আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৬
সুরভী আক্তার
সকাল থেকে বাড়িতে তুমুল তোড়জোড় । দূরদূরান্ত থেকে মেহমানদের আনাগোনা লেগেই চলেছে । ভিড়ভাট্টায় জমজমাট কাবির ম্যানসন । শিশিরের উপর ধকল গেছে বড্ড । কতশত মানুষের মুখোমুখি হতে হয়েছে আজ ওকে । আজকের দিনে সবার মূল আকর্ষণ সে ।
সকাল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যা । জোর পূর্বক হাসতে হাসতে চোয়ালে ব্যথা ধরেছে পুরো । এখন কমে এসেছে হুটোপাটি । টুকটাক গুটিকয়েক গেস্ট আছেন বাইরে ।
আজ সারাদিন বাড়িতে আছে রৌদ্র । মেঘার পিছু পিছু লেগে আছে সে । তার বউ কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে , সব জায়গায় নজরদারি চালাচ্ছে ।
মেঘা কে পরিপাটি হয়ে সাজগোজ করতেও দেয় নি । লোকে দেখবে তাই । লোকের নজর তার বউয়ের দিকে সহ্য করবে না সে । সেদিন অতসব শপিং করে দিলো , সেগুলো অবহেলায় ক্লথ কেবিনেটে পড়ে আছে অনায়াসে । ভিড়ভাট্টা কমতেই বাড়ির ভেতরে ঢুকেছেন সকলে । একাধারে বসে থাকতে থাকতে কোমর লেগে গেছিলো পুরো । একলা একটু বিশ্রামের জন্য উপরে উঠলো শিশির । মেঘাও উঠলো পিছু পিছু । শিশির কাঙ্ক্ষিত ঘরে ঢুকলেও মেঘা নিজের ঘরে ঢুকলো না । ফাঁক পেয়ে আশেপাশে চোরা চোখ বুলিয়ে এক ছুটে হুড়মুড়িয়ে রৌদ্রের ঘরে ঢুকলো । লোকটার দেখা নেই লাস্ট আধা ঘন্টা ধরে । ঘরে কি করছে কে জানে ?
ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো একবিংশী । বিকট শব্দে বিব্রত হলো রৌদ্র । রেগে তাকালেও রাগ স্থায়ী রইলো না বেশিক্ষণ । মেঘা কে দেখে শিথিল হলো আপনা আপনি । কানে এয়ারপড , কোলে বড় আইপ্যাড । বেশ পরিপাটি গোছানো সে । মেঘা ফিরে রৌদ্রের এমন আঁটসাঁট ভাবভঙ্গি দেখে বেশ অবাক হলো ।
ধপ করে বসলো তার পাশে । গাল ফুলিয়ে বাহু জড়িয়ে ধরলো…..
” আমি বিয়ে করবো !
রৌদ্র আঁখি লতা কুঁচকে ফেলে । আড়চোখে ল্যাপটপ সম আইপ্যাডটার দিকে তাকায় । কনফারেন্স কলে দু’জন যুক্ত । ফরেইন ভাব চেহারায় । তারাও হঠাৎ রৌদ্রের পাশে এভাবে একটা মেয়েকে দেখে চোখ কুঁচকে ফেলেছেন । রৌদ্রের দৃষ্টি অনুসরণ করে কাঁধে মাথা রেখে সামনে আইপ্যাডের দিকে তাকানো মাত্রই চোখ বড় বড় হয়ে আসলো মেঘার । অপরিচিত দুটো মুখাবয়ব দেখে দ্রুত ছিটকে সরে আসলো রৌদ্রের থেকে । রৌদ্রের ভাব গুরুগম্ভীর । বোঝা মুশকিল । গাম্ভীর্যতা বজায় রেখেই বলে শক্ত কন্ঠে…
” আই অ্যাম ড্রপিং অফ নাও, আই উইল কল ইউ অল ব্যাক ইন অ্যা লিটল হোয়াইল । নাও ইটস টাইম টু গিভ মাই ওয়াইফ সাম টাইম । ওকে ?
ওপাশ থেকে কিছু শোনার প্রয়োজন বোধ করলো না সে । কল কেটে আইপ্যাড উল্টে রাখলো । কান থেকে এয়ারপড খুলে তাকালো মেঘার দিকে…..
ভ্রু কুঁচকে শুধালো……
” কি বলছিলে ?
” আপনি কি করছিলেন ?
” কনফারেন্স মিটিং ছিলো ।
” আপনি মিটিং ও করেন ? কারা ওনারা ?
” বলেছিলাম না , আমি জুরিখের একটা বড় কম্পানিতে জব করি । অনেক দায়িত্ব আমার । এখানে এসে পড়ে আছি , তাই বলে দায়িত্ব গুলো ভুলে যাবো ? ওসব দায়িত্ব ভুলে গেলে তোমার দায়িত্ব নেবো কিভাবে ?
এখন বলো তুমি কি বলছিলে ? কি করবে ?
” বিয়ে !
রৌদ্র চোখ সরু করে আরো বেশি । আগে একটু আধটু শুনেছিলো । এবার পরিষ্কার শুনলো । মেঘা ওষ্ঠ উল্টে কাছে আসলো ।
” আমি আবার বিয়ে করবো ?
