Home আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৫৬+৫৭+৫৮

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৫৬+৫৭+৫৮

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৫৬+৫৭+৫৮
ফারজানা মনি

মেঘ যেন স্তম্ভিত, হতবম্ব। কি বলে এই লোক।
টুক.. টুক.. টুক.. দরজায় টোকার শব্দ পেতেই আবির আর মেঘ সে দিকে তাকালো। দেখলো হালিমা খান খাবার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভিতরে এসো মামুনি.. বলেই আবির বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
হালিমা খান ভেতরে ঢুকে মেঘের খাবার টা টেবিলে রেখে, মেঘের ভালো-মন্দ জিজ্ঞাসা করেই আবার চলে গেল। আবির রুমে থাকায় আর বেশিক্ষণ দেরি করল না।
হালিমা খান যাওয়ার পরেই আবির খাবারের প্লেটটা হাত তুলে নিল। নিজ হাতে মেঘের মুখে খাবার দিতে দিতে বলল: মেঘ..
মেঘ: হুম।

আবির: আমাকে অফিসে আজ যেতেই হবে। তুমি নিজের খেয়াল রাখবে। সঠিক সময়ে লাঞ্চ করবে। তাছাড়া আমার অবর্তমানে তুমি রুম থেকে একটুও বের হবে না।
আগের সব কথাগুলোই মোটামুটি ঠিক ছিল। কিন্তু আবিরের মুখে রুম থেকে না বের হওয়ার আদেশ শুনে মেঘের মুখটা সহসাই অন্ধকারে ছেয়ে গেল।
আবির তা বুঝতে পেরেই মেঘের মাথায় হাত রাখল। হাত বুলাতে বুলাতে বলল: আমার মেঘ নিশ্চয়ই আমাদের সন্তানের ভালো চায় তাই না?
মেঘের মুখে খাবার থাকা অবস্থায় ই সঙ্গে সঙ্গে মেঘ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। হ্যাঁ সে চায় তাদের সন্তান ভালো থাকুন।

আবির সন্তুষ্টি চোখে তাকিয়ে মেঘকে দৃঢ় কন্ঠে আবারো বুঝালো: রুম থেকে বের হয়ে হাটাহাটি করলে ওর.. সমস্যা হতে পারে মেঘ। তুমি নিশ্চয়ই চাও না আমাদের বেবি কষ্ট পাক।
মেঘ আবারও মাথা নাড়িয়ে জানালো সে চায় না।
তুমি সারাদিন রুমেই থাকবে। তোমার যা প্রয়োজন হবে, তা সঙ্গে সঙ্গেই আনিয়ে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আমি তোমার জন্য আরও একটা হেল্পিং হ্যান্ড রাখবো। যে সর্বক্ষণ শুধু তোমাকেই সঙ্গ দিবে। তারপরও তুমি হাটাহাটি করবে না। আমি যদি পারতাম তোমাকে রেখে কখনোই অফিসে যেতাম না। আশা করি তুমি এমন কিছু করবে না যার জন্য আমাকে অফিসে থেকেও টেনশন করতে হয়।
আবিরের দীর্ঘ কথা শুনে মেঘ এবার কিছুটা সিরিয়াস কণ্ঠে বললো: আহিয়ার আব্বু.. আপনি কেন এত টেনশন করছেন। আমি আপনাকে টেনশন দেওয়ার মতো কোন কিছুই করবো না। আপনার সকল কথা মেনে চলবো। আপনি কাজে মনোযোগ দিন ভালোভাবে।
মেঘের প্রতিশ্রুতি শুনে আবির কিছুটা স্বস্তি পেল। মেঘের কপালে দীর্ঘ একটা চুমু দিয়ে বলল: আমি জানি আমার মেঘ আমার সকল কথাই শুনবে। বলেই আবীর যাওয়ার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ালো।
আহিয়ার আব্বু..

