Home ইন্তেজার এ ওয়াসিল ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৮

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৮

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৮
নওরিন কবির তিশা

“রাজধানীতে চব্বিশ ঘণ্টায় ফের দুই তরুণী নির্মম ধ-র্ষণের শিকার! দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ।”
“বিয়েতে অসম্মতি জানানোয় খিলগাঁওয়ে এক কলেজ ছাত্রীকে তুলে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢামেকে ভর্তি!”
দুটি সংবাদ পরপর কর্ণগোচর হতেই হাতে থাকা শরবতের গ্লাসটা ঈষৎ কম্পিত হলো রেহানা বেগমের। সদ্য মেয়ের জন্য বেলের শরবত বানিয়ে রান্নাঘর থেকে দোতলার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি। গতানুগতিক নিয়ম অনুসারে ড্রয়িং রুমে টিভি চলমান ছিলো। আকস্মিক এমন ভয়াবহ সংকেতে পদযুগল থমকে গেল তার।

তবে সংবাদটা চিরাচরিত কোন সংবাদ এর ন্যায় ঠেকলো না তার কাছে। মুহূর্তের মাঝে চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো আরাভ-তিয়াশা কে ঘিরে স্বামীর চিন্তিত মুখমন্ডল। অসহনীয় উদ্বেগে হাঁসফাঁস করে উঠলো মন মস্তিষ্ক। এখানে যদি তার মেয়েটা থাকতো! না,না! কি সব ভাবছে সে? তীব্র ঘোরের অতলে ডুবে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে রেহেনা বেগম। মায়ের মন কি না!
ঠিক তক্ষুনই সিঁড়ি বেয়ে কারো নিচে নামার শব্দে রেহানা বেগমের চিন্তার জাল ছিন্ন হলো। তিয়াশা হালকা পায়ে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়িয়েছিল; ফ্রিজ থেকে একটা কোল্ড ড্রিংকসের ক্যান বের করার উদ্দেশ্যে ও নিচে এসেছিল। মায়ের অমন বিবর্ণ আর আতঙ্কিত মুখশ্রী এবং টেলিভিশনের পর্দায় জ্বলজ্বল করা রক্তিম হেডলাইনের দিকে নজর পড়তেই ও মুহূর্তের মাঝে পরিস্থিতি আঁচ করতে পারল।
ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রিমোটটা হাতে তুলে নিল এবং এক ক্লিকে খট করে টেলিভিশনটা অফ করে দিল ও। ড্রয়িংরুমের সেই চিল-চিৎকার করা যান্ত্রিক কোলাহল নিমেষেই স্তব্ধতায় রূপ নিল। ও মায়ের হাত থেকে বেলের শরবতের গ্লাসটা সাবধানে টেবিলে নামিয়ে রেখে মৃদু হেসে বলল,

— এসব আজেবাজে নিউজ দেখে নিজের রক্তচাপ বাড়ানোর কোনো দরকার নেই, আম্মু। এগুলো ইদানিং একটু বেশিই চলছে চারদিকে। তুমি শুধু শুধু প্যানিক করছ।
রেহানা বেগম মেয়ের আশ্বস্তকারী কণ্ঠ শুনেও শান্ত হতে পারলেন না। ওনার মাতৃহৃদয় তখন এক অজানা আশঙ্কায় দুলছে। তিনি তড়িৎ গতিতে তিয়াশার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন। ওনার হাত দুটো তখনো কাঁপছিল। ব্যাকুল চোখে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত কম্পিত স্বরে বললেন,
— মা রে, আমার বড্ড ভয় করছে। তুই জানিস না এই সমাজটা কতটা নোংরা হয়ে গেছে! চারদিকের এই অবস্থা দেখে বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপে। তুই প্লিজ চলন্ত পথে একটু সাবধানে চলাচল করিস, মা। প্রয়োজন ছাড়া একদম একা একা বাইরে যাবি না।
তিয়াশা মায়ের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখের রেখাগুলো দেখে মনে মনে একটু ব্যথিত হলো। ও জানত, কাল রাতে ওই সাইকো আরাভের ফোন আর চারপাশের এই নারকীয় পরিস্থিতিই মাকে এতটা দুর্বল করে তুলেছে। ও মায়ের কাঁধে মাথা রেখে পরম নির্ভরতায় বলল,

