Home ইন্তেজার এ ওয়াসিল ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৯

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৯

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৯
নওরিন কবির তিশা

সূর্যটা তখন মধ্যগগনে। চৈত্র শেষের তীব্র রৌদ্ররশ্মি সমস্ত নীলিমা জুড়ে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে। বেলা অনেকটাই বেড়েছে, তীব্র আলোর ছটা জানালার ভারী সিল্কের পর্দা ভেদ করে কক্ষের মাঝে এক অভূতপূর্ব আলো-আঁধারির সৃষ্টি করেছে। চারিধারের নিস্তব্ধতা ভাঙছে কেবল এয়ার কন্ডিশনারের মৃদু গুঞ্জন।
বিশাল কিং-সাইজ বিছানায় তখনো গভীর সুপ্তিতে মগ্ন আরাভ খান। ও উপুড় হয়ে শুয়ে থাকার দরুন গায়ের চাদরটা কোমরের নিচে লুটোপুটি খাচ্ছে। উন্মুক্ত সুগঠিত পিঠের পেশীগুলো তীব্র আলোর বিপরীতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ঠিক তখনই কক্ষের দ্বারটি নিঃশব্দে উন্মোচিত হলো। হাতে একটি কাঁচের গ্লাস নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল আনু। আনু ওর ফুফুর সৎ মেয়ে, এই বাড়িতেই থাকে। আরাভকে জাগিয়ে তোলার গুরুদায়িত্ব আজ ওর ওপরেই বর্তেছে । তবে পা টিপে টিপে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াতেই আনুর চঞ্চল চোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল।
কেমন এক অদ্ভুত আকর্ষণ এই ছেলেটার অবয়বে! মাদকতা আর অবাধ্যতা যেন ওর পুরো অস্তিত্বে মিশে আছে। ঘুমন্ত অবস্থায় এই দুর্ধর্ষ ছেলেটাকে বড্ড শান্ত, বড্ড সুদর্শন দেখায়—যেন দেখলেই একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। আরাভের বাবড়ি চুলগুলো আজ বড্ড অবাধ্য হয়ে কপাল ছাড়িয়ে বন্ধ চোখের ওপর এসে পড়েছে। চিবুক ছুঁয়ে থাকা চাপ দাড়ির আড়ালে লুকায়িত ‌ঠোঁটের কোণে এখনো লেগে আছে এক সুপ্ত গাম্ভীর্য।
আনু নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বেশ নিচু স্বরে ডাকল,,

— আরাভ ভাই? উঠুন।
কোনো সাড়া নেই। আরাভ শুধু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরল, কিন্তু চোখ মেলল না। আনু এবার ঈষৎ ঝুঁকে বেশ জোর দিয়ে ওর গায়ের চাদরটা টালমাটাল করে টেনে ধরে বলল,
— আরাভ ভাই ওঠুন না! দেখুন লেবুর পানি বানিয়ে এনেছি। কাল রাতে তো যা তা অবস্থা করে বাসায় ফিরেছিলেন। মাথাটা কি এখনো ধরে আছে?
‘লেবুর পানি’ শব্দটা কর্ণকুহরে পৌঁছাবামাত্র আরাভ একটা কর্কশ আওয়াজ করে চোখ মেলল। র-ক্তাভ চোখ দুটো পিটপিট করে ও এক হাত দিয়ে কপালে অবাধ্য চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিল। বিছানায় কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসে আনুর হাতের গ্লাসটার দিকে তাকাল।
— রেখে দে টেবিলে। চিল্লাচিল্লি করিস না তো সকাল সকাল, এমনিতেই মাথার রগগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে।
আনু গ্লাসটা পাশের সাইড টেবিলে নামিয়ে রেখে নমনীয় স্বরে বলল,
— সকাল কোথায়? এখন দুপুর বারোটা বাজে! আম্মু আপনাকে নিচে ডাকছেন।
আরাভ এক চুমুকে লেবুর পানিটা শেষ করে খালি গ্লাসটা আনুর দিকে বাড়িয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে বলল,,
— ফুফুরে বলিস আমি আসছি। আর শোন, বেশি পকপক করিস না, জাস্ট গেট আউট ফ্রম মাই রুম।
কথা বাড়ানোর পর্যাপ্ত সাহসে কুলালো না আনুর। আরাভের মেজাজ কখন কেমন থাকে তা ওর চেনা। ও গ্লাসটা হাতে নিয়ে আর একবার আরাভের সেই আকর্ষক মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আরাভ বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।

