Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি

গন্তব্যে ফেরা অবধি নিঃশব্দতায় কেটেছে দু’জনের, দু’প্রান্তে বসে একটুখানি নিজেদের পানে ফিরেও দেখেনি, ভাবনার সমাপ্তি টানতে পারেনি তখনো কেউ। দীধিতির বর্তমান বাসার সামনে গাড়িটা থামতেই শুধু তখন একবার দু’জন দু’জনার দিকে তাকায়। এ যেন ঠিক হলো না কিংবা উচিত নয়। এমনভাবেই অচিরাৎ চাহনি ফিরিয়ে নেয় নাওফিল। সংশয়ান্বিত হয় এতে দীধিতি৷ প্রেমমূলক যে বাক্যে তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছিল পাশের ছেলেটি, সেই বশত সামান্যতম হলেও সে প্রেমমুগ্ধ হয়েছিল। তবে সেই বাক্যের সাথে নাওফিলের চাহনি, কথাতে মিল নেই কেন? প্রকাশ পায় না কেন নাওফিলের চাহনিতে প্রেম? কথাতে নেই কেন প্রেমের আবেশ? ধোঁকায় পড়ছে কি সে?
-‘তুমি কি কিছু বলতে চাও? পৌঁছে গেছি তোমার বাসায়।’
নিস্তব্ধ গাড়িতে দু’জন মৌনতা বজায় রেখে বসে থাকার কোনো উদ্দেশ্য নেই, প্রয়োজনও তো আর নেই। দীধিতির ভ্রু কুঞ্চিত চিন্তাশীল মুখ দেখে সময় ব্যয়ের ইচ্ছাও নেই নাওফিলের।
ভাবনাতে বিভোর হয়ে পড়েনি দীধিতি। ভাবনাটুকুর সঙ্গে সে অপেক্ষাতে ছিল মাত্র। বিদায় বাক্যে নাওফিল তার প্রেমটুকু হয়তোবা প্রকাশ করবে। কিন্তু আরও একবার সংশয়ে পড়ল সে নাওফিলকে নিয়ে। বিনা বাক্যব্যয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। বিদায়সূচক কোনো শব্দ প্রকাশ করল না সেও। বাঁ হাতের মাঝে হ্যান্ডপার্সটা চেপে ধরে গেটের ভেতর ঢুকে পড়ল। পেছন ফিরলে নিশ্চয়ই দেখতে পেত তার প্রতি নাওফিলের দুর্ভেদ্য বদ্ধদৃষ্টি।

-‘শেষমেশ মেনে নিলিই তবে নাওফিল শেখকে?’
তামান্নার প্রশ্নে কোনো বিকার নেই দীধিতির। তন্বী নুডুলসের বাটি এনে ওদের হাতে দিলো এই ফাঁকে। দীধিতির পাশে বসতে বসতে বলল ও, ‘উপায় কী? এছাড়া কোনো অপশন রেখেছে কি এমপির ছেলে?’
-‘আচ্ছা সরাসরি জাকির শেখের কাছে গেলে কেমন হয়?’
-‘জাকির শেখ কে?’ নুডুলসের মাঝে চামচ নাড়াতে নাড়তে জিজ্ঞেস করল দীধিতি।
-‘তোর হবু শ্বশুর।’
মুখের মধ্যে তন্বী এক গাদা নুডুলস পুরে অস্বাভাবিক আওয়াজে প্রশ্ন ছুঁড়ল তখন তামান্নাকে, ‘ওর হবু শ্বশুরের নাম জাকির শেখ কে বলল তোকে?’
-‘আরে আমি ভুলে গেছি ওনার নাম। এমনই শুনেছিলাম মনে হয়। নামের ইতিহাস বাদ দে। ওনার ছেলের এই পাগলামি ডিরেক্ট ওনাকে জানালে কিছু একটা হবে নিশ্চয়ই।’
বিরক্তির সুর দীধিতির, ‘হ্যাঁ হবে। আমার বিয়ে হবে ওনার ছেলের সাথে।’
নুডুলস খাওয়ার মতো রুচিটুকু নেই দীধিতির। নাওফিলকে নিয়ে চিন্তায় ওর মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হয়ে গেছে।