— আরে আম্মু! তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন যে আমি কার মেয়ে? ডিআইজি তাহের চৌধুরীর মেয়ে আমি। কোনো অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়ানো আমাদের রক্তে নেই। আর আমার সাথে তো আমার স্কুটি আছেই, ঝড়ের গতিতে চলে আসি। তুমি একদম চিন্তা করো না তো!
রেহানা বেগম মেয়ের চিবুকটা ছুঁয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— তোর বাবার ক্ষমতার চেয়েও অপরাধীদের উগ্রতা এখন অনেক বেশি রে টিয়া। তুই বুঝিস না কেন, কিছু মানুষ পশুর চেয়েও অধম হয়। তোর ওই জেদ আর তেজ যেন তোকে কোনো বড় বিপদে না ফেলে, আমি শুধু সেই দোয়াই করি।
মায়ের এই আকুলতা তিয়াশাকে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করে দিল। বাহ্যিক জগতে ও যতই সাহস দেখাক না কেন, আরাভ খানের সেই বিষাক্ত শেষ কথাগুলো ওর মনের কোণেও এক সুপ্ত ভয়ের সৃষ্টি করেছিল। তবে মায়ের সামনে ও নিজের সেই দুর্বলতা প্রকাশ পেতে দিল না। মায়ের গালে আলতো চুমু খেয়ে ও হাসিমুখে বলল,
— আচ্ছা বাবা, আচ্ছা! তোমার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব। এবার লক্ষ্মী মায়ের মতো একটু হাসো তো দেখি!
রেহানা বেগম মেয়ের হাসিমুখ দেখে এক চিলতে মলিন হাসলেন বটে, কিন্তু ওনার মনের গহীনের সেই অমঙ্গল মেঘ পুরোপুরি কাটল না।

— স্যার? আই থিঙ্ক আরাভ খানের ব্যাপারে প্রপার কোন স্টেপ নেওয়া উচিত। ও দিন দিন ঠিক কতটা ডেস্পারেট হয়ে উঠছে সেটা তো আপনি নিজেও দেখছেন। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। তার ওপর এখানে মিস তিয়াশার পার্সোনাল ইস্যু জড়িয়ে আছে।
রুদ্রদ্বীপের মুখে নিজের মেয়ের নাম আর পরিস্থিতিটার গভীরতা শুনে তাহের চৌধুরীর চেহারায় উদ্বেগের কালো ছায়া আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি হাতের কলমটা টেবিলের ওপর রেখে চশমাটা খুলে ফেললেন। ওনার চোখে একজন দুঁদে অফিসারের চেয়ে একজন অসহায় পিতার আকুলতা বেশি ফুটে উঠল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,,

— আমি সব জানি রুদ্র। ওই ছেলেটা যে কতটা সাইকো, তার প্রমাণ সে কাল রাতে আমাকে ডিরেক্টলি ফোন করে দিয়েছে। ও তিয়াশাকে থ্রেট করছে! কিন্তু প্রবলেমটা কোথায় জানো? আনোয়ার খান পুরো ডিপার্টমেন্ট আর লিগ্যাল সিস্টেমটাকে নিজের পকেটে পুরে রেখেছে। সামনে ইলেকশন, এই সময় ও নিজের পজিশন ধরে রাখতে যেকোনো লেভেলে নামতে পারে।
রুদ্রদ্বীপের চোখ দুটো ক্ষোভে জোড়া লেগে গেল। ও টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে এসে সাবলীল কণ্ঠে বলল,,
— আই আন্ডারস্ট্যান্ড স্যার। কিন্তু পলিটিক্যাল ব্যাকআপ আছে বলেই তো ও এইভাবে ওপেনলি ক্রাইম করার সাহস পাচ্ছে। মিনিস্ট্রিতে আনোয়ার খানের সাথে আমার এই নিয়ে কথা হয়েছে। উনি ব্যাপারটা স্রেফ ইগনোর করতে চান। কিন্তু আমার কাছে অলরেডি ওর কিছু ড্রাগ সিন্ডিকেট আর রিসেন্টলি শহরের ওই ওমেন ট্রাফিকিং গ্যাংটার সাথে আরাভের কানেকশনের কিছু ডিজিটাল এভিডেন্স এসেছে। আমরা যদি প্রপার লিগ্যাল প্রোটোকল মেনে মুভ করি, মিনিস্টার সাহেবও ওরে সেভ করতে পারবে না।
তাহের চৌধুরী চেয়ারে হেলান দিয়ে কপালে হাত রাখলেন,,