খানিক বাদে নিচে নামলো আরাভ। ‌বরাবরের ন্যায় ওর পরনের শার্টটার ওপরের দুটো বোতাম খোলা, সুগঠিত উন্মুক্ত বক্ষপট ছুঁয়ে তখনো দু-এক ফোঁটা জল চুইয়ে পড়ছে। ডাইনিং টেবিলের এক কোণে বসে থাকা ওর ফুফু আম্বিয়া খান ছেলের এমন অবিন্যস্ত ভবঘুরের রূপে ফুসে উঠলেন। তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠলেন,,
—এ্যাই, এখন কয়টা বাজে? সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে মন চায় না? আর কাল রাতে আবার নেশা করে ফিরে ছিলে না তুই? ভাইজান শুনতে ছিল তোর কথা। তুই কি বুঝিস না আর কিছুদিন পর নির্বাচন।
ফুফুর চেঁচামেচি তোয়াক্কা না করে ‌রীতিমতো পা দিয়ে পিষে আরাভ এসে ধপ করে একটা চেয়ার টেনে বসল। আনু তড়িঘড়ি করে ওর সামনে গরম পরোটা আর গরুর মাংসের বাটিটা এগিয়ে দিল। আরাভ একটা পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিতে দিতে বললো,,

— সকাল‌ সকাল কানের কাছে গীত না গেয়ে সরো।
আম্বিয়া খান এবার তেড়ে এসে আরাভের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়ালেন। কোমরে হাত দিয়ে, চোখ-মুখ কুঁচকে ওনার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ঝাঁঝালো গলায় বললেন,
— মুখের ওপর কথা? এত বড় স্পর্ধা তোর! নির্বাচন ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, চারদিকে তোর কীর্তিকলাপ নিয়ে কথা উঠছে, আর তোর কোনো হুঁশ নেই? এভাবে চললে ভাইজানের মিনিস্ট্রি তো যাবেই, সাথে তোকেও জেলের ভাত খেতে হবে!
আরাভ মুখে পরোটার টুকরোটা পুরে দিয়ে একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে আম্বিয়া খানের দিকে তাকাল। ওনার এই রুদ্রমূর্তি দেখেও ওর মনে কোনো বিকার জাগল না, উল্টো ঠোঁটের কোণে সেই চেনা নির্লজ্জ ও কৌতুকী হাসিটা আরও চওড়া হলো। ও চিবুতে চিবুতেই বাঁকা সুরে বলল,
— আরে ফুফু, চিল! সকাল-সকাল এত চিল্লালে তো তোমার ওই ফেসিয়ালের গ্লো নষ্ট হয়ে যাবে। আর জেলের ভাত? আরাভ খানের জন্য জেলের ভাত এখনো রান্না হয় নি। কিন্তু প্রবলেমটা তো তোমরা বুঝছো না।
আম্বিয়া খান ভ্রু কুঁচকে রাগ কিছুটা দমিয়ে বললেন,

— কী প্রবলেম শুনি? তোর আবার কিসের প্রবলেম?
আরাভ এবার চেয়ারে আরাম করে হেলান দিয়ে বসল। আনুর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিতে বলল, তারপর ফুফুর দিকে চেয়ে অত্যন্ত রসিয়ে রসিয়ে বলল,
— প্রবলেম হলো তোমরা আমারে বিয়ে দিচ্ছো না! একটা সুন্দর দেখে বউ এনে দাও না কেন? বিয়ে দিলে তো এই আরাভ খান টাইমমতো এক লাথি মাইরা সকাল সকাল বিছানা থেকে উঠে পড়ত। সারারাত রোমান্স করার পরও আমার সুইটহার্ট কত আদর করে, কপালে একখান কড়াক চুমু দিয়ে কি সুন্দর করে আমার ঘুম ভাঙাইত! আহা! তখন কি আর আমার দুপুরের বারোটা পর্যন্ত ঘুমাইতে ইচ্ছা করত, বলো?
আরাভের এমন চরম নির্লজ্জ ও খোলামেলা কথাবার্তা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আনুর ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মাঝে রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। ও ওখান থেকে চোখ সরিয়ে মাথা নিচু করে নিল। আম্বিয়া খান আরাভের এমন বেহায়াপনায় রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লেন। ওনার কপালে রাগের চড়া রেখা ভেসে উঠল। উনি হাতের চামচটা টেবিলের ওপর সশব্দে ছুড়ে মেরে বললেন,

