ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৪
মেহজাবিন নাদিয়া
এদিকে সাদা শুভ্র পাঞ্জাবির হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত নিখুঁতভাবে ফোল্ড করতে করতে সারিম যখন হাসপাতালের প্রিমিয়াম কেবিন ব্লকের করিডোরে পা রাখল,মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর, রাশভারী ভাব। চোখের সানগ্লাসটা এক টানে খুলে পাঞ্জাবির পকেটে গুঁজে দিল। করিডোরের নার্স আর ডাক্তাররা দেশের তরুণ ও প্রভাবশালী শিক্ষামন্ত্রীকে আচমকা এভাবে দেখে কপালে হাত ঠেকিয়ে সালাম দিচ্ছিল, কিন্তু সারিম সেসবে স্রেফ একটা পেশাদার মাথা ঝাঁকানি দিয়ে এগিয়ে গেল ১০৪ নম্বর কেবিনের দিকে।
কেবিনের দরজার কাছাকাছি আসতেই সারিমের কান খাড়া হয়ে উঠল। ভেতর থেকে তীব্র চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজটা আর কারও নয়, স্বয়ং আলভির!
সারিম ভুরু কুঁচকে দরজার হ্যান্ডেলটা ঘুরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ওর সেই পাথরের মতো শক্ত আর চতুর চেহারায় এক মুহূর্তের জন্য চরম বিস্ময় আর হতভম্ব ভাব ফুটে উঠল। চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার দশা হলো!
কেবিনের ভেতরের দৃশ্যটা যেকোনো সিনেমার কেও হার মানতে বাধ্য করবে। হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে আলভি। তবে তার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ওর ডান হাতটা কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত মোটা প্লাস্টারের ব্যান্ডেজে মোড়ানো এবং সেটা একটা সাদা কাপড়ের বেল্ট দিয়ে গলার সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর আলভির ঠিক মাথার কাছে, জ্বলন্ত এক আগ্নেয়গিরির মতো দাঁড়িয়ে আছে নওমি! নওমির চুলগুলো কিছুটা অবিন্যস্ত, চোখে-মুখে এক চরম উন্মাদনা আর রাগ। সে একটা স্টিলের স্যালাইন স্ট্যান্ড দুই হাতে উঁচিয়ে ধরে আলভিকে মারার জন্য তাড়া করছে!
সারিমকে দরজায় দেখামাত্রই আলভির শুকিয়ে চুন হয়ে যাওয়া মুখে যেন মুহূর্তের জন্য প্রাণের সঞ্চার হলো। সে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে, এক হাতেই কোনোমতে গড়িয়ে গিয়ে সোজা সারিমের দীর্ঘ, চওড়া শরীরের পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল।আলভি কায়দায় করে সারিমের ছয়-ফুট-দুই ইঞ্চির বিশাল অবয়বটাকে ঢাল বানিয়ে ফেলল।
আলভি সারিমের পাঞ্জাবির পেছনটা খামচে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
_”স্যার! বাঁচান স্যার! আমি শেষ! এই ডাইনি আজকে হসপিটালের ভেতরেই আমার জান কবজ করে ছাড়ব!ওরে থামান স্যার!”
নওমি তখন রাগে অন্ধ হয়ে স্ট্যান্ডটা উঁচিয়ে ধরেছিল। কিন্তু সারিমকে হুট করে সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে সেও এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। সারিমের উপস্থিতি নওমির ভেতরের রাগটাকে যেন এক ঝটকায় আরও উসকে দিল। সে স্ট্যান্ডটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে, তীব্র আক্রোশে আর অভিমানে সারিমের দিকে ছুটে এলো।কোনো দিকে না তাকিয়ে, সারিমের দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চিৎকার করে উঠল-
_”সারিম! তুই এসেছিস? দেখ সারিম, তোর এই দুই টাকার ফকিন্নি অ্যাসিস্ট্যান্ট কতবড় সাহস! এই জঘন্য, লোভী ছোটলোকটা আমার অবচেতন মনের সুযোগ নিয়ে, আমি মাতাল থাকা অবস্থায় আমাকে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছে!তুই এর একটা বিচার কর সারিম!”
