Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ২

আবির ভাই পর্ব ২

আবির ভাই পর্ব ২
উর্মিলা মজুমদার

“কেন, কী হয়েছে?”
আবির ভাই একটা লম্বা শ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন, “সবকিছু লজিক দিয়ে বোঝানো যায় না। যা, নিচে গিয়ে ঘুমা। বৃষ্টিতে ঠান্ডা লেগে গেলে তোর বাবা আবার আমাদেরকেই ধরবেন।”
আমি চলে আসতে উদ্যত হতেই তিনি আবার ডাকলেন, “মেঘ!”
পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি আবির ভাই সরু দৃষ্টিতে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি যত্রতত্র তাকালাম। বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। ঠিক যেন দুপুরের রোদে খা খা করা কোনো বিরান প্রান্তর। আবির ভাইকে শেষ কবে স্বাভাবিকভাবে দেখেছি, মনে পড়ছে না। মানুষটা আজ বিকেলে যে অদ্ভুত আচরণ করল, তার কোনো কূলকিনারা করতে পারছি না। গলাটা শুকিয়ে তিতা হয়ে আছে। সাহস সঞ্চয় করে বললাম,

“ডাকলেন?”
আবির ভাই অদ্ভুত এক চিলতে হাসি হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো অর্থ নেই, আবার হয়তো অনেক অর্থ আছে। তিনি বললেন, “নাহ, কিছু নয়।”
আমার মেজাজটা হুট করে চটে গেল। আমার মেজাজ চটানো মানে হলো নিজের ভেতরকার এনার্জি নষ্ট করা। সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসলাম,
“আচ্ছা, আজ দুপুরে আপনি আমাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরলেন কেন?”
কথাটা শুনে আবির ভাইয়ের মুখভঙ্গি নিমেষেই বদলে গেল। মনে হলো জ্যান্ত কোনো মানুষ হঠাৎ পাথরের মূর্তিতে রূপান্তরিত হলেন।
তিনি বেশ রুক্ষ গলায় বললেন, “ভুল করে ফেলেছিলাম। আমি অন্য কাউকে ভেবেছিলাম।”
আমি দমবার পাত্র নই। কৌতূহল মানুষের মজ্জাগত দোষ। জিজ্ঞেস করলাম, “কাকে ভেবেছিলেন?”
আবির ভাই এবার আমার দিকে স্থির রক্তিমাভ দৃষ্টিতে তাকালেন। তিনি বললেন, “সেই প্রশ্নের উত্তর তোকে কেন দিতে হবে?”

আমি একদম চুপসে গেলাম। আবির ভাইয়ের চেহারার যে হালচাল, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে কপালে চড়-থাপ্পড় জুটতেও পারে। তার চেয়ে প্রস্থানই মঙ্গল।
অক্টোবর মাস। এই বাতাস নিয়ে দীর্ঘ কোনো বক্তৃতা দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। বাতাসটা বেশ মিহি, শীতল শীতল গন্ধ আছে তাতে। আমার একটু শীত শীত করতে লাগল। ছাদ থেকে নেমে আসার সময় দেখলাম আবির ভাই রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন তিনি মেঘেদের সাথে কথা বলছেন।
রুমে পা রাখতেই শুরু হলো তাণ্ডব। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। জানালার পর্দাগুলো বাতাসের তোড়ে পাগলের মতো নাচছে। আমি হন্তদন্ত হয়ে জানালাগুলো আটকে দিলাম। জানালার কাঁচ চুইয়ে কয়েক ফোঁটা জল এসে আমার গায়ে লাগল। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ভাবলাম! আবির ভাই কি এখনো ছাদে? লোকটা কি বৃষ্টিতে ভিজছে?
পরক্ষণেই মনে হলো, যাক গে! ‘মহাজাগতিক কোনো নিয়মে হয়তো তার আজ বৃষ্টিতে ভেজা প্রয়োজন।’ ঐ অসভ্য লোকটা ভিজলে আমার কী? আমি কাঁথা মুড়ি দিয়ে চোখ বুজলাম। বৃষ্টির শব্দে ঘুমটা আজ বেশ জম্পেশ হবে।

