আবির ভাই পর্ব ২৪
উর্মিলা মজুমদার
মেঘ ভাবছে, যখন আবির ভাই বালিশের পাশের ওই ছোট্ট চিরকুটটা খুঁজে পাবেন, তখন তার ঠোঁটের কোণে কি সামান্য একটু হাসির রেখা ফুটে উঠবে? সেই হাসি দেখার জন্য মেঘ একটা পুরো জীবন অপেক্ষা করতে পারে।
দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালে মনে হয় সেকেন্ডের কাঁটাটা বুঝি আলসেমি করে করে এগোচ্ছে। অথচ ড্রয়িং রুমে আবির ভাই এখনো অফিসের কাজ করছেন। মানুষ এতক্ষণ ধরে কী করে এক জায়গায় বসে থাকতে পারে? মানুষের তো হাত-পা কামড়ানোর কথা, হাই তোলার কথা। কিন্তু না, তিনি নির্বিকার। মেঘের বুকের ভেতর একটা ঢোল বাজছে ধক ধক, ধক ধক। নখ দিয়ে দাঁত কাটার বদভ্যাসটা তার বহুদিনের। আজ সেটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবির ভাইকে তো রুমে পাঠাতে হবে, নইলে সব পরিকল্পনা যে ভেস্তে যাবে!
হঠাৎ মেঘের মগজের কোণায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি ঝিলিক দিয়ে উঠল। বুদ্ধির রংটা হয়তো বেগুনী। মেঘ দ্রুত ফোনটা হাতে নিল। প্রযুক্তির এই এক সুবিধা, মানুষকে সামনে না গিয়েও চমকে দেওয়া যায়। মেসেঞ্জারে আবির ভাইয়ের নামের ওপর আঙুল বুলিয়ে সে লিখল, ”আবির ভাই, দ্রুত আপনার রুমে আসুন। আমি আপনার রুমে আটকে গেছি। প্লিজ জলদি!”
মেসেজটা পাঠিয়েই মেঘ এক ঝটকায় দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল। কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘সীন’।
মেঘের কলিজাটা যেন গলার কাছে চলে এসেছে। সে দরজার সামান্য ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। তার অনুমান ভুল হয়নি। আবির ভাই সোফা ছেড়ে উঠেছেন। মেঘ দ্রুত সরে এসে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল।
হৃদপিণ্ডের শব্দ কি বাইরের লোক শুনতে পায়? মৈনাক পাহাড়ের মতো কদম ফেলে আবির ভাই নিজের রুমের দিকেই আসছেন। মেঘ আর সাহস সঞ্চয় করতে পারল না। সশব্দে দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ করে দম আটকে রইল। আবির ভাই নিজের রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মেসেজে মেঘ লিখেছে সে ‘আটকে’ গেছে, অথচ দরজার হাতল ঘোরাতেই কপাট নিঃশব্দে খুলে গেল। দরজা তো ভেতর থেকে লক করা ছিল না!
রুমের ভেতর নিঝুম অন্ধকার। জানলার পর্দাগুলো বাতাসে দুলছে। নীলচে জ্যোৎস্নার সরু রেখা বিছানার ওপর পড়ছে। আবির ভাই চারপাশে চোখ বুলালেন। কোনো সাড়া নেই, কোনো মানুষের অস্তিত্বের ঘ্রাণ নেই। আবির ভাই মৃদু স্বরে ডাকলেন, “মেঘ? আছিস নাকি কোথাও?”
চারপাশটা বড় বেশি নিঝুম। আবির ভাই আবারও ডাকলেন, “মেঘ? কোথায় তুই? ফান করছিস আমার সাথে?”
উত্তরে কোনো শব্দ এলো না। মেঘ কি আলমারির ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে আছে? নাকি খাটের নিচে ধুলোবালি মেখে ভূত সেজে বসে আছে? মেয়েটার কাণ্ডকারখানা বোঝা বড় দায়। আবির ভাই পা টিপে টিপে বিছানার কাছে এগিয়ে গেলেন। হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল বালিশের পাশে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট নীল বাক্সের দিকে। নীল রঙের সেই বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে এলো একটা ভাঁজ করা চিরকুট। মুক্তোর মতো ঝকঝকে গোটা গোটা হরফে লেখা:
”শুভ জন্মদিন, আবির ভাই!”
