আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৫ (২)
সুরভী আক্তার
সময় তখন দুপুর দেড়টা । অফিস রুম থেকে বেরোলো আদ্র । ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে দোতলার করিডোর পেরিয়ে দম্ভভরে পা চালিয়ে এগোচ্ছে সিঁড়ির দিকে । ক্লাস শেষ । বাড়ি ফিরছে এখন । পড়নে টানটান সাদা শার্ট ইন করা । পুরো ফিটফাট প্রফেসর আদ্রিয়ান কাবির আদ্র । পুরো বললে ভুল হবে । একটু এলোমেলো আছে । পড়নের ব্লেজার খুলে ধরে রেখেছে হাতে । দু চারটে চুল কপালে বাড়ি খাচ্ছে । সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে নিচে নামলো সে । করিডোরের পথে পার্কিং লটের দিকে এগোতে গেলে চিকন মেয়েলি কন্ঠের ডাক পড়লো পিছন থেকে….
” স্যার…
আদ্র প্রথমত সাঁড়া দিলো না । দ্বিতীয় বার কানে বাজলো সে সম্বোধনের সাথে নিজের নাম ।
” আদ্র স্যার ?
সহসা থামলো আদ্র । ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরতেই সেই মেয়েটাকে দেখতে পেলো । অতি সহজিয়া রমনী । এই তো সেই । চেনা , তবে ক্ষণিকে ক্ষণিকে বড্ড অচেনা হয়ে দাঁড়ায় ।
আদ্র তাকে দেখে দাম্ভিকতা বজায় রেখেই কপালে ভাঁজ ফেললো তিন স্তর । শিশির পিটপিট করে এগোয় । সামনাসামনি দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে চিবুক উঁচিয়ে বলে….
” সরি , পিছু ডাকার জন্য । এ্যাকচুয়েলি , মেঘা আর শাফাহ্ কে ফোনে পাচ্ছি না । কদিন ধরে আসেও নি ভার্সিটিতে । ওদের সাথে কন্টাক্ট হচ্ছে না । তাই ডাকলাম আপনাকে । জানার ছিলো , কবে থেকে আসবে ওরা ?
আদ্রের রাশভারী জবাব…..
” কাল থেকে আসবে । আর,ওরা বাড়িতে নেই !
” কোথায় গেছে ?
শিশিরের বিচলিত প্রশ্ন । আদ্র চোখ সরু করে । বিরক্ত লাগলেও উত্তর করে…..
” গ্রামে ঘুরতে গেছে । সেখানে নেটওয়ার্ক প্রবলেম,তাই কন্টাক্ট হচ্ছে না হয়তো । তবে কাল থেকে আসবে ওরা ! অর এনি কোয়েচশন ?
গুরুগম্ভীর লোকটার মুখশ্রীতে প্রকাশিত বিরক্তি টুকু শিশির বুঝলো বোধহয় । লোকটা গুরুভার , দাম্ভিক । অহংকারী বললে ভুল হবে না । শাফাহ্ আর মেঘা সবসময় বলে আদ্র অনেক ভালো । খুব কোমল, নমনীয় । কেবল ক্লাসেই সে এমন গম্ভীর । বাড়তি সময় খুব মোলায়েম ।
তবে লোকটার ব্যাবহারে মোটেও তা প্রকাশ পায় না, মনেই হয় না তিনি কোমল ।
টিচার হিসেবে হলেও শিশির তার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলে নি কভুও । আজ প্রথম এভাবে ডেকে কথা বললো । আর সেদিনটা ছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত ।
গলা নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল শিশির….
” নো , স্যার ।
মাথা নামিয়ে ব্যাগ চেপে ধরে পাশ কাটাতে গেলে আদ্র ডাকে আচমকা…
” এইই শোনো…
চকিতে ঘাড় ঘোরায় স্নিগ্ধ কোমল রমনী । উত্তরে বলে…
” জি ।
” নামটা যেনো কি তোমার ?
” সেদিন বলেছিলাম ।
” মনে নেই ।
” শিশির ।
” হু… নাইস নেম । আসতে পারো….
