আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬
সুরভী আক্তার
ব্যালকনির ইজি চেয়ারটায় শরীর এলিয়ে বসে আছে মেঘা । চোখ দুটো বন্ধ । পা তুলে মাথা পিছনের দিকে এলিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে শান্ত হয়ে । কানে ব্লুটুথ । হাতের ভাঁজে ফোন । গান শুনছে হয়তো । হাঁটু ছড়ানো চুল গুলো খোলা । ইজি চেয়ার ছাপিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে চুল গুলো । মেয়েটা স্থির চিত্তে বসে আছে । কোনোদিকে খেয়াল নেই । কানে ব্লুটুথ থাকার দরুন ঘর পেরিয়ে ব্যালকনিতে কেউ উপস্থিত হয়েছে , এর আভাস পায়নি মোটেই । মেয়েটার শান্ত স্থিরতায় বিঘ্ন ঘটিয়ে বাঁ হাতে হেঁচকা টান মেরে বসা থেকে তুলে দাঁড় করালো কেউ । ঠাস করে হাতের ফোনটা মেঝেতে পড়ার শব্দ হলো । মেঘা সচকিতে সবটা বুঝে ওঠার আগেই দুটো শক্ত পোক্ত হাত দেয়ালে ঠেস মেরে চেপে ধরলো ওকে । মেয়েটার ঘন কালো চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছড়ে পড়লো মুখের উপর । যা হাঁটু ছাড়িয়ে গেছে ঢেউ খেলে । প্রথম অবস্থায় টাল সামলাতে না পেরে ভড়কালো মেয়েটা ।
পর মূহুর্তে চোখ মেলে তাকাতেই চোখ সম্মুখে অনাকাঙ্ক্ষিত একজনের মুখশ্রী দেখে নরম চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো ওর । এক নিমিষেই বিরক্তি ছাপিয়ে ক্ষুব্ধ হলো দৃষ্টি ।
রৌদ্র চিবিয়ে হিসহিসিয়ে উঠলো…..
” হেইই , হোয়াট’স ইউর প্রবলেম নাউ ? এখনো এ বাড়িতে কি করছিস হ্যাঁ ? কেনো গেড়ে আছিস এখানে ? আমার জন্য ? আমার জন্য নয় ? তাহলে কার জন্য, বল ? কার জন্য আছিস এ বাড়িতে ? এ বাড়িতে আছিস থাক , আমার মাথায় চড়ে বসলি কেনো ? হোয়াই…..?
শেষের কথাটা কন্ঠ চিপে উচ্চারিত হলো ।
মেঘা শক্ত মুখশ্রীতে শিথিলতা টানলো । হাঁফ ছেড়ে স্বাভাবিক হলো সে । রৌদ্র একে বারে ঝুঁকে পড়েছে ওর দিকে । মেঘা আলতো শক্তি খাটিয়ে ঠেলে দূরে সরালো রৌদ্র কে । গাঁ ঝাড়লো ধুলো ঝাড়ার ন্যায় । মুখের উপর আছড়ে পড়া সিল্কি চুল গুলো আলগোছে সরিয়ে দিলো । কান থেকে ব্লুটুথ খুলে দায় সারা ভঙ্গিতে ঠেস দিয়ে উচ্চারণ করলো….
” সরিইই । কিছু বললেন ? শুনতে পাই নি , রিপিড করুন !
রৌদ্রের চাহনি ধারালো তীক্ষ্ণ । খোলা বারান্দায় লালচে একটা নিভু আলো জ্বলছে । মেঘার ফর্সা চেহারা লালচে দেখাচ্ছে লাইটের আলোয় । রৌদ্রের চোয়াল শক্ত, স্থির দৃষ্টি । মেঘা সাথ সাথ প্রতিক্রিয়া না পেয়ে শ্বাস ফেলে আবার বললো…..
” আপনার সাহসের তারিফ করতে হচ্ছে । এভাবে চেনা নেই জানা নেই একটা মেয়ের ঘরে উইদাউট পারমিশন ঢুকে গেলেন ? বাহ্ , সাহস আছে বলতেই হয় !
কি,, শরীর চুলকায় মেয়েদের ছোঁয়ার জন্য ? বাহানা খোঁজেন ? বারবার টাচ্ করেন কেনো আমায় ? হু আর ইউ টু টাচ্ মি ?
রৌদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে নিলো । মেঘা ক্ষিপ্ত করেছে দৃষ্টি । ঝুঁকে এসে বললো রৌদ্র….
” এসব শেখাচ্ছে আদ্র তোকে ? এসব লেইম ছোট খাটো ইংরেজি শিখছিস ওর থেকে ? চ্যাপ্টার বাকি আছে ? ওর কাছে পড়তে যাবি ? চল আমি পড়াচ্ছি তোকে । তোর চ্যাপ্টার ক্লোজ করি চল ।
রৌদ্র মেঘার হাত খপ করে চেপে ধরতেই মেঘা ঝাড়া মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো । চোখ মুখ টাটিয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বলল…..
” হোয়াট’স রং উইথ ইউ ? বার বার ছোঁয়ার ধান্দায় থাকেন কেনো হ্যাঁ ? আর তুই তুকারি ? তুই তুকারি করছেন কার সাথে ? কে আপনি ?
