Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৫

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৫

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৫
মেহজাবিন নাদিয়া

নিস্তব্ধ এক ভোরের রেশ কাটিয়ে সকালটা গড়িয়ে দুপুর হতে চলল। অরির ঘরের ব্যালকনি থেকে গার্ডেনের দিকে তাকিয়ে জেবা একদৃষ্টিতে বসে আছে। ওর দুচোখে বিষণ্নতার গভীর ছায়া, যেন মনের ভেতরে কোনো এক অদৃশ্য মেঘের আস্তরণ জমেছে। আরিশান মৃধার সেই নির্মম বাক্য-জেবা ওনার কেউ নয়, ওর কোনো দায়িত্ব নেওয়ার দায়বদ্ধতাও ওনার নেই”
জেবার মস্তিষ্কের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা কি তবে সারাজীবন ওর সঙ্গী হয়ে থাকবে? সমাজ, পরিবার, আর এই অদ্ভুত অসম সম্পর্কের জটিল আবর্তে জেবা আজ নিজেকে বড্ড একা,বড্ড তুচ্ছ মনে করছে।

​অরি রুমে পা রাখতেই দেখল জেবা স্থির মূর্তির মতো বসে আছে। অরি বুঝতে পারল জেবার মনের ভেতরে কী পরিমাণ ঝড় চলছে।অরি কোনো উচ্চবাচ্য করল না। সে জানে, এই মুহূর্তে জেবাকে সান্ত্বনার বাণী শোনানোর চেয়ে ওর পাশে থাকাটা বেশি জরুরি। আরিশান মৃধার ওই কঠোর শব্দগুলো জেবার কোমল হৃদয়ে কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তা অরির অজানা নয়। অরি নিঃশব্দে আলমারির কাছে এগিয়ে গেল।
কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিতে হবে। অরি আলমারি থেকে বের করল হালকা নীল রঙের একটি ফরমাল শার্ট আর গাঢ় নীল জিন্স। শার্টের হাতা দুটো কিছুটা গুটিয়ে নিয়ে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। বাদামী রেশমি চুলগুলোকে আলতো হাতে দুভাগে ভাগ করে চমৎকার একটি বেণী করে নিল। ঠোঁটে আলতো করে বুলিয়ে নিল ন্যুড শেডের লিপ গ্লস। বাড়তি কোনো সাজসজ্জা ছাড়াই অরিকে স্নিগ্ধ অথচ ব্যক্তিত্বময়ী দেখাচ্ছিল।এমনিতেই অরি দেখতে মারাত্মক সৌন্দর্যের অধিকারে, তার উপর এই সামান্য সজ্জাটাই ওকে আরো ভুবনময়ী সৌন্দর্য দেখাচ্ছে।চোখের কোণে কোনো এক অজানা দৃঢ়তা আর গাম্ভীর্য ফুটে উঠছে ওর।
​টেবিল থেকে ব্যাগটা টেনে নিল অরি। প্রয়োজনীয় বই-খাতাগুলো ব্যাগে গুছিয়ে, ফোনটা পকেটে রেখে সে জেবার দিকে ফিরল। জেবার সেই উদাসীন চাহনি তখনো গার্ডেনের দিকে। অরি ধীর পায়ে ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। জেবার চিবুকটা ধরে নিজের দিকে আলতো করে ঘোরাল সে। জেবার চোখের কোণে এখনো ভেজা ভাব।
​অরি মিষ্টি হেসে বলল,

_”জেবা, তুই যদি এভাবে নিজেকে শেষ করে দিস, তাহলে পড়াশোনা করবি কখন?এখনো তোর বাকি জীবন পরে আছে!আগে নিজের ক্যারিয়ার তৈরী কর।নিজেকে একটা শক্ত অবস্থানে নিয়ে চল। ভাগ্যে যদি লেখা থাকে আর তোর ভালোবাসার নিয়ত ভালো থাকে, দেখবি তুই একদিন তোর সত্যিকারের ভালোবাসা নিশ্চই পাবি। ধৈর্য্য ধরতে শিখ আগে।আজকে আর তোর কোচিং যাওয়ার দরকার নেই,তবে হ্যাঁ কোচিংয়ে যাওয়ার আগে তোকে নাস্তাটা করিয়েই ছাড়ব।সেই কাল দুপুরে খেয়েছিস এখনো অব্দি আর কিছু মুখে তুলিস নি।এভাবে থাকলে কি হবে? আগে নিজের শরীরের দিকে নজর দে!”
​জেবা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ওর কণ্ঠে তখন কান্নার রেশ। অরি কোনো উত্তর শোনার অপেক্ষা করল না। সে নিচে গিয়ে শাহীন মিয়াকে ডেকে দিল, যেন জেবার জন্য নাস্তাটা ওপরের রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর খাবার নিয়ে বারান্দায় ছোট্ট টি-টেবিলে সাজিয়ে রেখে শাহীন মিয়া চলে গেলেন। অরি জেবার সামনের সোফায় বসলো।
​জেবা অরিকে বলল,

_”অরি, আমার কি সত্যিই এই বাড়িতে থাকা উচিত?ওনি যেভাবে সারিম ভাইয়ার সামনে আমাকে অস্বীকার করলেন…”
​অরি জেবার মুখে হাত রেখে বাধা দিল।
_”জেবা, ওসব কথা আর ভাববি না। মানুষ যখন রাগের মাথায় থাকে, তখন অনেক ভুল কথা বলে ফেলে।বাবা এখন মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত। তুই শুধু নিজের ওপর ফোকাস কর। দেখ, তোর সামনে মেডিকেল অ্যাডমিশন, ওটা এখন তোর একমাত্র লক্ষ্য।”
​খাবারগুলো জেবার দিকে এগিয়ে দিয়ে অরি স্নেহের সুরে বলল,
_”খা তো, না খেলে শরীর একদম ভেঙে যাবে।না খেয়ে থাকা একদম চলবে না।”
​জেবা বাধ্য মেয়ের মতো এক চামচ খাবার মুখে দিল। ওর চোখের জল আবার টলমল করে উঠল। অরি ওর পাশে বসে নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। এরপর জেবার কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে ওর গালে আদুরে একটা চুমু খেল।​অরি হাসিমুখে বলল,

_”আমি বিকেলে ফিরে আসব। চিন্তা একদম করিস না। তোর জন্য আমি আছি তো, আর সারিমও তো আছে। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। সাবধানে থাকিস, কেমন?”
কথাটা বলেই ​অরি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়, শেষবারের মতো জেবার দিকে তাকাল। অরিকে যেতে দেখে জেবা ম্লান মুখে একটি মুচকি হাসি দিল। এই শত কষ্টের মাঝেও অরির এই উপস্থিতি, এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা জেবার বাঁচার রসদ। অরি বেরিয়ে যেতেই জেবা একা হয়ে গেল,কিন্তু ওর মনের কোণে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করে গেল।মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাল। জীবনটা হয়তো বড় বেশি জটিল, অনিশ্চয়তায় ঘেরা, কিন্তু অরির মতো এমন একজন বন্ধু পাশে থাকলে সব লড়াই যেন কিছুটা হলেও সহজ মনে হয়। জেবা আবার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল, কিন্তু এবার ওর চোখে অতটা বিষণ্নতা নেই। অরির দেওয়া সেই ছোট্ট চুমু আর আশার বাণী ওর বুকের ভেতরের হিমশীতল শূন্যতায় যেন একমুঠো উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে গেল।
অরি বাইরে এসে দাঁড়াতেই সকালের সেই মনোরম স্নিগ্ধতা উধাও হয়ে রোদের তীব্রতা চোখে লাগল।তপ্ত সূর্য মাথার ওপর তার তেজ ছড়াতে শুরু করেছে। মৃধা নিবাসের বিশাল লোহার গেটটা পেরিয়ে অরি এসে রাস্তার মোড়ে দাঁড়াল, ড্রাইভার রহিম মিয়া আগে থেকেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রেখেছিলেন।
রহিম মিয়া অরিকে দেখে তড়িঘড়ি করে নেমে পেছনের দরজাটা খুলে ধরলেন।

_”আসসালামু আলাইকুম, আম্মাজান। কোচিংয়ে যাবেন নাকি?”
_”ওয়ালাইকুম আসসালাম, আঙ্কেল। হ্যাঁ, চলুন। একটু তাড়াতাড়ি করবেন, এমনিতেই কিছুটা দেরি হয়ে গেছে,” অরি গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল।
গাড়ির এসিটা চালু হতেই ভেতরের শীতল হাওয়া অরির ক্লান্ত শরীরে স্বস্তি এনে দিল। সে জানালার কাচ দিয়ে বাইরের চিরচেনা শহরটার দিকে তাকিয়ে রইল। জ্যাম, কোলাহল, মানুষের কর্মব্যস্ততা-সবকিছু কেমন যেন যান্ত্রিক।
অরি নিজের ব্যাগ থেকে চোখের রিডিং গ্লাসটা বের করল।এরপর পকেট থেকে ফোনেটা বের করে স্ক্রিনটা অন করে সময় দেখল। হাতে আর মাত্র পনেরো মিনিট আছে। এই সময়ে শহরের ট্রাফিক জ্যাম পেরিয়ে কোচিং সেন্টারে পৌঁছানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