— আইন নিজের গতিতে চলবে রুদ্র, সেটা নিয়ে আমার সংশয় নেই। কিন্তু একজন বাবা হিসেবে আমার ভয়টা অন্য জায়গায়। ওই বা-স্টার্ড যদি আইনি অ্যাকশনের রিভেঞ্জ নিতে গিয়ে তিয়াশার কোনো ক্ষতি করে বসে? ও তো ক্যাম্পাসেও তিয়াশাকে হ্যারাস করছে। তিয়াশার মা-ও খুব প্যানিকড হয়ে আছে।
— আপনি তিয়াশার সিকিউরিটি নিয়ে একদম ভাববেন না, স্যার। আমি পার্সোনালি ওর ওপর নজর রাখছি। আমার টিম অলরেডি আরাভের প্রতিটা মুভমেন্ট ট্র্যাক করছে। ও তিয়াশার আশেপাশে আসার চেষ্টা করলেই আই উইল টেক হিম ডাউন। আপনি জাস্ট আমাকে পারমিশন দিন, এই ফাইলগুলো অফিশিয়ালি প্রসেস করার।
তাহের চৌধুরী কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে চাইলেন ক্ষণকাল। হৃদয়ের কোণে বোধ হয় একটুখানি আসার আলোর উঁকিঝুঁকি। মনে মনে কিছু একটা আওরালেন হয়তো উনি। অতঃপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন কাঁচের জালনার ওপাশে।

সন্ধ্যার লালিমা হারিয়ে বহু আগেই আঁধারের চাদরে মুড়ি দিয়েছে গোটা ধরণী। ঘড়ির কাঁটায় রাত আটটা চলমান। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরে বাসায় ফিরলেন ডিআইজি তাহের চৌধুরী। মানুষটা ইদানিং বড্ড ক্লান্ত থাকেন শারীরিক নয়, মানসিকভাবে। যেটা আর কেউ না বুঝলেও ওনার সহধর্মিণী ঠিকই বোঝেন। সহধর্মিণীর অন্য নাম অর্ধাঙ্গিনীও বটে! হয়তো আত্মিক এই গভীর বন্ধনই এর কারণ স্বরূপ কাজ করে।
আজও বাসায় ফিরে প্রথমে ড্রয়িংরুমের সোফায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলেন তাহের চৌধুরী। রোজকার ন্যায় আজও ওনার আসার পরপরই পাশে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত এনে উপস্থিত হলেন রেহানা বেগম। গ্লাসটা সেন্ট্রাল টেবিলে রেখে তিনি স্বামীর পাশে বসলেন। ওনার কপালে জমে থাকা চিন্তার রেখাগুলো হাত দিয়ে আলতো করে মুছে দিতে দিতে একটু দ্বিধান্বিত গলায় বললেন,

