথিকা বলল,,“রোজা রেখেছো?”
কায়রা মাথা নোয়ালো,ইথিকা সামান্য চোখ খুলে বলল,,
“তুই করেই বলি, কেমন? তোকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিন বড্ড আপন লেগেছিল। তারপর চাচীআম্মু যখন তোকে দুর্জয় ভাইয়ের জন্য পছন্দ করলো, আমি মনে হয় সবচেয়ে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু দেখ, আমার খুশিটা আল্লাহ দীর্ঘস্থায়ী করলো না! কখনো আমার উপর নারাজ হলে ক্ষমা করে দিস, বনু। পারলে আমার মেয়েটাকে আগলে রাখিস! ওর তো আর কেউ নাই।”
ইথিকার প্রত্যেকটা কথা কায়রার বুকে শেলসম বিঁধলো।নিজের অজান্তেই চক্ষু কার্নিশ বেয়ে টুপটাপ অশ্রু ধারা গড়িয়ে পড়ল ওর। ইথিকার শীর্ণ হাত দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে ব্যাকুল কণ্ঠে ও বলল,
“এভাবে বলবেন না, প্লিজ আপু! আপনি কিচ্ছু চিন্তা করবেন না। কুহু আপনারই মেয়ে, আর ও সারাজীবন আমারও নিজের সন্তান হয়েই থাকবে। আমি কথা দিচ্ছি আপু, আমার জীবনের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে ওকে আমি আগলে রাখব। কখনো ওর চোখে একফোঁটা জলের আঁচ লাগতে দেব না, নিজের ছায়ায় ঢেকে রাখব ওকে। আপনি একদম নিশ্চিন্ত থাকুন।”
ইথিকা চোখ দুটো আধবোজা করে কায়রার কথার প্রতিটা শব্দ প্রচন্ড মনোযোগ দিয়ে শুনে, নিষ্প্রভ চোখে,দুর্বল হাতে কায়রার আঙুলগুলো একটু চেপে ধরার চেষ্টা করে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
“তোর ওপর আমার পূর্ণ ভরসা আছে, বনু… আমি জানি তোদের ভালোবাসায় আমার মেয়ে কখনো এতিম অনুভব করবে না। আমার মনটা বড্ড খালি খালি লাগছে রে… কুহুকে একবার একটু আমার কাছে এনে দিবি? আমার পাখিটাকে একটু কোলঘেঁষে নিয়ে শুই… বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে রে ওকে।”
“আমি এখনই ডেকে নিয়ে আসছি আপু, আপনি একদম নড়াচড়া করবেন না!”
কায়রা তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়াতেই,ইথিকা মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিল। কায়রা দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল কুহুকে নিয়ে আসার জন্য। ও তখন দু’ কদম এগিয়েছে বোধ হয়। হঠাৎ,ইথিকার বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড মোচড় দিয়ে উঠল। ফুসফুস দুটো যেন অক্সিজেনের অভাবে ছটফট করে উঠল এক নিমেষে।
শ্বাসনালী রুদ্ধ হয়ে আসছে, দম আটকে আসার উপক্রম। ইথিকার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, আপ্রাণ চেষ্টা করেও এক ফোঁটা বাতাস বুক ভরে টেনে নিতে পারছিল না ও। কায়রা তখন দরজার হাতলে হাত দিয়েছে, পিঠ ইথিকার দিকে। ইথিকা কাঁপতে থাকা ডান হাতটা শূন্যে বাড়িয়ে দিল কায়রাকে ডাকার জন্য;ঠোঁট দুটো হাঁ করে ব্যাকুল হয়ে বলতে চাইল, ‘জুনিয়র…’, কিন্তু কণ্ঠনালী দিয়ে কোনো শব্দ সরল না। কেবল এক হাহাকারঘেরা নিঃশব্দ আর্তনাদ ফুটে উঠল ওর যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে।