_”আঙ্কেল, ফ্লাইওভার দিয়ে নিন। নিচের রাস্তায় জ্যাম বেশি হতে পারে,” অরি পেছন থেকে নির্দেশ দিল।
_”জি আম্মাজান, আমি ওই দিক দিয়েই যাচ্ছি,” রহিম মিয়া দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ঘোরালেন।
গাড়ি যখন ফ্লাইওভারে উঠল, তখন দুপুরের রোদ এসে সরাসরি অরির মুখের ওপর পড়ল।অরি নিজের ব্যাগ থেকে নোটখাতাটা বের করে আরও একবার চোখ বোলাতে লাগল। বায়োলজির জেনেটিক্স চ্যাপ্টারটা আজ পড়ানো হবে। কোচিংয়ের রেগুলার টেস্টও আছে। এত সব মানসিক ঝামেলার মাঝেও নিজের পড়াশোনার ক্ষতি সে হতে দিতে পারে না।
ঠিক পনেরো মিনিট পর গাড়ি এসে থামল কোচিং সেন্টার মেডিকোর’ প্রধান শাখার সামনে। চারতলা এই ভবনটির সামনে সব সময়ই পরীক্ষার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। শত শত তরুণ-তরুণী চোখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এখানে আসে।
গাড়ি থামতেই রহিম মিয়া নেমে দরজা খুলে দিলেন। অরি তার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে, রিডিং গ্লাসটা নাকের ডগায় একটু ঠিক করে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল।

দুপুরের কড়া রোদ তখন অরির হালকা নীল রঙের ফরমাল শার্টের ওপর এসে পড়েছে, যার ফলে শার্টের রঙটা যেন আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। হাতার গুটিয়ে রাখা অংশ থেকে তার ফর্সা হাত দুটো রোদে চকচক করছে। চুলগুলো বেণীতে বাঁধা থাকায় তার ঘাড়ের স্নিগ্ধতা স্পষ্ট।ঠোঁটে ন্যুড শেডের লিপ গ্লস, যা রোদের আলোয় সামান্য চকচকে আভা ছড়াচ্ছে। অরি মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল,গেইটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একদল ছেলে, যারা এতক্ষণ হাসাহাসি আর আড্ডায় মত্ত ছিল,তাদের সবার দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হলো অরির ওপর।
ছেলেদের মধ্যে থেকে একজন অরিকে দেখে ফিসফিস করে বলল।
_”আজকে এই অরি মেয়েটাকে মারাত্মক জোস লাগছে।একে কোনভাবে গালফ্রেন্ড বানাতে পারলে জীবন সার্থক!”

_”গালফ্রেন্ড না,বউ!অন্য একজন হা করে তাকিয়ে থেকে মন্তব্য করল।
অরি প্রতিদিন এই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তবে সে এইসমস্ত সস্তা মনোযোগকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয় না।চোখের কোণে সবসময় একটা সহজাত গাম্ভীর্য আর উদাসীনতা থাকে, যা ছেলেদেরকে তার কাছে আসার সাহস দেয় না। অরি সোজা তাকিয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।
ছেলেরা অনেকেই ইচ্ছা করেই তার পথ আগলে দাঁড়ানোর ভান করে, কিন্তু অরির সেই তীক্ষ্ণ, গম্ভীর চাউনি দেখলেই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথ ছেড়ে দেয়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। অরি কাউকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে, নিজের চশমাটা বাম হাতের আঙুল দিয়ে একটু উপরে ঠেলে সোজা লিফটে উঠে গেল। লিফটের স্টিলের দেওয়ালে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে একবার তার বেণীটা ঠিক করে নিল। মনে মনে অরি ভাবল, ‘ছেলেরা সত্যিই অদ্ভুত। রূপের পেছনে সবাই এভাবে অন্ধের মতো ছোটে কেন? ভেতরের মানুষটাকে চেনার চেষ্টা কজন করে?’

লিফট থেকে তিনতলায় নেমে অরি তার নির্ধারিত ক্লাসরুমের সামনে পৌঁছাল, তখনো ক্লাস শুরু হতে কয়েক মিনিট বাকি। বিশাল এই হলরুমে প্রায় দেড়শতাধিক শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা রয়েছে। মেয়েদের বসার সারি আলাদা হলেও পেছনের দিকে সহশিক্ষার নিয়ম অনুযায়ী ছেলে-মেয়েরা একসাথেই বসে।
অরি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই পুরো ক্লাসরুমের গুঞ্জন এক পলকের জন্য থেমে গেল। পেছনের সারিতে বসা প্রায় প্রতিটি ছেলের চোখ চকচক করে উঠল। অরি ক্লাসরুমে চোখ বুলাতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল-যা এই এক মাস ধরে সে প্রায় প্রতিদিনই দেখে আসছে।
ক্লাসরুমের পেছনের দিকের প্রায় চার-পাঁচটি বেঞ্চের পাশের চেয়ারগুলো খালি পড়ে আছে। প্রতিটি খালি চেয়ারের পাশেই বসে আছে কোনো না কোনো ছেলে। তারা সবাই নিজেদের ব্যাগ কিংবা খাতা পাশের চেয়ারে রেখে জায়গা আটকে রেখেছে। কেন রেখেছে, তা অরির অজানা নয়। এই ছেলেগুলো প্রতিদিন মনে মনে একটা অসম্ভব আশা নিয়ে আসে-যদি কোনোদিন অরি এসে তাদের পাশের খালি চেয়ারটায় বসে! যদি তার সাথে দুটো কথা বলার সুযোগ মেলে!

এক একটা ছেলের চাহনিতে স্পষ্ট আকুতি। কেউ কেউ আবার অরিকে দেখে তড়িঘড়ি করে নিজের পাশের চেয়ার থেকে ব্যাগটা সরিয়ে নিয়ে বিনীতভাবে হাসার চেষ্টা করল, যেন আকারে-ইঙ্গিতে ডাকছে—’এখানে এসে বসো।’
কিন্তু অরি তাদের সবাইকে চরম হতাশ করে দিয়ে নিজের দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে রাখল। সে খুব ভালো করেই জানে, এই ফাঁদে পা দেওয়া মানেই নিজের পড়াশোনার বারোটা বাজানো। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা অরি বিবাহিত। স্বামীকে মানুক আর না মানুক তবে স্বামীর প্রতি লয়াল থাকবে বলে নিজেকে নিজে শাসিয়েছে অরি।
ক্লাসরুমের ডানদিকের জানালার পাশের সারির দিকে তাকাল অরি। সেখানে একদম শেষের দিকের একটা ডেস্কে বসে আছে একটি চেনা মুখ-আরাফ।
আরাফ আগে থেকেই অরির আসার অপেক্ষায় ছিল। অরিকে ক্লাসরুমে ঢুকতে দেখেই সে তার পাশের খালি চেয়ারে রাখা নিজের ওয়াটার বোতল আর ব্যাগটা সরিয়ে নিল। সে অরির দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু, মার্জিত হাসি দিল।

অরি আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে দ্রুত পায়ে হেঁটে আরাফের দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশের ছেলেদের দীর্ঘশ্বাস আর হতাশাজনক চাহনিকে পেছনে ফেলে সে সরাসরি আরাফের পাশের সেই কাঙ্ক্ষিত চেয়ারটায় গিয়ে বসল। পেছনের সারি থেকে কয়েকজন ছেলে নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে বলতে লাগল—
_”ধুর ইয়ার! আজকেও ওই আরাফ ব্যাটাই বাজি মেরে দিল!”
চেয়ারে বসে অরি তার কাঁধের ব্যাগটা ডেস্কের ওপর রাখল। এসি চলা সত্ত্বেও তার কপালে সামান্য ঘাম জমেছিল, সে টিস্যু বের করে আলতো করে কপালটা মুছে নিল।আরাফ অরির মুখের দিকে তাকাল। অরির চোখের কোণের ক্লান্তিটা সে চট করে ধরে ফেলল। কোচিংয়ে এই এক মাসে অরি আর জেবার সাথে আরাফের বেশ ভালো একটা বন্ডিং তৈরি হয়েছে। আরাফ ছেলেটা অন্য ছেলেদের মতো নয়; সে ভীষণ ভদ্র, পড়াশোনায় তুখোড় এবং বন্ধুদের প্রতি ভীষণ কেয়ারিং। এই এক মাসে সে অরি আর জেবাকে পড়াশোনার নানা খুঁটিনাটি নোট দিয়ে, কঠিন টপিকগুলো সহজ করে বুঝিয়ে দিয়ে তাদের ভীষণ ফ্রি করে নিয়েছে।

