Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮ (২)

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি

চেহারার অভিব্যক্তিতেই এক আলাদা অধিকারবোধ। চিকন ভ্রুজোড়ার মাঝ কুচকে দু’টো ভাঁজ তৈরি হয়েছে মেয়েটির। আপাদমস্তক মেয়েটিকে দেখতে থাকল দীধিতি। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গায়ে বেশ ভালো একটি মেরুন রঙা সেলোয়ার-কামিজ। চুল বাঁধার লম্বা কাঠি দিয়ে রেশম, কালো চুলগুলো উঁচু করে বেঁধে খোঁপা করা। মোটামুটি পরিপাটি আর সুশ্রী চেহারার সে। কণ্ঠের তেজ আর চেহারার অভিব্যক্তিতে দীধিতি ধরে নিয়েছে নাওফিলের পরিবারের কেউ একজন সে। কিন্তু প্রশ্ন হলো অপরিচিত একজনকে প্রথম দেখাতেই এমন কঠোরস্বরে কথা বলে উঠল কেন মেয়েটি? অন্যভাবেও তাকে কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারত।
নাওফিল দরজার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখতেই চেহারায় বিরক্তর বদলে রাগ ফুটিয়ে তুলল। দীধিতি তার দিকে চেয়ে নেই। সে মেয়েটিকে নিজের পরিচয় বলতে উদ্যত হতেই নাওফিলের সেই ঝাঁঝালো গলা শুনতে পেল তখন, ‘অসহ্য! আপনি আমার বাসায় ঢোকার অনুমতিটা কার থেকে নিয়েছেন?’

এমন একটা কথা দীধিতি নাওফিলের থেকে শোনার মতো আশা একটুও করেনি। সে তো ভেবেই নিয়েছিল ওরা দু’জন ভীষণ পরিচিত হবে। হতবুদ্ধি অবস্থা তার। মেয়েটির থেকে চোখ সরিয়ে নাওফিলের দিকে তাকাল। নাওফিল তখন এক পলক তার সাথে চোখাচোখি করে ওই মেয়েটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবার বলল, ‘অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে আসার পর আমি আপনাকে কল করে আসতে একেবারে বারণ করে দিয়েছিলাম না?’
মেয়েটির কান্না পেয়ে গেল খুব নাওফিলের এই রুঢ় আচরণে। সে তো নাওফিলের ড্রাইভারের থেকে প্রায়ই খোঁজ নিতো ওর। গতকালই জানতে পারল নাওফিল হঠাৎ ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে আছে চারদিন যাবৎ। না থাকতে পেরে তাই আজ চলে এসেছে। প্রায় সাতটা মাস সে নাওফিলের খাবার তৈরি করা থেকে জামাকাপড় ধুয়ে দেওয়া সকল কাজ করত। নাওফিলের আম্মা খুশিই ওকে ঠিক করে দিয়েছিলেন এখানে তার ছেলের কাজগুলো করে দেবার জন্য। প্রথম মাসগুলো নাওফিল ওর সঙ্গে ঠিকমতো কথা না বললেও শেষ দু’মাস হলো ওকে যেন সহ্যই করতে পারছে না। খুশির কাছেও সে বিচার পাঠিয়েছে ওকে যেন আসতে বারণ করে দেন তিনি। বেদানর্ত অশ্রুপূর্ণ দৃষ্টিতে একবার দীধিতির দিকে চেয়ে তারপর নাওফিলের দিকে তাকাল, ভেজা গলায় জবাব দিলো সে, ‘আমি আপনার জ্বরের খবর শুনে এসেছি স্যার৷ কীভাবে কী করবেন, কী খাবেন তাই ভেবে…’

