আমি শুধু চেয়েছি তোমায় শেষ পর্ব
suraiya rafa
বছর পাঁচেক পরে…..
ইতালির ছোট্ট শহর ভেনিস। সিটি অব ক্যানেলস। সম্পূর্ণরূপে পানির উপর গেঁড়ে বসা এই ইট পাথুরে প্রাচীন শহরের বুকে সকাল নামে গন্ডোলার ধীর দোলায় কুলকুলে জলধারার নরম স্রোতে ভেসে ভেসে।
ছবির মতো মনোরম এই শহরকে কেউ কেউ আবার প্রেমের শহর বলেও দাবি করেন। বলা হয়, প্যারিস হলো প্রেমের ঘোষণা আর ভেনিস প্রেমের অনুভব।
আঁকাবাঁকা পাথুরে সেতুর ছায়া ভেদ করে সকালের সূর্যকীরণ যখন জলের উপর সোনালী রেখা আঁকে, ভেনিস তখন নব্য নিয়মে ভালোবাসা শেখায়। বুকের ভেতর নিঃশব্দে বুনে চলে প্রণয় নামক এক গাঢ় অনুভব। এ শহর প্রেমকে বাঁচায় না, বরং তার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে প্রেম নিজেই নিজের অস্তিত্ব লুফে নেয়। কখনো বা শিল্পীর শৈল্পিক তুলির আঁচড়ে আবার কখনো সময়ের সাথে ক্ষয়ে যাওয়া পুরোনো পথের দেওয়ালে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে ছেলের সুরক্ষার জন্য এই ভেনিসকেই বেছে নিয়েছিল তুষার। নিজের অন্ধকার জীবন থেকে পুরোপুরি অব্যহতি না নিলেও, বিদায় দিয়েছে সেই ন’ রকীয় পেন্ট হাউজ আর ব্রাটভাকে। শুধুমাত্র ছেলের সুরক্ষা বললে কথাটা অবশ্য ভুল হবে। যন্ত্রমানব সেবার নিজের জন্যই ত্যাগ করেছিল জন্মভূমি। বলতে গেলে একপ্রকার পালিয়ে এসেছে ওখান থেকে। যেখানে এরীশ নেই সেখানে নিঃশ্বাস নেওয়াটাও তুষারের জন্য দুষ্কর হয়ে উঠেছিল দিনকে দিন। অথচ চারিপাশে সব জীবন্ত স্মৃতি। মানুষটা নেই, কোনোদিন ফিরবেও না, তবুও ফেলে যাওয়া স্মৃতি গুলো প্রতিটি মূহুর্তে তার অস্তিত্বের জানান দেয় , এ যেন বেঁচে থেকেও নর”কবাস। একটা গুমোট,অস্থির দিশেহারা জীবন থেকে সেবার পালিয়ে বেঁচেছিল তুষার।
এখনও ইতালিয়ান গ্যাংস্টারদের সাথে ওঠাবসা রয়েছে তার। যদিও জনসম্মুখে তুষার এখন বিজনেস আইকন। তবুও ব্রাটভায়ের সাবেক সদস্যকে বাঘের মতোই ভয় পায় ওরা। তুষারের প্রতিটি কমান্ড তারা নির্দ্বিধায় মেনে চলে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লিডারের মতোই সমীহ করে তাকে।
টানা একসপ্তাহের ঝড় বৃষ্টি শেষে আজ সূর্যোদয় হয়েছে ভেনিসের আকাশে। চমৎকার আবহাওয়া। নরম ভেজা বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসছে গন্ডোলার বৈঠা তোলার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ।
শহর থেকে কিছুটা দূরে কোলাহল মুক্ত নির্জন এক ভূখন্ডে অবস্থিত “স্নোফ্লেক্স ম্যানর”। বিলাশ বহুল এই ডুপ্লেক্স ম্যানশনের একটি কক্ষে সময় নিয়ে রেডি হচ্ছে তুষার। চারিদিকে চোখ ধাঁধানো ওয়াল মিররের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে সে। পেশিবহুল নীলচে শিরায় শক্ত হয়ে ওটা কব্জিতে ব্ল্যাকবেল্ট ঘড়ি বেঁধে টাইয়ের বাঁধন ঠিকঠাক করতেই পেছন থেকে কেউ একজন এসে কাঁধের উপর গ্রে রঙের একটা স্যুট চড়িয়ে দিলো তার। যন্ত্রমানব পাশ ঘোরার আগেই পেছন থেকে হাওয়ায় ভর করে ভেসে এলো আগন্তুকের রিনরিনে কণ্ঠস্বর,
— চার্কোল শার্টের সঙ্গে এটা ভালো লাগবে।
সঙ্গে সঙ্গে পেছনে ঘুরলো তুষার। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঈষৎ সোনালু চুলের এক রূপবতী রমণী। তুষারের ব্যক্তিগত স্নোফ্লেক্স। রমণীকে দেখে খুশির বদলে ক্রোধের ঢেউ খেলে গেলো মানবের ধারালো চেহারায় । রাগত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
— এটা কোথায় পেলে?
— ন..নিচের ক্লজেটে।
কথাটা বলতে গিয়ে শুকিয়ে এলো ফ্লোরার কণ্ঠস্বর। উৎকণ্ঠায় রেগেমেগে কিছু কথা শোনাতে গিয়ে রমণীর আপাদমস্তক পরখ করে ফের শিথিল হয়ে এলো তুষারের গনগনে উত্তপ্ত মস্তিষ্ক।
আগের মতো ফিনফিনে সরু নয়, মাতৃত্বকালীন ধকলে বেশ অনেকটাই স্বাস্থ্য বেড়েছে ফ্লোরার। তুলতুলে কোমল চেহারায় নিদারুণ ক্লান্তির ছাপ। কতশত রাত ঠিকঠাক ঘুম হয়নি , তাইতো চোখের নিচে অমন কালসিটে জমে গেছে। ।ভারী রুগ্ন লাগছে মেয়েটাকে। প্রেগন্যান্সীর শুরু থেকেই ফ্লোরার অবস্থা সংকটাপন্ন। প্রায় প্রতিমাসেই কোনো না কোনো জটিলতায় ভুগেছে সে। কতবার যে জ্ঞান হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এতো ধকলের পরেও শুধুমাত্র বাচ্চাটার জন্য নিজেকে শক্ত রেখেছে ফ্লোরা। অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে আছে তার ছোট্ট সোনার। ফ্লোরা যতই শক্ত থাকুক না কেন, শেষ সময়ে এসে ওর মুখের দিকে তাকাতেও কষ্ট হয় তুষারের। তার ওমন গোলাপ কোমল রুশরমণীর কতটা কষ্টই না হচ্ছে। এইটুকুনি মেয়ের নাকি আবার মেয়ে হবে। কি আশ্চর্য!
কথাটা ভাবতে গিয়েই কপাল গোছালো যন্ত্রমানব। তার ওমন চিন্তিত চেহারা পরখ করে ফ্লোরা জানতে চাইলো,
— কি ভাবছো এতো?
তুষার জবাব দিলো না। তার অভিব্যক্তি বুঝে ওঠা দুষ্কর। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর চল্লিশ সপ্তাহের বাড়ন্ত পেটে গভীর নজর বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সে। অতঃপর চোখ তুলে কড়া চোখে তাকালো ফ্লোারার পানে, কিছুটা ধমকের স্বরে বললো,
— কতবার বলেছি সিঁড়ি ভেঙে বারবার নিচে যাবেনা। কথা কেন শোনোনা তুমি?
অভিমানী বালিকার ন্যায় ঠোঁট উল্টালো রমণী। আহ্লাদী গলায় বললো,
— তুমি বলেছো একা একা নিচে না যেতে। কিন্তু এখন তো তুমি বাড়িতেই আছো।
— আমি বাড়িতে থাকি কিংবা না থাকি। তুমি আর সিঁড়ি মাড়াবে না গট ইট?
স্ত্রীর সুরক্ষায় তুষার জাওয়াদ অনুভূতিহীন তৎপর। ফ্লোরা রাগ করলেও যায় আসেনা তার । তবুও অভিমান নিয়ে জানতে চাইলো রমণী,
— ধমকাচ্ছো?
