Home আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় সারপ্রাইজ পর্ব 

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় সারপ্রাইজ পর্ব 

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় সারপ্রাইজ পর্ব 
suraiya rafa

চারিদিকে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অন্ধকার। আকাশের কোলে মেঘমল্লার সয়লাব,যেন এক বুনোমহিষের পাল। আজ বোধ হয় আমাবস্যা। ঘন ডালপালা আর গভীর অভ্যায়ণ্যের মাঝে বড়বড় পাইন গাছের বুক চিঁড়ে বেড়িয়ে আসা কালো কুচকুচে পেন্টহাউজটাকে দানবের মতো অদ্ভুতুরে লাগছে।এদিক ওদিক অবাধে বেড়ে ওঠা ঝোপঝাড় আর লতাগুল্মের গায়ে নিস্তব্ধ কাঁপন তুলে চঞ্চলা কিশোরীর মতো দোল খাচ্ছে একরাশ মেঘ ভেজা মাতাল হাওয়া।

লাউঞ্জের সাথে সংযুক্ত বিশাল থাই এলুমিনিয়াম গ্লাসের স্লাইডিং দেওয়ালের ওপাশে কুণ্ডলী পাকানো তমশা, আর এপাশে দ্যা ব্লাডিবিস্ট রীশষ্কা । দীর্ঘ মিশন শেষে কয়েক প্রহর হলো রাশিয়া ফিরেছে সে। আর এখন নিজের জন্য বরাদ্দকৃত একান্ত ব্যক্তিগত মূহুর্তে পাখির চোখে পরখ করছে গোটা মস্কো শহর। মিশন পরবর্তী সময়ে পেন্ট হাউজের টপফ্লোরে দাঁড়িয়ে শহরটাকে তুচ্ছ চোখে পরখ করতে গিয়ে তার বুকের ভেতর জেগে উঠেছে অদ্ভুত এক পৈশাচিক তৃপ্তি । আস্তিন গোটানো কালো শার্ট আর ফর্মাল প্যান্ট পরিহিত সুঠামদেহী শরীরটা আত্মঅহংকারের ভারে হিমালয়ের মতো নিটোল । বাম হাতে থাকা চকচকে ওয়াইনের গ্লাসটা মুখের কাছে এনে লম্বা সিপ নিয়ে ফের বিস্তৃত আকাশের পানে দৃষ্টি ফেললো এরীশ । হঠাৎই আঁধার কালো দিগন্তে ছাইরঙা মেঘের বুক চিঁড়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে গেলো একটা গভীর নীল দাগ। সঙ্গে সঙ্গে ভূখণ্ডে ছিটকে পড়লো জোড়ালো এক বজ্রপাত।
এরীশ তখনো স্বপ্রতিভ অনড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। নিজের অঢেল সাম্রাজ্যের উপর দম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাপিষ্ঠ সত্তা আর ওই নিষ্ঠুর জ্বালাময়ী দৃষ্টি দেখে মনে হয় প্রকৃতির পানে অব্যক্ত এক কঠোর হুশিয়ারি ছুঁড়ে দিচ্ছে সে,

— বলো কে বেশি অন্ধকার! তুমি নাকি আমি?
— আজ তুমুল বৃষ্টি হবে।
অকস্মাৎ পুরুষালি কন্ঠস্বর শুনে ঘুরে তাকালো এরীশ। তার পাশেই সটান দাঁড়িয়ে আছে ফর্মাল স্টাইলের তুষার। এরীশের তীক্ষ্ণ ফলার মতো দৃষ্টি অনুসরণ করে একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটালো সে,
— ওয়েদার ফোরক্যাস্ট তো তাই বললো।
— তুমি নিশ্চয়ই আমাকে আবহাওয়ার খবর জানাতে এখানে আসনি?
এরীশের তীর্যক বাক্যে জোরপূর্বক কেশে উঠলো তুষার। টাইয়ের বাঁধন শিথিল করতে করতে বললো,
— আপনাকে একবার ক্লাবে যেতে হবে।
— কেন?
— ভ্যালেনটাইন্স ডে উপলক্ষে পার্টি থ্রো করা হয়েছে। পাইথন প্যারাডাইসের অধিকাংশ ক্লায়েন্টরাই সেখানে উপস্থিত থাকবেন। এ্যান্ড দে ওয়ান্ট টু মিট উইথ মাফিয়া বস।

ভ্যালেনটাইন্স ডে অর্থাৎ ভালোবাসা দিবস। শব্দটা মস্তিষ্কে গেঁথে গেলো এরীশের। ভালোবাসা শব্দটা ওর কাছে নিছক মূল্যহীন, অথচ ভাবার্থটুকু শোনা মাত্রই মানস্পটে ভেসে উঠলো এক নীলাভ নয়নার স্নিগ্ধ সরল মুখ। শেষবার জোরপূর্বক রেজিষ্ট্রি পেপারর্স গুলোতে সাইন করিয়েছিল মেয়েটাকে,তারপর আর দেখা হয়নি দু’জনার। এক অসহ্যকর,বেপরোয়া অনুভূতির ধুম্রজালে নিজের পাথর কঠিন সত্তাকে অজান্তেই বিসর্জন দিয়েছে সে। না চাইতেও নিয়তির চিরস্থায়ী সুঁতোয় বেধে ফেলেছে সম্পর্ক। ছেড়ে যাওয়ার এই যুগে যে দেশে ছেড়ে যাওয়া নিয়মবহির্ভূত সেখানেই বেধেছে গাঁটছড়া। ভ্যাটিকান সিটির এক সংশ্লিষ্ট আইনে ডিভোর্স নিষিদ্ধ বলেই হয়তো তার এই অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত।বেইমান হৃদয় এতো সহজে ছাড়বেনা এই মেয়েটাকে। আপন সত্তার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েও সাকুরাকেই চাইবে সে ।
আজ গুনে গুনে একুশটি দিন মুখ দেখেনি ওর।
কি করেই বা দেখবে? এরীশ তো মিশনে ছিল। তাও যেখানে সেখানে নয়, সূদুর আটলান্টিকের ওপারে।

— সবাই আপনার সাথে মিট করার জন্য মুখিয়ে আছে।
তুষারের গমগমে বাক্যে বিভ্রম থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এলো এরীশ। শুকনো গলায় জবাব দিলো,
— আই নো।
— তাহলে এনাউন্স করে দিই?
— ফ্লোরাকেও নিয়ে চলো, আই থিংক ফ্লোরা অনেক দিন কোথাও বের হয়নি।
তুষার অত্যাশ্চর্য হলো। কিছু একটা ভেবে সুকৌশলে জানতে চাইলো,
— শুধু কি ফ্লোরা?অন্য কেউ না?
তুষারের কথার ইঙ্গিত ধরতে পেরে তৎক্ষনাৎ দু’হাত পকেটে গুঁজে তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো এরীশ। একটু সময় নিয়ে প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বললো,
— আমি যদি জনে জনে নাম উল্লেখ করে যাওয়ার কথা বলি তাহলে তুমি খুশি হবে নিশ্চয়ই?
— না থাক, বুঝতে পেরেছি।
এরীশকে আর ঘাটালো না তুষার। নির্বিকারে কথাগুলো বলে প্রস্থান করলো সেখান থেকে।

