Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৭

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৭

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি

-‘ইউ আর সো লেট, ম্যান।’
নাওফিল এগিয়ে আসতে আসতেই কথাটা হাসিমুখে ছুঁড়ে দিলেন পররাষ্টমন্ত্রী সিরাজ সাহেব। উত্তরে নাওফিল কিছুটা লাজুক হাসল। বিশাল সম্মাননীয় ব্যক্তিবর্গের ভিড়ে এসে, মাহতাব সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে, ঠোঁটে বিনয় হাসি ধরে একে একে সবার সঙ্গে করমর্দন করে নিলো সে৷ দীধিতি হঠাৎ তখন ওর পেছন থেকে সামনে এগিয়ে এলো, দাঁড়াল নিঃসঙ্কোচে ওর পাশে।
-‘তোমার থেকেও মহাব্যস্ত, বয়ঃজ্যোষ্ঠ মানুষগুলো তোমার আগে এসে হাজির হয়েছেন। আর তুমি বাড়ির কাছের মানুষ হয়ে ট্রেন ফেল করো?’ নাতিকে কৌতুকের ছলে বললেন মাহতাব সাহেব।
যদিও ব্যাপারটা আসলেই কিছুটা অনুচিত হয়েছে। ওর পার্টিতে ঢুকে পড়ার কথা ছিল সন্ধ্যার মধ্যেই। আর মাহতাব সাহেব নটার মধ্যে আসার কথা বলেও তিনি সাতটার মধ্যে এসে পড়েছেন। সেখানে ওরই আগমন ঘটল সবার পরে। দাদা মজা করে কথাটা বললেও আদতে তিনি অসন্তুষ্টির সঙ্গে নাতির থেকে কৈফিয়ত কামনা করছেন। তাই বিব্রতপূর্ণ হাসিটা মুছে সরস কণ্ঠে, নাটকীয় ভঙ্গিতে সবার উদ্দেশ্যে বলল, ‘আই অ্যাম সো স্যরি, হ্যান্ডসাম গাইজ।’
হেসে ফেলল উপস্থিত সকল বয়ঃজ্যোষ্ঠই। মুচকি হাসল তানিয়াও। সে নিজের চাচার পাশে দাঁড়িয়ে নাওফিল, দীধিতি দুজনকেই লক্ষ করছিল।

-‘আসলে বিশেষ এক কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম’, বলে দাদার দিকে একবার তাকাল সে। কৈফিয়ত প্রদান করল আরকি৷
‘বিশেষ’ শব্দটিতে ওর আলাদা জোর দিতে দেখে চৌকস ধারার মানুষগুলোর নজর নিবদ্ধ হলো গিয়ে দীধিতির ওপর। এতক্ষণে যে দীধিতিকে নজরে পড়েনি তা নয়। তারা অপেক্ষা করছিলেন, নাওফিল কখন মেয়েটির পরিচয় জানাবে। দীধিতির দিকেই যে ‘বিশেষ’ শব্দটির মাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছে সে, তা বুঝতে পেরেছে তানিয়াও। সে কৌতূহল ব্যাপারটি একদমই নিজের মাঝে চাপিয়ে রাখতে পারে না। তাই দাম্ভিকতা বজায় রাখার ধার না ধেরে সহাস্যে বলে উঠল দীধিতির উদ্দেশ্যে, ‘আমি ধারণা করে নিচ্ছি, আমাদের মোস্ট অনারেবল স্টেট মিনিস্টার আপনাকে ইন্ডিকেট করলেন, মিস…’ প্রশ্নবোধক রেখে তানিয়া করমর্দনের উদ্দেশ্যে হাতটা বাড়িয়ে দিলো দীধিতির দিকে। দীধিতি মুচকি হেসে চকিতেই তার হাতটা ধরে মৃদু ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলো, ‘মাইসেল্ফ, স্মরণ।’

-‘তানিয়া আহসান। নাইস টু মিট ইউ, স্মরণ।’
-‘থ্যাঙ্ক ইউ, তানিয়া। আপনার ধারণা সঠিক কি-না, তার জবাব রেসপেক্টেড স্টেট মিনিস্টারই ভালো বলতে পারবেন।’
-‘আমি কিন্তু প্রথম থেকেই আপনাকে নোটিস করছিলাম, স্মরণ। কেন বলুন তো?’ তানিয়া হাসিখুশি স্বভাবের ভীষণ মিশুক মেয়ে। তা বুঝতে পেরে দীধিতির একটু আগের কিঞ্চিম্মাত্র অস্বস্তিটুকু বিলীন হয়ে গেছে। তাই স্মিতহাস্যে উত্তর দিলো, ‘কারণ, আমরা সেম ডিজাইনারের তৈরিকৃত আউটফিটস পরে আছি।’
হা হা শব্দে হেসে তানিয়া মাথা দোলাল সম্মতিসূচকে। ‘মাহি ওয়্যারহাউজের ড্রেসে কিছু নিজস্বতা আছে। যা দেখলেই বোঝা যায়, এটা তাদের করা কাজ।’
-‘এক্সাক্টলি।’

ওদের দুজনের আলাপচারিতার ফাঁকে নাওফিল দাদার মুখভঙ্গি দেখে নিতে ভুলছে না৷ এই শক্ত ছাঁচে গড়া মানুষটা নিজের অভিব্যক্তিকে আড়াল রাখতে দারুণ পটু। তাই বোঝার উপায় নেই যে, এই মুহূর্তে ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি দীধিতি, তা জানার পর দাদার ভেতরে কী চলছে। সেটা না প্রকাশ পেলেও নাওফিল ঠিকই টের পাচ্ছে দাদার চোখে চেয়ে, তিনি শান্ত অথচ ভেতরে ভেতরে ক্রুদ্ধ হয়েই দীধিতিকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। আর ভাবছেন, তার নাতি ঠিক কী পরিকল্পনা করে আজকের দিনেই এভাবে দীধিতিকে নিজের সঙ্গে এনেছে?
দীধিতি আর তানিয়ার আলাপের বিষয়বস্তু নিয়ে মন্ত্রী মহাশয়েরা ওদেরকে টিটকারির চোখে দেখতে ছাড়লেন না। একজন তো ওদের উদ্দেশ্যে বলেই ফেললেন, ‘নারী প্রজাতিরা এক জায়গাতে হলেই তাদের জাতীয় টপিকস হয় হলো শাড়ি, চুরি আর গহনা। এর বাইরে এই প্রজাতিকে কখনও অন্য কিছুতে গসিপিং করতে দেখলাম না।’

