আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১১
কায়নাত খান কবিতা
” যেখানে তাকে দেখার অধিকার কাউকে দেইনি, সেখানে কেউ একজন তাকে ভালো বেসে ফেললো! Interesting! ”
বিশাল স্ক্রিনের সিসিটিভির ফুটেজের সামনে দাড়িয়ে ভিডিও তে চলতে থাকা অরিনের গতিবিধির উপরে লক্ষ্য করে কথা গুলো বলতে থাকে কিংশুক!! খান ম্যানশনে গুনে গুনে ২৪৬ টি ক্যামেরা লাগানো! পুরো ম্যানশন থেকে শুরু করে বাইরের গার্ডেন, রাস্তা এমন কী অরিনের বেলকনি দিয়ে যতদূর চোখে দেখা সম্ভব পুরোটাই সিসিটিভি দ্বারা আবদ্ধ! অরিন যেদিকে তাকায়, কিংশুকের সিসিটিভির ফুটেজ ও সেদিকে অন হয়ে যায়! ঠিক কোন জিনিসটা অরিন দেখছে সেটা দেখার জন্য!!
” তোর দৃষ্টিতে পড়া প্রতিটি জিনিসকে আমি ঘৃণা করি জান!””
হাতে থাকা ওয়াইনের গ্লাসটি টি-টেবিলে রেখে একদম ফুটেজের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে পড়ে কিংশুক! স্ক্রিনে থাকা অরিনের দৃষ্টি অন্য কিছুর উপরে রয়েছে! তাকে বেশ খুশি ও দেখাচ্ছে!! যেটা একদমই পছন্দ হচ্ছে না কিংশুকের!!
” তোর দৃষ্টি শুধু আমার উপরে থাকবে! তুই কেনো বাইরের জিনিস দেখবি?”
হাত মুষ্টি শক্ত করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে কিংশুক! এক মাস আগে সে অরিনকে বাংলাদেশে রেখে তো এসেছিল! কিন্তু নিজের গন্ডির ভিতরে! ঠিক জেলে থাকা কয়েদি যেভাবে থাকে! কিন্তু অরিনের জানা ছিলো না কিছু! তার অজ্ঞানে কেউ যে তাকে নজরে নজরে রেখে এটা একদমই জানা ছিলো না অরিনের!
এই একমাসে কিংশুকের অবসেশন এতোটাই বেড়ে যায় যে, অরিনের পছন্দের প্রতিটি জিনিসের উপরে তার হিংসা হতে থাকে! অরিন পছন্দ করবে তাকে! অন্য কাউকে নয়! এমন কী কোনো বস্তুকে ও নয়! খুব কষ্ট করে নিজেকে সামলে রাখে কিং! কারণ তার ফোকাস এখন বিশ্বের দ্বিতীয় ধনকুব হওয়া! তাহলে অরিনকে বিশ্বের সব সুখ দিতে পারবে! সে তাকে ছেড়ে ও যাবে না! পরপুরুষের দিকে ও তাকাবে না! তাই এই একমাস নিজেকে অরিনের থেকে দূরে রাখে কিংশুক!! কিন্তু তার কাছে অরিনের প্রতি সেকেন্ডের সেকেন্ডর খবর আসতে থাকে!! সে কোথায় যাচ্ছে , কি করছে, কার সাথে মিশছে সব! কিন্তু কিংশুক ঠিক করে তার পাখিকে খাচায় বন্দী করার আগে উড়তে দেবে! তাই এউ স্বাধীনতা দেওয়া!!
” ডানা কাঁটা’র এলো বলে বেবি গার্ল! ওয়েট এন্ড ওয়াজ!””
———-দেখতে দেখতে ১মাস ৭ দিন চলে যায়! অরিন ও কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠে! সেদিন ভোরবেলায় অরিনকে ওয়ার্ন করে লন্ডনে চলে যায় কিংশুক! তারপর থেকে বেশ কয়েকটা দিন সময় লাগে অরিনের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে এবং আগের মতো করে বাঁচতে! এর মাঝে অরিন একটি সুনাম ধন্য প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়! কিন্তু অবাকের বিষয় এটা ছিলো যে সেখানে বেশিরভাগই মেয়ে! প্রথম প্রথম একটু সন্দেহ হলে ও পরে স্বাভাবিক ভাবেই সব কিছু নেয় অরিন!
