Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯
মাইশা জান্নাত নূরা

নিচতলায় ড্রইংরুমে এখন প্রায় সবাই উপস্থিত হয়ে আছেন। আজ অফিসের কাজ খুব একটা না থাকায় খান বাড়ির সিনিয়র পুরুষ তিন সদস্য জামাল, জায়েদ ও জাবির তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। আর সন্ধ্যেবেলা এমনিও এ বাড়ির সদস্যরা যারা বাড়িতে উপস্থিত থাকেন তারা সকলে একসাথে বসে চা-নাস্তা করেন, সারাদিনের জমিয়ে রাখা অনেক কথা একে-অপরের সাথে শেয়ার করেন। এটা ওনাদের বহু পুরোনো অভ্যাস বলা চলে।
খান বাড়ির প্রধান কর্তা মোস্তফা খান কিয়ৎক্ষণ পূর্বেই আছরের নামাজ আদায় করেছেন তাই সোফায় বসে তসবিহ পাঠ করছিলেন। সারফারাজ ও তেজের বাবা জামাল খান সকালে ব্যস্ততার কারণে খবরের কাগজটাতে চোখ বোলাতে পারেন নি তাই এখন তা দেখছিলেন।

নির্ঝরের বাবা জায়েদ ও নীরার বাবা জাবির একে-অপরের সাথে বিজনেসের বিষয়ে কথা বলছিলেন। বাড়ির বাকি মহিলা তিন সিনিয়র সদস্য জামালের স্ত্রী তাহমিনা, জায়েদের স্ত্রী শিউলি ও জাবিরের স্ত্রী আতুশি একসাথে সবার জন্য চা-নাস্তা তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা তিনজন গল্প ও হাসাহাসি করছিলেন ধীরস্থির ভাবে।
সেইসময় সিঁড়ি বেয়ে একসাথে নিচে নেমে আসলো সারফারাজ, পিহু ও নীরা। খান বাড়িতে বর্তমানে কেবল তেজ ও নির্ঝর উপস্থিত নেই৷ সারফারাজের মুখশ্রীজুড়ে শান্ত ও স্বাভাবিক স্পষ্ট। পিহুর মাঝে খানিক চিন্তা ও বিচলিতা কাজ করছে। নীরার মুখশ্রী জুড়ে এতো বছর ধরে নিজের মাঝে চেপে রাখা সেই কঠিন ও তি*ক্ত সত্যের ভার বহন করতে করতে হয়ে যাওয়া ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে আছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

সারফারাজ, পিহু ও নীরা ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াতেই রান্নাঘর থেকে তাহমিনা, শিউলি ও আতুশি হাতে হাতে ট্রে-তে করে চা-নাস্তা নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। টি-টেবিলের উপর রেখে তাহমিনা ও শিউলি পাশাপাশি বসলেন সোফায়। আতুশি স্বযত্নে চায়ের কাপগুলো সবাইকে পরিবেশন করে দিতে শুরু করলেন। শিউলি বললেন….
—”তোমরা তিন জন রুমেই ছিলে ভেবেছিলাম এখন আর আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করবে না তাই চা করা হয় নি তোমাদের জন্য। এখন করবো কি?”
সারফারাজ গম্ভীর কণ্ঠে বললো…..
—“না মেজো চাচী, চা খাবো না এখন আর। তবে সবার উদ্দেশ্যে নীরা আপনাদের কিছু জরুরী কথা বলতে চায় তা আপনারা শুনুন।