নওমির অভিযোগে সারিমের ভুরু দুটো আরও কুঁচকে গেল। সে আলভির ঝুলন্ত ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,
_”আলভি, এই হাতের এই অবস্থা কীভাবে হলো? আর নওমি যা বলছে, তার সত্যতা কতটুকু?”
সারিমের পেছন থেকে আলভি নিজের মাথাটা সামান্য বের করে, নওমির দিকে তাকিয়ে মুখটা ভেঙচিয়ে বলে উঠল,
_”কীসের ধোঁকা হ্যাঁ? রূপসী ডাইনি, মুখ সামইলা কথা বলো! বিয়ে ঞ্জআমি একা একা করি নাই। তুমি নিজের পায়ে হাইটা কাজী অফিসে গেছ। আর হাতের এই অবস্থা তো তোমার ওই রাক্ষুসে কামড়ের লাইগা হইছে! রাক্ষসী একটা!”
_”কী! তুই আমাকে রাক্ষসী বললি? তোর এত বড় সাহস!”
নওমি আবার তেড়ে গেল আলভিকে মারার জন্য। সে সারিমের আড়াল থেকে আলভিকে টেনে বের করার চেষ্টা করতে লাগল।
_”স্টপ ইট! বোথ অফ ইউ, জাস্ট শাট আপ!”
সারিমের বজ্রকণ্ঠের ধমকে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা এক ঝটকায় হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল। সারিমের চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল। ও এক ঝটকায় নওমিকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে ওকে দুই কদম দূরে ঠেলে দিল, আর পেছন থেকে আলভিকে টেনে এনে বেডে বসিয়ে দিল।
সারিম অত্যন্ত ঠান্ডা, বরফশীতল বললো,
_”এটা কোনো ক্লাব বা রাস্তা নয় যে যা ইচ্ছে তাই করবে। এটা একটা হসপিটাল। আর আলভি, তুমি আমার পিএ। তোমার থেকে আমি এই ধরনের সস্তা চিল্লাচিল্লি আশা করি না। এখন শান্ত হয়ে বসো দুজনে। এবং আমাকে পরিষ্কার করে বলো,কী হয়েছে? আলভি, তুমি শুরু করো। একদম প্রথম থেকে বলবে।”
সারিমের সেই খুনে চাউনি দেখে নওমি আর আলভি দুজনেরই মুখ বন্ধ হয়ে গেল। আলভি একটা ঢোক গিলে, নিজের ভাঙা হাতটা সাবধানে আগলে রেখে সেই বিভীষিকাময় ঐতিহাসিক রাতের কথা মনে করতে লাগল।
প্রতিদিন রাতে আলভি সব কাজ শেষ করে নিজের বাড়ি ফিরে।কাল রাতেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় দুটো বাজে। শহরের একটা অভিজাত বারের কাউন্টারে বসে নওমি একের পর এক হাই-ভোল্টেজ ড্রিংকস গলায় ঢালছিল। পরনে ওয়েস্টার্ন ড্রেস।নওমি বারবার গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে আর বিড়বিড় করে বলছে,
“কেন সারিম? কেন তুই ওই পিচ্ছি মেয়েটার জন্য আমাকে মারলি? ও তোকে কী দেবে? ও তো একটা বাচ্চার মতো! ও তোকে আমার মতো ভালোবাসতে পারবে না… তুই শুধু আমার, সারিম! শুধু আমার!”