” জানে মেরে ফেলবো একদম । আমি বেঁচে আছি এখনো ।
” মেরেই দেখুন , ভুত হয়ে ঘাড়ে চেপে বসবো । বাঁচতে দেবো না আপনাকেও । বিয়ে করবো আমি ! বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো আমার , আপনি সব ঘেঁটে দিয়েছেন । এখন আবার সব ঠিক করে দিন । শুনুন রাইনো মুখো , আমাকে আবার বিয়ে করুন আপনি ! আমি চাই আমাদের ও এমন বড় করে একটা গেট টুগেদার হোক । সবাই চিনুক আমায় । যেভাবে আদ্র ভাইয়ার বউ হিসেবে শিশির কে চিনলো , সেভাবে । আমিও তো আপনার বউ । কেউ জানে না এটা । আজ সব অতিথিদের মেইন ফোকাস ছিলো শিশিরের উপর । আমিও যে এ বাড়ির বউ , সেটা কেউ তোয়াক্কাই করে না । এখন আপনি আবার বিয়ে করবেন আমায় । ব্যস , আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না ।
রৌদ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে শুনলো সবটা । কোনো প্রত্যুত্তর না করে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা লাগালো বাইরের দিকে । মেঘা থতমত খায় , পিছু ডাকে…..
” কি হলো , কোথায় যাচ্ছেন ? শুনলেন আমার কথা ?
থামলো রৌদ্র । ঘাড় ঘুরিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো হাত নাড়িয়ে….
” আমি বরং গিয়ে আদ্র কে জিজ্ঞেস করে আসি, ওদের বাসর হয়েছে কি না !
” কিহ !
” হু,, ওদের বিয়ে দেখে যেভাবে হিংসে করে দ্বিতীয় বার বিয়ে করতে চাইছিস , সেভাবে স্বেচ্ছায় বাসর করতে না চাইলে যেভাবে জোর করে বিয়ে করেছি সেভাবে জোর করে কিছু একটা করে ফেলবো এবার, বলে রাখলাম । শুনে আসি আগে ।
আহম্মক বনে গেলো মেঘা । হা বনে হতবাক হয়ে চাইলো । লোকটা দরজা মাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে । তড়তড়িয়ে পিছু নিলো একবিংশী । শিশির কে আবার নিচে নামানো হয়েছে । বেচারি পুরো ক্লান্ত , হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে এতো সবার সম্মুখে । একটু বিশ্রাম নিতে উঠলো , তবে নেওয়া হলো না । রুবিনা কাবির খাবারের জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন ওকে ।
রৌদ্র সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে শিশিরের দিকে চোখ বুলিয়ে নিলো । আদ্র নেই এখানে । শিশির কে জিজ্ঞাসা করলে মন্দ হয় না । মনে মনে মিটিমিটি হেসে কথা গুছিয়ে নিলো । একেবারে নিচে নামার আগেই মেঘা খপ করে টেনে ধরলো ওর হাত । চাপা স্বরে বললো ফিসফিসিয়ে…..
” কি করছেন আপনি ? কোথায় যাচ্ছেন ? কি বলবেন ? কাকে বলবেন ?
” আদ্র নেই , কুয়াশা কে জিজ্ঞেস করে আসি ।
” কি জিজ্ঞেস করবেন আপনি ?
মেঘার আতঙ্কিত স্বর । রৌদ্র বাঁকা হেসে বলল….
” জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ ।
মেঘার হাত ছাড়িয়ে চলে গেলো সে । পিছনে গিজগিজ করে কপাল চাপড়ালো মেঘা ।
রৌদ্র গিয়ে ঠাস করে শিশিরের পাশে বসে । জড়তা নেই কোনো । আকস্মিক কাছে বসায় অপ্রস্তুত হয়ে একটু নড়েচড়ে বসল শিশির । জোর পূর্বক লেলিন হাসলো । রৌদ্র তাল মিলিয়ে হাসে ।
” আচ্ছা কুয়াশা , একটা কথা বলবে ? সত্যিই বলবে কেমন ?
” জি ভাইয়া !
“ 你和阿德的洞房花烛夜什么的都完成了吗 ?
কিসব আজগুবি শব্দ উচ্চারণ করে থামলো রৌদ্র । শিশির ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে আছে । রৌদ্র বুঝলো ওর বোকা বোকা চাহনির অর্থ । হাসি পেলো ভীষণ । জোর পূর্বক হাসি চেপে বললো একটু ঝুঁকে……
” কি হলো , বলো ? হয় নি এখনো ?
” কি হয়নি ?
” যা বললাম তাই ? এক বাক্যে উত্তর করো , হ্যাঁ কি না ? হয়েছে ?
শিশিরের মাথার উপর দিয়ে গেলো সবটা । কেমন তালগোল পাকিয়ে আসলো । সে হাসার চেষ্টা করে না বুঝে দুদিকে মাথা নাড়ালো । তা দেখে ফিক করে হেসে উঠলো রৌদ্র । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো শিশির । আদ্র বাড়িতে ঢুকছিলো । শিশিরের পাশে বসে রৌদ্র কে এভাবে হাসতে দেখে আপনা আপনি কপালে ভাঁজ পড়লো তার । পায়ের গতি বাড়িয়ে গটগটিয়ে এসে শিশির কে টেনে দূরত্ব বাড়ালো । অতঃপর ধপ করে দু’জনের মাঝে বসে চোয়াল শক্ত করে তাকালো রৌদ্রের দিকে ।
” প্রবলেম কি ? আমার বউয়ের কাছে কি চাই ?
ভেংচি কাটলো রৌদ্র । বউ হয়েছে বলে ভাব বেড়ে গেছে ওর । রৌদ্র কি ভাব দেখিয়েছে কখনো ? কই না তো ।
সে চোখ উল্টিয়ে বললো ব্যাঙ্গ করে….
