Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১১

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১১

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১১
সাবিলা সাবি

জঙ্গলের গহীনে হিয়া পাগলের মতো খুঁজছে লিওনকে। প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে এক একটা যুগের মতো মনে হচ্ছে। দুশ্চিন্তায় তার দম আটকে আসছে, বুকটা ধড়ফড় করছে লিওন কি বিপদে পড়ল? তার কি কিছু হয়ে গেল?
দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে সমুদ্রের ধারের বালিয়াড়িতে আসতেই হিয়া থমকে দাঁড়াল। সামনেই লিওন। শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে কারো সাথে কথা বলছে।
হিয়াকে দেখতে পেয়ে লিওন ফোনের কথা শেষ করে ঘুরে তাকাল। হিয়া সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; তার কণ্ঠনালিতে শব্দ আটকে আছে। লিওন কিছুটা এগিয়ে এসে মৃদু স্বরে বলল, “সরি, তোমাকে না বলে চলে এসেছি। আসলে টং হাউজের ভেতর নেটওয়ার্ক একেবারেই ছিল না, তাই সিগন্যালের খোঁজে এখানে এসেছি। ফাইনালি রেসকিউ টিমকে রিচ করতে পেরেছি। তারা রাতে খুঁজে না পেলেও এখন আমাদের লোকেশন পেয়ে গেছে। খুব শীঘ্রই স্পিডবোট চলে আসবে আমাদের উদ্ধার করতে।”

লিওনের কথাগুলো বাতাসের মতো হিয়ার কানের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু তার মস্তিষ্কে কোনো অর্থই তৈরি হচ্ছে না। সে শুধু দেখছে লিওনকে যার নিঃশ্বাস পড়ছে স্বাভাবিকভাবে আর চোখের দৃষ্টিতে এখনো সেই শান্ত রহস্য। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সবকিছু ধুলোয় মিশে গেছে আর হিয়ার সমস্ত যুক্তি ও নিয়ন্ত্রণ এক লহমায় ভেঙে পড়ল।
হঠাৎ এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে বসল হিয়া। কোনো কিছু না ভেবেই এক দৌড়ে গিয়ে লিওনকে জাপটে ধরল সে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার গলা। হিয়ার মনে হলো, লিওনকে শরীরের বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে না রাখলে সে হয়তো এই মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। এই নিবিড় আলিঙ্গনের মাঝে হিয়া খুঁজে পেতে চাইলো তার অস্তিত্বের সবটুকু আশ্রয়।
আচমকা এই ধাক্কায় লিওন টাল সামলাতে না পেরে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। তার দুচোখে তখন তীব্র বিস্ময়। সে কি হিয়াকে ছাড়িয়ে নেবে, নাকি এই অসহায় আবেগের কাছে নিজেকে সঁপে দেবে—ঠিক করতে পারল না। লিওন স্তব্ধ হয়ে রইল; হিয়ার এই পাগলাটে আচরণ তাকে এক অদ্ভুত ঘোর আর গোলকধাঁধায় ফেলে দিল।

হিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সরাসরি লিওনের চোখের দিকে তাকাল। তার দুচোখ তখন রাগ, অভিমান আর দুশ্চিন্তায় টলমল করছে। সে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “না বলে কেন এখানে এলে? আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম জানো? এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে পারছিলাম না যে তোমার কিছু হয়ে গেছে! একা একা এই জঙ্গল পেরিয়ে এখানে কেন এলে? কাল রাতে এই জায়গায় কী হয়েছিল, তা কি তোমার অজানা?”
হিয়া রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলতে লাগল, “সিআইডি অফিসার বলে কি এত বেশি দুঃসাহস দেখাতে হবে? জীবনের কি কোনো দাম নেই তোমার? যদি নিজের কাছে দাম না থাকে, তবে শোনো—তোমার জীবন শুধু তোমার একার নয়। ওটা এখন আমারও! আমার অনুমতি ছাড়া এই জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আমি তোমাকে কোনোভাবেই দেব না!”

লিওন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সিআইডি ট্রেনিং তাকে পৃথিবীর যেকোনো বড় ধরনের নাশকতার মোকাবিলা করা শিখিয়েছে, কিন্তু হিয়ার এই তীব্র আবেগের বিস্ফোরণ তাকে পুরোপুরি অপ্রস্তুত করে দিল।
হিয়া এটা কী বলে ফেলল? নিজের কথার গভীরতা আর আবেগের তীব্রতা হঠাৎ করেই হিয়ার নিজের কানে ধাক্কা খেল। সে চমকে উঠল নিজের ওপরই। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, “সরি সিনিয়র, আমি আবেগে অনেক কিছু বলে ফেলেছি। আসলে আমি খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, বড্ড ভয় পেয়েছিলাম তাই।”
কথাটা বলেই হিয়া দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল, তার আবেগাপ্লুত মুখটা সে আড়াল করতে চাইল। লিওন তার দিকে হাত বাড়িয়েও থমকে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে কাছে এল স্পিডবোটের বিকট ইঞ্জিনের শব্দ। রেসকিউ টিম এসে গেছে। উদ্ধারকারীরা বোট থেকে লাফিয়ে নামল, আর সেই কোলাহলের মাঝে হিয়া এবং লিওনের মাঝের নিস্তব্ধতাটা হয়ে উঠল তীব্র।
অবশেষে দুজনেই বোটে উঠল, কিন্তু অদৃশ্য এক বিশাল দেয়াল তখন তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। পুরো যাত্রাপথ কাটল নিস্তব্ধতায়, কেউ কারো দিকে তাকাল না, কোনো শব্দও উচ্চারিত হলো না। রিসোর্টের ঘাটে বোট ভিড়তেই নজরে এল অপেক্ষমান মানুষের ভিড়। লিওনের বাবা-মা, মায়া এবং হিয়ার সহকর্মী ইভানা ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বোট থেকে লিওন নামার সাথে সাথেই মায়া এক ঝটকায় লিওনকে জড়িয়ে ধরল, আর তাদের এই ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখে হিয়ার বুকের ভেতরটা হিংসায় জ্বলে উঠল। রাগে ও অভিমানে সে বোটের লোহার রডটি এমন জোরে চেপে ধরল যে, তার পোড়া হাতের ক্ষতস্থান ফেটে রক্ত বেরোনোর উপক্রম হলো। প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণা ছাপিয়ে হিয়ার মনে তখন ঈর্ষার দহন। ইভানা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করছে; হিয়ার চোখের অসংবৃত আগুন দেখে সে শিউরে উঠল।
মায়া লিওনের বুক থেকে সরে এসে তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর লিওনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বলে উঠল, “প্রতিবার এই মেয়েটাই কেন বিপদে পড়ে? আর তোমাকে কেন প্রতিবার নিজের জীবন বাজি রেখে ওকে বাঁচাতে যেতে হয়?”

