আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৭০
suraiya rafa
ক্যালেন্ডারের পাতায় দোসরা জানুয়ারি। গুমোট নিস্তব্ধ এক মেঘাচ্ছন্ন সকাল। মস্কো শহর থেকে বহুক্রোশ দূরে গহীন জঙ্গলের মাঝে অশরীরি প্রেতাত্মার মতোই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এরীশ ইউভানের অঢেল সাম্রাজ্য। দ্যা পাইথন প্যারাডাইস।
দশতলার বহুতল পেন্ট হাউজ, পৃথিবীর নামি-দামি সব গাড়ির বহর, হ্যালিপ্যাডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শখের হ্যালিকপ্টার। বিশাল বড় গান ফায়ারিং রেঞ্জ, শয়ে শয়ে বন্দুকধারী গার্ড, অত্যধুনিক সিকিউরিটি, এছাড়াও শ-খানিক বিশালদেহী শক্তিশালী নেকড়ে পাল, সব মিলিয়ে যেন এক আলাদা ভূ-খণ্ড। কি নেই এই মাফিয়া স্বর্গে? (প্যারাডাইস মানে স্বর্গ)। এতোকিছু থাকার পরেও চতুর্দিকে জমাট বেঁধেছে থমথমে এক নিগূঢ় শূন্যতা। বেরঙ ধূলোমলিন সবকিছু। আঁধারের মতো কালো পেন্ট হাউজ আজ ডুবে আছে নৈঃশূন্য প্রহেলিকায়। গেটের দু’পাশে অবস্থিত বৃহদাকার সিংহমুখগুলো থেকে ম’রা নদীর মতো কুলকুলিয়ে বেড়িয়ে আসছে হীমশিতল ঠান্ডা জল। বাকি জায়গাটুকু মখমলি আবরণে ঢেকে রেখেছে রাতভর পতিত হওয়া শুভ্রস্নিগ্ধ বরফ।
বরফের সেই কোমল আবরন পায়ে পিষে গেটের সামনে উপস্থিত হলো একজোড়া পুরুষালি নিটোল পা। আপাদমস্তক তার কালো দিয়ে আবৃত। টার্টেল নেক সোয়েট শার্টের উপর ব্ল্যাক ওভারকোর্ট পরিহিত যুবকের দীপ্তিময় চেহারা । দূর আকাশে জ্বলে ওঠা নক্ষত্রের মতোই নির্মল দ্যুতি ছড়াচ্ছে তার সৌম্যকান্ত মুখ। অথচ দৃষ্টিজুড়ে তৃষ্ণার্থ চাতকের মতোই অবরুদ্ধ বেদনা।
কিয়ৎক্ষন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরের দিকে উঁকিঝুঁকি দিলো সেই যুবক। শরীর তার স্রোততরঙ্গের মতো দোদুল্যমান ,কণ্ঠতালু শুকিয়ে কাঠ। তখনই ভেতর থেকে এগিয়ে এলো একজন অ”স্ত্রধারী গার্ড। অচেনা লোকটাকে আপাদমস্তক পরখ করে স্পষ্ট রাশান ভাষায় জানতে চাইলো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—ক্টো ভু?( আপনি কে?)
বিপরীতে নীরব দৃষ্টি তুলে চাইলো যুবক। বিক্ষিপ্ত এক অনুভূতির যন্ত্রনায় ছটফট করছে তার মন। তবুও শুষ্ক ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে রুদ্ধস্বরে জবাব দিলো ,
— মাহিন!মাহিন বেনজামিন!
লোকটা অনিশ্চিত ভঙ্গিমায় কপাল গোছালো। চিনতে পারেনি বোধ হয়। না চিনলে ভেতরে প্রবেশের বিশেষ অনুমতি নেই। কারণ আজকের দিনে কোনো র’ক্তার’ক্তি নয়। আজ কেবল মাফিয়া বসের বিশ্বস্তরাই ঢুকতে পারবে পেন্ট হাউজে। যার দরুন লোকটা পেছনে ঘুরে দায়সারা জবাব ফিরিয়ে দিলো মাহিন কে,
— অন্তেষ্টিক্রিয়া ইতিমধ্যে শেষ, দু’জনেরই দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আর আপনি এখন এসেছেন?
অপ্রত্যাশিত একবাক্যে হৃদযন্ত্র খামচে ওঠে মাহিনের। ঝোড়ো হাওয়ার মতো ওলটপালট হয় পৃথিবী। আরেকদফা দৃষ্টি ঝাপসা হয় তার।নির্ঘুম ক্লান্ত শরীরটাকে সামলে কয়েক মূহুর্ত স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকে মানব। পরক্ষণেই জিভের ডগায় অধর ভেজায় সে। ভেতরে যাওয়ার নিরলস পাঁয়তারা করে আচ্ছন্ন স্বরে বলে,
— ঈশানী! ইউওর গডমাদার!
যাওয়ার পথে ফের ঘুরে তাকালো লোকটা। ভ্রু কুঞ্চন করে মাহিনের মুখাবয়ব পরখ করতেই তড়িঘড়ি করে বাক্য ছুড়লো মাহিন,
— ঈশানী আমার বন্ধু। খুউউব ভালো বন্ধু।
লোকটা আস্বস্ত হলো কিনা বুঝে ওঠা দায়। শুধু নির্লিপ্ত গলায় প্রত্যুত্তর করলো,
— আপনাকে তো আগেই বলেছি দাফনের কাজ সম্পন্ন। কফিন সমাধিত করা হয়েছে। তাহলে এখন গিয়ে কি দেখবেন ভেতরে ?