-‘সেদিন নাওফিলের বাবা-মা’কে নাকি ঐশীর শ্বশুর শাশুড়ি আমাকে দেখাতে চেয়েছিলেন। মানে নাওফিলের পছন্দের মেয়ের কথা ওর পরিবারও জানে। তো সরাসরি এমপির কাছে তার ছেলের নামে নালিশ নিয়ে গেলে আমাকে সরাসরি ওই সময়ে বিয়ে করিয়ে দেবে তাদের ছেলের সঙ্গে।’
-‘তিনটা মাস সময় তো দিয়েছে তোকে নাওফিল৷ আর ও তো বলেছেই যে, ওকে তোর খারাপ লাগলে তোকে বিয়ে করতে জোর করবে না, ছেড়ে দেবে। তুই যদি একান্তই নাওফিলকে না পছন্দ করিস তাহলে তিন মাস পর বলে দিবি ওর মাঝে তুই ভালো লাগার মতো কিছু পাসনি। কাহিনি শেষ!’
তন্বীর সহজ সাবলীল বাংলা কথাগুলো শুনে মেজাজ আরও তেতো হয়ে গেল দীধিতির। বিছানার ওপর থেকে ফোনটা তুলে গত এক সপ্তাহ আগে দেওয়া নাওফিলের মেসেজটা দেখাল ওদের। সুন্দর, নির্ভুল বাংলাতে লেখা, ‘আমাকে জাজ করার পুরো স্বাধীনতা তোমায় দিয়েছি। যেভাবে খুশি সেভাবে আমাকে বাছবিচার করো, গুপ্তচরের সাহায্য নাও, যা খুশি করো। কিন্তু কোনো কিছুই না করে তিন মাস শেষে যদি বলো আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি তাহলে সেদিন বাস্তবে তোমাকে সামনে বসিয়ে জ্যান্ত মানুষের ব্যবচ্ছেদ করব, তারপর তোমাকেও।’
মেসেজটা পড়তে পড়তেই তন্বীর গলায় আটকে গেল নুডুলস। এদিকে তামান্না হেসে খুন। আর দীধিতির নির্বিকার চাউনি ওদের দিকে। তন্বী দ্রুত উঠে গিয়ে পানি ঢালল গলার ভেতর। ফোনটা হাতের মধ্যে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে দীধিতি বলতে থাকল, ‘কী এমন প্রয়োজন আমাকে ওর? যে আমি ছাড়া ও আর অন্য কাউকেই চায় না! ছেলে মানুষ সত্যি প্রেমে পড়লে তার চোখের চাউনিতে আগে তা প্রকাশ পায়। কিন্তু নাওফিলের দৃষ্টি তোদের দিকেও যেমন আমার দিকেও তেমন। কোনো মুগ্ধতা দেখিনি ওর চোখে আমার জন্য, আমাকে পাওয়ার তৃষ্ণা ওর মাঝে প্রকাশ পায় না। ছেলে মানুষের মাঝে যে মেয়ের প্রতি ফিলিংস থাকে, সেই মেয়ে অবশ্যই তা টের পায়। কিন্তু আমি টের পাই না। ওর মাঝে আমার জন্য প্রেম, প্রণয় বলতে কিছু নেই। যেটা আছে তা হলো আমাকে ওর প্রয়োজন। এটাই মনে হচ্ছে আমার বারবার।’

