Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১১

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১১
ইসরাত জাহান দ্যুতি

-‘শাট আপ! শাট আপ! কী করছেন? চেঁচামেচি করছেন কেন? আমাকে আওয়াজ করার সুযোগটা তো দিতে হবে না কি? তার আগেই কেস খায়িয়ে দিতে চান?’
দাঁত কিড়মিড় করে চাপাস্বরেই অজ্ঞাত পুরুষটা ধমকাল। দীধিতিকে চিন্তামুক্ত করে ছেলেটা ছেড়েও দিলো ওকে কথাগুলো বলে৷ শব্দ পাওয়া গেল এবার, হেঁটে ছাদে ফিরে গেছে সে। তারপর হঠাৎ করেই চোখের সামনে সব ঝকঝকে পরিষ্কার দেখতে পেলো দীধিতি। আলো অনুসরণ করে ছাদে উঠে এলো ও-ও। ছাদের লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে সেই ছেলেটি৷ ভীতিকর উত্তেজনার রেশ এখনও কিছুটা রয়ে গেছে ওর মাঝে৷ কড়া পারফিউম মাখা ছেলেটার বদন একনজর দেখবার জন্য তার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। মুহূর্তেই ফের চেঁচিয়ে উঠল ও, ‘ব্লাডি রাসকেল নাওফিল! মশকরা করেন আমার সঙ্গে? আপনি এখানে কী করছেন? স্টক করছেন আমাকে?’

অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেই ভুলে গেল ছেলেটি। কিন্তু ”ব্লাডি রাসকেল” সম্বোধনের কারণে তার মতো খিটখিটে মেজাজের পুরুষের পক্ষে অচেনা মেয়েটির কাছে ভদ্রতা বজায় রাখা সম্ভব হলো না।
-‘ছাগল না কি আপনি? চোখে, মাথায় সমস্যা নিয়ে বাসার বাইরে কী করেন? বাড়ির লোক কোথায় আপনার? ধরে বেঁধে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি? ইয়াসিফ বলে গালি দিলেও বুঝতাম আমার টুইনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু গুলিয়েছেন তো আমার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে। চেহারায় এতখানিও মিল নেই যে, যার জন্য আলাদা করা যাবে না আমাদের। কী সম্পর্ক আপনার সাথে নাওফিলের? কত বড়ো আস্পর্ধা মন্ত্রীর নাতিকে ব্লাডি রাসকেল বলে গালি দেন! গার্লফ্রেন্ড হলেও তো এত দুঃসাহস দেখানোর কথা না। নাওফিল তো নিজের ঘরের মানুষকেও মাথায় তোলে না। সেখানে গার্লফ্রেন্ড!’
এক ঝলক চেয়েই দীধিতি নাওফিল ভেবে নিয়েছিল। কিন্তু এত বড়ো চমক পাবে এ ধারণা তো মোটেও ছিল না! চাচাতো ভাই! ছেলেটা নাওফিলের চাচাতো ভাই হলেও ওর প্রতিবেশী! এ কথা তো নাওফিল কখনই জানায়নি ওকে! না হলো প্রেমিক – প্রেমিকার সম্পর্ক। এসব খবর তো এমনিতেই মানুষ মানুষকে অবগত করে। ইস! কী কাণ্ড ঘটিয়ে বসল ও!

-‘ওহহো… স্যরি! রিয়েলি স্যরি নাওফিল ভেবে গালি দেবার জন্য! আমি আপনার ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড না। কিন্তু খুব পরিচিত। এই যে ব্লাডি রাসকেল বলে গালি দিলাম, এই দুঃসাহসটা দেখানোর মতোই কাজ করেছে সে। এমপির ছেলে বলে ভয় পেয়ে গালি দিতে দু’বার ভাবার মতো ভিতু মেয়ে আমি না। আপনার চাচা এমপি না মন্ত্রী সঠিক জানি না, তার সামনেও ওকে আমি জানোয়ার, কুকুর, অমানুষ বলে গালি দেওয়ার সাহস রাখি ইন শা আল্লাহ৷ তবে আপনার ব্যবহারে হারে হারে বুঝলাম, রয়্যাল ফ্যামিলি বা বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষগুলো ক্ষমতার দাপটে আর অহংকারের বশে প্রকৃত মানুষ আর হয়ে উঠতে পারে না। একটু আগে নিজের ব্যবহারে তা প্রকাশ করলেন। আপনি বুঝতেই তো পারলেন আমি নাওফিল ভেবে গালিটা দিয়েছি৷ কিন্তু তারপরও একটা মেয়ের সঙ্গে কেমন জঘন্যভাবে কথা বললেন!’
-‘আমি তাওসিফ শেখ নিজের অর্জন করা ক্ষমতার দাপটে চলি। দাদা, চাচার ক্ষমতায় না। ইভেন আমাদের ফ্যামিলির কোন ছেলে-মেয়েই বাইরে নিজেদের বংশ পরিচয় বলে সুবিধা নেয় না। নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয় আগে। আপনি নাওফিলকে চেনেন বলেই ফ্যামিলির কথাটা টানা। নাওফিল শেখ পরিবারে সবার কাছে চোখের তারা, কোহিনূর থেকেও মূল্যবান। আমার সেই ছোটো ভাইকে যে ভাষায় গালি দিলেন, তাতে আপনার জায়গায় কোনো ছেলে হলে তার মস্ত বড়ো বিপদ হয়ে যেত। এমন গালি খাওয়া অন্যায় ও সজ্ঞানে করতেই পারে না। যা-ই হোক, আপনার উগ্র ব্যবহারে মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল৷ তার জন্য স্যরি। কিন্তু আপনি সিঁড়িতে ওঠার সময় লাইট জ্বালিয়ে না উঠে আমাকে যেভাবে ফাঁসিয়ে দিচ্ছিলেন তার জন্য তো আপনার আমাকে আরও একবার স্যরি বলা উচিত। আমি বাধ্য হয়ে তখন মুখ চেপে ধরেছিলাম। রাতের বেলা ছাদে আসলে সিঁড়ির লাইট জ্বালিয়ে উঠতে হয় জানেন না?’