মেঘের কণ্ঠ শুনে আবির মেঘের দিকে তাকালো। ঠিক তখনই মেঘ বিছানায় বসেই আবিরের কোমর জড়িয়ে ধরে, পেটে মুখ ঘুজে দিয়ে বলল: আপনি যখনই ফ্রি হবেন, তখনই আমাকে টেক্সট করবেন। রুমে আমার একা একা ভালো লাগবে না। যদিও বন্যা এসে বসে থাকে। তারপরও আপনি টেক্সট করবেন। আর হ্যাঁ.. আসার সময় আমার জন্য কয়েকটা উপন্যাসের বই নিয়ে আসবেন।
আবির মৃদু হেসে মেঘের মুখটা তুলে, মেঘের কপালে আরেকটা চুমু দিয়ে বলল: আপনি যা হুকুম করবেন তাই হবে ম্যাম। আপনার জন্য এই বান্দা সর্বদাই হাজির।
মেঘ এবার খিলখিলিয়ে হেসে দিল।
গতকাল থেকে আবির যতটা ডিপ্রেশনে ছিল। মেঘ যেন আজ এক মুহূর্তেই তার হাসির ঝলকে সব ডিপ্রেশন কাটিয়ে দিল। মূলত আবিরের এটাই প্রয়োজন ছিল। অফিসে যাওয়ার আগে মাইন্ড ফ্রেশ হওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া আজ ইম্পরট্যান্ট একটা মিটিং আছে।

শুনুন..
মেঘের ডাকে আবিরের হুশ ফিরলো।
সেই চিরচেনা কন্ঠে বলল: হুম
মেঘ আবিরকে আগের মতই জড়িয়ে ধরে রেখে পেটে একটা চুমু খেয়ে বলল: তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবেন ।
আমির খানিকটা ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বলল: হুম.. ফিরবো।
বেলা প্রায় আড়াইটা। ধরণীতে আজ যেন তাপ প্রবাহের পরিমাণটা অতীবো পরিমাণে বেশি। তাছাড়া ব্যস্ত ঢাকা শহরের ট্রাফিক যানজট তো আছেই। ঘেমে নেয়ে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরেছে মিম। এসেই কোন দিকে না তাকিয়ে ই সোজা উপরে চলে গেল নিজের রুমে। উদ্দেশ্য দীর্ঘ একটা শাওয়ার নেওয়া।
৪০ মিনিটের দীর্ঘ একটা শাওয়ারের পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই মিম ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হাতে হেয়ার ড্রায়ার টা নিয়ে যেইনা চুলগুলোকে
শুকাতে যাবে তখনই চোখ পরল সামনের মিরোরে।
মিমের তো চক্ষু চড়কগাছ। মুহূর্তেই পিছনে ঘুরে তাকালো। নাহ.. এটা তো কোন চোখের ভ্রম নয় .. জলজ্যান্ত একটা ছেলে মানুষ। তারই বিছানায় এক পায়ের উপর আরেক পা রেখে চোখ ও কপাল বরাবর এক হাত তুলে শুয়ে আছে। মিম খানিকটা সামনে এগিয়ে গেল।
কে আপনি? আমার রুমে কি করছেন? এই যে হ্যালো…
বিপরীত পাশ থেকে কোন সারা শব্দ না পেয়ে, মীম আবারো ডেকে উঠলো। এই যে মিস্টার.. আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন…

সামনে থাকা অবয়ব টি এবার চোখের পলকেই উঠে বসে পড়লো। ছেলেটির হঠাৎ কর্মকান্ডে মিম খানিকটা ভয় পেয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেল। ভয়ে চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে স্থির হয়ে রইলো।
কি ম্যাডাম ভয় পেয়েছেন?
পরিচিত কণ্ঠস্বর পেয়ে, মিম পিটপিট করে চোখ খুলল।
চোখ মেলে তো মীম আরও অবাক।
মিম যেন বাকরূদ্ধ।
চমকিত কন্ঠে মিম কিছু বলতে না পারলেও আশ্চর্য একটা কাজ করে ফেলল। মূহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়লো আরিফের বুকে।
আরিফও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তার প্রিয়সিকে। দীর্ঘ পাঁচ মাস পর তাদের দেখা। আরিফ বাবার ব্যবসার কাজে নতুন নতুন জড়িত হওয়ায়, খুব বেশি একটা সময় পায় না খান বাড়িতে আসার। গত পাঁচ মাস আগে একবার মিমের কলেজের পাশে র কফি শপে তাদের দেখা হয়েছিল।
দীর্ঘ পাঁচ মাসের তৃষ্ণা যেন মিটলো আজ।
ছাড়ো এবার.. আরিফের নিশাতুর কণ্ঠের আওয়াজ পেয়ে মিম আস্তে করে বলল: য়ু.. হুম..
আরিফ খানিকটা মুচকি হাসলো। তারপর আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তার লাজুক লতাকে।