কয়েক মূহুর্ত নীরব থেকে মেয়েটাকে দেখলো তুষার। দেখতে গিয়ে মনেমনে অনুধাবন করলো ফ্লোরার ওই টলমল চাহনি, অভিমানী চোখের জল আজকাল ভীষণ পোড়ায় তাকে । তবে কি যন্ত্রের মতো অনুভূতিহীন হৃদয়টা নমনীয় হতে শুরু করেছে? তুষার ভাবতে গেলো না সেসব, তবে ফ্লোরার দু’বাহু আঁকড়ে ধরে খানিক ঝুঁকে গ্রীবা নামিয়ে বললো,
— না অনুরোধ করছি।
— মানুষ এভাবে অনুরোধ করে?
— তাহলে কিভাবে করে?
তুষারের কণ্ঠস্বর শীতল হয়ে এলো। ততোধিক শীতল গলায় ফ্লোরা জবাব দিলো,
— আদর দিয়ে?
তৎক্ষনাৎ ওর উন্মুক্ত কাঁধে মুখ ডোবালো তুষার। লম্বা শ্বাস টেনে ওষ্ঠপুটের কোমল উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ালো,
— আদর দিয়ে যাচ্ছি। এবার বলো?
স্বামীর গভীর আলিঙ্গনে আবেশে চোখ বুজলো রমণী। কম্পমান স্বরে জবাব দিলো,
— ঠিকাছে, সিঁড়ি মাড়াবো না । কিন্তু ইয়াশ!
ইয়াশের নাম নিতেই চকিতে মুখ তুললো তুষার। প্রসন্ন হেসে জানতে চাইলো,
— কোথায় সে?
— নিচেই, রেডি হয়ে তোমার জন্য ওয়েট করছে।
তুষার আর কথা বাড়ালো না। একবার ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে ঝটপট চুমু খেলো ফ্লোরার দু’গালে। বাচ্চার মতো বুকে আগলে নিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
— আজ আমাদের ছেলের স্পেশাল ডে। নয়তো বের হওয়ার প্ল্যান ছিল না। একসপ্তাহ আগে-পরের সব মিটিং ক্যান্সেল করে দিয়েছি শুধু তোমার জন্য। বাট ইয়্যু নো, হি ইজ মোস্ট স্পেশাল টু মি।
তুষারের কথার পাছে বিগলিত হাসলো ফ্লোরা। মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বললো,
— আমার ছেলের স্পেশালিটি আমি জানি। তোমাকে আর ব্যখা দিতে হবে না মি.জাওয়াদ।
— সাবধানে থাকবে। কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে হসপিটাল যাবে, নিচে মাদামরা আছেন, আর আমি তো আছিই।
কথা শেষ করে আর এক মূহুর্তও সময় নষ্ট করলো না তুষার। প্রেয়সীর ললাটমাঝে নিগূঢ় চুম্বন এঁকে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে।
সকালের স্নিগ্ধ আবহাওয়ার মতোই ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে গাড়িতে বসে আছে তুষার। যানজট বিহীন ফাঁকা সড়কের উপর দিয়ে শাঁই শাঁই করে মেস্ট্রোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে চকচকে ব্ল্যাক রোলস রয়েস গাড়িটা। সামনে বসে চোখে রোদচশমা লাগিয়ে নিশ্চিন্ত মনে গাড়ি ড্রাইভ করছে তুষারের ব্যক্তিগত এ্যাসিসট্যান্ড রোহান শাহরিয়ার। নম্র, ভদ্র, আজ্ঞাবহ এই বাঙালি ছেলেটাকে ভীষণ পছন্দ তুষারের। যেমন দেখতে সুদর্শন, তেমনই কর্মঠ। ইতালিয়ান নামকরা স্নাইপার,বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর ধারালো বুদ্ধি ওর। আন্ডারওয়্যার্ল্ডে সে ওয়ারওলফ নামে খ্যাত। আশেপাশে ঘেঁষা তো দূরে থাক,শত্রুপক্ষ তুষারের ছায়া মাড়ালেও তাকে পতঙ্গের মতো তুলে এনে ছুড়ে ফেলে দেয় অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের মাঝখানে। তবে বরাবরের মতোই রোহানের ব্যাপারেও নির্লিপ্ত ভাবাবেগহীন যন্ত্রমানব। এতো এতো খাটুনি করেও তার মুখ থেকে প্রশংসার প ও কোনোদিন শুনতে পায়নি ছেলেটা । ব্যাপারটা নিয়ে প্রথম প্রথম আফসোস এবং খারাপ লাগা কাজ করলেও তুষারের আচরণে এখন ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেছে রোহান । তুষারের নির্লিপ্ততার মাঝেই যে অসীম অনুরাগ মিশে থাকে তা এখন অবগত বান্দা।
পেছনের সিটে তুষারের পাশেই বাবু হয়ে বসে ছোট ছোট দু’হাতে ফিডিং বোতল আঁকড়ে ধরে চুঁক চুঁক শব্দ করে ফিডার খাচ্ছে পাঁচ কি ছ বছরের একটি বাচ্চা শিশু। স্যুটেড বুট্যেড চমৎকার আউটফিটে তাকে বয়সের চেয়েও কিছুটা বড় লাগছে। পরিধেয় রয়্যাল ব্লু ব্লেজারটির বুকের অংশে সিলমোহর দিয়ে খোদাই করা ভেনিসের বিখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নাম। চমৎকার পোশাকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে মানানসই গ্রে টাই আর পায়ে মব পলিশড কালো জুতা। শিশুটির চেহারার আদল মারাত্মক আকর্ষনীয়। এইটুকু ছেলের ব্লেডের মতো ধারালো জ লাইন, চেহারার কোথাও সামান্যতম বাড়তি বেবি ফ্যাট নেই।
রক্তরাঙা ঠোঁট দু’টোর নিচে নক্ষত্রের মতো গেড়ে বসে আছে কুচকুচে কালো তিল। লম্বা ঘন পাপড়ি যুক্ত নয়নযুগলের উপর জোড়া ভ্রুর আচ্ছাদন। এখনো ফিডার ছাড়েনি, অথচ ছেলের বাহ্যিক গড়ন আর চেহারার গাম্ভীর্যে যে কারোরই দৃষ্টি থমকে যায়। উপরওয়ালার অপরূপ সৃষ্টির প্রশংসায় ন্যুজ্ব হয়ে আসে অন্তর। তুষারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনা, অকারণেই বারবার দৃষ্টি চলে যায় ওই সুন্দর মুখের পানে। বড় হয়ে যে হাজারো রমণীদের চোখের ঘুম কেঁড়ে নিবে এই ছেলে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। চেহারা যেমন গম্ভীর তেমনই স্বভাব চরিত্রও অনেকটা পরিণত। তার মুখে হাসি দেখা দুষ্কর, কাঁদেও না খুব একটা। কিন্তু যখন একবার হেসে ওঠে তখন সেই হাসির ঢেউয়ে চারিপাশে খুশির আলোড়ন তুলে দেয়। দেখলে মনে হয় কেবল ঠোঁট নয়, ঠোঁটের সঙ্গে ওর চোখ দু’টোও সমান তালে হাসে। এক জীবনে কতইতো মানুষ দেখেছে তুষার। কিন্তু এই ছেলের মতো রহস্যের আঁধার দু’টো দেখেনি কোনোদিন। ঠিক যেন জন্মদাতার অনুলিপি । ছেলেকে দেখতে দেখতেই ওর মাথাভর্তি ঝাকড়া চুলে হাত বোলালো তুষার, স্নেহের স্বরে শুধালো,
— স্কুলের প্রথম দিন তোমার। হাউ ডু ইউ্য ফিল চ্যাম্প?
— বোলিং!