— আজকেও শরীরটা খুব বেশি ম্যাজম্যাজ করছে? মুখ-চোখ কেমন শুকিয়ে গেছে। চাপ কি ইদানিং বড্ড বেশি, নাকি অন্য কোনো চিন্তা?
তাহের চৌধুরী চোখ মেললেন। শরবতের গ্লাসে হাত না দিয়ে তিনি সোজা হয়ে বসলেন। রেহানা বেগমের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একেবারে আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত এক প্রশ্ন ছুড়লেন,
— রুদ্রদ্বীপ… এসপি রুদ্রদ্বীপ সিনহাকে আমাদের মেয়ের জন্য তোমার কেমন লাগে, রেহানা?
স্বামীর মুখে আকস্মিক মেয়ের বিয়ের প্রস্তাবে কিঞ্চিৎ ভড়কালেন রেহানা বেগম,
— তুমি… তুমি এই সময়ে হুট করে এসব কী বলছ? তিয়াশা তো এখনো পড়াশোনা শেষ করেনি। আর রুদ্রদ্বীপের কথা হঠাৎ এভাবে কেন তুললে?
তাহের চৌধুরী স্ত্রীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু জোরালো স্বরে বললেন,
— না, সরাসরি কথা বলো রেহানা। এটা আমাদের মেয়ের জীবনের ব্যাপার, ওর সুরক্ষার ব্যাপার। ইদানিং চারদিকে কী ঘটছে, তা তো তুমি নিজের চোখেই দেখছ। আনোয়ার খানের ওই সাইকো ছেলেটা যেভাবে দিন দিন ডেস্পারেট হয়ে উঠছে, তিয়াশাকে যেভাবে হ্যারাস করছে তাতে আমি আর এক মুহূর্তও নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারছি না। রুদ্রদ্বীপ শুধু ব্রিলিয়ান্ট আর সৎ অফিসারই নয়, ও একটা খাঁটি ছেলে। তিয়াশাকে আগলে রাখার ক্ষমতা ওর আছে।
রেহানা বেগম স্বামীর কথার গভীরতা আর ভেতরের তীব্র অসহায়ত্বটুকু এবার টের পেলেন। ওনার মনের সব দ্বিধা কেটে গিয়ে মাতৃ হৃদয়ের দুশ্চিন্তারা ভর করল। তিনি স্বামীর পাশে আরও একটু ঘেঁষে বসে নরম গলায় বললেন,

— তুমি ঠিকই বলেছ। চারদিকের যা পরিস্থিতি, তাতে আমার নিজেরও প্রতিটা মুহূর্ত আতঙ্কে কাটে। কিন্তু তিয়াশা? ও কি হুট করে এই বিয়েতে রাজী হবে?
তাহের চৌধুরী সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। উন্নত শিরে সিড়ির দিকে এগোতে এগোতে সহধর্মিনীর উদ্দেশ্যে শান্ত কণ্ঠে বললেন,,
— টিয়াকে বোঝানোর দায়িত্ব আমার। ও পরিস্থিতিটা বুঝবে। আমি আর দেরি করতে চাই না, রেহানা। আমি তাহলে কালই রূপকথা ভাবির সাথে কথা বলছি—ওদের পুরো পরিবারকে আমাদের বাসায় আসার জন্য ইনভাইট করব। এই সপ্তাহের মধ্যেই একটা ফয়সালা হওয়া দরকার।

আঁধারে চাদরে চাঁদটা অবধি ঢাকা পড়েছে যেন। চিরাচরিত নিয়ম অনুসারে আজও ক্লাবে মস্ত পার্টি নামক নোংরামির আয়োজন করা হয়েছে। আর প্রতিদিনের মতো আয়োজক আরাভ খান নিজেই। মাঝে মাঝে বিচ্ছিরি লাগে মদ্যপ ছেলেটাকে। নেশাগ্রস্ত হলেই প্রচন্ড পশুত্ব আর চরম উগ্রতা বাসা বাধে ওর ভেতর।
মেয়েবাজ হলেও কক্ষনো মেয়েদের খুব বেশি কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখে না ও। তবে টাকার নেশায় ওর কাছে আসা মেয়েগুলোকে ছেড়ে ও দেয় না। চরম বর্বরতার সহিত আঘাত করে ওদের,কোনরকম শারীরিক স্পর্শ ছাড়াই প্রচন্ডরকম ক্ষ’তবিক্ষ’ত করে ওদের। যেন নিজের অবচেতন মনের কোন এক তীব্র ক্ষোভ ওদের ওপর নিবারণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায় ও।
আজও তেমনি এক নোংরামির আয়োজন করা হয়েছিল ওর বিশেষ কক্ষে।তবে আজকের মেয়েটাকে একদম অ’ক্ষত অবস্থায় দেখে বেশ অবাক হল আরাভের ফ্রেন্ডরা। যদিও ওরা শুধিয়েছিল মেয়েটাকে তবে মেয়েটা প্রত্যুত্তর করেনি।
পরক্ষণেই দরজার পর্দা ঠেলে টলমল পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো আরাভ। শয়তানি আঁখিদ্বয় নেশার তোপে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে ,শার্টের কলারটা অবিন্যস্ত। সোফায় বসে থাকা আরিয়ান হাতের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ও এগিয়ে এসে আরাভের কাঁধে হাত দিয়ে কৌতূহলী সুরে শুধালো,,