কিংশুককে প্রায় ভুলে যেতে বসে সে! এই একমাসে এক সেকেন্ডের জন্য ও তাদের মধ্যে কথা হয়নি! যার সুবাদে অরিন প্রায় ভুলেই যেতে বসে কিংশুককে! অরিন এমনিতে ও কিংশুককে মনে রাখতে চায় না! সেখানে যদি কিংশুক তাকে ভুলে যেতে চায়, তাহলে তো কোনো কথায় নেই!!
” খান ম্যানশন ”
” কত ক্ষণ সময় লাগবে আসতে?”
অরিনের শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতে কথা গুলো বলতে থাকে আতিয়া বেগম! আজ ক্যাটরিনার সাথে বিশেষ একটি অনুষ্ঠানে যাবে অরিন! যেখানে প্রায় সব বাইকাররা আসবে শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে! তাই ক্যাটরিনা ও চাই অরিন শাড়ি পরুক!
” বাইকার জানে মনি!”
” হুমমম! বেশি রাত যেনো না হয়!”’
অরিন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝায়! তারা বেশি রাত করবে না! কিন্তু ক্যাটরিনা এবং অরিন একসাথে বের হবে আর রাত হবে না এটা মোটামুটি অসম্ভব!! আতিয়া বেগম জেনে ও তাও আগে আসার ও জন্য বলে!! যদি ও কোনো লাভ নেই!
” রেডি বাচ্চা? ”
ফোন টিপতে টিপতে অরিনের রুমে আসে ক্যাটরিনা! এসে অরিনকে দেখে দাড়িয়ে পরে! লাল শাড়ি হালকা গয়না এবং খোলা চুলে মারাত্মক সুন্দরীদের থেকে মারাত্মক লাগছিলো অরিনকে! একদম জীবন্ত পুতুল!
” হাউ ডু আই লুক বাইকার?”
” প্রিটি লিটিল বেইবি!”
খুব খুশি হয়ে যায় অরিন! এই একটা মানুষই অরিনের মন ভালো করতে পারে! বড় বোন কম! মায়ের মমতা বেশি!
” লেটস গো!”
ক্যাটরিনা অরিনকে নিয়ে বেরিয়ে পরে! তাদের সাথে গার্ড আসতে চাইলে ও ক্যাটরিনা বাঁধা দেয়! নো নিড এ্যনি গার্ডস! সবাইকে জানিয়ে দেয়! সে নিজের ধ্যান রাখতে পারে! তাই গার্ডসরা ও আর তেমন কিছু করতে পারে না! ইচ্ছে থাকলে ও যেতে পারে না! ক্যাটরিনা চলে যায় অরিনকে নিয়ে!!
খান ম্যানশন থেকে প্রায় ৩০ মিনিটের ডিস্টেন্সে হিজল বিল! সুন্দর সুসজ্জিত একটি ছোটো রিসোর্টের মতো! লেক, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পদ্মবিলকে মূল আর্কষণ করে রিসোর্টটি তৈরি করা হয়! সেখানে আজ বাইক রাইডারস গ্রুপের গেটটুগেদার! পুরো রিসোর্টটি বুক করা হয় শুধু তাদের জন্য! প্রায় দূপুর থেকেই শুরু হয় আয়োজন! আর এক এক করে সকলে আসতে থাকে!
অরিন এবং ক্যাটরিনা ও চলে আসে! গেটটুগেদারে এতো লোক সংখ্যা থাকার পর ও সকলের চোখ বার বার চলে যাচ্ছিল অরিনের দিকে! খুব কম বাংলাদেশী মেয়েরই গায়ের রং এমন সাদা-গোলাপি হয়! তার উপরে চায়নিজ দের মতো দেখতে! শাড়িতে একদম পুতুলের মতো লাগিলো অরিনকে! ক্যাটরিনার বেশ কয়েকজন ফ্রেন্ড অরিনের আশেপাশে ঘুরঘুর করতল থাকে! কিন্তু তেমন একটা পাত্তা দেয় না অরিন! আর ক্যাটরিনার জন্য কেউ সাহস করে ভাব ও জমাতে পারছে না!