-‘উইমেন্স!’ বলেই রাফিয়ান রাফি হো হো করে হেসে উঠল। এতক্ষণ এক পাশে চুপচাপই দাঁড়িয়ে ছিল সে। তার হাসির সাথে গলা মেলাল আরও কজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অর্থাৎ বাবার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতেই তাকে উপস্থিত হতে হয়েছে এখানে৷ দীধিতিকে নাওফিলের পাশে দেখা মাত্রই মনে মনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছিল সে। সেই সাথে ভাবছিল, একটু সুযোগ পেলেই কথা বলতে চেষ্টা করবে সে দীধিতির সঙ্গে৷ আর এজন্যই কথাটা বলে দীধিতির নজর কাঁড়ার চেষ্টা করল একটু।
কিন্তু তার দিকে নজর গেলেও দীধিতি বিশেষ পাত্তা দিলো না তাকে। তানিয়া অন্যদেরকে তুখোড় জবাব শোনাতে মশগুল । সেদিকেই মনোযোগ দিয়েছে সে। এর মাঝেই নাওফিলকে সিরাজ সাহেব, ‘ইন্ট্রুডাকশন চাইছি, নাওফিল’ বলে দীধিতির দিকে ইশারা করলেন।
-‘অফকোর্স, স্যার।’ নাওফিল অনায়াসেই দীধিতির ডান হাতটা নিজের হাতের মাঝে চেপে ধরল। ‘অস্ট্রেলিয়া উডসাইড এনার্জি কোম্পানির পরিচালগোষ্ঠীর একজন স্যামুয়েল টেলর। তারই এল্ডার ডটার স্মরণ।’

বোমা বিস্ফারিত হলো বোধ হয় দলটার মধ্যে। বিস্ময়ের চূড়ান্তে দীধিতি নিজেও। নাওফিল এভাবে তার পরিচয় তুলে ধরবে, তার কোনো আগাম ইঙ্গিতও দেয়নি তাকে।
এদের মাঝে অনেকেই আন্তর্জাতিক ব্যবসার খবরা-খবর রাখে৷ উডসাইড এনার্জি হলো পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান আর উৎপাদনকারী একটি কোম্পানি। মার্কেট ক্যাপ অনুসারে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম কোম্পানিগুলোর মাঝে এর অবস্থান সপ্তমে। আর এই কোম্পানির পরিচালক কেবল স্যামুয়েলই নয়। তার আরও তিন বন্ধুও। ওরা সমাজের নিচের মহলে আধিপত্য বিস্তার করার পর জায়িনের পরিকল্পনা মোতাবেক এবং তার বিপুল অর্থের মাধ্যমে বন্ধুরা মিলে এই কোম্পানি তৈরি করে। এবং যুগে যুগে কোম্পানির কেবল অগ্রগতিই হয়েছে।
মাহতাব সাহেব পুরোটা সময়ই নিশ্চুপ রইলেন। এমনকি এ মুহূর্তেও। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের ভাতিজির তুলনায় দীধিতির উচ্চস্থান মেনে নিতে না পেরে উত্তেজনার বশে বলে ফেললেন, ‘পাগল হলে না-কি, নাওফিল?’ মুহূর্তেই নাওফিলসহ অন্যরাও তার দিকে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকালে ভুল বুঝতে পেরে তিনি অপ্রস্তুত হাসলেন। দ্রুত শুধরে নিলেন নিজের কথাটা৷ ‘ওহ ম্যান, অস্ট্রেলিয়ার এত বড়ো বিজনেসম্যানের মেয়ের সঙ্গে তোমার পরিচয়টা হলো কীভাবে?’

-‘আমার বায়োলজিক্যাল ফাদার ওই কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন, স্যার। যদিও বিশেষ এক কারণে সেটা কাগজে কলমে উল্লেখ রাখেননি আমার বাবা৷ উল্লেখ আছে স্মরণের গ্র্যান্ডফাদারের নাম।
আর গত কয়েক বছর আগেই কোম্পানির একজন ডিরেক্টর আমাকে অফার করেছিলেন তাদের সঙ্গে যোগদান করতে। কিন্তু দাদা রাজি হননি, আমি অস্ট্রেলিয়াতে শিফট হই।’ বলে মুচকি হেসে সে দাদার দিকে তাকাল। মাহতাব সাহেবও সে মুহূর্তে নাতির দিকেই চেয়ে ছিলেন। দেখছিলেন ওকে এবং ভাবছিলেন নিজের যুবক কালকে। ঠিক এতখানিই কি ধূর্ত ছিলেন তিনি সে সময়? না-কি এর চেয়েও বেশি?
-‘ওহ হ্যাঁ, জায়িন মাহতাব! বাট এমন চাঞ্চল্যকর কথা মাহতাব স্যার তো কোনোদিন শেয়ার করলেন না আমাদের সঙ্গে।’ হাসতে হাসতে সিরাজ সাহেব কথাটা উদ্দেশ্য করলেন এবার মাহতাব সাহেবকেই।
প্রস্তুতই ছিলেন মাহতাব শেখ। ‘ফেরারি ছোটো ছেলেটার ভালো-মন্দ সবেতেই আমার আগ্রহ শূন্য, সিরাজ।’ এমন এক কথার পর আর কিছু বলার অবকাশ থাকে না কারও।
-‘তাহলে কি স্মরণের মম বাঙালি?’ আবারও কৌতূহল দমিয়ে রাখতে অপারগ হলো তানিয়া।
-‘হ্যাঁ, ওখানের প্রবাসী বাঙালি। জেরিন ইসলাম। পেশায় একজন সাইকলোজিস্ট।’ এ জবাবটা দীধিতিই দিলো সাজিয়ে গুছিয়ে।