-‘উফ্! ভর দুপুরে তোকে ডেকে নিয়ে এসে যেচে পড়ে মাথা আউলা ঝাউলা করলাম। এই হটি মাল মাথার ভেতরের পোকা নাড়িয়ে দিচ্ছে একেবারে! তার থেকে বলি কী? তুই এই তিনটা মাস ওকে কাছ থেকে সত্যি সত্যিই যাচাই বাছাই কর, হতেও পারে ও সত্যি বলছে। তোকে যেমনটা দেখিয়েছে ও তেমনটা আসলে নয়। আরেকটা বিষয় জানিস? ওদের ফ্রেন্ড সার্কেলে সব থেকে সম্ভ্রান্ত, ভদ্র প্রকৃতির নাকি নাওফিল। প্রচণ্ড মেধাবীও। আবার কিছুটা ধার্মিক গোছেরও নাকি ও আর তুষার। তুষারের থেকেই জানা এগুলো। ওদের প্রত্যেকের গার্ডিয়ান নাকি নাওফিলকে সব থেকে বেশি পছন্দ করে, ভালোবাসে। ওর প্রশংসার শেষ নেই। আমি শুনতে শুনতে মুখস্থ করে ফেলেছি। তুষার বলে, “এগুলো হয়তো তোমাদের কাছে বানোয়াট মনে হচ্ছে। কিন্তু মিথ্যা বলে আমার কী লাভ? নাওফিলকে দীধিতি বিয়ে করে নেবে এগুলো শুনলে, এটাই তো লাভ বলবে। আমি যদি সত্যিই মিথ্যা বলি তাহলে ওপরওয়ালার কাছে কি আমায় জবাবদিহি করতে হবে না? মিথ্যার সাজা কি মিলবে না আমার? না কি মৃত্যুর ভয় নেই আমার?” তুষারের সাথে আমার সম্পর্কটা প্রেমের না হলেও আমি এতটুকু চিনেছি ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ-কালাম ছাড়াও অনেক ইবাদাত করে। কয়েক দিন আগেও ওদের এলাকার মসজিদ থেকে তাবলীগ করতে গিয়েছিল ও। সে ক’দিন ওর ফোন অফ ছিল। স্টুডেন্ট থাকতে নাকি নাওফিল আর ও সব সময় এক সঙ্গে যেত। বাকিরাও যেত। কিন্তু ওদের দু’জনের মতো ঘনঘন না। তুই সুযোগ দিয়ে দেখতে পারিস নাওফিলকে। ওদের দু’জনের কপালেই দেখবি নামাজ পড়ার জন্য কালো দাগ হয়ে গেছে৷ অন্তত আল্লাহর কোরআন, হাদিস প্রতিদিন চর্চা করে কারও ক্ষতি করার সাহস ওরা করবে না৷ একটা কথা সেদিন ফেসবুকে ফটোক্যাপশনে দেখেছিলাম। কথাটা মন্দ ছিল না। যে বিশ্বাস করতে পারে সে অর্জন করতে পারে। এখন তোর নাওফিলকে বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

কথাগুলো শেষ হতেই দু’জন এক সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তন্বী আর আগ্রহ করেনি নাওফিলের ব্যাপারে শুনতে। সে রীতিমতো নাওফিলকে ব্ল্যাকহোল নামে আখ্যায়িত করে বসে আছে। তবে সে দীধিতিকে বলল, ‘তুই প্রথমবার একজনকে সিরিয়াস পছন্দ করে আর তা নিজের অজান্তে প্রকাশ করে নিজেকে নিজেই নাওফিলের চোখে ফেলেছিস। শিহাবও খুব প্রশংসা করে ওকে নিয়ে। আর এটাও বলে, এর আগে নাওফিল কোনো মেয়েরই ধারে কাছে যাবার আগ্রহবোধ করেনি।’
দীধিতি ফোঁস করে আবার একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সমুদ্রের বিশাল অশান্ত, অপ্রতিরোধ্য লহরী থেকে যে ভূপৃষ্ঠ রক্ষা পায় না। তা তো প্রকৃতির সৃষ্টি। দীধিতির জীবনেও নাওফিলের আগমন তেমন নির্বাধ৷ আর তা দীধিতির নিয়তি৷ তন্বী হয়তোবা ঠিকই বলেছে৷ নিয়তি কিছুটা মানুষের কর্মের ওপরই নির্ভর করে তৈরি হয়। নাওফিলের প্রতি তার মনোহারিত্ব প্রকাশ না পেলে নাওফিলের চোখে কি সে পড়ত? এক বেপরোয়া ঢেউ হয়েই এসেছে নাওফিল তার জীবনে। যে ঢেউয়ে সে নাওফিল নামক সমুদ্রে হারাবেই। কোনো নিস্তার নেই।