ভ্যালেনটাইন্স ডে পার্টিতে ফ্লোরা এবং ঈশানী দু’জনকেই নিয়ে আসা হয়েছে আজ । তুষারের সঙ্গেই পার্টিতে এসেছে ওরা। পেন্ট হাউজে বন্দি হওয়ার পরে এরীশের ইচ্ছানুযায়ী এটাই ঈশানীর প্রথম বাইরে আসা। যদিও এহেন রঙঢঙের অনুষ্ঠানে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিলনা ঈশানীর। কিন্তু ওই যে, পেন্টহাউজে কারোর মর্জি চলেনা, কেবল একজনের ইচ্ছেই এখানে সর্বদা স্বীয়ধার্য।

বাইরে গুড়গুড় করে মেঘ ডাকলেও ক্লাবের ভেতরে চমৎকার এক আলোকসজ্জিত সন্ধ্যাবেলা। র”ক্তলাল হার্ট শেপের দারুণ থীমে সাজানো হয়েছে পুরোটা ক্লাব। স্লাইডিং ডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে এসে সুড়সুড়ি দিলো অ্যালকোহল, ফ্র্যাগর‍্যান্ট ক্যান্ডেল আর দামী পারফিউমের সংমিশ্রণে অদ্ভুত একটা ঝাঁঝালো সুঘ্রাণ।
অদ্ভুত এই সুঘ্রাণ সবার কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক হলেও এসবে অনভ্যস্ত ঈশানীর মস্তিষ্কটা ঝিম ঝিম করে উঠলো হঠাৎ। চোখ মুখ কুঁচকে হাতের পিঠে মুখ ঢেকে সামনে তাকাতেই চোখে পড়লো অসংখ্য দেশী-বিদেশী সুন্দরীদের বহর। তাদের শরীরে চাকচিক্যের কোনো অভাব নেই, পার্টির থীম অনুযায়ী সবাই-ই লাল, গাঢ় ম্যাজেন্ডা অথবা মেরুন রঙে সেজেছে। সুন্দরী মেয়েগুলো সব উপস্থিত অতিথিদের মনোরঞ্জনে ব্যস্ত। কেউ ড্রিংক সার্ভ করছে, কেউ আবার দণ্ডায়মান একটা সরু ধাতব বস্তুকে কেন্দ্র করে পোল ডান্স করছে, কি বিশ্রী তাদের অঙ্গভঙ্গি। এখানে উপস্থিত অধিকাংশ মেয়েই আধুনিকতার নামে অর্ধন””গ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা দেখা মাত্রই ঈশানীর বাঙালি মনে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি জেঁকে বসলো ।

ভেতর ভেতর চিড়বিড় করতে থাকা বিরক্তি ভাবটা কিছুটা চেহারায় ফুটে উঠলো বোধ হয়। ঠিক সেসময় কুঁচকানো ভ্রু আরও খানিকটা কুঁচকে গেলো তার, যখন দেখলো এতোক্ষণ ধরে ওকে মোহাবিষ্ট হয়ে গিলে খাচ্ছিল দু’টো গভীর নিস্প্রাণ চোখ। ঈশানী যখন টের পেলো ঘন পাপড়িতে ঢাকা ওই ধূসর বাদামি চোখ দু’টোর মালিক অন্য কেউ নয়, স্বয়ং এরীশ ইউভান তখন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো।ওর থেকে কয়েক হাত দূরে কাউচের উপর দু’বাহু মেলে পায়ে পা তুলে বসে ড্রিংক করতে করতে পছন্দের টিভি শো দেখার মতো নিস্প্রভ দৃষ্টে ঈশানীকে দেখছে সে।
পড়নে কালো সিল্ক শার্টের উপর একটা ডিপ মেরুন স্যুট। হাতে হাবলট ব্রান্ডের দামী ঘড়ি, আন্ডারকাট চুল গুলো আজ অন্যরকম লাগছে, জেল দিয়ে সেট করেছে বোধ হয়।স্ফটিকের তরল আলোতেও ভ্রুর উপর গেড়ে বসা ধাতব রিংটা চকচক করছে। তার চেয়েও বেশি ঝিল দিচ্ছে অধর তলার ওই নির্লিপ্ত কালো তিল। লোকটার সমগ্র চেহারা বিচরণ করে সবশেষে ঈশানীর কৌতূহলী দৃষ্টি সেটাতে গিয়ে স্থির হলো। যেন অমানিশার আকাশের মিটিমিটি জ্বলতে থাকা এক রুপোলী শুকতারা।

সরাসরি দৃষ্টি মিলিত হওয়ার পরেও কোনোরূপ ভাবান্তর নেই এরীশের মাঝে, নেই কোনো সংকোচ। এখনো নির্দ্বিধায় গভীর দৃষ্টিতে পরখ করছে মেয়েটাকে।
মানুষটার এরূপ মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে জমে গিয়েছে ঈশানী।আড়ষ্টতায় চোখ নামিয়ে ফেললেও, কোণ দৃষ্টিতে দেখছে মাঝেমাঝে। তবে লোকটার ওই মাদক মিশ্রিত আচ্ছন্ন চাহনী খুব বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারলো না ও। একপর্যায়ে নিজেকে আড়াল করার প্রচেষ্টায় মুখ কাচুমাচু করে বোল্ড রেড স্যাটিন গাউনের সঙ্গে লাগোয়া স্লিভলেস হাতার ফিতে দু’টো টানতে লাগলো অহেতুক। এতেও ব্যাপারটা জুতসই না হওয়ায় দু’হাত আড়াআড়ি করে রাখলো বুকের উপর। মেয়েটাকে এতোটা অস্বস্তিতে ফেলেও কোনোরূপ হেলদোল নেই মাফিয়া বসের। নির্ভীক আলফার মতোই সে চালিয়ে যাচ্ছে নিজের কাজ।

— ঈশানী, চলো ওদিকটায় বসবে।
তুষারের ডাকে বহুক্ষণের মোহভঙ্গ হলো দু’জনার। চটজলদি ঘুরে দাঁড়ালো ঈশানী। ব্যস্ত চোখে আশপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—একি ফ্লোরা কোথায়?
— ওপাশেই আছে। আমার ক্লায়েন্টদের সঙ্গে মিটিং রয়েছে, তোমরা আপাতত ওখানটাতে বসেই পার্টি এনজয় করো। ফেরার সময় আমি ডেকে নিয়ে যাবো।
সামনে থাকা বার কাউন্টারটিকে ইশারা করে কথা গুলো বললো তুষার।
তাকে সায় জানিয়ে ঈশানী নিজেও দ্রুত আড়াল হয়ে গেলো এরীশের। এই লোকের থেকে যত আড়ালে থাকা যায় ততই মঙ্গল। ক্লাবের শেষ মাথায় বিশাল বড় বার কাউন্টারের সামনে গোলাকৃতির চার সেট সোফা অনায়াসে এঁটে গেছে। মাঝখানে তকতকে কাচের টেবিল। তারউপর টকটকে লাল গোলাপের চোখ ধাঁধানো ডেকোরেশন । আপাতত সেখানতেই বসতে দেওয়া হয়েছে ফ্লোরা আর ঈশানীকে।
এরীশের চোখের আড়াল হওয়া মাত্রই এতোক্ষণের অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে কাঁটতে শুরু করেছে রমণীর ।ওদিকে দুষ্ট প্রকৃতির চঞ্চল ফ্লোরা এখানে এসেই অথেনটিক রাশান ভদকার খোঁজ শুরু করে দিয়েছে। এমনিতে কখনো ড্রিংক করেনা ফ্লোরা, তবে একবার সুযোগ পেলে মাতাল হয়ে আশ্চর্য সব কর্মকান্ড ঘটিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয় সে। ফ্লোরাকে উশখুশ করতে দেখে বাঁধা দিলো ঈশানী। কড়া চোখে শাসিয়ে বললো,