হিয়া ধীরস্থিরভাবে বোট থেকে নামলো। তার পদক্ষেপে ছিলো দৃঢ়তা, মুখে কোনো টু শব্দ নেই। মায়া তার দিকে তেড়ে এসে তিক্ত স্বরে বলল, “আপনি কি নিজের খেয়াল রাখতে পারেন না? একজন মেয়রের এতটা অসহায় হওয়া কি সাজে? হতে পরে লিও ভাইয়া সিআইডি অফিসার কিন্তু লিও ভাইয়া এখানে এসেছে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে, ডিউটি করতে নয়। আপনার জন্য কেন সে বারবার নিজের জীবন বাজি রাখবে?”
মায়ার প্রতিটি শব্দই হিয়ার শরীরে কাঁটার মতো বিঁধল। সে মায়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। হিয়ার চাহনিতে কোনো অসহায়ত্ব বা আর্তনাদ নেই, বরং সেখানে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এক শীতল ঘৃণা। হিয়া কোনো কথা বলল না, কিন্তু তার এই নীরবতা এবং পাথুরে চাহনি মায়াকে যেন কোণঠাসা করে ফেলল।
মায়া হিয়ার সেই অগ্নিঝরা চাহনি দেখে মুহূর্তের জন্য কুঁকড়ে গেল, তার কণ্ঠস্বর মাঝপথেই থমকে এল। লিওন অবশ্য তখন তার বাবার সাথে কথা বলায় ব্যস্ত, সেদিকে খেয়ালই নেই। এদিকে হিয়া চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে; দাঁতে দাঁত চেপে মায়ার প্রতিটি অপমান সে হজম করছে ঠিকই, কিন্তু তার মনের গভীরে দানা বাঁধছে এক নতুন, ভয়ানক পরিকল্পনা। সে ভালো করেই বুঝতে পারলো লিওনকে ঘিরে থাকা এই মানুষগুলো এখন তার পথের প্রধান কাঁটা।

রাত তখন গভীর। রিসোর্টের নির্জন ভিলাটায় হিয়া একা। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর উত্তাল সমুদ্রের গর্জন ছাড়া চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে হিয়ার ল্যাপটপ স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা এনক্রিপ্টেড কল—বস দানিয়েল।
হিয়া কলটা রিসিভ করতেই দানিয়েলের শীতল, গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে এল, “গেমে নতুন মোড় নিচ্ছে,ভাইপার। তোমার আসল টার্গেট লন্ডনে পা রাখছে। ‘আয়মান খান’—আগামী দুদিনের মধ্যেই সে হিথ্রো এয়ারপোর্টে নামছে।”
‘আয়মান খান’—নামটা শোনামাত্র হিয়ার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাসপ্রশ্বাস থমকে গেল। অস্ফুট স্বরে তার কণ্ঠে ভেসে এল এক আর্তনাদ, “আয়মান, আমার ছেলেমেয়েকে বাঁচতে দে,প্লিজ আমি হাত জোর করছি তোর কাছে ওদেরকে কিছু করিস না!”

পরক্ষণেই হিয়া নিজেকে সামলে নিল। এই মুহূর্তে ভেঙে পড়া মানেই সব শেষ। সে গভীর শ্বাস নিয়ে নিজের স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেল; সে জানে, এখন দুর্বল হওয়া তার জন্য বিলাসিতা। এবার হিয়ার চোখের মণি তখন সংকুচিত হয়ে এসেছে; তাতে ক্রোধের আগুনের চেয়েও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শিকারকে ছিন্নভিন্ন করার এক পৈশাচিক তৃপ্তি। সে বুঝতে পারল, এই আয়মান খানই এখন তার চূড়ান্ত গন্তব্য। ভাইপার হয়ে ওঠার এই কুটিল যাত্রায় আয়মানই আপাতত তার একমাত্র লক্ষ্য—আর সেই লক্ষ্যভেদ করাই হবে তার প্রতিশোধের প্রধান অস্ত্র।
হিয়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক নিষ্ঠুর হাসি। সে ল্যাপটপের মাইক্রোফোনের কাছে মুখ নিয়ে হিমশীতল কণ্ঠে বলল, “আয়মান খান? খুব ভালো। তাকে স্বাগত জানানোর সব ব্যবস্থা আমি করছি, তবে তার আগে…”