” উপস সুইটহার্ট , তুই তুকারি করছি বলে পছন্দ হচ্ছে না ? আচ্ছা আর করবো না তুই তুকারি ? চলো বদলে ফেললাম ভাষা । আর ,, আমি কে ? আমাকে চিনিস , ও সরি , আমাকে চেনো না ? চলো চেনাই আমি তোমার কে ।
এর মধ্যেই ঘরের বাইরে থেকে আদ্রের উচ্চ স্বরের ডাক ভেসে আসলো…..
” মেঘ , তাড়াতাড়ি আমার ঘরে আয় । আমি কিন্তু অপেক্ষা করতে পারবো না বলে রাখলাম ।
চকিতে ক্ষুব্ধতা সমেত দরজার দিকে ফিরলো রৌদ্র । দপ করে কপালের শিরা ফুলে উঠলো । মুচকি হাসলো মেঘা । রৌদ্রের দিকে তাকিয়েই উত্তর করলো গলা বাড়িয়ে…..
” যাচ্ছিইই , তুমি যাও….
রৌদ্র তাকাতেই হাসির রেখা বাড়ালো । মেঝে থেকে ফোনটা তুলে রৌদ্র কে কাটিয়ে বারান্দা ছাড়লো । ঘরে ঢুকে টেবিলের উপর থেকে বই নিয়ে গুনগুন করতে করতে ত্যাগ করলো ঘর । উপেক্ষিত হয়ে হাত মুঠো করে সজোরে দেয়ালে পাঞ্চ করলো রৌদ্র । পিষে ফেললো দাঁত ।
মেঘা ঘর হতে বেরিয়েই টুকটুকির মুখোমুখি হয়েছে । টুকটুকি ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করলো…..
” তোর আবার কিসের চ্যাপ্টার বাকি আছে ?
” আছে । আমার যেটা বাকি আছে , সেটা তোর ও বাকি আছে । এখন চল…
” এই না । আমি যাবো না । এখন কি আর পড়াশোনা করার সময় বল ? আমি ঘুমাবো । ছাড় আমায়, আমি পড়বো না ভাইইই….
” তুই পড়বি না তোর ঘাড় পড়বে । চল….
বলেই টেনে টুনে নিয়ে গেলো মেয়েটা কে ।
ওরা আদ্রের ঘরে ঢোকা অবধি পিছন থেকে ক্ষুব্ধ নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রৌদ্র ।
রাত্রি এগারোটা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ ।
আহিয়ান খাটের ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে । অফিসের কাজ করছে ।
সিরাত বাবুর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আহিয়ানের দিকে তাকালো । ঘুমিয়েছে বাবু । আলগোছে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে উঠে বসলো সিরাত । আহিয়ানের কাছ ঘেঁষে নিজেও হেলান দিলো ব্যাক বোর্ডে । আলগোছে আহিয়ানের বাহু জড়িয়ে মাথাটা নামিয়ে কাঁধে রাখলো । ল্যাপটপ থেকে মনযোগ সরালো আহিয়ান । মৃদু হাসলো । বাম হাতে কাজ চালিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে পিছন থেকে ঘাড় গলিয়ে আলতো করে সিরাতের বাহু জড়িয়ে ধরলো । অতঃপর আবার মনযোগ ফেরালো কাজে । সিরাত চুপ থাকলো বহুক্ষণ । অতঃপর গলা ভিজিয়ে শীতল কন্ঠে বললো ….
” একটা কথা বলি ?
” না । বলবে না কোনো কথা ! কারন, যা বলবে তা আমি শুনতে চাই না ।
অগত্যা চুপসে গেল সিরাত । ও কি বলবে , আহিয়ান তা আন্দাজ করতে পেরেছে । সিরাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললো….
” একবার ভেবে দেখলে হয় না ?
” আমি ভাবতে চাই না ।
” কিন্তু আমি চাই । আমি একটা সংসার চাই,আহিয়ান…
” আছে তো আমাদের সংসার ।
” এটাকে সংসার বলে না ।
” তুমি যেটাকে সংসার ভাবছো , ভাবতে চাইছো , যেখানে যেতে চাইছো , সেটাকেও সংসার বলে না ।
” সবটা বদলেছে , সময় পেরিয়েছে , কিছুই আর আগের মতো নেই । তিন – তিনটা বছর কেটেছে এভাবে ! আর কতো ? চলো আর একটা বার সুযোগ নিয়ে ফিরে যাই , এখন তো আমাদের বাবু হয়েছে । আর কোনো চিন্তা নেই এখন । আগের সবটা ভুলে যাও…
” ভুলে যাবো আমি ? ভুলতে বলছো আমায় ? আমি তো কোনো দিন ভুলবো না । তুমি হয়তো ভুলতে চাইছো , দাঁড়াও মনে করাচ্ছি তোমায়….