সারফারাজের থেকে একটু পিছনেই নীরা দাঁড়িয়ে আছে। নীরার হাত দু’টো মৃদুভাবে কাঁপছে। পিহু নীরার ভী*তি ভাব বুঝতে পেরে ওর হাতের উপর হাত রেখে ওকে ভরসা দিলো।
জামাল তাঁর হাতে থাকা খোলা নিউজপেপারটা বন্ধ করে পাশে রেখে গম্ভীর স্বরে বললেন….
—”কি বলতে চাও তুমি নীরা মা? নির্দ্বিধায় বলো আমাদের।”
নীরা ওর জিহ্বার অগ্রাংশ দিয়ে শুকিয়ে আসা ঠোঁটটা হালকা ভিজিয়ে নিয়ে বললো……
—“আমি-আমি আজ আপনাদের সামনে এমন একটা কথা বলতে চাই যেটা আমি এতোদিন ধরে নিজের মাঝেই চেপে রেখেছিলাম, কাউকেই বলতে পারি নি।”
তাহমিনা নীরার দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন…..
—“কি হয়েছে নীরা মা? তোমার কথার মাঝে এমন জড়তা ভাব আসছে কেনো? কি নিয়ে ভ*য় পাচ্ছো তুমি বলো!”
নীরা চোখ তুলে কারোর দিকে তাকাতে পারছে না। ওর গলার কাঁপছে মৃদু ভাবে কথা বলার সময়। নীরা ওভাবেই বললো…..

—“দুই বছর আগে আমার সাথে অনেক বড় একটা অ*ন্যায় হয়েছিলো।”
আতুশি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নীরার দিকে তাকিয়ে। তিনি নীরার মা হয়েও জানেন না ওর মনের খবর। ওর সাথে হওয়া বড় কোনো অ*ন্যায়ের খবর। জামাল রু*ক্ষ কণ্ঠে বললেন…..
—“অ*ন্যায়? কি অ*ন্যায় হয়েছিলো?”
নীরা ওর চোখজোড়া বন্ধ করলো একবারে। অতঃপর নিজের ভিতরে জমে থাকা সম্পূর্ণ সাহস নিঙরে নেওয়া স্বরে বললো….

—“দুই বছর আগে আমাকে র‍্য*প করা হয়েছিলো।”
মুহূর্তের মধ্যেই খান বাড়ির ড্রয়িংরুম জুড়ে যেনো নীরব তোলপাড় হয়ে গেলো। স্তব্ধতার চাদর মুড়ে নিলো সবার তাৎক্ষণিক প্রকাশ করার অনুভূতি নামক কিছুকে। আতুশি ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে। নিজের একহাত ঠেকালেন কপালে। দৃষ্টি নত হয়ে মেঝের উপর স্থির হলো তাঁর। শিউলি ও তাহমিনা একসাথে আতুশিকে ধরে ‘ছোট! তুই ঠিক আছিস?’ বললেন। আতুশির তরফ থেকে কোনো প্রতিত্তুর আসলো না। পিহু এগোতে নিলে সারফারাজ ওর হাত ধরে থামিয়ে দিলো। চোখ ইশারায় বুঝালো, ‘এই সময় ওর নীরার পাশে থাকাটা জরুরী।’
নীরার বাবা জাবির উঠে দাঁড়িয়ে গ*র্জানো কন্ঠে বললেন…

—“কে ছিলো সেই জা*নো*য়ার? নাম বল! খুঁজে এনে জী*বন্ত পুঁ*তে ফেলবো ২০ হাত মাটির নিচে।”
নীরার দু’চোখ থেকে ঝর ঝর করে অশ্রুরা ঝরে পড়লো ওর গাল বেয়ে। নীরা ঠোঁট কাঁ*ম*ড়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে কান্না ভেজা কন্ঠে বললো…..
—“আমি জানি না আব্বু। আজও জানি না। আমি হয়তো তখন অচেতন ছিলাম। কে, কখন, কিভাবে এমন কিছু করেছিলো আমার সাথে আমি কিছুই জানি না। সত্যি বলছি আব্বু।”
জায়েদ দাঁতে দাঁত চেপে বললেন….
—“এতো বড় কথা আমাদের থেকে লুকিয়ে রাখার মানে কি নীরা?”
নীরা ঠোট ভে*ঙে শব্দ করে কেঁদে উঠলো জায়েদের ধ*মকে। পিহু একহাত নীরার কাঁধের উপর রেখে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। নীরা বললো…..