হাতটা কয়েক মুহূর্ত বাতাসে ভেসে,সশব্দে বিছানার ওপর ঢলে পড়ল। পরমুহূর্তেই, ওর অনাহারক্লিষ্ট, শীর্ণ নাসারন্ধ্র বেয়ে হুহু করে নির্গত হতে শুরু করল ঘন, গাঢ় লালতরল। নাসারন্ধ্র থেকে গড়িয়ে পড়া র’ক্তের ধারা ,ওর থুতনি, গাল বেয়ে ধবধবে সাদা বালিশটাকে র,’ক্তের বন্যায় ভিজিয়ে দিলো মুহূর্তেই। দেহটা সামান্য একটু শিউরে উঠল ওর, চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্থির আর অসীম শূন্যতায় বিলীন হয়ে গেল সিলিংয়ের পানে। এক পরম মুক্তি আর অন্তহীন নীরবতায় ঢলে পড়ল তার নিস্পন্দ দেহটা। নিঃশ্বাস থেমে গেল চিরতরে।
দরজার বাইরে পা রাখতেই ঊষার দেখা পেল কায়রা, কোলজুড়ে নিষ্পাপ কুহু। ছোট্ট মেয়েটি তখনও হাসিমুখে ঊষার গলা জড়িয়ে ধরে নিজের মতো বকবক করছিল। কায়রা বুকচাপা কষ্ট সামলে মুখে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“ঊষা, আপু কুহুকে দেখতে চাইল।”
ঊষা আর কায়রা কুহুকে মাঝখানে রেখে ইথিকার রুমে ঢুকলো। তবে পরক্ষণে,বিছানার দিকে নজর পড়তেই কায়রা ও ঊষার সমস্ত অস্তিত্ব স্তব্ধ হয়ে গেল এক লহমায়।ইথিকার নিস্পন্দ দেহটা বালিশের ওপর এলিয়ে পড়ে আছে। ধবধবে সাদা বালিশের বড় একটা অংশ গাঢ় লাল র”ক্তে ভেসে যাচ্ছে, নাসারন্ধ্র বেয়ে গড়িয়ে পড়া তাজা র’ক্ত থুতনি বেয়ে নেমে এসেছে বুকে। চোখের স্থির দৃষ্টি সিলিংয়ের শূন্যতায় আটকে রয়েছে চিরতরে।
ঊষার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এল। চরম আতঙ্কে বিস্ফোরিত চোখে ইথিকার রক্তে ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠতে যাচ্ছিল ও। কিন্তু কায়রা ক্ষিপ্র গতিতে নিজের এক হাত দিয়ে ঊষার মুখ চেপে ধরল, অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরল কুহুর চোখের দৃষ্টি। কায়রার নিজের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল ঝরছে, তবুও সে একবিন্দু শব্দ ফুটতে দিল না ঠোঁটে। ঊষার চোখের দিকে তাকিয়ে কায়রা অত্যন্ত অনুনয়ভরে মাথা নাড়ল,,
“কুহুকে বুঝতে দিও না, প্লিজ!”
কুহু ছটফট করে উঠে কায়রার হাতটা সরানোর চেষ্টা করে অবুঝ গলায় বলে উঠল,
“ মামুণি! চোখ ঢাকছ কেন? আমি তো মাম্মার কাছে যাব! মাম্মা ঘুমাচ্ছে?”
কায়রার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। ও রুদ্ধশ্বাসে অতি কষ্টে জলভেজা কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ সোনা… মাম্মা বড্ড ক্লান্ত তো, তাই খুব গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমি এখন পিপির সাথে বাইরে গিয়ে একটু খেলা করো, কেমন?”
কুহু নাছোড়বান্দার মতো ইথিকার দিকে হাত বাড়িয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিল,
“না! আমি মাম্মার কাছে যাব! মাম্মা কেন কথা বলছে না? মাম্মা ওঠো না!”
ঊষা ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে কুহুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে প্রায় জোরপূর্বক রুমের বাইরে নিয়ে গেল। কুহুর বুকফাটা অবুঝ আকুতি দরজার ওপাশ থেকে মিলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই কায়রার হাত থেকে কুহুর জুসের বোতলটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
পরমুহূর্তেই কায়রা হাঁটু মুড়ে বসে ধড়ফড় করে ইথিকার হাতটা স্পর্শ করল! ওর মনে হলো জীবনে প্রথম এত শীতল কিছু স্পর্শ করছে ও।
“আপু! আপু কথা বলুন না প্লিজ!”