কথা শেষ না হতেই নাওফিল ধমকাল, ‘আপনি বাসায় ঢুকলেন কীভাবে? কে ঢুকতে দিয়েছে?’
জিজ্ঞেস করেই উচ্চস্বরে ডেকে উঠল রুমানকে, তুষারকে। কারও কোনো সাড়া নেই। ব্যাপারটাতে দীধিতিও ভাবনাতে পড়ল। হঠাৎ করে সবাই উধাও হলো কেন? তখনই মেয়েটি বলল, ‘বসার ঘরে কেউ-ই নেই স্যার। দরজাটা হালকা খোলা ছিল। আর আপনার দাদী আর আম্মা আমার ওপর ভরসা করে আপনাকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাই আমি নিজ দায়িত্বেই কাজে এসেছি।’
এবার বিরক্ত হলো নাওফিল বন্ধুদের ওপর। ওদের বলা হয়েছিল দীধিতি আসলে ঘরে পাঠিয়ে ওদের দু’জনের জন্য আলাদা জায়গা করে দিতে। তাই বলে সোজা বাসা থেকেই বেরিয়ে যাবে? আর এদের দু’জনের মাঝে পড়ে দীধিতির অপ্রতিভ অবস্থা। ওই মেয়েটি দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে ঘর থেকে চলে যাওয়া উচিত তার, না এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকা ভালো তা নিয়ে সংশয় আর বিরক্ততে পড়ে কটির ডানপাশে হাত দিয়ে সে ঘাড়ের পিছে ডলতে থাকল।
-‘আপনি আমার ঘরের সার্ভেন্ট, আমার পার্সোনাল সেক্রেটারি না। আর পার্সোনাল সেক্রেটারি হলেও তো আমাকে নিয়ে এতখানি ভাববার রাইট দিতাম না।

আমাকে নিয়ে আপনার চিন্তা কেন সেটাই তো বুঝতে পারছি না। লাস্ট টু মান্থস আপনার ইঙ্গিত আর আচরণ অশোভন, রুচিবিরুদ্ধ লেগেছে। আপনি আমার চাচি আম্মার রিলেটিভস না হলে আম্মা আপনাকে আমার ধারেকাছেও আসতে দিতো না। আপনার পেমেন্ট আমি ক্লিয়ার করতে পারব না। কারণ, আমি আপনাকে আনিনি। আপনি এখান থেকে সোজা গাজীপুর যাবেন আর নয়তো চাচি আম্মাকে কল করে আপনার পেমেন্ট বুঝে নেবেন।’
-‘স্যার আমার ভুলটা কী ছিল?’
-‘রুশা না রুনা যেন আপনার নাম? পার্সোনালি আমি অনাত্মীয় মেয়ে বা পুরুষ উভয়ের সাথেই মিশতে আর কথা বলতে চাই না, পছন্দ না আমার। আপনি আমার বাসায় খুব কতৃত্ব ফলাতে চান, এমনকি আমার কাছাকাছি ঘেঁষার চেষ্টাও করেন। এর থেকে ক্লিয়ারলি বলা যায় না আপনার ভুল কী। তারপরও না বুঝলে নিজের কাজগুলো বসে বসে নিজে স্মরণ করবেন। আর কোন সাহসে আপনি আমার ঘরের অতিথিকেই আমার সামনে জিজ্ঞেস করে বসেন তাকে এ ঘরে ঢোকার কে পারমিশন দিলো? আমি হতবাক আপনার উদ্ধতস্বভাবে!’
রুনা কান্না গলায় বলল, ‘স্যার আপনি ভুল বুঝছেন। আমিও তো জানি আপনার কোনো মেয়ে বন্ধু নেই, কোনো মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশাও আপনার ভালো লাগে না। এসে হঠাৎ করে দরজা খোলা পেলাম, তারপর ঘরের সামনে এসেই দেখলাম উনি আপনার…’