— আগের বার কি করেছিলে এর মধ্যে ভুলে গিয়েছো?
— তুমি চিন্তা করোনা একটু খাবো।
হাতের ইশারায় পরিমাণ দেখিয়ে ঈশানীকে মানানোর চেষ্টা করলো ফ্লোরা। সেসবে কর্ণপাত করলো না মেয়েটা, ঝেঁঝে উঠে বললো,
— একটুও না। চারিপাশে দেখছো কত মানুষ? ভুলভাল কিছু করে বসলে তখন?
— এটুকু খেলে কিচ্ছু হবে না।
— তুষার রেগে গেলে আমি কিচ্ছু জানিনা।
— তুষারকে আমি ভয় পাই নাকি?
— ভয় না পেলে লোকটাকে দেখলেই তোমার দৃষ্টি কাপে কেন ফ্লোরা?
— এই ভয় সেই ভয় না ঈশু। এটা ভীষণ অলৌকিক উপলব্ধি। ভয়,জড়তা, অস্বস্তির মিশেলে অদ্ভুত এক সুখ সুখ ব্যথা।
ঠোঁট উল্টে উদাসীন গলায় কথাগুলো বললো ফ্লোরা। তারপর ঈশানীর সামনেই ঢকঢক করে দু পেগ মে’রে দিলো আচানক। সঙ্গে সঙ্গে গোলাপি রঙা ত্বক রক্তিমবর্ণ ধারণ করলো তার। দৃষ্টি দুলে উঠলো। তা দেখে চকিতে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো ঈশানী, দাঁত খিঁচে বললো,

— একি করলে!
তার আচানক চিৎকারে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে ফের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো কয়েক জন অতিথি। বিপরীতে অদ্ভুত স্বরে হাসতে লাগলো ফ্লোরা। একটা গ্লাস ঈশানীর দিকে বাড়িয়ে টলতে টলতে বললো,
— তুমি একটু খাবে? খেলেই আকাশে উড়ে যাবে, দেখো আমি উড়ছি।
বলেই নিজের হাতদুটো পাখির মতো নাড়াতে শুরু করলো ফ্লোরা। তা দেখে ঈশানীর মান যায় যায় অবস্থা। চোরা চোখে চারিদিকটা অবলোকন করে ভয়ে ভয়ে স্বগোতক্তি করলো সে,
— এবার কি হবে?

মেয়েটা নির্ঘাত সব অদ্ভুত কাজকারবার ঘটাবে এবার,ঈশানীর দুশ্চিন্তা হতে লাগলো। ভীতিগ্রস্ত হয়ে হাতে হাত রেখে কচলাচ্ছে সে। অসংখ্য মানুষের ভীরে চোখ দু’টো খুজতে লাগলো তুষারকে। কিন্তু হায়, সংকুচিত দৃষ্টি গিয়ে থমকালো আবারও সেই গিলে খাওয়া নিস্পাণ চোখ দু’টোতে। মাফিয়া বসের আবিষ্ট নেত্রে থমকে গিয়ে আরও একবার তাল হারালো নীলাম্বরী। লোকটাকে আজ এমন কেন লাগছে? কেন তার দৃষ্টিতে এতো ঘোর?
লোকটার মাদক চাহনিতে চোখ পড়তেই হঠাৎ একটা হার্টবিট স্কিপ করে গেলো ঈশানী। ভেতরে জাগ্রত হলো অদ্ভুত এক শিহরণ। এলোমেলো লাগছে ভীষণ। মন বলছে,
— লোকটা এভাবে কেন দেখছে? কেন! কেন! কেন! নিশ্চয়ই মানুষকে ম্যানিউপুলেশন করার অভিনব কোনো কৌশল এটা তার।

এরীশের মাঝে হেলদোল নেই, সে ড্রিংক করতে করতে ঈশানীকেই পরখ করছে শুধু। মেয়েটার টকটকে রাঙা ঠোঁট,নীলাভ চোখ, শরীরের সঙ্গে মিশে যাওয়া নরম পাতলা গাউন,সবকিছু। মেয়েটাকে অস্বস্তিতে কাটা হয়ে যেতে দেখে বেশ মজাই পাচ্ছে বোধ হয় । নয়তো এমন তৃষ্ণার্থ চাতকের মতো চেয়ে থাকার কারণ কি? আজ ওর দৃষ্টিতে রূঢ়তা নেই, নেই কোনো হিং””স্রতা। আছে কেবল চাতকের মতো বেসামাল বিমুগ্ধ তৃষ্ণা,
ভরা মজলিসের মাঝেও কয়েক মূহুর্তের জন্য দুজন দু’জনার চোখে ডুবে গেলো ওরা। সবকিছু ছাপিয়ে বুকে এসে লাগলো ভায়োলিনের নরম ক্লান্ত সুর। সুরের চরণ গুলো ছিল,

কতদিন…. ভেবেছি শুধু দেখবো যে তোমায়,
ক্লান্তহীন…. তুমি ছিলে আমার কল্পনায়।
সেই ছবি উঠলো ভেসে চোখেরই চাওয়ায়
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়।
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়।
ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো চারিপাশ। জড়তা,সংকোচ, অস্বস্তি সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে দু’টো প্রাণ যুগলবন্দী হয়ে বিচরণ করতে লাগলো অবাধ্য অনির্দিষ্ট এক অনুভূতির জগতে।
ঘোরের মাঝে বিচরণ করতে করতেই অকস্মাৎ ঈশানীর সামনে এসে দাঁড়ালো মাফিয়া বস। কোনোরূপ পূর্বাভাস ছাড়াই কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসালো,

— কোথায় লুকিয়ে ছিলে?
— লুকোবো কেন?
— আমি দেখছিলাম বলে।
— আমার অস্বস্তি হচ্ছিল তাই সরে এসেছি।
— অনুমতি দিয়েছি আমি?
— নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চয়ই কারোর অনুমতি সাপেক্ষে হয়না?
— শরীর তোমার, কিন্তু মর্জি আমার।
মাফিয়া বসের শেষ কথাতে চমকে উঠলো ঈশানী। চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে বিহ্বল কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
— কি বলতে চাইছেন?
— নাথিং।
গম্ভীর মুখে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো এরীশ। পরপরই মুখের আদলে নিজের চিরাচরিত অভিব্যক্তি টেনে প্রশ্ন করলো,
— কেমন এই জায়গাটা? একটু বেশিই ঝলমলে তাইনা?
হাস্কি পুরুষালি কণ্ঠটা কানে বাজতেই সংবিৎ ফিরে পেলো ঈশানী। মাথা নমিত রেখে জড়োসড়ো হয়ে জবাব দিলো,