— কিরে মামু? ভেতরের মাল তো একদম ফ্রেশ কন্ডিশনে বাইর হইলো! টাচও করিস নাই মনে হইলো। আজকে কি তোর দয়া-মায়া উথলায়া উঠল নাকি? নাকি বয়স হইয়া গেছে?
আরাভ আরিয়ানের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। টলতে টলতে গিয়ে একটা সিঙ্গেল সোফায় ধপ করে বসে পড়ল ও। মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। নেশার ঘোরে জড়িয়ে আসা কণ্ঠস্বর কোনমতে সামলে ও বলল,,
— ধুর ব্যাটা! ওইসব সস্তা বডি টাচ করার রুচি নাই আজ। ধরি নাই তো কী হইছে? ভয়ে ছ্যামড়ির যা অবস্থা হইছিল, দেখতি। কাঁপতে কাঁপতে এক্কেরে শেষ!
সাইদ পাশ থেকে হুইস্কির বোতলটা উঁচিয়ে বাঁকা হেসে বলল,,
— আরে মামু, তুই আসলেই একটা সাইকো! মেয়েদের গায়ে হাত না দিয়াও যে কেমনে এইভাবে টর্চার করিস, খোদা জানে। তা আজকের এই মুড অফের কারণ কী? ডিআইজির মাইয়া তিয়াশা নাকি?
তিয়াশা নামটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই আরাভ হুট করে সোজা হয়ে বসল। ওর অবিন্যস্ত চুলের আড়াল থেকে চোখের পৈশাচিক হিংস্রতা এক লহমায় ঠিকরে বের হলো। ও গ্লাস ছাড়াই টেবিল থেকে বোতলটা তুলে নিয়ে সরাসরি মুখে ঢালল। তারপর ঠোঁটটা মুছে কর্কশ গলায় বলল,,

— ওর নাম এই নোংরা জায়গায় নিবি না, সাইদ! তিয়াশা অন্য লেভেলের চিজ। ওরে ছোঁব আমি, খুব জলদি ছোঁব। তবে এইভাবে না, একদম লিগ্যালি নিজের কইরা নিয়া ছোঁব। আমি শিওর ওর বাপে মানে আমার খারুশ শ্বশুরটা বউডারে এসপি রুদ্রদ্বীপের সাথে পার করার ধান্দা করতাছে! আমার জিনিসে হাত বাড়ায়, এত বড় সাহস?
আরিয়ান আর সাইদ দুজনেই হেসে উঠল। আরিয়ান বলল,,
— আরে ধুর মামু! তুই তো পুরাই মজনু হয়া গেলি দেহি! কিন্তু ডিআইজি তাহের চৌধুরী কি অত সহজে তোর হাতে ওরে দিব?
আরাভ বোতলটা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রাখল। তারপর টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। ওর ঠোঁটের কোণে তখন এক চরম উগ্র-আত্মবিশ্বাসী হাসি। ও জড়িয়ে যাওয়া গলায় শেষবারের মতো হুঙ্কার ছাড়ল,,
— না দিয়া যাইব কই? ক্ষমতা কারে বলে কাল ওগো বুঝামু। তিয়াশা শুধু আমার রে মামু… জাস্ট আমার! তোরা এনজয় কর, আমি বের হইলাম।
কথাটা বলেই আরাভ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। বন্ধুদের চিল-চিৎকার আর ক্লাবের চড়া মিউজিকে পেছন ফেলে ও টলমলে পায়ে লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে গেল ও।