— লজ্জা-শরম কি এক্কেরে ধুয়ে-মুছে খাইছিস? মায়াবড়ি পোলা একটা! এখনো বিয়ের শখ কত! কারে বিয়ে করবি তুই শুনি?
আরাভ ও পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক ঢোক গিলে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওর পকেটে থাকা দামি আইফোনটা তীব্র কর্কশ আওয়াজে কেঁপে উঠল। আরাভ অলস ভঙ্গিতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা কৌতুকী হাসিটা বজায় রেখেই স্ক্রিনটা সোয়াইপ করে ফোনটা কানের কাছে ধরল। অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,,

— কী রে মামু? সকাল সকাল কী খবর?
কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে আরিয়ানের উত্তেজিত আর হন্তদন্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই আরাভের ঠোঁটের কোণের সেই চিলতে হাসি নিমেষেই উবে গেল। আরিয়ান ওপাশ থেকে প্রায় চিৎকার করে বলল,
— আরাভ! তুই এখনো বাড়ি? এখানে তো পুরা ‘কেস জন্ডিস’ হয়ে গেছে! ইনফো আছে যে ডিআইজি তাহের চৌধুরী আজ-ই রুদ্রদ্বীপের সাথে তিয়াশার বিয়ের কথা পাকাপাকি করতেছে! তুই শেষ মামু!
আরিয়ানের কথাগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছানোমাত্র আরাভের চোখের মণি দুটো মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। এতক্ষণের নির্লজ্জ রূপটা যেন এক লহমায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ওর পুরো অবয়বে ভর করল এক ভয়ঙ্কর, পৈশাচিক শীতলতা। চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে উঠল, আর কপালে রাগের নীল রগগুলো দপ দপ করে জেগে উঠল।
টেবিলের নিচে রাখা ওর বাম হাতটা সজোরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল, হাতের নখগুলো তালুর চামড়া ফুঁড়ে বসার উপক্রম। ও ওখান থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আম্বিয়া খান আর আনু ওর এই আকস্মিক রূপান্তর দেখে ভয় পেলেন সীমিত। আরাভের তীক্ষ্ণ আঁখিদ্বয়্ তীব্র ক্ষোভের লাভা ঠিকরে বের হচ্ছে। ও দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত নিচু, হিসহিসানি স্বরে বলল,,

— রুদ্রদ্বীপ সিনহা… তুই আমার জিনিসে হাত দেওয়ার ট্রাই করছিস? তোর এত বড় কলিজা!
আরাভ আর এক মুহূর্তও ডাইনিং টেবিলে দাঁড়াল না। পরোটার গ্রাস ওখানেই পড়ে রইল। ও ফোনটা পকেটে পুরে কোনো দিকে না তাকিয়ে, ঝড়ের গতিতে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে মেইন গেটের দিকে হনহন করে বেরিয়ে গেল।আম্বিয়া খান পেছন থেকে দুবার ডাকলেন, কিন্তু আরাভের কান অবধি সেই আওয়াজ পৌঁছাল না।