—“কার কাছে বলতাম মেজো চাচ্চু? প্রমাণ ছাড়া কে বিশ্বাস করতো আমাকে?”
সারফারাজ কিছুটা এগিয়ে এসে সকলের উদ্দেশ্যে শক্ত কণ্ঠে বললো…..
—“নীরা তখন একা ছিলো তাই ও ভয় পেয়েছিলো। এখানে ওর কোনো দো*ষ নেই।”
নীরা বললো….
—“কিছুদিন পর আমি হঠাৎ জানতে পারি যে, আমি প্রেগন্যান্ট।”
এবার সবাই আরো একধাপ এগিয়ে গেলেন অবাকের পর্যায়ে। নীরার মা আতুশির মাঝে যেনো অনুভূতি প্রকাশ করার কোনো শক্তিই বেঁচে নেই এইমূহূর্তে। তাহমিনা ও শিউলি দু’জনে মিলে আতুশিকে ধরে রেখেছেন। জাবির ধ*প করে সোফায় বসে পড়লেন। নীরা কাঁদতে কাঁদতে আবারও বললো…..

—“আমি দিশাহারা হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না তখন কি করবো! কি করা উচিত আমার! শুধু মাথায় একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো আমার ভিতরে বাস করা ঐ ছোট্ট প্রাণটা ও তো নিষ্পাপ। তাহলে ও কেনো বাঁচার অধিকার হারাবে? এরপর নিজের সাথে বোঝাপড়া করে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার সন্তানকে আমি জন্ম দিবো। বাবাহীন এই সন্তানকে পৃথিবীতে অবহেলিত হতে দিবো না কখনও আমি তা ঠিক করলাম। এরপর পড়াশোনার কথা বলে চলে গেলাম কানাডা। তখন তো আপনাদের সবার সাথেই প্রায় আমার যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। দেশে আসি নি দীর্ঘ ২ বছর। কারণ তখন আমার পেটে আমার সন্তান ছিলো।”
নীরা থামলো কিয়ৎক্ষণের জন্য। উপস্থিত কেউ একটা টু শব্দ পর্যন্ত করলেন না৷ নীরা বললো…..

—“ওখানেই আমি একটা ছেলে সন্তানের জন্ম দেই। ওর নাম রাখি নির্বাণ। এখন ওর বয়স প্রায় দেড় বছর।”
মোস্তফা খানের বুক চিঁ*ড়ে বেড়িয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। নীরা বললো….
—“২ বছর পর আমি দেশে আসলাম ঠিকই। কিন্তু নির্বাণের কথা আপনারা জানেন না জন্য আমার সাথে ওকে আনতে পারি নি। নির্বাণ এখন কানাডাতেই আমার একজন বিশ্বস্ত কেয়ারটেকারের কাছে আছে। কিন্তু আমার ছেলেটাকে ছাড়া আমি ভালো নেই আব্বু। ভালো নেই আমি চাচ্চুরা। ভালো নেই আমি দাদুভাই। আর আমার ছেলেটাও যে আমাকে ছাড়া ভালো নেই তা আমি জানি।”
এই বলেই নীরা ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো। পিহু নীরাকে ধরলো। হাঁটু ভাঁজ করে বসলো নীরার পাশে পিহু। নীরা কাঁদতে কাঁদতে বললো……

—“আজ উপায়হীনা হয়ে আপনাদের সামনে সব সত্য তুলে ধরলাম। আমার ছেলেটাকে আমার বড্ড কোলে নিতে ইচ্ছে করছে বিশ্বাস করুন আপনারা। আমার রাতের অর্ধ প্রহর নির্ঘুম কেটে যায় ওর চিন্তায়। ওকে একটু ছুয়ে দিতে মন চায়। ওর গালে-কপালে-হাতে-পায়ে কতোদিন হলো চুমু খেতে পারি না আমি। আমার কলিজাটা পুঁড়ছে বড্ড। বিশ্বাস করুন আপনারা। আমি আর পারছি না।”
কথা গুলো বলতে বলতেই হু হু কাঁদছে নীরা।
সারফারাজ ওর দু’হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিলো। নীরার কান্না ওর বলা প্রতিটি কথা যেনো সারফারাজের বুকে ধাঁ*রালো সূচের মতো এসে বিঁ*ধ*লো। সারফারাজ বললো…..
—“আমি আর পিহু এই সত্য সম্পর্কে কিছুদিন আগেই অবগত হয়েছি। আর শোনার পর থেকেই আমরা নীরার পাশে ছিলাম, এখনও আছি, ভবিষ্যতেও থাকবো।”
পিহু বললো…..