আর থামলো না মেয়েটা । আদ্র পার্কিং লটের দিকে পা বাড়ায় । আর সে পা বাড়ায় উল্টো পথে । মেঘা আর শাফাহ্’র খোঁজ নেওয়ার ছিলো কেবলই । ওদের সাথে কন্টাক্ট হয় নি কদিন হলো ।
কয়েক পা এগোতেই মুখোমুখি হয় ফারিন ।
ফারিনের সাথে আরো দুজন । ওরই ফ্রেন্ড । বড়লোকের মেয়ে ওরা সবে । শিশির কে আদ্রের সাথে কথা বলতে দেখেছে ফারিন । অমনি বিচুটি পাতা ডলা পড়েছে গায়ে । ক্লাস, আর পড়াশোনা , এই ব্যাতীত ভার্সিটির অন্য কোথাও আদ্রিয়ান কাবির আদ্রের সাথে কথা বলার সাহস নেই কারোর । কথা বলতে গেলেও আদ্র ইগনোর করে চলে । সে কেবলই এ ভার্সিটির লেকচারার । সময় করে আসা , ক্লাস নেওয়া , আর ছুটির পর চলে যাওয়া ব্যাতীত বাড়তি কিছুই তার ব্যাক্তিত্বের সীমায় পড়ে না ।
আজ হিতে বিপরীত । ফারিন শত চেষ্টা করেও কোনো দিন সুযোগ নিতে পারে নি ।
কথা বলতে পারে নি আদ্রের সাথে । চেষ্টা করলেও রাগান্বিত দৃষ্টির সম্মুখে টিকতে পারে নি । আজ বেশ স্বাভাবিক হয়েই আদ্রের সাথে শিশির কে কথা বলতে দেখলো । রাগে গজগজিয়ে শিশিরের পথ রুখে মুখ বাঁকিয়ে খিটখিটে স্বরে জিজ্ঞেস করলো সোজাসাপ্টা…..
” কি কথা বলছিলে স্যারের সাথে ?
শিশির ভ্রু যুগল জড়ো করে । পাল্টা শুধোয়…..
” তোমাকে কেনো বলবো ?
” জানতে চেয়েছি , তাই বলবে ।
” মেঘা আর শাফাহ্’র খোঁজ নিচ্ছিলাম ।
” খোঁজ নিচ্ছিলে , নাকি সেই বাহানায় স্যারের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করার চেষ্টা করছিলে ?
কুৎসিত বাক্যে মুখ কুঁচকে ছোট করলো শিশির । চাহনি তীক্ষ্ণ করে বললো….
” হোয়াট আর ইউ টকিং ননসেন্স ?
ফারিন হাসলো ব্যাঙ্গাত্বক । বাকি দুজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে ঠোঁট বাঁকিয়ে তিরষ্কার করে বললো….
” শুনেছিস তোরা , ডিপার্টমেন্টের টপার গার্ল – উপস্ সরি , লোয়ার ক্লাস গার্ল কিনা ক্লাসের বাইরে দ্যা মোস্ট হ্যান্ডসাম আদ্রিয়ান কাবির আদ্রের সাথে কথা বলার দুঃসাহস দেখিয়েছে ? মানা যায় এটা ?
শিশির বিব্রত হয় । এই মেয়ে বরাবর অসহ্যকর । এই অসহ্য অনুভূতি টা শাফাহ্’র থেকে ভালোই আয়ত্ত করেছে সে । সহ্য হয় না এই বিগড়ে যাওয়া মেয়েটাকে । আর এই মেয়ে শিশির কে সহ্য করতে পারে না । কারন মেঘা আর শাফাহ্’র সাথে গভীর বন্ধুত্ব আছে শিশিরের । যা ওর সাথে নেই । এই সাধারণ , ছোটলোক মেয়েটাকে কি দেখে বন্ধু পাতিয়েছে ওরা কে জানে ? বরাবর মেঘা আর শাফাহ্’র সামনে শিশির কে কটাক্ষ করে কথা বলে ফারিন । যতবার বলে ততবারই নিজেই লাঞ্চিত হয়ে ফিরে আসে । শাফাহ্ তো আছেই , মুখের উপর ঝকঝক্ করে ঠাস ঠাস কথা শোনানোর জন্য ।
এখন বিরক্তি সমেত স্বাভাবিক ভাবেই বললো শিশির….