রুনার কথার মধ্যেই দীধিতি হাঁপিয়ে ওঠা কণ্ঠে বলে বসল, ‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড বিব্রত আর অপমানবোধ করছি। আমি বের হতে চাইছি বাসা থেকে।’
-‘বিব্রত হতেই পারো। কিন্তু অপমানবোধ করছ কেন?’
স্বভাববশত দীধিতি চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েছিল নাওফিলের এমন বোকা প্রশ্নে। কিন্তু চেঁচিয়ে কথা বলা তো নাওফিলের পছন্দ নয়। স্বাভাবিক সুরেই বলল সে, ‘আমি অপমানবোধ করছি, কেন করছি সেটাও ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাব?’
-‘এই আপনি বাসা থেকে বের হচ্ছেন না কেন এখনো?’
হঠাৎ চিৎকারে দীধিতি, রুনা দু’জনেই চমকে উঠল। দীধিতি তো তাকিয়েই ছিল নাওফিলের দিকে। তার প্রশ্নের পর এমন আচমকা চেঁচিয়ে উঠতে পারে সে, এটাও আশা ছিল না বলে বেশ চমকেছে। রুনা কান্না করতে করতে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে। তারপরই নাওফিল শান্ত গলায় বলল দীধিতিকে, ‘এজন্যই বলেছিলাম দরজাটা বন্ধ করে দিতে।’
-‘আবার দরজা বন্ধ করার কথা বলেন! দরজা বন্ধ করে কথা বলার মতো সম্পর্ক আমার আর আপনার?’
-‘দরজা বন্ধ বলতে কি আমি লক করে দেওয়ার কথা বলেছি? বাদ দাও, আর বন্ধ করা লাগছে না।’
-‘হুঁ, সেটাই।’

বলে সে ঘর থেকে বের হতে গেল। নাওফিল তখন এগিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করল, ‘তো চলে যাচ্ছ কেন?’
ওর দিকে ফিরে দীধিতি এবার ক্রুদ্ধস্বরে বলল, ‘আমি অপমানবোধ করেছি বললাম না?’
-‘কিন্তু কেন করলে? ওকে তো অপমান করে দিয়েছি আর কাজ থেকে তো বের করে দিয়েছি অনেক আগেই।’
-‘অপমানের বদলে অপমান করে দিলেই শোধবোধ হয়ে গেল? আমি অপমানিত হয়েছি সেটা কি ফিরিয়ে নেওয়া আর সম্ভব?’
ঠোঁট কামড়ে নাওফিল কেমন করে যেন তাকাল এ কথায়। স্পষ্ট বোঝা গেল সে ইতোমধ্যে বিরক্ত হয়ে পড়েছে দীধিতির অযথা কথাবার্তায়। তার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে, যতটা পরিণত বোঝায় দীধিতি নিজেকে, ঠিক ততটা পরিণত এখনো নয় সে। কিঞ্চিৎ হলেও সদ্য কিশোরীদের মতো আবেগ আর অকারণ রাগটা বেশি তার।
-‘শোনো শোনো, ও আমাকে সিডিউসড করতে চাইত। ও আমার সব কাজ করলেও কখনো আমার বেডরুমে ঢোকার পারমিশন পায়নি। আমার ঘর আমি নিজে ক্লিন করি। আমার জামাকাপড় ওয়াশের প্রয়োজন হলে সেটা আমি বের করে বসার ঘরের সোফায় রেখে আসি। সেখানে তোমাকে আমার ঘরে দেখে তাও আবার তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আমি শার্ট পরছি, ও সহ্য করতে পারেনি। ওর জায়গায় আমার পরিবারের কেউ হলেও কখনো এভাবে তোমার সাথে কথা বলত না। বুঝতে পারছ কী বোঝাচ্ছি?’

-‘সোজা কথা হলো ও আপনার বউ হতে চায়, হুঁ?’
-‘হুঁ, সরাসরি বললে মনোবাসনা ওর এমনই।’
-‘কিন্তু ওরা গেল কই সব? কোনো সাড়া নেই কারও।’
দরজার কাছ থেকে সরে এসে নাওফিল লম্বা ওয়াল শোকেসের সাথে লাগোয়া আয়নার সামনে দাঁড়াল, জ্বরে শুকিয়ে যাওয়া মুখটা এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘আমাদের প্রাইভেট স্পেস দিয়ে গেছে।’
-‘কী জন্য?’ এবার চেঁচিয়েই বলল দীধিতি।
নাওফিল এতে আগেরদিনের মতোই কপাল কুঁচকে রাগ চোখে তাকাল। দীধিতি তা পরোয়া করল না, জিজ্ঞেস করল, ‘প্ল্যানিং এটা আপনাদের, না?’
-‘এই! আমি তোমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কোনো একটা এক্সকিউজ দেখাতে পারতাম না এ নিয়ে? সরাসরি বলে দিয়েছি, কোনো লুকোচুরি করিনি। ভালোভাবে কিছু ভাবতে পারো না? তুমি তিন মাস সময় পেয়েছ আমাকে চেনার জন্য, বোঝার জন্য। তো সেটা হবে কীভাবে যদি আমার আশেপাশে না থাকো? আমার বাইরে পথেঘাটে, পার্কে, রেস্টুরেন্টে বসে সময় দেবার ইচ্ছে নেই। আমার আশেপাশে থাকতে হলে আমার বাসা নয়তো ঐশী আর রুমানের বাসাতেই আসতে হবে তোমাকে। তোমার বাসায় যাবার তো আর সুযোগ নেই। এবং গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো ফাঁকা বাসায় তোমাকে আসতে বলিনি। যখন আসবে তখন এসে সবাইকেই পাবে।’