রাজপথে ঝড়ের গতিতে চলমান আরাভে বাইক;গতি তখন একশ ছাড়িয়েছে, চারপাশের ট্রাফিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ও এগিয়ে চলেছে। মাঝরাস্তায় এসে ও এক হাতে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে অন্য হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্পিড ডায়াল করল সাইদকে। ফোনটা রিসিভ হতেই আরাভ দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গালি দিয়ে হুঙ্কার ছাড়ল,,
— শালা কু**র বাচ্চা! তোরা সব কই? এখনই সবগুলারে রাজপথে নামতে বল। তিয়াশার বাড়ির দিকে মুভ করবি। ওই এসপি নাকি আজ ওইখানে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবে! শু””””টা যাওয়ার আগে যেন ওই এলাকা ব্লক করা হয়। যদি একটা বাইকও কম দেখি, তোদের চামড়া আমি জ্যান্ত ছিলে ফেলব!
ফোনের ওপাশ থেকে সাইদ কিছু বলার আগেই আরাভ লাইনটা কেটে দিল। ওর এই একটিমাত্র ফোনেই যেন পুরো আন্ডারগ্রাউন্ডের চ্যালাচামন্ডাদের মাঝে সুনামি বয়ে গেল। মিনিট দশেকের মাথায়, শহরের বুক চিরে একের পর এক স্পোর্টস বাইকের কানফাটানো আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। আরাভ যখন তিয়াশাদের ভিআইপি আবাসিক এলাকার মোড়ে এসে পৌঁছাল, ততক্ষণে ওর পেছনে এসে জুটেছে শয়ে শয়ে বাইক। প্রায় পাঁচশত বাইকের এক বিশাল ভয়ঙ্কর বহর! একেকটা বাইকে দুজন করে উগ্র, বেপরোয়া যুবক; কারও হাতে হকিস্টিক, কারও চোখে হিংস্র চাউনি। পুরো এলাকার শান্ত পরিবেশ নিমেষেই এক থমথমে নরককুণ্ডে পরিণত হলো।
আরাভ সবার সামনে থেকে হাত উঁচিয়ে ইশারা করতেই পুরো বাইক বাহিনী কর্কশ টায়ারের আওয়াজ তুলে ডিআইজি তাহের চৌধুরীর আলিশান বাসভবনের সদর ফটক একযোগে ঘেরাও করে ফেলল। পাঁচশত বাইকের একটানা হর্ন আর ইঞ্জিনের গর্জনে চারদিকের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। গেটের সিকিউরিটি গার্ডরা এমন আকস্মিক ও সশস্ত্র আক্রমণ দেখে ভয়ে ভেতরের যত্রতত্র লুকিয়ে পড়ল।

দোতলার সুসজ্জিত কক্ষের বা সাইডের দর্পণের অভিমুখে দাঁড়িয়ে কোনমতে নিজের শরীরে শাড়ি জড়িয়ে নিচ্ছিল তিয়াশা। মায়ের কড়া নির্দেশে এই প্রথমবার ভারী কারুকাজের একটি নীল রঙের জামদানি শাড়িতে নিজেকে আবৃত করছিল ও। ঠিক তখনই আচমকা এক গগনবিদারী ইঞ্জিনের গর্জন আর শয়ে শয়ে বাইকের তীব্র হর্নের আওয়াজ ওর কানে আছড়ে পড়ল। আকস্মিক শব্দে তিয়াশা প্রচণ্ড ভড়কে গেল, হাতের পিনটা ওখানেই খসে পড়ল। ও শাড়ির কুঁচিটা এক হাতে চেপে ধরে দ্রুত পায়ে ঝুলবারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।।
তুমি নিজে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া হলো ওর। এ যেন এক সশস্ত্র বাহিনীর রণক্ষেত্র! শয়ে শয়ে কালো স্পোর্টস বাইক পুরো চত্বর আর সদর ফটক অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তিয়াশা আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। ও তীব্র আতঙ্ক আর বুকভাঙ্গা ক্ষোভ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নামার জন্য সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল।
ততক্ষণে সদর দরজা ভেঙে মেইন হলরুমে প্রবেশ করার তোড়জোড় করছিল আরাভ। বাড়ির বিশাল কাঠের দরজাটা সশব্দে খুলে যেতেই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হলেন ডিআইজি তাহের চৌধুরী এবং ওনার সহধর্মিণী রেহানা বেগম। ভেতরকার কাজের লোকগুলো তখন ভয়ে এদিক-ওদিক লুকিয়ে পড়েছে। তাহের চৌধুরী নিজের ঘরের ভেতর এমন চোর-ডাকাতের মতো অনধিকার প্রবেশ দেখে ক্রোধে ফেটে পড়লেন। ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, উন্নত শির আরও টানটান করে আরাভের পথ আগলে দাঁড়িয়ে জলদগম্ভীর কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললেন,

— ইয়্যু বাস্টার্ড! আরাভ খান! তোর এত বড় স্পর্ধা কী করে হয় আমার বাড়িতে এভাবে শয়ে শয়ে গুন্ডা নিয়ে অ্যাটাক করার? তুই জানিস এটা একজন ডিআইজি-র সরকারি বাসভবন? আই উইল শুট ইউ ডাউন, রাস্কেল!
আরাভ একচুলও পিছাল না, বরং ঠোঁটের কোণে সেই বিষাক্ত, ক্রুর হাসিটা ঝুলিয়ে এক পা এগিয়ে এল। ও নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা, বেপরোয়া গলায় বলল,
— ডিআইজি সাহেব, থ্রেটের দিন শেষ। আমি আগেই বলছিলাম না, আরাভ খান রিকোয়েস্ট একবারই করে? ভালোয় ভালোয় পারমিশন চাইলাম, দিলেন না। উল্টো আমার জিনিসে হাত দেওয়ার জন্য ওই এসপি রুদ্রদ্বীপকে ইনভাইট করছেন? আরাভ খান বেঁচে থাকতে তিয়াশাকে অন্য কেউ টাচ করবে, এত বড় কলিজা এই দুনিয়ায় কারোর হয় নাই!
— মুখ সামলে কথা বল, স্টুপিড ক্রিমিনাল!তোকে জেলের ভাত আমি খাওয়াবই!
তাহের চৌধুরী প্রচন্ড ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে নিজের কোমরের দিকে হাত বাড়াতেই আরাভ তড়িৎ গতিতে জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটা রিভলভার বের করে সরাসরি ওনার কপাল বরাবর তাক করল।রেহানা বেগম এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন,