” যার সাহস থাকে , কেবল সেই দুঃসাহস দেখানোর মতো সৎ সাহস পায় । মানা বা না মানা সেটা প্রতক্ষ্যদর্শীদের ব্যাপার । বাই দ্যা ওয়ে , ভুলে যেও না আদ্র স্যার কেবলই আমাদের প্রফেসর । তোমার ও , আর আমার ও । আর তার পাশাপাশি তিনি মেঘা আর শাফাহ্’র ভাইয়া । আমি কেবলই ওদের ভাইয়ার কাছে ওদের খোঁজ নিয়েছি । বুঝেছো আশা করি ।
এটুকুনি বলেই শিশির পাশ কাটাতে গেলো ওদের । ফারিন কটাক্ষ করে বললো তৎক্ষণাৎ……
” ক্লাস , ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড , বা চেহারার সৌন্দর্য , কোনোটাই নেই তোমার কাছে । তোমার দ্বারে বাড়তি কিছু ভাবিও না আমি ।
শিশির থামলো সহসা । পিছু ফিরলো এক ঝাঁক বিরক্তি সমেত । সে নরম , তবে ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন । কারোর বিদঘুটে তাচ্ছিল্য করে বলা কথা শুনে গায়ে লাগানোর মতো মেয়ে নয় সে । সেই কথার বিপরীতে পাল্টা প্রতিরোধ তার জানা আছে । সাধারণ সে । তবে ভুক্তভোগী নয় । ফারিনের তিরষ্কার মোটেও গায়ে মাখলো না , ঝেড়ে উঠলো…..
” শাট আপ ,,, খবরদার আমার ক্লাস তুলে কথা বলবে না ।
আর না ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে । সহ্য করবো না বলে রাখলাম । নিজের অকাতে থাকো ফারিন । আমি কিন্তু ছেড়ে কথা বলার মেয়ে নই । সবসময় উল্টো পাল্টা মন্তব্য সহ্য করি তোমার ।
আর এমনিতেও , তোমার ক্লাস আর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড আমার থেকে ভালো হলে শাফাহ্ আর মেঘা আমার কাছে না এসে তোমার কাছেই যেতো । এখান থেকেই বুঝে নাও , তুমি কোন ক্লাস থেকে বিলংস করো ।
ফারিনের মুখখানা চুপসে আসে অগত্যা । শিশির আর দাঁড়ায় নি । কথা গুলো শুনিয়েই গটগটিয়ে হাঁটা ধরেছে নিজের পথে ।
গ্রাম থেকে শহরে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমেছে । শুভ্র গেছিলো দুপুরের পর । ফিরেছে ওদের সবাইকে এক সাথে নিয়ে । সে গিয়ে রৌদ্রের নাগাল পায় নি । তার আগেই বেরিয়ে এসেছে রৌদ্র । এই ছেলের মতিগতি বোঝা বড্ড দায় । কি করে , কে জানে ।
অবশ্য শুভ্র এখন খানিকটা অবগত সিক্রেট মিশন নিয়ে । সেও আজকাল যোগ দিয়েছে সিরাত আর আদ্রের সাথে । সেদিন বাড়ি ফিরেই রৌদ্রের কান্ড সিরাতের কানে তুলেছে দু ভাই । ওরা তিন ভাই বোন এখন একদল । মেহের কেও টানা হবে । শাফাহ্ টা বোকা ,, না হলে ওকেও টানা যেতো । কিন্তু ঐ মেয়ে বুদ্ধু , তার উপর মুখ পাতলা ।
বোকার মতো কখন সবটা মেঘার কাছে উগড়ে দেবে , তা সে নিজেও জানবে না । ওর কথা বাদ ।