চট করে জবাব দিলো ইয়াশ। সামনের দু’টো দাঁত না থাকায় তার ল আর র এর মধ্যকার পার্থক্য বুঝে ওঠা দুষ্কর। কিন্তু তুষার বুঝলো, ছেলের এহেন প্রত্যুত্তরে তার কপালে জড়ো হলো চিন্তার বলিরেখা।
সহসা পুনরায় প্রশ্ন করলো সে ,
— হোয়াই বোরিং? তুমি কি ড্যাডের মতো পাইলট হতে চাওনা?
প্রত্যুত্তরে এক মূহুর্ত সময় নিলোনা ছেলে তার। তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো,
— নো ওয়ে পাপা। আই লাভ গেমিং।
— তাহলে তুমি স্কুলে যেতে রাজি হলে কেন ?
তুষার জানে ছেলেকে অনিচ্ছাকৃত রাজি করানো মুশকিল, তাই প্রশ্নটা করলো সে।
— কালণ পাপা অনেক গেমিন দিভাইস কিনে দিবে।
ছেলের প্রত্যুত্তরে হতাশ হলো তুষার। ধৈর্য ধরে কিছু বলতে যাবে, তখনই ভাইব্রেট ফোনটা বেজে উঠলো তার।
রিসিভ করে কানে তুলতেই চোখের তারায় ভেসে উঠলো সংশয় । বজ্রাহতের ন্যায় ওপাশের কথাগুলো নীরবে শুনে গেলো সে । অতঃপর কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের মাঝে কল কেটে জোর গলায় আদেশ করলো রোহানকে,
— রোহান গাড়ি ঘোরাও ফাস্ট! উই নিড টু গো হসপিটাল রাইট নাও।
— বস,ইজ এনিথিং সিরিয়াস?
গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতেই কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো রোহান। বিপরীতে ওপাশ থেকে ভেসে এলো তুষারের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর,
— ফ্লোরা ইজ ইন লেবার নাও!
ঘটনার সারাংশ না বুঝলেও, কোথাও একটা জরুরি ভিত্তিতে যাওয়া হচ্ছে, তা ঠিকই উপলব্ধি করতে পারলো ইয়াশ। সহসা ফিডার খেতে খেতেই সে ড্যাশবোর্ডের দিকে চোখ বোলালো একপল। গতিসীমা ষাটের ঘরে আঁটকে আছে, রক্ষণশীল রোহানের এহেন সহনশীলতা মোটেও পছন্দ হলোনা তার। তাই চোখ তুলে তুষারের পানে দৃষ্টি তাক করে বলে উঠলো,
— পাপা! তোমাল মনে হচ্ছে গালিটা খুব ধীলে চলছে? আই থিংক ইউ্য শ্যুদ দ্রাইভ।
— ঠিক বলেছো।
ইয়াশের বলতে বাকি, তৎক্ষনাৎ রোহানকে সরিয়ে নিজে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো তুষার। অ্যাক্সেলে পা দাবিয়ে শক্ত হাতে গিয়ার টেনে ধরে লুকিং গ্লাসের মধ্যে দিয়ে ছেলেকে অবলোকন করলো যন্ত্রমানব,পেছন থেকে ইয়াশ বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে ওকে সাইন দেখাতেই ড্যাশবোর্ডে একশোর উপর গতি তুলে হাওয়ার বেগে ছুট লাগালো গাড়িটা। ওদিকে এইটুকুনি ছেলের পাকামিতে বেজায় বিরক্ত রোহান। সে পেছনে ঘুরে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে দাঁত খিচিয়ে আওড়ালো,
— বি”চ্ছ্যু!
— কল মি ইয়ং মাস্টাল!
ফটাফট রোহানের মুখের উপর জবাব ছুড়লো ইয়াশ। সে কথার প্রত্যুত্তরে রোহান ঠোঁট বাকিয়ে উপহাস করে বললো,
— আগে র বলতে শিখো পিচ্চি, তারপর ডাকবো।
রোহানের কথায় ভারী বিরক্ত হলো ইয়াশ। কথা নেই বার্তা নেই মুখ ভর্তি ফিডার নিয়ে অকস্মাৎ কুলকুচির মতো ছুঁড়ে মা”রলো তার মুখের উপর। দূধ, মিক্সড ফ্রুটস আর সিরিয়ালের ঘ্যাটঘ্যাটে মিশ্রন মুখের উপর আঁচড়ে পড়তেই চোখ দু’টো খিঁচে বন্ধ করে নিলো সে। ড্রাইভ করতে করতেই এই পুরোটা দৃশ্য একমনে পরখ করলো তুষার। নিজের বিশ্বস্ত সহচরের এই হাল করার পরেও ধমক তো দূরের কথা একটাবার প্রশ্ন অবধি করলো না ছেলেকে। তার কাছে ছেলের ইচ্ছাই সর্বদা স্বীয়ধার্য। ছেলে দিন বললে দিন, আর রাত বললে তবেই রাত। ফলস্বরূপ টিশ্যু বক্স থেকে কয়েকটা টিশ্যুু বের করে নীরবে এগিয়ে ধরলো রোহানের দিকে । বেচারার অবশ্য অভ্যাস হয়ে গিয়েছে এসবে। বাইরের দুনিয়ায় সে বাঘ হলেও, এই পুঁচকের বুদ্ধির সঙ্গে টেক্কা দেওয়া দায়। সহসা টিশ্যু গুলো গ্রহন করে নির্লিপ্তে মুখ মুছলো সে।
আগে অবশ্য সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু যখন থেকে এই বি”চ্ছ্যুটা কথা বলা শুরু করেছে তখন থেকেই শুরু হয়েছে বিপত্তি। দিনের বেশিরভাগ সময়ই একের পর ফরমায়েশ থাকে তার, কখনো বলবে, ওমুককে পছন্দ না গুলি করে দাও, তো কখনো বলবে ওই বাড়িটাতে আওয়াজ ভীষণ ব”ম মে”রে দাও। এসবকে আবদার বলে? এগুলোতো রীতিমতো ক্রা”ই”ম। তার কথায় রোহান সায় না জানালেই হলো, সেদিন আর স্নোফ্লেক্স ম্যানরে পা রাখার সুযোগ হয় না তার। এমন ভাবে হয়রান করে ছাড়ে যে লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয় ওয়ারউলফ খ্যাত রোহান। এই ছেলের র”ক্তে নিঃসন্দেহে মাফিয়া বসের ডিএনএ বইছে । নয়তো এইটুকুনি পুঁচকে ছেলের শিরায় শিরায় এতো বদবুদ্ধি কেন হবে? বান্দার এহেন নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে এতোক্ষণে ঠোঁট বাঁকিয়ে বড়দের মতো চোখে হাসলো ইয়াশ। সেই হাসিতে বিভ্রম কেটে গেলো রোহানের। সে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অসহায় কন্ঠে বললো,
— তুমি কি আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিবে ইয়াশ ?
বিপরীতে গম্ভীর স্বরে বাক্য ছুড়লো ইয়াশ,
— দেন কল মি ইয়ং মাস্টাল!
হন্তদন্ত হয়ে হসপিটালে পৌঁছেও লাভ হলোনা বিশেষ। ফ্লোরার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত ওটিতে নেওয়া হয়েছে তাকে ।
এই মূহুর্তে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তুষারের।
তবুও অস্থির হয়ে উঠেছে মন, কিছুতেই মানতে চাইছে না এই প্রতীক্ষার দহন। প্রতিটা মূহুর্ত তার কাছে অসহনীয় ঠেকছে, মনে হচ্ছে একেকটি মিনিট যেন একেকটি আলোকবর্ষ। সময় যেন যাচ্ছেই না। ভেতরের অহনীয় তৎপরতায় শীতল আবহাওয়ার মাঝেও দরদর করে ঘামতে লাগলো শরীর তার।
একপর্যায়ে হাসফাস করতে করতে একহাতে টাইয়ের বাঁধন শিথিল করে,পড়নের কোট খুলে হাতে নিলো সে। ব্যস্ততার মাঝে ইয়াশের উপস্থিতি টের না পেয়ে পেছনে ঘুরে ছেলেকে খুঁজলো। নাহ নেই!