-‘এখন ফাঁকাই তো আপনার বাসা। বাকিরা কই?’
-‘ওরা বেশি বুঝে ঘরের বদলে বাসা ফাঁকা করে ফেলেছে। এটা আমার দোষ না। কল করলেই চলে আসবে, এত হাইপার হওয়ার কী আছে হ্যাঁ? একা পেয়ে বিয়ে করে ফেলছি না কি তোমাকে?’
শেষ কথাগুলো নাওফিল নিজেই অস্বাভাবিক সুরে বলল।
আশ্চর্য হয়ে দাঁড়িয়েই রইল দীধিতি। নাওফিলও ইচ্ছে করে বসতে বলল না ওকে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে দেখতে দেখতে সময়ের পর সময় পার করে দেওয়া ওর ছোটোবেলার অভ্যাস। আপাতত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে দীধিতিকে বিরক্ত করে তোলাই ওর এখনের উদ্দেশ্য। কিন্তু দীধিতি বিরক্ত হলো কি হলো না তা ঠিক বোঝা গেল না। সে ফোনটা চাপতে চাপতে ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরটাই চলে এল, তন্বীকেও কল করল আর ওদের সবাইকে জলদি আসতে বলল।

-‘তোমার আম্মু আর ছোটোবোনটা কেমন আছে?’
পেছনে তাকাল দীধিতি। নাওফিল প্রশ্নটা করতে করতে ওর সামনের সোফাটায় এসে বসল।
-‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো রেখেছেন আল্লাহ। আপনার বাসার সবাই কেমন আছে?’
-‘আম্মা একটু অসুস্থ থাকেন ইদানীং।’
কথাটা বলে সে দীধিতির দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে সোফায় গা এলিয়ে বসল।
-‘ওহ, তো আপনার তাহলে তো ওখানেই থাকা উচিত এখন৷ নিজের বাড়িতে না থেকে একা থাকেন কেন?’
-‘এটাও তো আমার বাসায়।’
-‘হ্যাঁ, সেটা জানি। আমি বলছি পরিবারের সাথে থাকেন না কেন?’
-‘সোজা কথায় বলতে গেলে পরিবারের সাথে থাকতে মন চায় না।’
এ কথার পিঠে কথা বলতে গিয়ে দীধিতি খেয়াল করল নাওফিল তার দিকে সরাসরি বদ্ধদৃষ্টি মেলে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। আশেপাশেও একবারের জন্য দৃষ্টি ফেরাচ্ছে না। এবং হঠাৎ করে তার কণ্ঠস্বরও গম্ভীর হয়ে গেছে। আগে কখনো নাওফিলের দ্বিধাহীন নিবদ্ধ চাউনি দেখেনি তার প্রতি। সেদিনও এ কারণেই নিজের কাছে, বান্ধবীদের কাছে কত অভিযোগ করল সে! খারাপও লেগেছিল তার। কিন্তু নিজের কাছে নিজে স্বীকার করতে সে নারাজ, সে চায় নাওফিলের মুগ্ধ চাহনি সবসময় তাকেই দেখুক। কিন্তু এই মুহূর্তে ওর এমন নিবিষ্ট চাউনির সম্মুখে বসে সে ওর চোখে চোখ রাখতে পারছে না, কী যেন বলতে চেয়েছিল সেটাও হারিয়ে ফেলল! তাই মৌনাবলম্বন করল। ভাবল এতে নাওফিলই কোনো প্রসঙ্গ তুলবে হয়তো।