হিয়া জানালার পর্দা সরিয়ে রিসোর্টের আলোকিত লবির দিকে তাকাল। ডিজিটাল ম্যাপের ওপর চোখ রেখেই বললো “আগামীকাল রাতেই ব্লু স্টার ডায়মন্ডটা রিসোর্টের সেফ জোন থেকে আমার হাতে চলে আসবে। সব প্রস্তুতি নেয়া শেষ। ওটা হাতানোর পরেই আমি লন্ডন রওনা হচ্ছি।”
ওপাশ থেকে দানিয়েল ছোট করে শুধু বলল, “বি কেয়ারফুল।”
হিয়া কলটা কেটে দিল। ল্যাপটপের নীল আলোয় তার মুখমণ্ডল এখন পাথরের মূর্তির মতো শীতল দেখাচ্ছে। সে জানে, ব্লু স্টার ডায়মন্ডটা স্রেফ একটা রত্ন নয়, ওটা তার প্রতিশোধের প্রথম ধাপ। আয়মান খানের সাথে পুরনো হিসাব চুকানোর যে সুযোগ সে হাতছাড়া করতে চায় না, তার প্রথম ধাপ শুরু হবে কালকের এই ডাকাতি দিয়ে। সে নিজের অবশ হাতের দিকে তাকাল, কিন্তু এখনকার ব্যথা তার কাছে তুচ্ছ। তার মস্তিষ্কে এখন কেবলই এক নিখুঁত ধ্বংসযজ্ঞের নকশা।
লিওন কটেজের বারান্দায় চুপচাপদাঁড়িয়ে আছে। রাতের সমুদ্রের গর্জন তার কানে ভীষণ অদ্ভুতভাবে ধরা দিচ্ছে এই মুহূর্তে। একটু দূরেই হিয়ার ভিলাটা, সেখান থেকে আসা আবছা আলোটা লিওনের দৃষ্টি আটকে রেখেছে। সে ভাবছে আজ সকালে হিয়াকে নিয়ে ওঠা উত্তাল পরিস্থিতির কথা। বিশেষ করে সমুদ্রের বালুর তীরে হিয়া যেভাবে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল—সেই শক্ত আলিঙ্গনটা, আর তারপর তার সেই তীব্র, আবেগী কথাগুলো—লিওনের বুকের ভেতর এক অস্থির তোলপাড় শুরু করেছে। এমন এক নতুন অনুভূতি, যার সাথে সে আগে কখনো পরিচিত ছিল না।

সিআইডি প্রশিক্ষিত তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক বারংবার সতর্কবার্তা দিচ্ছে যে, এই মেয়েটির চারপাশটা বড় রহস্যময়। অথচ হিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে লিওনের সব যুক্তি ও সতর্কতা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। সেই দৃষ্টিতে এক গভীর মায়াজাল আছে আগে থেকেই যা তাকে সম্মোহিতের মতো টেনে নেয় এক অজানা আবেশে, যার গভীরতা সে আজও পরিমাপ করতে পারেনি।
লিওনের মনে ভেসে উঠল হিয়ার করা সেই অ্যাসাইনমেন্টগুলোর কথা। কাজগুলো দেখার পর সে সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি পয়েন্ট, প্রতিটি এনালাইসিস এতটাই নিখুঁত এবং গভীর ছিল যে, যা কোনো সাধারণ ছাত্রীর পক্ষে করা প্রায় অসম্ভব। হিয়া কি তবে সত্যিই সাধারণ কেউ?
লিওনের মনে হচ্ছে, তার জীবনের সুশৃঙ্খল ছকটা কেউ যেন ইচ্ছে করে ওলটপালট করে দিচ্ছে। এমন অস্থিরতা সে আজ অবধি কখনো অনুভব করেনি। সমুদ্রের পাড়ে হিয়ার চোখের জল আর ভাঙা গলার আকুতিগুলো তার ঠান্ডা মাথার যুক্তিগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। লিওন বুঝতে পারছে না, সে কি হিয়ার মায়ার জালে আটকা পড়ছে, নাকি হিয়া সত্যিই তার জীবনের এক অনিবার্য অংশ হয়ে উঠছে।
বারান্দার নির্জনতা ভেঙে লিওনের পকেটের ফোনটা হঠাৎই কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সিআইডি হেডকোয়ার্টারের জরুরি নাম্বার। লিওন ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে এসিপির গম্ভীর,উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“লিওনার্দো, তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? শহরে বড় ধরনের অঘটন ঘটে গেছে। আজ রাতে একটা হাই-প্রোফাইল মার্ডার হয়েছে, আর তার সাথে যোগসূত্র পাওয়া গেছে বিশাল এক অস্ত্র পাচারের সিন্ডিকেটের। ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে উঠে এসেছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই চালানটা শহরের বর্ডার ক্রস করবে। আমাদের তোমাকে এখনই দরকার।”
লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তার প্রশিক্ষিত মন তৎক্ষণাৎ ব্যক্তিগত সব অস্থিরতা ঝেড়ে ফেলে দায়িত্ববোধে স্থির হলো। সে অটল কণ্ঠে বলল, “আই আন্ডারস্ট্যান্ড,স্যার। কালকেই আমি ফিরছি।”
—”আগামীকাল বিকেলের মধ্যে তোমাকে রিপোর্ট করতে হবে, লিওনার্দো। এটা এখন আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রায়োরিটির।”