সিরাত , আদ্র, শুভ্র আর মেহের , এরা চারটে মিলে মিশনে নেমেছে । বেপরোয়া রৌদ্র আর জেদি মেঘা কে এক করার মিশন । মেঘা কে ছাড়া যাবে না । আর রৌদ্র কে ওকে ছাড়তে দেওয়া যাবে না । রৌদ্র রগচটা, সে কখনো নিজের অনুভূতি প্রকাশ করবে না কারোর সামনে । নিজের ইগো, দাম্ভিকতা বজায় রেখেই ঔদ্ধত্যা চালাবে সে । এখনো চালাচ্ছে । সেই বিদেশ থেকে ফেরার পর হতেই মেঘার উপর অপ্রকাশিত ভাবে খাটাচ্ছে নিজের অধিকার ।
এ কদিনে রৌদ্রের ভাবগতিক বোঝা হয়ে গেছে ওদের । বউয়ের প্রতি টান জেগেছে বেপরোয়া ছেলের । এই টান কতদূর গড়াতে পারে তাই দেখার পালা ।
রাতের ডিনার শেষে বাড়ির দুই কর্তা ড্রইং রুমে বসে আছেন । গিন্নিরা ব্যাস্ত কিচেন গোছাতে । মেঘা আর শাফাহ্ রুমে উঠেছে খেয়ে দেয়ে । কাল ভার্সিটি আছে । পড়াশোনা গুছিয়ে নিচ্ছে টুকটাক ।
সদর দরজায় বেল বাজলো এমত সময় । ঘড়ির কাঁটা নয়টার দোরে । এই সময় কে আসতে পারে ? রুবিনা কাবির দরজা খোলার জন্য এগোতে গেলে তোফায়েল কাবির বাঁধা দিলেন । নিজে গিয়ে খুলে দিলেন দরজাটা ।
গেটের দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে সদরের সামনে । সাথে আরেকজন । তোফায়েল কাবির কে দেখা মাত্রই দারোয়ান
স্বভাবত হেসে পাশের লোকটাকে ইশারা করলেন । ইনি এসেছেন পার্সেল নিয়ে । খুঁজছেন আদ্র কে । তোফায়েল কাবির লোকটার পাশে বিশাল আকারের একটা ফ্রেম মতো কিছু লক্ষ্য করলেন । প্যাকেজিং করা ভালো মতো ।
ভেতরে কি আছে জানা নেই । লোকটা সাবধানী হয়ে ধরে রেখেছেন সেটাকে ।
আদ্র আবার কি আনিয়েছে কে জানে ।
ছেলে কে ডাকা মাত্রই ছেলে ঘর হতে নিচে নামলো তড়তড়িয়ে । সদরের বাইরের লোকটাকে দেখে মুখ ফাঁক করলো । দ্রুত বললো স্বাভাবিক কন্ঠে…..
” বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো ? ভেতরে নিয়ে আসুন !
দারোয়ানের সহায়তা নিয়ে তাই করলো লোকটা । বড় পার্সেল করা বস্তু টাকে ভেতরে নিয়ে আসা হলো ।তোফায়েল কাবির শুধালেন…..
” কি আছে এতে ?
” ঐ , আমাদের ফ্যামিলি পিকচার । ভাইয়ার বিয়েতে তুললাম না ? সেটা ফ্রেমে বাঁধিয়েছি ।
সদর বরাবর ডাইনিংয়ের সামনের দেয়ালটা আগে থেকেই ফাঁকা করিয়ে রেখেছে আদ্র । সেখানকার সব ফটো ফ্রেম সরিয়েছে । মূল সদর বরাবর ঠিক সামনে টাঙানো হবে তাদের ফ্যামিলি ফটো টা । যাতে দৃষ্টি কাড়ক হয় আরো বেশি । প্যাকেজ খোলা হচ্ছে । খুব সাবধানে মুড়িয়ে এনেছেন ফ্রেম টা । বেশ বড়সড় ।
শাফাহ্ আর মেঘা কে ডাকা মাত্রই ওরা নামলো ছটফটিয়ে । মেঘা টেবিলের দিকে এগোয় । চেয়ার টেনে বসে , গ্লাসে পানি ঢালে খাওয়ার জন্য । শাফাহ্ চিকচিক করে শুধায়….
” এটা আমাদের সেই ফ্যামিলি পিকচার , ফ্রেমে বাঁধিয়েছো ভাইয়া ?