লেখার নিচে একটা গোলগাল চশমা পরা হাসিমুখের ইমোজি। আবির ভাইয়ের মেজাজটা মুহূর্তেই সপ্তমে চড়ে গেল, আবার পরক্ষণেই বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। এই হাতের লেখা তাঁর চেনা। মেঘ ছাড়া আর কারোর এত সাহস নেই যে মাঝরাতে তাঁর ঘরে চোর-পুলিশ খেলবে।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “মেয়েটা কি চিরকালই এরকম অবুঝ থেকে যাবে? বয়স বাড়ছে, অথচ বুদ্ধিটা বাড়ছে না।”
আবির ভাই নিজের অজান্তেই এক চিলতে হাসলেন। সেই হাসিতে কিছুটা প্রশ্রয় ছিল। বাক্সের একদম কোণায় একটা চকলেট পড়ে আছে। চকলেট দেখে আবির ভাইয়ের কপালে কয়েকটা চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। তিনি চকলেট খান না কিন্তু মেঘ নামক এই মেয়েটার অবান্তর আবদার উপেক্ষা করার ক্ষমতা বোধহয় পৃথিবীর কোনো ব্যাকরণেই লেখা নেই।
তিনি খুব যত্ন করে চকলেটের মোড়কটা ছাড়ালেন। সাধারণ একটা চকলেট, কিন্তু মুখে দিতেই মনে হলো এর স্বাদ অন্য সবকিছুর চেয়ে আলাদা। যেন মেঘের শৈশব আর দুষ্টুমিগুলো একসাথে মিশে আছে এতে। চকলেটটা শেষ করে তিনি চিরকুটটা খুব সাবধানে ভাজ করলেন। তারপর পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে মেঘের সেই চঞ্চল হাসিমুখের ছবিটার ঠিক পেছনে চিরকুটটা গুঁজে রাখলেন। ছবি আর চিরকুট দুটোই এখন এক জায়গায়।
রুম থেকে বের হওয়ার সময় তিনি একবার বুক শেলফের পেছনের দিকে তাকালেন। মেঘ কি আড়ালে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখছে? তিনি কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। শান্ত হয়ে আবার ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। ল্যাপটপটা খোলা পড়ে আছে।
পরদিন সকাল। আকাশের রঙটা আজ কেমন জানি ফ্যাকাশে নীল। ধোয়া ওঠা এক টুকরো মখমল। “খান বাংলো”র মূল ফটকটা আজ বেশ জাঁকজমক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গেটের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা খান বাংলো।
বাড়িতে আজ এলাহি কাণ্ড। সন্ধ্যাবেলা পার্টি। বড় আব্বুর বিজনেস পার্টনার থেকে শুরু করে চেনা-অচেনা আত্মীয়স্বজন সবারই আজ এখানে পদধূলি পড়বে। ড্রয়িংরুমে ফুলদানির জায়গা বদল হচ্ছে। ব্যস্ততার এই সমুদ্রে মেঘ একাকী এক দ্বীপ। সে সবেমাত্র গোসল সেরে বেরিয়েছে। ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে ফোন লাগাল গ্রামে।
”আসসালামু আলাইকুম, আব্বু।”
ওপাশ থেকে বাবার শান্ত গলা ভেসে এল, “ওয়ালাইকুমুস সালাম, আম্মু। কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোমরা কেমন আছো? আম্মু ভালো আছে তো?”
“হ্যাঁ মা, আমরা সবাই ভালো।”
মেঘ একটু ইতস্তত করে আসল কথাটা পাড়ল, “আজকে কি তোমরা ঢাকায় আসবে না?”
