আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি
ইয়াসিফের আবদারের জবাবে শান্ত, ললিত চেহারায় ঠোঁট ছড়িয়ে ফ্লোরেন্স হাসল। সে হাসিতে আশকারা পেল ইয়াসিফ— চোখের পলক ফেলার পূর্বেই ফ্লোরেন্সের কোমল পল্লবের সাথে দু’ঠোঁটের সন্ধি করে ফেলল চকিতেই। ওর বুকের মাঝে ধাক্কা দিয়ে তক্ষুনি ওকে সরাতে চাইল ফ্লোরেন্স।৷ তাতে বলবান পুরুষালি হাতজোড়া আকস্মিক ওর বাঁকানো, চিকন কোমর চেপে ধরল আরও নাছোরবান্দার মতো। হিতাহিতজ্ঞান বর্জিত ইয়াসিফ! তার মন, মস্তিষ্ক কিছুই নিজের আয়ত্তে নেই৷ কিন্তু এ মুহূর্তে ইয়াসিফের দেহস্থ অনুভূতি যেন খ্যাপাটে হয়ে উঠেছে। কিন্তু এটা তো হওয়া অসম্ভব। ফ্লোরেন্স কি তবে পারেনি পরিপূর্ণ সম্মোহন বিদ্যার সঠিক প্রয়োগ করতে?
তারপরের পরিকল্পিত ঘটনাটা মাত্র তিন সেকেন্ডে ঘটে গেল ইয়াসিফের সঙ্গে। আবদারে পাওয়া মাতোয়ারা চুমুর মাঝেই তার কাঁধে গেঁথে গেল চোখা সুচ। জ্বলে উঠল কিঞ্চিৎ সেখানে৷ বিদ্যুতের ঝটকা লাগার মতোই ইয়াসিফ থমকে গিয়ে ফ্লোরেন্সের অধর ছেড়ে দিলো। ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকানোর চেষ্টা করল তারপর৷ স্পষ্ট চোখের সামনে মোনোলিড চোখের মাভিশাকে নির্দয়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল সে৷ অভিব্যক্তি প্রকাশের আগেই অনুভব করল, সারা শরীর কেমন দুর্বল হয়ে আসছে তার ধীরে ধীরে৷ তখনই কানে এলো ফ্লোরেন্সের কণ্ঠ। তাকে বলছে, ‘আপনার এখন লম্বা একটা ঘুম প্রয়োজন, অফিসার।’
ফ্লোরেন্সের দিকে তাকানোর সুযোগটুকুও পেল না এরপর ইয়াসিফ… মস্তিষ্ককে স্থির করে পুরো পরিস্থিতির সমীকরণ মেলানোর আগেই মাভিশার ওপর ঢলে পড়ল সে।
যেন এক আহত সৈনিক দীধিতি! ক্ষতবিক্ষত, কাহিল অন্তর নিয়ে যে শয্যায় পড়ে আছে সে নিষ্প্রাণের মতো । আর তার থেকে ক’হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আরেক পরাজিত সৈনিক কিংকতর্ব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে তাকেই দেখে যায় নিষ্পলক।
গরমে ঘুমটা হঠাৎ করেই ভেঙে গেল তাওসিফের। বেলকনির থাই গ্লাস টেনে না দেওয়ার জন্য এসির হাওয়া গায়ে লাগছে না। বিরক্তি নিয়ে উঠে পড়ে গ্লাস লাগাতে এসে দেখল নাওফিলকে দাঁড়িয়ে থাকতে। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে যখন ওর কাছে এলো, তখন ওকে বিধ্বস্ত, পরাস্ত চেহারায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে পড়ে গেল দীধিতির কথা। মেয়েটার এখন কী অবস্থা? তা জানতেই দ্রুত পায়ে ছুটে এলো নাওফিলের কাছে। ওর কাঁধে হাতটা রাখল। তাতেও সম্বিত ফিরে পেল না সে… না কি কোনো এক যন্ত্রণাগ্রস্ত ঘোরে ডুবে আছে?