ব্যতিগ্রস্ত হয়ে তৎক্ষনাৎ পা চালিয়ে এগিয়ে গেলো কিছুটা। লম্বা সরু করিডোরের এ মাথা থেকে ওমাথা কোথাও দেখা মিললো না ইয়াশের। অগত্যা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লো তুষার। এক মূহুর্ত চোখের আড়াল হলেই ছেলে তার উদাসীন হয়ে পরে। কেমন যেন গম্ভীর হয়ে বসে থাকে চুপচাপ। ইয়াশের এই নির্লিপ্ততা তুষারকে পো”ড়ায় , ভীষণ পো”ড়ায় । দুনিয়া উজাড় করে দিয়েও ছেলের এই শূন্যতা আর একাকীত্ব বোধ হয় এ জীবনে কাটবার নয়। তুষারের অহস্য লাগে, অদম্য এক ছাইচাপা যন্ত্রণায় ভেতরটা হু হু করে ওঠে। ছেলের চেহারায় সামান্যতম ব্যথার ছাপ ও সহ্য হয়না তার । অগত্যা রোহানকে অপেক্ষা করতে বলে ইয়াশের খোঁজে ছুটে যায় তুষার। নিশ্চয়ই কোথাও কোনো নীরব জায়গায় বসে আছে চুপচাপ ।
এলিভেটর ধরে নিচের ফ্লোরে নামতেই দেখা পেলো ইয়াশের। যা ভেবেছিল তাই হয়েছে, কাচের দেওয়ালের ওপাশে রংতুলিতে আঁকা শৈল্পিক ভাসমান শহর, আর এপাশে নাটকীয় বিস্ময়। ছেলে তার ওয়েটিং রুমের চেয়ারে বসে আইপ্যাডে গেম খেলছে। ওর গোল গোল টলমলে চোখ দু’টো ডুবে আছে চলন্ত স্ক্রীনে।
তুষার জানে লোকজনের সান্নিধ্য মোটেই পছন্দ নয় ইয়াশের। তাই বলে এভাবে স্ক্রিনিং করবে? চোখের ক্ষতি হবে তো! চোখের পাওয়ারে সমস্যা হলে বড় হয়ে জেট পাইলটিং করবে কিভাবে সে?
মনের ভাবনায় তপ্তশ্বাস ফেলে ছেলের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল যন্ত্রমানব। তবে দু’কদম পা বাড়াতেই হাঁটার গতি থমকে গেলো তার। সচেতন মস্তিষ্ক ঢং করে একটা সংকেত দিতেই তড়িৎ বেগে ঘাড় ঘোরালো তুষার। পাশেই একটা কেভিন, ভেতরে মূমুর্ষ রোগী শুয়ে আছে, অক্সিজেন চলছে তার। অথচ তুষারের হৃদয় বলছে ভেতরে এমন কেউ রয়েছে যে ওর এটেনশন চাইছে । ঘটনা আঁচ করতে না পেরে ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের বাইরে থেকেই আরেকটু ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করলো সে। এবারে তুষারের চোখে স্পষ্ট হলো সেই পরিচিত মুখ। এতোগুলো বছরের দীর্ঘ দূরত্ব, আত্মিক টান নেই, তবুও মানুষটাকে চিনতে অসুবিধা হলোনা তার। নিস্তেজ, ভাঙাচোরা মুখটা দেখতে গিয়েই ঠোঁট ফুঁড়ে নিসৃত হলো অস্পষ্ট এক ভারী শব্দ,
— মমমাহ!
জীবনে প্রথমবার বোধ হয় এই শব্দটা উচ্চারণ করলো তুষার, ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো সুপরিচিত এক নারী কন্ঠস্বর,
— কার মা!
বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের ন্যায় ঘুরে তাকালো তুষার। পেছন ঘুরতেই যাকে দেখলো সে এক অপ্রিয় রমণী। যার প্রাণচঞ্চল উচ্ছলতায় কোনো এককালে বেঘোরেই হেসে উঠতো যন্ত্রমানব । জীবনের কোনো এক বেনামি পরিচ্ছদে অজান্তেই ঠায় নিয়েছিল সেই চঞ্চলা মানবী। আজও যাকে উপেক্ষা করার সাধ্য তুষারের নেই। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া এক ধুলোমলিন অধ্যায়, যা আজ পাতার পর পাতা উল্টে ফের একই কক্ষপথে এনে দাঁড় করিয়েছে দু’জনকে।
সেই যে তন্দ্রা ভিলার পেছনের জঙ্গলে দাঁড়িয়ে চাবুকের মতো আ”ঘা”ত করে এসেছিল মেয়েটাকে, আজ আবারও মুখোমুখি হলো তার।
— নিঝুম!
তুষারকে দেখে নিঝুমেরও একই অবস্থা। ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো রমণী। বেইমান চোখ আত্মসম্মানের তোয়াক্কা না করেই অশ্রুজলে থৈথৈ করে উঠলো। অথচ তুষারের সেই নিস্পৃহ মনোভাব আজও অমলিন। পর্বতের মতোই অটল তার আত্মসংযম । সে খুব সাবলীল ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো নিঝুমের দিকে। নিয়ম করে প্রশ্ন ছুড়লো,
— তুমি এখানে?
আজ বহুদিন বাদে এই মানুষটাকে দেখে ভেতরের সুপ্ত অনুভূতিরা যেন প্রজাপ্রতির মতো দিগ্বিদিক ছুটছে। হৃদয়ে র”ক্তক্ষ”রণ হচ্ছে। তিরতিরিয়ে কাঁপছে শরীর, কন্ঠতালু শুকিয়ে কাঠ। তবুও শুষ্ক একটা ঢোক গিলে জড়ানো গলায় জবাব দিলো নিঝুম,
— পৃথিবীটা যে গোলাকৃতির ভুলে গিয়েছেন?
— হেয়ালি করছো?
তুষারের কাটকাট প্রশ্নের জবাবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো নিঝুম। এদিকে ওদিকে মাথা নাড়িয়ে নিরুত্তাপ স্বরে জানালো,
— ভেতরে যিনি আছেন, উনি আমার শাশুড়ি মিসেস তন্দ্রা জাওয়াদ। ওনার চিকিৎসার জন্যই এসেছি।
সকল অনুভূতির উর্ধ্বে গিয়ে আবারও প্রশ্ন ছুড়লো তুষার,
— কি হয়েছে ওনার?
— ক্যা”ন্সার লাস্ট স্টেজ চলমান, এখন লাইফ সাপোর্টে আছেন।খুব সম্ভবত আর একসপ্তাহ টিকবেন।
নিস্পৃহ গলায় জবাব দিলো নিঝুম। ওর এই একটা মাত্র বাক্যই যথেষ্ট ছিল তুষারের হৃদয়টাকে এফোঁড়ওফোঁড় করার জন্য। তুষার অনুভব করলো তার ভেতরের ছটফটানি আর উৎকন্ঠা। এতো এতো যন্ত্রণা বইতে বইতে ওর ভেতরটা বোধহয় জ্ব”লেপু”ড়ে খাক হয়ে গিয়েছে এখন ।অথচ বাইরে থেকে নিস্ক্রিয় মানব। তুষারের এহেন নীরবতার মাঝেই খুব দুঃসাহস নিয়ে জানতে চাইলো নিঝুম,
— আপনি এখানে?
একমুহূর্ত ও ভাবলো না তুষার। দায়সারাভাবেই জবাব ছুড়লো,
—আমার ওয়াইফ ওটিতে আছে, শি ইজ ইন হার লেবার।
নিঝুমের নয়ন বিস্ফারিত হলো। অবিশ্বাস্য চাহনিতে দৃষ্টিপাত করলো তুষারের দিক। বিস্ময়ভাবটা কেটে যেতেই আহত স্বরে বললো ,
— আমি আপনাকে আজও ভীষণ ভয় পাই, কিন্তু একটা জিনিস জানতে ইচ্ছে করছে খুব।
— কি!