— কিন্তু আমার পছন্দ নয়।
— আমি হান্ড্রেড মিলিয়নের বিনিময়ে কিনে না নিলে আজ এটাই হতো তোমার চিরস্থায়ী ঠিকানা।
চারিদিকের অর্ধন”গ্ন আবেদময়ী মেয়ে গুলোকে চোখ দিয়ে ইশারা করলো এরীশ। তা দেখে হৃদয় ছলকে ওঠে ঈশানীর। খানিক আগে বুকের কাছে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো যে ভালো লাগার সৃষ্টি হয়েছিল। ঠুনকো কাঁচের মতোই এক নিমেষে চুরমার হয়ে গেলো তা। ঈশানী আবারও মুখ থুবড়ে পড়লো তার বিধ্বস্ত নিয়তির পদতলে। এরীশের দিক থেকে চোখ সরিয়ে থমথমে গলায় বললো,
— তার বিনিময়ে আপনি আমাকে আজন্মকালের দাসী বানিয়ে রেখেছেন তাইতো?
এরীশ একটু অবাক হলো। নির্দ্বিধায় প্রশ্ন ছুড়লো,

— সেটা কখন করলাম?
— একশো মিলিয়নের বিনিময়ে সেদিন আমাকে দিয়ে কতগুলো পেপারে সাইন করিয়েছেন।
ঈশানীর কণ্ঠে আক্রোশ। সেদিনের কথা মাথায় আসতেই আলো আধারির মাঝে অদ্ভুত এক শ্লেষ হাসির ঢেউ খেলে গেলো মাফিয়া বসের ঠোঁটের আগায়।
অতঃপর সামান্য গ্রীবা নোয়ালো সে । মুখটা ঈশানীর মুখের কাছে নিয়ে যেতেই ভ্যানিলার মিষ্টি ঘ্রাণটা আবারও উথাল পাথাল করে তুললো ভেতরটা। মেয়েটা অদ্ভুত রহস্যময়ী, কোনোরকম স্পর্শ ছাড়াই বারবার এরীশের বুকের পাঁজরে আ”ঘাত করছে।
অগত্যা বহু কষ্টে নিজেকে সামলে থেমে থেমে জবাব দিলো মাফিয়া বস ,

— সাইন করে শুধু দাসী নয় আরও অনেক কিছু বানানো যায়। ডুনইউ নো দ্যাট?
এরীশের বাক্যে রহস্যের আভাস।বিপরীতে অপ্রসন্ন গলায় শুধালো ঈশানী,
— কি বলতে চাইছেন?
সরাসরি দৃষ্টি তাক করলো এরীশের চোখে। সে চোখে প্রাণ নেই। নিস্তেজ নিস্তব্ধ আঁধারে মোড়া কৃষ্ণগহ্বর। নিজের কোপ দৃষ্টি অবহ্যত রেখেই পাথর কঠিন স্বরে জবাব দিলো এরীশ,
— অলওয়েজ অবেই ইউওর আলফা।
কথা বলতে বলতেই রমণীর তিরতির করে ফুলে ওঠা নাকের ডগায় চোখ পড়লো এরীশের। মেয়েটা শক্ত গলায় বললো,

— আমি কোনো ভুল করিনি।
—- করেছো তো, অনেক বড় ভুল করেছো।
ঈশানী জানে ভুল করলে শাস্তি পেতে হয়। তাই একটু কুণ্ঠিত হলো। আবার কোথায় কোন ভুল ধরে বসে আছে জানোয়ারটা কে জানে? বিপরীতে মুখ ফুটে জানতে চাইলো,
— ক…কি ভুল!
এরীশ কিছু বলবে তার আগেই পেছন থেকে হাঁক ছেড়ে ডাকলো তাকে কেউ,
— হাই দেয়ার!
এরীশ সোজা হয়ে পেছনে তাকাতেই একজন এগিয়ে এসে করমোর্দনের জন্য হাত বাড়ালো।
— হাই আ’ম ইউওর আমেরিকান ক্লায়েন্ট,মি. হাবার্ড।
অল্পবয়সী সুদর্শন হাবার্ডকে চিনতে সময় লাগলো না এরীশের। মাল্টি বিলিয়নিয়র ক্লায়েন্ট সে।পৃথিবীর বড় বড় সব আন্ডারগ্রাউন্ড ক্রাইমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তার নাম। বিশেষ করে নারী পা””চা”রে বেশ পারদর্শী।
এ যাবত এরীশ ইউভানের স্মাগলিং এর সবচেয়ে বড় ক্রেতাও এই শ্বেতাঙ্গ লোকটাই। সহসা বিগলিত হেসে তার সঙ্গে হাত মেলালো এরীশ । দু’জনার হাতে থাকা ওয়াইনের গ্লাসের সন্ধিতে চিয়ার্স করে বললো,

— হেই, হাউ’স ইট গোইং?
লোকটা কাট কাট ইংরেজি ভাষায় জবাব দিলো,
— ভেরী ফাইন। বাট!
— বাট!
একই কথার পুনরাবৃত্তি করলো এরীশ। লোকটা একটু গড়িমসি করে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জবাব দিলো,
— তোমার ক্লাবে আজ সুন্দরীদের মেলা বসেছে। আমার আসলে মাথা ঠিক নেই।
— এভরিথিং ইজ এট ইউওর সার্ভিস ম্যান ।
প্রসিদ্ধ গলায় প্রত্যুত্তর করলো এরীশ। লোকটা স্বভাবসিদ্ধ হেসে জানালো,
— আই নো, আই নো। বাট আই ওয়ান্ট সামওয়ান স্পেশাল।
এতোক্ষণে হাবার্ডের অভিপ্রায় ধরতে পারলো এরীশ। কলেকৌশলে মেয়ে কেনার ধান্দায় আছে দালালটা। সহসা ভ্রু বাঁকিয়ে শয়তানি গলায় জবাব দিলো মাফিয়া বস ,

— এই ক্লাবে সবকিছুই ভীষণ এক্সপেন্সিভ মি.হাবার্ড।
— অফকোর্স, বাট আ’ল পে ইউ্য।
এরীশ একটু ক্ষান্ত হলো। দাম্ভিক স্বর খাদে নামিয়ে পেশাদারিত্ব অটুট রেখে বললো,
— ঠিক আছে। বলুন কাকে চাই?
হাবার্ড সময় নষ্ট করলো না। আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিলো বোল্ড রেড স্যাটিন গাউন পরিহিত মেয়েটাকে । যে কিনা একটু দুরেই তুষারের সঙ্গে মিলে ফ্লোরাকে সামলাতে ব্যস্ত। মুখে বললো,
— জাস্ট লুক এট হার আইস। শী ইজ সো গর্জিয়াস! আ’ম ডেস্পারেটলি ক্রেভিং ফর হার।
বেখেয়ালে সেদিকে চোখ পড়তেই এরীশের দৃষ্টি জ্বলে উঠলো। চেহারায় জড়ো হলো আধারের ঘনঘটা। ঈশানীর হাসি মুখটা দেখেই দাঁতে দাঁত চাপলো এরীশ। বাক্য সম্পন্ন করার আগেই হুশিয়ারি কণ্ঠে থামিয়ে দিলো হাবার্ডকে,