বলতে বলতে তাওসিফ দীধিতিকে পুরোদস্তুর পর্যবেক্ষণ করে নিলো৷ যদিও হিজাবে মুখটা ঢেকে রাখা বিধায় চোখ ছাড়া কিছুই দেখার জো নেই৷ বয়সটা ঠিকঠাক অনুমান করতে পারল না এতে। একবার মনে হলো বিশ-একুশ হবে৷ আবার কথার ধরন শুনে মনে হলো চব্বিশ-পঁচিশ৷
তাওসিফের সরু দৃষ্টি খেয়াল করে বিব্রত হয়ে পড়ল এবার দীধিতি৷ সিঁড়িতে দেখল এক ফাঁকে, অনুপমা এলো কি না৷ এমনিতেই আজও খুব জ্যোৎস্না৷ উপরন্তু লাইটের আলোয় দু’জন যুবক-যুবতীকে ফাঁকা ছাদে এমন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে আশপাশ থেকে কেউ দেখে নিলে তা ভালোভাবে নেবে না। দীধিতি ঝটপট উত্তর দিলো, ‘আমি ফ্রেন্ডের বাসায় এসেছি৷’
বলা শেষেই নেমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে অনুপমা এসে হাজির হলো৷
-‘কই যাচ্ছিস? একটু দেরি হয়ে গেল মা’কে একটু হেল্প করতে গিয়ে।’
তাওসিফ জিন্সের প্যান্ট পকেট থেকে এক হাত বের করে পলো শার্টের কলার ঠিক করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল আশেপাশে নজর বুলাতে বুলাতে৷ ও খুব বুঝতে পারছে, এবার অনুপমা মেয়েটা সেধে আসবে ওর সঙ্গে কথা বলতে। এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই আর এই মুহূর্তে।
প্রতিদিন ফজরের ওয়াক্তে নামাজ পড়তে বের হলে ব্যালকনিতে মেয়েটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও। যতবার চোখাচোখি হয়েছে তখন, ততবারই মেয়েটার নির্লজ্জ, নিষ্পলক চাউনির কবলে পড়েছে৷ এসব মেয়ের চোখের ভাষা দূর থেকেই বোঝা যায়।

তাওসিফকে দেখা মাত্রই অনুপমার বুকের মাছে ছলাৎছলাৎ করে উঠল যেন। আনন্দে, উত্তেজনায় দীধিতির কাছ ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ভাই, এই তো সেই ছেলেটা। দেখেছিস ভালো করে?’
বলতে বলতে একটা কফি মগ ওর হাতে তুলে দিলো।
একবার পেছনে ফিরে দীধিতি তাওসিফ একটুখানি দেখে অনাগ্রহী সুরে জানাল, ‘দেখেছি। তাই নিচে নেমে যাচ্ছিলাম৷ আমি ছাদে থাকব না। তুই নিচে নাম।’
আগের মতোই ফিসফিস আওয়াজে অনুপমা তড়িঘড়ি করে বলল, ‘দাঁড়া দাঁড়া দোস্ত, পাঁচ মিনিট। সুযোগ পেলাম আজ কথা বলার। দু’টো কথা বলে যাই। তুই একটু দাঁড়া শুধু আমার সাথে।’
এর পরিবর্তে দীধিতিকে জবাব দেবার সুযোগ না দিয়ে গলায় হালকা কাশির আওয়াজ তুলে মনোযোগ পেতে চাইল অনুপমা। কিন্তু তাওসিফ ফিরল না ওদের দিকে আর৷ মুঠোফোনটাই একটু আগেই নাওফিলের মেসেজ এসেছে৷ সেটার জবাবই লিখছে ও ইনবক্সে।
ফিরতি চেষ্টা তাই অনুপমা আবার করল, ‘এক্সকিউজ মি ভাইয়া! একটু কথা বলতে চাইছিলাম আপনার সঙ্গে।’
ওর বাসা থেকে সুস্থ হয়েই তো গেল নাওফিল আজ সকালে৷ সন্ধ্যার মধ্যেই জ্বরে পড়ল কী করে ছেলেটা? বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে তাওসিফ মেসেজ টাইপ করল, ‘গাজীপুর থেকে আজ আর ঢাকা ফিরিস না। অফিস তো শেষ তাই৷ না? দাদা-দাদীর কাছে চলে যা।’