_”কী হয়েছে রে অরি? তোকে কেমন যেন চিন্তিত দেখাচ্ছে,” আরাফ তার কণ্ঠস্বর কিছুটা নামিয়ে আন্তরিকতার সাথে জিজ্ঞেস করল।
_”আর জেবা কোথায়? আজ ও আসেনি কেন? ওর তো আসার কথা ছিল।”
অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”জেবার শরীরটা ভালো নেই রে।তাই আজকে আসতে বারণ করলাম।”
_”ওহ!
আরাফ অরির ডেস্কের ওপর একটা সুন্দর করে বাঁধানো ডায়েরি এগিয়ে দিল।

_”এটা কী?” অরি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
_”জেনেটিক্সের ওপর আমার তৈরি করা স্পেশাল শর্টকাট নোট। আজকে স্যার যে চ্যাপ্টারটা পড়াবেন, তার ওপর ভিত্তি করে বানানো। এটা একবার চোখ বুলিয়ে নে, ক্লাসের পড়া ধরতে সুবিধা হবে। আর জেবাকে এটা দিয়ে দিস, ও যেন বাড়িতে বসে এটা কভার করে নেয়,” আরাফ হাসিমুখে বলল।
নোটখাতাটা হাতে নিয়ে অরির মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। সে খাতাটা খুলে দেখল, অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিষ্কার অক্ষরে প্রতিটি জটিল সূত্র আর ব্যাখ্যা লিখে রাখা হয়েছে। আরাফের এই নিঃস্বার্থ সাহায্য সত্যিই অসাধারণ।
_”থ্যাংক ইউ সো মাচ, আরাফ। তুই সত্যি অনেক হেল্প করিস আমাদের।” অরি আন্তরিকভাবে বলল।
_”ধুর! বন্ধুদের মধ্যে আবার থ্যাংক ইউ কিসের? তোরা ভালো রেজাল্ট করলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় গিফট।”

অরি আরাফের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, সব ছেলেই যদি আরাফের মতো মার্জিত হতো, তবে হয়তো এই সমাজটা অনেক সুন্দর হতো।
ঠিক তখনই ক্লাসরুমের সামনের দরজা দিয়ে লেকচারার তানভীর স্যার প্রবেশ করলেন। হাতে তার মার্কার পেন আর প্রজেক্টরের রিমোট। পুরো ক্লাসরুমে মুহূর্তের মধ্যে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। অরি ওর রিডিং গ্লাসটা আবার চোখে পরে খাতা-কলম রেডি করল। আরাফও তার মনোযোগ স্ক্রিনের দিকে দিল।

এদিকে ফাকা বাড়িতে জেবার জন্য এই বিশাল রাজপ্রাসাদসম বাড়িটা এখন একটা নিঃসঙ্গ খাঁচা ছাড়া আর কিছুই নয়।ভেতরের চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে দম আটকে আসছিল ওর। তাই নিজের মনটাকে কিছুটা হালকা করতে, ভেতরের জমে থাকা বিষাদের মেঘগুলোকে একটু কাটাতে সে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে নিচে নেমে এল বাগানের দিকে।
মৃধা নিবাসের এই বিশাল বাগানটা জেবার ভীষণ পছন্দের একটা জায়গা। যখনই ওর মন খারাপ থাকে, ও এই বাগানের সবুজ ঘাসের ওপর এসে দাঁড়ায়।বাগানটা সত্যিই দেখার মতো। চারপাশটা এত সুনিপুণভাবে সাজানো যে যেকারো মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। বিস্তীর্ণ সবুজ লনের দুপাশে সারিবদ্ধভাবে ফুটে আছে রকমারি দেশী-বিদেশী ফুলের গাছ। একদিকে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা আর অন্যপাশে রজনীগন্ধার স্নিগ্ধ সুবাস ছড়াচ্ছে। বাগানের ঠিক মাঝখানটায় বসার জন্য চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে—কয়েকটি নিচু মার্বেল টেবিলকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে সাজানো রয়েছে বেশ কিছু আরামদায়ক, বেতের সোফা। বিকেলের ম্লান রোদ তখন বাগানের গাছের পাতাগুলোর ফাঁক গলে এসে পড়ছিল ঘাসের ওপর।

অন্য পাশে বাগানের বৃদ্ধ মালি কাঁচি হাতে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে গাছের অতিরিক্ত পাতাগুলো কেটে সমান করছিলেন। খচখচ শব্দ তুলে তিনি নিজের কাজে ব্যস্ত। জেবা ধীর পায়ে বাগানের ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগল। খালি পায়ে নরম ঘাসের স্পর্শ ওর উত্তপ্ত মস্তিষ্ককে কিছুটা আরাম দিচ্ছিল।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেবা আকাশের দিকে তাকাল। জীবনটা কত দ্রুত বদলে গেল! কদিন আগেও সে ছিল এক স্বাধীন, উড়নচণ্ডী মেয়ে, আর আজ সে এক অদ্ভুত অসম সম্পর্কের জালে বন্দি।
হাঁটতে হাঁটতে জেবার নজর গিয়ে পড়ল বাগানের এক কোণে থাকা একটি বিশাল জাতের লাল গোলাপ গাছের দিকে। গাঢ় টকটকে লাল রঙের একটা চমৎকার গোলাপ ফুটে আছে ঠিক মগডালে। ফুলটা এত সুন্দর আর সতেজ দেখাচ্ছিল যে জেবার মনের ভেতরের সমস্ত উদাসীনতা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। ওর খুব ইচ্ছে হলো ফুলটা পেড়ে নিজের কাছে রাখতে।
জেবা গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়াল এবং হাত বাড়াল। কিন্তু গাছটা বেশ উঁচুতে হওয়ায় ওর হাত নাগাল পাচ্ছিল না। জেবা পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে, শরীরটাকে যতটা সম্ভব টান টান করে ফুলটা ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। ওড়নাটা বারবার কাঁধ থেকে খসে পড়ছিল, আর ওর ফ্যাকাশে মুখে সামান্য রক্তিম আভা ফুটে উঠছিল ক্লান্তিতে। কিন্তু কিছুতেই সে মগডাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছিল না।

_”ইস! আরেকটু যদি লম্বা হতাম!”
জেবা স্বগতোক্তিতে বিড়বিড় করে বলল এবং শেষবারের মতো একটা মরিয়া চেষ্টা করতে গেল।
ঠিক তখনই, ওর পিছন থেকে একটা দীর্ঘ, ছায়াময় অবয়ব এগিয়ে এল। জেবা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, একটি চওড়া, ফর্সা এবং পুরুষালি হাত ওর মাথার ওপর দিয়ে উঠে গেল। অত্যন্ত অনায়াসে, কোনো রকম বাড়তি কসরত ছাড়াই, সেই হাতের শক্ত আঙুলগুলো গোলাপের বোঁটাটা আলতো করে মট করে ভেঙে নিল।
জেবা চমকে উঠে এক ঝটকায় পিছু ঘুরল। ওর বুকের ভেতরটা যেন একটা জোরালো ধাক্কা খেল। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে ওর মুখের ভাষা পুরোপুরি হারিয়ে গেল।
আরিশান মৃধা!

গাম্ভীর্য নিয়ে জেবার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে এখনো ফর্মাল স্যুটের প্যান্ট আর সাদা শার্ট, তবে টাইটা কিছুটা আলগা করা এবং কোটটা হয়তো ওনি ভেতরেই কোথাও রেখে এসেছেন। ওনার সেই চিরচেনা চেরি পারফিউমের কড়া, পুরুষালি সুবাস জেবার নাসিকারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল।
আরিশান মৃধা কোনো কথা বললেন না। ওনার সেই তীক্ষ্ণ, গম্ভীর চোখজোড়া দিয়ে তিনি জেবার দিকে তাকালেন। এরপর ওনার হাতের সেই সদ্য ছেঁড়া টকটকে লাল গোলাপটি অত্যন্ত ধীর গতিতে জেবার দিকে এগিয়ে দিলেন।জেবা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওনার এই আচরণ ওর কাছে চরম বিস্ময়ের, এক প্রকার অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। যে মানুষটা ওকে দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নেন, যিনি ওকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অস্বস্তি মনে করেন, তিনি নিজে এসে ওকে ফুল পেড়ে দিচ্ছেন? জেবা ওনার মুখের দিকে তাকাল, কিন্তু আরিশান মৃধার পাথুরে মুখাবয়ব দেখে ওনার মনের ভেতরের কোনো অনুভূতি বোঝার সাধ্য কারোর নেই।
জেবা কাঁপতে থাকা হাত বাড়িয়ে ফুলটা ওনার হাত থেকে গ্রহণ করল। ওনার আঙুলের অগ্রভাগ এক মুহূর্তের জন্য জেবার ঠাণ্ডা হাতের তালু স্পর্শ করল,আর সেই সামান্য স্পর্শেই জেবার পুরো শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।
আরিশান মৃধা জেবার এই চরম বিস্ময় আর দ্বিধাগ্রস্ত ভাবটা লক্ষ্য করলেন, কিন্তু মুখে কিছুই প্রকাশ করলেন না। ওনি শুধু ওনার ডান হাতের ইশারা দিয়ে পাশের বেতের সোফাগুলোর দিকে দেখিয়ে অত্যন্ত ভারী, শান্ত গলায় বললেন,