— শী ইজ টু মাচ এক্সপেন্সিভ মি. হাবার্ড। ইউ্য কান্ট ইভেন এফোর্ট হার।
টাকার কথাটা ফোস্কা পড়ার মতোই গায়ে লাগলো মাল্টি বিলিয়নিয়র হাবার্ডের। তৎক্ষনাৎ ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রসন্ন হাসলো সে। এরীশকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টায় ফের শক্ত গলায় বলে উঠলো,
— আ’ল পে ইউ্য বেইওন্ড ইউওর ওয়াইল্ডয়েস্ট এক্সপেকটেশন মি. রীশষ্কা।
অচিরেই দু’হাত মুঠিবদ্ধ করে ফেললো এরীশ। র”ক্তজমাট চেহারায় ক্রোধের উষ্মা তার। দেখতে দেখতেই চোয়ালের পেশী শক্ত করে হাবার্ডের দিকে ঝুঁকে এলো সে, গভীর হিমশীতল গলায় হিসহিস করে আওড়ালো,
— বলেছি না বেচবো না। ওটা শুধু আমার।
কৌশলী মস্তিষ্কের হাবার্ড একটু ভণিতা করলো এবার। হেসে জবাব দিলো,
— আই থিংক আমি যথেষ্ট সুদর্শন। হোয়াট ইফ শী ওয়ান্ট টু বি মাই ভ্যালেন্টাইন?
হাবার্ডের কথায় এরীশের ঠোঁটের কোণে একটা পৈশাচিক দ্যুতি ছলকে উঠে ফের উবে গেলো। পরপরই ধ্বনিত হলো তার দম্ভ ভরা কণ্ঠস্বর,

— ট্রাই করেই দেখো।
কথাটা বলেই কাঁউচের উপর পায়ে পা তুলে বসলো মাফিয়া বস। হাবার্ডও আর সময় নষ্ট করলো না,ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো ঈশানীর নিকট।
তখনও তীক্ষ্ণ চিবুকের উপর আঙুল ঠেকিয়ে ওর কলিজার পরিধি মাপছিল এরীশ। হাবার্ড এগিয়ে গিয়ে অতি চমৎকার সম্মোধনে ডেকে উঠলো ঈশানীকে,
— হেই বিউটিফুল!
অজ্ঞাত ঈশানী ঘুরে তাকাতেই একগাল হাসলো লোকটা। রাজকীয় অভ্যর্থনা জানিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত গলায় জানতে চাইলো,
— উইল ইউ্য বি মাই ভ্যালেনটাইন?
হতবিহ্বলিত হয়ে পড়লো ঈশানী। আজকের এই পার্টির কোনো আগামাথাই সে ধরতে পারেনি, সেখানে হ্যা, না বলাতো বিলাসিতা। লোকটাকে কিছু বলা তো দূরে থাক উল্টো ভয়ার্ত চোখে তাকালো সে এরীশের পানে। ওই জ্বলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো দৃষ্টিতে ঝলসে গেলো তার বুক। বিপরীতে শুষ্ক ঢোক গিললো মেয়েটা।
— হোয়াই আর ইউ্য স্কেয়ার্ড বেইবী? আ’ল পে ইউ্য মোর দ্যান হিম।
এরীশের তীক্ষ্ণ ফলার মতো দৃষ্টি অনুসরণ করে কথাগুলো বললো হাবার্ড। যা শোনা মাত্রই কান দু’টো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো ঈশানীর। ঠোঁট ফুঁড়ে বেড়িয়ে এলো অবিশ্বাস্য কন্ঠস্বর,

— কিহ!
— এরীশ ইউভান এক রাতের জন্য কত দেয়? আমি তার দিগুণ পে করবো তোমায়।
নয়ন বিস্ফারিত হয়ে উঠলো ঈশানীর। লোকটার ইঙ্গিত পূর্ণ কথায় অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো সে এরীশের পানে। অপমানে লজ্জায় বাকরুদ্ধ হয়ে কয়েক মূহুর্ত সেভাবে তাকিয়ে রইলো বিমূঢ় চিত্তে।
এরীশ শুধু দেখলো, রমণীর চোখের কোলে জড়ো হওয়া ওই টলমলে বেদনাশ্রুটুকু সোজা গিয়ে বুকের পাঁজরে বিধলো তার। ব্যথাক্লিষ্ট নীলাভ নয়নযুগল এক মূহুর্তও আর স্থির থাকতে দিলো না তাকে। যার দরুন হঠাৎ করে কাউচ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো এরীশ। কোনোরূপ বাক্যব্যয় না করে দ্রীপ্ত পায়ে হনহন করে এগিয়ে গেলো মেয়েটার দিকে। তখনও অবিশ্বাস্য নয়নে রীশকেই দেখছিল ঈশানী, বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসেছে অসহনীয় এক চিনচিন ব্যথা। এটাই কি হওয়ার ছিল? এরীশ তার পবিত্র সত্তাটাকে অবশেষে বিক্রি করেই দিলো তাহলে? এহেন লাঞ্ছনার মুখোমুখি হয়ে মনে মনে এরীশকেই দায়ী করছিল মেয়েটা ।

ওদিকে আসার পথে পাশের টেবিল থেকে লম্বা দেখে দু’টো কাটা চামচ তুলে নিলো মাফিয়া বস । তারপর আর কোনো কথা নয়। প্রলয়ের বেগে হাবার্ড আর ঈশুর মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালো সে। ঝটিকা প্রবাহের মতো আচানক আগমনে কিঞ্চিৎ বিচলিত হয়ে পড়লো হার্বাড। চেহারায় ভর করেছে আতঙ্কের সুদৃঢ় ছাপ।
ক্রোধে অগ্নিশর্মা এরীশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত স্বরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই হাতে থাকা কাটা চামচ দু’টো অকস্মাৎ ঢুকিয়ে দিলো বান্দার চোখের ভেতর। চোখের মনি দু’টো ছি””ন্নভিন্ন হয়ে কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতেই গগনবিদারী এক চিৎকার দিয়ে উঠলো হাবার্ড। তার অত্যাশ্চর্য চিৎকারে থমকে গেলো পুরো ক্লাব। আনন্দ উল্লাস বাদ দিয়ে সবাই এসে জড়ো হলো বার কাউন্টারের কাছে। বিস্ফারিত নয়নে চেয়ে দেখলো মাফিয়া বসের ভয়াবহ সেই নৃ””শংস””তা।