বারের ওয়েটাররা নওমিকে ভালো করেই চিনত। তার বাবার ক্ষমতার কারণে কেউ তাকে ঘাটানোর সাহস পেত না। কিন্তু সেদিন নওমি এতটাই মাতাল হয়ে পড়েছিল যে সে নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল। একসময় বার বন্ধ হওয়ার সময় হলে সিকিউরিটিরা তাকে কোনোমতে ধরে বারের বাইরে রাস্তার পাশে এনে ট্যাক্সি ডেকে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু নওমি তাদের ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিয়ে নিজেই টলতে টলতে রাস্তায় নেমে আসে।
রাস্তা তখন প্রায় জনমানবহীন। দু-একটা দ্রুতগতির গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে চলে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় ওই রাস্তা দিয়েই নিজের গাড়িটা চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল আলভি।
সারা দিন অফিসের খাটুনি,বসের সঙ্গে কাজের সূত্রে এদিক ওদিক ছোটাছুটি —সব মিলিয়ে আলভির শরীর আর মন দুই-ই ক্লান্ত ছিল। সে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে গুনগুন করে গান গাইছিল আর ভাবছিল,
“আহা! জীবনটা যদি একটু রোমান্টিক হইত! বসের মতো আমারও যদি একটা সুন্দরী বউ থাকত!”
এসব ভাবতে ভাবতে আলভি আপন মনে ড্রাইভিং করছিল।ঠিক তখনই ওর গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ধরা পড়ল,একটা মেয়ে মাঝরাস্তায় একদম মাতাল অবস্থায় ডানে-বামে দুলতে দুলতে হেঁটে আসছে। মেয়েটা এতটাই অপ্রকৃতিস্থ যে যেকোনো মুহূর্তে কোনো বড় গাড়ির নিচে চাপা পড়ে যেতে পারে। আলভি কড়া করে ব্রেক চাপল।
শব্দ করে গাড়িটা মেয়েটার থেকে মাত্র দুই ফুট দূরে গিয়ে থামল।আলভি কপালে হাত দিয়ে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি থেকে নামল। মনে মনে বিরবির করল, _”কোন পাগলি রে ভাই, মাঝরাতে মরতে আসছে!”
অগত্যা আলভি গাড়ি থেকে নেমে এসে মেয়েটার মুখের ওপর ফোনের ফ্ল্যাশ অন করতেই,বুকের বাঁ পাশে ৪৪০ ভোল্টের একটা ইলেকট্রিক শক লাগল! ওর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। শার্টের পকেটে হাত দিয়ে সে নিজের বুকটা চেপে ধরল।
_”আরে! এ তো… এ তো বসের সেই রূপসী ডাইনি বান্ধবীটা!
এক মাস আগে মৃধা নিবাসে নওমিকে প্রথম নজরেই দেখে আলভি ওর প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছিল। যদিও সে জানত এই মেয়ে বসের জন্য পাগল, তাও মনের ভেতর একটা অবাধ্য চারাগাছ গজিয়ে উঠেছিল। আজ সেই মেয়েকে এভাবে মাঝরাস্তায় অসহায় অবস্থায় দেখে আলভির ভেতরের ‘মজনু’ এক নিমেষে জেগে উঠল।
আলভি দ্রুত নওমির দিকে এগিয়ে গেল এবং অত্যন্ত নরম গলায় বলল,
_”নওমি মিস? আপনি এখানে এই অবস্থায়? আপনার গাড়ি কোথায়? বাড়ি যাবেন না?”
নওমি আধবোজা চোখে আলভির দিকে তাকাল। অতিরিক্ত অ্যালকোহলের প্রভাবে ওর মগজে তখন ধুসর কুয়াশা। সে আলভির অবয়বটা ভালো করে দেখতে পাচ্ছিল না। ওর অবচেতন মনে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে আর কেউ নয়, স্বয়ং সারিম ভেবে বসে নিল!