সিরাত কে ছাড়লো আহিয়ান । ল্যাপটপ বন্ধ করে পাশে রাখলো । ঘরে একটা নিভু আলো জ্বলছে । রামিশার ঘুমের দরুন হাই পাওয়ারের আলো জ্বালানো হয় নি । ফোনের ফ্লাস জ্বালালো আহিয়ান । সিরাতের ডান হাতটা টেনে ধরলো । ফ্লাস তাক করলো সেই হাতের কব্জির নীচের দিকে । সহসা তীর্যক আলোয় পুরনো একটা কালো পোড়া দাগ ফুটে উঠলো ফর্সা হাতে । সেই দাগকে ইশারা করে শক্ত কন্ঠে বললো আহিয়ান…
” এই দাগটা দেখছো ? মনে পড়লো কিছু ? যদি মনে পড়ে থাকে , তাহলে দ্বিতীয় বার আমাকে আর সবটা ভুলে যেতে বলবে না । যেখানে আমি কখনো জোর পূর্বক তোমাকে স্পর্শ অবধি করিনি , সেখানে ওরা তোমার শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে । কি করে ভুলবো সবটা ?
ফ্লাস নেভালো আহিয়ান । পিটপিট করে চোখ নামিয়ে নিলো সিরাত । অসহায় কন্ঠে বললো….
” আমি চাই আমাদের একটা আলাদা সংসার হোক । এভাবে সারা জীবন বাপের বাড়িতে কাটাতে চাই না আমি । আমি আমার নিজের একটা আলাদা সংসার চাই …
” হবে , আমাদের নিজেদের একটা সংসার হবে এবার । থাকতে হবে না তোমায় এ বাড়িতে । তবে হ্যাঁ , ও বাড়িতে ফেরার কথা ভুলেও ভাববে না । কারন ও বাড়িতে ফিরবো না আমরা । আর কিছু দিন যাক , বাবু একটু বড় হোক , তুমি একলা সামলাতে শিখে নাও ওকে । তারপর আমরা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো । নতুন বাড়িতে নতুন করে শুরু করবো সবটা । নতুন করে সংসার পাতবো । যে সংসারে তুমি , আমি আর আমাদের রামিশা থাকবে । হবে না এতে ?
সিরাত কিছুই বললো না ।
আবছা আলোয় তাকিয়ে রইল নিজের হাতের পোড়া দাগটার দিকে । এই দাগটা আফিফা নেওয়াজের দেওয়া । তার অত্যাচারের চিহ্ন হয়ে থেকে গেছে ।
সিরাত আর আহিয়ানের বিয়েটা হয়েছিলো পারিবারিক ভাবেই । তবুও মাঝে মাঝে অবাকই হয় সিরাত । অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করেও যে মন বোঝার মতো এতোটা যত্নশীল, কোমল হৃদয়ের কাউকে পাওয়া যায়, তা সে কভু কল্পনাও করে নি ।
ওদের বিয়ের প্রথম বছরটা ঠিকঠাক ভাবেই কেটেছিল । ওদের বিয়ের পরের বছর আহিয়ানের ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয় । তার পর থেকেই শুরু হয় অশান্তি । সিরাত অসহ্য হয়ে পড়ে ও বাড়ির সবার কাছে । অবশ্য সহ্যই বা কবে ছিলো ? জোরপূর্বক ও বাড়ির লোক সিরাত কে মানিয়ে নিয়েছিলো ।
আহিয়ান দিনের পুরো ভাগটাই অফিসে থাকতো । বাড়িতে একলা থাকতো সিরাত । অন্যরা কেউ ওর সাথে কথা বলতো না সেভাবে । খাওয়া নেওয়া কোনো কিছুতেই সিরাতের খোঁজ খবর নিতো না । প্রথম বছর থেকেই বাচ্চার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে সিরাত কে । আহিয়ান এসব কিছুই জানতো না । ওর পরিবারের লোক ওর সামনে এক , আর পেছনে আরেক ছিলো । বাড়ির সব কাজ সিরাত নিজেই করতো । ও বরাবর চাপা স্বভাবের । মুখ ফুটে বলতো না কিছু । কখনো অভিযোগ করতো না । প্রতিবাদ করতো না ।
মুখ বুজে সবটা সহ্য করতো । বাড়ির সব কাজ করতো মুখ বুজে । আফিফা নেওয়াজ তার ছোট ছেলের বউকে যতটা যত্নে রাখতেন, বড় ছেলের বউ কে ঠিক ততটাই অযত্নে ফেলে রাখতেন । অবমাননা করতেন ।
এমনকি এক পর্যায়ে সীমানা পেরিয়ে ওর গায়ে অবধি হাত তুলতেন । তবুও সিরাত স্বাভাবিকের ন্যায় ছিলো । আহিয়ান কে সাহস জুগিয়ে কিছু বলার মতো সাহস পায় নি কখনো । কেননা ,আহিয়ান যদি ওকে ভুল বোঝে , তখন ? আহিয়ান যদি নিজের পরিবারের ফড়ে কথা বলে , যদি সিরাত কে অবিশ্বাস করে ? তখন কি হবে ? এই ভয়ে সিরাত মুখ খুলতো না । নিজের পরিবার,মা বাবা ছেড়ে আহিয়ান সিরাতের হয়ে কথা বলবে না নিশ্চয়ই ! এ নিয়ে সংশয় ছিলো সিরাতের মনে । সর্বদা ভয়ে তটস্থ থাকতো সে ।