চারিদিকে এতো এতো মানুষের উপস্থিতিও একচুল নড়াতে পারলো না এরীশকে। ক্রোধান্ধ হয়ে মা'”রতে মা””রতে র””ক্তাক্ত করে ফেললো হাবার্ডকে। কাটা চামচের আ”””ঘাতে তার চোখ দু’টো পুরোপুরি গেলে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো ব্লাডিবিস্ট । তার ফর্সা মুখে ছিটকে আসা র'”ক্তের ছড়াছড়ি। চোখ থেকে বেড়িয়ে আসা গলিত তরল, যা দেখে ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠে একযোগে পিছিয়ে গেলো সকলে।
অবশেষে মুখ ভর্তি র””ক্ত নিয়েই উঠে দাঁড়ালো এরীশ। সঙ্গে সঙ্গে চারিপাশ থেকে বন্দুকধারী ক্লায়েন্টরা এসে ঘিরে ধরলো তাকে। মাফিয়া বসের কাজে ক্ষুদ্ধ হয়ে সকলে একযোগে প্রশ্ন ছুড়লো,

— হোয়াই ডিড ইউ্য ডু দিস?
শ-খানিক বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়ে নির্বিগ্নে হাতে পিঠে র””ক্ত মুছতে লাগলো এরীশ। তারপর আস্তেধীরে হিমশীতল আওয়াজে জবাব দিলো,
— এরীশ কাউকে কৈফিয়ত দেয়না!
অতঃপর নৈঃশব্দ্য।
কয়েক মূহুর্ত বাদে ফের হিং”‘স্রের মতো গর্জে উঠলো মাফিয়া বস,
— হাবার্ডের তো শুধু চো””খ গে””লে দিয়েছি।নেক্সট টাইম ওর দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালে সোজা মাটি””র নিচে গে”‘ড়ে দে”‘বো।
এরীশের কথা শেষ হতেই সবার মাঝে একটা কৌতুহল ছড়িয়ে পড়লো,

— এই “ও” টা আবার কে? কার জন্যই বা এমন হুশিয়ারি ছুড়লো মাফিয়া বস?
পরমূহুর্তেই ওই বন্দুকধারী ক্লায়েন্টদের চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরলো আরও দিগুণ সংখ্যক সশস্ত্র স্নাইপার। কৌতুহলের বদলে চারিপাশে গুমোট ভাব ছড়িয়ে পড়লো এবার। আনন্দ আর উৎসব মুখর পরিবেশটা মূহুর্তেই যেন যু””দ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরিত হলো। তা দেখে কপট হাসির লেশ তরঙ্গিত হলো মাফিয়া বসের ঠোঁটের আগায়। শয়ে শয়ে ব””ন্দুকের নল মুখের সামনে নিয়ে তার এহেন হাসির রহস্য ধরতে পারলো না কেউই।
উল্টো তার এই হাসিতে ক্লায়েন্টদের মাঝে একটা চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। সহসা কিছুটা বশ্য হলো তারা। সবার মধ্যে থেকে একজন জেষ্ঠ ক্লায়েন্ট ভীষণ ক্ষোভ নিয়ে অসন্তোষ গলায় বললো,

— হোয়াই ডিড ইউ ডু দ্যাট রীশষ্কা? হাবার্ড ইজ ইউওর বেস্ট সেলার ক্লায়েন্ট। কেন তুমি তাকে এতো নৃ”শং””স মৃ””‘ত্যু দিলে? তাকিয়ে দেখো এবার সবাই তোমার এগেইন্সটে।
হাস্যোজ্জল মুখাবয়ব ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে গেলো এরীশের। দৃষ্টিতে ভর করলো অমানিশার মতো অশুভ অন্ধকার। ততোধিক গম্ভীর গলায় হুশিয়ারি ছুঁড়লো সে,
— শুধু ক্লায়েন্ট কেন? আই ক্যান ইভেন গো এগেইন্সট দ্যা এন্টায়ার ওয়ার্ল্ড ফর হার!
আবারও সেই একই কৌতুহল ভর করলো সবার মাঝে,
— কে সে?

শত শত মানুষের ভীরের মাঝেও এরীশের দৃষ্টি গিয়ে থমকালো ছুটে চলা ওই মেয়েটির দিকে। এরীশের চোখে সে চেরিব্লোসমের মতো স্নিগ্ধ। যার সামান্য চোখের চাহনিতে উথাল পাথাল হয়ে যায় ওর সমগ্র পৃথিবী। যার সামান্য উপস্থিতিতেও দাবানলের মতো আগ্রাসী হৃদয়ে শান্ত,শীতল জলোচ্ছ্বাস বসে যায়। বহুযুগ ধরে থমকে থাকা অনুভূতিরাও জেগে ওঠে তার সংস্পর্শে। সে-তো নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে রূপবতী রমণী।
দু’হাতে গাউন সামলে দৌড়ে বেড়িয়ে যাওয়া সেই অপ্সরাকে দেখতে দেখতেই ক্ষণকালের নৈঃশব্দ্য ভেঙে আচ্ছন্ন স্বরে আওড়ালো মাফিয়া বস,
— প্রেম আমার!

অন্ধকার করিডোরের পথ ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে ছুটছে ঈশানী। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কিছুই জানা নেই,তবুও দ্বিকবিদিক শূন্য হয়ে বেঘোরে দৌড়ে চলেছে সে। যেতে যেতেই কখন যে ক্লাব থেকে বেড়িয়ে এসেছে তার ইয়ত্তা নেই। আলো ঝলমলে চাকচিক্যে ভরা ওই নাইট ক্লাবের সীমানা ছাঁড়িয়ে সামনে এগোতেই ক্রমশ সরু আর অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে রাস্তাটা। তবুও থামলো না তার ছুটে চলা। ছুটতে ছুটতে একপর্যায়ে এসে চলন্ত পা দুটো অকস্মাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলো। মাত্রাধিক ক্লান্তিতে ঝুঁকে গেলো শরীর।
সহসাই হাঁটুতে দু’হাত রেখে তারউপর শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে হাঁপাতে লাগলো ঈশানী । ঠিক সেই মূহুর্তে শীতল মেঘ ভেজা দমকা হাওয়ায় ভেসে এলো একটা গভীর হাস্কি কণ্ঠস্বর,

— আই থিংক ইউ্য আর টায়ার্ড!
নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে দামামার মতো বেজে ওঠা পুরুষালী কণ্ঠের দাপটে থরথর করে কেঁপে উঠল ঈশানী। তৎক্ষনাৎ এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত খুঁজতে লাগলো সেই পুরুষালী কন্ঠের মালিককে। ধোয়াসার মাঝে কারোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দায়।
তাইতো ভয়ার্ত স্বরে ডেকে উঠলো মেয়েটা ,
— কেহ!
বিপরীত প্রান্ত থেকে প্রত্যুত্তর এলো না আর। উল্টো শরীরের সেই অদৃশ্য কাঁপন থেমে যাওয়ার আগেই একটা সবল পেশীবহুল হাত সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরলো ঈশানীকে । অতর্কিত এক ঠান্ডা পুরুষালি হাতের সংস্পর্শে কাগজের মতো ফ্যাঁকাসে হয়ে গেলো রমণীর ফর্সা তুলতুলে মুখ। প্রবল আতঙ্কে বরফের মতো জমে গেলো অন্তর । শিরদাঁড়া বেয়ে নামলো বরফের মতো ঠান্ডা শীতল স্রোত। মুখ ফুটে যে কিছু বলবে তারও উপায় নেই,কণ্ঠতালু শুকিয়ে কাঠ। ঠিক সেই মূহুর্তে আরও একদফা বাক্য ছুড়লো আগন্তুক,