প্রভাতী স্নিগ্ধ রৌদ্ররশ্মিতে অবগুন্ঠিত ধরণী। বেলা বেড়েছে ‌যৎসামান্য, জানালার সূক্ষ্ম পর্দা ভেদ করে এক ফালি সোনালী রোদ এসে লুটিয়েছে তিয়াশার শয়নকক্ষের মেঝেতে। তিয়াশা আজ এখনো শয্যাত্যাগ করেনি; ঊষালগ্নে নামাজ শেষে ও পুনরায় নিদ্রামগ্ন হয়েছিল, তাই সুপ্তির ঘোরটা বড় নিবিড়।
এমন সময় কক্ষের দ্বারটি অলক্ষ্যে খুলে গেল। তাহের চৌধুরী ধীরলয়ে কন্যার শয্যাপাশে এসে বসলেন। নিদ্রিত মেয়ের নিষ্পাপ মুখের পানে চেয়ে পরম স্নেহে মেয়ের কোমল হাতটি নিজের করতলে নিলেন, অতঃপর সেখানে একটি কুসুম-কোমল চুম্বন আঁকলেন।
পিতৃস্নেহের সেই চিরচেনা উষ্ণ পরশে তিয়াশার তন্দ্রা ছুটে গেল। ও পিটপিট করে নয়ন মেলল। সম্মুখে পিতাকে দেখে ওর ওষ্ঠাধরে এক চিলতে অম্লান হাসির রেখা ফুটলো। ও ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে একদম বাচ্চাদের ভঙ্গিমায়। চোখ ডলতে ডলতে বলল,

— গুড মর্নিং, বাবা! তুমি এত সকালে আমার রুমে? ডিউটিতে যাওনি এখনো?
তাহের চৌধুরী মেয়ের মাথায় আলতো বিলি কেটে দিয়ে মৃদু হাসলেন।
— গুড মর্নিং, মা। ডিউটিতে যাব, তার আগেই তোর সাথে একটু গল্প করতে এলাম। ইদানিং তো মা টার সাথে শান্তিতে দু-দণ্ড বসার সুযোগই পাই না।
তিয়াশা বাবার কাঁধে মাথা রেখে একটু আদুরে গলায় বলল,
— তা অবশ্য ঠিক। তুমি ইদানিং বড্ড ব্যস্ত থাকো। কোনো স্পেশাল কথা আছে বাবা?
তাহের চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার দৃষ্টি জানালার বাইরে প্রসারিত হলো। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বললেন,,
— একটা বাবার জীবনের সার্থকতা কোথায় জানিস মা?
তিয়াশা জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকাতেই তাহের চৌধুরী মেয়ের মাথায় ছোট্ট চুমু আঁকলেন,,
— তার মেয়ে নামক মাকে সুখে দেখা শান্তিতে দেখা।
তাহের চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অত্যন্ত ভারী ও আর্দ্র গলায় বলতে লাগলেন,