কণ্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে মাহিনের। কথা ঘোরানোর অবকাশ নেই, সহসা ব্যথাক্লিষ্ট গলায় জবাব ছুড়ঁলো সে,
— আমি ওর মুখ দেখতে আসিনি। যেই মুখে বুলি নেই, ঠোঁটের কোণে হাসি নেই, চাহনিতে চঞ্চলতা নেই তা দেখে কি করব? কেবল সমাধিটুকু দেখতে চাই। একনজর দেখেই চলে যাবো।
মুখ ফুটে বাক্য কটা বেরুতেই রুক্ষ দৃষ্টি ছলছল করে ওঠে মানবের। সচরাচর এমন ঘটনা ঘটলে হয়তো এতোক্ষণে বন্দুকের গুলিতে প্রাণ উড়ে যেতো তার । কিন্তু আজকের দিনটাই তো অন্যরকম। শোকাচ্ছন্ন এক ঘোরে থমকে আছে গোটা পৃথিবী। পেন্ট হাউজের একটা মানুষও নিজের মধ্যে নেই। সকলেই চিরাচরিত সত্তা ভুলে শোকের ছায়ায় কাতর। চারিদিকে প্রগাঢ় শূন্যতা। কোথাও যেন কেউ ভালো নেই।
কয়েকমূহুর্ত একধ্যানে চেয়ে থেকে ধাতস্থ হলো গার্ড। ভারী বিরক্তির স্বরে বলে উঠলো,
— ঠিক আছে। কিন্তু আগে আপনাকে সার্চ করা হবে।
মাহিন আর প্রত্যুত্তর করে না। চুপচাপ দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে যায় সম্মুখে ।
মাফিয়া বসের অভূতপূর্ব কার্যকলাপে ভূ-কম্পনের মতোই কেঁপে উঠেছে সমগ্র আন্ডারওয়ার্ল্ড। সকলের যেন টনক নড়ে উঠেছে। দেশে বিদেশে সতর্ক হয়েছে প্রশাসন। সজাগ দৃষ্টি এখন রাশিয়ান মানচিত্রে নিবদ্ধ। মুখে শুধু একই বুলি।
কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এহেন ঘটনা। সামনে পেছনে কত শত্রু, কতশত দুশমন ওঁত পেতে ছিল তাকে ধ্বংস করার প্রয়াস নিয়ে । অথচ সবাইকে আশাহত করে নিজেই নিজের পরিসমাপ্তি টানলো মাফিয়া বস। জীবনের অন্তিম লগ্নে এসেও কারোর নিকট মাথা নত করেনি সে , নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে পায়ে পিষে, শ’ত্রুর বিনাশ ঘটিয়ে তবেই মৃত্যু লিখেছে নিজের। নশ্বর এই দুনিয়ায় অবিনশ্বর রেখে গিয়েছে আজন্মকালের সবটুকু স্মৃতি।
সেই জের ধরেই পৃথিবী জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, প্রতিটি নিউজ পেপার, প্রতিটি টিভি চ্যানেলে একটাই হেডলাইন,
“আ”ত্মঘা”তী ঘটনায় নি”হত আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া টেরোরিস্ট এরীশ ইউভান।”
গোটা দুনিয়া আ’ত্মঘা’তীর ঘটনা জানলেও এর নেপথ্যের কারণ খুঁজতে এলোনা কেউ। যে যেভাবে পারলো গুজব রটালো। এতোকিছুর পরেও ভালোবাসার তরে জীবন বির্সজনের এই ঘটনা অপ্রত্যাশিত ভাবেই হৃদয়ের সুপ্ত অনুভূতিকে কাঁপিয়ে তুলেছে সবার । তৈরি করেছে ধোঁয়াসাবৃত রহস্যের আঁধার। সকলের মন মস্তিষ্কে একটাই প্রশ্ন কেবল ,
–কিভাবে! এমন একজন হার্টলেস, দূর্ধষ, টেরোরিস্ট মাফিয়া বস কিভাবে নিজের ভালোবাসার জন্য জীবন দিয়ে দিলো? এটা কি আদৌও সম্ভব!
কিন্তু মানুষের জীবন তো নাটকের চেয়েও নাটকীয়। বিস্ময়াভিভূত এই ঘটনা আদৌও সম্ভব কিনা ভাবতে ভাবতেই এরীশ ঈশানীর অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হলো। কর্দমাক্ত সোঁদা মাটির নিচে সমাধিত করা হলো দু’টো তরতাজা প্রাণ।
আর এখন, এই মূহুর্তে সেই ধূলোমলিন সমাধির শিয়রে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ফ্লোরা। পড়নে তার খাকি কাপড়ের লম্বা কালো গাউন। এলেমেলো চুল,উদাসীন দৃষ্টি। আত্মভোলা অভাগীর মতোই বিপর্যস্ত লাগছে তাকে।
পাইথন প্যারাডাইস এমন একটা জায়গা যেখানে প্রতিটি পদতলে সমাধি। এমন কোনো জায়গা নেই, যেখান থেকে মাটি খুঁড়লে মৃ”তদে’হের হাড়গোড় না বেড়িয়ে আসে। তবে আজকে এই মাটির বুকে যে নতুন দু’টো সমাধি তৈরি হয়েছে, কিঞ্চিত ভিন্নতা রয়েছে তাতে।
পাশাপাশি অবস্থিত একজোড়া যুগলবন্দী সমাধি, যার চারিপাশ মুড়িয়ে আছে অজস্র নীল গোলাপের তোড়া। পরম যত্নসহকারে থোকায়থোকায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে সেগুলো। দু’টো সমাধিস্থলের শিয়রে একটামাত্র প্রস্তরফলক বসানো হয়েছে। তাতে গুটিগুটি ইংরেজি অক্ষর দিয়ে পাশাপাশি খোদাই করে বসানো হয়েছে সেই যুগলবন্দী নাম,