— জানতাম পালাবে!
দ্বিতীয় দফায় ভেসে আসা গমগমে এই পুরুষালী কণ্ঠটা চিনতে সময় লাগলো না ঈশানীর।
— রীশ!
— সে ইট এগেইন!
— কি বলবো?
প্রসঙ্গ পাল্টালো মাফিয়া বস। নিজের চিরাচরিত সত্তায় ফেরত গিয়ে বললো,
— পালাচ্ছিলে কেন?
মস্তিষ্ক সজাগ হতেই কেটে গেলো আতঙ্ক। শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা ওই প্রশস্ত বুকটাকে দু’হাতে ঠেলে সরালো ঈশানী । অদূরের রাস্তা থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ ল্যামপোস্টের আলোয় চারিদিকটা পরখ করতেই বুঝতে পারলো, এটা সম্ভবত একই বিল্ডিংয়ের টপফ্লোর। তখন ক্লাব থেকে বেড়িয়ে ছুটতে ছুটতে কখন যে টপফ্লোরে চলে এসেছে তা আর আন্দাজ করতে পারেনি সে। আর এই মূহুর্তে রুফটপের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে ওরা। দরজার ওই প্রান্তে রুফটপ আর এই প্রান্তে করিডোর। মাঝখানের যায়গাটা ভীষন সরু। সেই এক চিলতে জায়গার মধ্যে থেকেই তড়িঘড়ি করে দূরত্ব বাড়ালো ঈশানী। শুকনো গলায় বললো,

— পালাচ্ছিলাম না।
— তাহলে ছুটছিলে কেন?
অঢেল কতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো এরীশ। সঙ্গে সঙ্গে বিরস কণ্ঠে জবাব দিলো ঈশানী,
— আপনার নৃ””শংস”‘তা দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে উঠছিলাম তাই।
— আমি খুব খারাপ তাই না?
— আপনি জ”ঘন্য!
ব্যথাক্লিষ্ট স্বরে কথাটা বলে পেছনে ঘুরতেই ওর হাতে হ্যাচঁকা টান দিলো এরীশ, ঈশানী ঝেঁঝে উঠে বললো,
— ছোঁবেন না আমায়।
রমণীর তিরিক্ষি আওয়াজে কর্ণপাত করলো না মাফিয়া বস। উল্টো তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠলো,
— ইউ্য থিংক আর আন টাচএবল? অথচ তুমি যেই রুফটপের উপর দাঁড়িয়ে আছো সেটাও আমার।
— আমি থাকতে চাইনি, আপনিই জোর করে আঁটকে রেখেছেন।
— ইট’স মাই চয়েজ।

এরীশের দায়সারা জবাব। বিপরীতে ঈশানী কিছু বলবে তার আগে বিকট স্বরে বজ্রপাত হলো। একটুকরো নীলাভ আলো হঠাৎই লাফিয়ে পড়লো ভূখণ্ডে। সঙ্গেসঙ্গে তরঙ্গোচ্ছাসের ন্যায় একটা কোমল তুলতুলে শরীর অতর্কিতে ছিটকে পড়লো মাফিয়া বসের শক্ত বুকের উপর। সরু লম্বাটে দু’টো কোমল হাত আঁকড়ে ধরলো তার পিঠের কাছের শার্ট। রমণীর হাতে থাকা তীক্ষ্ণ ফলস নেইলস গুলো শার্টের উপর দিয়েই গেঁথে গেলো ত্বকে। তবে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো না এরীশ । এই মূহুর্তে তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু বুকের উপর লেপ্টে থাকা লতানো দেহের মেয়েটা।চোখমুখ খিঁচে দু’হাতে জাপ্টে ধরে রেখেছে সে এরীশকে।
পরিস্থিতিটা ভীষণ অপ্রত্যাশিত। ফলস্বরূপ অন্ধকারের মাঝেই মাফিয়া বসের পুরুষালি এ্যাডামস অ্যাপলখানি কেঁপে উঠল হঠাৎ। প্রবল এক ঢোক গিললো বোধ হয়। অতঃপর কোথায় যেন ভাঙলো কিছু একটা, তেমন করেই গভীর শ্বাস ফেললো এরীশ । ধনুকের মতো নারীদেহের তীক্ষ্ণ নরম ভাঁজ গুলো অভাবনীয় আদর বুলিয়ে দিচ্ছে তার বুকের কাছে। এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো আত্মসংযম। তবুও সেটা অক্ষুণ্ণ রাখলো মাফিয়া বস। দু’হাত মুঠিবদ্ধ করে রুখে দিলো ভেতরের সব নিষিদ্ধ বাসনা। কিয়ৎক্ষণের নীরবতা ভেঙে বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

— কি হলো?
— আমার ভয় করে। ভীষণ বুক কাঁপে।
— সেটা টের পাচ্ছি। কিন্তু কেন?
এরীশ খুব সাবলীল ভাবেই জানতে চাইলো। ফলস্বরূপ তরল গলায় প্রত্যুত্তর করলো রমণী,
— ব…বাইরে ঝড় উঠেছে।
— তুমি বলতে চাইছো, তুমি বজ্রপাতে ভয় পাও?
এরীশের প্রশ্নে জোরে জোরে মাথা নাড়ালো মেয়েটা।তার এই হ্যা সম্মোধনে একটা অদ্ভুত পৈশাচিক আনন্দ খেলে গেলো মাফিয়া বসের সমগ্র চেহারায়। আর কোনো প্রশ্ন করলো না সে, কোনোরূপ পূর্বাভাসও দিলোনা। হুট করেই দরজা ঠেলে ঈশানীকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে দাঁড় করালো ছাঁদখোলা রুফটপে। বাইরে প্রচন্ড বাতাস। এলোমেলো দমকা হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসা বারিধারার ঝাপটায় পু’ড়ে যাচ্ছে গা। বৃষ্টির একেকটি ফোটা তীরের মতো বিঁধছে এসে শরীরে। সমস্ত আকাশ ঘুটঘুটে আঁধারে মোড়ানো। সেই কালো আকাশের বুকে আ” গুন ধরিয়ে ক্ষণে ক্ষণে গর্জে উঠছে মেঘ। বজ্র,বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ার মাঝে হঠাৎ এভাবে টেনে বাইরে নিয়ে আসায় ঈশানীর যেন পিলে চমকে গেলো। পাতলা বসন ভিজে গিয়ে মূহুর্তেই একটা হিম হিম শীত ঘিরে ধরলো ওকে। ঠান্ডায় জমে কাঁপতে কাঁপতেই ক্ষুব্ধস্বরে চ্যাচিঁয়ে উঠলো মেয়েটা,