বিয়ের দ্বিতীয় বছরেও যখন সিরাত কনসিভ করলো না , তখন সবকিছুর মাত্রা ছাড়িয়ে যায় । ও বাড়ির লোক কথায় কথায় অপদস্থ করা শুরু করে সিরাতকে । অত্যাচারের মাত্রা বাড়ে । এমনকি সিরাত কে ছেড়ে সিরাতের সম্মুখে আহিয়ানের দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার কথাও বলেন নেওয়াজ পরিবারের লোক ।
কাবির পরিবারের কাছেও এসবের কোনো হোদিস ছিলো না । আহিয়ান সন্দেহভাজনে সিরাতকে কখনো কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলে বরাবর এড়িয়ে যেতো সিরাত । কথা ঘোরাতো ।
কিন্তু সবটা তো আর চাপা থাকে না । এক পর্যায়ে যখন সবটা জানাজানি হয় , তখন ক্ষুব্ধতা সংবরন করতে পারে নি আহিয়ান । সিরাতের জন্য নিজের মা বাবাকে ছাড়তে দুবার ভাবে নি সে । আহিয়ান লজ্জিত । নিজের মা বাবা , পরিবারের কর্মকান্ডের জন্য সে নির্বিণ্ণ । সিরাতের সামনে নিজেকে ছোট মনে হয় ওর । সিরাত কে ও ছাড়তে পারে নি । ও পরিবারের লোক সিরাত কে বন্ধা অপবাদ দিয়ে আহিয়ানের দ্বিতীয় বিয়ে দিতে চেয়েছিলো । কিন্তু আহিয়ান , সে এসবে মানে নি । নিজের পরিবারের তোয়াক্কা করে নি সে ।
বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর ভাড়া বাড়িতে উঠেছিল ওরা । পরবর্তীতে তোফায়েল কাবিরের কথায় এ বাড়িতে আসতে হয়েছে ।
অতীত চারনেই খুবলে উঠলো সিরাত । বিষিয়ে গেলো অন্তর । মন কোঠরে পুরনো ব্যাথারা দগদগে হয়ে জেঁকে উঠলো । দুঃখি হয়ে মাথা নুইয়ে খচখচ করলো মেয়েটা । আহিয়ান চুপটি করে দীর্ঘক্ষণ পরখ করলো ওকে । অতঃপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সিরাত কে টেনে নিলো নিজের কাছে । আলতো করে জড়িয়ে নিলো । সিরাত ওর বুকে মাথা ঠেকিয়ে এলিয়ে পড়লো । আহিয়ান আলতো করে চুমু খেলো সিরাতের সিঁথি বরাবর । অতঃপর বললো মোলায়েম স্বরে….
” আর কিছু ভাবতে হবে না তোমায় । ঘুমাও এখন । সারাদিন রামিশার পেছনে অনেক ধকল যায় । দেখেছো চেহারার কি হাল হয়েছে তোমার ? এবার একটু বাচ্চার সাথে সাথে নিজের দিকেও খেয়ালি হও । আমার বউটা দিনকে দিন শুকিয়ে যাচ্ছে ।
” আচ্ছা , তাই পছন্দের মাত্রা কমে আসছে বুঝি ?
হাসলো আহিয়ান । হাতের বাঁধন শক্ত করলো এবার কপালে গাঢ় চুমু খেলো শব্দ করে । বললো কন্ঠ খাদে নামিয়ে….
” কোনো দিন না । পছন্দের মাত্রা বাড়ছে আরো বেশি । এতো সুন্দর বউয়ের উপর থেকে পছন্দের মাত্রা কমতে পারে কখনো ? তোমার উপর আমার পছন্দ আর ভালোবাসার গভীরতা কেবলই বেড়ে চলে , কমার নো চান্স ।
সকাল দশটা বাজতে চললো । আজ ভার্সিটি নেই । টুকটুকি এখনো দেধাড়ছে ঘুমোচ্ছে । হেলদোল নেই কোনো । ভার্সিটি না থাকলে এভাবেই ঘুমায় ও । মেঘাও ঘুমায় । তবে ও উঠে পড়েছে । ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতে নামতে আদ্রকে দেখলো সে । এতক্ষণে সবাই যে যার কাজে চলে গেছে । শুভ্র অফিসে চলে গেছে । তোফায়েল কাবির আর তৌসিফ কাবির ও চলে গেছেন অফিসে । ব্রেকফাস্ট শেষ সবার । আদ্র ড্রইং রুমের সোফায় বসে বসে ফোন ঘাটছে । মেঘা ওকে কয়েক পলক দেখে কিচেনের দিকে এগোলো । শাহিনা কাবির তরকারি কষাচ্ছেন । নিচে বসে বটিতে মাছ কাটছেন রুবিনা কাবির । মেঘা আলতো হেসে পেছন থেকে আলগোছে শাহিনা কাবির কে জড়িয়ে ধরলো । হাই তুলে নরম কন্ঠে বলল….
” গুড মর্নিং , মনি….
স্মিথ হাসলেন শাহিনা কাবির । কোমল সুরে বললেন….
” উঠে পড়েছিস ? কি খাবি বল ? হটপটে গরম পরোটা রাখা আছে । ডিমের অমলেট করে দেবো..?
” না , মনি । এখন কিছু খাবো না । শুধু কফি খাবো ।
বলতে বলতে কফি বসালো মেঘা । রুবিনা কাবির মুখ কুঁচকালেন । মেঘা চুলা জ্বালিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক চেয়ে এবার তার উদ্দেশ্যে বললো….