আব্বু একটু হাসলেন। তিনি বললেন, “না রে মা, আজ আসা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কথা দিচ্ছি, খুব শিগগিরই আসব তোমার সাথে দেখা করতে।”
মেঘের মনটা এক নিমেষে শরৎকালের মেঘের মতো খারাপ হয়ে গেল। ফোনটা রেখে দিলো বেশকিছু সময় পর। অরু এখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু মেঘের মাথায় আজ অন্য চিন্তা। আবির ভাই অফিসে গিয়েছেন। তাকে চমকে দিতে হবে। কাল সারারাত ধরে সে একটা কালো রঙের শাড়ি ঠিক করে রেখেছে। ইউটিউব দেখে দেখে শাড়ি পরার জটিল কৌশলটা সে আজ আয়ত্ত করেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে নিজেই একটু থমকে গেল।
চুলগুলো সামনের দিকে খানিকটা কোঁকড়ানো, আর পেছনের অংশটুকু একদম টানটান সোজা।
ঠোঁটে নুড রঙের লিপস্টিক দিয়ে ডার্ক রেড শেডে একটা আল্পনা করেছে সে। চোখে গাঢ় কাজল। সব মিলিয়ে আয়নার মেয়েটাকে যেন ঠিক মানুষ মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে সযত্নে সাজানো কোনো এক ‘বারবি ডল’।
বাড়ির সবাই যখন রান্নাবান্না আর সাজসজ্জার তদারকিতে মহাব্যস্ত, মেঘ সেই সুযোগে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ল। কেউ টেরও পেল না। একটা রিকশা ডেকে সে হুডটা ফেলে দিল। মাথার ওপর তপ্ত রোদ, কিন্তু মেঘের মনে আজ বসন্তের হাওয়া।
মাঝপথে রিকশা থামিয়ে সে একটা ফুলের দোকানে দাঁড়াল। একগুচ্ছ লাল গোলাপ নয়, সে কিনল বিশাল এক তোড়া সূর্যমুখী। কাল রাতে অনেক ভেবেচিন্তে নীল রঙের একটা কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে একটা চিরকুট লিখেছিল মেঘ। সেই চিরকুটটা সে গেঁথে দিল সূর্যমুখীগুলোর ঠিক মাঝখানে।
আবির ভাইয়ের অফিসের সামনে রিকশাটা থামল। মেঘের হৃৎপিণ্ডটা অবাধ্য পাখির মতো লাফাচ্ছে। ভাড়া মেটানোর সময় রিকশাওয়ালা বুড়ো মানুষটা হাসিমুখে বলল, “মা জননী, আপনারে ঠিক পরীর মতো লাগতেছে।”
মেঘ হাসল। দারোয়ান কাকাও আজ কপাল কুঁচকে তাকাল না, বরং বেশ সমীহ করে গেট খুলে দিল। মেঘ ভাবল, সুন্দর মানুষের কি সব অপরাধ মাফ? সেদিন যখন অরুকে নিয়ে এসেছিল, তখন তো এই মানুষগুলোই তাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না।
রিসিপশনে পা রাখতেই এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। সেখানে বসা লোকগুলো আর সোফায় অপেক্ষমাণ আগন্তুকরা একযোগে দাঁড়িয়ে পড়ল। মেঘ অবাক হয়ে বলল, “আমি মেঘ। আবির ভাইয়ের সাথে…”
কথা শেষ করার সুযোগ পেল না সে। রিসিপশনিস্ট মেয়েটা দাঁত বের করে এক গাল হেসে বলল, “ম্যাম, আমরা আপনাকে চিনি। আপনার পরিচয় দিতে হবে না। আপনি স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছেন তো? স্যার টুয়েলভ ফ্লোরে আছেন।”
মেঘের মনে খটকা লাগল। এই ‘ম্যাম’ সম্বোধনটা তার কাছে খুব অচেনা ঠেকল। এক বুক উত্তেজনা নিয়ে সে লিফটে চড়ল। লজ্জায় তার গাল দুটো আপেলের মতো লাল হয়ে আছে। সে ভাবছে, আবির ভাই কি রাগ করবেন? লিফটের দরজা খুলে গেল। মেঘের মুখে তখনো সেই মিষ্টি হাসিটা লেগে আছে। গার্ডদের পাশ কাটিয়ে সে আবির ভাইয়ের কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়াল। বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ শব্দটা এখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে আলতো করে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।
ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘের পৃথিবীটা স্থির হয়ে গেল। মহাবিশ্বের সব শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেল।
কেবিনের ভেতর উৎসবের আমেজ। টেবিলে একটা বড় কেক রাখা। আবির ভাই সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেক কাটছেন। আর ঠিক তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মিরা নামের সেই মেয়েটি। মিরার হাতে কেকের একটা টুকরো, সে সেটা আবির ভাইয়ের মুখের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। মেঘের হাতের সূর্যমুখী তোড়াটা তার অজান্তেই পড়ে গেল। সবাই দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
আবির ভাই চাইলেন মেঘের দিকে।
তার চোখেমুখে অন্ধকার। মানুষের পায়ের তলার মাটি সরে গেলে তার মুখটা যেমন দেখায়, আবির ভাইয়ের মুখটা ঠিক তেমন হয়ে গেছে। তিনি শুকনো গলায় অস্ফুট স্বরে ডাকলেন, “মেঘ?”