Arish Aranny Eshani tuj kornia
(1995-2025) (2003-2025)
তার ঠিক পাশেই ছোট্ট আরও একটা প্রস্তরবেদী। তাতে লেখা আছে বোজোর নাম আর জীবন বৃত্তান্ত।
ভেতরে ঢুকতেই মাহিনের চোখ আটকালো সমাধিস্থলের সেই চকচকে প্রস্তরফলকটাতে। ওইতো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ঈশানীর নাম । মাহিন যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেলো। এতদূর থেকে ছুটে এসেছে ও, এতো পথ পাড়ি দিয়ে, এই দৃশ্য দেখার জন্য? মোটেই না। অদৃশ্য যাতনায় বুকের র’ক্ত তোলপাড় করে উঠলো তার।
ব্যথাক্লিষ্ট নয়নে একপল প্রস্তরফলকটাকে নীরবে পরখ করলো মাহিন। অতঃপর সেখানটাতেই আঁটকে রইলো দৃষ্টি তার। সদ্য যুগলবন্দী সমাধির শিয়রে বুক চিতিয়ে গেড়ে বসা ওই একহারা পাথুরে ফলকটাকে দেখতে দেখতেই দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এলো মাহিনের। এরীশ ঈশানীর অপ্রতিরোধ্য পরিণয়ের এই মর্মান্তিক পরিনতি ভাবতে গিয়েই স্মৃতিতে ভেসে উঠলো রবী ঠাকুরের অনন্ত প্রেম কবিতার কিছু অজেয় চরণ,
আমরা দু’জনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয় উৎস হতে।
আমরা দু’জন করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধূর লাজে
পুরাতন প্রেম নিত্যনতুন সাজে।
সত্যিই তো ভালোবাসা মৃত্যুঞ্জয়ী। শারীরিক নির্জীবতা কখনোই রুখতে পারেনা সেই অনুভব। মাহিন আর কিছুই ভাবতে পারলো না, কণ্ঠতালু রুদ্ধ হয়ে এসেছে তার। কোনোমতে শ্বাস টেনে এগুলো কয়েক কদম। অতঃপর যান্ত্রিক ইঞ্জিনের মতো কেঁপে উঠল শরীর তার, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়লো কর্দমাক্ত সমাধির উপর। সদ্য গড়ে ওঠা কবরটাকে আঁকড়ে ধরে ভুলে গেলো অনিশ্চয়তা, ভেঙে গেলো তার আত্মসংযম। বিকারগ্রস্থের মতোই অস্থির স্বরে বলতে লাগলো,
— এটা কি করলে তুমি? কি করলে এটা? এতো স্বাদ করে এই জীবন বেছে নিয়েছিলে তবে? কি হলো বলছো না যে?
আমি তো চলেই গিয়েছিলাম, তোমাকে একটুখানি সুখী দেখবো বলে নিজেকে অদৃশ্যের মতো আড়াল করে নিয়েছিলাম। তাহলে এ-কি পরিনতি হলো তোমার ?
তুমি জানলে না!, তুমি জানলে না ঈশানী, শত নিষেধাজ্ঞার পরেও এই অধম কতবার তোমাকে দেখতে এসে ফিরে গিয়েছে, কতবার রিং হওয়ার আগেই কল কেটে দিয়েছে, কতশত রাত তোমায় মিস করেছে! যে একটা বছরের অপেক্ষা আমাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। আজ তার সঙ্গে তুমি অনন্তকাল জুড়ে দিলে। আমি আর কিসের আশায় বাঁচবো বলো?
পুরুষালী কণ্ঠস্বর ক্রমশ ভগ্ন স্বরে রূপান্তরিত হয়। চোখ ছাপিয়ে জল গড়ায়, কাঁদামাটিতে লেপ্টে যায় শরীর। ফের বেড়িয়ে আসে বুকভাঙা আর্তচিৎকার,
— নীল নয়না, আমার নীলাম্বরী। তুমি বলেছিলে, কথা দিয়েছেল তুমি ভালো থাকবে। তাহলে এভাবে কেন হারিয়ে গেলে? একেই কি তবে ফেরারী হওয়া বলে? এক ছাঁদের নিচে না হোক, এক আকাশের নিচেই তো ছিলাম আমরা দু’জন । তোমার সুখটুকু দেখেই না হয় বেঁচে থাকতাম। সুখী যদি নাই হবে তাহলে কেন বেছে নিলে এই মৃ”ত্যুদার? কি ছিল এখানে?
পরপরই অবরুদ্ধ এক দানবীয় চিৎকার বেড়িয়ে এলো মাহিনের বুকচিঁড়ে । হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আওড়ালো,
— কেন আমার হলেনা তুমি? যার সাথে জীবন কাটাবে বলে সব ছেড়ে এখানে এলে, তার একেকটি কর্মফল তোমাকে শুধু যন্ত্রণাই দিয়ে গেলো, সবশেষে প্রাণটাও কেঁড়ে নিলো । তবুও কেন ভালোবাসলে না আমায় ? কেন একটা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আমায় গোটা জীবন দিয়ে দিতে হলো? বলো ঈশানী! কেন চুপ করে আছো? কিভাবে শুয়ে আছো এই বদ্ধ মাটির নিচে? কষ্ট হয়না তোমার? দম বন্ধ হয়ে আসে না? বিশ্বাস করো তোমার অনুপস্থিতি, তোমার এই নির্জীবতা আমাকে উন্মাদ করে দিচ্ছে। ম’রে যেতে ইচ্ছে করছে আমাররর।
— এই নিন বন্দুক, শ্যু”ট করুন নিজের মা’থায়!