” গুড মর্নিং, মামনি ?
” মর্নিং আছে এখনো ? কটা বাজে খেয়াল আছে ? দশটা পেরিয়ে গেছে । কোন বাড়ির মেয়ে-বউ এতো সকাল অবধি ঘুমায় ?
মেঘা থামলো । শিথিল মুখশ্রী বিকৃত করলো সহসা । বউ সম্বোধন টা ঘৃণিত লাগলো ওর কাছে । শাহিনা কাবির পরিস্থিতি বুঝে ঝটপট বললেন….
” আহ্ রুবিনা । কিসব বলছিস ?
মেঘা , শাফাহ্ এখনো ঘুমাচ্ছে ? ঘুম থেকে ওঠে নি ও ?
শুকনো উত্তর করলো মেঘা….
” না ।
অতঃপর কফি নিয়ে বেরিয়ে এলো কিচেন থেকে ।
আদ্রের পাশে সোফায় বসলো ! উদাস হয়ে চুমুক বসালো কাপে । আদ্র এক পলক চেয়ে প্রশ্ন করলো….
” ঘুম হলো এতক্ষণে ?
উত্তর করলো না মেঘা । আদ্রের দিকে তাকালো । খুব মনযোগ সহকারে ফোন ঘাটছে আদ্র । নতুন ফোন কিনেছে আবার । আগের টার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি । লাস্ট লোকেশন বাড়িতেই ছিলো । মেঘা জিজ্ঞেস করলো…
” নতুন ফোন কিনেছো ?
” হুম !
” কি করছো ফোনে ?
” কিছু না ।
কপালে ভাঁজ ফেললো মেঘা । আদ্র ওর দিকে আনমনা । কিছু তো একটা করছে ফোনে । মেঘা একটু উঁকি দিতেই ফোন সরিয়ে নিলো আদ্র ।
” কি দেখছিস ?
” তুমি কি করছিলে তাই দেখছিলাম । লুকাচ্ছো কেনো ফোন ?
” লুকাতে যাবো কেনো ?
” তাহলে দেখাও কি করছিলে !
” তোকে দেখাবো কেনো ?
” প্রেম করছো ফোনে ? আমি লক্ষ্য করেছি , মিটিমিটি হাসছিলে । কার সাথে কথা বলছিলে বলতো ?
আদ্র শ্বাস ফেললো । খানিক মশকরা করে চোখ টিপে বলল….
” ইটস্ ঠু সিক্রেট ডিয়ার ।
মেঘা চিকচিক করে উঠলো । উচ্ছাসিত হয়ে বললো….
” সিরিয়াসলি প্রেম করছো ?
ফোনে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো আদ্র । রাশভারী গলায় বলল….
” টুকটুকির রোল প্লে করতে এসেছিস ?
মৃদু হাসলো মেঘা । কফিতে পরপর কয়েকটা চুমুক বসালো । মগটা বাড়িয়ে টি টেবিলের উপর রাখলো । সন্তর্পণে উঠে দাঁড়ালো । পা টিপে দু পা এগিয়ে ছোঁ মেরে আদ্রের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো । ভড়কালো আদ্র । মেঘা ছুট লাগালো সিঁড়ির দিকে । আদ্র ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে ধাওয়া ধরার আগেই গলা উঁচিয়ে বললো…..
” মেঘ ফোন দে আমার , ফাজলামো করবি না একদম । ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছি আমি ।
মেঘা শুনলে তবে তো ? পড়নের স্কার্ট টা উঁচিয়ে ধরে পায়ের দিকে তাকিয়ে সিঁড়ি উঠতে লাগলো টপাটপ । চার ধাপ সিঁড়ি ওঠার আগেই ধাক্কা খেলো শক্ত খাম্বা মতো কিছু একটার সাথে । আকস্মিক বাঁধা পেয়ে সিঁড়িতে পা উঁচু নিচু হতেই বেসামাল হয়ে পেছনের দিকে পড়তে নিলো । তবে পড়লো না । ডান হাত টেনে আটকে ফেললো কেউ । এক মুহুর্তে ভয়ে চোখ মুখ খিচলো মেঘা । পড়ে নি এটা অনুধাবন হতেই পিটপিট করে চোখ খুললো । অমনি রৌদ্রের নিরেট শ্যামলা মুখশ্রী নজরে পড়লো । প্যান্টের পকেটে এক হাত গুজে অন্য হাতে আরামছে মেঘা কে পড়া থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে ও । দুজনের দৃষ্টির মিলনের মাঝেই নিচ থেকে আদ্র চেঁচালো ভড়কানো গলায়….
” মেঘ , ঠিক আছিস ? তোকে বললাম ছুটবি না ! এক্ষুনি পড়ে গেলে কি হতো ?
আদ্রের কথা কর্নপাত হাওয়া মাত্রই রৌদ্র হাত ছেড়ে দিলো মেঘার । আর ঠিক থাকলো না মেয়েটা । ছাড়া পাওয়া মাত্রই ঠাস করে পড়ে গেলো পিছনের দিকে । সোজাসুজি কোমড় চড়কে পড়লো মেয়েটা । অমনি ব্যাথায় চোখ খিচে মৃদু আর্তনাদ করে কুকিয়ে উঠলো । চেঁচালো আদ্র….