-‘দাঁড়িয়ে আছিস যে এভাবে? স্মরণের কী হাল এখন?’
জড়িয়ে আসা স্তিমিত গলায় বলল নাওফিল, ‘আমি স্মরণের কাছে থাকতেই পারছি না, ভাই! আমার বউ … আমার সে … সম্পূর্ণই তো আমার। কিন্তু সেই আমিই ওর কাছে থাকতে পারছি না! আমার সহ্য হচ্ছে না একদমই।’
গতকাল তো তাওসিফ আর সৌরভের বেলাতেও তা-ই ঘটেছিল। কিন্তু তাওসিফের ধারণা ছিল, বলতে গেলে পূর্ণ বিশ্বাস ছিল নাওফিল এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে৷ কিন্তু তা যেহেতু হলো না, তার মানে ঘটনা গুরুতর।
-‘ঘুমিয়েছে কখন?’
-‘যখন থেকে আমি ঘরের বাইরে।’ নাওফিলকে লাগছে প্রস্তরীভূত হওয়া এক পুরুষ।
তাওসিফ ঘরের ভেতর তাকাল। এক রাতের ব্যবধানেই কেমন রুগ্ন লাগছে ঘুমন্ত দীধিতিকে। পুরোটা রাত যে মনে আতঙ্ক নিয়ে নির্ঘুম কাটিয়েছে, তা বুঝতে দেরি হলো না। নাওফিলকেও দেখতে খুব এলোমেলো লাগছে।
-‘ব্যাপারটা নিয়ে বসে কথা বলি, এদিকে আয়।’
ওকে ডেকে নিয়ে তাওসিফ লিভিংরুমে এসে দু ভাই পাশাপাশি বসল। নাওফিল সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে বলল, ‘আমি সহীহ্ করেই সব সূরা, আয়াত পড়ে ওকে রুকইয়াহ করে দেওয়ার পর যেন আরও বেশি সমস্যা দেখা দিলো৷ আমার চোখের সামনেই ওর হাতে, পায়ে, খোলা জায়গাগুলোতে খামচির দাগ, আঁচড়ের দাগ পড়তে দেখলাম৷ এরকম তো আমার সঙ্গে কখনও হয়নি৷ আর সারাজীবন এভাবেই তো নিজেকে প্রোটেকশন দিয়ে আসছি আমি। বিয়ের পর থেকে ওকেও করে দিচ্ছি। সমস্যাটা তাহলে কীভাবে হলো হঠাৎ করে? কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না যেন বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা।’
-‘আগে যেরকম হত তোর সঙ্গে, বর্তমান সেরকম কিছু ঘটেনি?’
চোখটা মেলে সোজা হয়ে বসল নাওফিল, ‘সেরকম কিছু হয়নি৷ কিন্তু অন্য ব্যাপার হয়েছে৷ যেদিন রাতে এলাম এখানে, সেদিন রাতেই ড্রয়িংরু থেকে বিড়ালের ডাক শুনেছি৷ আমি সিঁড়িতে উঠতেই পেছনে ভারী কিছু পড়ার আওয়াজ হয় হঠাৎ। তারপরই বিড়াল ডেকে ওঠে।’
-‘দাদাকে জানাতে হবে তাহলে। স্মরণের সাথে ডেঞ্জারাস কিছু হচ্ছে৷ তাড়াতাড়ি এটার ট্রিটমেন্ট নিতে হবে।’
কথাটা শুনেই নাওফিলের মাথায় কী যেন ভাবনা এলো৷ ও দ্রুত শোবার ঘরে গিয়ে ফোনটা নিয়ে আবার ফিরে আসলো। ফোনে স্লাইড করতে করতে তাওসিফকে বলল, ‘নতুন বউয়ের সঙ্গে ভৌতিক কাণ্ডকারখানার গল্প জানানো বুদ্ধিমানের কাজ না, মিহাদ। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে আমিই যোগাযোগ করি।’
তাওসিফ বিদ্রুপ করে বসল, তখন ‘ছ’মাস আগে মারা গিয়ে কবরে শুয়ে তোকে ট্রিটমেন্ট দেবে না কি সে?’