মেঘ কোনো উত্তর দিল না। দেখল একগুচ্ছ সূর্যমুখী নিস্পন্দ পড়ে আছে মেঝেতে। মেঘের মনে হলো, তার বুকের ভেতর যে ছোট্ট হৃদপিণ্ডটা এতক্ষণ ধুকপুক করছিল, সেটা হঠাৎ করে পাথর হয়ে গেছে। মেঘের ঠোঁট জোড়া কাঁপল ঠিকই, কিন্তু সেখান থেকে কোনো ধ্বনি বেরিয়ে এল না। তার চাঁদপানা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে শ্রাবণের মেঘলা আকাশের মতো অন্ধকার হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না।
পায়ের নিচে পড়ে থাকা সূর্যমুখীগুলো তছনছ করে সে উল্টো দিকে ঘুরে দৌড় শুরু করল। পেছন থেকে আবির ভাইয়ের চিৎকার শোনা গেল, “মেঘ? মেঘ!”
আবির ভাই সম্ভবত হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। ঘোর কাটতেই তিনি সবাইকে পেছনে ফেলে মেঘের পিছু নিলেন।
“মেঘ! দাঁড়াতে বলছি আমি। মেঘ!”
কিন্তু মেঘ দাঁড়াল না। সে তো আবির ভাইকে একটা সুন্দর সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস, বড়সড় সারপ্রাইজটা সে নিজেই পেয়ে গেল। মনের অজান্তেই নোনা জলের কয়েকটা ফোঁটা গাল বেয়ে নিচে নামল। চোখের সেই গাঢ় কাজল এখন লেপ্টে গিয়ে একাকার। লিফটের জন্য অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য বা মানসিক স্থিতি তার নেই। লিফট আসা মানে কয়েক সেকেন্ডের স্থবিরতা, আর সেই সময়টুকুতে আবির ভাই তাকে ধরে ফেলবেন। মেঘ তাই সিঁড়ির দিকে ছুটল।
খটখট শব্দে সে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। পরনের কালো শাড়িটা বারবার পায়ে আটকে যেতে চাইছে, ইউটিউব দেখে শেখা সেই পরিপাটি কুঁচিগুলো এখন অবিন্যস্ত। পেছন পেছন আবির ভাইয়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আবির ভাই আবারও গর্জে উঠলেন, “মেঘ! আই সে স্টপ!”
কিন্তু মেঘ থামল না। মেঘের পৃথিবীটা হঠাৎ করেই কেমন জানি ওলটপালট হয়ে গেল। গেট থেকে বের হয়ে সে যখন রাস্তার ওপাড়ে যাওয়ার জন্য দৌড় দিল, তখন তার মাথায় ছিল কেবল একটা ঘোরের জগৎ। সেই ঘোরে ডানে-বামে তাকাতে হয় না। ঠিক তখনই এক জোড়া হেডলাইটের আলো মেঘের চোখে এসে বিঁধল।
একটা প্রচণ্ড শব্দ, তারপর সবকিছু একদম চুপচাপ। জগতটা যেন হঠাৎ করেই সাদা-কালো কোনো নির্বাক চলচ্চিত্র হয়ে গেল। রক্তাক্ত মেঘ রাস্তার পিচের ওপর এলিয়ে পড়ল। তার পরনের কালো শাড়িটা এখন কালচে লাল। আবির ভাই অফিসের গেট থেকে বের হয়ে আসছিল। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া দৃশ্যটা দেখে তার মনে হলো, কেউ যেন তার হৃৎপিণ্ডটা ছিঁড়ে নিয়ে ফুটবল খেলছে। সে একটা গগনবিদারী চিৎকার দিল, “মেঘ!”
মানুষের চিৎকার যে এত ভয়ঙ্কর হতে পারে, সেটা বোধহয় আশেপাশের কেউ আগে শোনেনি। আবির দৌড়ে এসে রাস্তায় পড়ে থাকা মেঘকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। সে মেঘের দুই চিবুক ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর আর্তনাদ করছে, “মেঘ? এই মেঘ! কথা বল বেয়াদব! কথা বলছিস না কেন?”