” মেঘ !!
কিচেন থেকে ছুটে আসলেন শাহিনা কাবির , পিছু পিছু রুবিনা কাবির । আদ্র তেড়ে আসলো । কোমরে হাত ঠেসে মেঝেতে ব্যাথাতুর মুখো ভঙ্গিমা নিয়ে পড়ে আছে মেঘা । পদ যুগল এখনো সিঁড়িতে । আদ্র হকচকিয়ে গেলো । মেঘাকে সামলে ধরলো দু’হাতে । বিচলিত হয়ে পড়লো সে….
” মেঘ , আর ইউ ওকে ? ব্যাথা পেয়েছিস ? লেগেছে কোমরে ? ঠিক আছিস তুই ?
মেয়েটার কোমরে লেগেছে ভীষণ । খাঁড়া ভাবে আচমকা পড়েছে । লাগারই কথা । রুবিনা কাবির সবটা বোধগম্য করতে না পেরে মেঘা কে ওভাবে অমন অবস্থায় দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন….
” আদ্র , কি হলো ওর ?
এভাবে পড়লো কি করে ? এই মেয়ে , পড়লি কি করে ? ছোটাছুটি করেছিস নিশ্চয়ই ?
উত্তর না করে কিড়মিড়িয়ে উঠলো আদ্র । ক্ষিপ্ত হয়ে চোখ তুলে তাকালো সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রের দিকে । নির্বিকার ঠায় দাঁড়িয়ে রৌদ্র । কোন হেলদোল নেই , সেই একই ভাবে পকেটে এক হাত পুড়ে দাঁড়িয়ে আছে তাল গাছের ন্যায় । আদ্র চরম ক্ষুব্ধ হলো । ধমকে উঠলো রৌদ্র কে…..
” হোয়াট দ্যা হেল ডিড ইউ ডু ,রুডি ? আর ইউ ম্যাড ?
ফেলে দিলি কেনো ওকে ?
ধমকটা কানে বাজলো রৌদ্রের । রুবিনা কাবির খানিক চমকালেন । রৌদ্র মেঘা কে ফেলে দিয়েছে মানে ?
রৌদ্র কান চুলকে লাস্ট কয়েক ধাপ সিঁড়ি নেমে উত্তর করলো….
” ইয়েস আই এম ম্যাড । এতো বছর পর বুঝতে পারলি এটা ?
” ফেলে দিলি কেনো ওকে ?
” প্রথমত আমি পড়া থেকে বাঁচিয়েছি ওকে , আর দ্বিতীয়ত ফেলে দিয়েছি । মন চেয়েছে , তাই ফেলে দিয়েছি । ও পড়েছে । ব্যাথা পেলে ও ব্যাথা পেয়েছে । আমি ব্যাথা দিয়েছি , তাই ব্যাথা পেয়েছে ও ! তোর এতো জ্বলছে কেনো বলতো ?
আদ্রের সাথে সাথে বিস্মিত হলেন শাহিনা কাবির আর রুবিনা কাবির । রৌদ্রের ব্যাপার টা ঠিক হজম হলো না । এই মেয়েটাকে দেখেও রৌদ্র এতোটা স্থির কেনো ? কিছু জানার নেই ওর ? এতো বছর ধরে এই মেয়েটা এ বাড়িতে কেনো আছে , জানার নেই রৌদ্রের ?
রৌদ্র এতোটা শান্ত , ঠিক মানতে আর বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে । এতক্ষণে এই মেয়ে টাকে দেখার পর অনেক কিছু ঘটে যাওয়ার কথা ।
আদ্র রৌদ্র কে গ্রাহ্য করলো না । খেয়াল ফেরালো মেঘার দিকে । খানিক বিচলিত কন্ঠে মেঘার বাহু ধরে বললো….
” খুব বেশি ব্যাথা পেয়েছিস ? ওঠ দেখি….
আদ্র হাতটা বাড়িয়ে দিতেই সেটাকে শক্ত করে ধরলো মেঘা । দাঁতে দাঁত চেপে আদ্রের উপর ভর করে উঠে দাঁড়ালো । শাহিনা কাবির প্রশ্ন করলেন….
” মেঘা , ঠিক আছিস মা ?
” হ্যাঁ মনি , আমি ঠিক আছি । লাগে নি তেমন ।
” হাঁটতে পারবি , পা বাড়া দেখি….
আদ্রের কথায় মেঘা পা বাড়ালো ।
হাঁটতে সমস্যা হলো না । নিরিহ মুখে আদ্রের ফোনটা ওর দিকে ফিরিয়ে দিলো মেঘা । বললো নিচু স্বরে….
” সরি ।
মেঘার হাতে আবার আদ্রের ফোন দেখে রগরগে দৃষ্টিপাত করলো রৌদ্র । ফোনটার দিকে তাকিয়েই বিড়বিড় করলো ক্ষুব্ধ স্বরে….
” একটাকে কমোডে ফ্লাস করেছি , আবার এটা ?
রৌদ্রের বিড়বিড়ানো ওর মুখেই হারিয়ে যায় ।
আদ্র মেঘার সরি বলাতে নরম স্বরে বলল….
” ইটস্ ওকে , ঘরে চল । আমি নিয়ে যাচ্ছি ….