চকিত হয়ে তাকাল তখন নাওফিল তাওসিফের দিকে, খুব বিস্মিত হলো, ‘মারা গেছেন? কবে?’
-‘তুই অস্ট্রেলিয়া থাকতেই।’
একদম হতাশ হয়ে পড়ল নাওফিল। ধপ করে সোফায় বসে পড়ল, ‘তাহলে কার কাছে এখন হেল্প চাইব? এখানের ইমাম সাহেব অসুস্থ। ওনার পরিবর্তে নতুন ইমাম আসছে।’
তাওসিফ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বলল, ‘মাওলানা সাহেবের পরিবারে আর কেউ এসবের চিকিৎসা সম্পর্কে জানে না?’
-‘জানতেই পারে৷ এটা তো মাথায় আসেনি! ওনার দুই ছেলে আছে৷ আর ওনার নাতি মেহরাবের কথা মনে আছে তোর? আমার থেকে বছর দুইয়ের বড়ো। মাদ্রাসায় পড়তাম এক সাথেই। গত বছরও দেখা কথা হয়েছিল। ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখি কোনো পথ খুঁজে পাই কি না।’
তাওসিফও মাথা নেড়ে সায় জানাল।
আজকের ভোর রাতটা যে চায়ের দোকানদারের জন্য সর্বনাশের রাত। তা যদি একবার পূর্বানুমান করতে পারত লোকটা, তাহলে জীবনেও সে দোকান খুলে রাখত না।
এই দোকানদারকে মাভিশা ডেকে এনে যখন ফ্লোরেন্সের সামনে দাঁড় করাল, তখনও সে বুঝতে পারেনি শেষ রাতে আচমকা দেখা দুই সুন্দরীর স্বরূপ কী হতে পারে।
ইয়াসিফের কোমর থেকে ৯ এম এম পিস্তলটা বের করে ফ্লোরেন্স ডান হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ঠিক পায়ের কাছেই জ্ঞানহারা ইয়াসিফ লুটিয়ে আছে। ওকে পড়ে থাকতে দেখে দোকানদার কৌতূহল গলায় মৃদু চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী হইছে উনার? অজ্ঞান হইল কীরাম করি?’
তার দিকে শীতল চোখে চেয়ে থাকা ফ্লোরেন্সের হাতের পিস্তলটা তখনও চোখে পড়েনি। মাভিশা রুঢ় কণ্ঠে তাকে আদেশ করল, ‘ওকে গাড়িতে তুলতে হেল্প করেন আমাদের। অত কথা বলার সময় নাই।’
সে সময়ই ফ্লোরেন্সের হাতের দিকে চোখ পড়ল দোকানদারের। হাঁটু কেঁপে উঠল তার চকিতেই। ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাডাম, আফনেরা কারা?’
বিরক্ত নিয়ে ফ্লোরেন্স এগিয়ে এসে পিস্তলটা লোকটার কপালে ঠেকিয়ে ধীর স্বরে বলল, ‘উই আর ইন আ হারি। তাই যা বলছি তাড়াতাড়ি করো।’
এমন পরিস্থিতিতে লোকটা ইহকালে এই প্রথম পড়ল। সারাজীবন পিস্তল জিনিসটা সে টিভিতেই দেখেছে কেবল। এমন মারণাস্ত্র কপালে ঠেকানো দেখে কেঁদে উঠল, প্রচণ্ড ভয়ে পরনের লুঙ্গিটা ভিজিয়েই ফেলল। মাভিশা তা দেখে ঘৃণায় নাক কুঁচকে সরে এলো তার থেকে। ফ্লোরেন্স তার হাল দেখে পিস্তলটা নামিয়ে নিয়ে চোখের ইশারায় দ্রুত ইয়াসিফকে তুলতে বলল। লোকটি আর দেরি করল না। কাঁপা হাতেই ইয়াসিফকে ধরল। কিন্তু তার বলে কুলাল না। কাঁদতে কাঁদতে জানাল, ‘ম্যাডাম, এ তো ম্যালা ওজন। একলা পারুম না মনে হয়।’
