Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৩

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৩

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৩
কায়নাত খান কবিতা

“পৃথিবীতে সব থেকে ভয়ংকর নেশা হলো মানুষের নেশা! আমাকে তোর নেশায় ধরেছে রে অরিন!”
৪৭৫০ টি অরিনের ছবির মাঝে দাড়িয়ে আনমনেই কথা গুলো বলতে থাকে কিংশুক! আজকে আরো ৫০ টি ছবি যুক্ত হবে কিংশুকের ”লাভ”রুমের দেয়ালে! পুরো রুমটির দেওয়ালে শুধু অরিনের ছবি! তার ছোটোবেলা থেকে স্কুল জীবন, কলেজ জীবন, ভার্সিটি সব কিছুর ছবি এবং তার ফেলে দেওয়া টিস্যু থেকে শুরু করে এমন অনেক কিছুই আছে যেগুলো কিংশুকের কালেকশনে রয়েছে!! খুব যত্নসহকারে কিংশুক অরিনের প্রতিটি জিনিস গুছিয়ে রেখেছে তাও অরিনেরই অজান্তে!

ভালোবাসা যখন একটা মানুষকে পুরোপুরি উন্মাদ করে দেয় তখন তাকে সাইকো লাভার বলে! কিংশুক ও ছিলে তাই! অরিনের সাইকো লাভার!!
যখন পরিমাণের থেকে বেশি ভালোবাসা হয়ে যায় তখন তাকে আনহেলদি অবসেশন বলে! আর অরিন ছিলো কিংশুকের ‘আনহেলদি অবসেশন’ ! এমন একটা অবসেশন যাকে ভুলে থাকা বা তার থেকে দূরে থাকা কিংশুকের জন্য খুবই কষ্ট কর!!
কিন্তু আজকে তার আনহেলদি অবসেশন নেই তার কাছে! চলে গেছে তাকে ফাঁকি দিয়ে!!
ক্যালেন্ডার বলছে এখন ২০২৫ সাল
সময় বলছে তি-বছর হয়ে গেছে অরিন কিংশুককে ছেড়ে চলে গেছে! চলে যায়নি, পালিয়ে গেছে! পুরো শহরে কারফিউ জারি করে ও সে খুঁজে পায়নি নিজের হবু বউকে! বিশ্বের তৃতীয় ধনকুবের নাতি হওয়ার পর ও তার পাওয়ার কোনো কাজে লাগেনি! সে খুঁজতে ব্যর্থ হয় নিজের সব থেকে দামি জিনিসকে!
কিংশুক অরিনের ছবির সামনে গিয়ে নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠে!

” বলো কীভাবে, রবো এভাবে,
আমায় গোছাবে কে দু-হাতে?
ফিরে আসো না,
আর তো পারি না,
বাচি চলো না, আবার একসাথে! ”
নিজের হাতে থাকা, ওয়াই,নের বোতলটি অরিনের ছবিতে ছুঁড়ে মা’রে! খণ্ডবি’খণ্ড হয়ে যায় অরিনের ছবি! এটা এখন নিত্যদিনের কাজ কিংশুকের! প্রতিদিন অরিনের ছবি ভাঙে, প্রতিদিন তাতে নতুন ফ্রেম করে!
অরিনের ছবি থেকে দু-কদম পিছয়ে যায় কিংশুক!
” আই ওয়েল ম্যেক ইউর লাইফ হেল বেবি গার্ল ! ”

—————তিন বছর আগে, ২০২২ সাল
” আই হেট ইউ কিং, আপনার মতো জানো’য়ারকে আমি কোনোদিন ও বিয়ে করবো না!”
চোখের পাতা বন্ধ করে নিজের মন আরো শক্ত করতে থাকে অরিন! ভালো বাসা এক জিনিস, আর পাগলামি আরেক জিনিস! যেখানে স্বাধীনতা নেই, নিজ ইচ্ছে তে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার টুকু কেড়ে নেওয়া হয়, সেখানে কী আদোও থাকা সম্ভব?

