আবির ভাই পর্ব ৩২
উর্মিলা মজুমদার
আবির একটা শাড়ি পরা ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন:
”মেঘবালা, যেদিন তুমি আমার নামে ‘কবুল’ বলবে, সেদিন তোমায় হাত ধরে নিয়ে আসব আমার এই স্মৃতির রাজ্যে। সেদিন দেখবে, আমার শূন্যতাগুলো আসলে কতখানি তোমাকে দিয়ে ঠাসা ছিল।”
রাতের খাবার দাবার চলছে ডাইনিং টেবিলে। হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে আবির ভাই বললেন, ‘মেঘ, অরু, প্রেমা তোমাদের কি খাওয়া শেষ?’
সবাই অবাক হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। পেটে খিদে থাকলেও আবির ভাইয়ের গলার স্বরে এমন কিছু একটা আছে যে কেউ আর উচ্চবাচ্য করল না। যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো সবাই মাথা নাড়ল।
আবির ভাই নির্লিপ্ত গলায় বললেন, ‘তাহলে তোমরা ওপরে নিজেদের রুমে চলে যাও।’
ছোটরা চলে যাওয়ার পর টেবিলটা হুট করে অনেক বড় হয়ে গেল। সেখানে এখন শুধু পরিবারের গুরুজনেরা বসে আছেন। আবির ভাই বড় আব্বুর দিকে তাকিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আব্বু, আমি বিয়ে করতে চাই।’
কথাটা শুনে থমথমে পরিবেশে এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দিল। বড় আব্বু একটু হেসে বললেন, ‘এ তো খুব ভালো কথা। আমরা তো ভাবছিলাম প্রেমার পড়াশোনাটা শেষ হোক, তারপর আয়োজন করব। কিন্তু তুমি যখন এখনই চাইছ, তবে দেরি করে লাভ কী? শুভ কাজে দেরি করতে নেই।’
ঠিক সেই মুহূর্তে খাবার টেবিলে বজ্রপাত হলো। আবির ভাই পানির গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আমি প্রেমাকে নয়, মেঘকে বিয়ে করতে চাই।’
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ড্রয়িং রুমে একটা জাদুঘর হয়ে গেল। সবাই যেন পাথরের মূর্তি। কারো মুখে কোনো কথা নেই। বড় আব্বু আর মেজো আব্বুর মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। হঠাৎ বড় আব্বুর রক্ত মাথায় চড়ে গেল। তিনি চেয়ার ছেড়ে প্রায় তেড়ে আসলেন আবির ভাইয়ের দিকে।
‘তোমার সাহস তো কম না আবির! তুমি কি জানো না ছোটবেলা থেকে প্রেমার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে? এখন হঠাৎ এই পাগলামির মানে কী?’
আবির ভাইয়ের চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধ নেই। হিমু স্টাইলের উদাসীনতা নিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি ওসব জানি না। আমি মেঘকেই বিয়ে করব। এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত।’
বলেই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বড় আব্বু রাগে চিৎকার করছেন। আস্ত একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি চেপে বয়সে তার ভেতর। কিন্তু আবির ভাইয়ের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি হনহন করে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপার হলো মেজো আব্বুর আচরণ। তার নিজের মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে, অথচ তিনি একটা ‘টু’ শব্দও করলেন না। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সব দেখলেন। পরিস্থিতি যখন একটু থিতিয়ে এল, তখন মেজো আম্মু বড় আব্বুকে থামানোর চেষ্টা করে বললেন, ‘বড় ভাই থামুন, আপনি শান্ত হোন…’
সাদিফ এক কোণায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কে জানে! মাঝেমধ্যে খুব সাধারণ পরিস্থিতিও মহাজাগতিক জটিলতায় রূপ নেয়। ছোটো আব্বুর মুখটা মূহুর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। যাকে গ্রাম্য ভাষায় বলে ‘চুনকালি মাখা’। তিনি এই বাড়িতে সাধারণত আসতে চান না। আসলেও গুটিয়ে থাকেন। সৎ ভাই হওয়ার যে একটা দেয়াল থাকে, সেই দেয়াল তিনি চাইলেও টপকাতে পারেন না। ড্রয়িংরুমে মেঝো আব্বু বজ্রপাতের মতো ঘোষণাটা দিলেন। মেঝো আব্বু বললেন, “ছোটো, তুই আগামীকালই মেঘকে নিয়ে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যা।”
আসর জমে উঠল। বড় ভাবি আঁতকে উঠে বললেন, “মেঝো ভাইজান, এসব তুমি কী বলছো? নিজের ভাইকে কেউ এভাবে বাড়ি থেকে বিদায় করে?”
