আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৫+৬+৭
ফারজানা মনি
মেঘ:কিরে কখন থেকে ডাকছি। ছাদে কী করছিলি??
মিম:না…মানে আপু আমার তো ছাদে একটা ড্রেস শোকাতে দেওয়া ছিল ওটা আনতে গেছিলাম।
মেঘ:তাহলে ড্রেস কোথায় ?
মিম:তোমার ডাক শুনে নিচে চলে আসলাম, তাই আর আনিনি।
মেঘ: আচ্ছা শোন,,, এই লেহেঙ্গা টা নিয়ে যা। ভাইয়া দিয়েছে বলেছে, বন্যাদের বাড়িতে যাওয়ার সময় পড়তে।
মেঘ:কিন্তু আপু এটাতো পুরো বন্যা আপুর লেহেঙ্গার মতো।
মেঘ:হুম….তোর কী মনে নেই ভাইয়াকে বলেছিলাম ভাইয়ার বিয়েতে আমরা তিনজন একরকম লেহেঙ্গা পড়বো।
মিম:ওহ..হ্যা..মনে পড়েছে।
মেঘ:একটু পর আমি তোর রুমে আসবো
তারপর একসাথে রেডি হবো।
মিম:আপু… আবির ভাই এসেছে?
মেঘ:হুম…এখন ঘুমাচ্ছে ।
মিম:ওহ..ঠিক আছে আমি রুমে যাই।
বলেই মিম চলে আসলো। মেঘ নিচে আসলো।
দেখলো মালিহা খান, হালিমা খান, আকলিমা খান মেহমানের নাস্তা দিতে ব্যস্ত। মাহমুদা খান আবিরের মামি ও মিমের খালার সাথে গল্প করছে। মেঘ গিয়ে মাহমুদা খানের কাছে গিয়ে তার কাঁধে মাথা রাখলো।
মাহমুদা খান:কী হয়েছে মেঘ..শরীর ঠিক আছে?
মেঘ:হুম..ভাবছি।
মাহমুদা খান: কী ভাবছিস?
মেঘ: ভাবছি, এইযে বিয়ের পর এখন তুমি আর আমায় আদর করো না।
মাহমুদা খান মেঘের কান টেনে ধরে বলল:
ওরে দুষ্টু তুই আর বড় হবি না।
মেঘ খিল খিল করে হেসে দিল। মালা হেসে দিল। মালা দূরে চেয়ারে বসে মেঘকে দেখছে। গত দুমাস আগে মালার বিয়ে হয়েছে। স্বামী প্রবাসী। বিয়ের একমাস পরে মালাকে রেখে তার স্বামী প্রবাসে পারি জমিয়েছে। মালা মেঘকে দেখে ভাবছে, একটা মেয়ে কীভাবে এতোটা ভাগ্যবতী হয়। যার জীবনে আবির ভাইয়ের মতো একটা স্বামী আছে তার জীবনে আর কিছু প্রয়োজন নেই।
“মেঘ তুমি সত্যি একজন ভাগ্যবতী। যাকে আমি হাজার চেয়েও পাইনি, সে তোমাকে বহু বছর আগেই নিজ থেকে ধরা দিয়েছে। ভেবেই মালা দীর্ঘশ্বাস ফেলল”
মিম দৌরে গিয়ে রুমে ধপাস করে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। বাম হাতটা বুকে চেপে আছে। আজকাল আরিফকে দেখলেই তার হৃদ স্পন্দন টা বেড়ে যায়। বুকের ভেতর কেমন জানি ধুকবুক করে। তার সামনে পড়লে অনেক লজ্জা লাগে। তাহলে এটার নাম কী কিশোরী বয়সের আবেগ?