আর কিছু দিন পর ২০২৩ সাল পড়বে! কিংশুক এবং অরিনের বিয়ে ঠিক করা হয় নতুন বছরের ৬ জানুয়ারিতে! অরিনের জন্মদিন যেদিন! ১৯ বছরে পা দেওয়ার সাথে সাথে তাকে নিজের করে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে কিংশুক! অপরপ্রান্তে অরিন ও ঠিক করে সে কিছুতেই মেনে নিবে না এতো অত্যা”চার! কিংশুক যদি সুস্থ হতো তাহলে তাকে বিয়ে করতে কোনো অসুবিধা হতো না! কিন্তু সে তো মানু’ষিক রোগি! কোনো সুস্থ মানুষের লক্ষণ তার মাঝে নেই! যা আছে পুরোটাই অসুস্থ বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের লক্ষণ!
অরিনের চিন্তার মাঝে বাইরে থেকে তাকে জোড়ে জোড়ে ডাকা শুরু করে কিংশুক! সে তো বলে গিয়েছিল বাইরে অপেক্ষা করবে তার জন্য! ! উঠে কোনো রকম কাপড় পরিধান করে ভেজা চুল নিয়েই বাইরে চলে যায় অরিন!
অরিন বাইরে বের হতেই কিংশুক শুকনো ঢোক গিলে!
শখের নারীকে এমন আর্কষণীয় অবস্থায় দেখে!

” কন্ট্রোল কিং কন্ট্রোল! ইউ আর আনম্যারিড!”
কিংশুককে নিজের আবেগ কন্ট্রোল করে! যেহেতু দু-জনই প্রাপ্ত বয়স্ক, ভুল হওয়ার সম্ভবনা থাকেই, তাই কিংশুক ঠিক করে নিজের চোখকে সংযত রাখবে! সে বিয়ের আগে ঠিকমতো অরিনকে দেখবে না!
কিংশুককে বাইরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের ভয়কে জয় করে, কোনো রকম এসে কিংশুকের সামনে দাড়ায় অরিন!

” এতো দেরি হলো কেন?”
কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে অরিন! কিংশুক অরিনের হাত ধরে তাকে নিয়ে বিছানায় নিয়ে গিয়ে বসায়! তারপর গলার যেই অংশ টুকু কে’টে গেছে সেখানে মলম লাগিয়ে ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়!
” আমার অবাধ্য হলে তোমাকে পর’পারে পাঠাতে ও আমার হাত কাঁপবে না! ”
চোখ বড় বড় করে তাকায় অরিন কিংশুকের দিকে! তার জীবনের একমাত্র অপরাধ ছিলো কিংশুকের সামনে আসা! তার থেকে বড় অপরাধ ছিলো ফ্রেন্ডসদের পাল্লায় পড়ে কিংশুকের সাথে প্রেমের অভিনয় করা!
কথায় আছে, কুমির যদি জীবনে না আসে, কিছু মানুষ খাল কেটে তাকে নিয়ে আসে! অরিনের ও হয়েছে সেই অবস্থা! একটা সুস্থ সবল জীবনকে সে নিজের হাতে অসুস্থ বানিয়ে দিয়েছে!
কিংশুক ব্যান্ডেজ করে উঠে দাড়ায়! তারপর অরিনের কাবাডের সামনে যায়! সেখান থেকে সেলোয়ার-কামিজ বের করে অরিনের সামনে দাড়ায়!

” তোমার যত মর্ডান ড্রেস পরার ইচ্ছে আছে, বাসায় পরবে, বাইরে নয়! মাই প্রপার্টি ইজ নট ফর সেল! না-হলে শরীরে আগু’ন লাগিয়ে দেবো!”
কিংশুক ড্রেস বেডে রেখে বাইরে চলে যায়! কিংশুক চলে যাওয়ার সাথে সাথে অরিন উঠে দরজা লক করে ফেলে!
দরজা লক করে হাঁটু পেরে বসে প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পরে! কী থেকে কি হয়ে গেলো?একটা ছোটো মজা, তার সারা জীবনের সাজা হয়ে গেলো! এই জন্য বলে ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবি ও না!
এভাবেই সারাটি রাত নিজের রুমেই কাটিয়ে দেয় অরিন! শুধু দেয় না, রীতিমতো গৃহবন্দী হয়ে থাকে সে!
পুরোটা রাত ভয় আর আতঙ্কেই কেটে যায় তার! কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়ে ধ্যান নেই তার!
সময় তখন ৮:১৭ মিনিট!