মেঝো আব্বু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে জেদ। বললেন, “বড় ভাবি, আমি ঠিকই বলছি। আমার মেয়ের মন আমি ভাঙতে পারব না। ওই মেয়েটা ছোটবেলা থেকে আবিরকে পছন্দ করে। আবির এখন যদি বলে ও মেঘকে বিয়ে করবে, তবে আমার মেয়েটা তো হার্টফেল করবে! ওর কী অবস্থা হবে একবার ভেবেছেন?”
ছোটো আব্বু অপমানে কুঁকড়ে গেলেন। তিনি এই ঘরের আসবাবপত্রের চেয়েও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন। বড় আব্বু অস্বস্তিতে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “ছোটো, তুই কষ্ট পাস না রে। বুঝতেই তো পারছিস পরিস্থিতি। মেঘের ভালোর জন্যই আমাদের এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।”
ছোটো আব্বুর ভেতরের শান্ত মানুষটা হঠাৎ খেপে উঠল। তিনি নাকের ওপর চশমাটা ঠেলে দিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “আর যদি না যাই?”
বাতাসটা জমে হিম। মেঝো আব্বু শীতল গলায় বললেন, “তাহলে মেঘ যে তোর নিজের মেয়ে নয়, এই সত্যটা আজই ওর কানে পৌঁছে যাবে।”
আঘাতটা একদম বুকের মাঝখানে লাগল। ছোটো আব্বু দুই কদম পিছিয়ে গেলেন। নিজের ভাইয়েরাই কি এভাবে পিঠে ছুরি মারে? মেঝো আম্মুসহ অন্যরাও প্রতিবাদ করতে চাইলেন, কিন্তু ছোটো আব্বু আর দাঁড়ালেন না। তিনি টলমলে পায়ে দোতলায় মেঘের ঘরের দিকে ছুটলেন।
মেঘবালা তখন হাসছিল। একটা চমৎকার কৌতুক মনে পড়লে মানুষ যেভাবে একা একা হাসে, সেভাবে। কিন্তু বাবার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে তার হাসি মূহুর্তেই উবে গেল।
ছোটো আব্বু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “মেঘ, তৈরি হয়ে নে মা। আমাদের এখনই গ্রামে ফিরে যেতে হবে।”
মেঘ তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। “কেন আব্বু? কী হয়েছে? তোমার চোখ এত লাল কেন?”
ছোটো আব্বু মিথ্যা বলতে পারেন না, কিন্তু আজ বললেন। গাঢ় স্বরে বললেন, “তোর আম্মু খুব অসুস্থ। এখনই ফিরতে হবে। চড়ুইকে ডাক দে।”
মেঘের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। মা অসুস্থ। এই কথা শোনার পর আর কোনো প্রশ্ন চলে না। মেঝো আব্বু কিংবা আবির ভাই কাউকেই জানানোর সুযোগ হলো না। রাতারাতি জিনিসপত্র গুছিয়ে তারা রওনা হলেন সেই সুদূর পদ্মাপাড়ের উদ্দেশ্যে।
গাড়িতে ওঠার আগে মেঘ একবার ওপরের জানালার দিকে তাকাল। আবির ভাইয়ের ঘরের আলো নেভানো। অন্ধকার বারান্দা। ছেলেটা কি জানে, তাকে কেন্দ্র করে বড়দের ড্রয়িংরুমে কত বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে?