ওর গগনবিদারী কান্নার শব্দে মুহূর্তেই কক্ষে ছুটে এলেন আতিকা বেগম, আর সাজেদা চৌধুরী। ইকবাল আহসান,ইমতিয়াজ আহসান, দুর্জয়। কক্ষের বাইরে দাঁড়ালেন। ভেতরে পা রাখতেই র’ক্তে ভেজা ইথিকার নিস্পন্দ দেহ দেখে আতিকা বেগম এক বিকট চিৎকার দিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। সাজেদা চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এসেহ ধীরহাতে ইথিকার মেলানো অক্ষিপট দুটো চিরতরে বুজিয়ে দিল।
পুরো ঘরজুড়ে তখন স্বজন হারানোর হৃদয়বিদারক আহাজারি। ওদের কান্নাকাটিতে পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাট থেকে ভাড়াটিয়ারা ছুটে এসেছেন।কায়রা ওলট-পালট পদক্ষেপে কক্ষ থেকে প্রস্থান করল। বাইরে এসে ছলছল নয়নে দুর্জয়ের দিকে চেয়েই জ্ঞান হারালো মেয়েটা। দূর্জয় দ্রুত পদক্ষেপে বক্ষদেশে আকড়ালো ও মেয়েটাকে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রি ঘনীভূত। ইথিকার দাফন-কাফনের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে গোরস্থান থেকে কিছুক্ষণ আগেই ঘরে ফিরেছেন পুরুষেরা। পার্শ্ববর্তী কক্ষে ঊষার কোলে, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সদ্য মাতৃহীনা ছোট্ট কুহু। এদিকে নিজেদের কক্ষের বিছানায় শুয়ে ছিল কায়রা। জ্ঞান ফিরেছে তবে শারীরিক দুর্বলতায় চোখ মেলতে পারছে না, বিধায় ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল ওকে। ওর শিওরে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পায়রা।
আকস্মিক ঘুম ভাঙতেই, কায়রা চোখ মেলে পায়রাকে পাশে দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক ঝটকায় উঠে বসে বোনকে দু’বাহুতে শক্ত করে জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল ও। পায়রা পরম মমতায় বোনের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে শান্ত গলায় বলল,
“শান্ত হ কায়ু, প্লিজ… কান্নাকাটি করিস না আর। নিজেকে সামলা এবার, সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”
কায়রা জলভেজা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“কী করে সামলাব আপু? কুহুর কী হবে বলো তো? ও তো বড্ড ছোট! কী করে মেনে নেবে এত বড় সত্যিটা? ওর মুখটার দিকে তাকালেই আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে!”
ওদের কথোপকথনের মাঝেই, দরজায় মৃদু শব্দ পড়লো। পায়রা বোনকে বুকে রেখেই বলল আসুন। মুহূর্তেই ভেতরে প্রবেশ করল শুভ্র পাঞ্জাবি পরিহিত দুর্জয়। মাথার টুপিটা খুলে হাতে রেখেছে। ক্লান্তি স্পষ্ট অবয়বে।ওকে ভেতরে ঢুকতে দেখে পায়রা আলতো করে কায়রার কাঁধ ছুঁয়ে উঠে দাঁড়াল। বোনের মাথায় একটা শেষ হাত বুলিয়ে ধীরপায়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল ও।
ঘর খালি হতেই দুর্জয় ধীর পায়ে এসে কায়রার বিছানার পাশে বসল। ওর উপস্থিতিতে কায়রা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। বিছানা ছেড়ে একপ্রকার লাফিয়ে গিয়ে দুর্জয়ের প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে, পাঞ্জাবির কাপড় শক্ত করে চেপে ধরল। কান্নার তোড়ে ক্ষীণ কায়া কেঁপে উঠতে লাগলো বারংবার।
দুর্জয় এক হাত দিয়ে কায়রার কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে বুকের সাথে আগলে নিল, অন্য হাতের আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিল ওর এলোমেলো চুলের ভিড়ে। অতঃপর ওর মাথায় পরম মমতায় ঠোঁট ছুঁইয়ে ধীর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বি স্ট্রং, মাই ম্যাজেস্টি… নিজেকে একদম ভেঙে পড়তে দিও না।”
কায়রা দুর্জয়ের বুকে মুখ লুকিয়েই রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“আমি পারছি না মেজর… আমি একদম নিজেকে সামলাতে পারছি না! আমার চোখের সামনে আপু এভাবে চলে গেল, আর কুহু.. আমি ওখান থেকে না গেলে হয়তো আপুর কিছু হতো না!”