নওমি হুট করে আলভির শার্টের কলারটা দুই হাত দিয়ে খামচে ধরল। ওর মুখ থেকে তীব্র মদের গন্ধ আসছিল। সে আলভির মুখের একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল,
_”সারিম! তুই… তুই এসেছিস? আমি জানতাম তুই আমাকে ফেলে যেতে পারবি না। তুই ওই পিচ্ছি মেয়েটাকে ছেড়ে আমার কাছেই আসবি…”
আলভি চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে নওমির হাত দুটো আলতো করে সরানোর চেষ্টা করে বলল,
_”আরে মিস, আমি সারিম স্যার না। আমি আলভি। বসের পিএ। আপনি ভুল করছেন। চলুন, আপনাকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌছে দেই।”
কিন্তু নওমি কোনো কথাই শুনল না। সে আলভিকে রাস্তার পাশের একটা রেলিংয়ের ওপর টেনে নিয়ে বসাল এবং নিজেও তার পাশে ধপাস করে বসে পড়ল। এরপর শুরু হলো নওমির কষ্টের কথার ফুলঝুরি। সে কাঁদতে কাঁদতে নিজের চুল খামচে ধরে বলতে লাগল,
_”সবাই আমাকে রিজেক্ট করে! আমার বাবা আমাকে বোঝে না, তুই আমাকে বুঝলি না। আমি তোকে এত ভালোবাসি, তাও তুই আমাকে থাপ্পড় মারলি? ওই বাচ্চার জন্য?”
আলভি চুপচাপ বসে নওমির ওই চোখের জল, ওই লাল হয়ে যাওয়া নাক আর অবাধ্য জেদটার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। মনে মনে বলল,
_”আহা রে! কী মারাত্মক ভালোপাসা বসের জন্য! অথচ বস ওরে লাথি মেরে বের করে দেয়। কপাল খারাপ আমার! আমি এখানে ওর উপর মন দিয়ে বসে আছি,আর ও অন্য কারোর জন্য কাঁদতেছে।”
নওমি হঠাৎ কান্না থামিয়ে আলভির দিকে ফিরল।চোখ দুটো নেশায় আর কান্নায় জবা ফুলের মতো লাল।সে আলভির শ্যামলা,গোলগাল মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতটা আলভির গালে রাখল। আলভি তো লজ্জায় একদম জমে বরফ!
নওমি ফিসফিস করে বলল,
_”সারিম… তুই কি আমাকে সত্যিই কোনোদিন ভালোবাসবি না? তুই কি আমাকে বিয়ে করবি না?”
আলভি হা করে তাকিয়ে রইল। সে কী বলবে ভেবে পেল না।নওমি আলভির শার্টের বুকটা খামচে ধরে ঝাঁকাতে লাগল,
_”বল! বিয়ে করবি আমাকে? করবি কিনা বল? যদি না করিস, আমি এখনই এই রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোনো গাড়ির নিচে ঝাঁপ দেব! বল, করবি?”
আলভি বেচারা চরম এক সংকটে পড়ে গেল। একদিকে বসের প্রাক্তন বেস্টফ্রেন্ড এবং ওয়ান-সাইডেড লাভার, যে এখন পুরোপুরি উন্মাদের মতো আচরণ করছে। অন্যদিকে আলভির নিজের ভেতরের সুপ্ত ইচ্ছা।
_”এই মেয়েকে যদি এখন ছেড়ে দিই, ও সত্যি সত্যি মরবে। আর তা ছাড়া… সুযোগ তো জীবনে বারবার আসে না। বস তো ওরে ডাইরেক্ট রিজেক্ট করে দিছে। এখন যদি আমি ওরে আপন করে নিই, ক্ষতি কী? জীবন তো তেজপাতা হইলেও সার্থক!”