আরিফ ধীরে ধীরে তার হাতের বাঁধন আরো শক্ত করল। মিমের এবার মনে হচ্ছে তার শরীরের হাড়গোড় গুলো যেন ভেঙে যাবে। হঠাৎই কি মনে করে যেন মিম মোচড়ামুচড়ি করে নিজেকে ছাড়াতে চাইল।
আরিফ একটু বিরক্ত কন্ঠে বলল: এতক্ষণ তো ছাড়তে চাইলে না, এখন আবার মোচড়া মুচড়ি কেনো করছো?
মীমের মস্তিষ্কে যেন হঠাৎ ই টনক নরলো.. এভাবে যদি ওদেরকে কেউ দেখে নেয়, তাহলে পরিণতি কি হবে তা ভেবেই মিমের হাত-পা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো।
এবার আরিফ মিমকে বাহু থেকে আলগা করে, মিমের মুখটা দুহাতে আজলায় নিয়ে নেশাক্ত কন্ঠে বলল: কি হয়েছে জান.. এভাবে কাঁপছো কেন? আমার ছোঁয়া কি তোমার অনেক খারাপ লাগছে?
মিম মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালো। না তার খারাপ লাগেনা। মিম আরিফের চোখের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওরালো: কেউ চলে আসবে..

মিমের মুখে অনার্থক ভয়ের কথা শুনে আরিফ কিছুটা বাঁকা হাসলো। যা মিমের চোখের অগোচরেই রয়ে গেল।
আরিফ মুখটাকে একটু কঠিন করে মিমের দিকে তাকিয়ে বলল: আসুক.. তাতে আমার কি?
মিম একটু কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ালো। কি বলছেন এসব? এখনো সঠিক সময় আসেনি। আপনার কথা জানতে পারলে তখন সবাই মিলে আমাকে ঘাড় ধরে বিয়ে দিয়ে দেবে.. তখন দেখবো কি করেন আপনি.. আর এত সাহস ই বা কোথায় যায়…
মিমের কথা শুনে আরিফ আবারো এক হেচকা টানে
মিমকে বুকে এনে ফেলে বলল: জান.. এই হাতটা তো তোমাকে ছাড়ার জন্য ধরিনি। জীবনে যত বাধাই আসুক কখনো কোন পরিস্থিতিতেই আমি তোমাকে ছাড়বো না।

আরিফ মিমের মাথা টা কে বুকের মাঝে আরেকটু চেপে ধরে বলল : তুমি কি শুনতে পাচ্ছ এই বুকের ধুকপুকানি? গত পাঁচ মাসে এই মনটা অস্থির হয়ে আছে, কখন তোমায় এক নজর দেখতে পারব সেই আশায়।
আরিফের মুখে ভালোবাসা মেশানো ধ্বনি গুলো শুনতে পেয়ে , মিম আরো শক্ত করে আরিফকে জড়িয়ে ধরলো..
পারলে আরিফের বুকের মাঝেই ঢুকে যেতো মিম। কিন্তু আফসোস!!! তা তো আর সম্ভব না…
পূর্বের ন্যায় মিমের মাথাটা নিজের বলিষ্ঠ ঢেউ খেলানো বুকে রেখে ই আরিফ আবারো বলতে শুরু করল… জান… গত পাঁচ মাসে আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি…
এবার মিমও বলে উঠলো: আমিও আপনাকে মিস করেছি। আপনাকে ভিডিও কলে দেখে আমার মন ভরে না।
আরিফ একটু দুষ্টুমির কন্ঠে বলল: ওহ.. তাই??