” কুয়াশা কে জিজ্ঞেস করলাম , ও বললো বাসর টাসর নাকি কিছু করতে পারিস নি এখনো ?
আদ্র তব্দা খেলো । তাৎক্ষণিক তাজ্জব বনে তাকালো শিশিরের দিকে । মেয়েটার কানে পৌঁছায় নি রৌদ্রের কথা । বরং সে দুই ভাইকে রেখে উঠে যেতে লাগলো । ফের তড়াক করে রৌদ্রের দিকে ফিরলো আদ্র । কর্কশ গলায় কিছুটা ধমকে বললো…..
” এসব কি ধরনের কথাবার্তা, রুডি ?
” বাংলাতেই তো বললাম । কিন্তু তোর বউকে চাইনিজে বলেছি । ও শুনে একটু লজ্জা পেলো , বুঝলো কি না কে জানে ! তার পর না বোধক মাথা ঝাঁকালো । এতেই বুঝলাম কিছুই হয় নি তোদের মাঝে । বিয়ের বিশ দিন হতে চললো, এখনো সামান্য বাসরটাই করতে পারিস নি ? ছিঃ,, লজ্জা থাকা উচিত ?
রৌদ্রের তিরষ্কারে আদ্র চোখ কুঁচকে ফেলে । দাঁত চেপে সামলায় নিজেকে । পাল্টা তিরষ্কার করে বলে….
” আচ্ছা ? তোর বিয়ের যেনো কতদিন হলো ? গুনে গুনে পাঁচ বছর পাঁচ মাস ছয় দিন । ছিঃ,, লজ্জা থাকা উচিত, ছোট ভাই ।
ফেরারী খোঁটা । রৌদ্র ফুঁসে উঠলো । কটমট করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে গজগজ করলো । এ দু-ভাইয়ের তো কথা হয় না বহু বছর । রৌদ্র আদ্র কে সহ্য করতে পারে না । এড়িয়ে চলতো সর্বদা । কারনটা উহ্য । রৌদ্র বেপরোয়া । বিপরীতে আদ্র বাধ্য, শান্ত । দু’জন দুই মেরুর । দুজনের দুটো চিত্র ছিলো সবার সামনে । আদ্রের থেকে রৌদ্র কে বোধহয় ছোট চোখে দেখা হতো । যদিও এটা কেবলই রৌদ্রের ধারনা । ভুল ধারণা । আর এই থেকেই আদ্রের উপর সুপ্ত ক্ষোভ তার । সম্পর্কটা সে নিজে জটিল করে দিয়েছে । আদ্র তো কম চেষ্টা করে নি ওর সাথে মানিয়ে নেওয়ার । কিন্তু রৌদ্র পরিপন্থী ।
লাস্ট কদিন ধরে আদ্রের বিয়ের পর থেকে একটু পরিবর্তন এসেছে রৌদ্রের মাঝে । সে কথা বলে টুকটাক । খোটা দিয়ে মশকরা করে হলেও কথা বলে । এটুকুই প্রশান্ত করে আদ্র কে । যথেষ্ট এটুকুই । অবশ্য রৌদ্রের এমন পরিবর্তনের কারন ওর অজানা নয় ।
রৌদ্র কে রাগতে দেখে মিটিমিটি হাসলো সে । ফোঁস ফোঁস করলো রৌদ্র । কিড়মিড়িয়ে উঠলো ।
মেঘা এদিকে আর ধ্যান দেয় নি । বাড়ি হালকা হয়ে এসেছে ইতোমধ্যে । ঘড়ির কাঁটা প্রায় আটটার ঘরে । রুবিনা কাবির মেঘা আর শিশির কে টেনে খেতে বসিয়েছেন । ওদের খাওয়া হয় নি সেভাবে । ডিনারের সময় ও হয়ে গেছে । বাকিরা বসার আগেই ওদের খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ভদ্রমহিলা ।
আদ্র বসে থাকলো না । শান্ত চোখে শিশির কে একবার পরখ করে উঠে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে পা বাড়ালো ।
শিশির আর মেঘা আপন খেয়ালে খাচ্ছে পাশাপাশি বসে । খাওয়ার মাঝে আকস্মিক একখানা হীম শীতল পুরুষালি ডাক ভেসে আসলো…..
” লিটিল বার্ড…..
একবিংশী খাচ্ছিলো এক ধ্যানে । বিঘ্ন ঘটলো এতে । থমকালো সে । লোকমা মুখে তোলার আগেই জমে গেলো পুরো শরীর ।
রুবিনা কাবির দাঁড়িয়ে ছিলেন পাশে । কন্ঠ বরাবর ছলকে তাকালেন তিনি । আশঙ্কায় ধক্ করে উঠলো তার হৃদয় ।
আদ্র উঠছিলো সিঁড়ি বেয়ে । কয়েক কদম উঠেছে সবে । সেও থমকালো । ছলাৎ করে ঘাড় ঘোরালো । কন্ঠ পরিচিত, আর কন্ঠের মালিক ও । সদরের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সেই মালিক । গোছানো পরিপাটি এক সুদর্শন যুবক । উজ্জ্বল ফর্সা চেহারা শীতের তোপে লালচে হয়ে উঠেছে । ঠোঁটে এক রাশ তৃপ্ত হাসি । দৃষ্টি সোজাসুজি টেবিলের ধারে বসে থাকা মেঘার পানে । মেঘা এখনো কিংকর্তব্য বিমূঢ় । সেও তাকিয়েছে । চোখাচোখি হয়েছে । আপনা আপনি ভরে উঠেছে আঁখি কোটর ।
আদ্র অবাক লোচনে দু’জন কে দেখে অস্ফুটে বিড়বিড় করে…..