প্রসঙ্গটা নিয়ে আলোচনা আরও দীর্ঘক্ষণ চলল। নাওফিল অবশ্য জানত, এমন একটি তথ্য সকলের কাছে তুলে ধরার পর সিরাজ সাহেব বা মাহতাব সাহেব নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবার অবকাশ পাবেন না। জেনে শুনেই সে আজকের দিনে বিস্ফোরণটা ঘটাল৷ কথায় কথায় নাওফিল তাদের জানিয়েও দিলো, দু পরিবারের সম্মতি পেলে দীধিতি আর সে নতুন জীবনে পদার্পণ করবে। এ কথার পরই সিরাজ সাহেব আঁড়চোখে মাহতাব সাহেবকে দেখে নিলেন৷ কিন্তু বৃদ্ধ মানুষটির চেহারায় নির্বিকার ভঙ্গি দেখে ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ হলেন এই ভেবে, তিনি নিশ্চয়ই জানতেন নাতির এ সম্পর্কের কথা। নয়ত ভদ্রলোক রাগছেন না, চমকাচ্ছেন না, কিছুই বলছেন না নাতিকে।
দীধিতি হঠাৎ সবার থেকে সাময়িক সময়ের জন্য বিরতি চেয়ে নিয়ে চলে গেল কিরণদের কাছে৷ তখন নাওফিলও সৌজন্য হেসে তানিয়াকে বললেন, ‘আপনি বোধ হয় পার্টিটা আরেকটু ইনজয় করতে চান, তানিয়া। তাহলে আমার সঙ্গে জয়েন করতে পারেন।’

-‘শিওর। চলুন যাই।’
চাচার থেকে বিদায় নিয়ে তানিয়া নাওফিলের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো বার কাউন্টারে। দুজনে হাতে দুটো ভার্জিন মোজিত নিয়ে গল্পে মেতে উঠল। এক সময় নাওফিলকে তানিয়া জিজ্ঞেস করে বসল, ‘আমার পার্টিতে আসার কারণটা কি জানেন, নাওফিল?’
-‘আব… মানে বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?’ কপট অপ্রস্তুত স্বরে জানতে চাইলো নাওফিল। কিন্তু কপটতা ওর চেহারাতে ফুটে উঠল না। তানিয়া হা হা করে হেসে ফেলল কেন যেন। তারপর বলল, ‘আপনি দেখি জানার আগেই ঘাবড়ে যাচ্ছেন? তার মানে আইডিয়া করতে পারছেন, তাই না?’
-‘না, আসলে… মানে… আপনি বলুন না!’ আবারও বিচলিত হওয়ার নাটক নাওফিলের৷
-‘আরে মশাই, নার্ভাস হতে হবে না। আপনার আর আপনার ব্ল্যাক কুইনের মাঝে ভিলেন হওয়ার সাধ নেই আমার। তবে আপনার উচিত ছিল, স্মরণের ব্যাপারে আপনার পরিবারকে আগেই অবগত করা। তাহলে আজ মাহতাব শেখকে এমব্যারেসড্ হতে হত না।’

-‘দাদাকে কেন এসব্যারেসড্ হতে হবে?’
-‘উফ্, ড্রামা বন্ধ করুন, হিরো। আমি আপনাকে কী বলতে চাচ্ছি তা আপনি কিন্তু ভালোই বুঝেছেন।’
ঠোঁট টিপে হাসল নাওফিল অন্যদিকে ফিরে। তানিয়া তা দেখে নিজেও হাসল। বলল ওকে, ‘আপনি যখন এসে দাঁড়ালেন, তখন আমার দৃষ্টি ছিল আপনার ওপরই৷ কারণ, যার সঙ্গে আমার জীবনের আগামী দিন কাটানোর পরিকল্পনা চলছে। তাকে তো আমার অবজার্ভ করতেই হবে। সে সময়ই স্মরণের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়। আপনাকে আমার ক্যাপ-আ-পাই নোটিস করতে দেখেই ও সঙ্গে সঙ্গে আপনার পাশে এসে দাঁড়াল, আমাকে ঠান্ডা দৃষ্টি ছুঁড়ে। আমি ওই মুহূর্তটা দারুণ ইনজয় করেছি।’
-‘তাই না-কি?’ এবার সত্যিই একটু বিস্মিত হলো নাওফিল। তথ্যটা জেনে সেও মনে মনে উপভোগ করল। অতিথিদের ভিড়ে দুজনেই তাকাল তখন ইয়াসিফ আর তাওসিফের দলটার দিকে। দীধিতি সেখানেই দাঁড়িয়ে গল্প করছে ওদের সঙ্গে। কিছুক্ষণ পর তানিয়াকে জানাল নাওফিল, ‘আমি আসলে আজকের বিশেষ দিনটাকেই সিলেক্ট করেছিলাম, দাদাকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য।’