কয়েক পল কেটে গিয়ে মুহূর্ত, ক্ষণ পার হলেও নাওফিল কোনো কথা বলবে কি না সন্দেহ। এমনভাবে তাকিয়ে দেখার মানে কী? ফাজিল ছেলেটা কী দেখছে কে জানে? না কি আবার তাকে ভয় দেখানোর কোনো বদ মতলব করছে? হঠাৎ করেই দীধিতির মধ্যে ভীষণ জড়তা ঢুকে পড়ল। ভয় করছে না ঠিক। আবার করছেও বলা যায়।
যাকে বিয়ে করবে তাকে মাত্র একবার পরোখ করে দেখলে কী হয়? সুযোগ এবং সময় যেহেতু পেয়েছেই আবার কাছ থেকে দেখার জন্য, তাই নাওফিল দীধিতির বিব্রত ও লজ্জিত মুখটা দেখেও সে বিকারহীন। মাঝারি স্বাস্থ্যের এই সুশ্রীকে দেখার সময়ই তার মধ্যে কেন যেন বেহায়াপনা চলে আসে। এ সময়ে তাকে ঢেমনা, ইতর বললেও বোধ হয় তার গায়ে লাগবে না। এ সময়টার মাঝে দীধিতির অনেক কিছুই সে খেয়াল করেছে। বিব্রত অবস্থায় পড়লে দীধিতি যে বারবার জিহ্বার ডগায় ঠোঁট ভেজায় তা বেশ লাগছে ওর। এমনকি দীধিতির বারবার গায়ের ওড়না ঠিকঠাক করার পিছে লেগে পড়ার কাজটা দেখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওর নজর দীধিতির বুকের ওপর গিয়েই পড়তে থাকল। দীধিতি কি খেয়াল করেছে? শুকনো কাশি দিয়ে উঠে নাওফিলকে সে জিজ্ঞেস করল, ‘কথা না বলে দেখছেন কী এভাবে?’

-‘তোমাকেই দেখছি, পুরোটা।’
-‘পুরোটা কী?’ যেন আঁতকে উঠল সে।
প্রশ্নটায় নাওফিলের সোজাসাপটা জবাব দিতেই ইচ্ছে করছিল যে, সে কী কী দেখছে। কিন্তু তার ফল যে তার জন্যই ভালো হবে না।
-‘তোমার খোলাচুল দেখা হয়নি এখন অবধি।’
-‘বিয়ের পর দেখে নিয়েন।’
দীধিতির এ কথা অন্যমনষ্ক হয়ে বলা না হলেও সুরটা অমনই ছিল। বলার পর নিজের কানে যখন পৌঁছল কথাটা তখন দীধিতি প্রায় চরম লজ্জার শিকার। বাঁকা চোখে নাওফিলকে দেখল, ইতোমধ্যে সে ঈষৎ হাসছে।
-‘আমি বলতে চেয়েছি বিয়ে যদি হয় তো তখনই দেখতে পাবেন।’
-‘আচ্ছা।’ স্মিতহাস্য চেহারাতেই বলল নাওফিল।
দীধিতি কণ্ঠে কপট বিরক্ত ঢেলে জিজ্ঞেস করল, ‘আর আপনি আশেপাশে তাকাচ্ছেন না কেন?’
আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নাওফিল জবাব দিলো, ‘আশেপাশে দেখার মতো তো কিছু নেই।’