অতর্কিত এক রমণীয় কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই থমকালো মাহিন। চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো ফ্লোরা দাঁড়িয়ে তার পাশে। হাতে কুচকুচে কালো রিভলবার। মা”রণা’স্ত্রখানি ওর দিকেই বাড়িয়ে রেখেছে রমণী। মাহিনের জল ছলছল বিস্ময়াভিভূত নয়ন জোড়া পরখ করে ফের বাক্যের পুনরাবৃত্তি করলো সে,
— কি হলো ধরুন এটা? শ্যুট করুন নিজেকে।
রমণীর কথার তীক্ষ্ণতায় সৎবিৎ ফিরে পেলো মাহিন, রিভলবারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে থমথমে গলায় জবাব দিলো,
— আ”ত্মহ’ত্যা যে মহাপাপ।
তপ্তশ্বাস ফেললো ফ্লোরা। তাচ্ছিল্যের স্বরে জবাব দিলো,
— জানতাম। আপনাদের মতো সুশীল ব্যক্তিদের ভালোবাসার প্রতিদানে হাজারটা দুনিয়ার দোহাই থাকে। কিন্তু অন্ধের মতো যার বুলি আওড়ালেন এতোক্ষণ, সে কিন্তু একবারও ভাবেনি দুনিয়ার কথা! ঈশানীর শেষ নিঃশ্বাসের পরে একমূর্হুতও অপেক্ষা করেনি। পায়ে ঠেলেছে গোটা দুনিয়া। ভুলে গেছে তার ক্ষমতা,প্রতিপত্তি, এতোবড় সাম্রাজ্যের কথাও , এমনকি নিজের ছেলের কথাটাও একবার ভাবলো না ওই নিষ্ঠুর মাফিয়া বস। অন্তরের তাড়নায় দ্বিকবিদিক শূন্য হয়ে শ্যুট করে দিলো নিজেকে।
কারণ কি জানেন? কারণ এরীশের মনুষ্যত্ব নেই, ওর কাছে আবেগ অনুভূতি ভালোবাসা মানে শুধুই ঈশানী। তার একমাত্র পরিণিতা। যার সৌভাগ্য হয়েছে মাফিয়া বসের মুখে ভালোবাসি শব্দ শোনার।
এরীশ ভালোবাসা বোঝেনা , অথচ ঈশানীকে ও নিজের অজান্তেই মন দিয়ে ফেলেছিল। তার জন্য আফসোস ও করেছে প্রচুর। ধ্বংস হবে যেনেও দূর্বলতায় গা ভাসিয়েছে। অথচ সমগ্র জীবনের আত্মসংযম খুইয়ে ভালোবাসি বলার পরেও যখন মেয়েটা আর রইলো না।তখন ভালোবাসার উপর খুব অভিমান হলো এরীশের। বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়লো মস্তিষ্ক।
আক্ষেপ উৎকণ্ঠায় সব ধ্বংস করে দেওয়ার কথা ছিল তার , কিন্তু শেষ করে দিলো নিজেকে । কারণ একজীবনে ঈশানীর মতো করে আর কোনোকিছু চায়নি ওই নিষ্ঠুর মানব।
একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো ফ্লোরা। অতঃপর সংক্ষিপ্ত বাক্যে কথার ইতি টেনে বললো,
— এরীশ আজন্মকালের পাপী, তাই হয়তো পাপ পুন্যের তফাৎটা বুঝতে পারেনি কোনোদিন । তবে ভালোবাসার মূল্যয়ন করতে গেলে তার সমকক্ষ কেউ নেই, জাস্ট নো ওয়ান!
অনেকক্ষণ ধরে ধ্যানমগ্ন হয়ে ফ্লোরার কথা গুলো শুনছিল মাহিন। শুনতে শুনতেই উপলব্ধি করেছিল বোধ হয়,
— এরীশ ইউভান ট্রুলি ইজ এ্যান আলফা মেইল । সে বরাবরের বিজেতা। তাকে না কখনো যুদ্ধে কেউ হারাতে পেরেছে, আর নাতো ভালোবাসায়।
সেইসঙ্গে ভেতরটাকে ছন্নছাড়া করে তুলেছিলো বিরহবিধুর সুরের সয়লাব,
প্রেম যে বোবা, প্রেম যে কালা
তাই প্রেমে এতো জ্বলা,
সেই জ্বালায় পরাণ কান্দেরে….
শশ্মাসপুরীর নিস্তব্ধতায় মিশে গেলো দীর্ঘশ্বাস। ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আর এদিক ওদিক চাইলো না মাহিন। বুক পকেট থেকে একটা শুভ্রস্নিগ্ধ তরতাজা গোলাপ বের করে কম্পমান হাতে সেটা রেখে দিলো ঈশানীর সমাধির বুকে। আদ্র,দলা পাকানো মাটি গুলোতে আরও একবার হাত বোলালো সে। ব্যতিগ্রস্ত আত্মা শিথিল হয়না মোটেই । আক্ষেপ, যন্ত্রণা, হতাশার মিশেলে পরাজিত সৈনিকের মতোই বাক্য ছোড়ে সে,
—তুমিতো বেঁচে গেলে ঈশানী। চলে গেলে তোমার মাফিয়া বসের সাথে। অথচ গোটা জীবনের শূন্যতা লিখে দিয়ে গেলে আমার ভাগে।আর দিয়ে গেলে আজন্মকালের গুরুদ্বায়িত্ব। ইয়াশ ইউভান।
ইয়াশের কথা ভাবতেই পুনরায় ফ্লোরার পানে দৃষ্টি ঘোরালো মাহিন। সতর্ক গলায় জিজ্ঞেস করলো, —ইয়াশ কোথায়?
— এখনো হসপিটালে।
কলিজা কেঁপে উঠলো মাহিনের।উদগ্রীব হয়ে কিছু বলবে, তার আগেই ফ্লোরা জানায়,
— ইয়াশ ঠিক আছে। প্রোপার হেলথকেয়ারের জন্যই আইসোলিউসিনে রাখা হয়েছে।
মাহিন আর প্রত্যুত্তর করলো না। হনহনিয়ে হাঁটা ধরলো গেটের দিকে। তক্ষুনি পিছু ডাকলো ফ্লোরা জানতে চাইলো,
— কোথায় যাচ্ছেন?