-‘ওদিকে আপনার দাদাও আপনার জন্য সারপ্রাইজের বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন। কিন্তু তা আর হতে দিলেন কই!’ মিটিমিটি হেসে তানিয়া বলল ওকে। কিন্তু এই মুহূর্তে মেয়েটার দৃষ্টি অন্য কারও প্রতি নিবদ্ধ। সেদিকেই চেয়েই যোগ করল, ‘স্মরণের ফেস রিভিল না হলেও আমি টের পেয়েছি, সে দুর্দান্ত সুন্দরী।’
-‘কথা সত্য।’
-‘আমি জেনেছি, আপনি প্র্যাক্টিসিং মুসলিম। সেটার প্রমাণ পেলাম স্মরণকে দেখেই। আর আপনাকে অ্যাঙ্কেলের ওপর প্যান্ট পরতে দেখে। আমার ভালো লেগেছে আপনাদের দুজনকেই।’
এবার মুখে মেকি হাসি ঝুলাতে হলো আরকি। দীধিতির দিকে তাকিয়েই মনে মনে বলল নাওফিল, ‘জানেন না তো আপা, এক হিজাব আর মাস্ক পরাতে গিয়েই আমার এই মোটা শরীরের ফাঁক থেকে কত কিলোগ্রাম গ্যাস বেরিয়ে যায় রোজ।’ প্রলম্বিত শ্বাসটা ফেলে অতঃপর মুখে বলল তানিয়াকে, ‘দোয়া রাখবেন, যেন সে এবং আমি দুজনেই ইমানদার মুসলিমে পরিণত হতে পারি।’

-‘নিশ্চয়ই করব।’ বলে গলায় একটু মেকি কাশি তুলল তানিয়া। তারপর মুচকি হেসে স্তুতি গেয়ে উঠল, ‘স্বীকার করতেই হবে, আপনারা তিন ভাই ভীষণ ড্যাশিং। তবে বেস্টেস্ট লাগল, স্মরণের পাশে ওই যে দাঁড়িয়ে হাতে হার্ড লিকার নিয়ে যিনি। আমি এসেছি পর থেকেই দেখছি, সে যেন এই পার্টিতে থেকেও নেই। তার উইস্টলি স্মাইল একদম মেপে মেপে দিচ্ছে সবার প্রতি। আর এতগুলো হার্ড লিকারেও তাকে একটুও স্ক্রুড লাগছে না। বোঝায় যাচ্ছে, সে দারুণ অভ্যস্ত।’
মুচকি হাসল নাওফিল৷ সে না তাকিয়েও বুঝে গেল তানিয়া কার প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে। মনে মনে বিদ্রুপের সঙ্গে ভাবল, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সে মানুষটা সেই থেকে নাটকীয় হাসি মুখে লাগিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। সেটা আবিষ্কারের ক্ষমতা হলো না। অথচ অত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিফের অভিব্যক্তি ঠিকই পড়ে নিতে পেরেছে মেয়েটা। ভালোই আকৃষ্ট হয়েছে তবে।

এদিকে তানিয়া বেফাঁস সত্য কথাটা বলে ফেলেও কিছুটা লজ্জায় পড়ে গেল। কথা চেপে রাখতে না পারার এই বদস্বভাবটা তাকে বেশ অনেকবার নাস্তানাবুদ করেছে। না জানে, নাওফিল তাকে কী পরিমাণ সস্তা, নির্লজ্জ মানসিকতার ভাবছে! নাওফিলকে হাসতে দেখেই অস্বস্তিটা বেড়ে গেছে৷ কিন্তু গুলি যখন বন্দুক থেকে বেরিয়েই গেছে, তা আর ফেরত তো আনা সম্ভব নয়। লাজুক হেসেই কৈফিয়ত দেওয়ার ঢঙে বলল, ‘আসলে আপনি তো এলেন অনেক লেট করে। এর মাঝে আপনার দুই ভাইয়ের সঙ্গেও আলাপ করালেন আপনাদের দাদা। আর আপনার লেটে আসার ফলেই আপনার ম্যাট্রোনাল প্রকৃতির ভাইয়ের দিকে মনোযোগ চলে গেল।’
-‘এটা কোনো ব্যাপার নয়, তানিয়া। আপনি শেখ ব্যাচেলরের প্রতি ইন্ট্রেস্টেড হতেই পারেন৷’ মিটিমিটি হেসে বলল নাওফিল। ওর দুষ্টুমি বুঝে তানিয়াও স্বাভাবিক হলো। ‘বলছেন হতে?’
-‘যদি আপনি চান।’

-‘কিন্তু তার রুক্ষতা স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমি। আশেপাশে এত লাস্যময়ীরা ঘুরছে। সঙ্গেও একজন আছে৷ তবুও তাকে ভীষণ বিরক্ত দেখাচ্ছে সবেতেই। তার অ্যাটেনশন পাবো কি?’
ইয়াসিফ সত্যিই বিরক্ত আজ সব কিছুর প্রতি। ইস্তাম্বুল যাবার দিনটা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই অস্থির হয়ে পড়ছে সে। কোনো কিছুতেই মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। কখন ইস্তাম্বুল যাবে আর কখন ওই নোংরা মনের মেয়েটার টুটি চেপে ধরবে! পুরোদস্তুর অধৈর্য হয়ে পড়েছে। ভাইয়ের জন্য একরকম জোরপূর্বকই মুখে হাসি ধরে রেখেছে। কিন্তু মাথার ভেতর এক ভোঁতা যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছে। এজন্যই বাধ্য হয়ে কড়া মদের আশ্রয় নেওয়া। এক পর্যায়ে এত আওয়াজ আর ভিড় সহ্য করতে না পেরে একটু দূরে এসে দাঁড়াল, ফোনে কথা বলার বাহানায়। দীধিতি সেটা লক্ষ করে এগিয়ে এলো তার কাছে৷ মূলত কিছু জানতে চায় সে ইয়াসিফের থেকে।
-‘খারাপ লাগছে না-কি, ভাইয়া?’
পেছন ফিরে দীধিতিকে দেখে আশ্বস্ত হলো ইয়াসিফ। দীধিতি প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া কখনও খোশগল্প করতে চায়নি তার সাথে৷ এ মুহূর্তেও নিশ্চয়ই প্রয়োজনেই এসেছে। সেটা বুঝতে পেরেই মাথা ব্যথার কথা না জানিয়ে জবাব দিলো, ‘না, একটু বিরক্ত হচ্ছিলাম শোরগোলের জন্য৷ তুমি বলো, কী খবর এখন? মন, শরীর, সব ঠিক আছে?’