হাতের অস্ত্রটা ফ্লোরেন্স মাভিশার দিকে ছুঁড়ে দিলে সেটা অবিলম্বে ক্যাচ করল মাভিশা। তারপর লোকটার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইয়াসিফকে টেনে তুলে ইয়াসিফের পেছনে থামা গাড়িটাতে এনে তুলল। রীতিমতো হাঁপিয়ে গেছে দুজনই। সত্যিই প্রচুর ভারী ছিল ইয়াসিফের দেহটা। মাভিশা এগিয়ে এসে কোনো কথা ছাড়ায় লোকটার চোয়ালে আবারও শক্তভাবে পিস্তল ঠেকিয়ে সাবধান থাকতে হুমকি দিলো, ‘এখন থেকে চব্বিশটা ঘণ্টায় আমাদের নজরবন্দি থাকবে। কথাটা মাথায় রেখো। এখন আসতে পারো।’
যাওয়ার অনুমতি পেয়ে লোকটা এক সেকেন্ডও আর দাঁড়াল না। দৌঁড়ে গিয়ে দোকানে ঢুকে দোকানের ঝাঁপি নামিয়ে ফেলল। গাড়িতে বসা বিশ বছরের ছেলেটাও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নেমে এলো তখন। জিজ্ঞেস করল মাভিশাকে, ‘আপা, আমিও তাহলে যাই?’
ধমকে উঠল মাভিশা, ‘আরে দাঁড়া৷ তোর কাজ শেষ হয়নি৷ এত তাড়া কীসের? সেই তো ঢাকায় ঢুকে মস্তানগিরি করে বেড়াবি, চুরিচামারি করবি। ওই লাল গাড়িটা নিয়ে সামনের ব্রিজে একটা অ্যাক্সিডেন্ট করাবি। তারপর বিদায় নিবি।’
ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে ইয়াসিফের গাড়িতে গাড়িটা নিয়ে চলে গেল৷ যেতে যেতে ওদের দুজনকে বিশ্রী গালি গালাজ করতে ভুলল না। সঙ্গে নিজেকেও দিলো৷ ঢাকা থেকে ওদের ওই গাড়িটা চুরি করতে গিয়েই ধরা পড়েছিল সে ফ্লোরেন্সের হাতে৷ ওর হাতের কঠিন কয়েকটা চড় খেয়ে মাড়িই নড়ে গিয়েছিল তার। মেয়ে মানুষের হাত পুরুষদোর মতো অমন শক্ত হয়, তা জানা ছিল না। এরপর এমনভাবে ফেঁসে গেল ওই দুটো মেয়ের চক্করে! যেখান থেকে ছুট পেলেও মুক্তি পাওয়া নয়।
মাভিশা ড্রাইভিং সিটে। আর ব্যাকসিটে কোনোরকমে ফেলে রাখা হয়েছে ইয়াসিফকে। পাশেই বসে আছে ফ্লোরেন্স। চট্টগ্রাম পৌঁছতে পৌঁছতে জ্ঞান ফিরলেও যেন নড়চড় করার কোনো সুযোগ না পায় ইয়াসিফ, তার জন্য সে আনেসথেসিয়া হাতে রেখেছে৷ কিন্তু মাভিশা সেটা প্রয়োগ করতে একেবারেই নারাজ। ফ্লোরেন্সকে সতর্ক করল, ‘ওর যদি রক্তচাপ, হাইপারটেনশন বা কোনো কার্ডিয়াক প্রবলেম থাকে তাহলে কিন্তু বিপদ হবে।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৩ (২)
-‘হোক। আমার হেডেক নেই তা নিয়ে।’
-‘মানে কী? ভুলেও কোনো ভুল করা যাবে না আমাদের। আমরা ভুলতে পারি না ওর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড।’
ফ্লোরেন্স কটাক্ষ করে বলল, ‘সরাসরি কেন বলছিস না তোর কষ্ট হবে এই ছেলের জন্য?’
মাভিশা একটু নিভল। আপাতত আর কোনো কথা হলো না ওদের গাড়ির মধ্যে।