-‘তাই বলে একভাবে আমার দিকে অমন করে তাকিয়ে থাকবেন না কি?’
-‘তাকিয়ে থাকলে তাই কী? বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না কি এতে? তুমিও দেখো। তোমার দেখার নেই আমাকে?’
ঠোঁটটা আবার ভিজিয়ে নিয়ে দীধিতি সত্যি সত্যিই নাওফিলের মতো করেই তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। আর তখনই সে আশ্চর্যান্বিত হলো। হায় হায়! এ ছেলের গোঁফ দাড়ি কই?
-‘আপনি কি পিওর ক্লিন শেভ দেন?’ অবাক কণ্ঠে শুধাল দীধিতি।
তা শুনে নাওফিলের দৃষ্টিতে এতক্ষণে একটু বদল ঘটল। হালকা ভ্রু নাচিয়ে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘পিওর ক্লিন শেভ কী?’
-‘আপনার না গোঁফ আর দাড়ি ছিল?’
-‘কবে দেখলে? আমার আটাশ বছর বয়সের সব থেকে বড়ো আফসোস বাকিদের মতো আমার দাড়ি ঘন সুন্দর হয় না। খুবই কম, যেটা না হওয়ার মতোই৷ গোঁফ তো হয়। কিন্তু গোঁফটা রাখি না। শেভ করার সময় একটা টান দিই সুবজ ভাবটা রাখার জন্য। মুখেও এক টানই দিই। কিন্তু ঘনঘন। পাতলা দাড়ি যাতে দ্রুত ঘন হয়।’

বাস্তবে যে নাওফিলের তার কল্পনার মতো সদ্য সুন্দর চাপদাড়ি নেই তা দীধিতি এতদিন খেয়ালই করেনি। ওই কল্পনার নাওফিলকে দেখতে অবশ্য আরও বেশি দাম্ভিক আর গম্ভীর লাগে। কিন্তু বাস্তবের নাওফিল সুন্দর হলেও তার কল্পনার মতো নয় বলে হঠাৎই মনটা খারাপ হয়ে গেল ওর। আচ্ছা ওই নাওফিলের মতো কি তার বাস্তব নাওফিলের চাউনি ধূর্ত ইগলের মতো? আর ধূসর চোখজোড়া কি জ্যোৎস্নার আলোতে জ্বলজ্বল করবে? চুলগুলোও তো কত ঘন ছিল, তাতে কপালের কতখানি ঢেকে থাকত। এগুলো ভেবেই আবার চোখ তুলে তাকাল দীধিতি নাওফিলের দিকে। নাওফিলও তখনো চেয়ে আছে তার দিকে গাঢ় দৃষ্টি মেলে। যেন খুঁটে খুঁটে দীধিতির চোখ, নাক, ঠোঁট দেখছে সে। দীধিতিও সুক্ষ্ম চাউনিতে দেখতে দেখতে নাওফিলের ইগলের মতো তীক্ষ্ণ চাউনি আবিষ্কার করল। লম্বা মুখটায় চোয়ালদু’টো একটু চাপানো আর ধারাল যেন ওর। সেই জায়গাটুকুতে তার কল্পনায় দেখা দাড়ি নেই ঠিকই। কিন্তু তার ভাষ্যমতে পিওর ক্লিন শেভও নয়। বেচারা নাওফিল দাড়ি রাখার খুব চেষ্টা করে, তার জন্য দীধিতির হঠাৎ হাসি পেয়ে গেল। তবে হাসল না। কল্পনাতে দেখা ঘনচুলে কপালের খানিকটা ঢেকে কপালটা ছোটোও আছে নাওফিলের। আর চোখের মনি কি ধূসর বর্ণের? বোঝা যাচ্ছে না এত দূরে বসে। তবে সরু নাক, চিকন ছোটো ঠোঁট সবই ঠিক আছে। শুধু সুন্দর দাড়িটুকু থাকলেই একেবারে তার কল্পনাতে সাজানো পোল্যান্ডের নায়কের মতোই হয়ে যেত। আজকে থেকে সে না হয় আল্লাহর কাছে বেচারা নাওফিলের জন্য দাড়ি চেয়ে প্রার্থনা করবে। এমনটা ভেবে এবার সে হেসেই ফেলল মুখে হাত দিয়ে।