মেঘা আদ্রের সাথে সিঁড়িতে উঠলো । আদ্র হাতটা ছেড়েছে । নিজে নিজে উঠছে মেঘা । রৌদ্র কে পাশ কাটাতে গিয়ে রৌদ্রের দিকে চিবিয়ে কুপিত দৃষ্টি পাত করলো মেঘা । ফুসলো মনে মনে ।
বিকেল গড়াতেই ছাদে উঠেছে মেঘা আর শাফাহ্ । এটা নিত্যদিনের রুটিন । সন্ধ্যার আগের এই মুহুর্ত থেকে আঁধার নামা অবধি ছাদেই কাঁটাবে দুজন । ছাদে অসংখ্য ফুল গাছ । সব টুকটুকির জন্য । মেয়েটা ভীষণ ফুল প্রিয় । মেঘা রেলিংয়ের উপর পা ঝুলিয়ে বসেছে । ভয় ডর নেই একটুও । শাফাহ্ ভয়ে ভয়ে সাবধান করলো ওকে । উঁচুতে ফোবিয়া আছে শাফাহ্’র । রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াতেই পারে না ও । নিচের দিকে তাকালেই মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে । আর অপরদিকে এই মেঘা , এর তো কোনো কিছুতেই পরোয়া নেই । তিন তলার ছাদ থেকে রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছে ভয় হীনা । হাতে ফোন , পূর্ণ মনযোগ ফোনে । শাফাহ্ ওর থেকে সরে এসে ট্যাব ছেড়ে ছাদের ফুলের টব গুলোতে পানি দিচ্ছে ।
দিতে দিতে ডাকলো….
” মেঘা ?
” হুম !
” তুই না অদ্ভুত !
” অদ্ভুত কেনো হলাম ?
পানির পাইপ ছেড়ে এগিয়ে আসলো শাফাহ্ । ওরনায় ভেজা হাত মুছলো । রেলিং থেকে দুরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালো । ঠোঁট ভিজিয়ে খানিক ইতস্তত বোধ করলো কথা তুলতে । বাড়িতে সবাই এই নিয়ে উদাসীন । কারোর কোনো মাথা ব্যাথা নেই । নিরুদ্বেগ সবাই । শাফাহ্ সেই তিন দিন থেকে পেট আর মুখ বহু কষ্টে চেপে রেখেছে । খচখচ করছে প্রসঙ্গ তোলার জন্য । রৌদ্র আর মেঘার সমন্বয়ে প্রসঙ্গ । জিভ গিজগিজ করছে ওর । তবে ও জানে , এই প্রসঙ্গে কথা তুললে নিশ্চয়ই মেঘার ঝাড়ি খাবে । মেঘা ধমকাবে ওকে । রাগের দরুন হয়তো কথাও বলবে না ঘন্টার পর ঘন্টা । কিন্তু তবুও আজ আর শাফাহ্ চুপ থাকতে পারলো না । বলেই ফেললো…..
” ভাইয়া এসেছে তিন দিন হলো । অথচ তুই এতো নরমাল আছিস কিভাবে ?
মেঘা কথাটায় অতোটা গুরুত্ব দিলো না । অন্তত উপর উপর সে ভাবই দেখালো । ভেতরে কি চললো কে জানে ? নিঃশব্দে শ্বাস পড়লো । বললো অজানার ভান ধরে…..
” কোন ভাইয়ার কথা বলছিস ?
” রৌদ্র ভাইয়া !
” ও , ঐ ডিজগাস্টিং ম্যানারলেস লোকটা ? ওটা তোর ভাইয়া হয় বুঝি ? পাঁচ বছর ধরে এ বাড়িতে আছি , একটা দিনের জন্যেও তো দেখিনি । তাই জানতাম না । তো , তোর ভাইয়া এসেছে তো আমার কি ?
” তোর কিছু নেই ?
” কি আছে ?
” তুই আসলেই অদ্ভুত মেঘা ।
মেঘা আর প্রত্যুত্তর করলো না । খানিক বাদ সন্ধ্যার আজান পড়লো । আঁধার নামছে ।
শুভ্রের আসার সময় হয়েছে , এটা মনে পড়তেই শাফাহ্ চটপট বললো…..