” ইয়াশ !!
খাওয়া ফেলে উঠে দাঁড়ায় মেঘা । ঢোক গেলে । মুখের খাবার টুকু কোনো রকমে গলা পিছলে নামায় । চোখে অবিশ্বাস তার । ঝাপসা হয়ে এসেছে । ক্ষণিকের মধ্যেই ঝাপসা চোখ ছাপিয়ে পরপর কয়েক ফোঁটা পানি ঝরঝরিয়ে গড়িয়ে পড়লো । ভিজলো কপোল দুখানি । কান্না গিলতে গেলে ফিকড়ে উঠলো ।
ইয়াশ নামক ছেলেটা রমনীর সন্দেহ কাটাতে উপর নিচ মাথা নাড়ায় । বোঝায় , এটা ভ্রম নয় । সত্যিই সে এসেছে । ফিরে এসেছে অনেক দিন, অনেক বছর পর । সেই যে তিন বছর আগে সামনাসামনি হয়েছিল ওরা । এই তিন বছরের মধ্যে আর দেখা হয় নি ।
আজ হয়েছে । ইয়াশ এসেছে । সব ভুলে, আচমকা এসেছে । খবর না জানিয়ে হুট করে এসেছে ।
টলমল চোখে জল অনবরত ঝড়ে । আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না মেঘা । আর না কথা বলতে পারে । জবান বন্ধ হয়ে গেছে যেনো । কম্পিত ঠোঁট নাড়িয়েও টু শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না । কান্নার মাঝে এক ফালি হেসে এক ছুট লাগালো । সবাইকে উপেক্ষা করে তাজ্জব বানিয়ে , ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়লো ইয়াশের বুকে । ডুকরে কেঁদে উঠলো আকস্মিক । মা বাবা হারানোর পর এটাই তার শেষ আশ্রয় ছিলো ।
রৌদ্র এখনো ঠায় বসে আছে । নড়চড় করে নি একটুও । সে এসে গেছে । আভাস পেয়েছিলো রৌদ্র । কিন্তু তোয়াক্কা করে নি ।
এখন মেঘা কে ওভাবে ছুটে যেতে দেখলো সে । কান্নার শব্দ শুনলো । এতেই মুচড়ে উঠলো বুকটা ।
নড়েচড়ে উঠলো এবার । গলা শুকিয়ে আসছে । ঠোঁট ভিজিয়ে শুল্ক ঢোক গিললো । হাত মুঠো করে চোখ বুজে শ্বাস টানলো ।
ওদিকে ফুঁপিয়ে উঠলো মেঘা । কন্ঠ তার রোধ । কথা নেই জবানে । ইয়াশ ওকে ওভাবে কাঁদতে গেছে আলগোছে শান্তনা দিয়ে বললো……
” এই পাগল , আরে কাঁদছিস কেনো এভাবে ? এটা আমি , সত্যিই আমি ! দেখ , এসে গেছি । ছুঁতে পারছিস তুই আমায় । সত্যিই এসেছি আমি । মেঘা , মাই লিটিল বার্ড , থাম । শান্ত হ ।
মেঘা ফুঁপিয়েই যায় । কন্ঠ চিরে বুলি ফুটায় এবার, কেঁপে কেঁপে বলে ….
” তুমি এসেছো, ভাইয়া ? সত্যিই এসেছো ?
” হু । এইতো এসেছি । রিল্যাক্স বনু,,,
মেঘা হাতের বাঁধন আলগা করে । মাথা তুলে চায় । ইয়াশের হাসি ভরা মুখখানা দেখে ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে ওঠে । রৌদ্র বসে থাকতে পারে না আর । দম কুলোয় না । ঠান্ডাতেও ঘাম ছোটে কপালের ধার গড়িয়ে । আচমকা অস্থির হয়ে যায় সে । উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘোরায় । মেঘা এখনো ইয়াশের বাহুডোরে জড়ানো । কাঁদছে সে । রৌদ্র ওকে ওভাবে দেখে চড়াও হয়ে উঠলো । দড়দড়িয়ে রাগ চড়লো মস্তিষ্কে । ভেতরে আগ্নেয়গিরির ন্যায় উথাল পাতাল তান্ডব চললো । হাত মুঠিয়ে নিলো সে ।
ইয়াশ মেঘাকে সামলে চোখ তোলে । সামনে তাকানো মাত্রই দেখতে পায় বেপরোয়া যুবককে । অমনি হাসি উবে যায় ঠোঁট থেকে । একই ভাবে চড়াও হয় মস্তিষ্ক । দপ করে ক্ষিপ্ততা ঠিকড়ে ওঠে নরম মুখাবয়বে ।
চোয়াল শক্ত অবস্থাতেই চোখাচোখি হয় দুই যুবকের । বেশ অনেকটা সময় ক্ষুব্ধতা নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল । বহু বছর পর মুখোমুখি হলো দু’জনে । কত রাগ, ক্ষুব্ধতা জমানো,, তা ক্রমশ দগ্ধ হয়ে জেঁকে উঠলো ।
দাঁত পিষে মেঘার হাত শক্ত করে চেপে ধরলো ইয়াশ । ইয়াশের দৃষ্টি অনুসরণ করে রৌদ্রের দিকে তাকানো মাত্রই ধক্ করে উঠলো মেঘা । মুচড়ে উঠলো বুকটা । টলমল চোখ জোড়া কাঁপলো ।
রৌদ্র এক ঝলক মেঘার দিকে তাকায় । কিছু বলে না । বরং এলোমেলো কদমে হাঁসফাঁস করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায় । আদ্র কে পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে যায় সে । আদ্র অবাক লোচনে দেখলো ভাইয়ের কান্ড । অবান্তর সব চিন্তায় এলোমেলো হয়ে গেলো সে ।
রৌদ্র কোনো রকমে ঘরে ঢুকেছে । শ্বাস ফেলছে হাঁসফাঁস করে । যেনো দম ফুরিয়ে এসেছে বুকে । হা করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে । আচমকা কেমন ভয় লাগছে । ধড়ফড় লাগছে । ও মেঘা কে হারিয়ে ফেলবে না তো ? আগাম বার্তাহীন ইয়াশ এসেছে । মেঘা কে এখন দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে ও ?