—“নীরা কোনো অপ*রাধ করে নি। ও একজন ভুক্ত*ভোগী। আর নির্বাণ! ঐ বাচ্চাটা সম্পূর্ণ নিষ্পাপ। এই খান বংশের প্রথম নাতি নিবার্ণ।”
নির্ঝরের বাবা জায়েদ রাগী স্বরে বললেন….
—“আর এসব কথা সমাজ শুনলে কি বলবে ভেবে দেখেছো তোমরা একটা বারও?”
নীরার বাবা জাবির নীরব হয়ে বসে আছেন তখনও। জাবিরের দু’চোখ রক্তিম লাল বর্ণ ধারণ করেছে। তখুনি পাশ থেকে মোস্তফা খান শান্ত ও দৃঢ় কন্ঠে বললেন……

—“সমাজ তো আমাদের মতো মানুষদের নিয়েই তৈরি হয়।আমার নাতনীটা যা সহ্য করেছে গত দুই বছরে সেসব শোনার পরেও যদি আমরা ওকে দূরে ঠেলে দেই তাহলে কি আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন জাবির?”
নীরা দু’হাতে নিজের মাথার দু’পাশ চেপে ধরলো। চাপা রাগ, অপ*মান, লজ্জাবোধ সব একসাথে চেপে ধরেছে যেনো এই মূহূর্তে নীরাকে। জাবির গলা পরিষ্কার করে বললেন…..
—“মানে? তুমি কি বলতে চাইছো বাবা? ওই বাচ্চাটাকে নিয়ে কি সিদ্ধান্ত নিতে চাও তুমি এখন?
নীরা চমকে উঠা দৃষ্টিতে তাকালো সঙ্গে সঙ্গে মোস্তফা খান অর্থাৎ নিজের দাদুভাইয়ের দিকে। মোস্তফা খানের মুখশ্রী জুড়ে গভীর চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ফুটে আছে। পিহু শক্ত করে ধরে আছে নীরাকে। মোস্তফা খানের থেকে কিছু উত্তর আসার অপেক্ষা সারফারাজ করলো না। সে চোয়াল শক্ত করে বললো…..

—“কি হবে মানে? নির্বাণের পিতৃপরিচয়, সেই বংশ না থাকলেও ও খান বংশের ছেলে। তাই ওর ঠিকানা একমাত্র খান ভিলা। ও এই বাড়িতেই আসবে, সেটাও খুব শীঘ্রই।”
জায়েদ সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠে বললেন…..
—“অসম্ভব! যে বাচ্চার পিতৃপরিচয় এর ঠিক নেই সেই বাচ্চাকে এ বাড়িতে উঠিয়ে সমাজের মানুষের কথা আমি শুনতে পার….!”
সারফারাজ জায়েদকে তার কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিয়ে বললো…..
—“আমার ভাগ্নের জন্য আমি আছি, এ বাড়ির অনেকেই আছে। তাই ওর বাবার পরিচয়ের কোনো দরকার নেই। আর যেই কা*পুরুষটা আমার বোনের ই*জ্জ*ত নষ্ট করে পালিয়েছে ভবিষ্যতে ওকে পেয়ে গেলেও তখনও ওর পরিচয়ে আমি আমার নিষ্পাপ ভাগ্নেকে বাঁচতে দিবো না।”
মোস্তফা খান বললেন…..