আলভি অনেক কিছু ভেবে, শেষমেশ একটা লাজুক আর চতুর হাসি দিল। সে নওমির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল,
_”আমি রাজি। আমি আপনাকে বিয়ে করতে প্রস্তুত, নওমি জান। কিন্তু একটা কথা… পরে কিন্তু পস্তাতে পারবেন না।”
নওমি নেশার ঘোরে শুধু মাথা নাড়ল,
_”আমি পস্তাব না… চল, এখনই চল। কাজী অফিসে চল।”
রাত তখন দুটো বেজে পঞ্চাশ মিনিট। আলভি নিজের গাড়িটা চালিয়ে পুরান ঢাকার এক চিপা গলির ভেতরে এসে থামাল। এই এলাকায় তার এক পরিচিত কাজী থাকে, যে টাকার বিনিময়ে যেকোনো অসময়ে বিয়া পড়াতে ওস্তাদ।
গাড়ির পেছনের সিটে নওমি তখন পুরোপুরি এলিয়ে পড়েছে। সে কখনো হাসছে, কখনো কাঁদছে, আর অবিরত সারিমের নাম জপ করছে। আলভি গাড়ি থেকে নেমে নওমিকে এক প্রকার পাঁজাকোলা করে গাড়ি থেকে বের করল। নওমির খোলা অবিন্যাস্ত চুলগুলো লুটোপুটি খাচ্ছিল বাতাসে। আলভি সেগুলো নিজ হাতে ঠিক করে দিল।বলল,
_”আহা, লক্ষ্মী বউ আমার, একটু শক্ত হয়ে দাঁড়াও। আর কয়েকটা কদম।”
কাজী অফিসের দরজায় অনবরত ধাক্কা দেওয়ার পর ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ কাজী সাহেব লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে, চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুললেন। মাঝরাতে এভাবে একটা ছেলে আর একটা মদ্যপ মেয়েকে দেখে কাজী সাহেবের চোখ তো চড়কগাছ!
_”কী মিয়া? এই মাঝরাইতে কারে ধইরা নিয়া আইছ? মেয়েটার তো দেহি পা চলতেছে না! মদ খাইছে নাকি?” কাজী সাহেব নাক কুঁচকে বললেন।
আলভি দ্রুত পকেট থেকে কয়েকটা পাঁচশত টাকার নোট বের করে কাজী সাহেবের হাতে গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
_”চিল্লাচিল্লি করবেন না। প্রেমঘটিত জটিল কেস। মেয়েটা বিষ খেতে গেছিল। আমি বাঁচাইয়া নিয়া আসছি। আপনি দ্রুত নিকাহনামা বের করেন। শুভ কাজে দেরি করতে নাই।”
টাকার গরম দেখে কাজী সাহেবের সুর এক নিমেষে নরম হয়ে গেল। তিনি তাদের ভেতরে বসতে দিলেন। সেই সময় কাজী অফিসে আরও দুজন মানুষ ঘুমাচ্ছিল। একজন হলো কাজী সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্ট মকবুল, আর অন্যজন কাজীর ভাগ্নে পল্টু, যে গ্রাম থেকে ঢাকা বেড়াতে এসেছে।
কাজী সাহেব তাদের ডেকে তুললেন,
_”এই মকবুল, পল্টু! ওঠ ব্যাটারা। সাক্ষী হইতে হইব। খাতা কলম লৈয়া বোস।”
মকবুল আর পল্টু চোখ ডলতে ডলতে টেবিলের সামনে এসে বসল। নওমি তখন কাজীর চেয়ারের ওপর সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করছিল, কিন্তু বারবার ডানে-বামে হেলে পড়ছিল।
কাজী সাহেব খাতা খুলে লিখতে শুরু করলেন,
_”মেয়ের নাম কী?”
নওমি হঠাৎ টেবিলের ওপর একটা থাপ্পড় মেরে চেঁচিয়ে উঠল,
_”আমার নাম নওমি!তেজরিন খান নওমি, আমি সারিমের বউ! লেখো, সারিম মৃধা!”