এর মাঝে অনুপমার ডাক কানে এলেও উত্তর নেওয়ার কথা মাথায় এলো না। জ্বর নিয়ে গাড়ি ড্রাইভিং করে ঢাকা ফিরছে নাওফিল। কখন কোন শত্রুর আক্রমণ হয় তার কি ঠিক আছে? শিল্পমন্ত্রী মাহতাব শেখের নাতি হিসেবে ওদের কাউকে কেউ না চিনলেও নাওফিল শেখকে খুব ভালোভাবে চেনে সবাই৷ আর সেই সাথে এমপি জাহিদ শেখের পুত্র পরিচয় তো আছেই। এই ছেলে কি ওর নিষেধ বারণ মান্য করবে আদৌ। দ্রুত ডায়াল লিস্ট থেকে দাদার সেক্রেটারি ইমরানকে কল করল ও। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই ফোনটা কানে নিয়ে তাওসিফ হাঁটতে হাঁটতে দূরে চলে এলো৷ কড়াস্বরে হুকুম জারি করল, ‘আপনি যেখানেই থাকেন সেখান থেকে নাওফিলের কাছে পৌঁছন। ও এতক্ষণে চৌরাস্তা পৌঁছে গেছে হয়তো। ওকে আজ বাড়ি নিয়ে যান যেভাবে পারেন। ও অসুস্থ। পারলে দাদাকে খবরটা জানান। যদি দাদা ফ্রি থাকেন তো।’

ওপাশ থেকে আদেশ মান্য করার উত্তরই এলো বোধ হয়। কথাগুলো দীধিতি বা অনুপমার কানে যাতে না পৌঁছয় সে কারণে দূরত্ব সৃষ্টি করলেও দীধিতির কর্ণগোচর হয়ে গেল আবছা আবছা। নাওফিলের নামটাসহ ”অসুস্থ” আর ”দাদা ফ্রি থাকেন তো”, এই তিনটা কথা শুনতে পেয়েছে ও। অগোছালো কথাগুলো মিলিয়ে নিজের মতো ভেবে নিলো, নাওফিল অসুস্থ হয়তো। চিন্তা বাড়ল ওরও। একটু খোঁজ নেবে না কি তাওসিফের কাছে? দোটানায় ভুগতে থাকল খুব। তাওসিফ এগিয়ে এসে সটান দাঁড়াল ওরই মুখোমুখি। কিন্তু তাকাল অনুপমার দিকে, বলল, ‘হ্যাঁ বলুন কী বলবেন? ইম্পর্ট্যান্ট কল ছিল তাই তখন উত্তর নিতে পারিনি।’
মুচকি হাসল অনুপমা। বলতে চাইল, ‘ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই।’
কিন্তু তার আগেই ওর পাশ থেকে কানে এলো, ‘নাওফিল কি অসুস্থ? কাল কি ও আপনার এখানেই ছিল? আসলে আমার সঙ্গে গতকাল রাতে মেসেজে কথা হয়েছিল। খুব বেশি কথা হয়নি।’
বিস্ময় নিয়ে অনুপমা চেয়ে রইল দীধিতির দিকে। কিন্তু দীধিতি উৎসুকভাবে চেয়ে আছে তাওসিফের দিকে। ভ্রুক্ষেপই নেই অনুপমা কী ভাবল তা নিয়ে!

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১০ (২)

সহজ, স্বাভাবিক গলায়ই তাওসিফ জানাল, ‘হ্যাঁ ছিল গতকাল রাতে আমার কাছেই। হঠাৎ জ্বর এসেছে এই আর কী!’
তারপরই শুধাল, ‘আপনার সাথে ঠিক কেমন সম্পর্ক ওর?’
-‘বিশেষ কিছুই হতো৷ যদি সুযোগ দিতাম৷ ডিটেইলস ওর থেকে জেনে নিয়েন।’
বলেই দীধিতি নেমে এলো ছাদ থেকে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here