লিওন আস্তে করে ফোনটা নামিয়ে রাখল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল রিসোর্টের ঝাপসা আলো, আর সেই সাথে হিয়ার মুখটা। সে কি এখন এই অবস্থায় থাইল্যান্ড থেকে যেতে পারবে? এই অদ্ভুত পরিস্থিতির মাঝে থাইল্যান্ড ছেড়ে যাওয়ার চিন্তাটা তাকে অস্থির করে তুলছে। সে একবার হিয়ার ভিলার দিকে তাকাল, তারপর বাধ্য হয়েই বারান্দা থেকে রুমে ফিরে গেলো।
ভোর হওয়ার আগেই রিসোর্টের বাতাসে এক অস্থির ব্যস্ততা। সিআইডি হেডকোয়ার্টারের জরুরি তলবে লিওন তার ফ্যামিলিকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে রিসোর্ট ছেড়ে রওনা হয়ে গেল। হিয়া তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, সে জানতেই পারল না যে লিওন চলে গেছে। যদিও আপাতত সে তার ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’ হাতানোর মিশনে ব্যস্ত; আজ রাতেই এই মূল্যবান পাথরটি নিয়ে সে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।
থাইল্যান্ডের রথ আইল্যান্ড রিসোর্টের গ্র্যান্ড হলরুমটা আজ আলোয় ঝলমল করছে, কিন্তু বাতাসে কেমন একটা গুমোট উত্তেজনা ভাব। এটা সাধারণ কোনো পার্টি নয়, বরং বিশ্বের ক্ষমতাধর আর প্রভাবশালীদের জন্য আয়োজিত এক গোপন নিলামের আসর। হলরুমের ঠিক মাঝখানে বুলেটপ্রুফ শোকেসের ভেতর বন্দী ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’টা। নীল মখমলের ওপর বসানো পাথরটা থেকে ঠিকরে বেরোনো আলো যেন মরীচিকার মতো হাতছানি দিচ্ছে উপস্থিত কোটিপতি সংগ্রাহক আর চোরাকারবারীদের। সবার চোখে সেখানে লোভ আর লালসার স্পষ্ট ছাপ।

ভিড়ের ঠিক একদম কোণটায় দাঁড়িয়ে ইভানা আর হিয়া—দুজনেই গাঢ় রঙের ককটেল গাউনে আবৃত, যা তাদের অবয়বকে হলরুমের ছায়ার সাথে একীভূত করে ফেলেছে। হিয়ার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা এক চিলতে রহস্যময় হাসিই বলে দিচ্ছে সে এখানে সাধারণ কোনো দর্শক নয়। তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ ওই ডায়মন্ডের ওপর। এক গভীর শিকারি যেমন তার লক্ষ্যবস্তুকে পরখ করে নেয়, হিয়া ঠিক তেমন করেই পাথরটার দিকে তাকিয়ে আছে, ওটা এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা, শিকার তার হাতের মুঠোয়।
পার্টি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই হিয়ার চোখের ইশারায় ইভানা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ভেন্টিলেশন কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে সে ডিজিটাল সিস্টেমটি অকেজো করে দিল। কিন্তু ধোঁয়া বেরোনোর বদলে হলরুমের এয়ার কন্ডিশনার থেকে বেরিয়ে এল অতি সূক্ষ্ম একধরণের রাসায়নিক কুয়াশা।
সেকেন্ডের ব্যবধানে পুরো হলরুমটা এক প্রকার রহস্যময় ধূসর স্তরে ঢেকে গেল। এটা কোনো সাধারণ ধোঁয়া নয় বরং এটা লেজার সেন্সরগুলোকে অকার্যকর করার এক ধরনের বিশেষ গ্যাস। ধোঁয়ার ঘনত্ব বাড়ার সাথে সাথে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অ্যালার্মগুলো এক মুহূর্তের জন্য অস্পষ্ট হয়ে গেল। আর ঠিক সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগেই হিয়া নিজের আসল খেলাটা শুরু করল। চারিদিকে তখন ভিআইপি অতিথিদের হুড়োহুড়ি আর চিৎকার। কেউ বুঝতেই পারল না, আলোর এই ধোঁয়াটে আবহে কে কার সাথে ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর কার লক্ষ্য স্থির হয়ে আছে ওই কাঁচের শোকেসটির ওপর।

পুরো হলরুম যখন ধোঁয়ার চাদরে ঢেকে গেল, হিয়া বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সক্রিয় হয়ে উঠল। ইভানার তৈরি করা ওই কয়েক সেকেন্ডের অন্ধকারের সুযোগ সে এক মুহূর্তের জন্যও নষ্ট করল না। শোকেসের সামনে পৌঁছে পকেট থেকে বের করে নিল কাঁচ কাটার বিশেষ সরঞ্জাম। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড—ঠিক তিন সেকেন্ডের মাথায় কাঁচের শোকেসটি নিঃশব্দে সরিয়ে সে ভেতরে হাত ঢোকাল। অতি সাবধানে আসল ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’টি নিজের কবজায় নিয়ে তার জায়গায় বসিয়ে দিল অবিকল দেখতে একটি নকল পাথর।
কেউ টেরও পেল না। হিয়া দ্রুত তার গাউন থেকে গ্লাভস জোড়া খুলে পকেটে পুরে নিল। এরপর ঠিক সেই ধোঁয়ার মাঝখানেই সে মেঝেতে এলিয়ে পড়ল, শ্বাসকষ্টে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছে বোঝাতে।
হলের ভেতর তখন চরম বিশৃঙ্খলা। ধোঁয়া কিছুটা পাতলা হতেই নিরাপত্তা কর্মীরা চারপাশ ঘিরে ফেলল। হিয়া ধুলোমাখা মেঝেতে সাধারণ একজন অতিথির মতো নিথর হয়ে পড়ে আছে—তার চোখের পলকও কাঁপছে না। আসলে হিয়াতো শোকেসটি ভাঙেনি। ধোঁয়ার আড়ালে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ‘গ্লাস কাটার’ ব্যবহার করে সে কাঁচের একটি অংশ কেটে সরিয়েছিল। কাজ শেষ হতেই সে আলগা অংশটি এমনভাবে বসিয়ে দেয় যে, ওপর থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না সেটি কাটা।
নিরাপত্তা কর্মীরা যখন শোকেসের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল, তাদের নজরে এল কাঁচের ওপরের দিকটা একটু আলগা। একজন চিৎকার করে বলে উঠল, “ডায়মন্ডটা এখনো ভেতরেই আছে! মনে হচ্ছে চোর অ্যালার্মের ভয়ে কাজ শেষ করতে পারেনি!”