অন্যদিকে আরিফ আবার ছাদে চলে গেল। কিছুক্ষণ ছাদের সোফায় বসে থাকার পর, একটা রক্তিম গোলাপের দিকে তার চোখ আটকালো। সে মূহুর্তেই উঠে গিয়ে তা ছিড়ে এনে আবার সোফায় এসে বসলো। আরিফ গোলাপ টিকে দেখছে, হুম.. গভীর দৃষ্টিতে দেখছে। হয়তো এই গোলাপের মাঝে তার প্রেয়সীর লাজে রক্তিম চেহারা টা সে খুজছে।
হঠাৎ আকাশের পানে তাকিয়ে আরিফ বলে উঠলো: প্রেয়সী আমি তোমাকে চাই। সবসময় চাই। জানিনা আমাদের কখনো মিলন হবে কিনা। কিন্তু মৃত্যুর পরেও আমার হৃদয় থেকে ভালোবাসা একটুও কমবে না। তার পরও যদি আমি তোমাকে না পাই, তুমি আমার হৃদয় থেকে একটুও বিচ্ছিন্ন হবে না। বাস্তবে না হও, কল্পনাতে তুমি শুধু আমার।
বেলা বারোটা বাজে। মেঘ রুমে গিয়ে আবিরের শান্ত মুখের পানে তাকিয়ে আছে। এই ঘুমন্ত পুরুষটি একান্তই মেঘের ব্যক্তিগত পুরুষ। হঠাৎ আবির চোখ বন্ধ রেখে বলে উঠলো: বউ….এভাবে তাকিয়ো না প্লিজ।আমার লজ্জা লাগে।
মেঘ চোখ সরিয়ে নিল আর বলল: বেলা বারোটা বাজে এবার তো জেগে উঠুন আমি মিমের রুমে যাচ্ছি রেডি হতে। আপনি উঠে নামাজে যান। বলেই মেঘ চলে গেল।
আবির অবাক। যাহ….এর আবার কী হলো? আমার লজ্জা লাগলে কী আমি বলতেও পারবো না। এই জন্যই লোকেরা বলে,, “বউয়ের মন বোঝা, নয়রে নয় সোজা”
বলেই আবির তোয়ালে কাঁধে তুলে গোসলে ঢুকলো।
মিম আর মেঘ সাজতে বসেছে। পুরো ঘর এলোমেলো করে নিয়েছে। তখনই রুমে আদি ঢুকলো। বলল:তোমরা কী করছো?
মিম:কেন?
আদি:আম্মু বলেছে আজকে রেডি হতে দেরি হলে রেখে চলে যাবে।
মিম:তুই কী আমাদের এটা বলতে এসেছিস নাকি অন্যকোনো মতলবে?
আদি:না..মানে… আসলে তোমাকে দেখতে এলাম।
মিম:দেখা শেষ? তাহলে এখনি বের হয়ে যা রুম থেকে।
আদি: ভাবছি।
মিম:কী?
আদি:তোমাকে তেঁতুল গাছের পেত্নীর মতো লাগছে। শেওড়া গাছের ও।
মিম:আদির বাচ্চা…. আদি……
বলেই মিম চিৎকার দিল। আদি ছুটে বো দৌড়।
মিম: কাঁদো কাঁদো হয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। আপু তুমি আদিকে কেন কিছু বললে না? ও..আমাকে তেঁতুল গাছের পেত্নী বলেছে।
মেঘ: শেওড়া গাছের পেত্নী ও বলেছে। সেটা কেন বলছিস না?
মিম:আপু..তুমিও…
মেঘ মিমের রাগ বুঝতে পেরে বললো
সুন্দর লাগছে মিম মনে হচ্ছে রাজকন্যা রাজকন্যা ভাব, শুধু
একটা রাজপুত্রের অভাব!