আদ্র এক পলক তাকায় । বুকে হাত গুটিয়ে টান টান দাঁড়িয়ে ফ্রেমটার আনবক্সিং দেখছে সে । চোখ ফিরিয়ে আবারো সেদিকে নজর রেখে উত্তর করলো…
” হুম ।
” বেশ ভালো করেছো । আমাদের একটাও ফ্যামিলি ফটো নেই । থাকলেও ফোন গ্যালারিতে বন্দি হয়ে আছে । ফ্রেমে বাঁধানো নেই একটাও । এটা বেশ বড়সড় করে বাঁধিয়ে ভালোই করেছো ।
” আমি ভালোই করি সবসময় ।
ফ্রেম টার প্যাকেজিং পুরোপুরি খোলা মাত্রই আদ্র মৃদু হাসলো । হাত নামালো বুক থেকে । একটা হাস্যোজ্জ্বল পরিবার । মাধুর্যময় হাসি সকলের ঠোঁটে । নব দম্পতিকে ঘিরে রয়েছে তাদের পরিবার । ছবিটাতেই চাকচিক্যতা স্পষ্ট ।
শাহিনা কাবির, রুবিনা কাবির মুচকি হাসলেন তাদের সংসারের চিত্র দেখে । তোফায়েল কাবির, তৌসিফ কাবির একপাশে বসে । শাফাহ্ ভ্যাট ভ্যাট করে দেখলো । প্রথমেই দেখলো নিজেকে । ওর পাশে সায়ান । নিজের ফটো ভালো এসেছে , ফিক করে হাসলো সে । তুড়ি বাজিয়ে হাসি চওড়া করে বললো…..
” ওয়াহ্ , খুব সুন্দর হয়েছে ছবিটা । মেঘা , দেখে যা….
এ পর্যায়ে মেঘার ছবিটার দিকে তাকানো মাত্রই মুখ গোল করে ফেললো শাফাহ্ । সবার দৃষ্টি, মেইন ফোকাস সামন বরাবর হলেও মেঘার ফোকাস তার বাম পাশে । ঘাড় উঁচিয়ে চোখ তুলে বাম পাশে চেয়ে আছে মেঘা । বাম পাশের জন রৌদ্র । রৌদ্রেরও দৃষ্টি নেই সামনে । সেও একই ভাবে চোখ নামিয়েছে তার ডান পাশের অনুচ্চ রমনীর পানে । যেনো চোখাচোখি হচ্ছে দুজনার ।
শাফাহ্ ভ্যাট ভ্যাট করে তাকায় । মেঘা উঠে আসার আগে বোকা মেয়েটা আচমকা বলে ওঠে ছবিটার দিকে তাকিয়ে….
” একি মেঘা , তুই ওভাবে ভাইয়ার দিকে কি দেখছিস ?
মেঘা থতমত খেলো । বুঝলো না । কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ সূক্ষ্ম করলো । পরক্ষনে শাফাহ্ আবার বলে একই স্বরে…..
” ইয়া আল্লাহ , ভাইয়া এটা কি ছবি বাঁধিয়েছো তুমি ? মেঘা আর রৌদ্র ভাইয়া তো গন্ডগোল পাকিয়েছে । ওরা তো নিজেদের দেখতেই ব্যাস্ত ।
শোনা মাত্রই ধক্ করে ওঠে মেঘা । দ্রুত কদমে এগিয়ে আসে । সচকিতে দৃষ্টিপাত করে ফ্রেম টার দিকে । ছ্যাত করে ওঠে নিজেদের দিকে তাকানো মাত্রই । ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে । বাকিরা সামন পানে । চোখ ছোট হয়ে আসে মেঘার । রৌদ্রের স্পর্শ নিজের কোমরে পাওয়া মাত্রই বিরক্ত হয়ে রৌদ্রের দিকে তাকিয়েছিল সে সময়, আর ঠিক তখনই ক্যামেরায় ক্লিক করা হয়েছে ।
মেঘা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয় এক মুহুর্ত । ফের সম্বিত ফেরে শাফাহ্’র কথায়…
” মেঘা আর রৌদ্র ভাইয়া তো ফোকাসে নেই ভাইয়া ।
আদ্র চাপা স্বরে ধমকালো কাউকে না শুনিয়ে….
” চুপ বুদ্ধু , যার ফোকাস যেখানে , সে সেখানেই তাকিয়ে আছে । তোকে অতো বুঝতে হবে না । যদি আর একটা কথা বলেছিস , তো গাট্টা খাবি বলে রাখলাম ।
শাফাহ্ সহসা চুপসে যায় । মেঘার তাজ্জব মুখো ভঙ্গিমা দেখে ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করে আদ্র । শুভ্র আর সিরাতের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচায় ।
তোফায়েল কাবির কিছু না বুঝে উঠে এসেছেন দেখার জন্য । ছবিটা দেখা মাত্রই পেছনে হাত গুটিয়ে নিলেন তিনি । গুরুগম্ভীর করলেন নিজেকে । গলা ঝাড়লেন ।
” বাঁধানোর মতো আর ছবি পাও নি ? এটাই পেয়েছো ?