হিয়া চোখ বন্ধ করে মনে মনে হাসল। তারা মনে করল ধোঁয়ার প্রচণ্ডতায় চোর আতঙ্কিত হয়ে পালিয়েছে। আসল ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’ তখন হিয়ার গাউনের ভেতরে লুকানো গোপন পকেটে। সিকিউরিটি টিম যখন আতঙ্কিত হয়ে হীরাটি উদ্ধার করার জন্য বিশেষ গ্লাভস পরা শুরু করল, তারা ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে, তারা আসলে একটা সাধারণ কাঁচের নকলকে ‘আসল’ ভেবে পরম যত্নে স্পর্শ করছে। হিয়া জানে, হীরা উদ্ধার হয়েছে ভেবে তারা আর পুরো রিসোর্ট লকডাউন করবে না—এটাই তার পরিকল্পনার মাস্টারস্ট্রোক।
হিয়া ধীরস্থিরভাবে তার গাউনের ভাঁজে হাত দিয়ে নিশ্চিত হলো সব ঠিক আছে। এরপর সে তার অভিনয় শুরু করল। কয়েকবার জোরে জোরে কাশি দিল, যেন দীর্ঘক্ষণ ধোঁয়া আর গ্যাস সহ্য করতে না পেরে তার জ্ঞান ফিরছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক অতিথি আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল, “এই যে ম্যাডাম, আপনার জ্ঞান ফিরছে? এই তো, ডাক্তার আসছে!”

হিয়া ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে এখন আর কোনো শিকারি সত্তার তীক্ষ্ণতা নেই, আছে কেবল এক বিধ্বস্ত নারীর অসহায় ভঙ্গি। সে জানে, এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে বেরোনোর এটাই সেরা সময়। সে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি পড়ল দরজার দিকে—যেখানে ইভানা নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। ইভানার চোখে চোখ পড়তেই এক পলকের জন্য হিয়ার ঠোঁটে খেলে গেল এক ম্লান হাসি। কারো নজরে পড়ার আগেই হিয়া ধীর পায়ে ভিড়ের মাঝখানে মিশে যেতে শুরু করল। আজ রাতের এই ভয়াবহ জুয়ায় সে শুধু জয়ীই হয়নি, বরং সসম্মানে রিসোর্ট থেকে বেরোনোর রাজপথও তৈরি করে নিয়েছে।
পরের দিন সকালবেলা। থাইল্যান্ডের রথ আইল্যান্ড রিসোর্টের গ্র্যান্ড হলরুম এখন পুলিশের কড়া নজরদারিতে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, কারণ ভল্টের সিসিটিভি ফুটেজ পুরোই ব্ল্যাঙ্ক। শুধু ধোঁয়া আর বিশৃঙ্খলার কয়েক সেকেন্ড ছাড়া বাকি সব ফাইল ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে—পুরো ডিজিটাল সিস্টেম হ্যাক করা হয়েছে গত রাতেই।

তদন্তকারী অফিসার ভল্টের কাঁচের শোকেসটি পরীক্ষা করতে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। গ্লাভস পরে পাথরটি হাতে তুলতেই তার মুখ ফ্যাসে হয়ে গেল। এটা হীরা নয়, নিখুঁত কাঁচের কারুকাজ! আর ঠিক তখনই শোকেসের ভেতর থেকে পাওয়া গেল ছোট একটি চিরকুট—যা ভাইপারের ট্রেডমার্ক। ছোট সেই কাগজের টুকরোয় কালির আঁচড়ে খুব নিখুঁতভাবে আঁকা একটি সাপের ট্যাটু, যা দেখামাত্রই গোয়েন্দারা নিশ্চিত হলো, পুরো রিসোর্টকে বোকা বানিয়ে এই ডাকাতি করেছে কুখ্যাত ক্রিমিনাল ‘ভাইপার’।
পুরো প্রশাসন এখন নড়েচড়ে বসেছে। চারিদিকে রেড অ্যালার্ট, প্রতিটি বন্দর আর চেকপোস্টে ভাইপারের ডাকাতির কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ যখন পুরো দেশ শহর বেড়াচ্ছে, ততক্ষণে হিয়া আর ইভানা অনেক দূরে।
কাল রাতে যখন রিসোর্টে হইচই তুঙ্গে ছিল, তখনই হিয়া খুব সাধারণ একজন অতিথির বেশে বেরিয়ে এসেছিল। কোনো সন্দেহ বা আতঙ্ক ছাড়াই সে দানিয়েলের পাঠানো প্রাইভেট জেটে উঠে বসেছিলো।