আকাশের মুখ আজ গম্ভীর। বিষণ্ণ কোনো যুবকের মতো সে থমথমে হয়ে আছে। যেকোনো সময় অঝোর ধারায় কেঁদে ভাসিয়ে দেবে। একেই বোধহয় বলে ‘মেঘলা আকাশ’। তবে নামকরণের সার্থকতা নিয়ে আজ আর তর্কে গেলাম না, কারণ আজ মেঘের নিজেরই মন খারাপ। মেঘ নিজেই আজ তার নাম সার্থক করতে বসেছে। আজ মেঘের বড় চাচারা তাকে ঢাকা নিয়ে যাবেন।
সকালবেলা মেঘের সব কাজিনরা মিলে হাঁটতে বের হয়েছে। শহরের মানুষরা গ্রামের হাওয়ার এ রস বুঝবে না। তারা ধুলো আর ধোঁয়ার মধ্যে জীবন খুঁজে পায়। বাড়িতে রয়ে গেল শুধু আবির ভাই। মেঘ বসে আছে তার চাচার সামনে। আবির ভাইয়ের বাবা। মানুষটাকে মেঘ ঠিক চেনে না। আগে খুব একটা দেখা হয়নি।
মেঘ নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,”চাচা, আমাদের গ্রামটা আপনার কেমন লাগছে?”
চাচা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে মেঘের দিকে তাকালেন। গলায় খানিকটা কৃত্রিম শাসন মিশিয়ে বললেন,”গ্রাম তো ভালোই। কিন্তু তুই তো মা বড় পাষাণ হয়ে গেছিস। বাবার মতো হয়েছে স্বভাব। একবার যে চাচাদের কথা মনে করবি, তার তো কোনো লক্ষণ দেখলাম না। ঢাকা কি খুব দূরে রে মা?”

মেঘ চুপ করে রইল। তার ফর্সা মুখটা অপমানে না কি অভিমানে জানি না, টকটকে লাল হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে একটা টোকা দিলেই গাল বেয়ে রক্ত ঝরবে। মেঘের পরনে টিয়া রঙের থ্রি-পিস, পিঠ ছাপিয়ে কোমর পর্যন্ত নেমেছে চুল। ঠিক যেন পটে আঁকা কোনো এক গ্রাম্য কিশোরী। কিছুক্ষণ পর কাজিনরা ফিরল। সঙ্গে মেঘের খালাতো বোন পাখি। পাখি এসেই বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল।
“কিরে মেঘ, গোছগাছ শেষ? তোর লাগেজ তো দেখি হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।”
মেঘ শুকনো একটা হাসি দিল। সে জামাকাপড় ভাজ করছে। মনটা বড্ড বিষন্ন। ছোটবেলা থেকে যাদের দেখেনি, যাদের নাড়ি-নক্ষত্র কিছুই তার জানা নেই, তাদের সঙ্গেই এখন থেকে থাকতে হবে। জীবনের সমীকরণ মেলানো বড় কঠিন কাজ। মেঘ মনে মনে ভাবল, ‘ঢাকায় গিয়ে বাবা-মাকে এমনভাবে পটাতে হবে যেন তারা তল্পিতল্পা গুটিয়ে আমার কাছে চলে আসে।’ পটানোর বিদ্যাটা তাকে ভালোমতো শিখতে হবে।
হঠাৎ জানালার পর্দা সরিয়ে মেঘ দেখল আকাশ আরও কালো হয়েছে। ওপর থেকে হুকুম এল— ‘তাড়াতাড়ি করো, বৃষ্টি নামার আগেই রওনা দিতে হবে।’ মেঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাওয়ার নিতে ঢুকল।

বিদায় দৃশ্যটি করুণ হতে পারত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হলো মহাকরুণ। মেঘের কান্নায় আকাশের মেঘেরা বোধহয় লজ্জা পেয়ে গেল। তাদের আর আলাদা করে বৃষ্টি ঝরানোর প্রয়োজন নেই, মেঘ একাই পুরো গ্রাম ভাসিয়ে দেওয়ার পণ করেছে।
গাড়ির পাশে সবাই সার বেঁধে দাঁড়িয়ে। মেঘ তার বাবার বুক আঁকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কান্নার চোটে তার হেঁচকি উঠে যাচ্ছে।
মেঘ ধরা গলায় বলল,”বাবা, তোমাকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারব না। তুমি সত্যি করে বলো, কবে আসবে আমাকে নিতে? আম্মু, তোমরা কি আসবা না?”
মেঘের বাবা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। মানুষের মন বড় বিচিত্র; যে গ্রামে বড় হওয়া, সেই মাটির মায়া কাটানো পৃথিবীর কঠিনতম কাজগুলোর একটা। মেঘের বড় চাচা গম্ভীর মুখে বললেন,”ছিঃ মা, কান্নাকাটি করতে নেই। আমরা তো আছিই। তোর বাবা-মাও খুব শিগগিরই ঢাকা আসবে। দেখবি, সময় কীভাবে কেটে যায়।”