গত ন’দিন যাবৎ নাওফিলের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না দীধিতির৷ সেদিনের পর ওই একটা মেসেজ ছাড়া আর কোনো কল, মেসেজ করেনি নাওফিল তাকে৷ অদ্ভুতভাবে দীপ্তর সাথেও আর যোগাযোগ করতে পারেনি সে। এসব ঝামেলা না হওয়াই অবশ্য এ ক’টা দিন খুব শান্তিতে পড়াশোনা আর ভার্সিটি নিয়ে কাটিয়েছে। তবে এ ক’দিনে যে দুর্জ্ঞেয় নাওফিলকে তার মনে পড়েনি এমনটা বললে মিথ্যা হবে। বরং প্রতিটা দিনই মনে পড়েছে। শুধু দুশ্চিন্তাটা হয়নি৷ সোশ্যাল সাইটগুলোতে নাওফিলের আইডিগুলোও সন্ধান করা বাদ রাখেনি সে। সব আইডিগুলোতেই প্রচণ্ড গোপনীয়তা। অর্থাৎ নাওফিলের সঙ্গে সংযুক্ত না হলে সে কিছুই দেখতে পাবে না শুধু পার্শ্বচিত্রের জায়গায় ওর ছবিটা ছাড়া। তাও সেটা তোলা খুব দূর থেকে। চেহারা বোঝার উপায়ই নেই। এই ছেলের রহস্য রহস্য ব্যাপারগুলো দিনে দিনে তার কাছে অসহ্য হয়ে ঠেকছে। এ কারণে সামান্য এই আইডিগুলোও কেমন রহস্যময় লেগেছে তার কাছে।
আজ সকাল এগারোটায় ঐশী হঠাৎ কল করে ওদের তিন বান্ধবীকে ওর নতুন সংসার এসে দেখে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। রুমানও ওদের খুব অনুরোধ করেছে আসার জন্য। তাই না আর বলতে পারেনি। ওদেরকে ঠিকানা জানাতেই ওরা তিনজন প্রশ্নবিদ্ধ চোখে শুধু একে অপরকে দেখে যায়। মধ্যাহ্নভোজটা ঐশীর বাসায় গিয়েই করতে হবে। ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে চলে আসে ওরা উত্তরাতে নাওফিলের সেই চিরস্মরণীয় অ্যাপার্টমেন্টে। এ কারণেই ওদের বিস্ময় এখনো কাটেনি।

বেল চাপতেই দরজাটা খুলে যায় অবিলম্বে। যেন ওপাশে কেউ অপেক্ষাতে ছিল দরজা খোলার জন্যই। তামান্না আর শিহাব মুখোমুখি তখন দাঁড়িয়ে। তামান্নার পাশেই ছিল তন্বী আর পিছে দীধিতি। তামান্নার থেকে চোখ সরিয়ে তন্বীর দিকে চেয়ে মুচকি হেসে শিহাব ভেতরে আসার সুযোগ করে দেয় ওদের। দীধিতি ঢুকতেই শিহাব হঠাৎ লম্বা করে ওকে সালাম দিয়ে বসে, ‘আসসালাম ওয়ালাইকুম সিস্টার ইন ল। আমি আর সবুজ আপনাদেরকে এগিয়ে আনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাডি আমাদের যেতে দিলো না।’
এভাবে সালাম দেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে মজা করার জন্য দীধিতি কিছু বলতে চেয়েছিল। হঠাৎ তন্বীর দিকে তাকাতেই কিছু একটা ভেবে তা আর বলল না। শুধু জিজ্ঞেস করল, ‘বাডি কে?’
-‘নাওফিল শেখ।’ রুমান এসে বলল।

একে একে নাওফিলের বন্ধুদের সবাইকেই দেখা গেল। তামান্না আর তন্বী রান্নাঘরে চলে গেছে ঐশীর কাছে। তুষার আর রুমানের সাথে কথা বলতে গিয়ে দীধিতিই এখনো যেতে পারেনি। কিন্তু দীধিতি তখনো বুঝতে পারেনি, তাকে মূলত কথার ছলে আটকে রাখা হয়েছে। তুষার, রুমান তাদের কথার মাঝে নাওফিলের শারীরিক অসুস্থতার কথা এমনভাবে জানাল যে নাওফিলের অসুস্থতার কারণে তারা সেদিন ক্লাবে আড্ডা দিতে পারেনি ঠিকমতো, তাদের আড্ডার মাঝে নাওফিল হঠাৎ বমি করে ভীষণ বিরক্ত করেছে৷ ওদের এত সাবলীল ভঙ্গিতে বলা নাওফিলের অসুস্থতার কথা শুনে দীধিতি বিস্ময় আর রাগে চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল। এতদিন শুধু নাওফিলকে নিয়ে যে সংশয় ছিল, এখন থেকে তা ওর বন্ধুদের নিয়েও হচ্ছে। এদের মাঝের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আদৌ স্বাভাবিক কি না!
ওদের গল্প শুনতে আর একটুও ভালো লাগছে না দীধিতির। কথার মধ্যে ও মেজাজি সুরেই বলে উঠল, ‘উনি নিজের বাসায় থাকলেই পারেন। এভাবে জ্বরে পড়ে এতদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন একা একা।’
রুমান চেহারা কুঁচকে ফেলে বলল, ‘না গেলে তো আর কোলে করে নিয়ে যাওয়া যায় না, বলো। আমার বিয়ের গিফ্ট হিসেবে ওর পাশের ফ্ল্যাটটাই আমাদের গিফ্ট করেছে। আমার ট্রান্সফারটা ফুপাজান এখানে করিয়ে দিয়েছেন। তাই ঐশীকে নিয়ে এখানেই আছি। ও তো পারে আমাদের বাসায় এসে খেয়েদেয়ে যেতে। তাও আসে না। বাধ্য হয়ে আমরাই ওর ফ্ল্যাটে এসে রান্নাবান্না করে খাই।’