না , না কিছুতেই না । দুদিকে মাথা ঝাঁকায় রৌদ্র । বুক চেপে ধরে ঢোক গেলে । গলা শুকিয়ে কাঠ । বুক ফেটে যাচ্ছে বোধহয় । এদিক ওদিক তৃষ্ণার্ত লোচনে তাকালো । জগে পানি নেই । এককোণের মিনি ফ্রিজটা রিপেয়ার করা হয়েছে । রৌদ্র গিয়ে সেটা খুললো । দুটো উইস্কির বোতল পড়ে আছে । লাস্ট কদিন ধরে রৌদ্র এসব ছুঁয়েও দেখে নি । আজ আবার হাতে তুললো । কম্পিত হাতে বোতল তুলে ঢকঢক করে পুরো বোতল ফিনিস করলো ।
থামলো না আর । যেভাবে ধড়ফড়িয়ে উপরে উঠেছিলো , ঠিক সেভাবেই আবার নিচে নামলো । এতক্ষণে বাড়ির দুই কর্তার মুখোমুখি হয়েছে ইয়াশ । হেসে হেসে কুশল বিনিময় করেছে । দীর্ঘ চব্বিশ ঘণ্টার জার্নি ছিলো । চেহারায় কিছুটা অবসন্নতার ছাপ , তবুও যেন খুব পরিপাটি, সুদর্শন ছেলেটা । মেঘার হাত শক্ত করে ধরে আছে এখনো । তোফায়েল কাবির ওকে ফ্রেশ হওয়ার জন্য উপরে যেতে বললেন । বাকি সব পরে হবে । বাধ্যের ন্যায় তাই শুনলো ইয়াশ । মেঘার দিকে ফিরে মুচকি হাসলো । মেয়েটার চোখ ভেজা এখনো । তা দেখে ধীরে বললো…..
” চল….
পিছু ফেরা মাত্রই মুখোমুখি রৌদ্র । রাগে তামাটে মুখশ্রী । পূর্বাভাস হীন সে ইয়াশের থেকে ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিলো মেঘাকে । ধাক্কা খেয়ে এক কদম পেছালো ইয়াশ । বিলম্ব করলো না রৌদ্র । মেঘা কে টেনে বাহুডোরে আবদ্ধ করলো । ইয়াশের দিকে অগ্নি চক্ষু তাক করে বিভৎস রাগে শাশিয়ে বললো….
” খবরদার,,, ইভারা আমার । ওর যেই হোস না কেনো তুই , ছুঁবি না ওকে । ও শুধু আমার । কোত্থাও যেতে দেবো না আমি ওকে । কোত্থাও না ।
কন্ঠে ক্ষিপ্ততা , তবে চোখ ভেজা । ঘোলাটে দুচোখ । ফিরলো মেঘার দিকে । রাগ দমালো । হাসলো ভেজা চোখ নিয়ে । বললো রমনীর দু বাহু আঁকড়ে ধরে….
” ই…ইভারা , তুই শুধু আমার , তাই না ? তুই তো আমার , কোথায় যাবি আমায় ফেলে ? আমার সাথে থাকবি তুই । সবসময় থাকবি । চল , আ… আমার রুমে চল….
মেঘার বাঁধা দেওয়ার বা কিছু বলার অপেক্ষা করলো না সে । রমনীর হাত টেনে ধরে তড়িঘড়ি করে উপরে উঠতে লাগলো । যেনো পালাচ্ছে । পালাতে পারলেই বাঁচে ।
ইয়াশ রেগে যায় । রৌদ্র কে আটকাতে গেলে বাঁধা দেন তোফায়েল কাবির ।
” ইয়াশ ,, বাবা শান্ত হও । জার্নি করে এসেছো, ঠান্ডা হও আগে । এসবে পরে চোখ দিও । এভাবে হুট করে এসেছো , আসার আগে জানালেও না । যাই হোক , গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও এখন ।
রৌদ্র উদ্বিগ্ন , উন্মাদ । যেনো ভীষণ ভয় পেয়ে আছে ।এলোমেলো হয়ে গেছে সে ।
ঘরে ঢুকে ধাম করে দরজা আটকে দিয়েছে । মেঘা কে ছাড়ে নি এক মুহুর্ত । উন্মত্তের ন্যায় হাঁসফাঁস করছে । অস্থির তার চলন ।
মেঘা বুঝতে পারছে না কিছু । অস্থির চিত্তে নীরবে অবলোকন করছে কেবল । রৌদ্র ওর বাহু চেপে আঁকড়ে ধরলো ।
” এই, এই, এই,, তোকে কোথাও যেতে দেবো না আমি । বাইরে যাবি না তুই ! এখানে এই চার দেয়ালের মাঝে থাকবি । কারোর কাছে যাবি না । ঐ ইয়াশের কাছেও না । কোত্থাও না ।
বলতে বলতে পাগলের ন্যায় অস্থির হয়ে উঠলো । মেঘা সামলায়…..