||বাংলাদেশ, ঢাকা ||
ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশানে আসাদ খানের বিশাল অট্টালিকার ভেতরটা গুমোট পরিস্থিতি তে। এসির হাড়কাঁপানো ঠান্ডাতেও আসাদ খানের কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তার সামনে বসে থাকা ছেলে আয়মানের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ। টেবিলে রাখা ল্যাপটপে ব্লু স্টার ডায়মন্ড ডাকাতির খবরটি বারবার স্ক্রল করছে।
আসাদ খান ওয়াইনের গ্লাসে মৃদু চুমুক দিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “ব্লু স্টার ডায়মন্ডটা আমার হাতে আসার কথা ছিল, আয়মান। ওটা আমার দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, আমার সাম্রাজ্যের ভিত্তি। কিন্তু ওই কুখ্যাত ক্রিমিনাল ‘ভাইপার’ এসে সব মাটি করে দিল।”
আয়মানের দৃষ্টি ল্যাপটপের স্ক্রিনে থাকা সেই সাপের ট্যাটুর ছবিটার দিকে। সে অস্থিরভাবে বলল, “গোয়েন্দাদের নজর এখন থাইল্যান্ডের দিকে। তারা যদি জানতে পারে ওই ডায়মন্ডের আসল মালিক আমাদের পরিবারের কেউ, তবে পুরো তদন্ত আমাদের ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত চলে আসবে।”
গ্লাসটি টেবিলে রেখে আসাদ খান ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিলেন, “ভাইপারকে খুঁজে বের করো। আইনের হাত পৌঁছানোর আগেই তাকে আমাদের কবজায় চাই। নিজের সম্পদ চোর ডাকাতদের হাতে তুলে দিয়ে বসে থাকার মতো দুর্বল আমি নই।”

ছেলে আয়মান খানের চোখজোড়া রাগে জ্বলছে। সে হাতের মুঠো শক্ত করে টেবিলে একটা বাড়ি মারল, “বাবা, ভাইপার যে সাধারণ কেউ নয়, তাতো বোঝাই যাচ্ছে। রিসোর্টের সিকিউরিটি, সিসি ক্যামেরা সবকিছুর ভেতরে ঢুকে সে ডায়মন্ডটা গায়েব করেছে। ও যে কোনো ছোটখাটো চোর নয়, রীতিমতো প্রফেশনাল, এটাতো পৃথিবীর সবাই জানে।”
আসাদ খান চিন্তিত ভঙ্গিতে জানালার বাইরে তাকালেন। শহরের রাতের আলোর দিকে তাকিয়ে তার গলার স্বর আরও নেমে এল, “পুলিশ আর সিআইডি তো ওর পিছু নিয়েছেই। কিন্তু আমাদের ভয় অন্য জায়গায়, আয়মান। যদি ভাইপার জানে যে এই ডায়মন্ডের আসল মালিক আমরা, তবে সে আমাদেরও টার্গেট করতে পারে।”

আয়মান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীর গলায় বলল, “তাহলে আমাদের কি এখন আত্মরক্ষার চেয়ে আক্রমণাত্মক হতে হবে? রিসোর্ট থেকে সে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু তার গন্তব্য এখনও অজানা। আমাদের নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে যেকোনো মূল্যে তার লোকেশন ট্র্যাক করতে হবে।”
আসাদ খান ঘুরলেন। তার চোখে এখন হিসেবি এক ঠান্ডা আগুন। “শুধু ট্র্যাক করলে হবে না, আয়মান। তাকে এমনভাবে কোণঠাসা করতে হবে যেন সে নিজেই আমাদের দরজায় এসে হীরাটা ফিরিয়ে দিয়ে যায়। মনে রাখিস, ভাইপার আমাদের নাম শুনলে যেন আতঙ্কে কাঁপে।”
আয়মান সোজা হয়ে বসল। তার কণ্ঠে এখন সংকল্পের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। “বাবা, হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় ফুরিয়েছে। আজকের ফ্লাইটেই আমি লন্ডন রওনা হচ্ছি। ভাইপার এই মুহূর্তে কোনো ডার্ক মার্কেটের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডায়মন্ডটি হাতবদল করার পাঁয়তারা করবে। সিআইডির তদন্ত গন্তব্যে পৌঁছাক বা না পৌঁছাক, তার আগেই আমাদের শিকারে নামতে হবে। আমাদের যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার চড়া মাশুল ওকে গুনতে হবে।”

আসাদ খান তার ছেলের চোখের দিকে তাকালেন। এই অভিযানের ভয়াবহতা সম্পর্কে তিনি সচেতন, কিন্তু ব্লু স্টার ডায়মন্ড এখন তাদের আভিজাত্য আর অস্তিত্বের শেষ সীমা। কণ্ঠস্বর নিচু করে তিনি সতর্ক করলেন, “সাবধানে। মনে রাখিস, ভাইপার কোনো সাধারণ সাপ নয়, ও একটা বিষাক্ত ফণা।”
আয়মান উঠে দাঁড়িয়ে জ্যাকেটের কলার তুলল। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। আয়মান জানে না, সে যাকে বিনাশ করতে সুদূর লন্ডনে পাড়ি জমাচ্ছে, সেই ভাইপার ঠিক এই মুহূর্তে লন্ডনের এক আড়ালে বসে তাদের বিশাল সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ করার চূড়ান্ত ছক কষছে। ভাইপারের ওই সাপের চিহ্নের নিচে জমে আছে বহুকালের সঞ্চিত এক তীব্র প্রতিশোধের আগুন, যা আয়মানদের বংশের অস্তিত্বের ভিতটাই চুরমার করে দেবে।