আলভি দ্রুত নওমির মুখটা নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরে কাজী সাহেবকে বলল,
_”হুজুর,বরের নাম আলভি হোসেন। আপনি লেখেন।”
নওমি আলভির হাতটা কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। সে টেবিলের ওপর রাখা কালির দোয়াতটা এক হাত দিয়ে উল্টে দিল। নীল কালি গিয়ে পড়ল কাজী সাহেবের ধবধবে সাদা ফতুয়ার ওপর!
_”আস্তাগফিরুল্লাহ! এইটা কী করল এই বেডি?” কাজী সাহেব চিৎকার করে উঠলেন।
_”হুজুর, রাগ করবেন না। আমি আপনার নতুন ফতুয়ার কিনার জন্য টাকা দিবো,” আলভি আরেকটা নোট বাড়িয়ে দিল।
পাশ থেকে মকবুল যখন নওমিকে জিজ্ঞাসা করল,
_”কন্যা, আপনি কি একশত বারো টাকা দেনমোহরে আলভি হোসেনকে স্বামী হিসেবে কবুল করিয়া লইলেন?”
নওমি টেবিলের ওপর মাথা রেখে বিড়বিড় করছিল। সে মকবুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
_”কবুল? কারে কবুল? সারিমরে? হ্যাঁ, কবুল! কবুল! একশ বার কবুল!”
আলভি মকবুলের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারল,
_”দেখলেন তো? ও কবুল বলছে। আপনি সই নেন।”
নওমি খাতার ওপর সই করার সময় কলমটা দিয়ে খাতাটা ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করল। সে সই করল ঠিকই, কিন্তু সেটা সোজা লাইনে না হয়ে একটা আঁকাবাঁকা জিলাপির মতো হলো। আলভি নিজের সইটা অত্যন্ত নিপুণভাবে এবং গর্বের সাথে সম্পন্ন করল।
সাক্ষী হিসেবে মকবুল আর পল্টু তাদের দস্তখত বসিয়ে দিল। পল্টু নওমির দিকে হা করে তাকিয়ে ছিল। সে আলভির কানে ফিসফিস করে বলল,
_”ভাই, আপনে তো খাসা মাল পটানি দিছেন! কিন্তু আপনের কপালে যে শনি আছে, হেইডা বুঝতেছেন?”
আলভি পল্টুর পিঠে একটা থাপ্পড় মেরে বলল,
_”চুপ কর ব্যাটা!বিয়া হইছে, এটাই অনেক।”
বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর আলভি নওমিকে আবার গাড়িতে নিয়ে আসার জন্য ধরল, নওমি হঠাৎ আলভির দিকে ঘুরে তাকাল। নেশার ঘোরে ওর কেন যানি মনে হলো এটা সারিম নয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সারিমরুপী লোকটা তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। নওমি তীব্র কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
_”তুই আমার সারিম নোস! তুই কে রে ছোটলোক?”
এই বলেই নওমি আলভির ডান হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের ধারালো দাঁত দিয়ে এক কামড় বসিয়ে দিল! এবং একই সাথে আলভিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল কাজী অফিসের সিঁড়ি থেকে। আলভি বেচারা সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে গিয়ে একটা ভাঙা ইটের ওপর ল্যান্ড করল, আর মট করে একটা শব্দ হলো ওর ডান হাতের হাড়ে!
_”আহহহহহ মরে গেলাম রে!”
আলভি চিৎকার করে উঠল। কিন্তু সেই ভাঙা হাত নিয়েই সে কোনোমতে নওমিকে গাড়িতে তুলে হসপিটালে নিয়ে এসেছিল।
সারিম এতক্ষণ হাত গুটিয়ে, দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আলভির বর্ণনা শুনছিল। ওর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, চতুর আর বাঁকা হাসিটা আবার ফুটে উঠল। সে নওমির দিকে তাকাল, যে এতক্ষণ রাগে লাল হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে নখ কামড়াচ্ছিল।
নওমি সারিমের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
_”সারিম! তুই এই ছোটলোকের কথা বিশ্বাস করছিস? ও একটা আস্ত জোচ্চোর! ও আমাকে কোনো ড্রাগস খাইয়েছিল হয়তো! আমি কেন এই দুই টাকার অ্যাসিস্ট্যান্টকে বিয়ে করব? আমার স্ট্যাটাস কী, আর এর স্ট্যাটাস কী!”