মিম: হুম…
আরিফ: কতটা মিস করেছো?
মিম এবার হাতের কর গুলো গুনতে গুনতে বলল: গত পাঁচ মাসে আমি আপনাকে ১৫০ দিনে ১৫০ বার মিস করেছি। ৩৬০০ ঘন্টায় ৩৬০০ বার মিস করেছি। ২১৬০০০ মিনিটে ২১৬০০০ বার মিস করেছি। ১২৯৬০০০০ সেকেন্ডে ১২৯৬০০০০ বার মিস করেছি।
মিমের দীর্ঘ কথা শুনে আরিফ শুধুই হাসলো। তারপর মিমকে জানালো, আর মাত্র কয়েকটা বছর ধৈর্য ধরো। তারপর ই তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাবো আমার বউ করে।
আরিফের মুখে বউ কথাটা শুনেই মিম লজ্জায় আরো গুটিসুটি হয়ে দাঁড়ালো।

আরিফ আবারো বলল: মন দিয়ে নিজের লেখাপড়াটা শেষ করো। তাছাড়া তোমার আব্বু ভাইয়াদের কাছে যোগ্য পাত্র হওয়ার জন্য আমার নিজেকেও প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন। এই কয়েক বছরে আমি নিজেও সবটা গুছিয়ে নিতে পারবো। এই পাঁচ মাসে আমি চাইলেই হয়তো তোমার সাথে বারবার দেখা করতে পারতাম। কিন্তু করিনি। আমি চাই, তুমি মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করো। আমাদের সম্পর্ক যেন কোনভাবেই তোমার ক্যারিয়ারে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া আমি নিজেও ব্যবসায় সময় ও শ্রম বাড়িয়ে দিয়ে নিজেকে তোমার যোগ্য করে তুলতে চাই। তাই আমাদের কম দেখা হওয়াই উত্তম। অতিরিক্ত দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশার ফলে যদি কারো নজরে পড়ি, তাহলে দুজনের স্বপ্নই ভেঙ্গে যাবে। হয়তো তোমাকে জোর করে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিবে। তুমি কি তা চাও???
আরিফের দীর্ঘ কথা শুনে মিম মাথা তুলে তাকিয়ে জানালো , না সে চায় না।
আরিফ মুচকি হেসে মিমের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল: তাহলে আরো ধৈর্য ধরতে শেখো। আমাদের দেখা এবারের মতোই দীর্ঘ সময় পর পর হবে। হতে পারে পরবর্তী সাক্ষাৎ আরো দেরিতে হবে।

এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার মিম ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। পরবর্তী সাক্ষাৎ আরো দীর্ঘ সময় পর হবে কথাটা ভাবতেই মিমের দু চোখ ভরে গেল নোনা পানিতে।
আরিফ মিমের চোখের পানি মুছতে মুছতে একটু রাগী কন্ঠে বলল: তুমি এমন কান্নাকাটি করলে, তোমার সাথে বিয়ের আগে আর দেখাই করবো না। হোক সেটা দুই তিন বছর বা তার বেশি সময়, তখন কি তোমার ভালো লাগবে??
কথাটা কর্নকুহরে পৌছানো মাত্রই মিম মাথা নাড়িয়ে বারবার অসম্মতি জানিয়ে বলল: না..না.. আমি চাইনা।
আরিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে চাইলো, গুড গার্ল… আমি জানি আমার মিম পরবর্তী দীর্ঘ সুখের জন্য, বর্তমানের এই সামান্য বিচ্ছেদ টুকু মেনে নিতে পারবে ইনশাল্লাহ।
মিম এবার মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতির কন্ঠে বললো: হুম.. কয়েকটা বছর কেন.. আমি আপনার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করতে পারব।