তুষার প্রশ্ন ছুড়ঁতেই পায়ে পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো নিঝুম।মানুষটার গভীর টলমলে কৃষ্ণগহ্বরে চোখ রেখে বিধ্বস্ত গলায় শুধালো,
— আপনি আমায় বলেছিলেন কোনোদিন বিয়ে করবেন না। কারণ, ভালোবাসা, বিয়ে, সংসার এসব নাকি আপনার সঙ্গে যায় না।মিথ্যে বলেছিলেন?
বরাবরের মতোই অভিব্যক্তিহীন নেত্রে চেয়ে রইলো মানব। কিয়ৎক্ষণের নীরবতা ভেঙে অপ্রসন্ন গলায় জবাব দিলো,
— মানুষ প্রতীজ্ঞা করলেও সবসময় তা স্থায়ী হয়না নিঝুম। কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা তাদের প্রতীজ্ঞার দেওয়াল ধসিয়ে দেয়। ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় আত্মসংযম। তুমিও তো আমি ছাড়া অন্য কাউকে হৃদয়ে স্থান দিবে না বলে প্রতীজ্ঞা করেছিল, পেরেছো কি তা ধরে রাখতে?
তুষারের রুক্ষ জবাবের প্রত্যুত্তরে নিঝুম কিছু বলবে, তার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো গমগমে এক পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
— কে এসেছে নিঝুম?
নিঝুম ঘুরে তাকাতেই তুষার দেখলো, পাঁচ কি ছয় বছরের একটা ফুটফুটে ছেলে শিশুকে কোলে নিয়ে প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তূর্য। প্রথম দেখায় তুষারকে অপরিচিত ঠেকলো তার। চার্কোল শার্ট আর ব্ল্যাক ওয়েস্ট কোট পরিহিত আগাগোড়া ফর্মাল গেটআপের এই ভদ্রলোককে আগে কখনো দেখেছে বলেও মনে পরছে না, সহসা সামনে এগিয়ে এসে কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলো,
— আমরা কি কোনোভাবে পরিচিত?
তুষার একপল নিঝুমের দিকে চাইলো, তার নিভে আসা দৃষ্টি অনুসরণ করে ফের চোখ ঘুরিয়ে জবাব দিলো,
— না, তবে নিঝুম আমার পরিচিত।
তুষারের কথার পৃষ্ঠে তূর্য কিছু বলার আগেই ঝটপট উত্তর দিলো নিঝুম,
— ঈশানী! আমার বেস্টফ্রেন্ড ঈশানীর হাসবেন্ডের এ্যাসিসট্যান্ট উনি।কি ঠিক বলেছি না?
কাচুমাচু ভঙ্গিতে হেসে হেসে কথাটা বলে চোরা চোখে ইশারা করতেই হ্যা সূচক মাথা নাড়ালো তুষার।
বিপরীতে সম্মোহনী হেসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো তূর্য। স্বভাবসিদ্ধ গলায় বললো,
— মাই সেলফ তূর্য। তূর্য জাওয়াদ।নাইস টু মিট ইউ্য। মিস্টাররররর!
— তুষার জাওয়াদ!
বিনা বাক্যব্যয়ে ভাইয়ের হাতে হাত মিলিয়ে করমোর্দন করলো তুষার। বিপরীতে ভেসে এলো তূর্যের অভাবনীয় কণ্ঠস্বর,
— ওয়াও, আমাদের সারনেইম একই!
ঠোঁট প্রসারিত করে ফিকে হাসলো তুষার। নিরুত্তাপ স্বরে জবাব দিলো,
— নাহ! পুরোপরি এক নয়। আমি মিখাইল, তুষার জাওয়াদ মিখাইল।
তুষারের জবাবে কিছুটা অপ্রস্তুত দেখালো তূর্যকে।প্রসঙ্গ এড়িয়ে সে কিছু বলতেই যাবে, তখনই ওপাশ থেকে প্রশ্ন ছুড়লো নিঝুম,
— আচ্ছা ঈশু অরণ্য ওরা এখন কোথায় ? কেমন আছে বলুন তো? আমার কাছে একটা নাম্বারও নেই যে যোগাযোগ করবো। আপনি কি আমাকে ঈশুর নাম্বারটা দিতে পারবেন? প্লিইইজ!
নিঝুমের করা আকস্মিক প্রশ্নে আধার থমথমে হয়ে গেলো তুষারের তামাটে মুখ। এতোগুলো অবাঞ্ছিত প্রশ্নের কি উত্তর দিবে বুঝে উঠতে পারলো না ঠিক। কিয়ৎক্ষণের ব্যবধানে শব্দ ভান্ডার হারিয়ে গেলো তার। এতোক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা আত্মবিশ্বাসের দেওয়ালে চিড় ধরেছে যেন, তেমন করেই কণ্ঠ খাদে নামালো যন্ত্রমানব। করিডোরের পিনপতন নীরবতা ভেঙে থেমে থেমে রুক্ষস্বরে জবাব দিলো,
— ঈশানী কিংবা অরণ্য ওদের কাউকেই আর ফোনে পাওয়া যাবে না নিঝুম!
তুষারের এহেন বিরস বাক্যে কলিজা ধক্ করে উঠলো রমণীর। শুষ্ক একটা ঢোক গিলে বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে আওড়ালো,
— মানে, কি বললেন ঠিক বুঝিনি। ফোনে পাওয়া না গেলে কোথায় পাওয়া যাবে?
এবারে আর প্রত্যুত্তর করলো না তুষার। নিঝুমের প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে নীরবে সাইডে সরে দাঁড়ালো সে, অদূরের চেয়ারটাতে বসে চুপিসারে গেইম খেলতে থাকা অসম্ভব সুন্দর বাচ্চা ছেলেটাকে ইশারা করে বললো,
— ওই যে এরীশ আর ঈশানী।
তুষারের কথার মর্মার্থ বুঝে উঠতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের ন্যায় অকস্মাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো নিঝুমের সমস্ত শরীর। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পরে যেতে নিলে ওকে একহাতে সামলালো তূর্য। চিন্তিত শোনালো তার কণ্ঠস্বর,
— আর ইউ্য ওকে ঝুম?
সে কথার জবাব দিলো না নিঝুম। বিনাবাক্যে কাঁধ থেকে তূর্যের হাতটা সরিয়ে নীরব পদচারণায় এগিয়ে গেলো ধ্যান জ্ঞান সবকিছু দিয়ে গেইম খেলতে থাকা মনোযোগী বাচ্চা ছেলেটার দিকে।
তুষার নিজেও বাঁধা দিলো না ওকে। অন্য কেউ হলে হয়তো এসব বিষয়ে টু শব্দটিও করতো না সে । কিন্তু নিঝুম তো ঈশানীর সবচেয়ে কাছের বন্ধু, না বললে বড্ড অন্যায় হয়ে যেতো। কথাটা ভাবতে গিয়ে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে বসলো তার অবচেতন মন,
— ন্যায় অন্যায়ের তোয়াক্কা কবে থেকে করতে শুরু করলো তুষার জাওয়াদ।
পৈশাচিক মনের রূঢ় প্রশ্নকে আজ আর উপেক্ষা করলো না যন্ত্রমানব। অকপটে জবাব দিলো,
— যবে থেকে আমার ইয়াশ এসেছে। দুনিয়া উল্টেপাল্টে গেলেও ওকে ভালো মানুষ বানাতে হবে, বানাতেই হবে!
এ যেন নিজের সঙ্গে নিজের দৃঢ় এক প্রতীজ্ঞা তুষারের।
মনোযোগ দিয়ে গেইম খেলতে থাকা ইয়াশ হঠাৎ করেই উপলব্ধি করলো ওর সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসে আছে কেউ একজন। কিন্তু কে? ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে মানুষটিকে দেখার প্রয়াসে মুখ তুলতেই, আচানক ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো রমণী। তার বুক ভাঙা কান্নার আওয়াজ বড্ড করুণ শোনালো ইয়াশের শ্রুতিদারে। সে কেঁপে উঠল। কোনোকিছু বুঝে উঠতে না পেরে নরম মিহি আওয়াজে শুধালো,
— তি হো কাওজাতো দোলোরে ইন কোয়ালকে মোদো?( আমি কি আপনাকে কোনোভাবে কষ্ট দিয়েছি?)