-‘হ্যাঁ, ঠিক আছি আমি। অস্ট্রেলিয়া যাবার টিকিট বুকিং করলেন কবে?’
-‘ওইতো যেদিন তুমি কথা বললে তোমার মাম্মামের সঙ্গে।’
-‘আমাকে সেদিন সারাদিনেও কিছু জানানো হলো না কেন?’
-‘সেটা তো নাওফিলই বলতে পারবে। তোমার সঙ্গে তো আর দেখা হয়নি আমার। হলে আমি জানাতাম নিশ্চয়ই।’
-‘ওর এই রহস্য রহস্য কাজকর্ম আমাকে খুব মানসিক যন্ত্রণা দেয়, ভাই। আমার প্রত্যেকটা মুহূর্ত কীরকম কাটে, তা আমি আর ওকে বোঝাতে পারলাম না। ওকে কি এই স্বভাবটা পরিবর্তন করাতে পারেন না?’
ইয়াসিফ হাসে। নারকেল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে দীধিতিকে, ‘তুমি কি পেরেছিলে আমাদের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও জাইমার সঙ্গে যোগাযোগ না করে থাকতে?’

একটু বিব্রত হলো দীধিতি। অপরাধবোধও হতে লাগল। কতবার বারণ করা হয়েছিল তাকে, যেন জাইমার সঙ্গে পুরোপুরিভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় সে৷ জাকির সাহেব অবধি সাবধান করে গিয়েছিলেন। অথচ সে এতটাই জেদি আর মরিয়া হয়ে উঠেছিল নিজের সঠিক পরিচয় জানার জন্য যে, ভালো-মন্দ বিষয়গুলো আলাদা করে ভাবার মতো বিচারবুদ্ধিটুকুও ছিল না তার৷ জাকির সাহেবের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা প্রমাণগুলো হাতে এসেছিল, সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্যও সে আশ্রয় নিয়েছিল জাইমারই। নাওফিলকে ভরসা করতে পারেনি। জাকির সাহেবের ওপর প্রতিশোধের নেশায় জাইমা সেদিন মিথ্যা প্রমাণগুলোকে সত্য ভেবে দীধিতিকে উষ্কানি না দিতেন, তাহলে দীধিতি আগেপিছে চিন্তা করত এর পরিণতি সামনে কী হতে পারে? কিংবা সে যদি নাওফিলকে ভরসাটুকু করে প্রমাণগুলো ওর হাতেই আগে তুলে দিতো, তবুও সেদিন ভুলটা হত না তার দ্বারা। এখন কি আর সেসব ভেবে কোনো লাভ আছে কেবল দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করা ছাড়া?

-‘আমার ভুল আজ আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই, ভাইয়া। নিজেকে শুধরে নিতেও চেষ্টা করছি। আর ও আগেও আমার সঙ্গে যেমন মাইন্ড গেম খেলত, এখনও তেমনটাই করতে চায়।’
-‘না, এখন জাদ তোমার সঙ্গে অন্তত মাইন্ড গেম খেলার আগ্রহ পায় না। কারণ, সেই দরকারটা ওর আর নেই৷ একটু সাসপেনশন, একটু মিস্ট্রিজ এই স্বভাবটা তো ওর জেনেটিক। মানে আমার ছোটো চাচা এমনই ছিলেন। এজন্যই ওর মধ্যেই এটা এসেছে। তবে চিন্তা নিয়ো না। তোমাকে আর কোনো কিছুই একা সামলাতে হবে না। ওকে অকল্পনীয়ভাবে সব সময় সঙ্গে পাবে।’
মৃদু হাসল দীধিতি৷ কিন্তু দুর্বহ দেখাল হাসিটা। ‘আর এই চার বছরের বিচ্ছেদটাকে কীভাবে এক্সপ্লেনেশন করবেন?’ একটু থেমে আরেকবার জিজ্ঞাসা ছুঁড়ল, ‘বিচ্ছেদের যন্ত্রণার কোনো এক্সপ্লেনেশন হয়, ভাইয়া?’
-‘বিচ্ছেদের কষ্ট আমি কোনোদিন পাইনি, স্মরণ। কিন্তু চোখের সামনে কাউকে পেতে দেখে সেটা যে কিছুটা উপলব্ধি করতে পারব না, এমনটা ভেবো না। তোমাকেও দেখেছি, আমার ভাইকেও দেখেছি। তুমি কি একটা পানিশমেন্ট ডিজার্ভ করো না? অতীতটা মনে করে বলো তো?’