” বাচ্চা,”
” হুম!”
” তুমি একটু থাকো, আমি আসছি!”
” কোথায় যাবা?”
” এখানেই! সব কিছু চেক দিয়ে আসি!”
ক্যাটরিনা অরিনকে রেখে পুরে আয়োজনের কতদূর কি হলো বা হচ্ছে তার তদারকি করতে যায়! যেহেতু সে টপ লেডি বাইকার, তার দ্বায়িত্ব বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক!
ডান্স ফ্লোর থেকে একটু দূরে বসে বসে মক’টেল খেতে থাকে অরিন! প্রথমে ভেবেছিলো কক’টেল খাবে! কিন্তু মনি জু’তো পেটা করবে তাদের! তাই ভয়ে ভুলবশত ও সেদিনে চোখ দেয় না অরিন! নিজের মন মতো ফোন টিপতে থাকে এবং মক’টেল খেতে থাকে!
” হাই অরিন!”
অপরিচিত কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই উল্টো দিক ফিরে তাকায় অরিন!
” হু আর ইউ?”
” আ’ম ক্রিশ! ক্যাটের বাড্ডি!”
” ক্রিশ, মানে.. স্টান মাস্টার ক্রিশ?”
” ইয়েপ! ইউ নো মি? দ্যাটস গ্রেটস”
” নট রেলি! জাস্ট হেয়ার এবাউথ ইউ সামটাইমস! ”
” ওওও!”
ক্রিশের মুখ ছোটো হয়ে যায়! সে ভেবেছিলো অরিন তাকে জানে! এবং দেখার সাথে সাথে অন্য মেয়েদের মতো গলায় ঝলে পড়বে, কিন্তু না! কিছুই হলো না! অরিন ক্রিশকে পাত্তা ও দিলো না!
‘ ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, লেটস ডান্স!”
” নো, সরি!”
” কেন??”
” ঠিক মতো চিনি না, জানি না, নাচতে যাবো কেন?”
অরিনের কথা শুনে ক্রিশ পিছনে ফিরে তাকায়! তার বন্ধ মহল ইতোমধ্যে তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে দিয়েছে! সিম্পল একটা মেয়ে তাকে পাত্তা দিচ্ছে না! যেখানে মেয়েরা বাইকার রকির জন্য পাগল সেখানে কেউ একজন তাকে পাত্তাই দিলো না! নিজের রাগ সংযাত করে ক্রিশ!
” আসলে, অরিন ওই যে ওদিকে মেয়েটা দেখছো, ও চাই আমি ওর সাথে ডান্স করি, সবাই চাই, কিন্তু আমি চায় না! যদি না করি বেচারি চলে যাবে! ”
” সেটা তো আপনার সমস্যা, আমার নয়!”
” তা তো অবশ্যই! কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে সাহায্য করো! ধরো, তুমি নাচলে, আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম, ও তো কিছু বলতে পারবে না, আর পার্ট ছেড়ে ও যাবে না! কিন্তু যদি না করি চলে যাবে! প্লিজ অরিন! একটু বোঝো! ‘
অরিন বেশ অনেক ক্ষণ চিন্তা করে! এতো বড় গেটটুগেদার থেকে কেউ চলে গেলে পরে অবশ্যই মন খারাপ করবে! এর থেকে ভালো সে না হয় একটু নাচলো! রাজি হয়ে যায় অরিন! ক্রিশ ও তার বন্ধদের তীর্যক হাসি দিয়ে অরিনকে নিয়ে কাপল ডান্স ফ্লোরে চলে যায়! মোটামুটি স্বাভাবিক ভাবেই ডান্স করতে থাকে ক্রিশ এবং অরিন!! কিন্তু হুট করেই ক্রিশ কিছুটা ক্লোজ ভাবে নাচা শুরু করে! অস্বস্তিতে ভোগে অরিন! সে থেমে যেতে চাইলে ও পারে না! ক্রিশ তার গতি থামায় না! সে তার মতো নাচতেই থাকে!