বিমানের জানালা দিয়ে মেঘের জমাট স্তূপের দিকে তাকিয়ে হিয়া এক রহস্যময় হাসি হাসল। তার চোখের দৃষ্টি এখন সাপের মতোই স্থির আর তীক্ষ্ণ। পাশের সিটে ইভানা ঘুমাচ্ছে, কিন্তু হিয়ার চোখে কোনো তন্দ্রা নেই। তার হাতের মুঠো আলতো করে ব্যাগটিকে জাপটে আছে যার ভেতরে লুকিয়ে আছে সেই ব্লু স্টার ডায়মন্ড। এই রত্নটি এখন কেবল কোনো মূল্যবান সম্পদ নয়, বরং আসাদ খান এবং আয়মান খানকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে টেনে নেওয়ার জন্য এক অমোঘ টোপ।
লন্ডনের আকাশ ক্রমেই কাছে আসছে। হিয়ার মনে কোনো সংশয় নেই, বরং রয়েছে শীতল তৃপ্তি। এত বছরের প্রতিশোধ নেওয়ার যে পরিকল্পনা সে বুনেছিল, তা এখন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে। সে জানে, আয়মান তাকে খুঁজে বেড়াবে, লন্ডনের অলিগলিতে হন্যে হয়ে ঘুরবে—আর সেই খোঁজাখুঁজিই তাকে নিয়ে আসবে ধ্বংসের ঠিক দোরগোড়ায়।
সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, “এসো আয়মান খান, ভাইপার তোমাকে স্বাগত জানাতে তৈরি। এই ব্লু স্টার ডায়মন্ডটা আমি শুধু হাতানোর জন্য চুরি করিনি; এটা হচ্ছে গভীর জলে থাকা বড় মাছকে ডাঙ্গায় তোলার একটা বর্শি মাত্র।”

—”আমার উদ্দেশ্য এই পাথরটা নয়, আয়মান। আমার উদ্দেশ্য তোমাকে এই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। তোমার বাবা আর তুমি যে সাম্রাজ্য গড়েছ, তার ভিত্তিই ছিল পাপের ওপর। আর পাপের শাস্তি তো পেতেই হয়, তাই না আয়মান খান?”
হিয়া মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল। বিড়বিড় করে সে অন্ধকার আকাশকে লক্ষ্য করে বলল, “সিআইডির হাতে ধরা পড়া? ওসব অনেক পরের বিষয়। আগে তোদের চারজনকে আমি শেষ করব। প্রতিটি অহংকার চূর্ণ করব, প্রতিটি স্বপ্ন ধূলিসাৎ করব। তারপর… তারপর নাহয় আমার পরিণতি আমি নিজেই বেছে নেব।”
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল অতীতের সেই ধ্বংসস্তূপ। হিয়ার হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের স্তূপ এখন এক উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি, যা মুহূর্তেই সবকিছু ভস্মীভূত করতে প্রস্তুত।
—”তোদের নরকের দরজায় না পাঠানো পর্যন্ত আমার পরিবারের আত্মা শান্তি পাবে না, খোদা আমাকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলেননি, তিনি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে তোদের আজরাইল হিসেবে। আসাদ খান, আয়মান খান… তোদের ঘড়ির কাঁটা আর চলবে না, সময় ফুরিয়ে আসছে।”
লিওনের অফিসের ডেস্কে তখন ফাইলের পাহাড়। সিআইডি হেডকোয়ার্টারের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়ংকর তথ্য। অস্ত্র পাচার আর হাই-প্রোফাইল খুনের প্রতিটি সুতোর জট একটা নির্দিষ্ট দিকেই নির্দেশ করছে। লিওন গভীর মনোযোগ দিয়ে অডিও রেকর্ড আর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছিল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই রহস্যময় নাম

“দানিয়েল”…..
এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত মাস্টারমাইন্ড দানিয়েল, যাকে আজ পর্যন্ত কেউ সামনাসামনি দেখেনি। অথচ অদৃশ্য সুতোয় সে পুরো অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। লিওন ফাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর শক্ত করে চাপ দিল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে বুঝতে পারছে, কেবল খুনি বা অস্ত্র চোরাকারবারিদের ধরলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
তদন্তের গভীরে যেতেই লিওন আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পেল—এই দানিয়েল শুধু অস্ত্র পাচারকারীদের বস নয়, সে সরাসরি ভাইপার এর মতো ক্রিমিনালের মেন্টর বা বস। অর্থাৎ, ভাইপার যা কিছু করছে, তার পেছনে আসলে এই দানিয়েলেরই অদৃশ্য হাত আছে।
লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, ভাইপারকে পাকড়াও করা মানেই এই বিশাল অপরাধ জগতের সদর দরজা খুলে দেওয়া। আর দানিয়েলকে যদি একবার কব্জা করা যায়, তবে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাবি চলে আসবে সিআইডির হাতে। লিওন নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “তুমি যেখানেই থাকো দানিয়েল, তোমার ছায়া আমি ঠিকই খুঁজে বের করব। আজ পর্যন্ত কেউ তোমার নাম পর্যন্ত জানতো না অথচ অফিসার লিওনার্দো ঠিকই তোমার নাম বের করতে পেরেছে আর তোমাকেও বের করতে পারবে।”
সময় ফুরিয়ে আসছে, আর দানিয়েলকে ধরা মানেই পুরো অন্ধকার জগতের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেওয়া।
বিকেল বেলা। অফিসের জরুরি ফাইলগুলো টেবিলে রাখতেই ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে মায়ের আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো “লিওন, বাবা জলদি আয়! তোর বাবার শরীর খুব খারাপ, তিনি স্ট্রোক করেছেন!”

ফোনটা হাত থেকে প্রায় খসে পড়ল লিওনের। পেশাদার জীবনের সব সতর্কতা, সেই ঠান্ডা মস্তিষ্কের গোয়েন্দা সবকিছু এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কোনো কিছু না ভেবেই সে দৌড়ে পার্কিং লটে গেল। ড্রাইভ করার সময় তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে ছিল স্টিয়ারিং হুইলে। অফিসের ব্যস্ততা, দানিয়েলের রহস্যর জট সবকিছু এখন তার কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছে।
হাসপাতালের করিডোরে পা রাখতেই এক অসহ্য বিষণ্ণতা লিওনকে গ্রাস করল। চারপাশে উৎকণ্ঠা আর চাপা কান্নার রোল। যে মানুষটি আজীবন পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন, তিনি এখন আইসিইউ-এর কাঁচের ওপাশে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। মা আর মায়ার অঝোর কান্নার শব্দ সেই নিস্তব্ধতাকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তুলছে। লিওন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যার আদর্শে সে নিজেকে গড়েছিল, সেই বটবৃক্ষতুল্য মানুষটিকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখে তার নিজের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এল। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন মানুষটাও যে কতটা অসহায় হতে পারে, তা আজ নতুন করে অনুভব করল লিওন।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এসে জানালেন, “ভয় নেই, স্ট্রোকটা খুব মৃদু ছিল। কিন্তু ওনার শরীর খুবই দুর্বল। তাকে কোনোভাবেই কোনো স্ট্রেস বা মানসিক চাপের মধ্যে রাখা যাবে না। মনে রাখবেন, দ্বিতীয়বার অ্যাটাক হলে তার জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”