আলভি বিছানা থেকে আবার চিল্লিয়ে উঠল,
_”ওহ রে আমার মহারানী! স্ট্যাটাস দেখায়! বিয়ার রাতে যখন সারিম সারিম কইরা আমারে জড়াইয়া ধরছিলা, তখন স্ট্যাটাস কই আছিল? আমার হাতটা যে চিবাইয়া খাইলা, এখন আবার আমারে চোর বানাইতাছ!”
_”চুপ কর তুই!” নওমি আবার স্যালাইনের স্ট্যান্ডটা তুলতে গেল।
_”নওমি!”
সারিমের ভারী আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবার পুরো ঘরটাকে শান্ত করে দিল। সে এক কদম এগিয়ে এসে নওমির ঠিক সামনে দাঁড়াল। ওর চোখ থেকে সেই কৌতুকময় ভাবটা উধাও হয়ে সেখানে এক ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আর শীতলতা ফুটে উঠল।
সারিম নওমির চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল,
_”নওমি! আলভি যা করেছে, সেটার আইনি বৈধতা আছে। তুই এখন আইনত এবং সামাজিকভাবে আলভির বিবাহিত স্ত্রী।”
নওমি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সারিমের দিকে তাকাল। ওর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল,
_”সারিম… তুই এটা বলতে পারিস? তুই আমাকে এই ফকিন্নির হাতে ছেড়ে দিচ্ছিস? তুই আমাকে একটুও ভালোবাসিস না?”
সারিম একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে নিজের পাঞ্জাবির কলারটা একটু ঠিক করে বলল,
_”আমি আগেও তোকে কোনোদিন ভালোবাসিনি নওমি, আর আজ তো প্রশ্নই ওঠে না। আমার ঘরে আমার স্ত্রী আছে। আর তোর জন্য আলভিই একদম পারফেক্ট।”
সারিম এবার আলভির দিকে ফিরল। আলভি তখন বসের এই ঐতিহাসিক রায় শুনে মনে মনে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়ছিল।
সারিম আলভিকে বলল,
_”আলভি, তোমার এই ভাঙা হাতের জন্য তোমাকে এক সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হলো। তবে হ্যাঁ, ছুটিটা কিন্তু হানিমুনের জন্য নয়, নিজের হাত ঠিক করার জন্য। আর আজ থেকে তোমার স্ত্রীর সমস্ত দায়িত্ব তোমার।”
“জি স্যার!”
নওমি কাঁপতে কাঁপতে সোফার ওপর বসে পড়ল। সারিমকে পাওয়ার সমস্ত রাস্তা আজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। এখন তার কপালে এই আলভি নামের অদ্ভুত ছেলেটাই লেখা আছে।ভাবতেই বেচারি রাগে ফেটে পরছে।
সারিম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে নিজের পকেট থেকে সানগ্লাসটা বের করে চোখে পরল।দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে হ্যান্ডেলটা ধরে সে পিছন ফিরে আলভিকে একটা শেষ বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে বলল-
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৩
“শুভ বিবাহিত জীবন, আলভি। ডাইনিকে সামলানোর জন্য অল দ্য বেস্ট।”
কথাটা বলেই শিক্ষামন্ত্রী মৃধা আবরার সারিম নিজের চিরচেনা দর্পিত ভঙ্গিতে, জুতোর খটখট শব্দ তুলে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে বেরিয়ে গেল। আর কেবিনের ভেতরে আলভি অত্যন্ত লাজুক আর চতুর চোখে নওমির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
_”আহা! তেজপাতা হইলেও জীবনটা আজ থিক্কা সার্থক হইয়া গেল!”