হঠাৎই অদূর থেকে আদির শব্দ ভেসে আসলো। মেঘের রুমে র দিকে গিয়ে হয়তো আরিফকে খুঁজছে। বারবার আরিফ ভাইয়া আরিফ ভাইয়া বলে চিৎকার করছে।
আরিফ শুনতে পেয়েই, মিম কে একান্তভাবে বিদায় জানিয়ে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে শুধু আস্তে করে বলল: নিচে এসো।
ঘড়ির কাঁটা যখন বিকেল ৫টায়। তখনই তানভীর আর আবির একসাথে বাড়িতে ঢুকলো। দুই ভাইকে অনেকদিন পর একসাথে বাড়িতে ঢুকতে দেখে মালিহা খান, হালিমা খান এবং আকলিমা খান একটু অবাকই হয়েছিল। পরবর্তীতে তানভীর জানালো: বাড়িতে মাহমুদা খান ও আরিফ আসার ব্যাপারটা আবির নিজেই তানভীর কে ফোন করে জানায়। তাই তানভীর আজ অফিস থেকে সামান্য একটু আগে বেরিয়ে একেবারে আবিরকে নিয়েই বাড়ি ফিরেছে।
দুই ভাই মাহমুদা খানের সাথে কুশলাদি বিনিময় করে ফ্রেশ হতে যার যার রুমের দিকে চলে গেল।
একটা পড়ন্ত বিকেল। চারিদিকে পাখির কলকাকলি শোনা যাচ্ছে। হয়তো তারা নিজ নিজ নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। সারাদিনের প্রখর রোদে শুকিয়ে থাকা গাছগুলো ও যেন বিকেলের স্নিগ্ধতায় সতেজতা ফিরে পেয়েছে।
বন্যা দাঁড়িয়ে আছে তার ব্যালকনিতে। বিকেল পাঁচটা বাজে। হয়তো তানভীরের এখন ছুটি হয়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে চলেই আসবে ভেবে বন্যা এই মাত্র ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে। বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাস
মন প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎই কারো ঠান্ডা হাত কোমর ও পেটে স্পর্শ করায় ,বন্যা ধ্যান ভেঙ্গে সে দিকে তাকালো। মুহূর্তেই মেরুদন্ড বেয়ে যেন শীতল স্রোত বয়ে গেল।
বন্যা অবাক নয়নে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে বলল: আপনি.. এত তাড়াতাড়ি..
তানভীর: হুম… ভাবলাম বউটা অপেক্ষা করছে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাই।
ওহ… তাই বুঝি… বলেই তানভীরের গলা জরিয়ে ধরল বন্যা।
তানভীর কোমর চেপে ধরে বন্যাকে আরেকটু নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। কপালে কপাল ঠেকিয়ে নেশাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল: বউ ভালোবাসি… অনেক ভালোবাসি ♥️♥️
হুম আমিও ভালোবাসি ♥️♥️

কালো চুরিদার, এক পায়ে কালো পাথরের একটা পায়েল, কালো ঝলমলে সিল্কি চুল গুলো সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মৃদু বাতাসে দুলছে, কাজল কালো চোখে কি অপলক সেই দৃষ্টি….
যেই দৃষ্টি তীরের ফলার মতো এফোর ওফোর করে দিচ্ছে এক প্রেমিক পুরুষের হৃদয়।
আরিফ বুকের বা পাশে নিজের এক হাত চেপে ধরে তাকিয়ে আছে সিঁড়ি দিয়ে নামা তার প্রিয়শীর পানে। আজ কেন জানি মনে হচ্ছে, হাত দিয়ে চেপে না ধরলে রিদপিন্ডটা লাফিয়ে বক্ষ দেশ থেকে বেরিয়ে পড়বে।
মাশাল্লাহ… মিম তোকে তো অনেক সুন্দর লাগছে.. মিমকে উদ্দেশ্য করে মেঘের কথা শুনে আরিফের কিছুটা ধ্যান ফিরলো। তাকিয়ে দেখলো এতক্ষণে মিম নিচে নেমে এসে মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই মাহমুদা খান সহ বাড়ির তিন কর্তি গল্প করায় ব্যস্ত।

আরিফের ধ্যান ফিরতেই সাথে সাথেই বুকের বা পাশ থেকে হাতটা সরিয়ে দিল। আস্তে আস্তে আওরালো… আরিফ তুই শেষ… এই বাড়িতে আর আসা যাবেনা… এই মেয়ে তোকে উন্মাদ না বানিয়ে ছাড়বে না..
কিরে.. একা একা কি বিড়বিড় করছিস? আমাদেরও একটু বল শুনি..
আরিফ চোখ ঘুরিয়ে দেখল পাশেই এসে বসেছে তানভীর..
আরিফ: কই ভাইয়া.. কিছু বলিনি তো..
তানভীর: তাই বল… কিছু না বললেই ভালো.. আমি তো আবার ভাবলাম কোনো শাকচুন্নি এসে ভর করল নাকি তোর ঘাড়ে…
আরিফ: ধুর ভাইয়া.. তুমি যে কি বল…