—“কোনো শিশুই পা*প নিয়ে জন্মায় না।”
এতোসময় পর আতুশি তাঁর দু’চোখ থেকে বেয়ে পরা অশ্রুগুলো মুছতে মুছতে বললেন…..
—“ও আমার নাতি। ওকে এ বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করো তুমি সারফারাজ বাবা। আমি কারোর বাঁধা মানতে রাজি নই। আমার মেয়ে ও আমার নাতীর পাশে আমিও থাকবো।”
তাহমিনা ও শিউলি সমান ভাবে সমর্থন করলেন আতুশির কথায়। পিহু ও নীরা বিষয়টা দেখলো। কিন্তু জায়েদ তখনও সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি একই তেজী স্বরে বললেন…..

—“তুমি বিষয়টা যতোটা সহজ ভাবে নিচ্ছো ততোটা সহজ না এটা সারফারাজ। ঘরের এই সব কথা বাইরে গেলে তোমার রাজনীতির ক্যরিয়ার, এই বংশের মান-সম্মান সব ধুলোর সাথে মিশিয়ে যাবে। সমাজ কোনো ঘটনার গভীরে গিয়ে বিচার করে না। কারণ পিপাসায় কাঁতর কোনো মানুষ জলাধারে যাওয়ার পর সেখানের পানি ঘোলা হয়ে আছে দেখলে তার গভীরতা পরীক্ষা করে পানিটুকু পরিষ্কার করার কথা না ভেবেই সেই জায়গা ছেড়ে অন্যত্র পরিষ্কার পানি খুঁজতে চলে যায়। ঠিক তেমনি মানুষ ক*ল*ঙ্কের আভাস পেলে সত্যটা যাচাই না করেই মুখ ফিরিয়ে নেয়।”
সারফারাজ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো…..

—“যেই মান-সম্মান আমার নির্যা*তিতা বোনের ন্যায় পাওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই মান-সম্মান নিয়ে আমি কি করবো মেজো চাচ্চু? তাই যেই সমাজ ঘোলা পানি দেখেই পালিয়ে যায় তার গভীরতা পরীক্ষা না করে সেই সমাজের কাতারে অন্তত এই সারফারাজ ইউসুফ খান পড়বে না। আর ধরে নিলাম না হয় অন্যত্র গিয়ে পরিষ্কার পানি পাওয়া সম্ভব কিন্তু সেই পানি যদি ভিতরে ভিতরে বিষা*ক্ত হয়? তখন কি কেউ সেই বি*ষ পরীক্ষা করার ধৈর্য রাখবে বলে মনে হয় তোমার? রাখবে না। কারণ মানুষ বাহ্যিক পরিষ্কারত্ব দেখেই সেই পানি নির্বিচারে পান করবে। চিন্তাতেই আনবে না যে পরিষ্কার থাকা জিনিসটাও তার জন্য ভয়ং*কর হতে পারে।”
সারফারাজের এরূপ কথায় জায়েদ আর কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলেন না। নীরার বাবা জাবির তখন ধীরে মাথা তুললেন। তার দু’চোখেও পানি জমে এসেছে। জাবির বললেন…

—“আমার মেয়েকে যে কষ্ট দিয়েছে তার বিচার যেনো ইহ ও পর দুই জীবনেই হয় তাই আমি চাইবো আল্লাহর দরবারে। আর আমার মেয়ে ও আমার নিষ্পাপ নাতিকে আমি আমার বুকে টেনে নিতে চাই।”
নীরা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে জাবিরের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—“আব্বু্! তুমি আমাদের তোমার বুকে জায়গা দিবে? সত্যিই?”
জাবির সোফা ছেড়ে উঠে এসে নীরার মাথায় হাত রেখে বললেন….
—“তুমি যদি এইসব কিছু ২ বছর আগেও আমাদের জানাতে আমরা তোমায় একা নিজের হালে ছেড়ে দিতাম না মা। তখনও বুকেই টেনে নিতাম। কারণ সন্তান যতো বড় পা*পই করুক না কেনো বাবা-মা কখনও তাদের সন্তানদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে থাকতে পারে না। সেখানে তুমি তো সম্পূর্ণ নির্দো*ষ। তোমায় দূরে ঠেলে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসছে না।”