_”ওখানে গিয়ে বসো।”
ওনি নিজেই প্রথম ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে একটি সোফায় বসলেন। জেবা হাতের গোলাপ ফুলটা শক্ত করে মুঠোকরে ধরে, এক বুক দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে ওনার ঠিক পাশের সোফাটায় গিয়ে বসল।বসার পর বেশ কিছুক্ষণ দুজনেই সম্পূর্ণ চুপ করে রইলেন। বাগানে শুধু মালির সেই কাঁচির ‘খচখচ’ শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছিল। জেবা মাথা নিচু করে ওনার দেওয়া ফুলটার পাপড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল, যেন এই মুহূর্তে ওই ফুলটাই ওর একমাত্র আশ্রয়। ওনার পাশে বসাটাই ওর হৃদস্পন্দনকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নীরবতার এই কয়েকটা মুহূর্তে আরিশান মৃধা কিন্তু চুপচাপ জেবাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ওনার চোখজোড়া জেবার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত খুব ভালো করে একবার বুলিয়ে নিল। ওনার মনে পড়ে গেল, কিছুদিন আগেও এই মেয়েটা যখন অরির সাথে ওনার বাড়িতে আসত, তখন ওর পরনে থাকত জিন্স, টপস কিংবা আধুনিক ওয়েস্টার্ন পোশাক; চঞ্চলতায় পুরো বাড়ি মাথায় করে রাখত। কিন্তু আজ? আজ জেবার পরনে অত্যন্ত সাধারণ, সাদামাটা থ্রিপিস। মাথায় ওড়নাটা সুন্দর করে দেওয়া, কোনো চটুল সাজগোজ নেই, এক অদ্ভুত শালীনতা আর শান্ত ভাব ওর পুরো অবয়বে।

নিজের মনের অজান্তেই আরিশান মৃধার ভেতরের সেই কঠোর পুরুষটার কোথাও যেন একটা ভালো লাগার অনুভূতি দোলা দিয়ে গেল। মেয়েটা এই পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, এটা ওনার চোখ এড়াল না।
কিছুক্ষন কেটে যাওয়ার পর।দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে আরিশান মৃধা প্রথম কথা বলে উঠলেন। ওনার কণ্ঠস্বর একদম শান্ত, কোনো রাগ বা রুক্ষতা নেই সেখানে।
_”আমার বয়স কত জানো, জেবা?”
জেবা চমকে উঠে ওনার দিকে তাকাল। ওনার এই আকস্মিক প্রশ্নে সে কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। ও নিজের ঠোঁট দুটোকে সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে খুব নিচু স্বরে উত্তর দিল,

_”পঞ্চান্ন।মেবি!”
আরিশান মৃধা একটা নিস্পৃহ, ফ্যাকাসে হাসি হাসলেন।
_”আর তোমার? আঠারো। কত বছরের ডিফারেন্স হিসাব করতে পারো?”
জেবা মুহূর্তকালও দ্বিধা না করে, সরাসরি ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
_”সাইত্রিশ।”
_”সাইত্রিশ বছর!”
আরিশান মৃধা সোফার হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।
_”একটা পুরো জেনারেশনের গ্যাপ, জেবা। এই যে সাইত্রিশ বছরের একটা বিশাল অন্ধকার খাদ আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, এটা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না? আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করি… এটা কি শুধুই একটা বয়সের মনের ফ্যান্টাসি নয়?”
জেবা ভ্রু সামান্য কুঁচকে ওনার দিকে তাকাল। ওনার কথার অর্থ বুঝতে ওর কষ্ট হলো না। সে জিজ্ঞেস করল,

_”কোনটা ফ্যান্টাসি?”
_”এই যে তুমি যেটাকে ভালোবাসা বলে দাবি করছ,”
আরিশান মৃধা এবার সোজা হয়ে বসে জেবার চোখের দিকে তাকালেন। ওনার চোখ দুটোতে এখন এক ধরণের বিজ্ঞতা আর বোঝানোর আকুতি।
_”এই বয়সে মেয়েরা একটু গম্ভীর, প্রতিষ্ঠিত পুরুষ দেখলে সহজেই আকৃষ্ট হয়। এটা এক ধরণের মোহ, একটা সাময়িক ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিছুই নয়।”
জেবা হাতের গোলাপের ডাঁটাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ওনার এই কথায় ওর বুকের ভেতরটা অভিমান আর কষ্টে চনমন করে উঠল। সে মাথাটা কিছুটা উঁচু করে, অত্যন্ত অনমনীয় অথচ বিনীত গলায় বলল,
_”ফ্যান্টাসি কখনো একটা মানুষকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে বলে আমার মনে হয় না। ফ্যান্টাসির জন্য কোনো মেয়ে নিজের সমাজ, নিজের সম্মান, নিজের পুরো জীবনটাকে এভাবে বাজি ধরে না। আমার অনুভূতি যদি শুধুই ফ্যান্টাসি হতো, তবে সকালের আপনার প্রত্যাখ্যান পাওয়ার পর আমি এই বাড়িতে টিকে থাকতে পারতাম না।”
আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনি জেবার এই অবাধ্য জেদ দেখে কিছুটা নরম হলেন।

_”আমি তোমার অনুভূতিকে ছোট করছি না, জেবা। আমি বরং তোমাকে সঠিক রাস্তাটা দেখাতে চাইছি,” ওনি অত্যন্ত বুঝদার মানুষের মতো বলতে লাগলেন।
_”আমার প্রতি তোমার এই যে অনুভূতি, এটা সত্যিই বড্ড বেমানান। এর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তুমি একটা জ্বলজ্যান্ত সত্যকে এড়িয়ে যাচ্ছ—আমার এক পা অলরেডি কবরে চলে গেছে। আমি আমার জীবনের অর্ধেকটারও বেশি পথ পার করে এসেছি, আমার ভেতরের সমস্ত আবেগ, অনুভূতি অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। তুমি আজ যেটাকে ভালোবাসা বলছ, কাল যখন তুমি আরও একটু ম্যাচিউর হবে, যখন সমাজের বাস্তবতার মুখোমুখি হবে, তখন এটা তোমার কাছে নিছকই একটা মস্ত বড় ভুল মনে হবে।”
ওনি একটু থামলেন, জেবার মুখের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। জেবা চুপচাপ শুনছিল, ওর চোখের কোণে আবার জল জমতে শুরু করেছে।

_”আমি তোমাকে জোর করব না যে তুমি এখনই ডিভোর্স নিয়ে এই বাড়ি থেকে চলে যাও,”
আরিশান মৃধা বলে চললেন।
_”তুমি এখানে থাকতে পারো। কিন্তু একটা কথা তোমাকে পরিষ্কার করে বলে রাখি—আমি কখনোই তোমাকে সেইরকম নজরে দেখিনি, আর কোনোদিন দেখতেও পারব না। তুমি ঠিক আমার মেয়ের বয়সী, জেবা। আমি তোমাকে এর চেয়ে বেশি অন্য কোনো মর্যাদা দিতে অক্ষম।”
ওনি জেবার দিকে তাকিয়ে একটা আশ্বাসের সুর আনলেন ওনার গলায়,
_”তুমি তোমার মতো করে পড়াশোনা করো। যখন তোমার সময় হবে, যখন তুমি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তুমি যখন খুশি, যাকে খুশি নিজের লাইফ পার্টনার হিসেবে বেছে নিতে পারো। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, একজন অভিভাবক হিসেবে আমি সবসময় তোমার পাশে থাকবো, তোমার সমস্ত সিদ্ধান্তে সাপোর্ট দেব। তবে…” ওনার গলাটা আবার কঠোর হলো,
_”আমাদের মধ্যে কখনো ওইরকম কোনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের কথা তুমি চিন্তাও করবে না।”
জেবা ওনার এই অটল সিদ্ধান্তের কথা শুনেও ভেঙে পড়ল না। ওর ভেতরের সেই একরোখা ভালোবাসার শক্তিটা যেন এই মুহূর্তে আরও জাগ্রত হয়ে উঠল।জেবা আরিশান মৃধার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা অসম্ভব সাহসী প্রশ্ন করে বসল,