” এটাই ভালো এসেছিলো আব্বু ।
ছবি টাঙানোর জন্য লোকটাকে তাড়া দিলো বিলম্ব না করে….
” আপনি এটা টাঙিয়ে দিন ।
তাই করলো লোকটা । দ্রুত টাঙিয়ে দিয়ে তিনি তার পারিশ্রমিক নিয়ে চলে গেলেন ।
মেঘা মাথা নামিয়েছিলো লজ্জায় । পিটপিট করে চোখ তুলে আড়চোখে তোফায়েল কাবির কে দেখে আর থাকতে পারলো না । গা বাঁচিয়ে সবার নজর থেকে বাঁচতে উপরে উঠলো দ্রুত পায়ে ।
শাফাহ্ আদ্রের কাছাকাছি দাঁড়ায় । ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুকে এক হাত গুটিয়ে নেয় । অন্য হাত চোয়ালে ঠেকিয়ে ভাবুক ভঙ্গিতে দাঁড়ায় । বলে…..
” ভাইয়া , কি হলো এটা ?
” আই কন্টাক্ট । তোর মোটা মাথায় ওসব ঢুকবে না ।
” উঁহু , ঢুকেছে । কি ঢুকেছে জানো ?
চেয়ে দেখো ছবিটার দিকে । কি দেখছো ? বুঝলে না ? ওয়েট আমি বোঝাচ্ছি । দেখো ছবিটার দিকে…..ভাইয়া আর মেহের আপু কাপল । আম্মু আব্বু , মামনি আর বাবাই ওরাও কাপল । সিরাত আপু আর আহিয়ান ভাইয়া , ওরাও জোড়া জোড়া । মেঘা আর রৌদ্র ভাইয়ার ও জোড়া আছে । আমার পাশে সায়ান ভাইয়া , ছবিতে হলেও আমাদের জোড়া লাগছে । মানে ,, কাপল মনে হচ্ছে আরকি । কিন্তু দেখো , পুরো ছবিটার মধ্যে তুমি একলাই বেচারা । সিঙ্গেল ম্যান । কেউ নেই তোমার পাশে । তোমাকে এক কোণে রেখেছে সবাই । ইশশ্ ভাইয়া , সো স্যাড । কোনো পার্টনার নেই তোমার । ইশশ্ ইশশ্ , এজন্যই মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছো ? বুঝি আমি । তোমার কষ্ট টা বুঝি । কিন্তু আফসোস , বাড়ির কেউ বোঝে না । আর কতদিন সিঙ্গেল থাকবে এভাবে ?
আদ্র কটমট করে তাকিয়ে আছে । শাফাহ্ পাত্তা দিলো না । একটু থেমে ঢোক গিলে আবার বললো….
” আহারে বেচারা আদ্র ভাইয়া , সিঙ্গেল থাকতে থাকতে শুকিয়ে যাচ্ছো । টেনশন করো না , আমি মামনি আর বাবাই কে বলবো তোমাকে একটা বউ গিফট করতে । কেমন ? আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না । রিটার্ন হিসেবে কয়েকটা চকলেট দিও,তাতেই হবে । যদি বলো , তাহলে এক্ষুনি মামুনি বাবাই কে……
মেয়েটা আর কথা শেষ করতে পারলো না । আদ্র রেগে মেগে ব্লাস্ট হওয়ার আগেই ঢোক গিলে এক কদম পেছালো । বাকি টুকু শেষ করার জন্য মুখ খোলার আগেই সবার সামনে ওর দিকে তেড়ে গেলো আদ্র…..
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৫
” টুকটুকির বাচ্চাাাাা……
” আদ্র ভাইয়ার বাচ্চাাাা….আমি তো তোমার ভালোর জন্যই বললাম ।
মামনি , তোমার ছেলে আমাকে মেরে ফেললো । বাঁচাওওও…….