দীধিতির চেহারার রং বদলে গেল৷ নিজের ভুল আর অপরাধ স্পষ্টই মনে আছে। কিন্তু তার জন্য দীর্ঘ চারটা বছর স্বামীর থেকে দূরত্ব? লঘু পাপে গুরুদণ্ড দেওয়া হলো না তাকে?
-‘জাইমার মতো টেরোরিস্টের সঙ্গে তোমার গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া’, ইয়াসিফ মুখ খোলার সময় দিলো না দীধিতিকে। ‘বড়ো কাকুর বিরুদ্ধে পাওয়া ভুল প্রমাণের ব্যাপারে কোনো কিচ্ছু না বলা কাউকে, নাওফিলকে অবিশ্বাস করে জাইমাকেই বিশ্বাস করা। সেই সাথে মারিহামের সঙ্গেও যোগাযোগ হওয়ার কথাটা লুকিয়ে গেলে আমাদের সঙ্গে। জাইমা এমন পর্যায়ের টেরোরিস্ট, তার সঙ্গে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণেও সংযুক্ত থাকা মানুষগুলোকে এসবি, ডিবি ছাই দিয়ে ধরতে শুরু করেছে দীর্ঘ চার বছর ধরে। ভেবে দেখো, তুমি কত বড়ো বিপদ থেকে পার পেয়ে গেছ। পার পেলে কীভাবে, সে গল্পে পরে আসছি। এরপর বলি মারিহামের কথা। মারিহামের পরিচয়ের সত্যতা না পাওয়া অবধি আমার চোখে কোনো দাগী আসামির থেকে কম কিছু ছিল না। যদি কোনো টেরোরিস্টই হয়, এ সন্দেহ নিয়েও জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করে তিনটা মাস ওকে আমি নিজের সঙ্গে রেখেছিলাম। সেই মেয়েটা পরবর্তীতে আমার সন্দেহকেই সত্যি প্রমাণ করে পুরোপুরি হাওয়া হয়ে গেল।

কিন্তু যোগাযোগ করতে থাকল তোমার সাথে। সেটাও তুমি জাদের থেকে গোপন করে গেলে। আর তারপরের কাজটা? বড়ো চাচার বিরুদ্ধে পাওয়া মিথ্যে প্রমাণগুলো যখন হাতে পেলে শেখ বাড়ির ভেতর থেকেই। বুঝতে পারলে ও বাড়ির কেউই তোমাকে হেল্প করছে। কিন্তু কেন করছে? কী স্বার্থ তার? না-কি তোমারই কেউ ক্ষতি করতে চাইছে? তা ভেবে দেখারও প্রয়োজন মনে করলে না। আর জাদকে তো বলারই প্রয়োজনবোধ করলে না। তোমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা পড়ল, শেখ বাড়ির ছেলেকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করার মামলা পড়ল, বিশাল অঙ্কের টাকা আত্মসাতের মামলা, শেখ বাড়ির সম্পত্তি হাতানোর কূট পরিকল্পনা করার মিথ্যা দোষেও অভিযুক্ত করা হলো, তারপর কফিনের শেষ পেরেক গেঁথে দেওয়া হলো জাইমার সঙ্গে তালুত রাখার জন্য টেরোরিস্ট হিসেবে। এখন তো তুমি একজন প্রশাসনের লোক৷ বলো, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর কে ঠেকায় এই মামলাগুলো ঘাড়ে থাকলে? আরও যদি পত্র-পত্রিকা, নিউজ চ্যানেলে তোমাকে শিরোনাম করে দেওয়ার পদক্ষেপটাও নিয়ে নেওয়া হয়।

তখন স্বয়ং প্রাইম মিনিস্টার এসেও তোমার জন্য সুপারিশ জানালে প্রাইম মিনিস্টাকে নিজের ইমেজ নিয়েই টানাটানিতে পড়ে যেত হত আর একজন টেরোরিস্টকে খালাস করতে সুপারিশ জানালে গদিচ্যুতও হয়ে যেতে হত। তারপরও দেখো, এক দিন কারাগারে কাটিয়ে এসেও আসামির খাতাতে তোমার নাম উঠল না। কত সহজে এতগুলো মামলা থেকে পার পেয়ে গেলে! এর জন্য কোনো প্রাইম মিনিস্টারের অবদান নেই। যা অবদান আছে তা হলো বর্তমানের স্টেট মিনিস্টারের। শুনতে হাস্যকর লাগলেও এটাই সত্য, একদম তামিল সিনেমার ব্রিলিয়ান্ট ভিলেনের মতোই চালটা চেলেছিল দাদা।’
সেদিনের ভয়াবহ দিনটার কথা দীধিতি সহজে মনে করতে চায় না। প্রিজন ভ্যানে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো, জেলে পুরে দেওয়ার পর পুলিশের কাছে কত বিশ্রী ভাষার কথা শ্রবণ করতে হলো, সারাদিনে কেউ দেখা করতেও আসেনি৷ কতটা ভয় হয়েছিল তার! মনে হচ্ছিল, শেষ তার জীবনটা৷
কান্না গলা অবধি এসে আটকে গেছে। কোনোরকম বলে উঠল ইয়াসফিকে, ‘অবশ্যই শাস্তিপ্রাপ্য আমি৷ তারপরও আপনার ভাই যে আমাকে গ্রহণ করতে চাইছে, এ বড়ো ভাগ্যই আমার।’

হাসিটা ঠোঁটে আরেকটু গাড় হলো ইয়াসিফের৷ বলল, ‘তোমার অভিমান জায়েজ, স্মরণ। অপরাধী তার ভুল বুঝতে পারলে অবশ্যই তাকে ক্ষমা করা উচিত, সুযোগও দেওয়া উচিত। জাদের ওপর ওই সময়টা যে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল, মাথা ঠান্ডা ওই ছেলেটাও অশান্ত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। তোমার বিপদ ঠেকানোর জন্য বিচ্ছেদকে বেছে নেওয়া শুধু তোমার জন্যই মানসিক যন্ত্রণার ছিল না৷ তুমি শুধু এটুকুই জানো, কোনো এক কারসাজির মাধ্যমে ডিভোর্সটা সঠিকভাবে হয়নি তোমাদের৷ কিন্তু ওই কারসাজি করতে গিয়ে মাহতাব শেখ তার দুজন নাতিকে সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছেন।’