— আমার ছেলেকে দেখতে।
যেতে যেতেই জবাব দিলো মাহিন।
— এরীশ থাকলে এই কথার অপরাধে এতোক্ষণে আপনার চেহারা বদলে দিতো।
ফ্লোরার তিরিক্ষি কথার বিপরীতে মাহিন গলা ফেঁড়ে বললো,
— অফকোর্স! আফটার অল হি ওয়াজ আ ভিলেইন।
ধীরে ধীরে দৃশ্যপটের আড়াল হয়ে গেলো মাহিন। এই মূহুর্তে ফ্লোরা চেঁচিয়ে বললেও সে আর শুনতে পাবেনা বোধ হয়। অবশ্য চেঁচানোর মতো শক্তি আর নেই ফ্লোরার রুগ্ন শরীরে৷ সহসা বিড়বিড়িয়ে কটাক্ষের স্বরে স্বগোতক্তি করলো রমণী ,
— এভরি ভিলেইন ইজ দ্যা হিরো ইন হিজ ওউন মাইন্ড।
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। প্রকৃতির বিষন্ন আঁধারে মুড়িয়ে গেলো ধরিত্রী। সকালের সেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশ এখনও অভিমানী কিশোরীর মতোই ভার হয়ে আছে। যখন তখন কেঁদে ফেলবে সে।
অথচ আজ সারাদিনেও দেখা মেলেনি তুষারের।কোথায় গিয়েছে, কি করছে কেউ তার হদিস জানেনা। সকালের অন্তেষ্টিক্রিয়ার সময়ও খোঁজ ছিলনা তার। সারাদিন পেড়িয়ে রাত হতে চললো।তবুও ফিরলো সে মানব।
এদিকে মস্কো শহর থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের অলিগলিতে ভবঘুরের মতো চষে বেড়াচ্ছে তুষার। কিছু একটা খুঁজে পাবার প্রবনতায় আগ্নেয়গিরির দাবানলের মতোই দাউদাউ করছে তার অন্তরঃকরন। অপ্রকৃতস্থ ভাবনায় টগবগিয়ে ফুটছে মস্তিষ্ক। সবর্দা সাবলীল নিস্পৃহ মুখাবয়ব আজ প্রতিশোধের স্পৃহায় দূর্বার। হাঁটতে হাঁটতেই সড়ক পেড়িয়ে পরিত্যক্ত একটা রেলস্টেশনে চলে এলো তুষার। গন্তব্য এটাই, সারাদিন ঘুরে ঘুরে এই পরিত্যক্ত জায়গাটাই খুঁজে বেড়িয়েছে সে। আর এখন রেললাইন ধরে রোবটের মতো হাঁটছে। উদ্দেশ্যহীন চলন্তগতি অব্যাহত রেখেই দৃষ্টি নামিয়ে তাকালো সে হাতের দিকে। মুঠোবন্দি চকচকে ধাতব রিভলবারটা পুরোপুরি লোড, শুধু সময়ের অপেক্ষা তারপরই ট্রিগার টেনে সোজা ক্র”সফা’য়ার।
আকাশে তরবারির মতো বাজ পড়ছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের চমকে খানিক বাদে বাদেই ঝলসে উঠছে অমানিশার আকাশ। বিজলীর সেই নীলাভ আলোতে পথ দেখে যান্ত্রিক পদধ্বনিতে সামনে এগোয় তুষার।
না কোনো ভাবনা আর না তো পিছুটান,যেন সর্বহারা একলা পথিক।
যেতে যেতেই হঠাৎ থমকে গেলো তার পদক্ষেপ। তীরদণ্ড টেনে ধরার সুক্ষ্ম একটা আওয়াজে খাঁড়া হয়ে গেলো কর্ণকূহর। তুখোড় মস্তিষ্ক স্পষ্ট জানান দিলো, আশেপাশেই আছে সেই রহস্যময়ী আদিবাসী রমণী।
সর্তক দৃষ্টিতে ঘাড় ঘোরালো তুষার, মূহুর্তেই একটা আ’ক্রম’ণাত্তক তীর ছুটে এসে লক্ষ্য ভেদ করলো তার। বাতাসের বেগে সরে যেতেই পেছনের পাইন গাছের সঙ্গে গেঁথে গেলো সেটি।
সময় নষ্ট করলোনা তুষার। তড়িৎ হাতে ট্রিগার টেনে আঁধারের মাঝেই ফাঁকা গুলি ছুড়লো কয়েকবার। গুলি ছোড়ার বিকট আওয়াজে ভেঙে গেলো নৈঃশব্দ। জঙ্গল ভেদ করে ঝঙ্কার তুলে বেড়িয়ে এলো নিশাচরের হর্ষধ্বনি। তুষারের মনযোগ ইস্পাতের মতো কঠোর। প্রতিটি নির্ভীক কদমে উপচে পরা আগ্রাসন।
বিপরীত প্রান্ত থেকে আওয়াজ এলোনা আর। কয়েক মূহুর্ত নৈঃশব্দ্যে কেটে গেলো। একটু বাদেই বনবিচ্ছুঁড়ি পেড়িয়ে পা টেনে টেনে ছুটে চলার শব্দে মুখর হলো চারিপাশ।
ফের সর্তক হয়ে উঠলো তুষার। মেয়েটা জঙ্গলের দিকেই গিয়েছে নিশ্চিত হওয়া মাত্রই বিপরীত প্রান্ত থেকে টানেল ধরলো সে । এদিকটায় রাতবাতির আলো আছে। চিত্রপুত্তলিকার মতো দণ্ডায়মান সেই ল্যামপোষ্টের সুক্ষ্ম আলোয় রিয়ানা ভলকবের তীরের নিশানা স্পষ্ট দৃশ্যমান। অথচ পিছপা হলোনা মানব ।
টানেল থেকে বেড়িয়ে ধীরে সুস্থে একটা সিগারেট ধরালো সে। ঠোঁটের ফাঁকে লাইটার ধরতেই র’ক্তিম অগ্নিশিখার মতোই দাউদাউ করে উঠলো তার চোখের তারা। রুক্ষ চোয়ালে যেন বিনাশ খেলা করছে। সেই জ্বলন্ত প্রতিবিম্ভের দিকে একবারের বেশি চোখ রাখা দায়৷ সহসা দৃষ্টি অটুট রাখতে পারলো না রিয়ানাও। চোখ নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাঁড়লো সে । তীরের নিশানা তখনো তুষারের পানে স্থির। সিগারেট ধরানো শেষ হলে শীতল চাহনিতে সামনে তাকালো সে । দাম্ভিক অকুতোভয় মেয়েটার পানে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করে তারস্বরে আওড়ালো,
— পালিয়ে যাচ্ছিলে বুঝি?
সটান দাঁড়িয়ে থাকা ধনুকধারী রমণী লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তুষারের একটা মাত্র কথায় তীরের ফলা ধপ করে মাটিতে পড়ে যায় তার। পালিয়ে যাওয়া তার ধাতে নেই, তুষারের কথাটা মানে লেগেছে বোধ হয়। যার দরুন ফনা তোলা সাপের মতোই ফুঁসে উঠলো রিয়ানা। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
— রাশিয়া থেকে বের হওয়ার সকল পথ বন্ধ করে দিয়ে এখন নাটক করতে এসেছো?
— তোমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, এটা মাফিয়া টেরিটোরি। গ্যাংস্টার তুষার জাওয়াদের নখ দর্পন থেকে পালিয়ে ফিরে যাওয়া এতোটাও সহজ নয়।
— পাইথন লিডার আর নেই। ভাই ম’রেছে তোমার। তারপরেও এতো গলার জোর?
রিয়ানার কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের সুর। অথচ নির্বিকার তুষার জাওয়াদ। সে আরও কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে হিমশীতল গলায় বললো,
— ভাই ম’রে’ছে। এবার ভাইয়ের খু’নি ম”র’বে।
— তোমার ভাই নিজেই নিজেকে শ্যুট করেছে। তাহলে তুমি খু’নি কাকে বলছো?
রিয়ানার কন্ঠে চাপা সংশয়। সেসবে ভ্রুক্ষেপ করলো না তুষার। সিগারেটের শলাকায় লম্বা টান দিয়ে রিয়ানার অভিমুখে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
— তুমি বেশ অদ্ভুত জানো তো? সেদিন আমাকে ওইভাবে বাঁচালে। আর এখন মা’রা’র জন্য পা’গল হয়ে যাচ্ছো।
— শুধু একবার নয়, দু দু’বার বাঁচিয়েছি আমি তোমাদের দু’ভাই কে। আর এখন কু’কু’রের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছো তুমি আমায়। অকৃতজ্ঞ কোথাকার !
— আমি শুধু অকৃতজ্ঞ নই, অবিশ্বাস্যও!
তত্ত্বের মতো কথাটা বলেই, ঘুরে এসে রিয়ানার কপাল বরাবর বন্ধুকের নল ঠুকে দিলো তুষার। এক মূহুর্তের জন্য ছলকে উঠলো রমণী, প্রগাঢ় হলো শ্বাস প্রশ্বাস। দু’হাত মুঠিবদ্ধ করে চোখ খিঁচে মৃ”ত্যুকে আলিঙ্গন করবে, ঠিক সেই মূহুর্তে দ্বিতীয় দফা বাক্য ছুড়লো তুষার,
— যেনো তেনো ড্রা’গ নয়। ইট ওয়াজ সাইরোনক্স! আ ব্রাজিলিয়ান স্নেক ভেনম! সাপের বিষ দিয়েছিলে তুমি ওকে। কেন রিয়ানা? হোয়াই ডিড ইউ্য ডু দিস?
তুষারের কর্কশ হুংকারে সজাগ হয়ে উঠলো চারিপাশ। রিয়ানা নিজেও চোখ তুললো পর্যায়ক্রমে । বরাবরের মতোই বেপরোয়া রমণী। চোখের তারায় আগুনঝড়া দুঃসাহস তার । সহসা সত্য বলতে পিছপা হলোনা মোটেই। তেজস্বী কণ্ঠে জবাব দিলো,
—আগেই বলেছি তোমাদের, আমি রিয়ানা ভলকব প্রতিশোধ নিতে এসেছি। আমার ভালোবাসার মানুষকে মে’রে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে মাফিয়া বস। আমি ঠিক তাই করেছি যা যা এরীশ আমার সঙ্গে করেছে। কিন্তু আফসোস নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা পোহাতে হলো না তাকে। ব্লাডিবিস্টটা নিজেই নিজেকে শেষ করে দিলো।
— প্রতিশোধই যখন নিতে এসেছো,তাহলে আমাদের বাঁচালে কেন সেদিন?
তুষারের কণ্ঠে উদ্বেগ। রিয়ানা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো, বিদ্রুপাত্তক স্বরে জবাব দিলো,
— উঁহু!আমি তোমাদের বাঁচাই নি। আমিতো স্রেফ নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।
ভাবনায় পড়লো যন্ত্রমানব। কপালে স্পষ্টত হলো চিন্তার বলিরেখা। কি ভেবেই যেন চোখ ছোট ছোট বলে উঠলো,
— এরীশ তোমাকে হায়ার করেছিল তাইতো?
নৈঃশব্দিক বাঁকা হাসি দৃশ্যমান রিয়ানার ঠোঁটের আগায়। তুষার তীক্ষ্ণ গলায় বললো,
— তারমানে সবকিছুর প্ল্যান এরীশ আগে থেকেই করে রেখেছিল?
খুব বেশিক্ষণ রহস্য ধরে রাখলো না রিয়ানা। খানিকবাদেই নিরুত্তাপ স্বরে জবাব দিলো,
— ইউ্য আর আ জিনিয়াস তুষার জাওয়াদ। তুমি ঠিকই ধরেছো।সেদিন তুমি উপস্থিত ছিলেনা বলেই এরীশ আমাকে হায়ার করে। ঘটনার আগের রাতে আমি এরীশের সঙ্গেই ছিলাম। সারারাত ধরে প্ল্যান করেছিল সে । গার্ড মোতায়েন করেছিল প্রতিটি গ্যাংস্টারের টেরিটোরিতে। তারপর কিছু লোকেশন হাইলাইট করে রেখেছিল এরীশ । যার মধ্যে অন্যতম ছিল টমেটো প্রিন্সের ডেরা।
মাফিয়া বস আঁচ করেছিল আগেই। সে ভালো করেই জানতো সাইকোপ্যাথকে কপোকাত করা ওতোটাও সহজ নয়। পাওয়ার, স্নাইপার,ওয়েপনস কোনোকিছু দিয়েই লড়াই করা যাবে না তার সঙ্গে। খেলতে হবে কৌশলে। যার দরুন আগেভাবেই লিকুইড নাইট্রোজেন আর টমেটো প্রিন্সের পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরীর ঠিকানা আমাকে দিয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে বলে দেওয়া হয়, এটাই শেষ সুরক্ষা।
এই পর্যায়ে এসে বক্রাকার হয়ে গেলো তুষারের সরল দৃষ্টি। সে তীক্ষ্ণ স্বরে কথা কাটলো রিয়ানার,
— তুমি বলতে চাইছো, এতোকিছু তুমি কোনোরূপ স্বার্থ ছাড়াই করেছো? বিনাবাক্যে রাজি হয়েছো মাফিয়া বসের কথায়?