ছোট্ট প্রাণের অবুঝ প্রশ্নে চোখ তুলে চাইলো নিঝুম। ছেলেটার কোমল আদুরে লালিত্যমাখা চেহারাখানি পরখ করে এদিক ওদিক মাথা নাড়ালো সে।
— তাহলে কাঁদছেন কেন?
এই প্রশ্নের কি জবাব দিবে নিঝুম? কণ্ঠনালি যে কান্নায় আঁটকে আছে। ফলস্বরূপ আবারও ডুকরে কেঁদে ভাসালো রমণী। কাঁদতে কাঁদতেই হাজারটা চুমু আকঁলো ছোট্ট নমনীয় মুখটায়। ফোঁপানোর সুরে উত্তর দিলো,
— তোমাকে দেখে বাবা। তোমার মুখটা যে আমার ভীষণ পরিচিত, ভীষণ আপন। এতো সুন্দর কেন বলোতো তুমি?
— গদ( গড) বানিয়েছে তাই।
ছেলের এহেন জবাব শুনে আবারও ওকে পরম স্নেহে বুকে আঁকড়ে ধরে নিঝুম। সিল্কি নরম চুলের মাঝে গাঢ় চুমু খেয়ে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে বলে,
— তোমাকে দেখে আমার কেন এতো কষ্ট হচ্ছে বাবা ? কেন আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না? বলোতো কেন !
অজ্ঞাত এই রমণীর কষ্টের কারণ কিংবা পরিধি কোনোটিই জানা নেই ইয়াশের। তবে তার শরীর থেকে নিসৃত হওয়া মা মা গন্ধটা ভীষণ ভালো লাগছে। এতোটাই আরাম লাগছে, যে চোখ জুড়িয়ে ঘুম আসছে ওর ।
তাই আর জবাব দেয়না ইয়াশ। নির্বিগ্নে দাঁড়িয়ে থেকে মায়ের মমতার আশ্চর্য স্বাদ গ্রহন করে সে। শীতল চোখে শুধু পরখ করে তারই সমকক্ষ একজনকে। যে কিনা কিছুটা দূরত্বে দাড়িয়ে এই মূহুর্তে নিজের মায়ের ভালোবাসার ভাগ নিয়ে বেজায় চিন্তিত। ওই টলমলে অভিমানি চাহনী আর ফুলানো চোখই তার ঈর্ষান্বিত মনের বহিঃপ্রকাশ।
কক্সবাজার, বাংলাদেশ।
ঈশানীদের শ্যাওলা জমা, আটপৌরে দোতলা বাড়িটা আজ লোকে লোকারণ্য। চারিদিকে একটা খোশমেজাজি উৎসবের আমেজ। বাড়ির আঙিনা থেকে গেইট পর্যন্ত রঙিন পর্দা আর তাজা গোলাপ দিয়ে মোড়ানো । লোহায় গড়া পুরোনো আমলের গেইটটাকেও সাজানো হয়েছে অসাধারণ রাজকীয় সাজে। দেখে মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়ি। বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসা সুস্বাদু খাবারের গন্ধে ম ম করছে চারিপাশ। বাড়িতে উপস্থিত সকলের মাঝেই এক ছাইচাপা উৎকণ্ঠা। কারোর আগমনের প্রতীক্ষায় ক্রমশ সময় গুনছে তারা। এরই মাঝে শিশুদের হইরই আর উৎসুক অতিথিদের শোরগোল স্তব্ধ করে দিয়ে বাড়ির গেইটে এসে উপস্থিত হলো একটা বিলাশবহুর চার চাকার মার্সিডিজ। বাড়ির ভেতর থেকে সকলে একযোগে উঁকিঝুঁকি দিতেই
গাড়ির দরজা ঠেলে নেমে এলো একজন। নাহ প্রতিক্ষিত ব্যক্তি নয়, বরং গেইটে এসে দাঁড়িয়েছে ব্যাগী ওভারসাইজড ডেনিম আর ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট চেইক শার্ট পরিহিত সুদর্শন এক যুবক। অচেনা এই যুবকের আগমনে কিঞ্চিৎ আশাহত হলো সবাই। তারা সম্ভবত বরের প্রতীক্ষায় মুখিয়ে ছিল। সহসাই অন্যকারোর আগমনে আশাহত হয়ে ফের যে যার মতো ব্যস্ত হলো খোশগল্পে।
ওদিকে সুসজ্জিত গেইটটাকে নিগূঢ় দৃষ্টিতে পরখ করতে গিয়েই চোখ থেকে রোদ চশমা সরালো আগন্তুক। উপরের নেইমপ্লেটে চোখ বুলিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
— হৃদ ওয়েডস ঊষা! ওয়াও!
আজ ঊষার বিয়ে। রোকেয়া প্রাচী নানান কাজে ব্যস্ত। একদণ্ড শ্বাস ফেলার ফুরসত নেই তার। এরই মাঝে তার সঙ্গে নাকি আবার কোনো এক ছোকরা দেখা করতে এসেছে। দেখতে নাকি ফিল্মের হিরোর মতন। আপাতত বসার ঘরে বসতে দেওয়া হয়েছে তাকে। সেখানেই বিয়ে বাড়ির কুমারী মেয়েরা সব কাজকর্ম ফেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এতো এতো কাজের মাঝে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির আগমনে বেজায় বিরক্ত হলেন রোকেয়া। দরজার আগল ঠেলে মেয়েগুলোকে সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আশ্চর্য হলেন তিনি। কণ্ঠে অবিশ্বাসের ঢেউ তুলে আওড়ালেন,
— মাহিন! তুমি মাহিন বেনজামিন না?
হাতে থাকা একটা শক্ত কাগজে মোড়ানো ফাইলে এতোক্ষণ মুখ ডুবিয়ে রেখেছিল মাহিন। রোকেয়া প্রাচীর আওয়াজ পেতেই ফাইলটা বন্ধ করে নীরবে চোখ তুললো সে। সামনের কাউচের উপর কৌতুহল নিয়ে বসে থাকা মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলার পানে শ্লেষ হাসি নিক্ষেপ করে শুধালো,
— কেমন আছেন আন্টি?
ব্যথাতুর শ্বাস ফেললো রোকেয়া।নিরেট স্বরে জবাব দিলো,
— এইতো চলছে আর কি । কিন্তু তুমি হঠাৎ? না মানে কয়েকবছর ধরেই দেখিনা তোমায়।
রোকেয়া প্রাচীর কৌতুহল অস্বাভাবিক নয়,সহসা মৃদু হেসে প্রত্যুত্তর করলো মাহিন,
— এসেছি। একটা দরকারি কাজেই এসেছি।
রোকেয়া শুধালেন,
— কি কাজ বাবা?
এবারে মাহিন নিজের হাতের ফাইলটা রোকেয়ার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো,
— এই ফাইলটা নিন।
রোকেয়ার কৌতূহলী দৃষ্টি বিস্ফারিত হলো। ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে এলো তার। ফাইলটাকে উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো মাহিনের কণ্ঠস্বর,
— এটা একটা উইল। এতে লেখা আছে এই বাড়ির পূর্ণাঙ্গ মালিকানা আপনার আর ঊষার। নিচে দেখুন ঈশানীর সাইন রয়েছে।
কাটাকাটা বাংলা অক্ষরে ঈশানী লেখা নামটায় আলতো স্পর্শে আঙুল বোলালো রোকেয়া। পরমূহুর্তে চোখ তুলে শুধালো,
— এটা কিভাবে… না.. মা…
রোকেয়ার কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে দেখে মাহিন নিজে থেকেই জবাব দিলো,
—- আজ থেকে কয়েক বছর আগে এই উইলটা করেছিল ঈশানী। ঈশানী চেয়েছিল এই বাড়ির মালিকানা সারাজীবন আপনাদের থাকুক। হস্তান্তরের দ্বায়িত্ব পরেছিল আমার ভাগে। আমি শুধু আমার দ্বায়িত্বটুকু পালন করলাম।
রোকেয়া প্রাচী স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন। তার মুখে রা নেই। মাহিন আর কথা বাড়ালো না। বাক্যালাপ শেষে দ্রুত উঠে পড়লো বিদায় নিয়ে। ঘর থেকে বেড়িয়েই যাচ্ছিল ঠিক তখনই পিছু ডেকে ওঠেন রোকেয়া। ধরা গলায় জিজ্ঞেস করেন,
— ঈশানী এখন কেমন আছে?