দুর্জয় কায়রার চিবুক ধরে মুখটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। নিজের অটল আর গভীর দৃষ্টি কায়রার জলছলছল চোখের ওপর নিবদ্ধ করে খুব শান্ত স্বরে বলল,
“এত সাহস করে একজন মেজরের ওয়াইফ হয়েছ, সামান্য ধাক্কাতেই এতটা দুর্বল হলে চলবে? তুমি ওখান থেকে না আসলেও আল্লাহর জিনিস আল্লাহ নিয়ে যেত। আর আমরা তো ইথিকাকে কথা দিয়েছি, কায়রা। কান্নাকাটি করে নিজেকে শেষ করে ফেললে কুহুকে আগলে রাখবে কে?”
দুর্জয়ের এই অটল ভরসা, শান্ত কণ্ঠে যেন কায়রার ভেতরের উন্মাদ ঝোড়ো হাওয়াটা খানিকটা থিতু হয়ে এল। সে বাষ্পরুদ্ধ গলায় শুধাল,
“এই পরিস্থিতিতে কেউ নিজেকে কিভাবে সামলে রাখা যায়?”
দুর্জয় আলতো করে নিজের বৃদ্ধাঙ্কুষ্ঠ দ্বারা কায়রার গাল বেয়ে নেমে আসা শেষ অশ্রুকণা মুছে দিল। অতঃপর মৃদু হেসে কায়রার কপালে আবার নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“সব কষ্ট সবসময় প্রকাশ করতে হয় না, মাই লাভ। কিছু কষ্ট বুকের ভেতর চেপে রেখে সামনের দায়িত্ব সামলাতে হয়। কুহু এখন সম্পূর্ণ আমাদের দায়িত্ব। ও এখন থেকে আমাদের মেয়ে, আমাদের প্রথম সন্তান। তুমি আর আমি মিলে ওকে এমনভাবে বড় করব যেন ও কখনো অনুশোচনা না করে।”
কায়রা দুর্জয়ের কথার মাঝে এক অদ্ভুত আশ্রয় আর শক্তি খুঁজে পেল। ও ধীরে ধীরে দুর্জয়ের চওড়া বুকে নিজের মাথাটা আবার এলিয়ে দিয়ে হাত দুটো ওর পিঠের চারপাশে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বিষাদঘেরা কক্ষে দুর্জয়ের বুকের স্পন্দন শুনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টায় ভেজা গলায় বিড়বিড়ালো,
“আই প্রমিস, আমি আর দুর্বল হব না। উই উইল টেক কেয়ার অফ হার টুগেদার।”
রাত বাড়তেই কুহু গোঁ ধরেছে মায়ের কাছে যাবে। ছোট্ট মেয়ের আকুল আবেদন। চিৎকার করে ক্রন্দনরত ওকে সামলেটে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারের প্রত্যেকে।শেষমেষ দুর্জয়ের আদরে কান্নার মাত্রা কমলো ওর।তবে,এখনো একনাগাড়ে ফুঁপিয়ে চলেছে ও। দুর্জয় ওকে বুকে আগলে,চাদরের উষ্ণতায় জড়িয়ে ও বলল,,
“এভাবে কেউ কান্না করে মাম্মা!”
কুহু ঠোঁট ফুলিয়ে, ফুপাতে ফুপাতে বলল,,
“আমি মাম্মার কাছে যাবো।তোমরা নিয়ে যাচ্ছ না কেনো?”
দুর্জয় শান্ত স্বরে বলল,,
“তোমার মাম্মাও আজ একটু পাপা কাছে ঘুরতে গিয়েছে,আম্মা।”
কুহু ভীত কণ্ঠে বলল,,
“মাম্মাও স্টার হয়ে গিছে?”
“হ্যাঁ,মা।”
“কিন্তু,কেনো গেলো?আমি তো সেদিন বারণ করলাম!
অভিসৃতি পর্ব ২৭
“আল্লাহ নিয়ে গেছে মা!”
“আল্লাহ শুধু আমার মাম্মা-পাপাকেই স্টার বানিয়ে দিচ্ছে কেনো, চাচাই?”
এই প্রথম ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্বের পুরুষের চোয়াল কাপলো কিঞ্চিৎ। তাও,এমন এক বাচ্চার ছোট্ট প্রশ্নে।এই প্রথম নিজ মস্তিষ্ক শূন্য ঠাওর হয় ওর। উত্তর পাবে কোথায়?এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া আদেও সম্ভব?