আরিফ মুখে এ কথা বললেও মনে মনে বলল: হুম ভর করেছে তো.. তবে কোন শাকচুন্নি নয়, মিষ্টি একটা কালো পরী… যেই পরীটা এই মুহূর্তে তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
দুধে আলতা গায়ের রঙে কালো চুড়িদারটা বেশ মানিয়েছে মিমকে । কেন যে এই ছোট্ট পরীটা বারংবার বহু বেশে আরিফের সামনে আসে? পরীটা কি জানে না… তাকে দেখলে আরেকটা হৃদয় মুহূর্তেই থমকে যায়… এলোমেলো হয়ে যায় তার সবকিছু ….
উফফসস.. আরিফ আর কিছুই ভাবতে পারছে না.. কথা ঘুরাতে মেঘের পানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল: ভাবি… ভাইয়া কই?
সঙ্গে সঙ্গেই মেঘ কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল: আমি কি তোর ভাবি আগে নাকি বোন আগে? সবাই আপু বলে তুই কেন আমাকে ভাবি বলিস?
আরিফের তৎক্ষণাৎ জবাব: ভাবি আগে…

মেঘ একটু রাগে কিরমির চোখে তাকিয়ে অভিযোগের কন্ঠে বলল: আরিফ তুই তোর বোনকে ভুলে গেলি? শুধু ভাইয়াকে সাপোর্ট করছিস যে.. আমি তোর ভাবি আগে হয়েছি নাকি মামাতো বোন আগে হয়েছি…
এবারো আরিফের নিরলস জবাব: ভাবি…
মেঘ এবার কাঁদো কাঁদো দৃষ্টি নিয়ে মাহমুদা খানের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলল: দেখেছো ফুপ্পি… আমাকে কেউ ভালবাসে না, শুধু আবির ভাইকে ভালোবাসে…
মাহমুদা খান এইবার বাড়ির ছোট সদস্যদের কথায় মনোযোগ দিলেন.. আরিফ এর কান টেনে ধরে বলল : কে বলেছে আম্মু.. তাকে কেউ ভালোবাসে না? এই বাঁদর বলেছে?
আরিফের কান তার মায়ের হাতে ধরা দেখে মিম খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো.. যা মুহূর্তেই ঝংকার তুলল আরিফের বক্ষ পিঞ্জরে।

নিজের কান থেকে মায়ের হাতটা সরিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে রসাত্মক কন্ঠে বলল: আমি তো ঠিকই বলেছি.. যেদিন থেকে মেঘ আপুকে চিনেছি, সেদিন থেকেই আবির ভাইয়ের বউ হিসেবে তাকে ভাবি বলে সম্বোধন করেছি। আপুকে তো আমি ছোটবেলা থেকে মামাতো বোন হিসেবে চিনতাম না। প্রথমেই চিনেছি ভাবি হিসেবে। তাই আমার ভাবিই আগে।।
সাব্বাস… বলেই কেউ কাঁদে হাত রাখল। আরিফ তাকিয়ে দেখল আবির দাঁড়িয়ে আছে।
এবার আমার বোনটাকে দুইটা মিলে হেনস্থা করবে, ভেবেই মুখ টিপে হাসলো তানভীর.. মনে মনে বলল: আমি কিন্তু আমার বোনের পক্ষেই আছি।

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৫৩+৫৪+৫৫

মেঘ তো এবার খানিকটা কেদেই দিল.. আস্তে আস্তে বলল: তোমরা সবাই দেখলে তো আমাকে যে কেউ ভালোবাসে না.. যদি ভালোইবাসতো তাহলে তো আমার ভাই বোন সবাই আবির ভাইকে দুলাভাই বলে ডাকতো।
এই কথা শুনে আবিরের তো চক্ষু চড়ক গাছ। কি বলে এই মেয়ে…

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৫৯+৬০+৬১