মেঘ কথা বলছে না। তার জ্ঞান নেই। মাথা থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তে আবিরের ধবধবে সাদা শার্টটা ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মানুষের ভিড় জমে গেছে চারপাশে। তারা অবাক হয়ে দেখছে এক যুবকের পাগলামি। সে মেঘকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিজের গাড়ির দিকে ছুটল। তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু পড়ছে কি না সে জানে না, কিন্তু তার দৃষ্টি ঝাপসা।
হাসপাতালের ইমারজেন্সি অপারেশন থিয়েটারের বাইরের করিডোরটা বড় বেশি ঠান্ডা। রায়হান আর জায়ান খবর পেয়েই ছুটে এসেছে। এসে দেখে, করিডোরের এক কোণায় আবির পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। তার সাদা শার্টটা এখন আর সাদা নেই, মেঘের শরীরের রক্ত সেখানে মানচিত্র এঁকে দিয়েছে। আবিরের চোখের দৃষ্টি ফাঁকা। সে ভাবছে, রাতের বেলাই তো মেয়েটা চিরকুটে নীল অক্ষরে লিখেছিল “শুভ জন্মদিন, আবির ভাই”।
সেই কালির রঙের চেয়ে এই রক্তের রং কেন এত গাঢ় হলো?
রায়হান এসে আবিরের কাঁধ ধরে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিল।
“কী হয়েছে আবির? মেঘের এক্সিডেন্ট কীভাবে হলো?”
জায়ান পাশ থেকে যোগ করল, “তুই থাকতে মেঘের এই দশা হলো কী করে? তুই তো ওকে চোখে হারাস!”
“আবির! নিজেকে সামলা। এভাবে বসে থাকলে হবে?”
আবির ফিরল না। বলল, “ওকে আমি বেয়াদব বলেছি রে রায়হান। ও যখন অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল, তখনও আমি ওকে বকলাম।”
আবির কোনো উত্তর দিতে পারল না। উত্তর দেওয়ার মতো ক্ষমতা তার নেই। আবিরের চোখের সামনে এখনো সেই দৃশ্যটা ভাসছে পিচঢালা কালো রাস্তায় মেঘের রক্ত। সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে, যদি মেঘের কিছু হয়ে যায়, তবে সে পৃথিবীর কোনো আদালত নয়, নিজের কাছেই কোনোদিন মুক্তি পাবে না। খবর পেয়ে বড় আব্বু, মেঝো আব্বু সবাই হাসপাতালে এসে গেছেন।
আবির নিজেকে সবার কাছ থেকে সরিয়ে নিল। হাসপাতালের পেছনে নির্জন এক কোণায় সে দাঁড়িয়েছে। তার হাত কাঁপছে। একটা সিগারেট ধরাল সে চিন্তা দমাতে। এক ঘণ্টা পর অপারেশন থিয়েটারের দরজাটা খুলে গেল। নীল পোশাক পরা ডাক্তার বের হয়ে আসলেন। সবাই পাগলের মতো ডাক্তারকে ঘিরে ধরল। কিন্তু আবির নড়ল না। সে কয়েক হাত দূরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। সামনে এগিয়ে গিয়ে কোনো দুঃসংবাদ শোনার সাহস তার নেই। সে বরং এই দূরত্বের অনিশ্চয়তাটুকুকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়।
ডাক্তার হাসিমুখে বললেন, “চিন্তার কোনো কারণ নেই। ভিক্টিম এখন সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত।
কপালে চোট লেগেছে ঠিকই, তবে বড় কোনো আঘাত নেই। বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
কথাটা শোনার পর আবিরের শরীর থেকে যেন এক মস্ত বড় পাহাড় নেমে গেল। সে নিজের অজান্তেই হাতের মুষ্টি শক্ত করে ফেলল। তারপর করিডোরের মেঝেতেই সে লুটিয়ে পড়ল সিজদায়। মনে মনে বলছে— শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।
আবির ভাই পর্ব ২৩
মেঘকে যখন ট্রলিতে করে প্রাইভেট ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবির আড়াল থেকে দেখল। মেয়েটার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কপালে ধবধবে সাদা ব্যান্ডেজ। রক্তের কিছু দাগ এখনো চুলে লেগে আছে। মেঘ অজ্ঞান। সে জানেই না, তার শিয়রে একজন মানুষ কতটা নিঃস্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আবির দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একপলক মেঘকে দেখল। তার চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে উঠেছে। সে চোখ মুছল। এই কান্নার সাক্ষী সে কাউকে হতে দেবে না। সবাই যখন মেঘকে নিয়ে ব্যস্ত। আবির হাসপাতালের গেট দিয়ে বেরিয়ে এল।