” রৌদ্র , এমন করছেন কেনো আপনি ? কি হয়েছে ? এইতো আমি আছি ?
দমে যায় রৌদ্র । স্থির হয়ে তাকায় । ওর ভেজা দৃষ্টি । ভিজে জবজবে কপোল । মেঘা আঁতকায়…..
” এ কি ! আপনি কাঁদছেন ? চোখে পানি আপনার ? কি হয়েছে ? এভাবে কাঁদছেন কেনো ?
” ভয় হচ্ছে আমার । ভীষণ ভয় হচ্ছে । তোকে হারানোর ভয় । মনে হচ্ছে হারিয়ে ফেলবো আমি তোকে । ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাবি তুই ? হারিয়ে যাবি আমার থেকে ?
” হারাবো ? কোথায় হারবো আমি ?
রৌদ্র শুনলো । উন্মাদনা ছেড়ে আচমকা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মেঘা কে । বক্ষ পিঞ্জরে তান্ডব চলছে তার । কি করে বোঝাবে ? ভয় হচ্ছে যে ভীষণ । এতো দিন তো এভাবে ভয় লাগে নি । পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে । ভয় ঘিরে ধরেছে হঠাৎ ।
সে সব আতঙ্ক দমিয়ে স্থির হয়ে গেলো । মুখ গুজে নিলো একবিংশীর কাঁধের ভাঁজে । চুল খোলা রমনীর । সে নাক ডুবিয়ে সুঘ্রাণ টানলো । বললো হাঁপিয়ে যাওয়া দূর্বল স্বরে…..
” তুই চলে যাবি আমায় ছেড়ে ? বল না সত্যি করে ! শোন, আমি কিন্তু মরে যাবো তুই চলে গেলে । বাঁচবো না তোকে ছাড়া ! দেখবি দম বন্ধ হয়ে মরে যাবো একদম । তুই চাস আমি মরে যাই ? চাস না তাইতো ? তাহলে ছেড়ে যাস না আমায় । আমি মরতে চাই না, বাঁচতে চাই তোর সাথে । ভালোবাসি আমি তোকে । প্লিজ আমাকে মেরে ফেলিস না এভাবে ।
মেঘা নিজের কাঁধে ভেজা ভেজা কিছু অনুভব করলো । লোকটার চোখের নোনা জল । আতঙ্কে শুল্ক ঢোক গিললো রমনী । আলগোছে রৌদ্রের পিঠে হাত বুলিয়ে বললো আদুরে গলায়…..
” কি হয়েছে আপনার ? এইতো আমি আছি আপনার কাছে ! এমন করছেন কেনো ? শান্ত হোন । পানি খাবেন ! ছাড়ুন আমায় , আমি পানি দিচ্ছি ।
রৌদ্র এক কথাতেই ছাড়লো ওকে । অবাধ্য হলে যদি মেঘা রেগে যায় ? যদি ত্যাড়ামো করে রৌদ্র কে ফেলে যায়, তখন ?
মেঘা রৌদ্র কে খাটের একপাশে বসায় । পানির গ্লাস তুলে এগিয়ে দেয় । লোকটার ভেজা চোখ দেখে কাঁপে বক্ষস্থল । তবুও সংযত রাখে নিজেকে ।
রৌদ্র পানি খেলো না , গলা শুকিয়ে কাঠ । তবুও গ্লাস ফিরিয়ে দিলো । মেঘার হাত টেনে জড়িয়ে নিলো ওকে । সে বসে থাকার দরুন তার মাথাটা ঠাই পেলো রমনীর বুকে । একবিংশীর বুকের মাথা গুঁজে ভেজা স্বরে বলল….
” ইয়াশ তোকে কেড়ে নিয়ে যাবে আমার কাছ থেকে ! চলে যাবি তুই ?
মেঘা লোকটার চুলের ভাঁজে আঙ্গুল চেপে প্রত্যুত্তর করলো নরম কন্ঠে…..
” উঁহু, যাবো না !
” যদি জোর করে ? ভুল বোঝায় , আমার নামে বদনাম করে , তখন ?
” বুঝবো না ভুল !
” সত্যিই ?
” একদম সত্যি !
” তারমানে আমার কাছে সারাজীবন থাকবি ?
” হুঁ , পুরো জীবন ।
” ইয়াশ কে ফিরিয়ে দিবি ?
” দেবো !
” যদি না মানে ?