শেষ পর্যন্ত মেঘের কান্নার বেগ একটু কমল। সে চোখ মুছতে মুছতে গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসল। জানালার কাচ দিয়ে বাইরের মানুষগুলোকে মনে হচ্ছে কোনো পুরনো ছায়াছবির কুশীলব। মেঘের চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। সে ভাবছিল একা একা ড্রাইভারে পাশে বসে এই দীর্ঘ পথ কীভাবে পাড়ি দেবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সদর দরজার দিকে মেঘের নজর গেল। আর মুহূর্তেই তার কান্নার কথা বেমালুম ভুলে গেল সে। দরজার ওপাশ থেকে যে যুবকটি হেঁটে আসছে, তাকে ঠিক ‘আবির ভাই’ বলে চেনা যাচ্ছে না। লম্বাটে গড়ন, গায়ের রঙ শ্যাম বর্ণ থেকে উজ্জ্বল ফর্সা। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট ইন করা, তার ওপর গাঢ় নেভী ব্লু রঙের ব্লেজার। কবজিতে দামী ঘড়িটা চিকচিক করে উঠছে। চুলে নিখুঁত আন্ডার-কাট। তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো নামী বহুজাতিক কোম্পানির সিইও কিংবা সিনেমার নায়ক যে এইমাত্র শুটিং সেট থেকে ভুল করে গ্রামে ঢুকে পড়েছে।

মেঘের মুখটা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। তার নিজের অজান্তেই মনে হলো, এই মুখে অনায়াসে দুটো মশা ঢুকে পড়ে ডিম পেড়ে চলে যেতে পারবে। সে ঢোক গিলল। তার বুকের ভেতরটা কেমন জানি ‘গুড়গুড়’ করতে শুরু করেছে। আবির ভাই ধীরস্থির পায়ে এগিয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে বসলেন। তার শরীর থেকে দামী পারফিউমের একটা মৃদু সুবাস মেঘের নাকে এসে ধাক্কা দিল। মেঘ নড়েচড়ে বসল।
আবির ভাই গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখলেন। চারপাশের বিদায় জানানো মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে একবারের জন্যও মেঘের দিকে তাকালেন না। মেঘ আড়চোখে কয়েকবার তাকাল। সে আশা করেছিল আবির ভাই অন্তত বলবে, ‘কিরে মেঘ, কাঁদছিস কেন?’ কিংবা ‘তোর তো চোখ-নাক সব লাল হয়ে গেছে!’

কিন্তু না। আবির ভাই পুরোপুরি নির্বিকার। তার দৃষ্টি সামনের পিচঢালা রাস্তার দিকে। গাড়ি চলতে শুরু করল। মেঘ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল বটে, কিন্তু তার মন পড়ে রইল স্টিয়ারিং ধরা ওই শক্ত হাতদুটোর দিকে। ‘মেঘ, সুন্দরের সামনে মানুষের মন স্থির থাকে না, দুলতে থাকে।’ মেঘের মনটা এখন পেন্ডুলামের মতো দুলছে।
‘মানুষ যখন খুব একা থাকে, তখন সে নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দও শুনতে পায়।’ মেঘের এখন সেই দশা। আবির ভাইয়ের ড্রাইভ করছে। একবারের জন্যও সে বাম দিকে তাকাচ্ছে না। মেঘের খুব ইচ্ছে হলো একটা ঝগড়া শুরু করতে। অকারণে ঝগড়া শুরু করাটা মেয়েদের সহজাত প্রতিভা। মেঘ গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আবির ভাই?”
আবির ভাই নির্লিপ্ত গলায় বললেন, “বল।”
“আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?”
“না।”
“তাহলে কথা বলছেন না কেন?”

আবির ভাই খুব সামান্য সময়ের জন্য মেঘের দিকে তাকালেন। ঠোঁটের কোণে সরু একটা হাসির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। তিনি বললেন,”রাস্তা ভেজা। ড্রাইভ করার সময় কথা বললে কনসেন্ট্রেশন নষ্ট হয়। আর তোর চোখ থেকে এখনো পানি পড়ছে। কান্নারত কারো সাথে কথা বলতে আমার অস্বস্তি লাগে।”
মেঘ চট করে ওড়না দিয়ে চোখ মুছল। মনে মনে বলল, ‘পাথরের মানুষ! রোবট! একটা মেয়ে এত কাঁদছে, তার কোনো পাত্তাই নেই।’

আবির ভাই পর্ব ১

মেঘ আর আবিরের এসব কান্ড পেছন থেকে দেখছে সবাই আর মিটমাট হাসছে। হঠাৎই গ্রাম পেরিয়ে আসতেই ঝড় বইতে লাগল চারপাশে। রাস্তাঘাটে গাছপালা ভেঙ্গে পরার দশা। আবির তাই দ্রুত একটা ফাঁকা জায়গায় বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি পার্ক করলো।

আবির ভাই পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here