— মেয়েরা যখন ছোট থাকে, তখন মনে হয় ওদের আগলে রাখা কত সহজ। একটু চোট পেলেই কোলে তুলে নেওয়া যায়, কান্না করলে একটা পুতুল দিয়ে হাসানো যায়। কিন্তু মেয়েরা যখন বড় হয় মা, তখন বাবার বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় প্রতিনিয়ত কাঁপতে থাকে। এই বাইরের পৃথিবীটা বড্ড কঠিন, বড্ড নির্মম। যেখানে তার পুতুলের মত মেয়েকে আগলে রাখাটা বাবার পক্ষে বড্ড কঠিন। আর বাবারা না, নিজের মেয়ে নামক মায়ের বেলায় প্রচন্ড দুর্বল হয়।
তিয়াশা বাবার হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
— বাবা! তুমি ডিআইজি তাহের চৌধুরী, পুরো শহরের অপরাধীরা তোমাকে ভয় পায়। তুমি কেন এভাবে ভাবছ? আমি তো তোমারই মেয়ে, একদম তোমার মতোই সাহসী।
তাহের চৌধুরী একটা মলিন হাসলেন। মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষটাও তিনটে নারীর ব্যাপারে বড্ড অসহায়! প্রথমত তার মা যিনি তাকে পৃথিবীতে এনেছেন, দ্বিতীয়ত তার স্ত্রী তাকে ভালোবেসে বাসতে শিখিয়েছেন, তৃতীয় আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে তার মেয়ে নামক তার অস্তিত্ব! আর তুই তো শুধু আমার কলিজার টুকরো মা, আমার জান্নাত। তোর গায়ে একটা আঁচ লাগা মানে আমার পুরো অস্তিত্বটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। আমি আমার জীবনে সততার চাদরটা কখনো হাতছাড়া করিনি, কিন্তু আজ যদি তোর সম্মানের ওপর কোনো আঘাত আসে, তবে এই বাবার ক্ষমতা, এই পদের অহংকার সব অর্থহীন হয়ে যাবে।
বাবার চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু তিয়াশার নজর এড়ালো না। ও তড়িঘড়ি করে নিজের হাত দিয়ে বাবার চোখটা মুছে দিয়ে বলল,

— বাবা, প্লিজ এমন করে বোলো না। তোমার এই মেয়ে কখনো এমন কিছু করবে না যাতে তোমার উন্নত শির নিচু হয়। আর আমি নিজেকে রক্ষা করতে জানি, বাবা।
তাহের চৌধুরী মেয়ের গালে হাত রেখে পরম মমতায় বললেন,
— আমি জানি মা, তুই অনেক সাহসী। কিন্তু কখনো কখনো বাবারা চান তাদের মেয়েদের জন্য এমন একটা শক্ত আশ্রয় তৈরি করে দিতে, যেখানে কোনো ঝড় ছুঁতে পারবে না। আমি তোর জন্য এমন একটা নিরাপদ হাত খুঁজতে চাই মা, যে হাতটা আমার অনুপস্থিতিতেও তোকে ঠিক এই বাবার মতোই আগলে রাখবে। তুই আমার ওপর ভরসা রাখিস তো, মা?
তিয়াশা বাবার চোখের সেই গভীর ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা দেখে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল বাবা ভেতর থেকে কতটা অশান্তিতে আছেন। ও বাবার বুকে মাথা রেখে শান্ত গলায় বলল,

— আমি তোমার ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করি, বাবা। তুমি আমার জন্য যা সিদ্ধান্ত নেবে, তা কখনো ভুল হতে পারে না।
তাহের চৌধুরী আবারো মেয়ের হাত মুঠোয় পুরে নিলেন,,
— আমায় ভুল বুঝিস না, মা। একটা বাবা তার মেয়ের জন্য সব করতে পারে নিজের জীবন কোরবানি দিতে পারে,নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন করতে পারে। কিন্তু ওই যে মরণ বলে একটা জিনিস আছে না;বাবা তো সবসময় মেয়ের সঙ্গে থাকতে পারে না। তাই একটা বাবা সারা জীবন চায় তারপর তার মেয়েকে তার মত যত্ন দিয়েই কেউ একজন আগলে রাখুক।

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৭

নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিলো তিয়াশা। আহ্লাদের জড়িয়ে ধরল বাবার বাহু। পরম নিশ্চিন্তে সেথায় কপাল ঠেকিয়ে নাক টেনে বলল,,
— না বাবা, তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আর আমার তো মনে হয় আমি দুনিয়ার সবচেয়ে লাকি মেয়ে যে তোমার মত একটা বাবা পেয়েছি। আই লাভ ইউ্যু বাবা। লাভ ইউ সো মাচ।

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here