লিওন ভেতরে ঢুকে বাবার শিয়রে বসল। আর্থার হায়াস ধীরগতিতে চোখ খুললেন। ছেলের হাতের ওপর হাত রাখলেন তিনি। কথা বললেন খুব কষ্টে, “লিওন, আমার শরীরটা বোধহয় আর বেশিক্ষণ সাথ দেবে না। আমি মৃত্যুর আগে একটা শেষ ইচ্ছা পূরণ হতে দেখে যেতে চাই।”
লিওনের বুকটা কেঁপে উঠল। সে মাথা নিচু করে বলল, “বাবা, এসব কী বলছ? তুমি একদম সুস্থ হয়ে উঠবে।”
আর্থার হায়াস কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “আমি আর সময় নিতে পারছি না। মায়া তোমার বাবার ছায়ার মতোই বড় হয়েছে, ও তোমাকে অনেক ভালোবাসে। আমি চাই, এই সপ্তাহেই তোমাদের বিয়েটা সম্পন্ন হোক। আমি আমার চোখের সামনে তোমাদের দুজনকে এক হতে দেখে যেতে চাই।”
মায়া আর লিওনের মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ার চোখে তখনো জল, কিন্তু লিওনের বাবার কথায় সে নতুন আশা খুঁজে পেল। লিওন তার বাবার ম্লান মুখের দিকে তাকাল। তার সিআইডি ডিউটি, লন্ডনের মিশন, ভাইপারের রহস্য—সব এক মুহূর্তের জন্য ঝাপসা হয়ে গেল। সে জানে, বাবা এখন এমন এক অবস্থায় আছেন যে, তাকে ‘না’ বলা মানে তার ওপর আরও বড় মানসিক চাপ সৃষ্টি করা। লিওন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাবার চোখের সেই করুণ আর্তি তাকে আর কিছু ভাবতে দিল না।
লিওন শক্ত করে বাবার হাতটা চেপে ধরে ধীর কণ্ঠে বলল, “ঠিক আছে বাবা, তুমি যা চাইবে তাই হবে। এই সপ্তাহেই বিয়ে হবে।”

মায়া আর তার মায়ের মুখে সেই মুহূর্তে অদ্ভুত এক স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। লিওন হাসপাতালের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। সে কথা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মনে হলো, এক অদৃশ্য শিকল তার দুই হাত বেঁধে ফেলল। তার জীবনের গন্তব্য কি এখন শুধুই এই সংসার, নাকি ভাইপার আর দানিয়েলের ওই অন্ধকার দুনিয়া? সে জানে না, তার এই সম্মতি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল নাকি সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা।
এদিকে লন্ডনে ফিরেই টাউন হাউসে বসে আছে হিয়া। ল্যাপটপের স্ক্রিনে আয়মান খান এবং আসাদ খানের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে সে। তার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফাইল, ম্যাপ আর কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত গ্যাজেট। ইভানা এক কাপ কফি নিয়ে ঘরে ঢুকে হিয়ার গম্ভীর মুখের দিকে তাকাল। সে নিচু স্বরে বলল, “মিস্ট্রেস, পরিস্থিতি তো বদলে গেল। এখন তো আপনি প্রতিশোধের নেশায় আছেন, তাহলে কি অফিসার লিওন আপনার লিস্ট থেকে আপাতত বাদ?”

হিয়া স্থির দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে কোনো নড়াচড়া না করেই শীতল কণ্ঠে বলল, “কে বলেছে ও বাদ? লিওন আমার ডিকশনারি থেকে কোনোদিন বাদ হবে না।”
ইভানা কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। হিয়া তার ল্যাপটপটা বন্ধ করে ঘুরে তাকালো তার চোখে ফুটে উঠলো উজ্জ্বলতা, হিয়া একটু হেসে বলল, “কিছুদিনের মধ্যেই আমি হিয়া হয়েই ওকে প্রপোজ করব।”
ইভানা অবাক হয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “আপনি বলছেন কী! প্রপোজ করবেন? বাহ! এই প্রথম মনে হচ্ছে কোনো মেয়ে আগেভাগে প্রপোজ করছে কোনো ছেলেকে। মিস্ট্রেস আপনি এত রোমান্টিক কীভাবে?”
হিয়া তার সাদা ফ্রেমের চশমাটা ঠিক করতে করতে বাঁকা হাসল। একদম শান্ত গলায় সে উত্তর দিল, “কারণ আমার আইডল হচ্ছে ইমরান হাশমি ব্রো।”

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১০

ইভানা হিয়ার এই অদ্ভুত অপ্রত্যাশিত উত্তর শুনে কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল। হিয়া আবারও তার কাজে মন দিল। সে জানে, এই প্রপোজালটা শুধু রোমান্টিক কোনো কাজ নয়, এটা লিওনকে নিজের জালে আরও শক্ত করে বাঁধার একটা নিখুঁত অস্ত্র।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here