চমকে উঠল দীধিতি। ইয়াসিফ তা দেখেও থামল না। ‘মাহতাব শেখের আইকিউ স্কোর অ্যাভারেজ না। যে এতগুলো বছর শত শত মানুষকে আগাপাছতলা পড়ে ফেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সে আমার করা কারসাজি ধরতে পারবে না, তা আসলে ভাবাটাই বিরাট বোকামি। একটু দেরিতে হলেও বুঝে ফেলেছিল সে। যার ফলাফল জাদকে কারাগারের আসামির মতোই নজরবন্দি হয়ে যেতে হয়। আমার আর মিহাদের ওপর আগে থেকেই ক্ষিপ্ত ছিল দাদা। দাদার আদেশ অমান্য করে কিরণকে বিয়ে করল মিহাদ। আবার আমরাই তো তোমাকে আর জাদকে বিয়েটা দিয়েছিলাম। তারপর আবারও আমিই তোমার আর জাদের ডিভোর্স আটকালাম। বারবারই কি আর ছাড় পাই? মাহতাব শেখ যখন ধরলেন, তখন একবারে ছাই দিয়ে ধরলেন আমাদের। এই যে জাদের ঠান্ডা স্বভাবটা দেখো না? এটা কিন্তু দাদারই অন্যতম স্বভাব। তোমাদের বিয়ের পর জাদও টের পায়নি, দাদা তার ঠান্ডা স্বভাবের ভেতরেই কত বড়ো পরিকল্পনা সাজিয়ে রেখেছিল। সে বোধ হয় নীরব চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিল তোমাদের, দুজনকে ছয় মাসও ঘর করতে দেবেন না।’

এরপর থামল সে। থামতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো দুজনের থেকেই। নত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা দীধিতিকে দেখে নিয়ে কথার সুতো টেনে ধরল সে আবারও। ‘দাদার নজরবন্দি মূল ফ্যাক্ট না ঠিক৷ জাদ আসলে সত্যিই সে সময়টা কেমন অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। তোমার সঙ্গে বিচ্ছেদের পরই যখন মারিহামের চিঠিটা ওর হাতে এলো। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল। আমি সবটাই স্বীকার গেলাম৷ তখনও আমাকে কিছু বলেনি৷ চট্টগ্রাম ছুটে যাবার পর মারিহামের সাজানো খুনের নাটকটা ওর চোখের সামনে এলে ও প্রথম অবস্থাতে সবটা সত্যিই ভেবে নিয়েছিল। ওই যে বললাম, অস্বাভাবিক ধরনের একটা পরিবর্তন এসে গিয়েছিল তোমাদের বিচ্ছেদের কারণে৷ আসলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের ধাক্কাটাই ওকে এলোমেলো করে দিয়েছিল কিছুদিনের জন্য। ওর মাথা ঠিকমতো কাজ করছিল না, সেটার প্রমাণ পেলাম মারিহামের কেসটাতেই।

খুনের আলামতগুলো কতটা নাটকীয় ছিল, তা একটুখানি ঠান্ডা মাথাতে দেখলেই ও বুঝে ফেলত। কিন্তু সেটাই ও বুঝতে সময় নিলো এক সপ্তাহ। ওই এক সপ্তাহে আমার সঙ্গে শুধু ওর মারামারি করায় বাদ ছিল। ওর অশ্রাব্য গালাগাল শুনে মিহাদ খেপে যেত। যে কারণে মিহাদের সাথেও ঝগড়া লাগত। একটা সময় খেয়াল করি, এর সবটাই দাদা দেখেও কিছু বলত না ওকে৷ এমনকি বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করত না আমাদের মধ্যে কলহ শুরু হলে। ব্যাপারটা খালি আমি একাই নোটিস করিনি, জাদও করেছিল। সেই ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে গিয়েই আবিষ্কার করলাম, সে তখন চাইছিলই এমনটা হোক আমাদের সম্পর্কের পরিণতি। কারণ, প্রথমত জাদকে সবসময়ই সে বেশি ভালোবেসেছে৷ সেটা নিয়ে আমাদের সমস্যা ছিল না। ওকে যে একটা সময়ে বেশি সম্পদও দেবে স্নেহের আধিক্যে, সেটা আমরা আগেই জানতাম। তাই বলে অর্ধেকেরই বেশি, এমনটা আমাদের কল্পনা ছিল না।

দ্বিতীয়ত, আমি ছিলাম আমার মর্জির মালিক আর অবাধ্য। আমাকে সে নিজের মনমতো হয়ে উঠতে দেখেনি। রাজনীতিতেও আমার কোনো আগ্রহ নেই৷ তার উপর পুলিশে জয়েন করার কারণে আমার ওপর তার স্নেহ আর ভরসা অনেকটাই কম ছিল৷ আবার মিহাদের ব্যাপারটাও প্রায় একই। ও ব্যবসা ভালো বুঝলেও রাজনীতি তেমন বোঝে না, আগ্রহও নেই। অবাধ্যতা ও-ও করল। তাহলে একমাত্র জাদকেই সে নিজের মনের মতো পেলো। যে তার মতোই ঠান্ডা স্বভাবের, রাজনীতিতে আগ্রহী, সমানতালে ব্যবসা সামলাতেও এক্সপার্ট। কোনো অবাধ্যতাও নেই। আর আমাদের পাল্লায় পড়ে তোমাকে বিয়ে করার মতো ভুল যাতে আরও অনেক কিছুতে না করে ও, তারপর আমাদের মাধ্যমে যেন তোমার সঙ্গেও কোনোরূপ যোগাযোগ যেন
না করতে পারে। তাই দাদা ভেবেছিল আমাদের ভাইদের মাঝে দ্বন্দই শ্রেয়। জাদ যখন মারিহামের ঘটানাটা বুঝতে পারল, তারপর থেকেই ঠান্ডা মাথা কাজে লাগাতে শুরু করল৷ তাই বলে মনটাকে আর শান্ত করতে পারেনি৷ তোমার ভুলের জন্য সীমাহীন রাগ ছিল ওর মনে৷ যার নমুনা ছিল ওই সময়ে তোমার সঙ্গে করা ওর দুর্ব্যবহারগুলো। অনেকগুলো দিনই তোমার ওপর ক্ষিপ্ত থেকে স্বেচ্ছায় দূরে ছিল। এর মাঝেই দাদা যেমনটা চাইছিল ওকে, তেমনটাই হতে থাকে ও।