মাত্র SSC দিয়ে কলেজে ওঠা কিশোরীর মনে আবেগের সাদা মেঘ উড়ে আজকাল। শাড়ি অপছন্দ করা মেয়েটাও এখন শাড়ি দেখলে তাকিয়ে থাকে। চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক পড়ে। মাঝে মাঝে ললাটের নিচে দু’ব্রু জুগলের মাঝে ছোট্ট একটা টিপ পরে নিজেকে সাজিয়ে নেয়। মেঘের মুখে রাজপুত্রের কথা শুনে লাজে রাঙা হয়ে উঠেছে তার চোখ মুখ। মুহূর্তেই ভেসে উঠলো সকালের স্মৃতি। যে স্মৃতি পুড়ো অস্তিত্ব জুড়েই আরিফ।
হঠাৎ নিচ থেকে সবার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
মেঘ বলল: মিম তুই আয়। আমি নিচে যাই।
সবার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সবাই রেডি হয়ে নিচে এসে গেছে।
মিম:আচ্ছা যাও।বলেই মিম আয়নার সামনে নিজেকে দেখছে।
আর মনে মনে বলছে.. মনে হচ্ছে কী যেনো নেই।
হঠাৎ এক গম্ভীর সুর ভেসে এলো ” কপালে টিপ আর চুলে একটা ফুল”।
আকস্মিক ঘটনায় মিম হতচকিয়ে গিয়ে গেল।
সামনে তাকালে দেখল তার পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে তার চুলে একটি গোলাপ আটকে দিচ্ছে। যার প্রতিবিম্ব আয়নার সুস্পষ্ট। মিম ভুত থাকার মত চমকে গেল কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল:আপনি.. এখানে…?
আরিফ ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে একটা টিপ নিয়ে মিমের কপালে পড়িয়ে দিয়ে বলল:” নাও পারফেক্ট”
মিম হঠাৎ শক্ত কণ্ঠে বলে উঠলো: আপনি এখানে কি করেন?
আরিফ: অনেকদিন হলো তোমার সাথে ঝগড়া করি না। তাই তোমাকে মিস করছিলাম।
মিম: আমাকে মিস….???
আরিফ:নাহ…. তোমার ঝগড়াকে। আমার বয়েই গেছে তোমার মত ঝগড়াটে মেয়েকে মিস করতে।
মিম গার্ল ফুলিয়ে হন হন করে ছুটে গেল নিচের দিকে। আরিফ তাকিয়ে আছে মিমের যাওয়ার পানে।
মিমের পায়ের নুপুরের শব্দ যেন তার মনে ঝড় তুলছে বারংবার। আজ মেয়েটাকে একটু বেশি বড় বড় লাগছে। পরনে ভাড়ী লেহেঙ্গা,দুহাত ভরা চুরি, হাতে মেহেদি, চোখে কাজল, খোলা চুলে রক্তিম গোলাপ, কপালে ছোট্ট একটা টিপ। আরিফ এর কাছে সৌন্দর্যের আরেক নাম মিম। মিম নিচে চলে আসলো। দেখলো সবাই রেডি।
বাড়ির ছেলেরা জুম্মার নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরলে সবাই রওনা হবে তানভীরের বরযাত্রী হয়ে। মেঘ আজ একটু বেশি সেজেছে। তার একমাত্র ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা। হঠাৎ বাড়ির মেইন গেটে চোখ যেতেই দেখল, সবাই নামাজ পড়ে ফিরছে। কিন্তু আবির ভাই কই? তাকে কোথায় দেখা যাচ্ছে না কেন??
মেঘের মনটা সহসাই খারাপ হয়ে গেল। মেঘ এতক্ষণ অপেক্ষায় ছিল। বাড়ি ফিরলেই বলবে: আহিয়ার আব্বু আমাকে কেমন লাগছে বলুন তো?
কিন্তু তিনি কোথায়?
হঠাৎ বাইকের শব্দে মেঘের হুশ ফিরলো।
দেখলো আবির হেলমেট খুলে বাইকটি পার্ক করছে। তার হাতে ছোট একটা শপিং ব্যাগ।
আবির বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখল, বাড়ির মেয়েরা রেডি। আর ছেলেরা সবাই যে যার মতন
নামাজ পড়ে এসে রেডি হয়ে নিচ্ছে।
মালিহা খান: কিরে আবির… এতক্ষন কোথায় ছিলি??
আবির: আম্মু, একটা কাজ ছিল। নামাজের পর সেখানেই গিয়েছিলাম।
মালিহা খান : আচ্ছা…ওপরে যা… রেডি হয়ে নে।
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৩+৪
আবার ওপরে গিয়ে দুই মিনিটের মাথায় মেঘ কে ডাকছে মেঘ হন্তদন্ত হয়ে ছুটল সেদিকে।
এটা দেখে বাড়ির বড়রা মুচকি হাসলো।
হালিমা কান্ত বলেই উঠলো: এদের দেখলে মনটা জুড়িয়ে যায়।