মাহিন পিছু ফিরে নিস্প্রাণ চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ । অতঃপর থমথমে গলায় জবাব দিলো,
— আমি জানিনা!
— কেন কোথায় আছে ও?
এবারে ঘুরে দাঁড়িয়ে হনহনিয়ে হাঁটা ধরলো মাহিন, যেতে যেতেই অনুভূতিহীন বিমর্ষ গলায় আওড়ালো,
— নেই! ঈশানী আর নেই!
মূহুর্তেই পেছন থেকে ভেসে এলো রোকেয়া প্রাচীর গগনবিদারী চিৎকার। পৃথিবী সমান ক্লেশ নিয়ে দরজার কাছেই লুটিয়ে পড়েছেন তিনি। বাড়ি ভর্তি মানুষ হুড়মুড় করে ছুটে এলো সব। তারা সকলে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছে রোকেয়াকে। মানুষের পায়ে পিষে বাড়ির উইল মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। অথচ রোকেয়া প্রাচীর আহাজারি তখন দুনিয়া ফুঁড়ে আসমানের শিয়রে। ঈশানীর নানী দেবোরা বয়োবৃদ্ধা। সহজে নড়াচড়া করেন না । তবুও মেয়ের এহেন ম”রা কান্না শুনে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারেন নি। লাঠিতে ভর করে ছুটি এসেছেন দরজার কাছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়া মেয়ের আহাজারিতে নয়ন বিস্ফারিত হলো তার। অবিশ্বাস্য গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—- বিয়া বাড়িত তুই এল্লে ম”রা হাদোন শুরু গইজ্জুস কিল্লাই? (বিয়ে বাড়িতে তুই এমন ম”রা কান্না জুড়েছিস কেন?)
— আমার ঈশানী আর নেই মা!
কান্না সংবরণ করে জবাব দিলো রোকেয়া। তার কথার পাছে ভ্রু কুচকালেন দেবোরা। অধৈর্য হয়ে বললেন,
— ওই মেয়েপোয়া ইবে তো বোত বছর ধরিই নাই। এহন আবার নতুন গরি ঢং গররদে কিল্লাই?( সে মেয়ে তো অনেক বছর ধরেই নেই। এখন আবার নতুন করে ঢং করছিস কেন?)
— কি করবো বলো? আমার ঈশানী যে দুনিয়াতে নেই!
মেয়ের বেদনারুদ্ধ আহাজারি কর্ণকুহর ভেদ করতেই আচানক হাতের লাঠি ফস্কে গেলো দেবোরার। ধপ করে বসে পড়লেন সে মাটিতে।উৎসব মুখর বিয়ে বাড়ি নিমেষেই ঢেকে গেলো শোকের ছায়ায়। আর্তনাদ আর আহাজারিতে ভার হয়ে এলো এ বাড়ির আকাশ বাতাস। পাড়া মহল্লায় হাওয়ার বেগে গুঞ্জন ছড়ালো,
—- ম”রে’ছে! রোকেয়ার বড় মেয়ে ম”রে”ছে।
শোকে মাতোয়ারা ওই শ্যাওলা জমা বাড়িটার দিকে আর ভুলেও ফিরে তাকায়নি মাহিন। নিটোল পায়ে একলা পথিকের মতোই উদ্দেশ্য হীন হাঁটছে সে ।হাটঁতে হাঁটতে কতবার যে শার্টের হাতায় চোখ মুছেছে তার ইয়ত্তা নেই। একপর্যায়ে যেতে যেতে সেও হারিয়ে গেলো ওই ধূলোপড়া সরু রাস্তার বাঁকে। মাহিন,তুষার, নিঝুম, তূর্য কিংবা এরীশ ঈশানী ওদের সকলের ভালোবাসার প্রতিদান দিতেই বোধ হয় কোনো এককালে লালন ফকির গেয়েছিলেন,
ওই প্রেম যে করে সে জানে,
ওই প্রেম যে করে সে জানে,
আমার মনের মানুষেও শনে,
আমার মনের মানুষেরও শয়য়য়নে…..
পরিশিষ্টঃ
বর্তমান,
প্রিসিলা কাঁদছে, নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কান্নার তোড়ে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে তার সরু চিবুক। গোলাপি গাল র”ক্তিম হয়ে উঠেছে। দুহাঁটু ভাঁজ করে তাতে কলমিলতার মতোন গা এলিয়ে ভেজা বালুচরের উপর বসে আছে মেয়েটা। মাথা নুয়িয়ে কাঁদার দরুন ওর কম্পমান শরীরের তীক্ষ্ণ ঝাঁকুনি স্পষ্ট দৃশ্যমান। রাজকুমারীর মতো দেখতে হাঁটুসম ঈষৎ সোনালু চুলগুলো সমুদ্রাগত বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছে । তার উড়ো চুলের সুমিষ্ট ঘ্রান ক্রমশ ইয়াশের নাকে এসে লাগছে। প্রিসিলার থেকে খানিকটা দূরেই বিরস মুখে বসে আছে সে। মাথাভার্তি একঝাঁক সিল্কি কালো চুল আর উন্নত নাসার সুদর্শন যুবক সে । দৃষ্টিতে অমোঘ আকর্ষন,কালচে বাদামি ওষ্ঠ জোড়া আবেশিত করে রেখেছে দু’টো চকচকে ধাতব পিয়ার্সিং। থুতনিতে সামান্য ঢেউ, ঠিক তার মাঝখানে কুচকুচে কালো তিলক। গম্ভীর ধারালো চেহারা জুড়ে প্রাচুর্য্যের অহং। যেন এক অমানিশার রাজপুত্র সে। লাগামহীন অবাধ্য,বেপরোয়া, ছন্নছাড়া এক অস্তিত্ব।
রোদের তেজদ্রীপ্ত রোশনাই কোমল হয়ে এসেছে। ম”রা বিকেলের শেষ প্রহরে সাগরের বুকে ঝুড়ো ঝুড়ো রঙ ছড়িয়ে পশ্চিমে হেলে পড়েছে সূর্যরাজ। রক্তিম হয়ে উঠছে দিগন্ত। একটু বাদেই আধারের পর্দা টেনে সন্ধ্যা ঘনাবে ধরিত্রীতে।লোকালয়হীন একচ্ছত্র এই ছেঁড়াদ্বীপে কোনো আলোর উৎস নেই, পুরোপুরি অন্ধকার নামার আগেই এই স্থান ত্যাগ করা আবশ্যক । ওদিকে প্রিসিলার কান্না থামার নামই নেই। এতোক্ষণ থমথমে মুখে বসে থাকলেও এবার আর চুপ থাকতে পারলো না ইয়াশ। বহুক্ষণের মৌনতা ভেঙে জোড়ালো এক ধমক দিয়ে বসলো সে,
— ফ্যাঁচফ্যাঁচ আওয়াজ করা বন্ধ করবি, নাকি তোকে রেখেই দ্বীপ ছাড়বো?