তুষারের দৃঢ় বিশ্বাস মেয়েটা এরীশের নিকট ব্লাড ডায়মন্ড দাবী করেছিল। কিন্তু ওকে ভুল প্রমানিত করে এক অপ্রত্যাশিত জবাব দিলো রিয়ানা,
— মোটেই না। আমি রিয়ানা বিনিময় ছাড়া কখনোই কিছু করিনা। ডিল করার সময় প্রতিদান চেয়েছিলাম আমি । যে আমাকে গার্ডদের সামনে সুরক্ষিত দাবি করা হোক । কিন্তু এরীশ রাজি হয়নি। সে ঈশানীর ব্যাপারে এইটুকু ছাড় দিতে রাজি নয়। কিন্তু তাতে আমার কি? আমিতো ঈশানীকে মা’রবোই।
এই পর্যায়ে উন্মাদের মতো খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো রিয়ানা। শুনশান নীরবতার মাঝে গা ছমছমে শোনালো তার অট্টহাসির আওয়াজ। হাসতে হাসতেই অকস্মাৎ অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো তার। মুখাবয়ব শক্ত করে শীতল গলায় বললো,
— মিসক্যারেজের ফলে প্রচুর পরিমাণ র”ক্তক্ষরণ হয়েছিল ঈশানীর। অপারেশনের সময় জোগাড় করা র”ক্ত সব শেষ হয়ে গিয়েছিল, তখনই ব্লাড ডোনার হয়ে ঢুকেছিলাম হসপিটালে।
— গার্ডরা তোমায় ঢুকতে দিলো?
তুষারের কণ্ঠে বিস্ময়। ঠোঁট বিস্তৃত করে নীরবে হাসলো রিয়ানা। জবাব দিলো,
— আমিতো ওঁত পেতেই ছিলাম। ইমারজেন্সির সময় গার্ডরা এদিক ওদিক তাকায়নি। রাস্তাঘাটে যাকে যেখানে পেয়েছে তাকেই কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে হসপিটালে নিয়ে এসেছে। তাদের সঙ্গে সুযোগ বুঝে আমিও ঢুকে যাই।
— তোমার ব্লাডগ্রুপ মিললো তবে ঈশানীর সঙ্গে?
— নাহ মেলেনি!
আচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে রইলো তুষার। রিয়ানা অপ্রকৃতস্থের মতোই বলে উঠলো,
— ব্লাড গ্রুপ না মেলায় আমি সহ অনেক জনকেই বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমিতো এতো সহজে বের হয়নি। আমার কাজ আমি সম্পন্ন করে তবেই বের হয়েছি।
—গার্ডদের সামনে পরোনি?
— পরেছিলাম। অনেকের সামনেই পরেছিলাম। কিন্তু মা”রণা”স্ত্র তো স্বয়ং মাফিয়া বসই আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। আমার আর ভয় কিসের?
তুষার কপাল গোছালে চোয়াল শক্ত করে ফেললো রিয়ানা। গলা খাদে নামিয়ে হিসহিসিয়ে বাক্য ছুড়লো,
— লিকুইড নাইট্রোজেন। যাকে সামনে পেয়েছি, ছুড়ে মে’রে তারই জবাব বন্ধ করে দিয়েছি। মজার বিষয় হলো, এতো এতো গার্ড, এতো বাহিনীদের মধ্যে ওই দু চারজনের খবর তোমরা থোরাই রাখোনি।
— তারপর?
— তারপর আর কিই? টমেটোর ডেরায় যেতে যেতে আমার দেরী হয়ে গেলো। ফলে তুমি আর এরীশ বাজে ভাবে আহত হলে।
— এতোকিছু করেও কি তোমার প্রতিশোধ সম্পন্ন হলো রিয়ানা? তুমি যাকে ভালোবাসার য’ন্ত্র’ণায় বিদগ্ধ করতে চেয়েছিলে সে নিজেই তোমাকে হারিয়ে দিলো। তার আর অস্তিত্ব নেই। দুনিয়া ছেড়েছে নিজের পরিণিতার সাথেই। সেই তো মাফিয়া বস তোমায় হারিয়েই দিলো। ভস্ম হয়ে গেলো তোমার সকল পরিকল্পনা।
নির্বাক রিয়ানা। ভেতরের শব্দভাণ্ডার ফুরিয়ে এসেছে যেন। প্রত্যুত্তর করার ভাষা নেই। রিয়ানার নিস্পৃহতা অবলোকন করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো তুষার। প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে বললো,
— পালিয়ে কেন গেলেনা?
— পালিয়ে গেলে এরীশ আমায় ছাড়তো? দুনিয়ার যে প্রান্তেই লুকাতাম টেনেহিঁচড়ে বের করে আনতো। ওইজন্যই তো তোমাদের বাঁচাতে গিয়েছিলাম। যাতে সন্দেহের তীরটা আমার দিক থেকে সরে যায়।
শ্লেষ হাসলো তুষার। রিভলবারের ট্রিগার টানতে টানতেই ভেসে এলো তার হিমশীতল কণ্ঠস্বর,
— মানতেই হবে, জম্পেশ খেলেছো তুমি। ইউ্য ডিজার্ভ কমপ্লিমেন্ট। কিন্তু আমিতো তোমাকে ছাড়বোনা। কারণ তোমাকে ছেড়ে দিলে আমার র”ক্তের সঙ্গে বেঈমানী করা হবে। আর তুষার জাওয়াদ বেইমান নয়।
পালানোর কোনো ভাবাবেগ দেখা গেলোনা রিয়ানার মানে। ব্যাগ্রহীন স্বরেই প্রশ্ন করলো,
— এখন তবে কি করবে তুমি ?