_”যদি…কোনোদিন এমন সময় আসে, যখন আপনি নিজেই আমাকে সেভাবে চাইবেন? তখনো কি আপনি এই কথাই বলবেন?”
আরিশান মৃধা জেবার এই অবাস্তব ও ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রশ্ন শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ওনি অত্যন্ত শীতল, বরফ জমা গলায় বললেন,
_”সেটা তখনই সম্ভব হবে, যখন আরিশান মৃধা নামক লোকটার অস্তিত্ব আর এই দুনিয়ায় থাকবে না। অর্থাৎ, সেটা অসম্ভব।”
জেবা আর কিছু বলল না। ও বুঝতে পারল, এই পাথরের দেয়ালে আঘাত করে আজই ফাটল ধরানো যাবে না। সে শুধু হাতের ফুলটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
আরিশান মৃধা জেবাকে এভাবে চুপ হয়ে যেতে দেখে নিজেই আবার নীরবতা ভাঙলেন। ওনার মনে একটা কৌতুহল ছিল, যা সে আজই মিটিয়ে নিতে চান।
_”আমি একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছি না, জেবা,” ওনি কিছুটা হালকা সুরে জিজ্ঞেস করলেন।
_”এই দুনিয়ায় এত সব তরুণ, হ্যান্ডসাম ছেলে থাকতে… তোমার বয়সী কত চমৎকার সব ছেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে, তাদের ছেড়ে আমার মতো এই বুড়ো লোককে নিয়ে তুমি কেন এমন স্বপ্ন দেখলে? তোমার এই জেদের পেছনের আসল কারণটা কী?”
জেবা ওনার এই প্রশ্নে হঠাৎই একটু হাসল। ওর সেই ম্লান, ফ্যাকাশে মুখে এই প্রথম একটা মিষ্টি, মায়াবী হাসি ফুটে উঠল।জেবা আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে বলল,

_”আপনি বয়সে বুড়ো হতে পারেন… কিন্তু দেখতে এখনো ঠিক সেই হ্যান্ডসাম যুবকটার মতোই আছেন। শুধু চুলে হালকা পাকঁ ধরেছে।তাছাড়া আপনি নিজেই বলুন তো, আপনি এত সুন্দর কেন?”
আরিশান মৃধা জেবার মুখে এমন সরাসরি ও চটুল প্রশংসা শুনে চরম অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। ওনার মতো একজন গম্ভীর, প্রবীণ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীকে কোনো আঠারো বছরের মেয়ে এভাবে সামনাসামনি ‘সুন্দর’ বলছে, এটা ওনার কল্পনারও অতীত ছিল। ওনার ফর্সা গালে এক পলকের জন্য যেন কিছুটা রক্তিম আভা ফুটে উঠল, যা ওনি কাশি দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করলেন।
_”বোকা মেয়ে!” আরিশান মৃধা ওনার গাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে বললেন।
_”তুমি তাহলে আমার রূপ দেখে আকৃষ্ট হয়েছ? বাহ! এটাকে তাহলে ভালোবাসা না বলে রূপের মোহ বলাই শ্রেয়।”

_”না, আপনি ভুল বুঝছেন,” জেবা মাথা নাড়ল। ওর চোখে এক অদ্ভুত গভীরতা।
_”প্রথমে হয়তো এটা আপনার ওই ব্যক্তিত্বময় রূপ দিয়েই শুরু হয়েছিল, আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, আপনার ওই কঠোর অবয়বের আড়ালে থাকা একজন সৎ, আদর্শবান আর দায়িত্বশীল মানুষকে আমি চিনেছি। এখন আর এটা শুধু রূপে আটকে নেই। এখন তা আমার হৃদয়ের একদম গভীরে গিয়ে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। রূপের মোহ তো কেটে যায়, কিন্তু হৃদয়ের এই টান কোনোদিন কমে না।”
আরিশান মৃধা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার মনে হলো, এই মেয়েটার সাথে আর বেশিক্ষণ কথা বলা নিরাপদ নয়। এর যুক্তি,এর চোখের এই অটল বিশ্বাস ওনার এত বছরের তৈরি করা আত্মরক্ষার দেয়ালটাকে কোথাও যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
_”তুমি একটা মরীচিকা জেনেও তার পেছনে ঘুরে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করছ, জেবা,” আরিশান মৃধা পিছন ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন।
জেবাও ওনার সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল। সে ওনার পিঠের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করল,

_”সেটা যদি মরীচিকাও হয়… তবুও আমি আপনার পিছু ঘুরব। সারাজীবন ঘুরব।”
আরিশান মৃধা আর কোনো উত্তর দিলেন না। ওনার পিঠের সোজা ভঙ্গিটা এক মুহূর্তের জন্য যেন একটু কেঁপে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই মেয়েটিকে বোঝাতে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। কোনো যুক্তি, কোনো বয়সের সমীকরণ বা সমাজের ভয় এই অবুঝ মেয়েকে দমাতে পারবে না।
ওনি আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে, দ্রুত পায়ে বাগান পেরিয়ে চলে গেলেন।জেবা একা দাঁড়িয়ে রইল বাগানের মাঝখানে। বিকেলের শেষ সূর্যটা তখন দিগন্তে ঢলে পড়ছে। সে নিজের হাতের লাল গোলাপটার দিকে তাকাল। আরিশান মৃধা যতই মুখে অস্বীকার করুন না কেন, ওনার নিজের হাতে পেড়ে দেওয়া এই ফুলটাই জেবার জন্য এক মস্ত বড় আশার আলো। সে ফুলটা বুকের কাছে চেপে ধরে একটা গভীর তৃপ্তির শ্বাস নিল। এই অসম যুদ্ধের প্রথম ধাপে সে হয়তো পুরোপুরি জেতেনি, কিন্তু হেরেও যায়নি। মরীচিকার পেছনে ছুটে চলার এই পথটা যতই কঠিন হোক, জেবা এখন আর পিছপা হবে না।দরকার পরলে সারাজীবন আরিশান মৃধার সঙ্গে জোর করে সংসার করবে।

টানা সাড়ে চার ঘণ্টার ক্লাস এবং ক্লাস টেস্ট শেষে যখন ঘড়িতে বিকেল চারটে বাজল, তখন স্যার অবশেষে ঘোষণা করলেন,
_”আজকের মতো এখানেই শেষ। নেক্সট ক্লাসে সবাই জেনেটিক্সের ওপর প্রিপারেশন নিয়ে আসবে।”
পুরো ক্লাসরুমের ছাত্রছাত্রীরা একযোগে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সবাই তড়িঘড়ি করে নিজেদের ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। অরিও তার বই-খাতাগুলো গুছিয়ে ব্যাগে পুরে নিল। চশমাটা খুলে কেসের ভেতর রেখে ব্যাগটা পিঠে ঝুলাল।
_”টেস্টে কত পেলি?” আরাফ ব্যাগ কাঁধে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করল।
_”চল্লিশে আটত্রিশ। দুটো নেগেটিভ মার্কিং হয়েছে,” অরি কিছুটা মন খারাপ করে বলল।
_”আরে ধুর! এই কঠিন কোশ্চেনে আটত্রিশ পাওয়া মানে তুই টপ ফাইভের মধ্যে আছিস। আমার তো সাঁইত্রিশ এসেছে,” আরাফ হাসল।
_”চল, এবার বের হওয়া যাক। আজ তোকে নিচে পর্যন্ত ড্রপ করে দিই।”
_”চল,” অরি বলল।
দুজনে একসাথে ক্লাসরুম থেকে বের হলো। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় এখনো কিছু ছেলে অরির দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল, কিন্তু অরি আর আরাফকে এত ফ্রিভাবে হাসিমুখে কথা বলতে দেখে তাদের বুক জ্বলে যাচ্ছিল। আরাফ ইচ্ছা করেই একটু উচ্চস্বরে একটা জোকস বলল, আর অরি সেটা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল। অরির সেই অমায়িক হাসি দেখে করিডোরের অনেকেই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
_”জানিস আরাফ, তোর এই জোকসটা একদম পচা ছিল,” অরি হাসতে হাসতে বলল।
_”পচা হলেও তুই তো হাসলি। মিশন সাকসেসফুল! তোকে হাসানোই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য,” আরাফ গর্বের সাথে বলল।

লিফটের সামনে ভিড় থাকায় তারা সিঁড়ি দিয়েই নিচে নামতে শুরু করল।মেইন গেটের বাইরে আসতেই দুপুরের সেই তীব্র রোদ এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। বিকেলের মিষ্টি একটা হাওয়া বইছে চারপাশে। আকাশের এক কোণে হালকা মেঘের আনাগোনা, যা গরমটা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
রহিম মিয়া গাড়ি নিয়ে গেটের ঠিক সামনেই অপেক্ষা করছিলেন। অরিকে আসতে দেখে তিনি দ্রুত নেমে পেছনের দরজা খুলে দিলেন।
অরি গাড়ির দরজার কাছে এসে আরাফের দিকে ফিরল।
_”তাহলে আজ আসি রে আরাফ। কাল তো আবার ক্লাস আছে?”
_”হ্যাঁ, কাল ঠিক সময়ে চলে আসিস। আর জেবাকে অবশ্যই সাথে নিয়ে আসবি। ওকে ছাড়া ক্লাসটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে,” আরাফ মৃদু হেসে বলল।
_”ইনশাআল্লাহ, ও কাল ঠিক চলে আসবে। বাই। সাবধানে যাস তুই,” অরি হাসিমুখে বিদায় জানাল।
_”বাই অরি। টেক কেয়ার,” আরাফ হাত নাড়ল।
অরি গাড়িতে উঠে বসল। রহিম মিয়া দরজা বন্ধ করে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলেন এবং গাড়ি স্টার্ট দিলেন। গাড়ি আস্তে আস্তে মেডিকোর গেট ছেড়ে মেইন রোডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,
গাড়ি মৃধা নিবাসের সামনে এসে থামল। অরি গাড়ি থেকে নেমে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলো।কোচিং থেকে ফেরার পর ওর শরীর আর মন দুই-ই যেন ভেঙে আসছিল।
রুমে ঢুকেই অরি একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কাঁধ থেকে ভারী বইখাতার ব্যাগটা নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখতেই হুট করে একটা খট শব্দ হলো। অরি চমকে উঠে পেছন ফিরল। দরজার লকটা আটকে যাওয়ার চেনা আওয়াজ।