নিঃশব্দতার মাঝে হঠাৎ এমন হেসে ওঠায় নাওফিলের স্থির দৃষ্টির চাউনিতে ব্যাঘাত ঘটল, ‘হাসছ কেন?’
হাসিতে কোনোরকমে বাধা দিয়ে দীধিতি জবাব দিলো, ‘আপনার মতো সুপুরুষের মাঝে একটা বিশেষ কমতির জন্য আমারও আফসোস হচ্ছে ভীষণ।’
-‘আফসোস হচ্ছে না। তোমার খুব মজা লাগছে তা বোঝায় যাচ্ছে।’
-‘না সত্যি। আমারও আফসোস হচ্ছে। হাসলাম তো আমার নিজের ভাবনার জন্য।’
-‘কী ভাবনা?’
-‘বলা যাবে না। যদি কোনোদিন আমার কল্পনার মতো আপনার সুন্দর চাপদাড়ি গজায় সেদিন বলব।’
-‘তোমার কল্পনার মতো?’

দীধিতি থমকাল এবার। ইস! বেশি ঠাট্টা করতে গিয়ে কী একটা ভুল করে বসল! লজ্জায় নাওফিলের মতো সেও ঠোঁট কামড়ে ধরল, চোখ মুখের অভিব্যক্তি সর্বনাশ সর্বনাশ! নাওফিল এবার ওকে নকল করেই ঠোঁট কামড়ে মিটিমিটি হাসতে থাকল। এ কথার সুর বদলানোর জন্য আর কোনো ছুতা মাথায় আসছে না দীধিতির। আড়চোখে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখল, নাওফিলের মিটিমিটি হাসির সঙ্গে তার চোখের নিবদ্ধ চাউনিতে দুষ্টুমি খেলা করছে। চকিতে উঠে দাঁড়াল সে, কপট গম্ভীরস্বরে বলল, ‘ওরা আসছে না কেন? দুপুরের খাবারের দাওয়াত দিয়ে ঐশী খেতে দিতে ভুলে গেল না কি?’
নাওফিলও উঠে পড়ল, নজর ঝুঁকিয়ে হাসতে হাসতে ওর কাছে এগিয়ে এল। দীধিতির খু্ব কাছে আসার ইচ্ছা হলো ওর। পুরোপুরি নিশ্চিত সে, ভালোবাসাটা হয়ে গেছে দীধিতির। আর তার বিশ্বাস, আকস্মিকভাবে তার ঠোঁটের প্রগাঢ় স্পর্শে ওর ঠোঁটদু’টো আঁকড়ে ধরলেও তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছপা হবে না আর দীধিতি। কিন্তু এখন এ ইচ্ছেটা দাবিয়ে রাখার জন্য, প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য নয়। তবে হৃদয়ের অন্তঃপুরে ইচ্ছেটা জমিয়ে রাখল সে। মুখোমুখি এসে দাঁড়াতেই দীধিতি লজ্জা আর বিহ্বল নজর মেলল নাওফিলের চোখে। তার এই সমাচ্ছন্ন দৃষ্টির কাছে নাওফিলের সম্মোহনী ক্ষমতার চোখদু’টো অসংযত হয়ে ওর ঠোঁটদু’টোতে গিয়েই আটকাল। দ্বিধাহীনভাবে খুব কাছে এল দীধিতির। তা দেখে কোমল, অনুচ্চস্বরে দীধিতি জিজ্ঞেস করল, ‘এত কাছে এলেন কেন?’
নাওফিলের জবাব পেল না। কয়েক পল যেতে নাওফিলের নজর খেয়াল করে সে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘আমার ঠোঁটের দিকে চেয়ে আছেন কেন?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮ 

প্রশ্নটা কানে বাজতে নাওফিল তাকাল একবার দীধিতির চোখে, আবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করল ওর ঠোঁটে। ঠোঁটের ওপর আরেকটু ঝুঁকে এসে চাপাস্বরে জবাব দিলো, ‘এখানটাতে আমার ঠোঁটজোড়া কথা বলতে চায়।’
ঠোঁটদু’টো চেপে ধরে চোখদু’টোও বন্ধ করে ফেলল দীধিতি। সারা শরীরে তার কাঁটা দাঁড়িয়ে গেছে। তা খেয়াল করল নাওফিল ওর গালের পাশটায় তাকিয়ে। কানেকানে বলল তখন ওকে, ‘আমার থেকেও আবেগ-অনুভূতি তোমার বেশি দেখছি।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