— তোমাকে শেষ করবো।
নিটোল কণ্ঠে জবাব দিলো তুষার । পরপরই দু’হাতে রিভলবারটাকে আঁকড়ে ধরে চোখমুখ খিঁচে ভেতরে সবকটা বুলেট ঢুকিয়ে দিলো রিয়ানার মস্তিষ্কে। মা’র”তে মা’র’তে ভেতরের গুলি যখন শেষ পর্যায়ে চলে এলো তখনই চোখ খুললো তুষার। পায়ের কাছে লুটিয়ে পরা নিথর নারীদেহখানি অন্তিমবারের মতো পরখ করে স্বগোতক্তিতে বিড়বিড়ালো,
— আলবিদা রিয়ানা ভলকব।
তারপর মৃ’তদে’হটাকে আবর্জনার মতো পায়ে মাড়িয়ে হনহনিয়ে বেড়িয়ে গেলো জঙ্গল থেকে।
হৃদয়ভাঙা কিশোরীর মতোই আজ অঝোরে কাঁদছে আকাশ। রাত যত গভীর হচ্ছে ততোই থেকে থেকে বেড়ে চলেছে বাতাসের প্রকোপ। এই ঝড়বৃষ্টির রাতেও রেললাইন ধরে উদ্দেশ্যহীন হেটে চলেছে যন্ত্রমানব। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে কিছুই জানেনা সে । সারাটাদিন প্রতিশোধের তাড়নায় কোনোকিছুই উপলব্ধি হয়নি ভেতরে। কিন্তু এখন রাত যত গভীর হচ্ছে ততই ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে অন্তরটা। বুকের র”ক্ত তোলপাড় করা যন্ত্রনায় হাঁসফাঁস করছে হৃদয় নামক মাংসপিণ্ড। কি যেন নেই! কি যেন নেই!ভাবতে ভাবতেই ব্যথায় ভরে ওঠে বুক। যে সে ব্যথা নয়, একেবারে দ’মব’ন্ধকর যাতনা। তুষার সহনশীল উপায়ে বুকের বা পাশে হাত বুলায়। কিন্তু হায়, বুকের ব্যথা কমেনা। কোনো অমূল্য রতন হারিয়ে ফেলার নিগূঢ় শূন্যতা অদৃশ্য দানবের মতোই উল্টো গলা চেপে ধরে তার।
বৃষ্টির তোড়ে চারিপাশ ঝাপসা হয়ে আসে। প্রকৃতির ভয়াল অন্ধকার মৃ’ত্যুদূ’ত হয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে তুষারের শরীর। মাথার উপর আকাশের গর্জন। হাঁটতে হাঁটতেই একপর্যায়ে পা দু’টো থমকে গেলো তার । শ্বাস টেনে তুলতে পারছে না আর। অগত্যা শরীরের সবটুকু ভার ছেড়ে দিয়ে পরিত্যক্ত রেললাইনের উপরেই শুয়ে পড়লো হাত পা ছড়িয়ে।
অতঃপর কয়েক মূহুর্ত নৈঃশব্দ্য।
পরক্ষনেই মানবের বুকভাঙা আকস্মিক আর্তচিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো অমানিশার রজনী । অভিমানি বালকের মতোই হাউমাউ করে কাঁদছে যন্ত্রমানব। তার এহেন অধৈর্য্য অকৃত্রিম সত্তা আর কেউ কোনোদিন দেখেছে বলে বোধ করিনা। কাঁদতে কাঁদতেই চিৎকার দিয়ে উগড়ে দিতে লাগলো ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা, সমস্ত আক্ষেপ,
— কাওয়ার্ড!কাওয়ার্ড! কাওয়ার্ড! ইউ্য আর আ কাওয়ার্ড এরীশ ইউভান। দুনিয়ার বুকে এভাবে একা করে দিয়ে গেলে আমায়, অথচ একটাবার বলেও গেলেনা? কেন! কি দোষ করেছিলাম আমি? আমি যে কাঁদছি দেখতে পাচ্ছো না? তুষার জাওয়াদ কাঁদছে, তার র’ক্তে’র জন্য কাদছে। তুমি কি এর প্রতিদান দিয়ে যাবে? জানি, কোনোদিন দিবে না!
তুমি তো মা”রা যাওনি এরীশ, বরং আমার অর্ধাংশ ধ্বং”স করে দিয়ে গেছো। তোমাকে ছাড়া আমি দূর্বল। বিশ্বাস করো ভীষণ দূর্বল!
আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৯
আকাশভাঙা বৃষ্টির সাথেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় তার বজ্রাহত চিৎকার। আক্ষেপ, অভিমান, অনুশোচনা বানভাসি হয় বারিধারার অবিশ্রাম জলে। এই মুষলধারারা বর্ষন ছাপিয়ে ব্যথাক্লিষ্ট অবচেতন তুষারের কানে বাজে শুধু অনুপমের বিরহমাখা বিমত্ত সুর,
“কখনো আকাশ বেয়ে চুপ করে
যদি ভালোবাসা নেমে আসে খুব ভোরে
চোখে ভাঙা ঘুমে তুমি খুঁজোনা
আশেপাশে আমি আর নেই।”

Atota kharap laglo ai uponnas ta pore ki bolbo kisu bolar vasa nai r apu
Yay thanks apu .I’m happy that main khuni Mara gese ,I hope tumi aro plot twist niye next part lekhba.😊
Ami mante par6ina arish ar Ishani kano chole gelo😭
Comment: Arish jodi beche thakto tahole ki khub kharap hoto?
Writer apu, Apnar theke aita asa kori nay…kemne hotasa r buk vora kosto diye Arish r Esani sad ending korlen…Yash Yuvan er ki hobe aibar.
Kanna chepe rakhte parsi na…ki kore likhlen ai sad ending Arish r Esani k niye…mante parsi na…apni twist anben please. 🥺🥺🥺🥺
Apu golpotar happy ending dile kih khub kharap hoye jeto? 😅🙏
Fictional tao khub kharap feel hocche,go! 😭🥹
Next part taratari diyo…ato late Kno daw
Lekhika bolsilo ata happy ending hoibo tao ken agula hoilo please Kono twist diye golper mor change kore felen Please 🙏🙏🙏🙏🙏🙏
Plz next part den
ar oppekka korte valo lagchena