— ও আল্লাহ! একি সর্বনাশ! দোহাই তোমার বাবা, এমন কিছু কোরো না!
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এল তিয়াশা। নীল শাড়িতে একদম অপরূপা অপ্সরীর ন্যায় প্রতীয়মান হচ্ছিল ও। তিয়াশাকে দেখামাত্রই আরাভের চোখ দুটোতে এক পৈশাচিক তৃপ্তির আলো জ্বলে উঠল। ও রিভলভারটা পকেটে পুরে তাহের চৌধুরীর সামনে দিয়ে সোজা এগিয়ে গেল তিয়াশার দিকে।
তিয়াশা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরাভ এক হ্যাঁচকা টানে ওর নরম কবজিটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। আচমকা এই আক্রমণে তিয়াশার শাড়ির আঁচলটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ও যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল,
— ছাড়! লিভ মাই হ্যান্ড, ইউ সাইকো! হাত ছাড় বলছি! বাবা, বাঁচাও আমাকে!
তাহের চৌধুরী মেয়ের দিকে এগোতে চাইলেন, কিন্তু দরজার বাইরে দাঁড়ানো আরাভের চার-পাঁচটা সশস্ত্র চ্যালা একযোগে ওনার দিকে অস্ত্র তাক করে ওনাকে থামিয়ে দিল। আরাভ তিয়াশাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে বন্য চাউনিতে তাহের চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,

— শ্বশুর আব্বা, আজকের মতো আসি। দোয়া করবেন যেন জামাই-বউয়ের সংসারটা সুখে কাটে। আর বছরে বছরে একটা করে মুরগির ছানার জন্ম দিতে পারে। আর ওই এসপিকে বইলা দিয়েন, সে যেন নিজের লিমিটের ভেতর থাকে।
বলেই আরাভ তিয়াশার কোনো আকুতি-মিনতির তোয়াক্কা না করে, ওকে আক্ষরিক অর্থেই এক ঝটকায় পাঁজকোলা করে তুলে নিল। তিয়াশা ওর পিঠে, বুকে অনবরত কিল-ঘুষি মারতে লাগল, চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়লো ওর। কিন্তু আরাভের ইস্পাতকঠিন শরীরের সামনে ওর সেই প্রতিরোধ বড্ড খড়কুটোর মতো উড়ে গেল।

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৮

আরাভ তিয়াশাকে নিয়ে মেইন গেটের সামনে এসে নিজের ইয়ামাহা বাইকের ট্যাংকের ওপর এক প্রকার জোর করেই বসিয়ে দিল। ও নিজে বাইকে উঠে স্টার্ট দিতেই পাঁচশত বাইকের বহর একযোগে কানফাটানো হর্ন বাজিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে ওখান থেকে ঝড়ের গতিতে ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে গেল। ডিআইজি তাহের চৌধুরী নিজের লিভিং রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব বুকে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। ওনার রাজকন্যাকে এক পিশাচ ক্ষমতার জোরে সবার চোখের সামনে দিয়ে তুলে নিয়ে গেল।
না মস্তিষ্ক আর কোন নির্দেশনা নিল না। আকস্মিক কাজ বন্ধ করে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে গোটা দুনিয়া চক্কর দিয়ে উঠলো তাহের চৌধুরীর। উন্নত শির মাটিতে লুটালো তার। সহধর্মিনী দৌড়ে এসে, ওনার মাথাটা উরুর উপর রেখে চেঁচিয়ে আর্তনাদ উঠলেন,,
— ডিআইজি সাহেব কি হল তোমার? ওঠো দেখো না আমার মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছ?

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here