প্রথমে ও ভেবেছিল হয়তো জেবা এসেছে। কিন্তু দরজার দিকে তাকাতেই অরির চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল।জেবা নয়, দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারিম!
ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, বাঁকা রহস্যময় হাসি।
সারিমকে এই অসময়ে নিজের ঘরে দেখে অরির ক্লান্তি এক নিমেষে উবে গিয়ে সেখানে জমা হলো একরাশ বিস্ময় আর বিরক্তি। ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
_”আপনি? আপনি এখানে কেন এসেছেন? আর দরজা লক করছেন কেন?”
সারিম অরির প্রতিক্রিয়া দেখেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে অত্যন্ত ধীর এবং মাপা পায়ে অরির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ওর প্রতিটি পদক্ষেপে এক অদ্ভুত অধিকারবোধ আর দৃঢ়তা। একদম অরির মুখোমুখি এসে দাঁড়াল সারিম। দুই জোড়া চোখের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির।
সারিম পকেটে হাত গুঁজে নিচু, শান্ত গলায় বলল,
_”আমার বউয়ের রুমে আসতে আমি কারো পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনা, চন্দ্রিমা।”
‘বউ’ শব্দটা সারিমের মুখে শোনামাত্রই অরির ভেতরের রাগ চাড়া দিয়ে উঠল।সে এক কদম পিছিয়ে গিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে বলল,
_”আমি আপনাকে স্বামী হিসেবে মানি না!বুঝতে পারছেন না কেন?”
সারিম একটুও রাগল না। উল্টো ওর চোখের চাউনি আরও গভীর হলো। সামান্য ঝুঁকে অরির কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত ঠান্ডা অথচ ধারালো গলায় বলল,

_”সমস্যা নেই।বুঝে পারবে। বেশি না…যখন কানের নিচে দুইটা পড়বে, তখন শুধু মানা না, এক বাচ্চার মা হয়েও মানবে।”
সারিমের এই চরম ঔদ্ধত্য আর হুমকিসূচক কথা শুনে অরির ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
_”আপনি একটা অত্যন্ত বাজে লোক!”
সারিম এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেন সে অরির কথায় আকাশ থেকে পড়েছে।সারিম অরির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল,
_”কী বাজে কাজ করলাম যার জন্য বাজে লোক বললে, চন্দ্রিমা? এখনো তো তোমার জামা খুলিনি, তোমার সর্বাঙ্গে ঠোঁট স্পর্শ করিনি, তোমার সবকিছু দেখা হয়নি… তাহলেই বাজে হয়ে গেলাম?”
_”চুপ করুন! একদম চুপ করুন!নির্লজ্জ, বেহায়া, ঠোঁটকাটা পুরুষ একটা!”
অরি নিজের দুই কানে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠল।অরি ওর জীবনে এমন নিলজ্জ লাগামহীন বেহায়া পুরুষ আর দুটো কখনো দেখেনি।
সারিম অরির দিকে তাকিয়ে হাহা করে হেসে উঠল।সে নিজের ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে বলল,

_”কই, আমার ঠোঁট কাটা? তুমি এখনো চুমু দিয়ে আমার ঠোঁট কাটোনি চন্দ্রিমা। দিস ইজ নট ফেয়ার! বউ হয়ে স্বামীকে এভাবে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছো? আহারে… বড় দুক্কু পেলুম!”
অরি আর নিতে পারছিল না। এই লোকটার সাথে তর্ক করা মানে নিজের মাথাটা আরও খারাপ করা। ও চরম বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে বলল,
_”আপনি আদেও মানুষ তো? নাকি অন্য কিছু?”
সারিম ওর ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা আরও চওড়া করল। গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
_”আমি মানুষ হতে যাবো কেন? আমি তো মৃধা আবরার সারিম, ওরফে অরিমার আব্বু!”
অরি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ওর রাগ এবার কিছুটা কৌতূহলে রূপ নিল, যদিও ও সেটা প্রকাশ করতে চাইল না। ও কিছুটা ঝাঁঝালো গলায় জিজ্ঞেস করল,
_”এই অরিমা আবার কে?”
সারিম এক কদম আরও এগিয়ে এসে অরির খুব কাছে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো তখন অরির মুখের ওপর নিবদ্ধ। ও ফিসফিস করে বলল,
_”আমার আর তোমার ডিএনএ।”

কথাটা বুঝতে অরির এক মুহূর্ত সময় লাগল। যখনই ও বুঝল সারিম ওদের ভবিষ্যৎ সন্তানের কথা বলছে, ওর বুকের ভেতরটা অচেনা এক আলোড়নে কেঁপে উঠল। কিন্তু ও বাহ্যিকভাবে কঠোর থেকে বলল,
_”সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। আপনার এই অবাস্তব চিন্তা আর পাগলামি দেখার সময় আমার নেই। আপনি বরং আগে পাবনা গিয়ে নিজের চিকিৎসা করুন।”
সারিম অরির এই রেগে যাওয়া রূপটা বেশ উপভোগ করছিল। সে মাথা নেড়ে বলল,
_”দরকার নেই অত দূরে টাকা খরচ করে যাওয়ার। তাছাড়া তুমি তো ডাক্তার আছোই—ভবিষ্যত হবু ডাক্তার! আমাকে না হয় তুমিই সুস্থ করে তোল।”
_”আমি পাগলের ডাক্তার হলেই তো আপনার চিকিৎসা করতাম!” অরি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে চাইল।
_”পাগলি…” সারিম পেছন থেকে ওর হাতটা এক ঝটকায় ধরে ফেলল। অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সারিম ওকে নিজের শক্ত বুকের সাথে চেপে ধরল। সারিমের চওড়া বুকের সেই ওম আর তীব্র পুরুষালি সুবাসে অরি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
সারিম ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,

_”ঐটার জন্য চিকিৎসা নয়, বরং ঔষধ লাগবে। আর ঐ ঔষধের নাম-অরিয়া ইবনাত অদ্রিজা। এই ঔষধ খেলেই আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবো।”
অরি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করে উঠল,
_”আমি ফ্রেশ হবো, ছাড়ুন আমাকে!”
কিন্তু সারিম ওকে ছাড়ার পাত্র নয়। সে এক হাত দিয়ে অরির কোমর জড়িয়ে ধরে অন্য হাতের মুঠোয় ওর মুখটা সামান্য ওপরে তুলল। অরি চোখ বড় বড় করে তাকাল, কিছু বলতে যাবে-ঠিক তখনই সারিম অত্যন্ত জোরের সাথে, গভীর আবেগে অরির নরম গালে একটা শক্ত করে চুমু খেল।
চুমুর সেই তীব্র স্পর্শে অরির পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। ও কিছুক্ষণের জন্য যেন কোনো এক ভিনগ্রহে হারিয়ে গেল। কিন্তু অরি জানতও না, সারিম অত্যন্ত চতুরতার সাথে অন্য হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে সেই বিশেষ মুহূর্তের—অর্থাৎ অরির গালে ওর ঠোঁট চেপে রাখার এক নিখুঁত ছবি ফ্রেমবন্দি করে ফেলেছে। পুরো প্রক্রিয়াটা এত দ্রুত আর নিপুণভাবে হলো যে অরি বিন্দুমাত্র টের পেল না।
চুমু দিয়ে সারিম যখন ওকে ছেড়ে দিল, অরি তখন রাগে, লজ্জায় আর ক্ষোভে ফুঁসছে। ওর চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলছে, গাল দুটো টমেটোর মতো লাল।অরি নিজের শার্টের হাতা দিয়ে গালটা মুছতে মুছতে সারিমকে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল,