— কি করলেন এটা? কেন করলেন?
রুফটপে একটা বিশালাকৃতির কালো রঙের হেলিকপ্টার ল্যান্ড করা। আপাতত সেটার গায়ে হেলান দিয়ে লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালো এরীশ। ঈশানী তখনো ঠান্ডায় জবুথবু। সেদিকে একপল নজর বুলিয়ে মেঘভেজা হাওয়ায় ধোঁয়ার কুন্ডলী ছাড়তে ছাড়তে জবাব দিলো সে,
— এরীশ কাউকে কৈফিয়ত দেয়তা।
ঠিক সেই মূহুর্তে আরও একটা বিকট শব্দের বাজ পড়লো জমিনে। তৎক্ষনাৎ দু’হাতে কান চেপে ধরে চিৎকার দিয়ে উঠলো ঈশানী।ঠান্ডা, ভয় আর ভেজা শরীরের অস্বস্তিতে বেজায় দুরবস্থা তার। ধড়ফড়িয়ে উঠে তাড়াহুড়ো জায়গা ত্যাগ করতে যাবে তখনই ওর হাতের কব্জিটা শক্ত করে টেনে ধরলো এরীশ। ঈশানী অস্থির হয়ে উঠলো। হাত ছাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেই ব্যতিগ্রস্ত হয়ে বলতে লাগলো,

— কি করছেন কি? যেতে দিন আমায়!
— না!
— তাহলে আপনিও আমার সঙ্গে চলুন।
— না!
— কি চাইছেন, ম”রে যাই আমি?
— ম””রে যাওয়া কি এতোই সহজ? আর ম””রলেই বা কি? ছাড়ছিনা আমি তোমায়।
— তাহলে কেন এমন করছেন? কি চান আপনি?
— আমি চাচ্ছি সারারাত ধরে বজ্রপাত চলুক। আর যতক্ষণ বাজ পড়বে,ঠিক ততক্ষণ আমার সঙ্গে এখানেই দাড়িয়ে থাকবে তুমি।
এরীশের একরোখা জবাবে অভিমানি আঁধার ঘনালো ঈশানীর দু’চোখে। আচ্ছন্নের মতো ডুকরে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। আবারও বাজ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এরীশ নিজের বুকে টেনে নিলো ওকে। বেঘোরে কাঁদতে কাঁদতেই এরীশের ইস্পাত কঠিন বুকের উপর হাত দিয়ে আঘাত করতে লাগলো ঈশানী,

— আর কত ভাবে ভাঙবেন আমায়? কতটা নিচে নামবেন বলুন?
— ঠিক যতটা নিচে নামলে তোমায় কাছে পাবো।
ঈশানীর কথার পৃষ্ঠে ভুলক্রমে এক চিরন্তন সত্যি উগড়ে দিয়েছিল এরীশ। অথচ সেই সত্যির মুখোমুখি হওয়ার আগেই আকাশ কাঁপিয়ে বর্ষন নামলো ধরণীতে। অচিরেই স্বামীর বুকের ভেতর বিড়াল ছানার মতো গুটিয়ে গেলো মেয়েটা। ঠিক সেই মূহুর্তে মাফিয়া বসের বক্ষপাঁজরে তীব্র ভাবে বিঁধলো কিছু একটা। অনুভবে উদ্বেল হলো মন। একটা পবিত্র শীতল অনুভূতির জোয়ারে সশব্দে ডঙ্কা বেজে উঠলো বুকের ভেতর। তীব্র জলোচ্ছ্বাস আর ঝোড়ো হাওয়ার মাঝেও বুকের ভেতর চলতে থাকা সেই শব্দটা কানে বাজলো ঈশানীর,

— ধুক্ পুক্ ধুক্ পুক্ ধুক্ পুক্!
এরীশের বুকে বাজতে থাকা ওই অদ্ভুত শব্দের হদিস করতে গিয়েই ধীরে ধীরে কান্নাকাটি থেমে গেলো রমণীর। সেই সঙ্গে কমে এলো বৃষ্টির রেশ। এখন কেবল টিপ টিপ করে জলের ফোটা এসে কানে, গলায়, মুখে নিঃশব্দে আদর দিয়ে যাচ্ছে দু’জনকে। জলের এই বাহাদুরিতে এরীশের খুব মেজাজ খারাপ হলো। সে তৎক্ষনাৎ বুকের কোটরে লুকিয়ে ফেললো সাকুরাকে, পর মূহুর্তেই মুখের সামনে তুলে ধরে হামলে পড়লো ওর বৃষ্টিভেজা নরম ওষ্ঠপুটের উপর। ভেজা স্নিগ্ধ পদ্মের মতো কোমল ঠোঁট দু’টো থেকে শুষে নিলো সব জলকণা, তারপর সময় নিয়ে গিললো সবটা। এ যেন এক অতর্কিত আ’ক্রম'””ন, অথচ বিপরীত পক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। পদ্মাপাতার জলের মতোই এরীশের বুকের মাঝে টলটল করছে রমণীর নিস্তেজ শরীরটা।
এই পর্যায়ে কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত হলো সে। হাত দিয়ে পানপাতার মতো মুখখানি তুলতেই দেখতে পেলো চেতনা হারিয়েছে ঈশানী।

অগত্যা বৃষ্টি থামার আর অপেক্ষা করলো না মাফিয়া বস। তৎক্ষনাৎ ঈশানী সমেত উড়াল দিলো হেলিকপ্টারে। মাথায় হেডসেট পড়ে আলো ঝলমলে ককপিটে বসে লক্ষ্য নিয়ন্ত্রণ করতে করতেই এক আধবার চাইলো সে ঈশানীর পানে। ফর্সা চেহারা বৃষ্টিতে ভিজে নীলবর্ণ ধারণ করেছে তার। আপাতত ভেজা পোশাক খুলে একটা তোয়ালে পেঁচিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলনা হাতে, আর সেটাই করেছে এরীশ । কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে তার মস্তিষ্কে। তোয়ালে মোড়ানো মেয়েটার দিক থেকে চোখ সরছে না কিছুতেই। হেবি ড্রা””গের মতোই আকৃষ্ট করছে ওকে। বারবার লক্ষ্যভেদ হচ্ছে। ড্রা””‘গের জন্য রীতিমতো আন্দোলন করছে শরীরের প্রতিটি স্নায়ুকোষ।

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় শেষ পর্ব 

অথচ এরীশ জানে এটা শুধুই ঈশানীকে কাছে পাওয়ার অদম্য আকাঙ্খা। তবুও সে বদ্ধ পরিকর কিছুতেই ড্রা””গ নেবে না আজ । চোখের সামনে বসিয়ে রাখা আস্ত এক সাকুরাকে বসিয়ে রেখে ড্রা””গ নিয়েও স্বস্তি পাবেনা ওর মস্তিষ্ক। মাদকমিশ্রিত মুখখানি দেখে দেখেও শান্ত হবে না বুক। তাইতো আকাশের বুকে পালতোলা নৌকার মতো বয়ে চলা ছাইরঙা মেঘের জগত ছাড়িয়ে দূর দূরান্তে পারি দিতে দিতেই বেসামাল কণ্ঠে আওড়ালো মাফিয়া বস,
— আজ আর ড্রাগ নয়, আজ শুধু তুমি! মাই বিলাভড ভ্যালেনটাইন!

3 COMMENTS

  1. Yashver love storyr jonno wait korbo. Pls happy ending deben. Ar mahiner ki holiday. Se to yash ke dekhte hospital jabe bolechilo. Se kii yash ke kache rakhe ni? Se to yash ke cheler porichoy diechilo.

Comments are closed.