ইয়াশের অতর্কিত গর্জনে কাঁদতে কাঁদতে মাথা তুলে চাইলো প্রিসিলা। কান্নার তোড়ে নীলাভ দু’নয়ন ফুলে উঠেছে তার, যা দেখা মাত্রই বিরক্তিতে কপাল কুঁচকালো ইয়াশ, পরক্ষণেই দৃষ্টি গিয়ে ঠেকলো তরুণীর তুলতুলে কোমল রক্তিম ওষ্ঠাধরে। কম্পমান চিবুকের সন্ধিতে সমান তালে কাপছে ঠোঁট দু’টো। মেয়েটা একটু বেশিই কোমল আর রূপবতী । তাকালেই চোখ জ্বালা করে। কিন্তু এতো নজরকাড়া রূপ মোটেই পছন্দ নয় ইয়াশের। সহসা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। সেই অনুভূতিহীন বিরস দৃষ্টি অনুসরণ করে ঝাঁঝিয়ে উঠলো প্রিসিলা। পেয়েছে কি এই লোকটা? কথায় কথায় হু””মকি দেয়। অগত্যা নাকের পাটা ফুলিয়ে হেঁচকি দিতে দিতে বললো,
— তুমি যাও, আমি পাপাকে কল করে নিবো।
— এখানে নেটওয়ার্ক নেই।
দায়সারা গলায় জবাব ছুড়লো যুবক। তার চেহারা জুড়ে পাথরের মতো কাঠিন্যতা। মানবের নিস্ক্রিয় প্রতিক্রিয়ায় অভ্যস্ত প্রিসিলা, যার দরুন সেসবে পাত্তা না দিয়ে অন্তরের তাড়নায় আবারও ডুকরে কেঁদে উঠলো মেয়েটা, ভঙ্গুর জড়ানো গলায় বলতে লাগলো,
— কেন! কেন ওরা দু’জন দু’জনকে এতোটা ভালোবাসলো?দুনিয়ার উর্ধ্বে গিয়ে এভাবে ভালো না বাসলে সবকিছু অন্যরকম হতো নিশ্চয়ই!
প্রিসিলার অশ্রুসিক্ত নীলাভ দু’নয়ন পেছনের ঝিনুক আকৃতির পরিত্যাক্ত ক্যাফেটাতে আবদ্ধ, মাথার উপর এখনো জ্বলজ্বল করছে নামটা “কর্ণিয়া ক্যাফে”। ইয়াশ নিজেও সেদিকে তাকালো একপল, তারপর চোখ ঘুরিয়ে নিরন্তর সাগরের পানে দৃষ্টিপাত করে বললো,
—- Even a whole lifetime Doesn’t enough for their love, so they went away.
কথার শেষে গভীর টানলো ইয়াশ। প্রিসিলা কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে বললো,
— তাই বলে এতো অপূর্ণতা! এতো অপূর্ণতা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে আমার ইয়াশ!
ক্রন্দনরত প্রিসিলার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ইয়াশ। জীবনে প্রথমবারের মতো ওর কথার সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে বলো,
— কে বলে অপূর্ণতা?ড্যাড আর মাম্মার ভালোবাসা নিখাঁদ পরিপূর্ণ। অপূর্ন হলে নিশ্চয়ই আমি এক্সিস্ট করতাম না?
—- তুমি কিভাবে এতো সহজে বলে দিচ্ছো?
— টাইম হিলস এভরিথিং!
ইয়াশের কণ্ঠস্বর নিস্পৃহ শোনালো।
— মিথ্যে!, টাইম হিলস নাথিং! নয়তো আজ এখনো এই স্থানে কর্ণিয়া ক্যাফের অস্তিত্ব থাকতো না।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আবারও কেঁদে উঠলো প্রিসিলা। দু’হাতে চুল আঁকড়ে ধরে পা”গ’লের মতো কাঁদছে সে । এবার নিশ্চয়ই অসুস্থ হয়ে ইয়াশকে নতুন কোনো ঝামেলায় ফেলে তবেই ক্ষান্ত হবে মেয়েটা। ইয়াশের তো মাঝেমধ্যে মনে হয় এই মেয়ের জন্মই হয়েছে তাকে বিরক্ত করার জন্য। আগেপরের সব ঘটনা ভাবতে ভাবতেই চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে গেলো তার। মেয়েটার দিকে র”ক্তিম চোখে তাকিয়ে রুক্ষস্বরে বাক্য ছুড়লো তৎক্ষণাৎ,
— জাস্ট স্টপ দ্যা ফাকিং ক্রায়িং প্রিসি!
— আমি কাঁদলে তোমার সমস্যা কোথায়?
সমান তালে চেচিয়ে উঠলো প্রিসিলা। ইয়াশ এগিয়ে এসে ওর নাজুক চোয়ালখানি শক্ত হাতে চেপে ধরে বললো,
— বিকজ আই হেইট ইট।
এক ঝটকায় ইয়াশকে দূরে সরানোর চেষ্টা করলো প্রিসিলা। কিন্তু পারলো না, বিপরীতে আরও দৃঢ় হলো হাতের বাঁধন। অসহনীয় ব্যথায় চোখের কোটর টলমল করে উঠলো মেয়েটার। ব্যথাক্লিষ্ট গলায় আওড়ালো,
—- এতোটা হেইট না করলেও তো পারো।
প্রিসিলার টলমলে ব্যথাতুর দৃষ্টি দেখেও দেখলো না ইয়াশ। উল্টো দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
— তোকে আমি এতোটা অপছন্দ কেন করি জানিস? বিকজ অফ ইউওর ডিজগাস্টিং ব্লু আইস।
কথাটা বলেই মেয়েটাকে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিলো সে। প্রিসিলা আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে উত্তাল সমুদ্রের অভিমুখে হেঁটে যেতে যেতে বিড়বিড়ালো,
—- এটাই তোমার আমার ভবিতব্য ইয়াশ । It’s destined to have a sad ending.
বিপরীতে দাপুটে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে স্বগোতক্তি করলো ইয়াশ,
—A sad ending is actually not an end. It an Infinite love war.
বিভ্রমে ডুবে কথাগুলো বলতে বলতে আচানক সংবিৎ ফিরতেই সামনে তাকালো ইয়াশ । যতদূর চোখ যায় কেবল উত্তাল জলরাশি। দৃষ্টি সীমানার কোথাও প্রিসিলা নেই।সহসা গা ঝেড়ে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ালো সে। ঝড়ো হাওয়ার বেগে সমুদ্রের দিকে ছুটে যেতে যেতে আনমনেই বলে উঠলো,
—but this time, i will definetly change the destiny!
হয়তো আবারও নব্য সূচনায় রচিত হতে চলেছে ভালোবাসার এক নবোদিত অধ্যায়। গোধূলির আকাশে হঠাৎ জ্বলে ওঠা সন্ধ্যা তারার মতোই ইয়াশ এগিয়ে যাচ্ছে তার অজ্ঞাত ভবিতব্যের টানে। পেছন থেকে গাংচিলের পাখায় ভর করে ভেসে আসছে সেই মন্ত্রমুগ্ধ গানের সুর,
টালমাটাল মনটা কিছু
তোমায় বলতে চায়,
বেসামাল ভাবনা গুলো
তোমায় ছুঁতে চায়,
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়…..
সমাপ্ত

Yash name ta shundor Prisila abar kemon nam…last k niye shes korlen, mathar opor diye gelo..aita kemne shes hoilo..
Vlo but last part kichui bujhi nai last er dike and yarish r eshanir shathe ja hoise ta thik na oder diye ending hoilei vlo lagto jotoi Yash ashuk but yarish to yarish e that’s why I hate the story hate you suraiya rafa…
Ami sudhu cheyechi tomay….ekhon ei uponnash tao amar favourite hoye thake jabe….😊😊
Etaaa ki vbee sesh korlen apni please etar session 2 anun etaa ei vbe sesh hote pare na
Apni bolechilen happy ending diben…. Ei apnar happy ending?? Ajke theke apnake khub hate kori ami….i hate u suraiya rafa
na moteo etar sad ending hoy,,, ni apu eta open ending dise ekhon apnar kache jodi mone hoi eta sad ending tahole sad ar jodi mone hoi happy ending tahole happy.
Yarish ar eshani ka bachiya rakhla o partan 🥺
Yarish ar eshani ka bachiya rakhla o partan 🥺
এটা কি সিজন 2 আসবে?
etar surprise episode ashbe nah???
Apu pls season 2 aina dan 😭
আচ্ছা এটা কেনো শেষ হয় চলমান থেকে না কেন “সমাপ্ত” শব্দটা যে ভীষণ পিরা দেয় 😥❤️🩹