দাদার ভরসা আর বিশ্বাসটা অর্জন করায় একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ওর। আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণটা অব্যাহতই রাখে। দাদার সব চাওয়াকেই মূল্যায়ন দেয়। চার বছর লাগে ওর দাদার সবটুকু বিশ্বাস অর্জন করতে। এতেই তো ফায়দা। নজরবন্দি থেকে মুক্তি, ততদিনে একটু একটু করে ক্ষমতাও প্রতিষ্ঠা করে ফেলা, অপ্রত্যাশিতভাবে আড়াই তৃতীয়াংশ সম্পদের মালিক বনে যাওয়া। কিন্তু এসব অর্জনের পিছে মূল উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু এটাই– তোমার সঙ্গে যাতে নির্বিঘ্নে, নির্ঝঞ্ঝায় গোটা জীবন কাটাতে পারে। তোমাদের প্রেম তো কাঁঠালের আঁঠা৷ তুমি আমার আন্ডারে ট্রেনিং নেওয়ার বছরখানিকের ভেতরই ও সব ভুলে টুলে তোমার কাছেই ছুটে এসেছিল।’

-‘আচ্ছা তাই? আমি দেখতে পেলাম না কেন?’ দীধিতির কণ্ঠে তখনও তিরস্কার।
ইয়াসিফ এবার আর হাসল না তিরস্কারের সুর শুনে। তবে রাগলও না। কারণ, দীধিতির ওই একাকিত্বের দিনগুলো সে তো কাছ থেকে দেখেছে। তার বিষণ্নতাও দেখেছে। তাও কখনও তার কাছে গিয়ে সান্ত্বনার বুলি আওড়ায়নি সে। চেয়েছিলই সে, দীধিতি দুঃখগুলো ভোগ করুক। দুঃখগুলো সয়েই ভুলগুলোকে উপলব্ধি করুক, নিজেকে বদলাক, শক্ত হোক, সঠিক জেদ করতে শিখুক।
-‘তুমি দেখতে যাতে না পাও সেই ব্যবস্থাটা আমিই করেছিলাম, স্মরণ। বাধাটা ওকে আমিই দিয়েছিলাম। ওই সময় তুমি যদি ওকে ফিরে পেতে, আমি কনফিডেন্সের সঙ্গে বলছি, তুমি তোমার ভুলগুলো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারতে না। জাদকে সব কিছু না জানানোর কারণে ওকে হারিয়ে ওর যে মর্মটা তুমি বুঝেছ, সেটা বুঝতে না।

সব থেকে বড়ো কথা তুমি বদলাতে না। জাদও তখন যেভাবে ধীরে ধীরে পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছিল, সে সময়টাতে ওর স্ট্রেস
ফ্রি থাকাটা দরকার ছিল। কোনোভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে আজকে এই জায়গায় আসাটা ওর জন্য ক্রিটিক্যাল হয়ে যেত। তোমার সঙ্গে ওই সময় মিলিত হওয়া মানে দাদা যে কোনো সময় জেনে যেত, স্মরণ। তখন আর দাদার আস্থাভাজন হওয়া সম্ভব না হত না ওর। এসব কিছু আমিই বিবেচনা করেছিলাম। তাই স্ট্রিক্টলি বাধাটা আমিই দিতাম। আমার মনে হয়েছিল, তোমার শাস্তিটা হওয়া উচিত অনেকগুলো লেসনের মাধ্যমে। যে লেসনস তোমাকে বুদ্ধিসম্পন্ন আর আত্মবিশ্বাসী হতেও সহযোগিতা করে। আর জাদের জন্য প্রয়োজন ছিল স্ট্রেস ফ্রি টাইম। তাছাড়া আমি এটাও চাইছিলাম, এক সময় তুমি যা হওয়ার স্বপ্নটা দেখতে, সেটা যেন পূরণ করতে পারো। স্বামীর যত যা-ই থাকুক, নিজের আইডেন্টিটি আর নিজের বল থাকাটা এখনকার সময়ে সব মেয়েরই থাকা জরুরি বলে মনে করি। এজন্যই আমি তোমার ক্ষেত্রে পার্সোনালি স্ট্রিক্ট হয়েছিলাম। ক্রুয়েলও বলতে পারো।’

-‘নাহ, আপনি আমার জন্য যা করেছেন তাকে নিষ্ঠুরতা বললে অকৃতজ্ঞ হয়ে যাব আমি,’ বিড়বিড় করে বলে উঠল দীধিতি। ‘আমার ভুলগুলোই আমার কাল হয়ে দাঁড়াল। আমি আপনাদের বারণ অমান্য করে মাম্মামের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম মায়ায় পড়ে। মায়ের মতো ভালোবেসে ডাকত তো। তাই কঠিন হতে পারিনি। নাওফিলকে জানানোর সাহস হত না আসলে৷ মারিহামের ব্যাপারটাও তাই। একে তো মারিহামের নিষেধাজ্ঞা ছিল কাউকে জানানোতে। উপরন্তু নিজেও ভয়ে জানাইনি, ভাইয়া৷ মারিহামের কথা জানানো মানেই তো মাম্মামের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়ে দেওয়া। এই আশঙ্কা থেকেই লুকিয়ে যেতাম। অবশ্য সাহস করে বলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটাও তো নিয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই…

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৬

-‘সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।’ কথা কেড়ে নিলো নাওফিলের কণ্ঠ। দীধিতির পেছন থেকে এলো সেটা। কিন্তু তার খুব কাছাকাছিই। তাই তো তার বিড়বিড়ানি শ্রবণসাধ্য হয়েছে নাওফিলের।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here