” মানবে ! আমার ভাইয়া খুব ভালো ।
” ও তোকে নিতে এসেছে, এতো সহজে মানবে না ! আমার শান্তি কেড়ে নিয়ে যাবে ও ।
” কাড়তে পারবে না । আমার ভাইয়া আমাকে খুব ভালোবাসে । আমি যা বলবো তাই শুনবে । ও তো হঠাৎ করে আমাকে সারপ্রাইজ দিতে এসেছে । জানেন, পুরো তিন বছর পর ফিরেছে । আপনি আমাকে রেখে যাওয়ার পর এসেছিল দাদু মনির মৃত্যুতে । তারপর মাঝে আরো একবার এসেছিলো সেই তিন বছর আগে । এরপর আর আসে নি । আপনার সাথে তো কখনো দেখা হয়নি, তাই আপনি ভাইয়াকে চেনেন না । ও আমার ছোট ভাইয়া । আমার একমাত্র আপনজন । ওর পুরো পৃথিবী শুধু আমাকে ঘিরে । আমাদের তো আম্মু আব্বু নেই । কেবল আমরাই একে অপরের । আমি ছাড়া ওর আর কেউ নেই । কিন্তু ও ছাড়া আপনি , এই পরিবারের সবাই আছে আমার । আমি কোথায় যাবো আপনাদের ছেড়ে ? কোত্থাও যাবো না ।
” তারমানে ইয়াশের কথা শুনবি না ?
” ভাইয়া আমার কথা শুনবে । ও আপনার উপর রেগে আছে , আপনি তো কাজটা ভালো করেন নি । রেগে থাকারই কথা । তবে দেখবেন , ও যখন আপনাকে চিনবে, যখন জানবে আপনি আমাকে ভালোবাসেন , তখন সব রাগ ভুলে যাবে । ঠিক আমার মতো ।
রৌদ্র মৃদু হাসলো । ওকে চেনা বাকি নেই ইয়াশের । এই পাগল মেয়ে তো তা জানে না ।
” আমি তোকে ভালোবাসি, এটা জানিস তুই ?
” জানি তো ,, যে আমাকে হারানোর ভয়ে কাঁদতে পারে , তার ভালোবাসা বুঝবো না আমি ? আপনি আমাকে হারানোর ভয়ে কাঁদছেন এভাবে ? ভয় পাচ্ছেন ?
” সত্যিই ভয় হচ্ছে , যদি হারিয়ে যাস ! আমি পারবো না তোকে ছাড়া বাঁচতে । মরে যাবো । মরে যাওয়া টা যদি সহজ হয়, তাহলে কান্না করাটা আর কি কঠিন ব্যাপার ! আমি কখনো কাঁদিনি, জানিস ? কারোর জন্য কাঁদিনি ।
ছেড়ে যাস না আমায় । সত্যিই মরে যাবো । হঠাৎ করে খুব ভয় হচ্ছে আমার । তোকে হারিয়ে ফেলার ভয় । দেখ , হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে ।
” ভয় পেতে হবে না , হারাবো না আমি । বলছি তো থাকবো সারাজীবন ।
” কথা দে , সারাজীবন থাকবি আমার সাথে । ইয়াশের কথায় ভুল বুঝে ফেলে যাবি না আমায় !
” কথা দিলাম ।
” এখনো ঘৃণা করিস আমায় ?
” না !
” ভালোবাসিস ?
মেঘা উত্তরে কিঞ্চিত দ্বিধাগ্রস্ত হলো…..
থেমে অস্ফুটে উচ্চারণ করলো…..
” বাসি !
” আমিও বাসি , ভীষণ ভালোবাসি ।
মেঘা এক চিলতে হাসে । রৌদ্র কে একটু সরায় নিজের থেকে । লোকটার ভেজা দু চোখ আলগোছে মুছিয়ে দেয় ।
” আপনি না বাচ্চাদের মতো করে কাঁদছেন ! এমন করে কেউ ! কোথায় আপনার সেই রাগ,তেজ, বেপরোয়া সত্তা ? আমাকে হারানোর ভয়ে নিমিষেই নিঃশেষ হলো ?
” নিঃশেষ তো অনেক আগেই হয়েছি ।
রাত তখন একটা প্রায় । চোখে ঘুম নেই রৌদ্রের । আনচান হৃদয় নিয়ে ছাদে পায়চারি করছে সে । সিগারেট ধরিয়েছে অনেক দিন পর । বেশ কয়েকটা শেষ করেছে । দু আঙ্গুলের ফাঁকে আরো একটা পুড়ছে । পোড়াচ্ছে রৌদ্র কেও ।
স্থির থাকতে পারছে না বেপরোয়া যুবক । এমতসময় ছাদে আগমন ইয়াশের । রৌদ্র কে দরজার কাছ থেকে দেখেই পৈশাচিক হাসলো ঠোঁট বাঁকিয়ে । রাগে দাঁত চেপে এগিয়ে আসলো । রাতে ঘুমানোর অভ্যাস কম । ঘুমহীন রাত কাটানো স্বভাব হয়ে গেছে ওর ।
সিগারেট টানতেই এসেছে এখানে । নিঃশব্দে একপাশে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালো । দুবার ফুঁকে হাঁক ছেড়ে বললো টেনে টেনে…….
” রুডভিক কাবির রৌদ্র ,,, ওরফে রুডি ! হোয়াটসঅ্যাপ ? বহু বছর পর দেখা !
তড়াক করে তাকায় রৌদ্র ।
” তুই ?
” হু , আমি ! #ইয়াশ_আহসান ,, মনে পড়েছে আমায় ? ভুলে গেছিস ? অবশ্য ভুলে যাওয়ার কথা নয় । বন্ধুকে ভোলা যায় , শত্রু কে না । আর আমি তো কস্মিনকালেও তোর বন্ধু ছিলাম না । তাই আমাকে ভোলার নো চান্স ।
সব রাগ সমেত তেড়ে গেলো রৌদ্র……
” কেনো এসেছিস এখানে ? আমার বাড়ি এটা !