_”আপনি… আপনি একটা জঘন্য লোক! এর ফল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি!”
কথাটা বলেই ও আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে ধপাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
অরি ওয়াশরুমে চলে যেতেই সারিমের মুখের সেই চতুর হাসিটা আবার ফিরে এলো। সারিম পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে ছবিটা দেখল-অসাধারণ এসেছে! এক্কেবারে পারফেক্ট।
সারিম এবার সোজা টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে অরির ফোনটা রাখা ছিল। ও ফোনটা হাতে নিল। অরির লক স্ক্রিনটা ও খুব ভালো করেই জানে। চটজলদি লক খুলে ও সরাসরি ফেসবুক অ্যাপে ঢুকে পড়ল।
অরির অ্যাকাউন্টটা পাবলিক। সারিম ওর প্রোফাইলে ঢুকে একটু স্ক্রল করতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পুরো টাইমলাইন জুড়ে শুধু মোটিভেশনাল কোটস, পড়াশোনাভিত্তিক পোস্ট, মেডিকেল প্রিপারেশনের টিপস আর কঠিন কঠিন বিজ্ঞানের সমীকরণ। বউয়ের এই অগাধ পড়াশোনা আর নীরস জীবন দেখে সারিম মনে মনে হায়-হতাশ করল।

_”এত পড়াশোনা করলে তো সংসার চলবে না,আমার!” বিড়বিড় করে বলল ও।
প্রোফাইল পিকচারের দিকে তাকাল সারিম। একটা খুব সাধারণ, মার্জিত গাউন পরা ছবি অরির। কোনো আড়ম্বর নেই, কিন্তু দেখতে পরীর মতো লাগছে ওর বউটাকে। সারিম এরপর ওর ‘অ্যাবাউট’ সেকশনে গেল। সেখানে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস লেখা—সিঙ্গেল’।
সারিমের চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। ও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সেটা পরিবর্তন করে ‘মেরিড’ করে দিল এবং নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিটা সেখানে মেনশন করে দিল।
কাজ এখানেই শেষ নয়। সারিম ওর নিজের ফোন থেকে ব্লুটুথের মাধ্যমে সেই তুলে রাখা চুমুর ছবিটা অরির ফোনে ট্রান্সফার করল। তারপর অরির ফেসবুক আইডি থেকে সেই ছবিটা পোস্ট করার জন্য সিলেক্ট করল। ছবিতে অরির আইডি আর নিজের আইডি একসঙ্গে মেনশন দিয়ে ক্যাপশনে মাত্র তিনটা শব্দ লিখল
“My personal property.”
পোস্ট বাটনে ক্লিক করার পর সারিম কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। যখন দেখল পোস্টটা সাকসেসফুলি আপলোড হয়ে গেছে, ও তৃপ্তির একটা হাসি হাসল। এরপর অত্যন্ত সাবধানে অরির ফোনটা একদম আগের জায়গায়, যেভাবে রাখা ছিল, ঠিক সেভাবেই রেখে দিল। যেন এখানে কিছুই হয়নি।
ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়াজ আসছিল। সারিম আয়নায় নিজের চুলটা একবার ঠিক করে নিয়ে, পাঞ্জাবির পকেটে হাত গুঁজে খাটে বসে পড়ল।

ওয়াশরুমের ঠান্ডা জলে মুখটা ধুয়ে অরি নিজের ভেতরের উত্তেজনা আর রাগটা কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করছিল,তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছতে মুছতে ও ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে পা রাখল। ওর ধারণা ছিল, এতক্ষণে হয়তো সেই অহংকারী জল্লাদটা রুম থেকে বিদায় নিয়েছে।
কিন্তু ঘরের ভেতরে তাকাতেই অরির পুরো শরীর আবার রাগে রিরি করে উঠল।
সারিম চলে যাওয়া তো দূরের কথা, সে অত্যন্ত আরাম করে অরির বিছানায় শুয়ে আছে! এক হাত মাথার নিচে দিয়ে অন্য হাতে নিজের ফোনটা স্ক্রল করছে। পরনের সাদা পাঞ্জাবির ওপর বিকেলের ম্লান আলো পড়ে ওকে দেখতে যতটা সুদর্শন লাগছিল, অরির মনে ঠিক ততটাই বিরক্তি দানা বাঁধছিল।
অরি প্রথমে ভাবল চেঁচামেচি করবে। কিন্তু পরক্ষণেই ওর মনে হলো, এই লোকের সাথে কথা বলা মানেই নিজের সময় আর মানসিক শান্তি নষ্ট করা। তাছাড়া সকালের পর থেকে ওর পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে, সামনে মেডিকেল পরীক্ষা। তাই ও সারিমকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। বিছানার পাশে থাকা বেড সাইড টেবিল থেকে নিজের মেডিকেলের মোটা বই আর
নোটখাতাগুলো হাতে তুলে নিল অরি। সারিমের দিকে একবারো আড়চোখে না তাকিয়ে সে ধীর পায়ে লাইব্রেরি রুমের দিকে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু মৃধা আবরার সারিমকে এত সহজে এড়িয়ে যাওয়া কি তার চন্দ্রিমার পক্ষে সম্ভব?

অরি দরজার দিকে দু-কদম বাড়াতেই সারিম নিজের ফোন স্ক্রল করা বন্ধ করল। ওর চতুর চোখ দুটো অরির ওপর গিয়ে স্থির হলো। বিছানা থেকে ওঠার কোনো শব্দই হলো না, অথচ চোখের পলকে সারিম ঝড়ের গতিতে এসে অরির হাতটা চেপে ধরল।
_”কোথায় যাওয়া হচ্ছে, চন্দ্রিমা?” সারিমের গলার সেই নিচু, অথচ ধারালো স্বর।
_”ছাড়ুন আমাকে! আমি পড়তে যাব,” অরি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সারিম এক ঝটকায় অরিকে টেনে এনে নরম বেডের ওপর ফেলে দিল। হাতের বইখাতাগুলো ছিটকে পড়ল বিছানার একপাশে। অরি সামলে ওঠার আগেই সারিম ওর ওপর ঝুঁকে এল, দুই হাত অরির দুই পাশে রেখে ওকে সম্পূর্ণ নিজের শরীরের নিচে বন্দি করে ফেলল।
দুজনের দূরত্ব এক নিমেষে শূন্যে নেমে এল। সারিমের উষ্ণ শ্বাস অরির মুখের ওপর আছড়ে পড়ছিল। অরি ভয়ে আর উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে ওর চওড়া বুকে দুই হাত দিয়ে ঠেলার চেষ্টা করল,
_”সারিম, ছাড়ুন! কী করছেন আপনি?ছাড়ুন বলছি!”

সারিম ওর কোনো কথাই শুনল না। ওর চোখ দুটো তখন অরির কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর।সারিম অত্যন্ত ধীর গতিতে নিজের এক হাত অরির শার্টের নিচে গলিয়ে দিল। পাতলা শার্ট ভেদ করে সারিমের শক্ত, উষ্ণ হাতের তালু গিয়ে অরির নরম পেটের চামড়া স্পর্শ করল, অরির পুরো শরীরে যেন এক তীব্র বিদ্যুতপ্রবাহ বয়ে গেল। ও শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সারিম ওর মুখের আরও কাছে নিজের মুখটা এগিয়ে নিল, যেন এখনই ও অরির ঠোঁট দুটোকে নিজের দখলে নিয়ে নেবে।
ঠিক তখনই-দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
মুহূর্তের মধ্যে দুজনেরই শরীর শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু আসল সমস্যাটা বাঁধল ঠিক তখন। সারিম যখন রুমে ঢুকে দরজা লক করেছিল, তখন ও তাড়াহুড়োয় খেয়াল করেনি যে দরজার ল্যাচটা পুরোপুরি বসেনি।
এদিকে বাইরে থেকে আরিশান মৃধা অরির রেসপন্স না পেয়ে। যখনই দরজার হ্যান্ডেলে চাপ দিলেন, অমনি ক্লিক করে দরজাটা সামান্য খুলে গেল।
অরির বুকের ভেতরটা যেন এক লাফে গলায় চলে এল! বাবা যদি এই অবস্থায় ওদের দেখে ফেলেন, তবে চরম জঘন্য পরিস্থিতি দেখাবে বিষয়টা। চরম আতঙ্কের মধ্যেও অরির মগজ তীব্র গতিতে কাজ করল।সে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে বিছানার ওপর থাকা বড়, মোটা ব্ল্যাংকেটটা টেনে এক ঝটকায় সারিমের ওপর ছুড়ে দিল। সারিমও পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গুটিসুটি মেরে কম্বলের নিচে নিজেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে ফেলল।
অরি ততক্ষণে বিছানার ওপর উঠে বসে পড়েছে। ছিটকে পড়া মোটা বইটা টেনে উল্টো-পাল্টা করেই বুকের সামনে তুলে ধরল ও, যেন ও অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছে।