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। রাতের ঢাকা শহরটা বাতি জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাক্ষী হিসেবে। আবির ভাইয়ের সাথে কি আর কোনোদিন দেখা হবে মেঘের? নাকি জীবনটা একটা অসমাপ্ত উপন্যাসের মতো এখানেই থমকে গেল? সন্দিহান উওর।
|৩৭|
সিলেটে আজ দুদিন হলো বৃষ্টি হচ্ছে। একটানা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। এই শহরের বৃষ্টি মানুষকে খুব দ্রুত একা করে দেয়। মেঘ পদ্মাপাড়ের গ্রামে যায়নি। ছোটো আব্বু অত্যন্ত চতুরতার সাথে রুট বদলে মেঘকে নিয়ে সিলেটে তার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়র বাসায় উঠেছেন।
ছোটো আব্বুর ভয়। আবির নাছোড়বান্দা। পদ্মাপাড়ের খবর সে জানে, সেখানে সে ঠিকই পৌঁছে যাবে আর মেঘকে ছিনিয়ে নিয়ে আসবে। কিন্তু সিলেটে এই আধো-চেনা গলির ভেতর তাকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। ছোটো আব্বুর জেদ এখন পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে গেছে। অপমানে মানুষ যখন কুঁকড়ে যায়। তখন সে নিজেকে রক্ষা করার জন্য চারদিকে একটা কাঁটাতারের বেড়া দেয়। ছোটো আব্বুও তাই করেছেন। তিনি মেঘের ফোনটা কেড়ে নিয়েছেন। বাইরের পৃথিবীর সাথে মেঘের এখন কোনো সংযোগ নেই।
ছোটো আব্বুর মাথায় এখন একটাই চিন্তা। মেঘকে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দিয়ে দেওয়া। গ্রামের নিয়ম বা মফস্বলের নিয়ম যা-ই হোক, তিনি চান মেঘকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে ঠেলে দিতে, যেখানে আবিরের ছায়াও পৌঁছাতে পারবে না। মেঘ নিজের ঘরের ভেতর একটা পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। তার ফর্সা মুখখানা কান্নায় ফুলে লাল হয়ে গেছে। চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ। যেটা কেবল বিনিদ্র রজনী পার করলেই দেখা যায়। সে নড়ছে না।
দরজায় শব্দ হলো। ছোটো আম্মু এক হাতে ভাতের থালা আর অন্য হাতে এক বাটি মুরগি ভুনা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। ছোটো আম্মু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটের কোণে বসলেন।
তিনি বললেন, “মেঘ, উঠে বোস মা। দুটা ভাত খেয়ে নে।”
মেঘ কোনো কথা বলল না। সে যেন এই জগতের কেউ না। সে এখন মনে মনে আবির ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। মনে মনে বলছে ‘আবির ভাই, আপনি কি আমাকে খুঁজছেন? নাকি ভুলে গেছেন?’
ছোটো আম্মু আবার ডাকলেন, “লক্ষ্মী মা আমার, শরীরটা তো ভেঙে যাবে। তোর আব্বু যা করছে তোর ভালোর জন্যই করছে। খেয়ে নে।”
মেঘ এবার ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল। তার কণ্ঠস্বর ভাঙা, অনেকটা পুরনো রেডিওর সিগন্যালের মতো শোনাল। সে ধরা গলায় বলল, “না আম্মু, আমি খাব না। আমার ক্ষুধা নেই।”
ছোটো আম্মু থালাটা পাশে নামিয়ে রাখলেন। তিনি জানেন, এই ক্ষুধার নাম শারীরিক ক্ষুধা নয়। এর নাম অন্য কিছু। মানুষ যখন প্রিয়জনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তার পাকস্থলীও বোধহয় অভিমান করে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ছোটো আম্মু মেঘের অবিন্যস্ত চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “মা রে, জেদ করতে নেই। আমরা কি তোর খারাপ চাই? মা-বাবা কি কখনো সন্তানের অমঙ্গল চায়?”
আবির ভাই পর্ব ৩১
মেঘ হঠাৎ ছিটকে সরে গেল। তার দুচোখে এখন শ্রাবণের ধারা। সে চিৎকার করে উঠল, “খারাপ চাও না? তাহলে এই অচেনা জায়গায় কেন নিয়ে এলে আমাকে? কেন মিথ্যা বলে ঢাকা থেকে নিয়ে আসলে? কেন আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে চাইছ আম্মু? উত্তর দাও!”
ছোটো আম্মু আমতা আমতা করে বললেন, “শোন, বিয়ে তো একদিন করতেই হবে। আমরা তো শুধু আকদ করিয়ে রাখব। তোকে এখন বিদায় দেব না, আরও চার বছর পর না হয় যাবি। বুঝলি তো?”