” নিচে চল এখন । সন্ধ্যা হয়ে গেছে ।
রেলিং থেকে নামলো মেঘা । শাফাহ্ ছুটতে উদ্যত হয়ে পিছু ফিরলো । নিজের সাথে নিজেই চ্যালেঞ্জ ধরলো , মেঘার আগে নিচে পৌঁছাবে ও । মেঘা রেলিং থেকে নেমে গা ঝেড়ে পা বাড়ানোর আগেই দৌড় লাগালো শাফাহ্ । দুদিকে মাথা নাড়ালো মেঘা । এই মেয়ের ছটফটে পনা যাবে না । শাফাহ্ হুড়মুড়িয়ে তিন তলা থেকে দোতলায় নামতে গেলে সিঁড়ির মাঝপথে রৌদ্রের সাথে সাক্ষাৎ । হাতে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে ছাদে উঠছে রৌদ্র । শরীরে ভারী ট্রাওজার আর গলায় টাওয়েল ঝোলানো । পেটানো শরীর উন্মুক্ত । যখন তখন শাওয়ার নেওয়া অভ্যাস হয়ে গেছে ওর । শাফাহ্ একটু থামলো । চোখ নামিয়ে গুটি গুটি ধাপে রৌদ্র কে পাশ কাটিয়ে ফের ছুটলো নিচের দিকে । রৌদ্র দেখেও দেখলো না । এখান থেকেই সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে উঠবে এখন । প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরলো রৌদ্র । দৃষ্টি নিচুতে নামিয়ে বেখেয়ালে পা বাড়াতে বাড়াতে লাইটার জ্বালানোর আগেই কোনো কিছুর সাথে পা জড়িয়ে সামনের দিকে হুবড়ি খেলো সে । পড়তে পড়তে বাঁচিয়ে নিলো নিজেকে । পা জড়ালো কিসে এই সিঁড়ির পথে ? কেউ ল্যাং মেরেছে ওকে । ক্ষুব্ধ হয়ে পিছু ফিরলো রৌদ্র । সূচালো দৃষ্টির মুখোমুখি মেঘা দাঁড়িয়ে । ওকে পাশ কাটিয়ে দুই ধাপ সিঁড়ি নেমেছে । রৌদ্র তাকাতেই বললো ঠোঁট নাড়িয়ে….
” উপসস , দেখে হাঁটবেন তো । অতিথি মানুষ , দুদিনের অতিথি , এভাবে বেকায়দায় ঠ্যাং ভেঙে নীড়ে ফেরার ইচ্ছে আছে বুঝি ?
মেঘা নিজের পা দিয়ে রৌদ্রের পথে বাঁধা দিয়েছে , তা বুঝতে আর বাকি রইলো না । ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে কন্ঠ চড়াও করলো রৌদ্র । জবান টাটিয়ে ঔদ্ধত্য স্বরে বলল….
” ইউ স্টুপিড , এক্ষুনি পড়ে যেতাম আমি ।
” রিডিকিউলাস !
পড়ার জন্যই তো ল্যাং মেরেছি । পড়েন নি সৌভাগ্য । আমাকে সিঁড়ি থেকে ফেলে দিয়েছিলেন না , এর রিভেঞ্জ নিতে হবে তো ? বাট ইউর লাকটাই গুড , পড়তে পড়তে বেঁচে গেলেন ।
কন্ঠ পিষে শেষটা বললো মেঘা । অতঃপর তিরস্কারে মুখ ফিরিয়ে নিলো । চুল উড়িয়ে ভাব নিয়ে সিঁড়ির ধাপ নামতে গেলে শক্ত হাতের টান পড়লো চুলে । তড়িতে পিছু ফিরলো মেঘা । রৌদ্র ওর চুল খামচে টেনে ধরেছে । ধরেই দুধাপ সিঁড়ি নিচে নেমে মেঘার সামন বরাবর দাঁড়ালো সে । মুখ সিঁটকে নিলো মেঘা । নিজে ঔদ্ধত্য হওয়ার আগেই রৌদ্র ওর চুল ছাড়লো । ঝুঁকে ফুঁ দিলো মেঘার মুখের উপর । শ্বাস খিচে মুখ বিকৃত করলো মেঘা ।
রৌদ্র বললো হিসহিসিয়ে……
” সাহস খুব বেড়েছে তোর, তাই না ? ওওও সরিইই , তোকে তো আবার তুই বললে গাঁয়ে ফোস্কা পড়বে । সরি সুইটহার্ট , তোমার সাহস বেড়েছে খুব ? আমার পিছে লাগতে এসেছো ? রুডভিক কাবির রৌদ্রের সাথে তাল মেলাতে চাইছো ?
তুমি সম্বোধন টা রৌদ্রের জিভে পোষালো না বেশিক্ষণ । কন্ঠ তড়তড়ে রুপ ধারণ করতেই তুমি থেকে বের তুই সূচকে বললো বাকিটা….
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫
” খুব ইগনোর করছিস আমায় দেখছি । হয়েছে টা কি বলতো ? ভুলে গেছিস আমায়… । আমি তোর কে,সেটা মনে নেই ? আগের থেকে সুন্দর হয়েছি বলে আমার ফেস এই পাঁচ বছরে হরলিক্সের সাথে গুলে খেয়েছিস !
মেঘার কাছে সৌন্দর্য বোঝানোর দিকটা বেশ হাস্যকর লাগলো । নিজের রুপ উপস্থাপনে নিজের ঢাক নিজেই পেটাচ্ছে এই লোক । মেঘা হাসি চাপতে পারলো না । তাচ্ছিল্যতার সহিত সিঁড়ির রেলিংয়ে খানিক হেলে শব্দ করে হি হি করে হেসে উঠলো । ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতেই ফিট খেলো রৌদ্র । আকস্মিক হাসির রিনরিনে ঝংকারে তব্দা খেলো বটে । হাসির কারন বুঝলো না । কপাল গুটিয়ে ফেললো সে । বিষ্ময়ে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার হাসির দিকে । মেঘা হাসছে নিজের মতো । রৌদ্র চোখ সরু করে ওর হাস্যোজ্জ্বল মুখপানে তাকিয়ে থাকার মাঝেই খেই হারালো ধ্যান জ্ঞান খুইয়ে । ধীরে ধীরে ধারালো দৃষ্টি শীতল হয়ে আসলো আপনা আপনি ।