খুব জোড়ে জোড়ে অরিনের দরজায় কেউ ধাক্কা দিতে থাকে! ধড়ফড়িয়ে উঠে সে ঘুম থেকে! আবার ও ভয় জেগে বসে তার মনে! তাহলে কী কিংশুক চলে এলো? অরিন উঠে দরজার সামনে যায়! তারপর ভালো মতো দরজায়,কান লাগায়! নাহ, কিংশুক নেই! আতিয়া বেগমের গলা! অরিন তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে ফেলে!
দরজা খোলার সাথে সাথে আতঙ্কিত থাকা অরিনকে দেখে জড়িয়ে ধরে আতিয়া বেগম!
” মাঝে মাঝে আমাকে ও তো একটু আকটু জড়িয়ে ধরতে পারো!”
কিংশুকের কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে অরিন! পাশ কাটিয়ে চলে যায় কিংশুক! তেমন একটা বিরক্ত করে না সে অরিনকে! কাল এমনিতেই যা হলো আতঙ্ক বাসা বেঁধে আছে অরিনের মনে! তাকে আর ভয় দেখানো যাবে না!
কিংশুক চলে যাওয়ার সাথে সাথে অরিন আতিয়া বেগমকে নিয়ে রুমে ঢুকে পরে, এবং দরজা লক করে ফেলে!
আতিয়া বেগম বুঝতে পারেন মেয়ের মনের অবস্থা! এই টুকু বয়সে এতো কিছু সহ্য করা সহজ নয়!অরিনকে শান্ত করে বিছানায় বসায় আতিয়া বেগম! তারপর তাকে পানি খেতে দেয়!

” কিংশুক কি কিছু..! ”
” নাহ মনি, করেনি!”
স্বত্বির নিঃশ্বাস ফেলে আতিয়া বেগম! যাক কোনো অঘটন এখনো ঘটেনি! কিন্তু ঘটতে কতক্ষণ? ছেলে মেয়ে আ’গুন এবং গ্যাসের মতো! একসাথে থাকলে জ্বলে উঠবেই!
” মনি তুমি প্লিজ একটু বোঝাও না উনাকে!”
অরিনের চোখের পানি মুছে দিয়ে আতিয়া বেগম! উনি জানেন, অরিন যতটা সহজ ভাবে কথা গুলো বলছে ততটা সহজ নয় কিংশুককে বোঝানো, তারউপরে অরিন এখন ও সব থেকে বড় সত্যির সম্মুখীন হয়নি! যেটা আতিয়া বেগম ছাড়া আর কেউ জানে না! আর আতিয়া বেগম চাই ও না কেউ জানুক এই সত্যিটা!

” ও মনি! প্লিজ! কিছু তো বলো!”
“” আমি বুঝাবো, কিং কে! কিন্তু তোকে একটা কথা শুনতে হবে আমার!”
” কি কথা মনি!” …!
” ওর রাগ হয় এমন কিছু করবি না”
অরিন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝায়, সে এখন থেকে সাবধান থাকবে! এমন কিছু করবে না যাতে বিয়েটা হয়! বা কিংশুক রেগে তার উপরে অত্যা’চার করে!
এভাবেই কিছু দিন চলে যায়! নতুন বছর পরতে আর মাত্র হাতে গনা কয়টা দিন!কিংশুক ও চলে যায় লন্ডনে! উদ্দেশ্য একটাই, বিশ্বের দ্বিতীয় ধনকুব হতে হবে! প্রথম হয়া এখন এতোটা ও সহজ না হলে ও দ্বিতীয় হওয়া সহজ! তাই সে অরিনকে ওর্য়ানিং দিয়ে চলে যায়! আর যাওয়ার আগে তার চারপাশে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে দিয়ে যায়! যেই দেয়াল ভেদ করে বাইরের জগৎ এ কি হচ্ছে সেটা জানা অরিনের পক্ষে সম্ভব নয়! সেই অদৃশ্য দেয়াল এতোটাই মজবুত যে তাকে ভাঙা যায় না! আর না তাকে ভেদ করা যায়! পুরো বাড়িতে ক্যামেরা, গার্ড ও বেশ কয়েকজন! একটু যে নিজের মতো করে নিঃশ্বাস ফেলবে অরিন সেটার ও উপায় নেই!
সকাল বেলা……