কিছু ক্ষণ নাচার পর হঠাৎ করে গান বন্ধ হয়ে যায়! আর ক্রিশ ঢলে পড়ে মাটিতে!
” ক্রিশশশশ!”
ভয়ে চমকে উঠে সবাই!তড়িৎ গতিতে অরিন হাঁটু পেরে বসে দেখার চেষ্টা করে ক্রিশের হলো টা কি! ঠিক তখনই একটি ছায়া মুর্তি স্পষ্ট হয় অরিনের পিছন থেকে!
” হ্যালো ফিউচার ওয়াইফি! লং টাইম নো সি!”
ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যায় অরিনের! মাথা উচু করে তাকায় অরিন! কালো জিন্স এবং টিশার্ট পরে, কালো সানগ্লাস চোখ দিয়ে, মিনিমাম ১০-১৫ জন গার্ড নিয়ে অরিনের ব্যাক সাইটে দাড়িয়ে আছে কিংশুক!তাকে দেখার সাথে সাথে হাত পা কাঁপুনি দিয়ে উঠে তার! কিংশুক অরিনের এক হাত ধরে তাকে টেনে উপরে উঠাতে থাকে!
” কাম বেবি! বুকে আসো!”
” কিং…কিংশ…!””
কিংশুক টেনে অরিনকে তুলে, এবং তার কোমর আবদ্ধ করে নিজের হাতের গন্ডির মাঝে!
” টাইগার! প্লে দ্যা মিউজিক!”
উচ্চস্বরে গান বাজানো হয়! কিন্তু ডান্স ফ্লোর ফাঁকা! শুরু অরিন এবং কিংশুক রয়েছে! কিংশুক অরিনের কোমর ধরে নিজের মতো করে তার সাথে নাচতে থাকে!
” Tu hi pyaar… Tu hi chahatee.. Tu hi ashiq ki hyee…!”
কিংশুক নিজের মতো অরিনের কোমর ধরে কাপল ডান্স করতে থাকে! কিন্তু অরিনের যেনো প্রায় যায় যায় অবস্থা! সে কিংশুকের গতির সাথে কিছুতেই তাল মেলাতে পারছে না! চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে!
থেকে থেকে পড়ে যেতে নেই অরিন! কিন্তু কিংশুক তাকে পড়তে দেয় না! নিচে ক্রিশ পড়ে রয়েছে, এবং তার আসে পাশে কিংশুক অরিনকে নিয়ে ডান্স করছে! একদম হিন্দি সিরিয়াল!
” কী হলো বেবি গার্ল নাচবে না? থেমে যাচ্ছো কেন?”
” আমি নাচবো না!”
” নাচতে তো তোমাকে হবেই জানননন! আমার সাথে নাচে! পরপুরুষ কেন? আইম বেটার দ্যান হিম!”
কিংশুক আবার ও নাচতে থাকে অরিনকে নিয়ে! অরিন তো কেঁদেই চলেছে! কিন্তু কিংশুকের কোনো থামার গতি নেই! সে কাপল ডান্স করতেই রয়েছে! সাধারণ ভাষায় একে জন্মের মতো নাচা বলে!
শুধু মাত্র পর পুরুষের সাথে নাচার অপরাধে নিজের হবু বউকে জন্মের মতো নাচালো সাই’কো কিংশুক!
এ পর্যায়ে অরিন ক্লান্ত হয়ে কিংশুকের বুকেই ঢলে পড়ে! এবং খুব জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিতে থাকে! কিংশুক নিজের বাহু ডোরে আবদ্ধ করে নেয় অরিনকে! পা প্রায় অচল তার! হাঁটার মতো শক্তি নেই!
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১০
” বলেছিলাম তো জান! আমি ছাড়া কেউ দেখবে না তোমাকে! শুধু আমি দেখবো তোমাকে!”
কোলে তুলে নেয় কিংশুক অরিনকে!
” বাড়ি চলো জান!”