ইতস্তত না করে দীধিতি সরাসরিই জিজ্ঞেস করল, ‘উনি ঘরে আছেন?’
-‘হ্যাঁ, চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। বাইরেও আসেনি। কিন্তু ও জানে তুমি আসবে।’
শেষ কথাটা বলার কারণ দীধিতি বুঝতে পারল না। তাকে যে বোঝানো হয়েছে নাওফিল তার আসার অপেক্ষাতে আছে, সেটা বুঝতে না পারার ফলে ওদের সাথেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে তুষারের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছা করছে। সে বলেই বসল, ‘তুমি গিয়ে দেখা করে আসবে একবার?’
একটু অপ্রস্তুত হলো দীধিতি। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝিয়ে এগিয়ে গেল নাওফিলের ঘরের দিকে। শোবার ঘরে ঢুকে দেখা করতে যাওয়াটা তার চোখেই শোভা দেখায় না। তবুও না বলতে পারল না সে কেন যেন।
ঘরের এসি, ফ্যান, সব বন্ধ। জ্বর তাহলে এখনো কি অনেক বেশি আছে নাওফিলের? না হলে বাতাস ছাড়া তো এই গরমে সিদ্ধ হয়ে যাবার কথা। বিছানা খালি, ব্যালকনির থাই খোলা, ব্যালকনিতেও দেখা যাচ্ছে না নাওফিলকে। বাথরুমের দিকে তাকাল দীধিতি। তখনি দরজাটা খুলে গেল। হঠাৎ করে বাথরুমের দরজা খুলতেই দীধিতির মনে হলো সেদিনের মতো আজও না আবার কোনো কাটাছেঁড়া লাশ দেখা লাগে! তাই ব্যালকনির দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

-‘দরজাটা বন্ধ করে দাও।’
ভারী কণ্ঠের এই সাধারণ বাক্য দীধিতির কর্ণকুহরে পৌঁছল ভীতিকর আদেশবাণী হিসেবে। হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। সে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারছে। গোল গোল চোখদু’টো আরও বড়ো বড়ো করে ব্যালকনির দিকে চেয়ে থেকেই নিজের বুকের বাঁ পাশে হাতটা রাখল। স্তম্ভিত মূর্তি দেখাচ্ছে তখন তাকে। ধীরে ধীরে বুকের পাশে রাখা হাতটার দিকে চেয়ে তারপর বিস্মিত চাউনিটুকু ছুঁড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির দিকে। যে মাথা নিচু করে শার্টের শেষ তিনটা বোতাম লাগাচ্ছে মনোযোগ সহকারে। বিস্ময়ের জাল ছিদ্র করে বেরিয়ে এসে সে কণ্ঠে কপট দৃঢ়তা এনে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন? আমরা তো হাসবেন্ড ওয়াইফ নই।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭ (২)

শেষ কথাটা শুনে নাওফিল মাথা তুলে তাকাতে বাধ্য হলো। দরজার কাছ থেকে তখন আরেকটি মেয়ে কণ্ঠ শোনা গেল। যে দীধিতিকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এ ঘরে কার অনুমতিতে ঢুকেছেন? কে আপনি?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮ (২)