” গার্ড ছাড়া গেলে হবে না মনি?”
” একদম না কিং কে তো চিনিসই! সব ফেলে এখানে আসবে আশা করি তুই এটা চাস না!”
একটু অন্যমনস্ক হয়ে পরে অরিন! কিং যতটা তার থেকে দূরে থাকবে ততটাই ভালো! সে আসা মানেই বিপদ! আর বিপদের ধ্বংসাবশেষ অরিনকেই বহন করতে হবে!
তাই চুপচাপ মনির কথা মতো গার্ডসহ চলে যায় ক্যাম্পাসে! নতুন ক্যাম্পাসে ফ্রেন্ডসদের সাথে কিছু সময় থাকলে মন এমনিতেই চাঙ্গা হয়ে যাবে!
বার্সা গোল ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামে চুপচাপ বসে থাকে অরিন, সাথি, পুষ্প এবং মনিয়া! চার জনের আজকের প্রধান টপিক হচ্ছে অরিনের বিয়ে ভাঙা! একজন এতোটাই জঘন্য আইডিয়া বের করছে যেগুলো শুনলেই অরিনের পায়ের রক্ত মাথায় উঠছে!

” তোরা কী চাইছিস বলতো? আবার কিং আমাকে যমুনার পানিতে চুবাক?”
” নো অরিন! কিন্তু এর থেকে ভালো কোনো প্ল্যান তো নেই! কিরে সাথি তুই তো কিছু বল!”
” এমনিতেই কিংশুক ভাইয়ার বাংলাদেশের কোম্পানির কো-পার্টান আমার ড্যাডি! যদি জানতে পারে আমি আছি তাহলে সব শেষ আমাদের! ”
সাথির কথা শুনে অরিন প্রচন্ড বিরক্ত বোধ করে! এটা কেমন বন্ধু যে নিজের বিপদের কথা ভাবছে, পাশে থাকছে না! গটগট করে চলে যায় সেখান থেকে! তারা ও পিছু নেয়! সবাই তাকে থামানোর চেষ্টা করে! কিন্তু সে কারো কথা শুনতে নারাজ! চলে যেতে থাকে সেখান থেকে!

” অরিন শোনো!”
শ্রাবণের ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকায় অরিন!
” কিছু বলবে? ”
শ্রাবণ কোনো কথা না বলে অরিনের হাতে ফুল ধরিয়ে দেয়! সাথে একটা চিরকুট ও!
” এসব কী?”
” পরে দেখো!”
” ওয়াটটট!”
শ্রাবণ চলে যায় সেখান থেকে! অরিন চুপচাপ দাড়িয়ে হাতে থাকা ফুলের বুকেটি দেখতে থাকে! একদম লাল গোলাপ!
” কে দিলো রে অরিন?”
” শ্রাবণ! ”

অরিন ফুলটি হাতে নিয়েই বান্ধবীদের সাথে বাইরে চলে যায়! প্রাইভেট ভার্সিটির একটা সমস্যা হচ্ছে, বাইরের ফুসকা ওয়ালা বা স্ট্রিট ফুডের লোক গুলো এখানে ঢুকতে পারে না! তাই বাইরে গিয়েই খেতে হয়!
অরিন এবং তার তিনজন ফ্রেন্ড ঠিক করে ফুসকা খাবে বাইরে গিয়ে! হলো ও তাই! গার্ডদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অরিন বাইরে চলে আসে! মোটামুটি মর্ডান ড্রেস পরে আছে সবাই! যুগ অনুযায়ী পোশাকের ধরন তাদের সকলের!
বাইরে দাড়িয়ে ফুসকা ওয়ার্ডার দিয়ে চারজন খুশগল্পে মেতে উঠে! আশেপাশে কে এলো কে গেলো কোনো ধ্যান নেই তাদের!

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১২

” অরিন মনে হচ্ছে ওই ছেলে গুলো তোকে দেখে কিছু একটা করলো!”
অরিন পিছনে ফিরে তাকায়!
” লেট দ্যাম বি! পাত্তা দিস না!”
” আমাকে ও কী দিবে না?”
পরিচিত কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই গলা শুকিয়ে আসে অরিনের! যার ভয়ে তার রাত গুলো দূরস্বপ্নের মতো হয়ে গেছে সেই তার পিছনে দাড়ানো!
কিংশুক এসে সোজা অরিনের বাহু ধরে ফেলে!
” অনেক ক্ষণ বাইরো আছো, চলো বাড়ি যায়! আই হ্যাভ আ স্যারপ্রাইজ ফর ইউ!”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৪