নীরা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। ঝাঁপিয়ে পড়লো নিজের আব্বুর বুকে। হুহু করে আবারও কাঁদতে শুরু করলো নীরা। জাবির স্বযত্নে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলেন। জাবিরের চোখে জমে আসা অশ্রুগুলোও ঝরে পড়লো তার গাল বেয়ে বাঁধা হীন ভাবে। নীরার দীর্ঘ ২ বছরের জমে থাকা সব কান্নারা আজ একসাথে বেরিয়ে আসছে যেনো। হালকা করে দিচ্ছে ওর বুকের ভিতরটাকে। পিহু শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ভিজে আসা চোখ মুছলো। ওর ঠোঁটেও ফুটে উঠেছে হালকা হাসির রেখা।
কিয়ৎক্ষণ পর পরিবেশ ঠান্ডা হলে সারফারাজ বললো…..

—“কালকেই আমি কানাডা থেকে নির্বাণকে বাংলাদেশে আনার সব কাগজপত্র তৈরির কাজ শুরু করবো। খুব শীঘ্রই বাড়ির ছেলে বাড়িতে আসতে পারবে। নিরাপদ আশ্রয় পাবে।”
জায়েদের রাগ পরে গিয়েছে ইতিমধ্যেই৷ তিনি নরম স্বরে বললেন……
—“বাহিরে লোকজন প্রশ্ন করলে কি বলবে তাঁদের তুমি সারফারাজ?”
সারফারাজ বললো…..
—“সত্যটা জানবে সবাই ধীরে ধীরে। কিন্তু আগে নির্বাণের আসাটা জরুরী।”
মোস্তফা খান বললেন….
—“হুম আমরা ঘরের মানুষ সব ঠিক থাকলে বাহিরের মানুষ কি ভাবলো কি বললো কি বুঝে কি রটালো তা দেখার সময় হবে না।”
উপস্থিত সবাই নির্বাণের দেশে আসার ও এ বাড়িতে থাকার বিষয়টাকে মন থেকে মেনে নিলো এবার৷

বাংলো বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার পর বাইকের ব্রেক কষলো তেজ। ইলমা পিছন সিট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বললো….
—”ফিরতে ফিরতে দেড়িই হয়ে গেলো মনে হচ্ছে।”
তেজ ওর মাথা থেকে হেলমেটটা খুলে বললো….
—”অনুর কিছু হলে নির্ঝর ফোন করতো। আর এখন তো এসেই গিয়েছি আমরা। আপনি ভিতরে যান। আমি বাইকটা রেখে আসছি।”
ইলমা ছোট্ট করে ‘হু’ বলে ভিতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো। তেজ চলে গেলো পার্কিং সাইডে বাইকটা রাখতে। ইলমা বাংলো বাড়ির ভিতরে আসার পর ড্রয়িংরুমটা পুরোপুরি শান্ত দেখে ওর ভ্রু জোড়া হালকা কুঁচকে এলো। তখুনি ইলমার চোখ গেলো দোতলায় একটা রুমে। যেই রুমের আলো বাহির পর্যন্ত আসছে হালকা। ইলমা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে এলো। রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখলো বিছানায় অনু আধশোয়া হয়ে বসে আছে। ওর পাশেই একটা চেয়ারে নির্ঝর বসে আছে। ইলমা তড়িৎগতিতে রুমের ভিতরে এসে বললো…..

—”অনু! তুমি বিছানায় এভাবে বসে আছো যে শরীর খারাপ হয়েছিলো নাকি তোমার?”
নির্ঝর অনুকে দেখতে ব্যস্ত ছিলো তাই ইলমার হঠাৎ এমন প্রশ্নে সে চমকে উঠে ইলমার দিকে তাকালো। অনু বললো….
—”আমি ঠিক আছি আপা, চিন্তা করো না তুমি।”
ইলমা বিছানায় উঠে অনুর পাশে বসে ওর কপালে, গলায় হাত বুলিয়ে বললো…..
—”জ্বর জ্বর লাগছে হালকা। নির্ঝর! আপনাকে তো বলেছিলাম অনুর শরীর খা*রাপ হলে আমাদের জানাবেন। আপনি জানান নি কেনো?”
নির্ঝর মনে মনে বললো….
—”তাদের পার্সোনাল স্পেস দিলাম কোথায় এর জন্য আমায় ধন্যবাদ দিবে তা না এসেই না জানানোর বিষয় নিয়ে পড়েছে।”
পর পরই নির্ঝর ওর গলা পরিষ্কার করে বললো…..
—”জানাবো ভেবেছিলাম পরে ডাক্তার আঙ্কেল আসলেন, ঔষধ আনলাম বিভিন্ন ব্যস্ততায় মাথা থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলো৷”