” জানি তো , এটা তোর বাড়ি । বোধহয় ভুলে গেছিস , আমার বোনকে খুঁটি করে এবাড়িতে গেঁড়ে রেখেছিস । আর সেই খুঁটি উপড়ে ফেলতেই এসেছি আমি । গোড়া সমেত উপড়ে ফেলতে এসেছি ।
আঙ্গুলের ফাঁকের সিগারেট টা হাতের মুঠোয় পিষলো রৌদ্র । চাঁদের আলোয় তামাটে চেহারার রাগ ঠিকরে বেরোচ্ছে । দাঁত পিষে শাশালো সে……
” খবরদার ইয়াশ ,, জানে মেরে এ বাড়ির মাটিতেই পুঁতে রাখবো , যদি আমার ইভারা কে আমার থেকে সরানোর চেষ্টা করিস তবে ।
শব্দ করে হাসলো ইয়াশ । পরক্ষনে আচমকা হাসি থামালো….
” তোর ইভারা ? হাউ ফানি ! বোন ও আমার । জানে মেরে তোকে পুঁতে রাখবো , যদি ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করিস তবে । তোর শত্রুতা আমার সাথে । আমি তো ছেড়ে দিয়েছিলাম তোকে , কোনো ক্ষতি করিনি । চলে গেছিলাম অনেক দূর । রাগে জেদে আমার ছোট্ট বোনটাকে একা ফেলে রেখে গেছিলাম আমি । আর সেই সুযোগ কাজে লাগালি তুই ? আমার বোন তো তোর কোনো ক্ষতি করে নি । তাহলে ওকে জড়ালি কেনো এতে ? ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই । কেউ না । আরে আমরা মা বাপকে হারিয়েছি সেই ছোট কালে । এরপর যাদের পেয়েছি , তাদের তুই কেড়ে নিয়েছিস আমার থেকে । তোর জন্য বন্ধু, ভালোবাসা সব হারিয়েছি আমি । তবুও শান্তি হয় নি তোর ? আমার বোনটাকে টানলি এই অবান্তর শত্রুতায় ?
কেনোওও ? কি ক্ষতি করেছি আমি তোর ?
রৌদ্র রাগ সামলায় ……
” দেখ ইয়াশ , তোর বোনকে টানিনি আমি । ওকে জড়ায় নি এসবে । একদম ভুল বোঝাবি না ওকে । সব ভুলে গেছি আমি । এখন শুধু জানি , তোর বোন আমার সব । ওর কোনো ক্ষতি করা তো দূর, ওকে ছাড়া আমার পক্ষে বাঁচাই সম্ভব নয় ।
” তো মরে যা । বাঁচতে বলছে কে তোকে ?
” ইয়াশ , রাগাস না আমায় । সেই পুরনো রুডভিক কাবির রৌদ্র নেই আমি ।
” বদলেছিস ?
” তোর বোনের জন্য । পাঁচ পাঁচটা বছর ধরে সামলেছি নিজেকে । পরিবর্তন করেছি । দেখ , আমাদের মাঝে যা হয়েছে সব ভুলে যা ।
” ভুলবো ? কি করে ?
মেঘা কে ছাড়া তোর পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয় , তাই না ? একবার ভেবে দেখেছিস , রিসা কে ছাড়া আমি কিভাবে বেঁচে আছি ?
সুদর্শন যুবক টার গলা কাঁপলো শেষ কথাটা উচ্চারণ করতে গিয়ে । বোধহয় চোখের কোণে পানিও জমলো । তবে কেউ দেখলো না । চিকচিক করলেও আঁধারের মাঝে মিলিয়ে গেলো তা ।
রৌদ্র শান্ত হয়ে যায় । আকাশ পানে মুখ তুলে শ্বাস টানে । কোমরে হাত ঠেসে দাঁড়ায় ।
” রিসা তোকে ভালোবাসতো না !
বিকট হাসির শব্দ শোনা গেলো বিপরীতে । তাচ্ছিল্যের সুর সে হাসিতে ।
” ওও রিয়েলি ? আমার বোন তোকে ভালোবাসে বুঝি ?
” বাসে, একবার জিজ্ঞেস করেই দেখিস ! ও যাবে না আমাকে ছেড়ে । কথা দিয়েছে আমায় ।
চোয়াল খিচলো ইয়াশ,, বুঝে গেছে আগে থেকেই । কিড়মিড় করে বললো……
” মেঘা আমার বোন । তোর থেকে ওকে সরানোর জন্য সব কিছু করতে পারি আমি ! সবকিছু মানে সবকিছু ! তুই আমার থেকে আমার রিসা কে কেড়ে নিয়েছিস । আমার আরাফের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করিয়েছিস । কেড়ে নিয়েছিস আমার একমাত্র বন্ধু কে । আর তোর কাছে কি না আমি আমার বোনকে সঁপে দেবো ? নাহ , কিছুতেই না । আমি মেঘা কে নিয়ে যাবো । নিয়ে যেতেই এসেছি । তৈরি থাক ডিভোর্স পেপারে সাইন করার জন্য ।
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৫
হিসহিসিয়ে কথা গুলো শেষ করলো ইয়াশ । রাগে কপালের শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে রৌদ্রের । সে বিপরীতে আর কিছু বলার আগেই সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে গটগটিয়ে ছাদ ত্যাগ করেছে ইয়াশ ।
রৌদ্র নিস্তব্ধ খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে শান্ত করলো নিজেকে । চোখ খুলে শূন্যে তাকালো । মাথায় কিছু একটা ভাবনা এঁটে ঠোঁট বাঁকিয়ে পৈশাচিক হাসলো ।