এদিকে কম্বলের ভেতরে থেকেও সারিম যেন দমে যাওয়ার পাত্র নয়। এই পরিস্থিতির মধ্যেও ওর দুষ্টুমি কমল না। কম্বলের নিচেই অরির কোমর জড়িয়ে ধরে ওর বুকের ওপর মুখ রেখে শুয়ে পড়ল। সারিমের উষ্ণ নিঃশ্বাস অরির বুকের কাপড়ে এসে লাগছিল, যা অরিকে ভেতরে ভেতরে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছিল। কিন্তু বাইরে ওকে একদম স্বাভাবিক থাকার ভান করতে হচ্ছিল।
আরিশান মৃধা ঘরের ভেতরে পা রাখলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ওনি কিছুটা অবাক চোখে তাকালেন। অরি বিছানায় কম্বল গায়ে জড়িয়ে, বুকের কাছে বই ধরে একমনে বিড়বিড় করে পড়ছে। ওনার গম্ভীর ও কঠিন মুখে কিছুটা বিস্ময়ের ছায়া নামল। তিনি কখনো অরিকে এভাবে বিছানায় শুয়ে-বসে পড়তে দেখেননি।
ওনি ধীর পায়ে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। বাবার মনোভাব বুঝতে পেরে অরি বই থেকে মুখ তুলে একটু শুকনো হাসার চেষ্টা করল। নিজের গলার কাঁপুনি আড়াল করে বলল,
_”বা-বাবা? তুমি এখানে আমার রুমে? কিছু বলবে?”
আরিশান মৃধা ওর বসার ভঙ্গি আর গায়ে জড়ানো কম্বলটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালেন। ওনার কন্ঠস্বরে বিস্ময়,

_”অদ্রিজা, তোমার কি শরীর খারাপ? এই গরমে তুমি গায়ে এত মোটা কম্বল জড়িয়ে রেখেছ কেন?”
অরি মনে মনে ঢোক গিলল। আমতা আমতা করে বলল,
_”না মানে বাবা… আসলে কোচিং থেকে ফেরার পর থেকেই শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। কেমন জানি একটু শীত শীত বা ঠান্ডা লাগছে। তাই কম্বলটা গায়ে দিয়েছি। একটু ওম লাগলে ভালো লাগবে তো, তাই…”
আরিশান মৃধা মেয়ের এই যুক্তিতে খুব একটা সন্দেহ করলেন না। ওনার মুখের কঠোর ভাবটা কিছুটা শিথিল হলো।অরির সঙ্গে সেই রুক্ষ ব্যবহারের পর ওনি নিজেই কিছুটা অপরাধবোধে ভুগছিলেন। তিনি বিছানার একপাশে এসে বসলেন। ওনার এই স্বাভাবিক আচরণ দেখে অরি মনে মনে কিছুটা স্বস্তি পেল।
_”পড়াশোনার চাপ বেশি হয়ে যাচ্ছে না তো?” আরিশান মৃধা অত্যন্ত নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
_”কোচিংয়ের মক টেস্টগুলোর রেজাল্ট কেমন আসছে?”
বাবাকে এতটা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে দেখে অরির মনটা খুশিতে ভরে উঠল।প্রায় দুদিন পর বাবা ওর সাথে সেই আগের মতো স্নেহশীল গলায় কথা বলছেন। অরি উৎসাহ নিয়ে বলল,
_”হ্যাঁ বাবা, রেজাল্ট ভালোই আসছে। গত টেস্টে আমি টপ ফাইভে ছিলাম। তুমি চিন্তা করো না, আমি আমার বেস্ট দেওয়ার চেষ্টা করছি।”
আরিশান মৃধা একটু হাসলেন,

_”আমি জানি আমার মা খুব ভালো করবে।” ওনি কথা শেষ করে যখন উঠে দাঁড়াতে যাবেন, ঠিক তখনই ওনার তীক্ষ্ণ নজর গেল কম্বলের অন্য দিকটায়।
কম্বলের নিচটা কেমন যেন উঁচুমতো হয়ে আছে, আর সেখানে সামান্য নড়াচড়াও টের পাওয়া যাচ্ছে। আরিশান মৃধা চোখ সরু করে সেদিকে তাকিয়ে বললেন,
_”ওদিকের কম্বলটা অমন উঁচু হয়ে আছে কেন? নিচে কী?”
অরির কলিজা এবার সত্যি সত্যি শুকিয়ে গেল। কম্বলের নিচে তখন সারিম ইচ্ছে করেই অরির পেটে হালকা করে চিমটি কাটছিল, যাতে অরি ধরা পড়ে যায়। অরি দাঁতে দাঁত চেপে নিজের চিৎকার আটকে রাখল। মুখে এক অবাস্তব হাসি ফুটিয়ে বলল,
_”ওহ! ওটা… ওটা কিছু না বাবা! ওটা আসলে আমার কোলবালিশ। ওটা ছাড়া তো আমার রাতে ঘুমই আসে না, তুমি তো জানোই। ওটাকে কম্বলের নিচে গুঁজে রেখেছি।”
আরিশান মৃধা আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। ওনি দরজার দিকে দু-কদম এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেন। তারপর পিছু ঘুরে অরির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ও সতর্ক কণ্ঠস্বরে বললেন,

“একটা কথা মনে রেখো অদ্রিজা… সারিমের থেকে একটু দূরে থেকো। আমি ওকে আমার ছেলে বলে বলছি না, আমি ওকে খুব ভালো করে চিনি। ইদানিং আমি লক্ষ্য করছি সে তোমাকে খুব ডিস্টার্ব করছে, তোমার পড়াশোনার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। সারিম তোমার মতো একটা মেয়ের জন্য কোনো দিক থেকেই যোগ্য ছেলে নয়। ও একটা দায়িত্বহীন ছেলে। তুমি এসব ফালতু চিন্তা মাথা থেকে বের করে দাও। বাবা তোমার জন্য সমাজ ও বংশ মর্যাদা দেখে এর চেয়ে আরও অনেক ভালো, যোগ্য ছেলে এনে দেবে। তুমি এখন শুধু নিজের পড়াশোনায় ফোকাস রাখো।”
বাবার এই কথাগুলো শোনামাত্রই কম্বলের নিচে সারিমের চতুর মুখটা রাগে কালো হয়ে গেল।সে মনে মনে বাপকে একগাদা গালি দিতে লাগল,
_’শালা বুড়ো ভাম! নিজে তো বউকে ভালোবাসে না।এখন আবার আমার বউয়ের পিছে লাগছে।আমার বউয়ের জন্য অন্য ছেলে খুজাচ্ছি?আগে তোমার মিনিস্টারগিরি আমি ছুটাইনেই!’
আরিশান মৃধা যাওয়ার আগে একটু থামলেন। ওনার চোখে অনুশোচনা ভেসে উঠল। ওনি নরম গলায় বললেন,

_” গতকাল রাতে তোমার সাথে যেভাবে রুক্ষ গলায় কথা বলেছি, সেটার জন্য আমি দুঃখিত অদ্রিজা। আমি তোমাকে কোনো দোষারোপ করছি না। পরিস্থিতিটাই এমন ছিল। নিজের খেয়াল রেখো।”
কথাটা বলেই আরিশান মৃধা ঘর থেকে বের হয়ে দরজাটা টেনে দিলেন।বাবা চলে যেতেই অরি একটা দীর্ঘ, গভীর হাফ ছেড়ে বাঁচল। যেন ও ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছে। ও নিজের কপাল থেকে জমে থাকা ঘামটা মুছতে যাবে, ঠিক তখনই ওর মনে হলো—ওর শার্টের ভেতরের বুকের দিকটায় কেমন যেন একটা ভিজা ভিজা আর তীব্র গরম অনুভূতি হচ্ছে!ও চমকে উঠে নিচের দিকে তাকাল। আর সাথে সাথে এক ঝটকায় গায়ের কম্বলটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বিছানা থেকে এক লাফে মেঝেতে নেমে গেল সে।
বিছানার ওপর তখন সারিম অত্যন্ত আয়েশ করে শুয়ে আছে। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চতুর, বাঁকা হাসি। অরির বুকের সেই নির্দিষ্ট জায়গাটা সারিমের মুখের লালা আর উষ্ণ শ্বাসে ভিজে আছে। কম্বলের নিচে শুয়ে শুয়ে এই শয়তান লোকটা যে ঠিক কী কী করেছে, তা ভেবেই অরির মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা হলো।
অরি নিজের দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি করে ধরে, চোখ বড় বড় করে রাগে আর লজ্জায় কাঁপতে কাঁপতে বলল,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৪

_”আস্তাগফিরুল্লাহ! ছিঃ ছিঃ… আপনি… আপনি একটা চরম বাজে লোক!”
তবে সারিম মোটেও লজ্জিত হলো না।উল্টো বিছানায় কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে আধা-শোয়া অবস্থা থেকে অরির দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো তখনো অরির বুকের ওপর নিবদ্ধ।সারিম নিজের এক চোখ টিপে বলল,
“বউ, গালি পরে দিও। আগে নিজের দিকে তাকাও। তোমার শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলাই রয়ে গেছে, এখনো সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। চোখের সামনে এমন সুস্বাদু খাবার সাজিয়ে রেখে শিকারীকে লোভ দেখানোর কোনো মানে হয় না, চন্দ্রিমা! আমার তো খিদে পেতেই পারে, তাই না?”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here