—”ডাক্তার পর্যন্ত আনতে হয়েছিলো! এতো সিরিয়াস অবস্থা হয়েছিলো?”
—”জ্বর আর শরীর দূর্বলতার কারণেই সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলেন উনি। এখন ঔষধ খাইয়ে দিয়েছি। জ্বরও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাই চিন্তার কিছু নেই।”
অনু বললো….
—”সন্ধ্যে হয়ে যাবে একটু পর বাসায় ফিরে যাই চলো আপা।”
ইলমা কিছু বলার আগেই নির্ঝর বললো…
—”আজ রাতটা থাকুন এখানেই। এই অবস্থায় জার্নি করে বাসায় গেলে রাতে রাতে আবার অসুবিধা বাড়তে পারে।”
সেইসময় তেজও রুমে প্রবেশ করে বললো….
—”হুম, নির্ঝর ঠিক বলেছে অনু। আজ এখানেই থাকো তোমরা। আর আগামীকাল তোমায় আর ইলমাকে নিয়ে আমি একটু বাহিরে যাবো। এখান থেকে গেলেই ভালো হবে সবার জন্য।”
অনু ইলমার দিকে তাকালো ও কি বলে তা শুনতে। ইলমা কিয়ৎক্ষণ ভেবে বললো…..

—”ঠিক আছে। থাকবো আজ রাতটা আমরা এখানেই। কিন্তু আমাদের একটা শর্ত আছে৷”
নির্ঝর অবাক হলো ইলমার এমন কথা শুনে। তেজ ভ্রু উঁচিয়ে বললো…..
—”শর্ত! কি শর্ত?”
ইলমা বললো….
—”আমরা ২জন মেয়ে, আপনারা ২জন ছেলে এভাবে একটা ফাঁকা বাংলো বাড়িতে রাত কাটানোর বিষয়টা ভালো দেখাবে না। তাই আপনার পরিবারের কোনো এমন সদস্যকে আজ আমাদের সাথে এখানে থাকতে হবে যাকে আমরা ভরসা করতে পারবো। আর বাহিরের কেউও তখন উল্টো-পাল্টা কিছু ভাবার সুযোগ পাবে না।”
ইলমার এরূপ কথা শুনে তেজ আর নির্ঝর দু’জনের মুখ-ই হা হয়ে গেলো মূহূর্তেই। তেজ আর নির্ঝর একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। দু’জনের মাঝেই একই প্রশ্ন কাজ করছে ‘এবার কি করবে ওরা?’ তেজ বললো…..
—”কিন্তু আপনি তো এরআগে ছিলেন এখানে ২ রাত। তখন নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন কিভাবে নিরাপদ থাকবেন যে তার?”
ইলমা বললো…..

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৮ (৫)

—”তখন বাড়ি ভর্তি অনেক সার্ভেন্টস ও গার্ডসরা ছিলো। আর তখন কি বলেছিলাম ও করেছিলাম তা কি এখন মনে করিয়ে দিবো?”
তেজের সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ হলো ইলমা এ বাড়িতে ১ম রাত কাটানোর সময় ওকে কতোটা সন্দে*হ করেছিলো প্রতি পদে পদে। তেজ দ্রুত স্বরে বললো…..
—”না না, তার আর প্রয়োজন পরবে না। আমি কিছুই ভুলি নি।”
—”বেশ তো, এখন তাহলে ব্যবস্থা করুন নিজেদের পরিবার থেকে যাকে এনে আমাদের সাথে থাকার জন্য মানাতে পারবেন তার।”

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৯ (২)